বজ্রমেঘ . ❤
পর্বসংখ্যা_১৩ .
ফাবিয়াহ্_মমো .
অবাক বিস্ময় নিয়ে চেয়ে থাকল সেগুফতা! মুখে কথা জুটল না, শব্দ ফুটল না, বিস্ময় কাটল না। ঘটনাটা বিশ্বাস করতে পারছে না! কী ঘটছে এটা? কী দেখছে? এ কেমন অলীক দুঃস্বপ্ন? গলার কাছে আঁটকে পড়া ঢোক নিচে নামল না ওর! বিরাট বড়ো হাঁ করার মতো মুখটা বানিয়ে ফেলেছে সেগুফতা! ওই মুখের ভেতরে যেন আস্ত এক পৃথিবীই ঢুকে যাবে! যাকে চাইলেও কাছে ভিড়ানো যায় না, ওভাবে পাশে বসানো যায় না, ওরকম একটা সেবা পাবার কথা ভাবাও অকল্পনীয়, সেই লোক কিনা বসে আছে ওই জঘণ্য মেয়েটার জন্য? ওই ইতর, নিচু, অসভ্য মেয়েটার সামনে? কেন অমন উদারতা দেখাতে হবে তাকে? কী প্রয়োজন এটার! কী অদ্ভুত, কী উদ্ভট, কী হিজিবিজি লাগল ব্যাপারটা। অজান্তেই পা পিছিয়ে সরে যেতে নিলে হঠাৎ কে যেন বাজখাঁই কণ্ঠে হুঙ্কার দিয়ে উঠল,
- আপনি স্যারের ঘরের সামনে কী করছেন!
আচমকা বিদ্যুৎপৃষ্টের মতো শিউরে উঠল সেগুফতা! ঘাড় ঘুরিয়ে পিছু ফিরে চাইতেই রাজ্যের আতঙ্ক যেন খামচা দিয়ে ধরল! কী সর্বনাশ! ও এখানে কী করছে! রাফান এখানে কখন এসে দাঁড়িয়েছে? ও কী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবই লক্ষ করেছে নাকি? কী ভয়াবহ ব্যাপার! মনে মনে এসব নিয়ে ভাবতেই জিভ দিয়ে নিচের ঠোঁটটাকে আলতো ভেজাল সেগুফতা। কণ্ঠে একটা খরখরে গাম্ভীর্য তুলে তোপ দেখিয়ে বলল,
- এটা আমার দেবরের ঘর। আমার দেবর ফারশাদ মির্জার। দেবরের ঘরের সামনে কী করব না-করব তোমাকে জিজ্ঞেস করতে যাব নাকি? তুমি কে? তুমি আমার পেছনে পেছনে কী করছিলে! কী উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে ফটকামি করছ শুনি?
সেগুফতা ভ্রুঁদুটো কুঁচকে তির্যকসুরে শোনাতেই রাফান তখন আর থামল না। নিজের পুরুষালি ভ্রুঁদুটো আরো দ্বিগুণ খিঁচে চোখমুখ কঠোর করে বলল,
- উনার নামের পাশে মির্জা লাগাবেন না সেগুফতা ভাবী। এই নামের কোনো অস্তিত্বই নেই। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, আপনাদের মতো মির্জা ট্যাগ উনার লাগাতে হয় না। ওই ট্যাগ ছাড়াই মানুষজন উনাকে চিনে, এক নামে পুরো পরিচয়টাই জানে। বংশের দাপট উনার অন্তত লাগে না।
- তুমি সিলি ম্যাটারের জন্য তর্ক করছ কেন! এরকম বাজে ব্যবহার কী জন্য? আমি কী এখন তোমার থেকে পারমিশন নিব রাফান? তুমি এরকম ফালতু অসভ্যমি কেন করছ? তর্ক বাদ দিয়ে বিদেয় হও। আমি এমন কিছু করিনি যেখানে এখানে আসাটা কোনো সমস্যা! যাও।
- দেবরের ঘরের সামনে বাঙালি বধূরা এভাবে দাঁড়িয়ে থাকে? চোরের মতো ছোঁক ছোঁক করে? আপনি আমাকে দুই বোঝালেন, আর আমিও আপনার কথামতো দুই দুই বুঝে গেলাম? দুইয়ে দুইয়ে যে চার হয়, সেটা আমি বুঝব না?
কী পরিমাণ খারাপের খারাপ! এই রাগী, অভদ্র, শয়তান ছেলেটা কীভাবে কথা বলছে? কথা শুনে গা জ্বলে উঠছে সেগুফতা! কত বড় সাহস! শয়তানটা মুখে মুখে আবার তর্ক জড়াচ্ছে! ডান গালে চটাশ করে একটা চড় লাগাতে ইচ্ছে করছে সেগুফতার। কিন্তু পরিস্থিতির কথা ভেবে নিজেকে শান্তভাবে দমাল ও। ভারি একটা শ্বাস ফেলে দাম্ভিক কণ্ঠে বলে উঠল ,
- তুমি আমাকে কোন সাহসে হুমকি দেবার চেষ্টা করছ? কার সামনে দাঁড়িয়ে জবান চালাচ্ছ? আমার সাথে ফালতু স্পর্ধা দেখাবে না বলছি! আমি কেন এসেছি সেটার কৈফিয়ত তোমাকে দেব না। আমার সামনে দুই টাকার পশ অ্যাটিচিউট দেখাবে না। তোমার মতো অশ্লীল চিন্তা করা লোকদের জন্য বলছি, আমি ওই মেয়েটার অবস্থা জানতে এসেছি। মেয়েটা কী করছে, কেমন আছে এটা দেখার জন্যই আসা। ভেতরে এজন্য ঢুকিনি, কারণ সেগুফতা কারো প্রাইভেসি ম্যাটারে ইন্টারাপ করে না। এখন নিজে একজন পুরুষ মানুষ হয়ে এখানে কেন এসেছ? এই ঘরে তো তোমার স্যার ঘুমাননি। কালরাতের ওই আহত মেয়েটা ঘুমিয়েছে। এখন নিজে কীসের জন্য এসেছ? ওই সুন্দরী, ঘুমন্ত মেয়েটার লোভে লোভে এসেছ না? ফাজিল ভণ্ড কোথাকার! নিজের নেই শিক্ষা, অন্যকে দেয় দীক্ষা!
দুহাত বজ্রমুষ্টি করে তাকিয়ে থাকে রাফান। চোখে ধিক ধিক করে জ্বলছে আগুন। ইচ্ছে করছে এই বজ্জাত মহিলাকে কঠিন ক’দফা শিক্ষা দিতে, কিন্তু আশু পরিস্থিতির কথা ভেবে কিছুই বলল না সে। একটা মুখ ভাঙা জবাব পর্যন্ত দিল না। যদি স্যার একবার এই অবস্থাটা দেখতেন, এই মহিলার অহংকার মাটির মধ্যে পিষে দিতেন তিনি। ভাগ্যিস, রাফান এই মুহুর্তে বচসা করতে আসেনি। রাগের হলকাটা নাক ফুলিয়ে ছাড়তেই আধ ভেজানো দরজায় ঠক্ ঠক্ করাঘাত করল সে। গলায় বিনীত ভঙ্গিটা রেখে সরলকণ্ঠে বলে উঠে,
- স্যার, রাফান বলছিলাম। ক্যান আই কাম ইনসাইড?
ভেতর থেকে সেই হিমধরা শীতল, ভরাট, শাণিত গলাটা ছুটে এল। ছোট্ট করে বলল,
- কাম ফরোয়ার্ড।
ওই দুই শব্দের অনুমতিতে স্থির হল রাফান। চোখদুটো তখনো সেগুফতার দিকে বিদ্ধ। ডানহাতে দরজাটা ঠেলে পা বাড়িয়ে ভেতর ঢুকল রাফান। কিন্তু শেষ ঝলক পর্যন্ত সেগুফতার দিকেই ক্রুদ্ধ দৃষ্টি ছুঁড়ে রইল সে। এরপর যখন ভেতরে প্রবেশ করে, ঘরের নির্দিষ্ট দিকে চোখ পড়ে, তখনই আচমকা কপাল কুঁচকে উঠল! তৎক্ষণাৎ মাথাটা ডানে বাঁয়ে দুবার ঝাড়া দিয়ে ফের চোখ মেলে তাকাল। চোখদুটো বড়ো বড়ো হয়ে গেল তার। এরপর যা বুঝতে পারল, তাতে পিলে চমকে উঠার জোগাড়! সাদা শার্ট পড়া ওই পেশিধারী শান্ত মানুষটা মাথা নিচু ঝুঁকিয়ে ক্ষত মুছে দিচ্ছে। মেয়েটার কনুইয়ে লাগা আঘাতে তুলো দিয়ে ধীরে ধীরে স্যাভনল লিকুইড লাগাচ্ছে। স্যাভলনের ঝাঁঝালো জ্বলুনিতে মেয়েটার দুচোখ বন্ধ, মুখটা বাঁদিকে ঘুরানো, বাঁদিকের খোলা জানালাটা দিয়ে হুঁ হুঁ করে সতেজ বাতাস উদ্যম উল্লাসে ঢুকছে। সেই হাওয়াতে মেয়েটার এলোমেলো বেণীর চুল, স্যারের ঈষৎ নরম চুল দুরুদুরু উড়ছে। দৃশ্যটা এমন জান্তব, এমন সুন্দর, এমন অকল্পনীয় ছিল যে রাফান দুই মিনিট কথাই বলতে পারল না। পরক্ষণে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসিটা ফুটে উঠলে দ্রুত সেটা লোপাট করল রাফান। হাসিটা দেখে ফেলল বিপদ! এখন এই ঘরে ওই ঈগলচক্ষুর সামনে হাসা যাবে না। হাসলেই গ্লক-১৭ পিস্তলটার মতো চোখদুটো তাক করে ফেলবে।
- এখানে কেন এসেছ রাফান? দরকারটা বয়ান করো।
কথার ধরণ শুনে শাওলিন চোখ খুলে চাইল। এভাবে কেউ কথা বলে? কেমন যেন খড়খড়ে ভঙ্গির না? আজ্ঞাসূচকের মতো লাগল না ওটা, বরং ফাঁসির আসামীর কাছে যেভাবে কর্তৃত্ব বজায় রেখে বলা হয় ‘ বয়ান করো! ‘, ঠিক সেরকম কিছু মনে হল ওর। গলার স্বরটা এমনিই কিছুটা বজ্র গম্ভীর লাগে। কানে ভারি গমগম প্রতিধ্বনির মতো অনুভূত হয়। গতকাল রাতে যখন স্ট্র দিয়ে পানি পান করাল, ওই মুহুর্তের দৃশ্যটা আবারও মনে মনে স্পষ্ট ভেসে উঠল। ওই মোমজ্বলা আঁধারে, সাদা পর্দার ওপাশে, কেমন বিরাট দেখাচ্ছিল ওই পৌরুষ দেহকায়! কেমন সম্ভ্রম ব্যক্তিত্বের আভাস ছিল ওটা! এমন সময় শাওলিন শুনতে পেল রাফানের শক্ত গলা,
- কালরাতের হামলাটা নিয়ে আর্মির কিছু তথ্য এসেছে স্যার। ওরা যা জানিয়েছে, তাতে প্রচণ্ড আশ্চর্য হতে হয়েছে। আপনি যদি ফ্রি থাকেন, আমি আপনাকে তথ্যগুলো পাঠিয়ে দিব। ওদের নন অফিশিয়াল কিছু আপডেটের পাশাপাশি একটু আগের ভাইটাল তথ্যটাও এসেছে। আমি কী আপনার অফিস রুমে পৌঁছে দেব স্যার?
মাথাটা অল্প নোয়ানো থেকে এবার একটু তাকাল শোয়েব। বাঁয়ে মুখ ফিরিয়ে রাফানের মুখটায় তাকাল। এক মুহুর্তের জন্য রাফান এই চশমাধারী চোখদুটোর কাছে অপ্রস্তুত হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু পরক্ষণে সেই বিশেষ কথাটা স্মরণ করে নিজেকে শক্ত বানাল ও। শোয়েব নিজের নীলবর্ণ চোখদুটো পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিয়েছে। এখন সে মনোযোগের সহিত সাদা গজ কাপড়ে নতুন ব্যাণ্ডেজটা বাঁধতে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করে মনে মনে কিছু ভাবনা কষল শোয়েব ফারশাদ। দুহাতের দক্ষ চালনায় কনুইয়ের ব্যাণ্ডেজটা পুরোপুরি বেঁধে দিতেই বলল,
- রাফান শোনো।
বলেই ডানহাতে সার্জিকাল কাঁচিটা তুলে নিল। ক্ষণিকের ওই অল্প বাক্যে রাফান ও শাওলিন দুজনই সপ্রতিভ। দুজনই শোয়েবের দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ব্যাপারটা নিজেও আড়চোখে লক্ষ করে প্রসঙ্গটা ব্যক্ত করল শোয়েব,
- আগামী সাতদিন কড়া পাহারার একটা ব্যবস্থা করো। এমন ব্যবস্থা করো, যেন নিরাপত্তার ফাঁদ গলে একটা পাখিও ঢুকতে না পারে। গতকাল এদের উপর সাধারণ কিছু হয়নি। একটা অস্বাভাবিক মুভমেন্ট প্রসিডিউর হয়েছে। এটা আগে থেকেই কোথাও না কোথাও রেডি করা ছিল। আর এখানেই ছিল, এই খাগড়াছড়িতে। এখানে বন জঙ্গলের পরিমাণ এতো বেশি, রাতের আঁধারে কেউ পালিয়ে গেলে আর্মিরা ধরতে পারবে না। কেন পারবে না জানো। তাই যেভাবে যেভাবে বললাম, সেভাবে করো। কোথাও এপিডেমিক কণ্ডিশন দেখলে সবার আগে কার্যালয়ে যোগাযোগ করবে, এরপর বাকি জায়গায়। পরিষ্কার?
সবগুলো কথা অখণ্ড মনোযোগে শুনল শাওলিন। শুনতে পেল রাফান সিদ্দিকীও। কিন্তু কথার মাঝে এমন একটা তির্যক ইঙ্গিত ছিল যেটা শুধু বুঝতে পেরেছে রাফান। আর্মিরাও ধরতে পারবে না! এই একটা কথার কাছে সম্পূর্ণ উত্তর বুঝে মাথাটা হ্যাঁ সূচকে দোলাল রাফান। পকেট থেকে একটা খামের মতো জিনিস বের করে সেটা সে সামনে বাড়িয়ে ধরল। শাওলিন চকিতে মুখটা ডানে ফিরালে সেই বাড়ানো হাতটাকে দেখতে পেল। একটা খাম সদৃশ বস্তু দেখে চোখ উপরে তুলল ও,
- এটা কী?
- এটা আপনার জিনিস মিস। কালরাতে এই কটা জিনিসই আপনার কুটির থেকে নিয়ে আসা গিয়েছে। বাকি সব জিনিস এখন কাস্টেডিতে আছে। ওগুলো এখান থেকে পরে নিতে পারবেন। কিছু প্রমাণ দেখিয়ে পারমিট ইস্যু লাগবে। স্যারই ওসব এনে দিবেন। চিন্তা নেই। কিন্তু এখন এটা বুঝে নিন।
শাওলিন নিজের বাঁহাত দিয়ে খামটা বুঝে নিল। কাগজে খসখস খামটা ধরতেই বুঝল, এটার ভেতরে মোবাইল ফোন! ওর ফোনটা বোধহয় উদ্ধার করা গেছে! শাওলিন খামটার মুখ বিছানায় উপুড় করে ধরতেই টুপ করে নিজের ফোনটা বিছানায় পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে একরত্মি স্বস্তির বায়ু চোখ বন্ধ করে ছাড়ল শাওলিন। অবশেষে বাঁচা গেছে! এই মুহুর্তে ফোন হারানো মানে বিপদ! বাসায় ফিরে গেলে একশো একটা অজুহাত, কৈফিয়ত, বিপদের পয়গাম হতো। এদিকে শোয়েব কাজ সম্পণ্ণ করে চেয়ার থেকে নিজের কালো স্যূটটা তুলে নিয়েছে। ওদিকে রাফান ঘরের বাইরে প্রস্থান। নিজের বাঁহাতে ভারি স্যূটটা ঝুলিয়ে নিতেই হিম-স্থির কণ্ঠে ডেকে উঠল শোয়েব,
- শাওলিন,
এমন করে ডাকল, যাতে চকিতে চোখ তুলল শাওলিন। দুচোখে কৌতুহল মিশ্রিত চাহনি ফুটিয়ে বলল,
- জ্বী?
- তুমি কী নিচে ডাইনিং এরিয়ায় ব্রেকফাস্ট করতে পারবে? এখন?
প্রশ্নটা শুনে নিজের পায়ের দিকে তাকাল ও। একপলক পাদুটো মৃদু নাড়াচাড়া করে দেখল। পরক্ষণে চোখ ফিরিয়ে হ্যাঁ বোধক সম্মতিতে বলল,
- আমার কোনো সমস্যা হবে না অফিসার। পায়ের ব্যথা কিছুটা কমেছে। হাঁটা যাবে আশাকরি।
- বেশ, নিচে চলো।
কথামতো পা দুটো ফ্লোরে নামিয়ে খুব সাবধানে দাঁড়াল ও। পায়ের গোড়ালি দিকটায় বেশি ভর রেখে সামনের দিকটা হালকা করে রাখল। পায়ের তলায় এখনো মোটা সাদা ব্যাণ্ডেজ। এই ব্যাণ্ডেজটা এখনো খোলা হয়নি। এটা নাশতার পর খোলা হবে। সিঁড়ি দিয়ে খুব আস্তে আস্তে নামলেও ওর পেছনে ততটাই আস্তে ধীরে নামছিল শোয়েব। তার চোখ সমান সতর্ক, বাঁহাতে ঝুলছে কালো স্যূট, ডানহাতে মোবাইল চেপে কথা বলছে সে। কিন্তু নজরটা ঘুরাফেরা করছে সামনে ব্যাণ্ডেজ বাঁধা পাদুটোর দিকে। না, মেয়েটা অন্যান্য মেয়েদের মতো করছে না। তার অভিজ্ঞ চোখ এই জীবনে যত মেয়ে দেখেছে, তন্মধ্যে এই হিসাব স্পষ্ট, যারা মার্জিত, সভ্য, নিজেকে সব পরিস্থিতিতে সমানভাবে খাপ খাওয়ায়, তারা কখনো ভয়ংকর পরিস্থিতিতে সিমপ্যাথি আশা করে না। তারা অধরা ভাবী এবং এই মেয়েটার মতোই চমৎকার।
ডাইনিং টেবিলের সামনে পৌঁছুতেই সবগুলো চেয়ার প্রায় ভরাট দেখল। ডিম্বাকৃতি লম্বা টেবিল, টেবিলের দুপাশে দশটি চেয়ার, টেবিলের এ-মাথা ও-মাথা দুটি চেয়ার। শাওলিনের ছয় বন্ধু এবং শোয়েবের চার ভাবী মিলে বসে পড়াতে এখন অবশিষ্ট রয়েছে এ মাথার সিংহাসন সদৃশ্য চেয়ার, এবং ওটার বাঁদিকের চেয়ারটাই। সবাই ততক্ষণে খাওয়া শুরু করেছে বলে কাউকেই জায়গা বদল করতে দিল না সে। শাওলিন যখন চেয়ারে বসে নাশতায় হাত দিল, তখনই টের পেল এই খাবার ওর জন্য বিস্বাদ! এক বাটি প্লেইন স্যূপ, দুটো সিদ্ধ ডিম, যা মাঝ বরাবর কাটা, এক গ্লাস দুধ সামনে রাখা। খাবারটা দেখেই নাড়িভুঁড়ি উলটে আসতে চাইল ওর! এই ডিম আর দুধ ওকে উনিশ বছরেও খাওয়াতে পারেননি মণি। এই দুটো বস্তু দেখলেই ওর বমি বমি পায়, জিভটা বমির জন্য উলটে আসে। অসহ্য লাগে! শাওলিনের চোখমুখ বিতৃষ্ণায় থমথম করলে হঠাৎ চোখ পড়ল আরেকদিকে। ঠিক মুখোমুখি চেয়ারে বসে আছে নাযীফ। মাথায় টুপির মতো সাদা ব্যাণ্ডেজ নিয়ে তাকিয়ে আছে সে। চোখে কাতর কাতর চাহনি, পারলে এই খাবার দেখে এখুনি কেঁদে ফেলে। সুস্বাদু বাঙালি খাবারের ঘ্রাণ পেয়ে ভেবেছিল, তাকেও বোধহয় কষা মাংস দিয়ে পরোটা খেতে দিবে। কিন্তু শাওলিন আর ওকে এ কী গু জাতীয় খাবার দিয়েছে! হ্যাঁ এগুলোই গু-ই। মুরগীর গু, গরুর গু এবং এক গামলা সবজি ধোয়া পানি। এগুলো কিনা আবার আহত রোগীর জন্য নাশতা! আরে, এসব খাবার খেলে আহত রোগীটা নিহত হয়ে যাবে! এর চেয়ে হসপিটালে থাকাটাই ঠিক ছিল না? মামা-চাচাদের পকেটে দু-চারটা নোট ঢুকিয়ে দিলে হরেক পদের সুস্বাদু খাদ্য এনে দিতো। এরপর কেবিনের বাইরে যথাযথ পাহারাও দিতো, যেন নার্স বা ডিউটিরত ইন্টার্ণ না আসে। ধ্যাত! এমন সময় চোখে চোখে শাওলিনের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ল নাযীফ, অর্থটা ঠিক এমন,
- কীরে, খেতে পারবি এগুলো? বমি চলে আসছে না? কী করি বল তো! এরকম অত্যাচার তো নেয়া যায় না। আয়! অজ্ঞান হওয়ার নাটকটা ধরি।
শাওলিন দুটো ভ্রুঁই যথাসম্ভব কুঞ্চন করল। ওসব নাটুকে ভঙচঙে একদম নেই ও। আড়চোখে ওর ডানদিকে বসা লোকটার দিকে ইঙ্গিত দিয়ে বোঝাল,
- তুমি উনাকে সরাসরি বলো এসব খাবার তুমি খাবে না। এগুলো তোমার পছন্দ না। তুমি একটা পরোটা দিয়ে ঝাল কষা মাংস খেতে চাও।
- তুই খাবি? তুই খেলে এক্ষুণি ব্যাটাকে বলব!
- আমি কখন বললাম খাব?
- দাঁড়া, এক্ষুণি বলছি। আমি বুঝতে পেরেছি তুই দুটা পরোটা খাবি, আর সাথে এক বাটি গরম কষা মাংস। ঘ্রাণটা সুন্দর আসছে রে। আমার তো ঘ্রাণ শুঁকেই এপিটাইট বেড়ে গেছে।
- তুমি আমার নাম —
শাওলিন আর কথা শেষ করতে পারল না। মাথায় মিশরের মমির মতো ব্যাণ্ডেজ নিয়ে ছোটখাটো একটা হুঙ্কার ছাড়ল নাযীফ,
- স্যার!
স্যূপের চামচে ঠোঁট রাখতে গিয়ে থামল শোয়েব। চোখটা এমনভাবে তাক করল, যা তার চশমার উপর দিয়ে ফুটে উঠেছে। নাযীফের অমন ‘স্যার’ বলে উঠাতে বাকিরাও তখন হতভম্ব। ও হঠাৎ হঙ্কার দিল কেন? এই খাওয়ার মধ্য কী হল? শোয়েব স্যূপের চামচটা নিচে নামিয়ে মুখ সোজা করে বলল,
- জ্বী, নাযীফ।
- স্যার, জানা এই খাবারটা খাবে না। ওর বমি বমি পাচ্ছে। এসব দেখলে ও অসুস্থ ফিল করে। ওর জন্য এনাদার অপশন দেয়া যায়? এই যেমন, বাকিদের মতো মাংস-পরোটা?
হতবাক শাওলিন বিস্ফোরিত চোখে চাইল! কী খারাপের খারাপ! এভাবে কেন ফাঁসানো হচ্ছে? ও কখন বলল ও এসব দেখে অসুস্থ ফিল করছে? কী বাজে মিথ্যাটা বলে দিল! অন্যদিকে শ্রেষ্ঠার চোখ অনুসন্ধিৎসু চোখে দুই বন্ধুর দিকে ঘুরছে। একবার বড় হারামিটার দিকে, আরেকবার ছোট পাথরটার দিকে। দুটোই বসেছে মুখোমুখি, দুটোই পেয়েছে মশলাহীন নাশতা। তার মানে এই ভণ্ডামির গুলটা পাকিয়েছে নাযীফ! নিজে খেতে চায় না বলে জানার ঘাড়ে চাপাচ্ছে! কী আশ্চর্য! শ্রেষ্ঠা টেবিলের নিচ দিয়ে সোহানার পায়ে লাত্থি দিল। সোহানা তখন মাংসের ঝোলে পরোটা চুবিয়ে সবে মুখে ঢুকাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই পায়ে বারিটা খেয়ে হাতটা ওর নাক-মুখ মাখিয়ে দিল। পরোটার টুকরোটা ধপ করে পড়ল প্লেটে। ওদিকে শ্রেষ্ঠা নাযীফের দিকে চোখ ফেলে ফিসফিস করে বলছে,
- ওর খাই খাইপণা বন্ধ করতে বল। ইশারা দে। এই চোরটা মাংস দেখে হুঁশ রাখতে পারছে না।
এদিকে সোহানা বেজায় ক্ষিপ্ত হয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
- তুই আগে আমার দিকে তাকা!
- তোর দিকে কী তাকাব? তুই ওইদিকে তাকা। ইশারা কর। তোরটা আগে দেখবে।
- তুই আমার দিকে তাকা শ্রেষ্ঠা!
এবারের ফিসফিসানিটা দৃঢ় শুনতে পেল শ্রেষ্ঠা। তৎক্ষণাৎ চোখটা ডানদিকে ফেরাতে ফেরাতে বলছিল,
- আচ্ছা কী তাকা—
আর বলতে পারল না শ্রেষ্ঠা! ঠোঁট হাঁ করে জুলজুল দৃষ্টিতে সোহানার চেহারাটা দেখল ও। এরপরই ফিক করে হেসে দিতেই বহুকষ্টে হাসি আঁটকে ফিসফিসিয়ে বলল,
- ওমা! তোর মুখ দেখি হনুমানের লাল প— মানে পশ্চাৎদেশ হয়ে আছে। আচ্ছা স্যরি, স্যরি। তুই প্লিজ ন্যাপকিনটা দিয়ে মুছে ফ্যাল। আর ওই বান্দরটাকে বল ফকিরিপণা না করতে। নাহলে আজ বিকেলের চিকেনে কাবাবে ওকেই আমি চিকেনের কিমা বানাব। সাবধান কর।
- করছি। কিন্তু . . এক মিনিট, কীভাবে করব? ও তো —
বলতে বলতেই শোয়েব তখন শাওলিনের মুখে তাকাল। ওই মুখ দেখে কী বুঝল কে জানে পুনরায় নাযীফের দিকে চোখ ফেলে বলল,
- তুমি শিয়োর তোমার বন্ধু সিক ফিল করছে? অনলি ফর দিস বয়েল্ড এগ অ্যাণ্ড সাম ভেজিটেবল স্টক প্লেইন স্যূপ?
- ইয়েস স্যার। আই অ্যাম ওয়ান থাউজেণ্ড পার্শেন্ট শিয়োর। প্লিজ ডোন্ট টর্চার উইদ হার ফর দিস প্লেইন ফুড।
- সাউন্ডস ইক্যুয়েল। আচ্ছা, এক কাজ করো। তুমি ওখান থেকে প্লেটে তিনটা পরোটা নাও, যতখানি তরকারি দরকার তুলে নাও।
এরকম আত্মতুষ্টির কথা শুনে মনটা বাকবাকুম করে উঠল নাযীফের। এই তো সেরেছে কাজ! জানাকে এভাবে মধ্য অবস্থায় রেখে খাপে খাপ কাজ হয়েছে। পুরুষদের সবসময়ই মেয়েদের উপর একটুখানি কোমল ইন্দ্রিয় কাজ করে। তারা কখনো ডেম্পারেট ভঙ্গিটা ওদের উপর না। নাহলে আর্মিরা কেন পেছনে ছেলেদের মারে, আর মেয়েদের বেলায় শুধু মুখ দিয়ে বলে? তার উপর পার্বত্য অঞ্চলের এই ফরেস্টার অতিমাত্রায় ভদ্রলোক। খুশিতে ঠোঁট-মুখ উদ্ভাসিত হয়ে প্লেটে মনের ইচ্ছেমতো সব তুলে নিল। এরপর আরেকটা প্লেটে শাওলিনের জন্য একই খাদ্য তুলে নিতে গেলে এবার পারমাণবিক মিসাইলটা ছুঁড়ল শোয়েব,
- তুমি আরেকটা প্লেট নষ্ট করছ কেন? ওটা কার জন্য? প্লেট তো তোমাকে একটা সাজাতে বলেছি। দুটা না। ওটা সাজানো হয়ে গেছে, যে সিক ফিল করছে তাকে দেয়া হয়েছে। এবার তুমি ওরটা সহ দুটো প্লেটের খাবার শেষ করো। খাবার যেন একটুও ওয়েস্ট না হয়। খাও।
মুখে অমাবস্যার আঁধার নিয়ে চুপসে গেল নাযীফ। অসহায়, বুভুক্ষু নজরে শাওলিনের দিকে চাইল। শাওলিনের সামনে তখন দ্বিগুণ বাঁশ। নাযীফ নিজের প্লেট ভেবে যেভাবে খাদকের মতো খাবার নিয়েছে, মাংসের টুকরোয় বাটি উঁচু উঁচু, এগুলো ওর মতো স্বল্পভুক্তের গলা দিয়ে নামবে? এই নরক যন্ত্রণাটা নাযীফ ডেকে আনল না? কী দরকার ছিল ওর নাম নিয়ে কাজটা করা? নাযীফ মিশরের আসল মমির মতোই শুকনো মুখে বলল,
- আপনি ওকে দেখেছেন? ও এতগুলো খাবার খেতে পারবে?
স্যূপের চামচে নিঃশব্দে একটা চুমুক দিয়ে শোয়েব বলল,
- নিশ্চয়ই। তুমি যেহেতু শিয়োর তোমার বন্ধু প্লেইন ফুডের জন্য সাফার করছে, তাই এটাও তোমার ধারণা থাকার কথা, সে কতটুকু খাবে। তাই তোমাকে বলেছি একটা প্লেট সাজাও, আর সেটা ওকে পাস করো।
- স্যার, ও তো ছোট মানুষ। ছোটখাট একটা পিঁপড়াও ওর চেয়ে বেশি খায়। ও তো অতোগুলো খাবার খেতে পারবে না। নষ্ট করে ওয়েস্ট বিনটাই ভরিয়ে ফেলবে।
মেজাজটা আর সামলাতে না পেরে কঠিন গলায় ধমকে উঠল শ্রেষ্ঠা,
- অ্যাই ছাগল, তুই ওকে পিঁপড়ার সঙ্গে তুলনা দিয়ে কী বোঝাচ্ছিস? চড় দিয়ে এখন খাবারের স্বাদ ভুলিয়ে দেব। তুই মাংস খেতে চাচ্ছিস এটা মুখ দিয়ে বললেই হয়। অতো জিলাপির প্যাঁচে প্যাঁচাচ্ছিস কেন?
এবার চোখটা স্বাভাবিক করে শোয়েবের দিকে চাইল শ্রেষ্ঠা। কণ্ঠের উত্তাপটা নীচের দিকে ঠেলে ধাতস্থ গলায় বলল,
- স্যার, অনাকাঙ্ক্ষিত ঝামেলার জন্য আমি স্যরি বলে নিচ্ছি। গরুর যেমন ঘাস দেখলে হুঁশ থাকে না, ওরও মাংস দেখলে হুঁশ থাকে না। আপনি যে হেলথ কনসাস চিন্তা থেকে খাবারগুলো দিয়েছেন, এটা ওর মতো ষাঁড়ের বুদ্ধিতে ধরেনি। আপনি প্লিজ কন্টিনিউ করুন স্যার। অ্যাই জানা, তুইও খা প্লিজ। ওখানে দুই পিস আপেল দিয়ে শুরু কর। খেতে পারলে ভারি কিছু ওখান থেকে নিয়ে নিস।
শ্রেষ্ঠার উপস্থিত ধমকে পরিস্থিতি কিছুটা ধাতস্থ হয়ে গেল। এদিকে শ্রেষ্ঠা আর শাওলিন বাদে প্রায় প্রত্যেকেই ফিসফিস হাসছে। মিথিলা ঠোঁটের সামনে হাত রেখে হাসি আড়াল করছে, তাহিয়া মাথাটা প্লেটের দিকে ঝুঁকিয়ে রেখেছে, অধরা বহু কষ্টে ঘর কাঁপিয়ে হাসা থেকে বিরত থাকছে। অন্যদিকে সেগুফতার চোখ-মুখ গম্ভীর। মুখে যেন কালি পড়েছে। অধরা হাসির দমকটা আঁটকানোর জন্যই সবে ডানপাশে তাকিয়েছিল, কিন্তু সেগুফতার ওই গম্ভীর মুখ দেখে আর নিজেকে আঁটকাতে পারল না। হো হো করে হেসে উঠতেই এদিকে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় সেগুফতা। মুখে পরোটা নিয়ে চিবোতে চিবোতে হঠাৎ থেমে ভাবল, আচ্ছা মুখে কী কিছু লেগেছে? এই অধরা চোখ খিঁচিয়ে হাসছে কেন? অন্যদিকে থেমে নেই বাকিরা! হাসির জীবানু ছড়িয়ে যেতেই পুরো ডাইনিং ঘর হাসিতে ফেটে পড়ল। এবার আর বাঁধ মানল না কেউ। সেই হাস্য কলরবে চমকে উঠলেন বৃদ্ধা ফাতিমা। এ কী! চোখে বয়সের ভারে ন্যূব্জ চশমা, হাতে সুন্দর একটা কাঠের ডায়েরি। তিনি দুই ভ্রুঁর মাঝে চমকের ভাঁজ ফেলে বললেন, নিচে হাসির রোল নাকি? কারা হাসছে? এই মরা বাড়িতে উল্লাসপূর্ণ আবহাওয়া কী করে এল? কীভাবে কী?
.
দুপুরটা ঘনিয়ে এসেছে সন্ধ্যায়। চারিদিকে ভয়াল কালো মেঘ। মেঘের গোগ্রাসে ঢেকে গেছে সমস্ত আলোকিত বনাঞ্চল। ঢেকে গেছে সমস্ত নির্মলতা। পার্বত্য এলাকায় যখন-তখন ঝড়বৃষ্টি নামে, যখন-তখনই আছড়ে পড়ে তুফান। এখানে আবহাওয়ার আন্দাজটা খাটে না। সারাটা বাংলো ভয়ানক নির্জীব। কোথাও কেউ নেই। ওরা পাঁচজন দূরের একটা টিলার কাছে গিয়েছে। হেঁটে গেলে চল্লিশ মিনিট। নাযীফ গিয়েছে হসপিটালে। ওর মাথার ব্যাণ্ডেজটা পালটানো বাকি। শাওলিন দুপুরের ঔষুধগুলো খেয়ে চুপচাপ জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। সুন্দর দুটো নির্মল চোখে বজ্র সরব প্রকৃতি। কেমন গুমোট যন্ত্রণায় মোচড়ে উঠে বুকটা। একটা বোবা অস্ফুট কান্নায় হু হু করে মন। যেন এখুনি আকাশের চোখ ফেটে অশ্রু ঝরবে। আর পৃথিবীর মাটিতে ছড়িয়ে দিবে আলোড়ন। পড়ণের হালকা গোলাপি জামাটা বাতাসে খুব দুলছে। ঢোলা হবার ফলে দস্যুর মতো ছোবল দিচ্ছে শীত। ঠাণ্ডা শীতালু পরশে কেঁপে উঠে শাওলিন, হাতদুটো চেষ্টা করে বুকের কাছটায় আড়াআড়ি জড়িয়ে নিতে। কিন্তু ডানহাতের কনুইয়ে বীভৎস ব্যথাটা জন্য পারে না। এমন সময় ঘরের পেছন থেকে ডেকে উঠল অধরা,
- তুমি ঘুমোওনি?
মাথাটা পিছু ঘুরিয়ে তাকায় শাওলিন। ডান কাঁধ বরাবর পিছু তাকিয়ে মাথাটা ডানে-বামে নাড়ায় ও। সমস্ত মুখ চুলের দুরন্ত ঝাপটায় লুটোপুটি খাচ্ছে, বাগানের সতেজ গোলাপ ফুলটার মতো রঙ ফিরে পেয়েছে ওর পাতলা ঠোঁট। গোলাপি নরম মিঠে রঙ, ঠোঁটের চর্তুদিকে এক অদ্ভুত কোমলত্ব। অধরা মিষ্টি হেসে মেয়েটার কাছে ভিড়তে ভিড়তে বলল,
- তোমার তো গোসল করা হয়নি। বেলা যে প্রায় পেরিয়ে যাচ্ছে। তুমি কী গোসল করতে চাও?
সামনে দাঁড়ানো অল্পবয়সী মানুষটাকে দেখল শাওলিন। সুডৌল হাসিমুখ মুখ, চোখে হাসির উচ্ছ্বাস, গায়ে সোনালি পাড়যুক্ত কালো রঙের শাড়ি, ছোট হাতায় ম্যাচিং কালো ব্লাউজ। চুলগুলো সদ্য গোসলের দরুন ভিজে আছে। টুপ টুপ করে পানি ঝরছে চুল গড়িয়ে। শাওলিন নিজেও এক টুকরো হাসি ফিরিয়ে বলল,
- আমার জন্য তো গোসল করলে ভালো হয়। গতকাল দুপুরের পর থেকে এই সুযোগটা পাইনি। আমার জামাকাপড়গুলো ছোট ট্রাভেল ব্যাগটায় ছিল। ওগুলো ছাড়া আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
অধরা কিছুটা দ্বিধায় পড়ে গেল। শোয়েব এতোকিছুর খেয়াল রেখেছে, টাইম টু টাইম ঔষুধের বিষয়টাও দেখে দিয়েছে, সে কেন এতো বড়ো দায়িত্বটা ভুলে গেল? নাকি ওর পুরুষোচিত মস্তিষ্কে এটা আসেইনি যে, একটা মেয়ে গোসল ছাড়া থাকতে পারবে না। তার জন্য পোশাকটা অপরিহার্য। অধরা ভাবতে ভাবতে চকিতে চোখদুটো ছোট ছোট করে তাকাল। শাওলিনের দিকে আপাদমস্তক দৃষ্টি বুলিয়ে ভাবুক গলায় বলল,
- আচ্ছা, তোমার জন্য একটা ভালো বুদ্ধি আছে। বুদ্ধিটা খুব সুন্দর। তুমি চাইলে এক্ষুণি উপায়টা বাতলে দিতে পারি। তবে একটা শর্ত হচ্ছে, তোমার জামাকাপড়ের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত তুমি আমার বুদ্ধিটায় ‘না’ করবে না। কোনো সংকোচ করবে না।
- কী বুদ্ধি অধরা? একা একা কী উপায় ঠাওরাচ্ছ তুমি?
হঠাৎ দুজনই সেই প্রশ্নকণ্ঠে চোখ পিছু ফেলল। শাওলিন তাকাল অধরার ঠিক পেছনে, আর অধরা নিজের মাথাটা ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকাল। দেখতে পেল, সেজো নাতবউ তাহিয়া হারুন ভ্রুঁ নাচাতে নাচাতে অধরাকে প্রশ্ন শুধাচ্ছে। অধরা একটা ফিচেল হাসিতে সম্পূর্ণ পেছনে ঘুরতেই তাহিয়াকে সব বলল। তাহিয়া ব্যাপারটায় তৎক্ষণাৎ সম্মতি দিলে আর দেরি করল না অধরা। ঝটপট সব দক্ষহাতে, ত্রস্তভাবে বন্দোবস্ত করল সে। বিস্ময় বিমূঢ় শাওলিনের হাতে একস্তুপ ধরিয়ে দিয়ে বলল,
- যাও, এবার গোসলটা সেরে আসো। বাকিটা আমি দেখে দিচ্ছি কেমন? এরপর ছাদে গিয়ে বসলে তোমার চুল দশ মিনিটের মধ্যে শুকিয়ে যাবে। যাও যাও, দেরি করো না। একটু পর বেলা হয়ে যাবে।
নিজের হাতের দিকে থমকানো চোখে তাকাল শাওলিন। ঘোর বিস্ময়ে কপাল কোঁচকানো। বাইরে গুড়ুম গুড়ুম করে মেঘ ডাকছে। বৃষ্টি নামতে বোধহয় দেরি নেই।
.
লোহার প্রকাণ্ড ভারি গেটদুটো গুঁড় গুঁড় মেঘের মতো গর্জন তুলেছে। মাঝখানে ফাঁক হয়ে দুদিক বরাবর খুলে যাচ্ছে গেটদুটো। গেট ডিঙিয়ে ভেতর ঢুকছে একটি অফ রুটের জীপ। জীপের পুরো দেহ কালচে সবুজ বর্ণের। ইঞ্জিনটা বন্ধ হয়ে গমগম স্বরগুলো থেমে যেতেই দরজা খুলে বেরুলো বন কর্মকর্তা। মুষলধারে আছড়ে পড়েছে বন পাহাড়ের বৃষ্টি। একেকটি ফোঁটা যেন মার্বেল আকৃতির। তার পোশাকে, তার চলনে, তার দৃষ্টিতে, তার ভাবভঙ্গিতে বৃষ্টির নিপাট স্পর্শ ছুঁয়ে দিচ্ছে। আবছা হয়ে আছে চোখের একহাত দূরত্বও। জীপের চাবিটা পকেটে পুড়তে পুড়তে কাঁকর বিছানো লম্বা পথটা ধরে বাংলোর সীমানায় উঠল। খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই কোথা থেকে যেন মতিন একটা গামছা হাতে ছুটে এল। গলায় অস্থির চিন্তার ভাব ফুটিয়ে বলল,
- ভাইজান, আপনে ভিইজা ভিইজা ক্যান আইলেন? আমারে একটাবার ডাক ছাড়তেন! ছাতাখানাডা লইয়া ছুট দিতাম! এই আকাইম্মা বিষ্টির লিগ্যা আপনেরে যদি সর্দি ধরে!
- না, এই বৃষ্টিতে আমার জ্বর আসে না।রোকেয়াকে বল এক মগ কফি লাগবে। আমি উপরে গেলাম।
- আইচ্ছা ভাইজান। আমি পাডায়ে দিবার ব্যবস্থা করতিছি।
মতিনের প্রস্থানের পর পাদুটো সিঁড়িপথে চলমান করে শোয়েব। সমস্ত শরীর বৃষ্টিতে ভিজে গেছে। অসময়ের বৃষ্টিতে ভেজার ইচ্ছে থাকলেও আজ বাড়িভরা অতিথি বাৎসল্য। একঝাঁক তরুণ-তরুণী দল। অন্যদিকে গুলজার আজিজ তার দুজন চেনা লোক নিয়ে এখানে আসছেন। আসার কোনো শক্ত উদ্দেশ্য নেই। তবে শোয়েব অনুমান করছে, এরা নিশ্চয়ই গুলজার আজিজের স্বজন কেউ। এখন ব্যাপারটা যেন কোনো আঙ্গিকে বিয়ে-প্রসঙ্গে না যায়। দাদীর কানে পাত্রী সংক্রান্ত কথা না উঠায়। সে এই মুহুর্তে এসব ভয়াবহ চিন্তা করছে না। সে বিয়ে নামক সামাজিক বন্ধনে আগ্রহী না। সিঁড়ির প্রতিটি ধাপ ভেঙে ভেঙে দোতলায় উঠছিল শোয়েব, অন্যমনষ্ক মস্তিষ্ক আজ বড়োই অশান্ত। মেজাজটা তিলে তিলে খতারনকের দিকে যাচ্ছে, কিন্তু তার মুখায়ব যথেষ্ট শান্ত। বাঁদিকে না যেয়ে ভুলবশত ডানদিকে পা ঘুরায় ও। খেয়াল নেই নিজের ঘরটা যে রাতারাতি অন্য কারোর। সে পায়ে পায়ে হাঁটতে থাকলে বন্ধ দরজার সমুখে থামে। আরেক পা বাড়িয়ে যেই দরজাটায় ধাক্কা দিতে নিবে, ঠিক তখনই আচমকা থমকে যায় শোয়েব! স্থির হয়ে যায় চোখ! থমকে তাকায় ও!
FABIYAH_MOMO .
বজ্রমেঘ . ❤
পর্বসংখ্যা_১৩ .
ফাবিয়াহ্_মমো .
[অংশ সংখ্যা – ০২]
যেই দরজাটায় ধাক্কা দিতে নিবে, ঠিক তখনই আচমকা থমকে যায় শোয়েব! স্থির হয়ে যায় চোখ! দুর্দম্য চমকে স্থবির হয় মন। চোখের সামনে আর কেউ নয়, বরং দাঁড়িয়ে আছে দাদী। দরজার রূপোলি নবটা ধরে সাদা ভ্রুঁ দুটো ঈষৎ কুঁচকে চেয়ে আছেন। গলায় আধো কৌতুহল, আধো দ্বিধা মিশিয়ে বললেন,
- কী ব্যাপার অফিসার সাহেব? আপনি এদিকে? ভুল করে এদিকে চলে এসেছেন?
মুখের হতচকিত ভাব সেকেণ্ডের মধ্যে আড়াল করল শোয়েব। বুঝতে দিল না সে যে ভারী বিষম খেয়েছে। তার বিক্ষিপ্ত মন সত্যিই ভুলে গিয়েছিল নিজের ঘরটা এখন অন্যের দখলে। দাদীর ভ্রুঁ কোঁচকানো দৃষ্টি দুটোয় চোখ মিলিয়ে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল সে,
- মেয়েটার শারীরিক অবস্থা জানতে এসেছিলাম। কেমন আছে, কী খবর এটুকুই। মাত্র নক করতে যাব, তার আগেই দেখছি দরজা খুলে দিয়েছ।
কথাগুলো অকপট, নির্ভেজাল, স্থৈর্য কণ্ঠে বলল শোয়েব। একটা পরিষ্কার নির্বিকারত্ব ফুটে ওঠল চোখে, কাটালো চোয়ালে, এক শীতলস্পর্শী মুখে। দাদীর চোখদুটোর চাহনি অতিমাত্রায় ছোট ছোট হয়ে গেছে। তিনি কী একটা গভীর আশঙ্কা পর্যবেক্ষণ করে ভীষণ চিন্তিত হয়ে গেলেন। নবটা ছেড়ে এক কদম বাইরে এসে প্রচণ্ড দ্বিধাপূর্ণ দৃষ্টিতে বললেন,
- তুমি ডাক্তারের কাছে যাওনি? তোমার কাঁধের পেশিটা আরো ফুলে উঠেছে! এগুলো কেমন ধরণের কাজ করেছ? ডাক্তারকে আসতে বলো ফারশাদ। এরকম হেলাফেলা একদম বরদাস্ত করব না!
উচ্চকণ্ঠে কথাগুলো শুনতেই ডানহাতটা উপরে উঠাল শোয়েব। নিজের বাঁ কাঁধে হাতটা রাখতেই বুঝল, অজান্তেই কখন জানি বাঁ কাঁধটা প্রচণ্ড ফুলে উঠেছে। ব্যথাটা খুব একটা কাবু করতে পারেনি; দুপুরে একসঙ্গে দুটো হাই ডোজের পেইনকিলার খেয়ে ফেলায় ব্যথাটা রন্ধ্রে রন্ধ্রে সংকেত পৌঁছাচ্ছে না। কিন্তু যার চোখে ব্যাপারটা খাপে খাপ ধরা পড়ল, তিনি তো এখন ক্ষান্ত দিবেন না। ডাক্তার না ডেকে বসবেন না একচুল। শোয়েব ফোলা কাঁধটা ডানহাতে ছুঁয়ে নির্বিকার চিত্তে সুস্থির কণ্ঠে বলল,
- আমার কাঁধে ব্যথা নেই। ফোলাটা বাইরে থেকে বেশি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। বৃষ্টির পানিতে শার্ট ভিজে আছে। এই ভেজা শার্টের কারণে এরকমটা মনে হচ্ছে। দুপুরে পেইনকিলার খেয়েছি দুটো। বতর্মানে ব্যথার ছিঁটেফোঁটাও নেই। ডাক্তার ডেকো না দয়াকরে। প্রয়োজন বোধ করলে আমি ব্যাপারটা দেখে নিব। টেনশনের কোনো কারণ নেই।
- সাজিয়ে গুছিয়ে মিথ্যে কথা পরিবেশন করছ কেন? আমি তো দেখতে পাচ্ছি, কাঁধের ওখানটায় রক্ত জমাট বেঁধে গেছে। এরকম অবস্থায় নিজের মতো ঔষুধ খাওয়াটা ঠিক?
শোয়েবের নির্ভীক সোজা কণ্ঠ,
- তুমি আমার জন্য হটব্যাগের ব্যবস্থা করে দাও। চাইলে নিজে এসে এই জায়গাটা দেখে দিতে পারো। আমি এখন আর বাইরে যাব না। একটু পর গুলজার সাহেব তার দুজন লোক নিয়ে আসবেন। তাদের যথাসাধ্য অতিথি আপ্যয়ন করো।
কথাটা বলতেই আরো এক পা এগিয়ে গেল শোয়েব। বৃষ্টিতে পুরোপুরি ভিজে থাকায় সাদা শার্টটা সম্পূর্ণ গা সাঁটানো। স্বচ্ছ সাদা কাপড়ের অতলে ঢাকা পড়ে আছে, এক ঘাম ঝরানো কঠোর দেহশ্রী। যে দেহের ভেতরে লুকিয়ে আছে এক দুর্গম, অজানা দূর্গ। সেই দূর্গের ধারালো খাঁজ, পেশির মাপ, নিখুঁত বলিষ্ঠতা প্রচণ্ড শ্বাসরুদ্ধকর! সেখানে একবার তাকালে পাঁজরা ভেতরটা ঝিমঝিম করে ওঠে! এদিকে ফাতিমা নাজ তখনো জানতেন না, উনার পেছনে থাকা নারীটি ভীষণ আশ্চর্যে তাকিয়ে আছে। স্নিগ্ধ-কোমল মুখের উপর ভয়াতুর কৌতুহল। ওর চোখ তখন আঁটকে আছে দরজার বাইরে, দুটো আশ্চর্য বিধুর চাহনিতে। লোকটার ওই বিশাল দূর্গের মতো বুকটার মাঝে ওটা কীসের চিহ্ন? স্থির, খাটো, ছোট দৃষ্টিতে শাওলিন গভীররূপে দেখতে চাইল। কিন্তু গলার কাছে নিঃশ্বাস যেন আঁটকে আসছে, বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ডটা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, এক অদ্ভুত অস্থিরতায় চোখ নামাল ও। শুধু এটুকু বুঝতে পারল ওটা সার্জারির দাগ। ওরকম একটা সার্জারির চিহ্ন বইয়ের পাতায় পড়েছে। বহুবার বহু জায়গায় ছবিটা দেখেছে। কিন্তু লোকটার ওই স্থানে কেন ওরকম চিহ্ন? ঠিক ওই বিশেষ স্থানটাতে? এদিকে দরজার বাইরে তখনো দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন ফাতিমা। তিনি কথা বলতে বলতে রূপোলি নবটা টেনে দরজাটা ভেজিয়ে দেন। চোখের সামনে ওইটুকু দৃশ্যপট আস্তে আস্তে বন্ধ দরজায় ঢাকা পড়ে গেল। কানে শুধু অস্ফুটে এটুকু শুনতে পেল,
- ওকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের কাঁধটাকে জখম করেছ। সারারাত ব্যথা নিয়ে ঘুমোতে পেরেছ? তার উপর হাতের এই জায়গাটা . . হয়েছে অজুহাত বন্ধ করো ফারশাদ। এক ঘা শুকাতে না শুকাতে আরেক ঘা বসিয়ে এনেছ। আসো, মিথিলাকে ডেকে ব্যবস্থা করি। হটব্যাগ দিয়ে . . .
এরপর আর কিছু শুনতে পেল না ও। দরজার আড়ালে কথাগুলো চাপা পরে গেল। আবছা অন্ধকার ঘরটার ভেতর এখনো বাতি দেয়নি শাওলিন। জানালাগুলো দিয়ে যতটুকু বাইরের আলো এসে পরছিল, তাতেই সুইচবোর্ডটা খুঁজে খুঁজে বাতিটা জ্বালিয়ে দেয় ও। মুহূর্তেই বিশাল বড়ো ঘরটার মাঝে আলোর বন্যা যেন বয়ে গেল। দেয়ালে দেয়ালে আলোর বিচ্ছুরণ, প্রকৃতির বৃষ্টিমুখর ছন্দ, ঘরে একটা শান্ত শীতল বাতাস সবকিছুই কেমন হৃদয় জুড়োনো। শাওলিন চর্তুদিকে চোখ বুলাতে বুলাতে ঠোঁটে এক টুকরো মিষ্টি হাসিতে উদ্ভাসিত হল। কী সুন্দর শৈল্পিক মন, মার্জিত চোখ, ঘরের আনাচে কানাচে একজন রুচিশীল মানুষের চমৎকার ছাপ! আসবাব থেকে শুরু করে পায়ের তলায় থাকা লাল মখমলি কার্পেট, জানালায় গ্রিলহীন থাইগ্লাস, বারান্দায় কাঁচের স্লাইডিং ডোর, দেয়ালে ঝুলতে থাকা গ্রাম বাংলার চিত্রপট! সবই কেমন যেন শান্তি ছোঁয়ানো। যেন এ ঘরটায় কেউ পা দিলে, সে রন্ধ্রে রন্ধ্রে এক সুখ মাখানো আরাম অনুভব করবে। এক অব্যক্ত সুখ, শান্তিময় নিবিড় সুখ। শাওলিন চুলে তোয়ালে ঘষতে ঘষতে আয়নার কাছে এসে থামল। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজের অবয়ব দেখতে পেয়ে সহসা হাতদুটো থমকাল ওর। এক দুর্দমনীয় কৌতুহলে নিজের প্রতিবিম্বটা দেখতে লাগল। কার বাড়ি? কার ঘর? কার শাড়ি? কার আশ্রয়? কোনোকিছুই ওর নয়, অথচ সবকিছুই কেমন যেন নাগালে পৌঁছুনো। এই পৌঁছে দেবার কাজটা সৃষ্টিকর্তা কেন করছেন? কীসের ইঙ্গিতে করছেন? কোন পরিকল্পনায় সাজাচ্ছেন? কোনোকিছুরই উত্তর খুঁজে পেল না শাওলিন। গম্ভীর, শুকনো, হাসিহীন মুখটার মাঝে কোনো উত্তর এসে ভিড়ল না।
.
ঘড়িতে ঠিক ক’টা বাজে খেয়াল নেই। সদ্য গোসল শেষে কোমরে টাওয়েল প্যাঁচানো দীর্ঘ উচ্চতার লোকটা ঘরে প্রবেশ করেছে। তার চওড়া দৃঢ় কপালের ওপর একছাঁট সারিবদ্ধ চুল। চুলের অগ্রভাগ চোখের ওপর লুকোচুরি খেলছে, কখনো ছুঁয়ে দিচ্ছে চোখের লম্বা সুন্দর পাপড়িগুলো। দুটো নীল স্বচ্ছ মণি দৃষ্টিবদ্ধ হয়ে আছে ফোনের দিকে। ডানহাতের বুড়ো আঙুলটা টাইপের স্পিডে কিছু একটা লিখে যাচ্ছে। অন্যদিকে চোখ বুলাচ্ছে ঘরের দেয়ালঘড়িতে। রাত আটটা বিশ। ইতোমধ্যে গুলজার আজিজ এবং তার সহযোগী দুজনের এসে পরবার কথা। নিচে তারা এসেছে কিনা তা সে জানে না। আলমারি থেকে ডার্ক গ্রিন টিশার্ট, একটা আমেরিকা ব্রাণ্ডের ট্রাউজার বের করে নিল। যতটুকু খেয়াল আছে, আজ এমন কিছু আলোচনা হবে না, যার দরুন মাথাটা বিগড়ে যেতে পারে। খুব ঠাণ্ডা, খুব শান্ত, খুব স্থির থাকতে হবে। ঝটপট গায়ে পোশাকগুলো জড়িয়ে ঘর থেকে বেরোল শোয়েব। সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতেই বুঝতে পারছিল হলঘরে মেহমান উপস্থিত। কিছু একটা নিয়ে হাসিমুখর গল্প বিরাজমান। শোয়েব সেখানে উপস্থিত হতেই গল্পের মোড় অন্যদিকে ঘুরল। ঘটনা কোনদিকে যেতে চলেছে তা বুঝতে একটুও দেরি হল না। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে গুলজার আজিজ বলে উঠলেন,
- বন বিভাগের চাকরি কেমন যাচ্ছে? প্রশাসনিক কাজ, বৈদেশিক সেমিনার সব মিলিয়ে অবস্থা কেমন?
শোয়েব শান্তমুখে শান্তকণ্ঠে জানাল,
- বেশ ভালো। ব্যস্ততা, অবসর, সেমিনার সব মিলিয়ে ভালো যাচ্ছে। সময়টা উপভোগ্য।
- তাহলে পরবর্তী ধাপ নিয়ে কী ভেবেছ?
শোয়েব কথাটা শুনে এমন ভাব করল, যেন সে ব্যাপারটা বুঝতেই পারেনি। একটা ইচ্ছাকৃত সরল অভিব্যক্তি ফুটিয়ে বলল,
- পরবর্তী ধাপ বলতে ডি. এফ. ও থেকে প্রোমোটেট?
কথাটা শুনে খলখল করে হেসে উঠেন গুলজার। উনার ঘর কাঁপানো হাসিতে সমস্ত হলঘর ভরে উঠল। তিনি যেন এমন মজার কথা ইহজন্মেও শোনেননি। উনার হাসিতে একমাত্র শোয়েব ব্যতীত হলঘরে সকলেই বিব্রত। রাফান মুখটাকে প্যাঁচা বানিয়ে তাকিয়ে ছিল। পারলে এক্ষুণি এক হাঁড়ি গরম ফুটন্ত পানি এনে রাখে, তারপর শোয়েব স্যারকে যখন ইলহাম নামটা জানাবে, তখন ওই হাঁড়ি ভর্তি ফুটন্ত পানিটা ছুঁড়ে মারবে। এদিকে পার্থ ওই সঙ্গী লোকদুটোর দিকে চেয়ে ছিল। লোক দুটো সুবিধাজনক না। দুজন গুলজার সাহেবের স্বজন। কিন্তু কেমন স্বজন তা এখনো খোলশা হয়নি। অন্যদিকে ফাতিমা নাজ খুব ধীরস্থির, গম্ভীর। তিনি অতো সহজে বিচলিত বোধ করেন না। যে ব্যাপারটির জন্য এতোদিন বিচলিত ছিলেন, চিন্তায় ছিলেন, সেটি নিয়ে সমস্ত উদ্বেগ নির্ভার হয়ে গেছে। তিনি এখন চক্ষুস্থির করে শোয়েবের জবাবটা শোনার জন্য মুখিয়ে আছেন। শোয়েব দুটো গভীর দমটা ছেড়ে অকাট জবাবটা রাখল,
- কর্ণেল, কিছু বিষয় খোলাখুলি আলোচনায় আসুক। আপনি আমারটা শুনবেন। আমি আপনারটা শুনব।
এটুকু বলতেই শোয়েব পায়ের উপর পা তুলে বসল। অর্থাৎ, বলার ফাঁকে এখন কোনো অর্থহীন কথা নয়। যা আলোচনা হবে, সব মাপা, সব ছক করা, সব হিসেব মতো। শোয়েব চোখে চোখ বিদ্ধ করে বলা শুরু করল,
- কর্ণেল, আমি সম্মান করি আপনাকে। সম্মানটা স্বার্থহীন, শর্ত ছাড়া। এখানে চাকরি করছি সাড়ে চার বছরের মতো হতে চলল। আপনার সঙ্গেও সম্পর্কের বয়সটা সাড়ে চার বছর। আমাদের মাঝে একটা সম্পর্ক থাকুক। একটার মধ্য দিয়ে দ্বিতীয়টা না। আপনি রিটায়ার্ড আর্মি অফিসার, আমি রানিং ফরেস্ট অফিসার। সম্পর্ক এটা চলুক, একটা।
কথাগুলো এমন চাতুর্যে বলল, যেখানে পরোক্ষ ইঙ্গিত সব বোঝানো। একজন বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ বুঝে যাবে এখানে বিয়ের প্রস্তাব না রাখার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। কেননা, প্রস্তাব রাখলে মুখের উপর ‘না’ শুনতে হবে। এটা নিয়ে মন কষাকষি হবে। পরবর্তীতে সম্পর্ক মলিন হবার আশঙ্কা আছে। ভদ্রলোক এমন উত্তরটা পাবার পর কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন। তিনি হয়ত ভাবতে পারেননি, শোয়েব যে উনার আসার উদ্দেশ্যটা এভাবে ধরে ফেলবে। কিন্তু পরিবেশটা ধাতস্থ বানাতে ফাতিমা নাজ নিজের বুদ্ধিমত্তায় সবটা সামাল দিলেন। নাতবউ দুজনকে ডেকে রাতের খাবারে হইচই উঠালেন একটা। থমথমে গুমোট পরিস্থিতিটা চোখের পলকে কিছুটা শান্ত করলেন তিনি। কিন্তু তখনো উনি জানতেন না, কোন ভয়ংকর জায়গায় ভুলটা করেছেন। শ্রেষ্ঠা সহ বাকিরা টেবিল জুড়ে বসেছে। গুলজার ওদের সম্পূর্ণ পরিচয় শুনলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে চিনে যান, এরাই হচ্ছে সেই নিষিদ্ধ জোনে গাড়ি ঢোকানো দল। হাসিতে পুরো পরিবেশটা জমে উঠলে সবাই খাওয়া শুরু করল। এমন সময় তাহিয়ার মনে হল, ওদের সাতজনের ভেতর একজন তো নিচে আসেনি! শাওলিন! ধ্যাত্তরি, ওকে তো ডাকাই হয়নি! তড়িৎ গতিতে অধরার কানে খবর পৌঁছায় তাহিয়া। অধরা নিজের ভুলোমনা রোগের জন্য জিভ কামড়ে মাথায় হাত! সামনে রোকেয়াকে দেখে যেই ডাকতে নিবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে প্রশ্ন ছিঁটকে এলো,
- এখানে নেটওয়ার্ক নেই? বৃষ্টির কারণে কী নেটওয়ার্ক সমস্যা?
খাবারের প্রথম লোকমাটা মুখে নিতেই আকস্মিকভাবে হাত থামিয়ে ফেলে শ্রেষ্ঠা। অদূরে চোখ বড় বড় করে চাইতেই আপাদমস্তক দৃষ্টি ছুঁড়ে থমকে যায়। হাতের লোকমা যে কখন ছেড়ে দিয়েছে টের পায়নি ও। অন্যদিকে জিদান মাছের কাঁটা দুপাটির দাঁতের ভেতর চেপে ধরে আচানক স্থির হয়ে গেল। প্রত্যেকের মুখ জড়বৎ স্থির। কথা পর্যন্ত বলতে পারল না। শোয়েব তার ব্যস্ত দৃষ্টিযুগল যেই প্রশ্নকারীর দিকে ঘুরাল, ঠিক তখনই বাইরে আকাশ কাঁপিয়ে প্রবল বজ্রপাত পড়ল। সমস্ত শরীর যেন ঝিমঝিম করে উঠল তার! বৈদ্যুতিক স্পর্শ লাগার মতো কেঁপে উঠল ডানহাত! ধারালো চোয়ালের উপর কঠোর হলো পেশি। চোখটা ঘুরিয়ে দাদীর দিকে চাইল শোয়েব। হাত মুষ্টি পাকিয়ে আসছে। ওদিকে সোনালি ফ্রেমের আড়ালে দুটো প্রবীণ চোখ হাসছে। সঙ্গে হাসছে ছোট ভাবী অধরা। দুজনের কেউই জানে না, কী সাংঘাতিক অকর্ম ঘটিয়ে ফেলেছে! অন্যদিকে এসবের কিছুই জানে না শাওলিন! হঠাৎ এমন অপ্রত্যাশিত একটা কাণ্ড ঘটল যে, সিঁড়িতে দাঁড়ানো শাওলিন ভয়ংকর ভাবে শিউরে উঠল!
#নোটবার্তা — পর্ব তেরো বিশাল এক পর্ব ছিল। এটা একটা টুকরো, আরেকটা টুকরো সাজাতে সময় লাগবে। রিচেক দিতে গিয়ে দেরি। দুঃখিত। সবাইকে শুভ রাত্রি। ❤
FABIYAH_MOMO
বজ্রমেঘ . ❤
ফাবিয়াহ্_মমো .
পর্বসংখ্যা_১৩ .
[অংশ – শেষ]
হাতে একটা ইলেকট্রিক শেভিং সেট। যান্ত্রিক একটা শব্দ বেরোচ্ছে। শেভিং সেটটা কানের পাশ দিয়ে চুল ছেঁটে নিচ্ছে। সামনের আয়নায় যে প্রতিবিম্বটি ফুটে আছে, তা এখন আর শান্ত নেই। একটা অমানবিক ভয়াবহতা ওই মুখে স্পষ্ট। রাগের উত্তপ্ত তেজ খুব সাবধানে সামালানো। যেন একটু এদিক ওদিক হলে ভয়ানক বিস্ফোরণ ঘটে যেতে পারে। বাইরে আকাশ অন্ধকার করা বৃষ্টি। কালরাতের বাদলা ভাব এই সকালেও কাটেনি। এখনো ব্যাপারটা ভুলতে পারছে না শোয়েব। চোখের সমুখ থেকে হটাতে পারছে না ওই দৃশ্যটা। মনে পড়লেই তার দুই চোয়ালের প্রখরত্ব আরো কঠিনত্বে ধরা দেয়। দাদী এমন একটা বিষাক্ত কাজ কী করে করলেন? কীভাবে চিন্তা করলেন ওই বিপজ্জনক অংশটা ঘাঁটানোর? উনি কী ভুলে গেছেন কেন উনার প্রাণপ্রিয় নাতী পরিবারটা পরিত্যাগ করেছে? আর কেন-ই বা সে ব্যবসায়িক মহলে না ঢুকে এমন খাপছাড়া বন্য জঙ্গলে পড়ে আছে? এমন আশ্চর্যজনক কাণ্ড তিনি কী করে ঘটান! দাঁতে দাঁত চেপে আরো একবার নিজেকে ঠাণ্ডা বানাল শোয়েব ফারশাদ। নিজেকে বোঝাল, এভ্রিথিং ইজ অলরাইট। নাথিং হ্যাজ গন ইরিটেব্যাল। কালরাতে যা যা ঘটেছে, তা এই পর্যন্ত-ই। সকালে ভুলে যাওয়াই শ্রেয়। অগ্রাহ্য করা তার বৈশিষ্ট্যসূচক কর্তব্য। বেসিনের উপর নরম চুলগুলো ছেঁটে ছেঁটে পড়ছে তার। চুলগুলো ক্রু কাট শেপে কেটে নিচ্ছে। কেবল এক সপ্তাহ চুলে শেভিং রেজারটা পড়েনি, আর তাতেই মনে হচ্ছে বেপরোয়া চুল তার কপাল ঢেকে দিচ্ছে। গম্ভীর একটা শ্বাস ছেড়ে গোসলের জন্য প্রস্তুত হল শোয়েব ফারশাদ। ভোর পাঁচটা বিশ মিনিট। শাওয়ারের নব মোচড়ে অবিরাম ধারার বৃষ্টিতে ভিজতে লাগল সে। দুচোখ বন্ধ, মাথাটা সামনের দেয়ালে ঠেকানো, তার মসৃণ পেশিবল পিঠ বেয়ে স্বচ্ছ জলের ধারা গড়িয়ে নামছে। পার্বত্যাঞ্চলের ঠাণ্ডা বরফ পানি, গায়ে একফোঁটা পড়লেই শিরশির করে উঠে, অথচ সেই পানিতে সিক্ত হয়ে স্বাভাবিক মস্তিষ্কে ভাবছে বন মানুষ। মেয়েটাকে আশ্রয় দিয়েছে সে, নিজের ঘরটা দিয়ে দেয়ার কাজটাও করেছে, অথচ তার ব্যাপারে এখনো কিছু জানেনি। জানার চেষ্টাটা অবশ্য করা যায়, কিন্তু প্রয়োজন বোধ করছে না। আজ নয়ত কাল পুরো দলটাকে বিদায় দিতে হবে। সেফ এক্সিট দেখলে ওদের ঢাকাগামী পথে বুঝিয়ে দেবে। সেখানে কাউকে নিয়ে জানার দরকারটা কী?
বাথরুম থেকে বেরুতেই ধৌত পরিচ্ছন্ন পোশাক পড়ল শোয়েব। আসমানী নীল শার্ট, কালো গ্যাবার্ডিন প্যান্ট। ঘর বেরিয়ে যেই সিঁড়িপথে হাঁটা দিবে, ঠিক তখনই অনুভব করল থামা দরকার। একটা ক্ষীণ শব্দ শোনা যাচ্ছে। বাইরে মুষলধারার বৃষ্টি, দূরে কোথাও বজ্রাঘাতের শব্দ। সব মিলিয়ে ক্ষীণ সুরটা বারবার চাপা পড়ে যাচ্ছিল। কী মনে করে পায়ের দিক পরিবর্তন করল শোয়েব। কালরাতে অন্যমনষ্ক হয়ে এই ঘরের কাছে এসে পড়েছিল, কিন্তু আজ পূর্ণ সজাগে দরজায় ডানহাত বসিয়ে ঠেলে দিল সে। সমস্ত ঘর চাপা অন্ধকারে ডুবোনো। একটা মিহি আলোর রেখা কোত্থেকে যেন হালকা ফরসা ভাব এনেছে। সেই ক্ষীণ আলোকে চোখ বুলিয়ে কপালে অজস্র কুঞ্চন নিয়ে ভেতরে ঢুকল শোয়েব। ফিনফিনে পর্দার ওপাশে গুটিশুটি পাকিয়ে ঘুমোচ্ছে ও। মুখটা ওদিকের জানালায় ঘুরানো। পিঠটা এদিক বরাবর রাখা। ভীষণ স্বচ্ছ ও পাতলা পর্দাগুলো উড়ে উড়ে শয্যাশায়িণীর সবটুকু অবয়ব দৃশ্যমান করে দিচ্ছে। পার্বত্যাঞ্চলে ভোরের তাপমাত্রা ভয়ংকর নিম্ন হয়ে যায়। শীতে তিরতিরে কাঁপন ধরে। চামড়া কাঁটা দিয়ে উঠে। দ্রুত উষ্ণতা পেতে ভারী কম্বল বা লেপ চটপট গায়ে চড়াতে হয়। কিন্তু সেরকম কিছু না পেয়ে একটা মোটা টাওয়েল গায়ে জড়িয়েছে ও। তাতে লাভ কিছুমাত্র হয়নি, তা সুস্পষ্ট। সাদা তোয়ালের নিচে অনবরত কাশছে, কাঁপছে, ঘুমের ঘোরে নড়ছে মেয়েটা। চোখ সয়ানো আঁধারে ওরকম পরিস্থিতিটা দেখতে পেয়ে এক সুযোগে আলমারিটা খুলে ফেলল শোয়েব। একেবারে নিচের দিক থেকে ভারী কম্বলটা টেনে বের করল। কম্বলটা মেলার আগে তোয়ালেটা যখন সরিয়ে দিচ্ছিল, তখন খুব অদ্ভুত একটা দৃশ্য দেখে থমকে গেল। তার কুঞ্চিত কপাল সহসা আস্তে আস্তে মসৃণ হয়ে ফুটল। একটা বালিশ ওইটুকু বুকের মধ্যে জাপটে ধরে আছে। তাতে মুখ গুঁজে কিছু যেন খুঁজছে। যেমনটা ছোট বাচ্চা মায়ের ওম পেতে, ওম খুঁজতে করে থাকে। দুহাতের মুষ্টিটা এমন দৃঢ় করে পাকানো, যেন বালিশটা কোনো মানুষ। এই মানুষটাকে মুঠোবন্দি করে না ধরলে হারিয়ে যাবে। এমন জায়গায় হারাবে, যেখান থেকে আর কক্ষণো ফিরে আসবে না। ঘুমের মধ্যে কী কিছু দেখছে? খারাপ, ভয়াবহ, বিপজ্জনক? ব্যাপারটা মনে পড়তেই কম্বলটা আস্তে করে জড়িয়ে দিল। এক মুহুর্ত চিন্তা করে পাশে বসল ওর। দাদীকে একবার ডেকে আনা দরকার, কিন্তু কালরাতের ঘটনাটা সহনশীল নয়। জোরে একবুক শ্বাস ছেড়ে খুব শান্ত গলায় ডাকল শোয়েব,
- শুনতে পাচ্ছ?
এক মুহুর্ত সম্পূর্ণ স্থির। কোনো কাজ হল না তাতে। বিপজ্জনক কিছু একটা এখনো ও দেখছে। কপালে একটা রগ দপদপ করে কাঁপছে। ডাকটা ব্যর্থ বুঝতে পেরে সামান্য ঝুঁকল শোয়েব। হালকা ভাবে নিজের ডানহাতটা ওর মাথায় স্পর্শ করল। নিরাপত্তার অনুভূতিটুকু বোঝাতে স্থির গলায় মৃদু স্কেলে বলতে লাগল,
- শুনতে পেলে জেগে ওঠো। তুমি অবাস্তব কিছু দেখতে পাচ্ছ, যা সত্যি নয়। জেগে ওঠো শাওলিন। যদি আমার কথা শুনতে পাও, চোখ খুলে তাকাও।
ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের ভেতর কেউ অস্থির হয়ে গেলে, এভাবেই একসময় সাহায্য করতো সে। ঘুমের ঘোরে প্রায়ই দেখা যেত, কেউ না কেউ গোঙাচ্ছে। কেউ ভয় পাচ্ছে। কেউ অশান্ত হয়ে যাচ্ছে। অন্যান্যরা ধমকে তাকে জাগাতে গেলে শোয়েব করতো তার উলটো। সেই মানুষগুলোকে সাহায্য করতো সরল ভঙ্গিমায়। আজও তার সেই শান্ত, নিরাপদ কণ্ঠে ঘুম ভাঙল শাওলিনের। মাথায় আলতো এবং সাবধানী হাতের স্পর্শ পেয়ে অস্থির অবস্থা একটু একটু করে ঘুচল। মাথা ঘুরিয়ে ডানে চাইতেই চশমা আঁটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মুখটা দেখতে পায় ও। অন্যসময় হলে আচম্বিতে ঝটকা মেরে উঠে বসতো। কিন্তু আজ মনের ভারসাম্য কিছুটা বেসামাল। মস্তিষ্কের কোষ লণ্ডভণ্ড। বুকের মধ্যে তীব্র প্রচণ্ড ধড়ফড় হচ্ছে। ওই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মুখটা মাথায় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে বলল,
- নিরাপদে আছ। কিছু হয়নি। তুমি দুঃস্বপ্ন দেখেছ, যেটা সম্পূর্ণই অবাস্তব। ভয় পেয়ো না।
কথার এমন শীতল স্পর্শে চোখ বুজল শাওলিন। মাথাটা ঠাণ্ডা করার জন্য স্থির হল ও। কপালের ডানপাশে এখনো একটা রগ চিলিক দিয়ে যাচ্ছে। কেমন অদ্ভুত ধরণের খারাপ লাগছে, বলে উঠতে পারল না। এটা প্যানিক অ্যাটাক বা পিটিএসডি সমস্যা কিনা বুঝে উঠতে পারল না। কানের কাছে আবার শুনতে পেল সেই নির্ভয়ী সুর,
- গভীর শ্বাস নাও। শিথিল হও। বাইরে ভোর হয়ে গেছে। চাইলে তুমি ভোরের প্রকৃতি দেখতে পারো। এখানে চমৎকার বৃষ্টি হচ্ছে। বন বাংলোর পেছন দিকে ঘন জঙ্গল আছে একটা। জায়গাটা বৃষ্টির সময় উপভোগ্য হয়।
মাথার ঘোলাটে ভাব একটু একটু করে কমতে লাগল ওর। কিছুটা স্বস্তি অনুভব হচ্ছিল। বুকের উপর থেকে এক মণের পাথরটা নেমে গেছে। এখন স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস নিতে পারছে ও। ঢোক গিলে চোখদুটো আবারও মেলল শাওলিন। চশমা পড়া শীতল মুখটা দেখতে পেল ও। পড়নে আসমানী নীল শার্ট। চুলগুলোয় হালকা ভেজা ভাব। একটা দৃঢ়তাপূর্ণ আধিপত্য এখনো ওই মুখে বিদ্যমান। লোকটার ভেতর কোথাও এতটুকু ধমকানি ভাব নেই, দাম্ভিকত্ব নেই, কটাক্ষ ছাপ নেই, কাউকে অপমান করার প্রবণতাটাও শূন্য। কেমন যেন ফেনিভ সমুদ্রের মতো শীতল, যেন হাতে ছুঁয়ে দেখলে মন আকৃষ্ট হয়। চোখে চেয়ে দেখলে শান্তি শান্তি লাগে। অনুভবে মাখলে মদির মিশ্র আভা দেয়। শাওলিন কিছুটা হালকা অনুভব করলে ধীরস্বরে বলল,
- আপনাকে ধন্যবাদ। আমি খুব অবাক হয়েছি, আপনি যে কীভাবে বুঝতে পেরেছেন আমি ভয়ানক দুঃস্বপ্নে আক্রান্ত। এটা আমাকে যন্ত্রণা দিচ্ছিল। আরো একবার নিঃশব্দে উদ্ধারের জন্য ধন্যবাদ অফিসার ফারশাদ।
মেয়েটার সরল স্বীকারোক্তিতে নিশ্চুপ রইল। ঠোঁটের আগায় উত্তর করল না কিছু। শুধু অপলকে দুটো নীল শান্ত চক্ষু মেলে চেয়ে রইল ফারশাদ। বারবার নিজের কর্ণকুহরে শুনতে পাচ্ছে বহুল ব্যবহৃত নামটা। যে নামটা তার সবচেয়ে কালো অধ্যায়, কালো অংশের, কালো জীবনের এক ভয়াল স্মৃতি বহন করে। মাথায় হাত বুলিয়ে চিন্তা করে, একবার কী বলবে, এই নামে ডেকো না তুমি? পরক্ষণে চিন্তাটা বাতিল করে মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল সে। দুটো মায়াবী কালো চোখ, যেন দিঘির মতো টলটল, নির্মল, পবিত্র। ওই চোখের দিঘিতে নিজের প্রতিচ্ছবি যেন দেখতে পাওয়া যায়। যেন পড়তে পারা যায় ওই দুটো আয়নার মতো চোখ। দুটো ওষ্ঠযুগল একদিনের পরিচর্যায় প্রাণ ফিরে পেয়েছে। গোলাপ ফুলের মতো রঙ ফুটিয়েছে ও দুটো। ছোট্ট থুতনির নিচটায় আঁচড় লেগেছিল, সেটিও এখন শুকনো প্রায়। নিজের হাতটা আস্তে করে সরিয়ে নিল শোয়েব। চোখদুটো তখনো ওই দিঘির চোখে আবদ্ধ রেখে বলল,
- তুমি অনেকটাই সুস্থ। তোমাকে সুস্থ দেখে ভালো লাগছে। যদি তুমি চাও, এখন তোমার বন্ধুদের সাথে আশেপাশে কোথাও ঘুরে আসতে পারো। খাগড়াছড়ির অবর্ণনীয় সৌন্দর্যে গত পরশুর স্মৃতিটা ভুলিয়ে রাখতে পারো। তুমি কী যেতে ইচ্ছুক?
বাইরে তখন মেঘে কেটে এসেছে। ভোরের আলো ফুটে চারদিক মৃদু মৃদু ফরসা। একটা অলৌকিক সৌন্দর্য ওই পার্বত্যাঞ্চলের বন বাংলোর ঘরে শাওলিনকে অত্যাশ্চর্য অনুভূতি দিল। এমন অনুভূতি, যা হৃদয়ে সুপ্ত, শব্দে অব্যক্ত, বুকের মধ্যিখানে কাঁপন উঠানো। বন কর্মকর্তার অমন স্বাচ্ছন্দ্য বাক্যে নিজের উচাটন সুর গোপন করে বলল,
- সম্ভব?
- সম্ভব।
- আশেপাশে পাহাড় . .
- সব আছে।
কথা শোনার পর এক মিনিট ভাবল শাওলিন। ততক্ষণে শোয়া থেকে উঠে বসেছে ও। গায়ে যে নরম ভারী কম্বল তা সে খেয়াল করেনি। পড়নে কাল বিকেলের সেই ঘটনাবহুল পোশাক। গাঢ় ছাই রঙের সুতির শাড়ি, শাড়ির পাড়টা বেশ মোটা এবং কালো। ব্লাউজটা ছোট হাতায়, রঙটা পাড়ের মতোই কালো বর্ণ। চোখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল শোয়েব। মুখ ফুটে কিছু না বললেও শাওলিন বুঝতে পারছিল, এই শাড়িটাতে কোনো সমস্যা আছে। যার দরুন, কাল রাতেও খাবারের টেবিলে সুস্থির থাকেনি লোকটা। পানির গ্লাসটা ডানহাতে খামচে টেবিলের উপর ভয়ংকর একটা আছাড় মেরে গেছে। উপস্থিত সকলেই তখন বিদ্যুৎপৃষ্ট! ঘটনার আকস্মিকতা ঠাহর করতে পারেনি কেউ। একমাত্র ফাতিমা নাজ এবং অধরার মুখ ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গিয়েছিল। আর একটা কথাও কেউ তখন বলেনি। বুদ্ধি করে কিছুটা স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল শাওলিন,
- আপনি কী কোনোভাবে শাড়ি পরার জন্য উপর বিরক্ত?
চোখ ঘুরিয়ে ওর দিকে তাকাল শোয়েব। আপাদমস্তক আরো একবার চোখ বুলিয়ে সত্যটাই বলল,
- শুধু এই শাড়িটার উপর বিরক্ত। শাড়ি পরাটার উপর বিরক্ত না। বাঙালি হিসেবে তোমাদের জন্য শাড়ি পোশাকটা সুন্দর। আমার এটা ভালো লাগে।
শেষের কথাটা শুনে তৎক্ষণাৎ ঢোক গিলল শাওলিন। অনুভব করতে পারল, এই ভদ্রলোক কিছু কিছু জায়গায় যথেষ্ট সোজাসাপ্টা। স্টেইট ফরোয়ার্ড কথাটার মতো সরাসরি সত্য চটপট বলে দেয়। কিন্তু সে কী জানে এভাবে মেয়েদের সামনে শাড়ির আলাপন তুললে কিছু অদ্ভুত বিষয় হয়? যা বাক্য দিয়ে, শব্দ দিয়ে তেমন ব্যাখ্যা করা যায় না? শাওলিন প্রসঙ্গটা ঘুরিয়ে দিতে অন্যদিকে মোড় নিয়ে বলল,
- আমার বন্ধুরা আজই পোশাকের ব্যবস্থা করবে। আশাকরি আপনার জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি ঘটবে না। যদি আপনার ভাবী বা দাদী একবার আমাকে বলতেন এটাতে কোনো সমস্যা আছে, আমি এটা পরা থেকে —
কথাগুলো একমনে বলে চলছিল শাওলিন। কিন্তু খেয়াল করেনি ততক্ষণে শোয়েবের চোখ অন্যদিকে ঘুরেছে। গ্যাবার্ডিন প্যান্টের ডান পকেটে মৃদু ভাইব্রেশনে কিছু কাঁপছিল। লাগাতার ডিভাইসটাকে অগ্রাহ্য করে ওর কথাই মূলত শুনছিল। কিন্তু যখন বুঝতে পারল, কলটা একবার নয়, বরং বারবার আসছে, তখন কিছুটা ধৈর্যের চ্যুতি ঘটিয়ে ফোনটা রিসিভ করে সে। কানে ফোন ঠেকিয়ে ‘হ্যালো হুঁ’ কোনোকিছু না বলে নিঃশব্দে উঠে পরেছিল শোয়েব। এদিকে শাওলিনও বুঝতে পারেনি, এই নীরবতার মাঝে কখন যে লোকটা উঠে চলে গেছে। যখন কথা শেষ করে ডানদিকে চোখ তুলল, ততক্ষণে বুঝতে পারল ঘর খালি। আশেপাশে কেউ নেই। কী ভয়াবহ!
.
কালরাতে যে ভুলটা তিনি করেছেন, তার দরুন মুখটা এখনো অন্ধকার। নাতী উনার ঘরে একবারও এল না। তিনি সাতসকালে ভেবেছিলেন, আজ ওর সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে পছন্দের ফ্রুর্ট কাস্টার্ডটা বানিয়ে খাওয়াবেন। কিন্তু খাওয়ানো তো দূর থাক, উনার ভদ্রোচিত নাতী বন বিভাগের জঙ্গল সার্ভেতে চলে গেছে। সঙ্গে নিয়ে গেছে দুটো গোলা-বারুদকে। পার্থ এবং রাফান। বাড়িটা এখন ভরে আছে এক দঙ্গল ছেলেপিলেদের কণ্ঠে। তরুণ প্রাণের উচ্ছ্বাস হঠাৎ হঠাৎ হাসির স্বরে ধরা দিচ্ছে। তবে হাসি দেখেনি ওই অদ্ভুত ঠাণ্ডা মেয়েটির মুখে। আহত, ব্যথায় জর্জরিত, পায়ে পাতলা ব্যাণ্ডেজ নিয়ে ও এখনো আছে নিজের ভূমিকায়। প্রশ্ন করলে উত্তর দেয়, কথা শুধালে জবাব রাখে, জানতে চাইলে ততটুকুই প্রত্যুত্তর। অথচ, সেদিন রাতে যখন ছেঁড়া, ময়লা, রক্তে মাখা পোশাকটা বদলে দিয়েছিলেন, তখনি উনার চোখে চরম বিস্মিত ব্যাপারটা ধরা পড়ে। কোনো এক বিচিত্র কারণে ওই ব্যাপারটা কারুর সঙ্গেই আলাপ করেননি তিনি। শোয়েবের কাছেও নয়। এমন সময় উনার ঘরের দুয়ারে মৃদু ঠকঠক করাঘাত পড়ল। তিনি চশমা চোখে দরজা বরাবর তাকালেন। গম্ভীর মুখে এক পশমা বৃষ্টির মতো হাসি দিয়ে বললেন,
- এসো। খুব ভালো হলো তুমি এলে বলে। বসো। কাছের ওই চেয়ারটা টেনে বসো।
দরজা ছেড়ে প্রবেশ করেছে শ্রেষ্ঠা। নাশতা পর্ব চলাকালে কেন জানি এই বৃদ্ধা ওকে কথা বলার জন্য ডেকেছিলেন। কিন্তু কী কারণে ডাকতে পারেন তা এখনো উদঘাটন হয়নি ওর। হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা কালো লং টিশার্টে ঢোলা জাতীয় প্যান্ট। চুলগুলো খুব উঁচু করে খোঁপা বাঁধা। গলায় কালো ওড়নাটা এক প্যাঁচ দিয়ে বুকের দুপাশে ঝুলিয়ে রাখা। পুরোপুরি স্মার্ট ভঙ্গিতে একটা চেয়ার টেনে বসল ও। মৃদু গলায় স্পষ্ট আত্মবিশ্বাসী সুরে বলল,
- জ্বী, আন্টি। আপনি আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন?
ফাতিমা নাজ সাবধানে শুধরে দিয়ে বললেন,
- আমাকে দাদী, দাদু বলতে পারো। আমি তোমাদের দাদু বয়সি মানুষ। তা তোমাকে ডেকেছিলাম একটু গল্পগুজব করার জন্য। তোমাদের ব্যাপারে জানার জন্য। তোমরা এতোগুলো মানুষ বাড়ি ছেড়ে এভাবে ট্যূর দিচ্ছ, ঘুরতে ফিরতে সময় দিচ্ছ, এসব নিয়েই কথাবার্তা।
শ্রেষ্ঠা মুচকি হাসিতে জবাব দিয়ে উঠল,
- আমরা ক’জন হলে আর হোস্টেলে থাকি দাদী। বলতে পারেন, বাড়ি ছাড়া সবার জীবন কিছুটা অন্যরকম। পড়াশোনার বাইরে এভাবে একটা ট্যূর দিলে আমাদের যাঁতাকলে পিষ্ট জীবন কিছুটা স্বস্তির হয়। তার মধ্যে ধরুন, একাডেমিক চাপে আমরা সবাই সারাটা বছর ঘুম হারা থাকি। এজন্য মাঝে সাঝে যাদের ফ্রি পাই, তাদের একত্র করে সংঘবদ্ধ একটা ট্যূর দিই।
- বেশ চমৎকার। ভালো লাগল তোমার কথা শুনে। এটা সত্যি বলেছ, তোমাদের যুগে পড়াশোনার বাইরে যে জগতটা রয়েছে, সেখানে উপর্যুক্ত বিনোদন মাধ্যম থাকা চাই। মাঝে মাঝে প্রকৃতি ভ্রমণ আমাদের মনের চোখটা খুলে দেয়। শ্রেষ্ঠা, তোমাকে যদি একটা একান্ত ব্যক্তিগত প্রশ্ন জিজ্ঞেস করি, বলবে?
এবার কিছুটা ঘাবড়ে গেল শ্রেষ্ঠা। তবে মুখের ভঙ্গিতে তা এতটুকু প্রকাশ পেল না। উনি আবার কী প্রশ্ন করতে যাচ্ছে? শ্রেষ্ঠা হাসিমুখে বলল,
- নিশ্চয়ই। আমি যথাযথ চেষ্টা করব উত্তরটা দিতে।
কথাটা শোনার পর গম্ভীরভাবে দম নিলেন ফাতিমা। এবার তিনি যে প্রশ্নগুলো করতে যাচ্ছেন, তার যথাযথ উত্তর পাবেন তিনি। ফাতিমা নাজ স্বাভাবিক গলায় প্রশ্নটা করলেন,
- শাওলিনের কী গার্ডিয়ান নেই? ওর বতর্মান দেখভালের দায়িত্ব কে পালন করছে?
আচমকা ও দুটো প্রশ্ন শুনে হাসি নিভল শ্রেষ্ঠার। মুখে ছড়িয়ে পড়ল একরাশ বিষণ্ণতা। চোখে বিষাদ ঘনানো আঁধার নিয়ে মাথা নিচু করল ও। ঠোঁটের ওপর জিভ বুলিয়ে শান্তভাবে বলল,
- আপনি ব্যাপারটা কী করে বুঝলেন? মানে, আমরা . . আমরা কখনো ওর ব্যাপারে খোলাখুলি আলোচনা করি না। এটা ওর পছন্দ না। ও এটা জানতে পারলে কষ্ট পাবে।
ফাতিমা নাজ সঙ্গে সঙ্গে বুঝিয়ে বলে উঠলেন,
- না না, ভুল ভাবলে তুমি। আমি ওরকম কিছু বোঝাচ্ছি না। আমার কাছে সত্যি বলতে ওকে খুব অন্যরকম লেগেছে। ও তোমাদের সঙ্গে জড়িত, কিন্তু তোমাদের মতো না। তাই কিছু বিষয়ে অদম্য কৌতুহল জেগেছে বলব।
শ্রেষ্ঠা এবার মুখ তুলে তাকাল। বৃদ্ধার বাহ্যিক অভিপ্রায়টা বুঝে নিয়ে হালকা স্বরে বলল,
- ওর একমাত্র গার্ডিয়ান ভাবী। যাকে ও মণি বলে ডাকে। ভাবীর সঙ্গে ওর সম্পর্কটা ঠিক মায়ের মতো। ওর ভাই যখন বিয়ে করেছিল, তখন ওর বয়স খুবই অল্প। পাঁচ বা তারও কম হলে হতে পারে। আমার স্পষ্ট খেয়ালে নেই। এরকম একটা বয়সে ও ওর ভাবীকে পায়। ভাবীর কাছেই মূলত মানুষ হয়। ওর কাছে ওই একজন মণি ছাড়া আর কেউই নেই।
খুব আশ্চর্য হয়ে কথাগুলো শুনলেন তিনি। কল্পনাও করতে পারেননি, অতটুকু একটা মেয়ে পিতা-মাতাহীন আশ্রয়ে আছে। তাদের ছায়া না পেয়ে ভাবীর কাছে গচ্ছিত রয়েছে। তার খুব জানতে ইচ্ছে হচ্ছে, ঠিক কোন কারণে প্রকৃতির অমোঘ নিয়মটা বিফলে গেল? ঠিক কী কারণে নিজের জন্মদাত্রীর কাছে ছায়াটুকু পায়নি ও? কী এমন কারণ ছিল? উনার কোলে শাড়ির আঁচলে একটা ডায়েরি ঢাকা। ডায়েরিটায় অনবরত হাত বুলাচ্ছেন তিনি। গতকাল সারাটা দুপুর একটু একটু করে পড়েছেন। কিন্তু সামনে এগোনোর দুঃসাহস উনার হয়নি। একবুক হতোদ্যম শ্বাস জিজ্ঞেস করলেন ফাতিমা,
- পড়াশোনা কীভাবে করছে?
- ওর দাদা . . মানে ওর ভাই যতটুকু রেখে যেতে পেরেছে। আর ওর ভাবী সরকারি কলেজের অধ্যাপিকা। উনি সবটা নিজের হাতে দেখাশোনা করছেন। কোথাও এখনো অবধি কমতি রাখেননি।
- ঢাকায় তোমরা একসঙ্গে থাকো?
- না। আলাদা আলাদা। ও আগে থাকতো মৌলভীবাজার। এরপর পড়াশোনার জন্য চলে আসে ঢাকায়। একটা হোস্টেলে উঠেছিল। কিন্তু বেশিদিন থাকতে পারেনি। হোস্টেলের এলাকাটা ভালো ছিল না। এখন ওর ভাবী সবটা গুছিয়ে দিয়েছেন। একটা ফ্ল্যাটে একজন বৃদ্ধ পরিচারিকার সঙ্গে আছে।
এবার খুব সাবধানে প্রশ্নটা করলেন ফাতিমা। আস্তে করে শুধালেন,
- ওর মা কী মারা গেছে?
- ওর মা আত্মহত্যা করেছে।
.
আকাশে ধীরে ধীরে বেগুণি রঙ ধরেছে। সন্ধ্যার মায়াবী রূপে মনটা মুগ্ধ হয়ে যায়। পাখিরা ঝাঁকে ঝাঁকে ফিরছে নীড়ের দিকে। তাদের কিচিরমিচির আওয়াজে কান রাখা দায়। ওদিকে পূবের সূর্য লাল সিঁদূর ছড়িয়ে ডুবে গিয়েছে। আকাশে লক্ষ তারায় ঝিকিমিকি করছে নক্ষত্রমণ্ডল। বাংলোয় বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন। কাছাকাছি একটা বৈদ্যুতিক খাম্বায় সমস্যা হওয়াতে আজ বিদ্যুৎ মশাই আসবে না। মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে ত্যক্ত-বিরক্ত হচ্ছে সেগুফতা। ঠাস করে বাঁ বাহু একটা চড় কষাল। লাভ হল না। মশার বাচ্চা মরেনি। রাগে হুঙ্কার দিয়ে প্রচণ্ড ফুঁসে উঠল সেগুফতা,
- অ্যাই রোকেয়া! রোকেয়া! কোথায় আছিস? এক্ষুণি এদিকে আয়!
অমন জলদ্গম্ভীর হুঙ্কারে রোকেয়া অবশ্য এল না। দরজা একটু ফাঁক করে চুপি দিল মিথিলা। ঘরে ঘরে হারিকেন বা মোমের উজ্জ্বল আলো। চমৎকার একটা আনন্দ আভা ফুটে আছে দ্বিগ্বিদিক। মিথিলা দেখল, সেগুফতার ঘরে শুধু চার্জার লাইটের আলো। কোনো মোমবাতি, হারিকেন বা কুপি জ্বালানো নেই। মিথিলা ঠোঁটের হাসিটা নিভাতে নিভাতে বলল,
- আপনি দেখি চার্জার লাইট ধরিয়ে রেখেছেন?
- তো?
- তো কিছু না। একটা ব্যাপারে কথা বলতে এসেছি।
- কী কথা? যা বলার দ্রুত বলে প্রস্থান হও।
- কাল পাহাড়ি মানুষদের উৎসব আছে একটা। বৈসাবি উৎসব। শোয়েব সেখানে ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসার হিসেবে ইনভিটেশন পেয়েছে। আমরা যাচ্ছি সবাই। আপনি যাবেন?
চোখ খাটো করল সেগুফতা। ডানহাতের নখ দিয়ে বাঁহাতের চামড়া ঘ্যাচর ঘ্যাচর করে চুলকাচ্ছে। কী যেন একটা আঁচ করে অনুমান গলায় বলল,
- আমরা বলতে কারা? ওই সাতজনের দলটা আবার যাচ্ছে নাকি?
- জ্বী, সবাই যাচ্ছে। গুলজার সাহেব যদি সময় পান যাবেন, তিনি যাবেন। আর উনার মেয়ে ইলহাম যাচ্ছে। উৎসবের পর শোয়েব সবাইকে কোথায় যেন ঘুরতে নিয়ে যাবে।
- কোথায়?
- বলেনি। হতে পারে খাগড়াছড়ির সাজেক ভ্যালি!
কথাটা শোনার পর থমথম করছিল মুখ। সেগুফতা যে খুশি হয়নি তা বোঝাই যাচ্ছিল। কিন্তু তার চেয়ে বেশি অপেক্ষা করছিল, একটা নিয়তি চালিত সংযোগ। ওরা কেউ জানে না সাজেকের ভূমি কী আনতে চলেছে। কী অকল্পনীয় যোগ-সাজশ অপেক্ষায় আছে ওদের। কী হবে সাজেকের বুকে? ভীতিকর নাকি ভয়ংকর? জানা নেই . . .
Share On:
TAGS: ফাবিয়াহ্ মমো, বজ্রমেঘ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
বজ্রমেঘ পর্ব ২২
-
বজ্রমেঘ পর্ব ২
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১৭
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৬
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১৫
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১৪
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১৬
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১২
-
বজ্রমেঘ পর্ব ২০
-
বজ্রমেঘ পর্ব ২১(২১.১+২১.২)