অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৪০ এর বর্ধিতাংশ)
সোফিয়া_সাফা
ক্রাশার দোতলায় এসে একটা বদ্ধ রুমের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল। রিদম তখন হাঁটুতে মুখ গুঁজে নিথর হয়ে বসে ছিল। তাকে এই ঘরে বন্দি করে রাখা হয়েছে অনেকদিন; মেপে মেপে খাবার দেওয়া হয় ঠিকই, কিন্তু তার বিনিময়ে রিহান নিজের মনোরঞ্জন করিয়ে নেয়। ক্রাশার খাবারের প্লেটটা পাশে রেখে অবহেলার সুরে বলল, “তোর ভাই বিয়ে করতে চলেছে রিদ। বড় ভাই হিসেবে সে তোর কাছে আশীর্বাদ চেয়েছে।”
কথাটা কানে যেতেই রিদম ধীরলয়ে মাথা তুলল। কোটরাগত চোখে রাজ্যের ক্লান্তি, তবুও কণ্ঠস্বরে বিস্ময় দানা বাঁধল। ভ্রু কুঁচকে সে শুধাল, “কা…কে বিয়ে করবে ও?”
ক্রাশার বাঁকা হেসে উত্তর দিল, “কাকে আবার? তেহুর সেই সুন্দরী বউকে তুলে এনেছি আমরা। তাকেই আজ হান বিয়ে করবে।”
বিস্ময়ে রিদমের চোখজোড়া কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। সে অবিশ্বাসের সুরে প্রায় চিৎকার করে উঠল, “কী বললি? তোরা ওকে খুঁজে পেলি কীভাবে?”
“তোকে উদ্ধার করতে ওরা এখানে এসেছিল। এসে নিজেরাই আমাদের হাতে ধরা পড়েছে।” ক্রাশার খাবারের প্লেট এগিয়ে দিয়ে বলল, “চল বাদ দে, আজ খাবারের জন্য তেহকে গালমন্দ করে হানের মনোরঞ্জন করতে হবে না। আজকের টাস্ক অনেক সিম্পল। স্রেফ ভাইকে মনে মনে আশীর্বাদ করে পেটপুরে খেয়ে নে।”
ক্ষুধায় রিদমের নাড়িভুঁড়ি জ্বলে যাচ্ছিল, শরীর প্রচণ্ড দুর্বল। কিন্তু ফুলকে তুলে আনার খবরটা তার মস্তিষ্কে বজ্রপাতের মতো আঘাত করল।
“কী হলো, খাবার চাই না?” ক্রাশার তাগাদা দিল।
রিদম মাথা নেড়ে প্রত্যাখ্যান করল। দৃঢ় স্বরে বলল, “তোরা ঠিক করছিস না। তেহ তোদের ছাড়বে না। এখনো সময় আছে, নিজেদের ভালো চাইলে ওকে তেহুর কাছে ফিরিয়ে দিয়ে আয়।”
ক্রাশার বিরক্ত হয়ে বলল, “তুই আদৌ ভালো-মন্দের পার্থক্য বুঝিস? তোর জায়গায় আমি থাকলে নিজের আপন ভাইয়ের সাথে বেইমানি করে তেহুর মতো শয়তানের সাথে হাত মেলাতাম না।”
রিদম তাচ্ছিল্যের সাথে হাসল। “অথচ দেখ, আমার নিজের ভাই আমাকে কুকুরের মতো ট্রিট করছে। বেঁধে রেখেছে আমাকে, ওর গুণগান না গাইলে খেতে পর্যন্ত দেয় না। আগে ওর জন্য একটু খারাপ লাগলেও এখন মনে হচ্ছে তেহকে সমর্থন করাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল।”
“তোর এই দুর্দশার জন্য সেই সিদ্ধান্তটাই দায়ী। তারপরও হান তোকে এভাবে ট্রিট করত না, যদি তুই তার লোকেশনটা আমাদের বলে দিতিস।” ক্রাশার এবার একটু ঝুঁকে এল, “এখনো সময় আছে রিদ, আমাদের বলে দে তেহ তাকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছে। আমরা তোকে সঠিকভাবে ট্রিট করব।”
রিদম এবার রাগে ফেটে পড়ল। “কতবার বলব, আমি তার বিষয়ে কিচ্ছু জানি না! সে বেঁচে আছে না মরে গেছে, তারও ঠিক নেই। তবুও কেন বারবার একই কথা জিজ্ঞেস করছিস?”
ক্রাশার ব্যঙ্গ করে বলল, “আহারে রিদ! এই তোদের বন্ধুত্ব? তেহ তোকে তার ব্যাপারে কিছুই জানায়নি?”
“একই কথা বারবার বলে আমাকে রাগাস না। তেহ কখনো বলেনি আমরা ওর বন্ধু। ও বন্ধু, ভাইয়ের মতো সম্পর্কগুলোকে সহ্য করতে পারে না।”
“তাহলে তোদের মাঝে সম্পর্কটা ঠিক কিসের? কিসের জেরে ও তোদের এভাবে ডমিন্যান্ট করে?” ক্রাশার অবাক হয়ে জানতে চাইল।
রিদম রক্তচোখে তাকাল। “ও আমাদের ডমিন্যান্ট করে কারণ আমরা ওকে নিজেদের বন্ধু মানি। ও আমাদের কাছে বন্ধুর চেয়েও বেশি কিছু; ও আমাদের মেরুদণ্ড। আমাদের হাঁটতে শিখিয়েছে, প্রতিকূলতায় বাঁচতে শিখিয়েছে। যার ওপর ভর করে হাঁটতে শিখেছি তার প্রতি কৃতজ্ঞতা দেখাব না? দুঃখিত ক্রাশার, হানের মতো অকৃতজ্ঞ হতে আমি পারলাম না।”
ক্রাশার মুখ বাঁকিয়ে বলল, “অতো বড় কিছুও করে ফেলেনি ও তোদের জন্য। তবুও ওকে যথেষ্ট সম্মান দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু না, ওর সেই ফাঁকা সম্মানে পেট ভরেনি, রাজত্ব করতে চেয়েছিল। ট্রুয়েনো স্যারকে হাতের মুঠোয় নিয়ে সব নিজের নামেও করে নিয়েছে।”
“হ্যাঁ, সব ঝামেলা নিজের নামে করে নিয়ে তোদেরকে একটা নিরাপদ জীবন দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তোদের তো দামি খাটে শুলে ঘুম আসে না, নোংরা নর্দমা তোদের বেশি পছন্দ।”
ক্রাশার খানিকক্ষণ চুপ থেকে ঠান্ডা গলায় বলল, “জেদ দেখালে সারাদিন না খেয়ে থাকতে হবে। তার চেয়ে জেদ ছেড়ে ভাইকে আশীর্বাদ করে দে।”
“চাই না তোদের খাবার।” রিদম আবার মাথা নিচু করে নিল।
ক্রাশার দাঁতে দাঁত পিষে বিড়বিড় করল, “নির্বোধ কোথাকার! ঠিক আছে, খেতে না চাইলে মর না খেয়ে। আসি তবে। সি ইউ সুন।”
ক্রাশার গটগট পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
বিকেলের পড়ন্ত রোদ তখন অরণ্যের ঘন ছায়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু রিহানের এই দুর্ভেদ্য প্রাসাদে তখন এক উন্মাদনার উৎসব চলছে। পুরো লিভিং রুমকে সাজানো হয়েছে রক্তবর্ণের গাঁদা আর রজনীগন্ধার মালায়। মাঝখানে তৈরি করা হয়েছে এক বিশাল হোমাগ্নি কুণ্ড, যেখান থেকে চন্দন আর ঘিয়ের মিশ্রিত ঘ্রাণে চারপাশ ভারী হয়ে উঠেছে। এক কোণে বসে ধীরলয়ে মন্ত্র উচ্চারণ করছেন একজন ভাড়াটে পুরোহিত।
ফুলের সাজগোছ হয়েছে রাজকীয়, কিন্তু তার চেহারায় ফুটে আছে এক জীবন্ত লাশের প্রতিচ্ছবি। তাকে জোর করে পরানো হয়েছে টকটকে লাল রঙের বেনারসি শাড়ি। কপালে আঁকা হয়েছে চন্দনের কলকা, আর দুহাতে পরানো হয়েছে লাল-সাদা রঙের মোটা চুড়ি। জ্বরের ঘোরে তার চোখের পাতা ভারি হয়ে আসছে, ঠোঁট দুটো ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। সাজানোর সময় একাধিকবার পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় ছোটাছুটি করেছে ফুল। গলা ফাটিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করেও কোনো লাভ হয়নি। ফুল সু’ইসা’ইডাল সেটা তাদের অজানা ছিল না। তাই শেষ পর্যন্ত তারা ফুলের হাত-পা বেঁধে তাকে সাজিয়েছে। এখন পর্যন্ত সেই হাতের বাঁধন খোলা হয়নি।
রিহান নিজের স্বভাবজাত দম্ভ নিয়ে কালো শার্ট আর প্যান্ট পরে সোফায় বসে মদ্যপান করছিল। ফুলের আগমনে সে গ্লাসটা নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়াল। রিহান সামনে এসে দাঁড়ানো মাত্রই ফুল শিউরে উঠল।
“কী সুন্দর লাগছে তোমায় ফ্লোরিতা!” রিহান এগিয়ে এসে ফুলের তপ্ত গালে হাত রাখতে চাইল।
ফুল এক ঝটকায় মুখ সরিয়ে বেদনাকাতর আর্তি করে উঠল, “এই পাগলামি বন্ধ করুন! আমি আপনার পায়ে পড়ছি, আমাকে যেতে দিন। এসবের কোনো মানে হয় না। আমি মুসলিম ঘরের মেয়ে। ধর্মে সইবে না, আল্লাহর লানত পড়বে। তার ওপর আমি অলরেডি অন্য কারো স্ত্রী!”
রিহানের চোখে বিদ্রূপের হাসি ফুটে উঠল। “তুমি খুব সুন্দর করে কথা বলো ফ্লোরিতা। আমি বারবার তোমার প্রেমে পড়ে যাচ্ছি। জেনে রাখো, তোমাকে বউ করে পাওয়ার জন্য আমি এর চেয়েও বড় পাপ করতে রাজি আছি।”
রিহান ঘাড় বাঁকিয়ে পুরোহিতের দিকে তাকিয়ে ইশারা করল। পুরোহিত উচ্চস্বরে সাতপাকের মন্ত্র পড়া শুরু করতেই রিহান ফুলের দিকে এক পা এগিয়ে এল। ফুল চিৎকার করে পিছু হটতে চাইল, “আমি মরে যাব তবুও এই বিয়ে করব না। কক্ষনো না!”
ফুল দৌড়ে পালিয়ে যেতে চাইল, যা দেখে রিহান এবার নিজের আসল রূপ ধারণ করল। সে কোনো কথা না বলে আচমকা ঝুঁকে ফুলকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল।
“কু’ত্তার বাচ্চা ছাড় আমাকে। আমি তোকে মে’রে ফেলব। শেষ করে ফেলব, সাহস থাকলে আমার হাত খুলে দে।”
ফুল নিজের বাঁধা হাত দিয়েই রিহানকে কিল-ঘুষি মারতে লাগল। রিহান খেই হারিয়ে ফুলকে ঝট করে নিচে নামিয়ে তার গালে সপাটে চড় মেরে দিল। ফুলের দুর্বল শরীরটা নিমিষেই ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যেতে নিল। তার আগেই রিহান দাঁতে দাঁত চেপে তাকে পুনরায় কোলে তুলে ফেলল। ফুলের সবটুকু প্রতিরোধকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে আগুনের চারপাশ বরাবর হাঁটা ধরল। জ্বরের প্রচণ্ড উত্তাপ আর থাপ্পড়ের তীব্রতায় ফুল তখন প্রায় সংজ্ঞাহীন।
রিহান পৈশাচিক জিদে ফুলকে নিয়ে তৃতীয় পাকের দিকে অগ্রসর হতেই প্রাসাদের প্রধান ফটকটা বিকট শব্দে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে পড়ল উদ্যান আর তার সোলার গ্যাং। লিভিং রুমের সেই সাজানো গোছানো পরিবেশ এক মুহূর্তেই রণক্ষেত্রে পরিণত হলো।
রিহান স্তম্ভিত হয়ে গেল। তার কপালে পড়ল গাঢ় চিন্তার ভাঁজ; এত দ্রুত উদ্যান তাদের গোপন আস্তানার খোঁজ পেল কীভাবে? সে বুঝতে পারল হাতে সময় খুব কম। সাতপাক পূর্ণ করার চেয়েও এখন ফুলকে নিজের করে নেওয়ার তাড়না তাকে পেয়ে বসল। সে পাক ঘোরা মাঝপথে থামিয়ে ফুলকে নিচে নামিয়ে এক হাতে তার চিবুক চেপে ধরল, অন্য হাতে দ্রুত সিঁদুরের কৌটাটা তুলে নিল।
“আজ তোমায় আমার হতেই হবে ফ্লোরিতা!” রিহান যখনই কম্পিত হাতে সিঁদুর ফুলের সিঁথিতে ছোঁয়াতে যাবে, ঠিক তখনই বজ্রনির্ঘোষে সারা বাড়ি কাঁপিয়ে একটা গর্জন ভেসে এল।
“প্রিমরোজ! ওপেন ইওর আইস।”
উদ্যানের সেই ডাকে যেন মৃতপ্রায় ফুলের শরীরে বিদ্যুৎ তাড়িত হলো। মুহূর্তেই তার অবশ শরীরে চেতনা ফিরে এল। সর্বশক্তি সঞ্চয় করে সে রিহানের হাত থেকে সিঁদুরের কৌটাটা ধাক্কা মেরে ফেলে দিল। রঙিন সিঁদুরগুলো ছিটকে গিয়ে আগুনের ওপর পড়ল। রিহানের হতভম্বতার সুযোগ নিয়ে ফুল ঝড়ের বেগে উদ্যানের দিকে দৌড় লাগাল।
“বাঁচান আমাকে!”
কিন্তু উদ্যানের নাগাল পাওয়ার আগেই পাশ থেকে ক্রাশার অতর্কিত আক্রমণ করে বসল। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে হাতে থাকা ভারী কোনো বস্তু দিয়ে ফুলের মাথায় সজোরে আঘাত করল।
“আহ্!” এক তীব্র আর্তনাদ করে ফুলের শরীরটা ঢলে পড়ল। সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার আগেই ক্রাশার তাকে টেনে হিঁচড়ে পুনরায় রিহানের হাতে তুলে দিল।
উদ্যান তখন শত্রুপক্ষকে প্রতিহত করে প্রবল বেগে এগিয়ে আসছিল, ক্রাশার সেদিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে রিহানকে উদ্দেশ্য করে চেঁচিয়ে উঠল, “তুই একে নিয়ে সেফ এক্সিট দিয়ে এখনই বেরিয়ে যা হান! আমি এদিকটা সামলাচ্ছি। কুইক, দেরি করিস না!”
রিহান পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। র’ক্তাক্ত ফুলকে পুনরায় কোলে তুলে নিয়ে সে দোতলার গোপন সুড়ঙ্গের দিকে পা বাড়াল। উদ্যান সেদিকে ছুটে যাওয়ার আগেই ক্রাশার তার পথরোধ করে ফেলল। উদ্যানের চোখ দুটো রক্তিম হয়ে উঠল, কপালের শিরা ফুলে উঠে তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে গেল। রাগে রীতিমতো ফোঁসফোঁস করছে সে। লুহান, সোহম, অনি, মেলোসহ গ্যাংয়ের বাকিরা অন্যদের পরাস্ত করতে ব্যস্ত।
বেশ কিছুক্ষণ ক্রাশার আর উদ্যানের মাঝে লড়াই চলল। ক্রাশার মোটেও কমজোর ছিল না, তাই উদ্যানকেও বেগ পেতে হচ্ছে। লুহান একফাঁকে বাকিদেরকে পাশ কাটিয়ে উদ্যানকে সাহায্য করার লক্ষ্যে ক্রাশারকে আষ্টেপৃষ্টে চেপে ধরল।
“তেহ তুই রিহানের পেছনে যা, এই ক্রাশারকে আমি দেখে নিচ্ছি।”
উদ্যান তড়িৎ বেগে দোতলায় ছুটে এল।
কিন্তু এখানে পৌঁছে সে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। সেখানে কোনো মানুষের চিহ্ন নেই। রিহান যেন ফুলকে নিয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। উদ্যান তীক্ষ্ণ নজরে চারপাশ পরখ করল, কিন্তু সেই ‘সেফ এক্সিট’ বা গোপন সুড়ঙ্গটার মুখ সে খুঁজে পেল না।
সময় নষ্ট করা মানেই রিহানকে আরও দূরে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। উদ্যান পকেট থেকে কনসোলটা বের করল। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই তার কপাল কুঁচকে গেল। লাল বিন্দুটা অবিশ্বাস্য গতিতে প্রাসাদ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
“এত তাড়াতাড়ি বাইরে বেরিয়ে গেল কী করে?” উদ্যান বিড়বিড় করল। পরক্ষণেই নিজের মনেই উত্তর দিল, “এর জন্যই একে সেফ এক্সিট বলে তেহজিব। এত অবাক হচ্ছিস কেন? সোলার এস্টেটের আশেপাশেও অনেকগুলো সেফ এক্সিট আছে ভুলে গেছিস?”
এক্সিট খোঁজার বৃথা চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে উদ্যান বিদ্যুদ্বেগে মূল ফটক দিয়ে বেরিয়ে গেল।
অন্যদিকে, রিহান তখন হাঁপাচ্ছে। অচেতন ফুলকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে সে জঙ্গলের বুক চিরে অনেকটা পথ চলে এসেছে। তার ধারণা ছিল সে উদ্যানের চোখে সফলভাবে ধুলো দিয়ে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে।
কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর শুকনো পাতার মড়মড় শব্দে সে চমকে উঠল। মনে হলো, কেউ একজন ছায়ার মতো তার পিছু নিচ্ছে। রিহান দিক পরিবর্তন করল। খাড়াই পাহাড়ের পাথুরে পথে উঠল, ঘন ঝোপের আড়ালে লুকানোর চেষ্টা করল। কিন্তু উদ্যান যেন কোনো অশরীরী শিকারি। রিহান যতবার ভাবছে সে এখন নিরাপদ আছে, ততবারই টের পাচ্ছে উদ্যান তার থেকে মাত্র কয়েকশ গজ দূরে।
“কীভাবে সম্ভব?” রিহান আতঙ্কে ঘামতে শুরু করল। বুঝে উঠতে পারল না কীভাবে উদ্যান তাকে এত নির্ভুলভাবে ট্র্যাক করছে। তার এটা বুঝতে বড্ড দেরি হয়ে গেল যে, উদ্যান তাকে নয় বরং ফুলকে ট্রেস করতে পারছে।
পালাতে পালাতে রিহান একসময় পাহাড়ের একদম প্রান্তে চলে এল। সামনে আর কোনো পথ নেই, শুধু কয়েক হাজার ফুট গভীর খাদ। নিচে কুয়াশার চাদরে ঢাকা অন্ধকার অরণ্য। মূলত এখান থেকেই সে ফুলকে নিয়ে হেলিকপ্টারে উঠে যাওয়ার মনস্থ করেছিল।
পায়ের শব্দটা একদম কাছে চলে আসতেই রিহান ঘুরে দাঁড়াল। কয়েকশো গজ দূরে দাঁড়িয়ে আছে উদ্যান।
রিহান এটা খুব ভালো করে বুঝে গেল যে ফুলকে সাথে নিয়ে গেলে উদ্যান তাকে পাতাল থেকেও খুঁজে বের করে ফেলবে। তাই ফুলকে রেখে যাওয়াই এখন বুদ্ধিমানের কাজ। রিহান ভাবল সে ফুলকে এখান থেকে সরাসরি নিচে ফেলে দেবে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ল, হেলিকপ্টার এখনো আসেনি; সে ফুলকে ফেলে দেওয়ার পরমুহূর্তেই উদ্যান তাকে মে’রে ফেলবে।
তার চেয়ে ফুলকে ঢাল বানিয়ে জান হাতে নিয়ে পালিয়ে যেতে হবে। মনে মনে কুটিল বুদ্ধি এঁটে নিল রিহান। সেই মোতাবেক ফুলকে পাহাড়ের একদম শেষ প্রান্তে শুইয়ে দিল। জায়গাটা অত্যন্ত বিপজ্জনক; মাটিতে বড় বড় ফাটল ধরেছে, যেকোনো সময় ধসে পড়বে।
উদ্যান না চাইতেও থেমে গেল। রিহান সুযোগটা লুফে নিল। ফুলকে ওখানে অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রেখে সে খাদের কিনারা ধরে দৌড়ে অনেক দূরে চলে গেল। ঠিক তখনই দিগন্তের ওপার থেকে হেলিকপ্টারের যান্ত্রিক শব্দ শোনা গেল। রিহান তার দিকে তাকিয়ে শয়তানি হাসল। “তুই ডিসাইড কর আমাকে মারবি নাকি ফ্লোরিতাকে বাঁচাবি।”
রিহান হেলিকপ্টারে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। উদ্যান একটা বড় নিঃশ্বাস নিল। তারপর নিজের সর্বশক্তি দিয়ে দৌড় লাগাল। কয়েকশো গজের দূরত্ব অতিক্রম করে ঠিক যে মুহূর্তে মাটির খণ্ডটি ভেঙে হাজার ফুট নিচে তলিয়ে যাচ্ছিল, উদ্যান এক অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে ফুলকে টেনে নিজের শক্ত বুকের ভেতর পিষে ধরল।
রিহান ততক্ষণে হেলিকপ্টারে উঠে পড়েছে। উদ্যান দাঁতে দাঁত চেপে তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল। “আরও একবার তুই আমার হাত ফসকে বেরিয়ে গেলি রিহান। কিন্তু এভাবে আর কতদিন? একদিন না একদিন তোকে আমার মোকাবিলা করতেই হবে। সেদিন তুইও বুঝবি অকৃতজ্ঞদের তেহজিব ঠিক কতটা ঘৃণা করে।”
উদ্যান ফুলের মুখের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল। রক্তে লাল হয়ে আছে ফুলের মোমরঙা মুখশ্রী। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। সে ফুলের শাড়ির আঁচল টেনে ছিঁড়ে ফেলল। সেই কাপড়ের টুকরো দিয়ে ফুলের কপাল বেঁধে দিল। তারপর তার নিথর দেহটা তুলে নিয়ে হাঁটা ধরল।
ফুলের জ্ঞান ফিরতেই এক পৌরুষদীপ্ত ঘ্রাণে তার স্নায়ুকোষগুলো যেন মুহূর্তেই সজাগ হয়ে উঠল। আধো বোজা চোখে সে আবিষ্কার করল, সে কারও ঘাড়ের ভাঁজে মুখ গুঁজে বসে আছে। মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে যন্ত্রণায়, ব্যান্ডেজ করা কপালটায় চিনচিন করছে ব্যথা। সে কোনোমতে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল সামনেই বসে আছে লুহান আর সোহম; প্রত্যেকেই ক্লান্তিতে সিটে গা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে রেখেছে।
পাশে তাকিয়ে রিহানের মতো কাউকে দেখে ফুল ভয়ে কুঁকড়ে যেতেই রিদম ম্লান হেসে বলল, “হেই বোকাফুল, ঘুম কেমন হলো? সবচেয়ে এক্সপেন্সিভ সিটে বসে আছো, ঘুম খারাপ হওয়ার কথা নয়।”
রিদমের ‘বোকাফুল’ সম্বোধনে ফুল বুঝতে পারল এটা রিহান নয়। অবশ্য চেহারা দেখেও তাদের এখন আলাদা করা যাচ্ছে। রিদমের চেহারা এই কদিনেই ভেঙে গেছে। ফুল আলগোছে বাচ্চাদের মতো সেই অপরিচিত অথচ ভরসাযোগ্য কাঁধে মুখ নামিয়ে রাখল। রিদম আগ বাড়িয়ে আরেকটু কথা বলতে চাইল। “ভাগ্যিস আমাকে দেখে তুমি চিল্লিয়ে ওঠোনি। যদিও চিল্লানোর মতো শক্তি তোমার শরীরে এই মুহূর্তে নেইও।”
রিদম ঠিক বলেছে, ফুল নিজেকে অনেক দুর্বল অনুভব করছে। গলাও যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। ফুলের হঠাৎ মনে হলো সে নরম তুলতুলে কোনো গদিতে বসে নেই, বরং শক্তপোক্ত কোনো মানব কোলে বসে আছে। সে এবার বাম হাত উঠিয়ে রাখল লোকটার কাঁধের ওপর; তারপর ধীরে ধীরে মুখ তুলল। প্রথমেই লক্ষ্য করল তার হাতে সেই লাল-সাদা রঙের চুড়িগুলো নেই। বুক চিরে স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল তার।
পরক্ষণেই লোকটার মুখের দিকে চোখ ফেরাতেই ফুলের তন্দ্রাভাব টুটে গেল। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল উদ্যানের ঘুমন্ত মুখপানের দিকে। প্রথমে উদ্যান ঘুমিয়ে আছে মনে হলেও তার বুকের ওপর চোখ পড়তেই ফুলের বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল। উদ্যানের পরনের সাদা শার্টের ওপর র’ক্তের দাগ লেগে আছে। অল্পস্বল্প নয়, বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে সেই দাগ বিস্তৃত। ফুল নিজের কোমল হাতটা আনমনেই সেই দাগের ওপর রাখল। ঠোঁট নেড়ে জানতে চাইল, “কী হয়েছে আপনার?”
ফুলের প্রশ্ন কদাচিৎ শুনতে পেয়েছে উদ্যান। বস্তুত সে ঘুমায়নি। তবুও ফুলের অযাচিত প্রশ্নের উত্তর দিতে চাইল না সে। তাই একইভাবে ঘুমের ভান ধরে পড়ে রইল। ফুলের কণ্ঠ এবার অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। “এই… বলছেন না কেন? এই দাগ কিসের?”
রিদম জানে উদ্যান জেগে আছে। কারণ এতক্ষণ সে তাকে ফোনে স্ক্রোল করতে দেখেছে; যখনই ফুলের জ্ঞান ফিরেছে তখনই উদ্যান ঘুমের ভান ধরেছে। তবুও সে তাদের মাঝে কথা বলতে চাইল না। হেলিকপ্টারে উপস্থিত কারও মন-মেজাজই ভালো নেই। এখন চুপচাপ থাকাই বুদ্ধিদীপ্ত কাজ।
উদ্যানের নিস্তব্ধতা ফুলকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছে, যেন সে কোনো দুঃস্বপ্নের মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। ফুল এবার রিদমের দিকে তাকাল। ব্যাকুল কণ্ঠে প্রশ্ন করল, “রিদম স্যার, ওনার কী হয়েছে? উনি কথা বলছেন না কেন? এই দাগগুলো এল কোত্থেকে?”
ফুলের বোকামি দেখে রিদমের এই ক্রান্তিলগ্নেও হাসি পেল। শখে কি আর সে তাকে বোকাফুল বলে? মেয়েটা ব্যান্ডেজ প্যাঁচানো মাথা নিয়ে জিজ্ঞেস করছে র’ক্ত কোত্থেকে এসেছে। রিদম নাক গলাবে না বলে ঠিক করলেও ফুলের প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে পারল না। “ওগুলো রক্তের দাগ…”
আরও কিছু বলার আগেই উদ্যান খুব মন্থর ভঙ্গিতে নিভু নিভু চোখে তাকাল। যেন চোখ মেলাটাও তার জন্য খুব কষ্টকর। সে ফুলের ডান হাতটা নিজের মুঠোয় পুরে নিয়ে খুব ক্ষীণ স্বরে ফিসফিসিয়ে বলল, “আমার বুকের ভেতর র’ক্তক্ষরণ হচ্ছে পেটাল। এগুলো সেই র’ক্তেরই দাগ।”
ফুল চমকে উঠল। আতঙ্কে তার কণ্ঠরোধ হয়ে এল, “কী বলছেন এসব?”
ঠাট্টা করতে মন না চাইলেও ফুলকে বিচলিত হয়ে পড়তে দেখে উদ্যান নিজের স্বভাবসুলভ ঝোঁকের বশে সুযোগ নিতে চাইল। সে চোখের পলক না ফেলে মরণাপন্ন মানুষের ভঙ্গিতে বলল, “হ্যাঁ, আমি সত্যি বলছি। রিহান পালিয়ে যাওয়ার আগে আবারও আমার বুকে ছুরি ঢুকিয়ে দিয়েছে।”
ফুলের হৃদয় ছলকে উঠল। তার চোখের সামনেটা ইতোমধ্যেই ঝাপসা হয়ে এসেছে। সে ঠোঁট ভেঙে বলল, “তাহলে আপনাকে ডাক্তারের কাছে কেন নিয়ে যাচ্ছে না?”
রিদম উদ্যানের এই অভাবনীয় নাটক দেখে ভেতরে ভেতরে অবাক হলেও পরিস্থিতি সামলাতে তার ‘হ্যাঁ’-তে ‘হ্যাঁ’ মিলিয়ে বলল, “আমরা ওকে সেখানেই নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি বোকাফুল।”
ফুলের বুকের ভেতরটা যেন দুমড়ে-মুচড়ে গেল। এক বুক হাহাকার নিয়ে সে কান্নায় ভেঙে পড়ল। উদ্যান তার নিস্তেজ হাতটা বাড়িয়ে ফুলের চোখের জল মুছে দিয়ে বলল, “রাতের ঘটনার জন্য আমি সরি ওয়াইফি। আমার তোমাকে একা যেতে দেওয়া উচিত হয়নি। আমাকে পারলে ক্ষমা করে দিও।”
অনি পেছনের সিট থেকে উঁকি মেরে উদ্যানের নাটক দেখে যারপরনাই বেকুব বনে গেল। সে কখনো ভাবতেও পারেনি উদ্যান এত বড় নাটকবাজ।
ফুলের কান্নার মাত্রা বেড়ে গেল। তার কান্নার শব্দে যারা ঘুমিয়ে ছিল তারাও ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। উদ্যান প্রথমে সুযোগ নিলেও এখন বেশ মজা পাচ্ছে ফুলের অবস্থা দেখে। সে আবারও করুণ স্বরে বলল, “আমি জানি তুমি… আমাকে একটুও ভালোবাসো না। তাই আমি তোমার কাছে যাওয়ার পর তুমি অমন আচরণ করেছিলে। যেটা খুব স্বাভাবিক ছিল… আমার উচিত ছিল তোমার কাছে তখনই ক্ষমা চাওয়া। শোনো পেটাল… আমি মরে-টরে গেলে তুমি আবেশের কাছে ফিরে যেও, কেমন?”
ফুলের দম আটকে আসছিল। সে নাক টেনে বলল, “আপনি এসব বাজে কথা কেন বলছেন? কিচ্ছু হবে না আপনার, এই আপনারা তাড়াতাড়ি ওনাকে হসপিটালে নিয়ে চলুন প্লিজ।”
ফুলের লাল হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে উদ্যান অস্ফুট স্বরে আওড়াল, “আমি হয়তো বাঁচব না পেটাল। শুধু ম’রে গেলে একটা আফসোসই থেকে যাবে, সেটা হলো… তোমার মুখ থেকে ভালোবাসি শব্দটা শুনতে না পারার আফসোস। সেই অতৃপ্তি নিয়ে আমি হয়তো ম’রে গিয়েও শান্তি পাব না।”
ফুল কোনো যুক্তি বা বুদ্ধি দিয়ে ভাবার অবস্থায় নেই। সে স্রেফ ঝাঁপিয়ে পড়ে উদ্যানের গলা জড়িয়ে ধরল। তার নাক গিয়ে ঠেকল উদ্যানের ঘাড়ে। কান্নার তোড়ে সে হেঁচকি তুলে বলল, “আপনাকে আমি কোথাও যেতে দেব না।”
উদ্যান ফুলের আলিঙ্গনটুকু উপভোগ করল। “আমাকে এভাবেই জড়িয়ে ধরে রাখো পেটাল। ম’রে যেতে দিয়ো না।”
এক বুক অসহায়ত্ব নিয়ে ফুল ডুকরে উঠল, “বারবার ম’রে যাওয়ার কথা বলবেন না। আমার খুব কষ্ট হয়।”
“আমারও কষ্ট হচ্ছে খুব। ইশ! যদি একবার তোমার মুখ থেকে… ভালোবাসার কথাটা শুনতে পেতাম তবে হয়তো আরও কিছুক্ষণ লড়াই করার শক্তি পেতাম।”
ফুল উদ্যানের গলা ছেড়ে দিয়ে তার গালে দুহাত রাখল। কান্নায় রুদ্ধ হয়ে আসা গলায় আজ নিজের অজান্তেই সেই ধ্রুব সত্যটা স্বীকার করে ফেলল, যা সে কোনোদিন প্রকাশ্যে আনবে না বলে মনে মনে পণ করে রেখেছিল।
“আমি ভালোবাসি আপনাকে। খুব খুব ভালোবাসি।”
উদ্যানের সাথে সাথে হেলিকপ্টারের সবাই একযোগে বিস্মিত চোখে ফুলের দিকে তাকাল। ফুলের ঠোঁট তিরতির করে কাঁপছিল; প্রবল জ্বরে নাকি অজানা কোনো এক গভীর শিহরণে—সে নিজেও জানে না। উদ্যান এক হাতে শাড়ির ফাঁক দিয়ে ফুলের অনাবৃত মসৃণ কোমর চেপে ধরল। তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিয়ে সিরিয়াস গলায় বলল, “তোমার মিথ্যা স্বীকারোক্তিটা এত সত্যি কেন শোনাচ্ছে পেটাল?”
ফুল তখনও ঘোরের মাঝেই ছিল। চিৎকার করে বলে উঠল, “কারণ এটা মিথ্যা নয়, এটাই সত্যি। হ্যাঁ আমি ভালোবাসি আপনাকে, আমার কাছে ভালোবাসা মানে আপনি। এই ভালোবাসা সদ্য জন্মানো কোনো অনুভূতি নয়। এ আমার দীর্ঘদিন ধরে লালন করা এক প্রগাঢ় অনুভূতি। এমন এক উন্মাদনা যার বশে এলে আমার মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দেয়। ইচ্ছা করে বাস্তবতা থেকে ছুটি নিয়ে অনুভূতির রাজ্যে হারিয়ে যাই।”
উদ্যান ফুলের চুলের ভাঁজে হাত গলিয়ে তার মুখটা নিজের মুখ বরাবর আনল। আরও ভারী কণ্ঠে বলল, “তুমি কিন্তু ভালোবাসার কথাটা স্বীকার করে নিচ্ছ পেটাল। পরে আবার বোলো না নিজের সেন্সে ছিলে না। সবাই কিন্তু শুনেছে তুমি আমার সামনে কনফেস করেছ। কী তোরা শুনেছিস না?”
সবাই বিনাবাক্যে ওপর-নিচ মাথা নাড়ল। মেলোর মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেলেও সে মুখ ঘুরিয়ে জানালার বাইরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল।
ফুল তার দুহাত দিয়ে উদ্যানের বুক চেপে ধরল। যেন সে র’ক্ত থামানোর চেষ্টা করছে। উদ্যান এবার ফুলের থুতনি উঁচিয়ে তার চোখে চোখ রাখতে বাধ্য করল। “তোমার ভালোবাসা পেয়ে র’ক্তক্ষরণ থেমে গেছে। অযথা উদগ্রীব হয়ো না।”
ফুল ঠোঁট চেপে ডানে-বামে মাথা দোলাল। “আপনাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে।”
উদ্যানের দৃষ্টি ফুলের চোখে-মুখে ঘুরে ফিরে ফুলের ঠোঁটের ওপর আটকে গেল। “ওকে, লেটস টেক সাম মেডিসিন।”
ফুল উদ্যানের কথার মানে বুঝে উঠতে পারল না। শুধু অশ্রুসিক্ত নয়নে চেয়ে রইল। উদ্যান তার দিকেই দৃষ্টি স্থির রেখে বাকিদের উদ্দেশ্যে গলা চড়িয়ে বলল, “গাইস, ক্যান ইউ ক্লোজ ইয়োর আইস ফর অ্যাট লিস্ট টু মিনিটস?”
সোহম আর লুহান হতবুদ্ধির মতো হ্যাঁ-বোধক মাথা নাড়ল। রিদম হালকা কেশে বলল, “আই থিংক উই হ্যাভ টু ক্লোজ আওয়ার ইয়ার্স টু।”
সঙ্গে সঙ্গে সবাই তাড়াহুড়ো করে নিজ নিজ কানে ইয়ারপিস গুঁজে চোখের ওপর আই মাস্ক টেনে নিল। আবহাওয়া হঠাৎ গুমোট হয়ে যাওয়া মাত্রই ফুলের টনক নড়ল। সে উদ্যানের কোল থেকে সন্তর্পণে নেমে যেতে চাইল। কিন্তু উদ্যান তার আগেই ফুলের ঘাড় চেপে ধরে তাকে নিজের খুব কাছে নিয়ে গেল। কানের কাছে মুখ নিয়ে নেশাতুর কণ্ঠে বলল, “একটা কিস করি, হ্যাঁ রাগ কোরো না।”
ফুলের কান গরম হয়ে গেল। লজ্জায় উদ্যানের বুকে দুহাত রেখে ঠেলে তাকে সরিয়ে দিতে চাইল কিন্তু পারল না। উদ্যান তাদের মধ্যকার দূরত্বটুকু ঘুচিয়ে তার ঠোঁট জোড়ায় নিজের ঠোঁট বসিয়ে দিল। ফুল প্রথমে ধাক্কা দেওয়ার জন্য হাত রাখলেও উদ্যানের সংস্পর্শে আসার পরপরই তার হাতের আঙুল উদ্যানের শার্ট খামচে ধরল। উদ্যানের রুক্ষ ঠোঁটের নিচে দলিতমথিত হতে লাগল ফুলের পাপড়ির ন্যায় ফিনফিনে অধরযুগল।
ঠিক কতক্ষণ উদ্যান তার ওপর কর্তৃত্ব চালাল তার ইয়ত্তা রইল না। আর না তো হুট করে থেমে যাওয়া উদ্যানের পক্ষে সহজ ছিল। তারপরও নিজের ইমেজ ঠিক রাখতে উদ্যান থেমে যেতে বাধ্য হলো। উদ্যানের কবল থেকে মুক্তি মিলতেই ফুল ছোট্ট চড়ুই ছানার মতো আড়ষ্ট হয়ে গেল। উদ্যান তার লজ্জাটুকু শুষে নেওয়ার প্রচেষ্টায় তার মুখটা নিজের কাঁধের ওপর রাখল। ফুল নরম গলায় বলল, “আমি সরে বসি, আপনার নিশ্চয়ই কষ্ট হচ্ছে।”
উদ্যানের ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে বলল, “মেডিসিন খেয়ে সুস্থ হয়ে গেছি।”
ফুল বুঝতে পারল উদ্যান এতক্ষণ তার সাথে নাটক করেছে। সত্যি সত্যি তার বুকে রিহান ছুরি ঢুকিয়ে দিলে সে হঠাৎ করেই স্বাভাবিক টোনে কথা বলতে পারত না। সে চট করে মুখ তুলে ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল। সন্দিহান গলায় বলল, “আপনি মিথ্যা বলেছেন আমাকে?”
উদ্যান শাড়ির আঁচল মুঠোয় নিয়ে ফুলের কপালের কলকাগুলো মুছে দিতে লাগল। যদিও কলকাগুলো এখানে-ওখানে লেগে প্রায় মুছেই গিয়েছিল।
“মিথ্যা কথা বলে এমন একটা সত্যি জানা যাবে আগে জানলে, মিথ্যাটাকে সত্যি করে হলেও তোমার মুখ থেকে ভালোবাসার কথাটা টেনে বের করতাম।”
ফুল কথাটা উপেক্ষা করতে চাইল। “শার্টে র’ক্ত লাগল কীভাবে?”
উদ্যান শান্ত গলায় বলল, “এগুলো তোমার র’ক্ত। তখন তোমাকে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে গিয়ে লেগেছিল। তারপর তোমাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে ছুটতে হয়েছে। তাই এস্টেটে ফিরেও শার্ট চেঞ্জ করার টাইম পাইনি। পাহাড়ি এলাকায় ডাক্তার পাওয়া সহজ নয়, ভাগ্য ভালো ছিল তাই পেয়েছিলাম।”
ফুল নিজের মাথার ব্যান্ডেজ ছুঁয়ে বলল, “হ্যাঁ মনে পড়েছে, তখন ওই লোকটা আমার মাথায় বাড়ি মেরেছিল। আচ্ছা আমি কি খুব ব্যথা পেয়েছি?”
“কম ব্যথা পাওনি, দুটো সেলাই লেগেছে।”
“কোন জায়গায় কেটেছে?”
উদ্যান ফুলের হাতটা কপালের সামান্য ওপরে রেখে বলল, “এখানে।”
ফুল কিয়ৎক্ষণ চুপ থেকে বলল, “কু’ত্তা লোকটাকে ধোলাই করেছেন?”
উদ্যান ভ্রু উঁচিয়ে শুধাল, “সেটা আবার কে?”
ফুল ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, “আমি রিহানের কথা বলেছি।”
উদ্যান একবার আড়চোখে রিদমের দিকে তাকাল। যে কিনা ফুলের কথা শুনেও না শোনার ভান করল। যেন সে রিহান নামের কাউকে চেনেই না।
“ধোলাই করার সুযোগ থাকার পরেও করতে পারিনি।”
“কেন?” ফুল উদ্যানের দৃষ্টি অনুসরণ করে রিদমের দিকে চোখ ফেরাতেই শুকনো ঢোক গিলল। রিহান যে রিদমের ভাই হয় সেটা সে ভুলেই গিয়েছিল। সে উদ্যানের দিকে একটু ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বলল, “রিহান রিদম স্যারের ভাই হয় বলে আপনি তাকে কিছু বলেননি তাই না? এটা কিন্তু ঠিক করেননি। সে আমার সাথে যা করতে চেয়েছে তা মোটেও ক্ষমার যোগ্য নয়। আপনার উচিত ছিল তাকে পানিশড করা।”
উদ্যান আবারও ফুলের ঠোঁটের নড়াচড়া থেকে বিমূঢ় হয়ে গেল। তার মনোভাব বুঝতে পেরে ফুল একটু সরে বসতে চাইল। কিন্তু সিটে একদম জায়গা ছিল না। সে অভিযোগের সুরে বলল, “আমার সিটটাই রিদম স্যারকে দিতে হলো? এই হেলিকপ্টারে আমিই কি তবে বাড়তি লোক?”
উদ্যান মোহাচ্ছন্ন কণ্ঠে বলল, “তুমি চাইলে আমি এখনই সবাইকে জানালা দিয়ে ফেলে দিতে পারি। আমারও ওদেরকে আর ভালো লাগছে না। তারপর তুমি আর আমি ভালোভাবে রাইড এনজয় করতে পারব। কী বলো? ফেলে দিই?”
ফুল স্তম্ভিত চোখে চাইল। রিদম তার কথা শুনেও কানে তুলল না। ফুল ভাবল উদ্যান হয়তো মজা করছে।
“আপনি আসলেই সবাইকে ফেলে দেবেন?”
উদ্যান ভরাট কণ্ঠে বলল, “তুমি একবার বলেই দেখো।”
রিদম এবার গলা খাঁকারি দিল। “আমি কিন্তু তোদের সব সিক্রেট প্ল্যান শুনে ফেলছি।”
উদ্যান ফুলের ওপর দৃষ্টি স্থির রেখে বলল, “তাহলে তো আড়ি পেতে আমাদের প্ল্যান শুনে ফেলার জন্য তোকে পানিশড করা উচিত।”
রিদম নিশ্চুপ হয়ে আবারও কানে ইয়ারপিস গুঁজে নিল। উদ্যান ফুলের গালে হাত রেখে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। “হ্যাঁ তো বলো, সবাইকে আউট করে দিই?”
ফুল ঠোঁট চেপে না-সূচক মাথা নাড়ল। “দরকার নেই।”
উদ্যানের দৃষ্টি ফুলকে পাশ কাটিয়ে সম্মুখে গিয়ে পড়ল। দেখতে পেল সবাই ঘুমিয়ে আছে; রাতে কারওই ঠিকঠাক ঘুম হয়নি, সবাই মিলে ফুলকে হন্যে হয়ে খুঁজে ফিরেছে। অনিলা বেচারিও ফুলের চিন্তায় দুচোখের পাতা এক করতে পারেনি। এখন নিশ্চিন্তে অনির কাঁধে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছে। যদিও এই ব্যাপারে বেখবর সে। পাশেই মেলো উইন্ডোতে মাথা এলিয়ে দিয়ে ঘুমোচ্ছে।
“আমি তোমাকে আরেকটা কিস করি পেটাল?”
উদ্যান শুধু শুধুই জিজ্ঞেস করল, বস্তুত সে ফুলের উত্তরের অপেক্ষায় থাকলই না। আবারও ফুলের অধর নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিল। ফুলের এখন আর ভালো লাগছে না। এতগুলো মানুষের মাঝে মেয়েটার বেজায় অস্বস্তি হচ্ছে। তার ওপর উদ্যান মোটেও সফটলি কিছু করছে না। তার কাছে সবকিছু কেমন যেন পানসে লাগছে। ফুল চোখ বন্ধ করে উদ্যানকে আশকারা দিচ্ছিল; কারণ এই মুহূর্তে তাকে আটকানোর মতো শক্তি বা মনোবল কোনোটাই ফুলের মাঝে নেই।
উদ্যানের রুক্ষ আদরে বিভোর হয়ে ছিল ফুল, তখনই মানসপটে উর্বীর জীর্ণ মুখটা ভেসে উঠল। তৎক্ষণাৎ চোখ মেলে সে ছটফটিয়ে উঠল। উদ্যান বিরক্ত হয়ে ফুলের ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। “কী হয়েছে? আদর করছি, ভালো লাগছে না? তুমি না আমাকে ভালোবাসো, তাও কেন বাধা দিচ্ছ?”
ফুল হাতের পিঠে ঠোঁট মুছে ভয়ার্ত চোখে চতুর্দিকে তাকাল। কিন্তু উর্বীকে নজরে এল না। উদ্যান ফুলের অস্থিরতা টের পেয়ে জিজ্ঞেস করল, “এই, কী হয়েছে তোমার? কাকে খুঁজছ?”
ফুলের বুকের ভেতর ধক করে উঠল। “আপনারা তাকে আনেননি কেন?”
“কাকে আনিনি?”
“আরে ওই প্রাসাদের মাটির নিচে গুপ্ত কুঠুরি আছে।”
উদ্যান তব্দা খেয়ে গেল। বাঙ্কার থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয় তার কাছে। কিন্তু ফুল এমনভাবে বলছে যেন এটা অত্যন্ত অনুচিত কিছু।
“বাদ দাও, যা মন চায় থাকুক গে। আই ডোন্ট কেয়ার, আমি শুধু তোমাকে আর রিদমকে বাঁচাতে গিয়েছিলাম। ওখানে কোথায় কী আছে তার তদারকি করতে যাইনি।”
ফুলের নাসারন্ধ্র স্ফীত হয়ে উঠল। একরাশ বিতৃষ্ণা নিয়ে বলল, “মেয়েটাকে আমি চিনি, আমাকে সাহায্য করেছিল সে। আমি তাকে বলেছিলাম তাকে রেখে কোথাও যাব না। আপনারা ফিরে চলুন সেখানে।”
উদ্যান তার প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিল। “আমরা আর কিছুক্ষণের মধ্যে সোলার এস্টেটে ফিরে যাব। এখন কোনোভাবেই বান্দরবান ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। তুমি অকারণে জেদ কোরো না।”
ফুল কিয়ৎক্ষণ উদ্যানের মুখপানে তাকিয়ে থেকে শক্ত গলায় বলল, “আপনি আসলেই মানুষ নন। যদি হতেন তাহলে ওখানে একটা মেয়ে বন্দি আছে জেনেও হার্টলেসের মতো নিজের সুবিধা-অসুবিধার অঙ্ক কষতে পারতেন না।”
উদ্যান ঠোঁটের বাঁক উঁচিয়ে বলল, “আমি মানুষ হতেও চাই না। যেমন আছি ভালো আছি।”
ফুল দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “আপনি যাবেন কি না বলুন।”
“না যাব না।”
“ঠিক আছে, আমাকে কোথাও নামিয়ে দিন, আমি পুলিশের সাহায্য নিয়ে তাকে উদ্ধার করব।”
“পুলিশের বাপেরাও সেই প্রাসাদ খুঁজে পাবে না।”
ফুল এবার নিরুপায় হয়ে কেঁদে ফেলল, “দয়া করে ফিরে চলুন, মেয়েটা ওখানে থাকলে ম’রে যাবে। আমিও তার চিন্তায় চিন্তায় নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দেব।”
উদ্যান একটু আগ্রহ প্রকাশ করল। “মেয়েটা তোমার সাহায্য কীভাবে করেছিল শুনি?”
ফুল সরল মনে বলে ফেলল, “আপনি আমাকে জঙ্গলে ফেলে রেখে চলে যাওয়ার পর সেই ম্যামই আমাকে উদ্ধার করে আবেশ ভাইয়ের হাতে তুলে দিয়েছিল।”
ব্যস, উদ্যানের আগ্রহ কর্পূরের মতো হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। মনে পড়ে গেল উর্বীর সাথে তার কথোপকথনের কথা। মেয়েটা তার সাথে উঁচু গলায় কথা বলেছিল, মেজাজও দেখিয়েছিল। “বাহ! তাহলে তো সে তোমার অনেক বড় সাহায্য করেছিল। তোমার উচিত সৃষ্টিকর্তার কাছে হাত জোড় করে প্রার্থনা করা যাতে মৃ’ত্যুর পর সে হ্যাভেনে যেতে পারে।”
ফুল রাগী চোখে তাকাতেই উদ্যান নিচু স্বরে বলল, “ওভাবে তাকিও না, মাথা খারাপ হয়ে যাবে। তারপর বেহুদা কান্নাকাটি করেও পার পাবে না।”
ফুলের ভীষণ অভিমান হলো। একে তো তার শরীর ভালো নেই, তার ওপর উদ্যানের অপ্রাসঙ্গিক কথা তার মনকে বিষিয়ে দিচ্ছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে হেলিকপ্টারটি সোলার এস্টেটের টেরেসে ল্যান্ড করল। একে একে সবাই যার যার মতো নেমে যেতে লাগল। গার্ডরা এগিয়ে এসে তাদের লাগেজ তুলতে সাহায্য করল।
ফুলকে উদ্যান কোলে করে নামানোর জন্য হাত বাড়িয়ে দিল কিন্তু ফুল তাকে পাত্তা দিল না। কাঁদতে কাঁদতে একা একাই নেমে দাঁড়াল। তারপর কারও অপেক্ষায় না থেকে অসুস্থ শরীরটাকে নিয়ে ত্রস্ত পায়ে এস্টেটের ভেতরে চলে গেল। অনিলাও ছুটে গেল তার পিছু পিছু। মেয়েটার সাথে কথা বলার সুযোগ পায়নি সে; একদিনেই যেন কথার পাহাড় জমে গেছে।
উদ্যান তখন ফুলের কথায় কর্ণপাত না করলেও হঠাৎ মনে হলো—সেই মেয়েটাকে ফুল রিহানের প্যালেসে দেখল কীভাবে? লুহান উদ্যানের থমকে যাওয়া লক্ষ্য করে প্রশ্ন করল, “এনিথিং রং?”
উদ্যান পকেটে হাত গুঁজে নিরাবেগ গলায় বলল, “হুম, আই থিংক ওয়াইফির সাথে রূঢ় ব্যবহার করে ফেলেছি।”
সোহম ফিক করে হেসে ফেলল, “তুই তো সবসময়ই এভাবে কথা বলিস।”
উদ্যান সরু চোখে তাকাল। সোহম হাসি থামিয়ে বলল, “আমি বলতে চেয়েছি, তুই ন্যাচারালি একই টোনে কথা বলিস।”
অনি বলল, “যখন বুঝতেই পেরেছিস ফুলবানু কষ্ট পেয়েছে তখন গিয়ে মানাচ্ছিস না কেন?”
উদ্যান ভাবলেশহীন কণ্ঠে বলল, “আরে ও রিহানের প্যালেসে ফিরে যেতে চাইছে।”
কথাটা উদ্যানের মুখ থেকে বেরোনো মাত্রই সবাই একযোগে বলে উঠল, “হোয়াট!”
উদ্যান আঙুল দিয়ে কপাল চেপে ধরল। “চিৎকার করিস না। ও আসলেই সেখানে যাওয়ার বায়না ধরেছে।”
আচমকা চিল্লানি শুনে রিদম তাদের সামনে এসে দাঁড়াল। “কী হয়েছে?”
সোহম তাকে বলল, “রিভেঞ্জফুল নাকি তোর ভাইয়ের কাছে ফিরে যেতে চাইছে।”
রিদম বুঝদারের মতো বলল, “ও হয়তো ওকে ধোলাই করার জন্য যেতে চাইছে, উল্টোপাল্টা মিনিং বের করিস না।”
উদ্যান দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আমি বলেছি রিহানের প্যালেসে যেতে চেয়েছে, রিহানের কাছে বলিনি।”
মেলো বলল, “আরে কেন যেতে চাইছে সেটা বলেনি?”
উদ্যান বিরক্ত গলায় আওড়াল, “বলল প্যালেসের বেসমেন্টে নাকি একটা মেয়েকে আটকে রাখা হয়েছে।”
একথা শুনে বাকিরা ধাঁধায় পড়ে গেলেও অজানা আশঙ্কায় রিদমের শরীর দুলে উঠল। “কোন মেয়েকে?”
সোহম বাগড়া দিল। “আরে হবে হয়তো কোনো প্র’স্টি’টিউট, তোর ভাই তো তোর মতোই। মার্সিফুল খুব নরম মনের, সেই জন্যই মেয়েটাকে বাঁচানোর জন্য যেতে চাইছে। কিরে! ঠিক বলেছি না?”
রিদম রক্তচোখে সোহমের পানে তাকাল। লুহান বুঝতে পারল এদের থামানো প্রয়োজন। “তোরা বাচ্চাদের মতো কথার মাঝে হাত-পা ঢুকিয়ে দিচ্ছিস কেন? তেহকে পুরোটা বলতে তো দিবি নাকি।”
অনি সহমত পোষণ করল। “হ্যাঁ তেহ, বল কাহিনী কী?”
উদ্যান প্রচুর ধৈর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার মনোযোগ তো সেই কখন ফুলের পিছু পিছুই চলে গেছে। বিষয়টা যথেষ্ট চিন্তার হলেও উদ্যান আপাতত কোনো কিছু ভাবতে পারছে না। তবুও বাকিদের জানানোর তাগিদে উদাস গলায় বলল, “মিসেস উর্বী সেন নামের মেয়েটার কথা বলতে চেয়েছিল ও। সেই মেয়েটা, যে মেয়েটা মাতব্বরি করে এস্টেটে তল্লাশি চালাতে এসেছিল। শুধু সেটা করেই থেমে থাকেনি, পেটালকে জঙ্গল থেকে তুলে নিয়ে আবেশের হাতে গছিয়ে দেওয়ার সব ক্রেডিট তারই ছিল।”
আরেকদফা সবাই চেঁচিয়ে উঠল, “হোয়াট দ্য ফা’ক!”
লুহান বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। সোহম বলল, “ডাউটফুল হয়তো সেখানে সেই মেয়ের মতো দেখতে অন্য কাউকে দেখেছে, নইলে তুই-ই ভাব, সেই পুলিশ মেয়েটা ওখানে যাবে কেমনে?”
উদ্যান বাহু ঝাঁকিয়ে বলল, “তাই হবে হয়তো। পেটাল যা দেখে, যা বলে আর মাঝেমধ্যে যা করে তার পেছনে কারণ খুঁজতে গেলে মাথা হ্যাং হয়ে যায়। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারি না ওকে; তখন বলল অনেক আগে থেকেই নাকি আমাকে ভালোবাসে, তোরাই বল এই কথার কোনো লজিক আছে?”
বাকিরা বুঝতে পারল উদ্যান ফুলের স্বীকারোক্তি নিয়ে বিড়ম্বনায় আছে। এই মুহূর্তে অন্য কিছু নিয়ে ভাবতে পারছে না দানবটা। তারা যে যার মতো বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে গেল। তাদের মধ্যে সবাই ধরেই নিয়েছে ফুল ভুল দেখেছে। হঠাৎই ধপ করে একটা শব্দ হলো। শব্দের উৎসের খোঁজে সামনে তাকাতেই দেখতে পেল রিদম হাঁটু ভেঙে নিচে বসে পড়েছে। বিড়বিড়িয়ে বলছে, “ও বলেছিল ওকে ছেড়ে দিয়েছে, কিন্তু নাহ ও দেয়নি। ও এটা কীভাবে করতে পারল!”
সোহম ভাবল রিদমের শরীর খারাপ লাগছে, সে দ্রুত তার দিকে এগিয়ে গেল। তাকে তোলার চেষ্টা করতে লাগল। “এই রিদম, কী হয়েছে তোর?”
বাকিরাও রিদমকে নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেল। লুহান ফোন করে ডাক্তার ডাকল। অনি মেইডদের পানি নিয়ে আসতে বলল। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই রিদম মাথা তুলে দাঁড়াল। হন্তদন্ত হয়ে ফুলের খোঁজে হাঁটা ধরল। একমাত্র সেই তাকে সবটা পরিষ্কার করে বলতে পারবে।
চলবে,,,
শব্দসংখ্যা: ৫০০০+
Share On:
TAGS: অবাধ্য হৃৎস্পন্দন, সোফিয়া সাফা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৮
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৩
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৮
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৯
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১২
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৬
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৬
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৭