গল্প: #অতীত। তৃতীয় পর্ব
যেখানে মৃত অতীত নড়েচড়ে বসে
ঘরের ভেতর শব্দটা মিলিয়ে গেল।কিন্তু নীরবতা গেল না।
মিতু দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে,রাহিবও।
দুজনেই একই প্রশ্ন ভাবছে, কিন্তু কেউ মুখ খুলছে না।
এই বাড়িতে…এই মুহূর্তে…তারা ছাড়া আর কেউ নেই।
তাহলে ফিসফিসটা এল কোথা থেকে?
হাজী আবদুল করিমের শ্বাস ভারী হয়ে উঠছে। চোখ আধখোলা। ঠোঁট কাঁপছে। যেন বহু বছর পরে আবার কোনো বোঝা নড়ছে ভেতরে।
— মি…তু…
এই নামটা তিনি ঠিক উচ্চারণ করেননি।কিন্তু ভুলও বলেননি।
মিতু ধীরে এগিয়ে যায়।
— আব্বা…?
রাহিব এক পা এগোয়, আবার থেমে যায়। তার চোখে আতঙ্ক, শিশুর মতো আতঙ্ক।
— বাবা…!
হাজী সাহেব চোখ ঘোরান,দরজার দিকে তাকিয়ে খুব কষ্টে, ভাঙা স্বরে—বলল্লেন,
— ও…রা… এসেছে…
একটা ভাঙা শব্দে মোড়া রহস্যময় একটা বাক্য।
কিন্তু ঘরের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে যায়।
মিতু ফিসফিস করে বলে—
— কারা?
হাজী সাহেব উত্তর দেন না।শুধু চোখ বন্ধ করেন।
আর ঠিক তখনই—নিচতলা থেকে ঠক করে কিছু পড়ার শব্দ।
রাহিব সজোরে শ্বাস টানে।
—মিতু, তুমি শুনলে?
মিতু মাথা নাড়ে।
আরও একটা শব্দ।এইবার পরিষ্কার।
পায়ের শব্দ,কেউ হাঁটছে।
ধীরে, পরিমিত,যেন বাড়িটা তার চেনা।
রাহিব ধীরে দরজার দিকে যায়। হাত বাড়িয়ে লাইটের সুইচে চাপ দেয়,লাইট জ্বলে ওঠে,কিছু নেই।
কিন্তু নিচতলার করিডোর থেকে হালকা আলো আসছে।
কারণ—ড্রয়িংরুমের লাইট জ্বলছে।
— আমি তো সেটা বন্ধ করেই এসেছিলাম…
— রাহিব ফিসফিস করে বলে।
মিতুর বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত অনুভূতি ওঠে,যেন এই অন্ধকারটা তাকে চেনে।
রাহিব নিচে নামতে চায়।মিতু তার হাত চেপে ধরে।
— একা যেও না।
দুজন পাশাপাশি নামতে থাকে সিঁড়ি দিয়ে।
সিড়ির প্রতিটা ধাপে ধাপে পা ফেলার শব্দ বুকে কম্পন সৃষ্টি করছে…নিজের পায়ের শব্দ এতোটা ভয়ানক হতে পারে অগ্যতা জানা ছিলো না…
ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই তারা থমকে যায়।,সোফায় কেউ বসে আছে।একজন বৃদ্ধ লোক,চুল সাদা, মোটা ফ্রেমের চশমা,পরিচ্ছন্ন পাঞ্জাবি।লোকটা হাসছে,একদম শান্ত স্বাভাবিক হাসি কিন্তু মোটেও স্বাভাবিক লাগছে না।
— এত দেরি করালে কেন, রাহিব?
রাহিবের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়।
— চা…চাচা?
লোকটা মাথা নাড়ে।
— হ্যাঁ। আমি।
মিতু তাকিয়ে থাকে,এই লোকটাকে সে চেনে না।কিন্তু রাহিব চেনে।
এই লোক—রাহিবের বাবার পুরোনো বন্ধু।
এক সময়কার ধুরন্ধর আইনজীবী।মোহাম্মদ ইকবাল।
— আপনি… এখানে কীভাবে?
ইকবাল সাহেব হাসেন।
— দরজা খোলা ছিল।
এই কথাটা মিথ্যে।এই বাড়ির দরজা কখনো খোলা থাকে না,একটু আগে রাহিব নিজেই দরজা লাগিয়ে এসেছে।
রাহিব কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই—আরেকটা কণ্ঠ।
— শুধু উনি না।ডাইনিং টেবিলের দিক থেকে একজন উঠে আসে।
মাঝবয়সী।চোখে নিচে কালো দাগ,গলায় পুরোনো কাটার চিহ্ন।
মিতুর মাথা ঘুরে যায়।
এই লোকটা…!এই লোকটার ছবি সে দেখেছে।
হাসপাতালের পুরোনো নথিতে,পুলিশ রিপোর্টে।
— আপনি…?
লোকটা ঠোঁট বাঁকায়।
— আমি সেই আ/গুনে মা/রা যাইনি, মিতু।
আমার নামটা সে জানে।
রাহিব ধাক্কা খেয়ে পেছনে যায়।
— এটা অসম্ভব…
ইকবাল সাহেব শান্ত গলায় বলে—
— অসম্ভব কিছু না, বাবা। শুধু চরিত্রটা আড়ালে পড়ে ছিল।
— আপনারা কী চান?
এই প্রশ্নটা করে মিতু।
সবাই তাকায় তার দিকে।
ইকবাল সাহেব উঠে দাঁড়ান।খুব ধীরে।
— সত্যটা।
মিতু হাসে।কিন্তু সেই হাসিতে আনন্দ নেই।
— সত্য তো আমি অনেক দেরিতে পেয়েছি।
লোকটা এগিয়ে আসে।
— না। পুরোটা না।
রাহিব চিৎকার করে ওঠে—
— বাবা অসুস্থ! আপনারা এখান থেকে চলে যান!
ইকবাল সাহেবের চোখ কঠিন হয়ে যায়।
— তোমার বাবা অসুস্থ না, রাহিব।
— উনি শাস্তি ভোগ করছেন।
— পনেরো বছর আগে, এই বাড়িতেই শেষ মিটিং হয়েছিল।
মিতুর বুক ধক করে ওঠে।
— এই বাড়ি?
— হ্যাঁ। এই বাড়ির বেজমেন্টে।
মিতু তাকায় রাহিবের দিকে।
— তুমি বলোনি…
রাহিব চোখ নামিয়ে ফেলে।
— আমি জানতাম না… এতটা।
ইকবাল সাহেব বলতেই থাকে—
— আ-গুন লাগানো হয়েছিল প্রমাণ পোড়ানোর জন্য।
— কিন্তু সবাই মারা যায়নি।
— কেউ কেউ… হারিয়ে গিয়েছিল।
মিতুর মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে…
লোকটা হাসে।
— আমরা এসেছি স্মৃতি নিতে।
— কী স্মৃতি,কার স্মৃতি!
ইকবাল সাহেব ওপরের দিকে তাকান।
— হাজী আবদুল করিম।
— তিনি কথা বলতে পারেন না।
— কিন্তু সব কিছু মনে রাখতে পারেন।
একটা কণ্ঠ পেছন থেকে—
— আর এখন তিনি আবার কথা বলতে শুরু করেছেন।
সবাই ঘুরে তাকায়।
সিঁড়ির ওপর হুইলচেয়ারে বসে আছে হাজী আবদুল করিম।
চোখ জ্বলছে।যে চোখ এতদিন মৃত ছিল, এখন জীবিত।
— অনেক দেরি করেছ তোমরা। কণ্ঠ ভাঙা।কিন্তু স্পষ্ট।
— কিন্তু দেরি মানেই শেষ না।
মিতুর চোখে জল আসে।
— আব্বা…
হাজী সাহেব তাকান তার দিকে।
— মা… আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাই না।
এই কথাটা শোনার জন্য মিতু প্রস্তুত ছিল না।
— আমি শুধু চাই…
— সত্যটা বের হোক।
ইকবাল সাহেব ধীরে মাথা নাড়েন।
— তাহলে শুরু করা যাক।
বাইরে হঠাৎ বজ্রপাত।হঠাৎ কারেন্ট চলে যায়…
চারিদিকে রাজ্যের অন্ধকার নেমে আসে….কোথাও যেনো আলোর ছিটেফোঁটা ও নেই।
আর সেই অন্ধকারের ভেতর—দরজা খোলার শব্দ।
বেজমেন্টের দরজা।যে দরজা সব সময় বন্ধ থাকতো…
বন্ধ দরজ পেছনে কী আছে?কে খুললো সেই দরজা?!
⏭️চলবে………
লেখা: 1 Minute With Mitu
গল্প: অতীত।
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE