হেইসুইটহার্ট!__(০৮)
নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি
চারপাশে বার্চ গাছ। বাতাসে কনিফারের কাচা গন্ধ। ভারি আকাশ থেকে ধূসর মেঘ অনেকটা নিচুতে নেমে এসেছে। কালো কোর্ট আর লম্বা স্কার্ফ পরা নারী-পুরুষ সবাই নিশ্চুপ,স্তব্ধ মুখে দাঁড়িয়ে। অদূরের এক কোণে চিকণ, মিহি সুরে ভায়োলিন বাজছে। ওইপাশে গুনগুন করে কাঁদছে রবার্টের মা আলিসা। রবার্টের বাবা বসে আছেন ভারি,ব্যথিত মুখে। রবার্টের স্ত্রীও তার বাচ্চা নিয়ে এসেছে। চোখ ছলছল করছে তারও। যেখানে মানুষটাই নেই,সেখানে অভিমান কার সাথে!
রবার্টের আজ ফিউনারেল। তার এই অকাল মৃত্যুতে শোকার্ত সবাই। তবে কোনো ক্যামেরা,জার্নালিস্ট এলাউ করা হয়নি। এসেছে চেনাজানা গণ্ডির লোকজন। প্রায় সবাই ঝুলন্ত মালায় জড়ানো রবার্টের হাস্যোজ্জ্বল ছবিটাকে ঘিরে অনেক দুঃখ প্রকাশ করলেন। অনেক প্রডিউসার,ব্র্যান্ডের লোকদেরও ফুলের বুকে দিতে দেখা গেল। সম্রাট চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখছিল সেসব। জিভটা চতুরের মতো গালের ভেতর এপাশ-ওপাশ করছে। তুহিন এসে পাশে দাঁড়াল তখনই। গলা খাকারি দিয়ে একটু বসের মনোযোগ চাইল সাথে। তবে সম্রাট পাশ ফিরল না। দেখলও না ওকে। শুধু ভ্রুয়ের ইশারায় বলল,
“ রবার্টের স্ত্রী না?”
“ হ্যাঁ বস।”
“ দেখতে ভালো। রবার্টের মতো লুজারকে পছন্দ করল কেন?”
“ এজন্যেই তো বস সেপারেশন হয়ে গেছিল।”
বিদ্রুপ করে হাসল সম্রাট। দুজনের কথার মাঝেই একজন ভদ্রলোক পাশে এসে দাঁড়ালেন। ডাকলেন,
“ মিস্টার স্যাম!”
পাশ ফিরল সে। পুলিশের লোক। হেসে হাতটা বাড়ালেন তিনি।
“ নাইস টু মিট ইউ। আমার বাবা আপনার পেশেন্ট ছিল। বিজনেস ম্যান,এরিক এহরান।”
সম্রাট হাসল না। হাতটা ধরল শুধু। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকাল রবার্টের কফিনের দিকে। খুব আক্ষেপ নিয়ে
বলল,
“ ভালো মানুষ ছিল। ভাবতেই পারিনি এভাবে চলে যাবে।”
ভদ্রলোক নিজেও একটা ছোট্ট শ্বাস ফেললেন। বললেন,
“ আপনাদের চেনা-জানা কেমন ছিল?”
“ কম। তবে যতটুকু চিনতাম, হী ওয়াজ আ নাইস গাই।”
তুহিন বিষম খেলো। দুজন ওর দিকে তাকাতেই, থতমত খেয়ে মাথাটা নুইয়ে রাখল পায়ের ওপর। ভদ্রলোক বললেন,
“ বুঝতে পেরেছি। এত সিভিয়ার এক্সিডেন্ট! ফুসফুস অবধি ফেটে একদম যা তা অবস্থা। কী থেকে কী যে হয়ে গেল!”
তুহিন চশমার আড়ালে চোখের মণিজোড়া দুই দিকে ঘোরাল। সাগ্রহে শুধাল,
“ পোস্টমর্টেমে আর কিছু পাওয়া যায়নি?”
“ না।”
মাথা নাড়ল ও। সম্রাটের দিক চাইতেই দেখল আড়চোখের একটা ঠান্ডা দৃষ্টি ফেলে চেয়ে আছে সে। ছেলেটা ঘাবড়ে গেল। ত্রস্ত ঘাড় নুইয়ে নিলো আবার।
ভদ্রলোক বললেন
“ তাহলে আসি মিস্টার স্যাম। আবার দেখা হবে।”
সৌজন্যতায় মাথা নাড়ল সে।
ভদ্রলোক পাশ কাটালেন। যেতে যেতে শুনতে পেলেন সম্রাট আকাশের দিকে চেয়ে বলছে,
“ মিস ইউ রবার্ট!”
অথচ দুটো সেকেন্ড পার হতেই সম্রাটের শীতল চেহারায় একটা সূক্ষ্ম হাসি ছুটল। ফিসফিস করে বলল,
“ রেস্ট ইন পিস, কাওয়ার্ড।”
ভ্যাক্সহলম, সুইডেনের এক শান্ত শহর। স্টকহোমের কোল ঘেঁষে থাকা এক গুচ্ছ্ব দ্বীপের শহর বলে একে। কম শব্দ,প্রচণ্ড হাওয়া।
সম্রাট বেশিরভাগ সময় এখানেই থাকে। একদম নিজের জন্যে আলাদা এক জগৎ তৈরি করতে এখানে একটা বিশাল বাঙলো কিনেছে ও। বরফ নামার জন্যে একটু ঢালু ছাদ, চারপাশ লম্বা লম্বা পাইন গাছ দিয়ে ভরতি। বড়ো বড়ো কাচের জানালার পাশাপাশি সব থেকে সুন্দর ব্যাপার হচ্ছে পেছনের ওপেন উইন্ডো থেকে সমুদ্র দেখা যায়। সম্রাট আজ সেখানেই ফিরেছে। স্টকহোমে আপাতত ওর কোনো কাজ নেই। তুহিনও এখানেই থাকে,ওর ছায়া সঙ্গি হয়ে। সুইডেনে তুহিন এসেছিল পনের বছর বয়সে,খালার কাছে। তারপর একদিন যে সম্রাটের লেজ ধরল,সেটা আর ছাড়েনি।
সম্রাট ভেতরে এসে গায়ের ওভারকোর্ট খুলল
লিভিংরুমের এক পাশে ফায়ারপ্লেস জ্বলছে। দেওয়ালে গিটারের শোপিচ ঝোলানো, একটা পাশ জুড়ে শুধু সম্রাটের এওয়ার্ডের ক্রেস্ট। গান,ডাক্তারি সব কিছু মিলিয়ে। রান্নাবান্নার জন্যে একজন পার্মানেন্ট শেফ আছেন এখানে,জোফেন। সাথে বেশ কজন মেইড সার্ভেন্ট। সম্রাট আসার আগে গোটা বাঙলো এক দফা চকচকে করে রেখেছে তারা। তুহিন নিজেও আস্তেধীরে সম্রাটের পাশে বসল। তার ভেতরটা উশখুশ করছে কিছু বলার আশায়। জোফেন এসে দাঁড়াল তখনই।
“ স্যাম,লাঞ্চ রেডি।”
“ পরে। তুহিন, যাও খেয়ে নাও।”
“ না বস। একসাথে।”
“ তাহলে তুমি যাও জোফেন। লাগলে ডেকে নেব।”
মাথা নেড়ে প্রস্থান নিলেন তিনি। সম্রাট দুটো পা সেন্টার টেবিলে তুলে বসল। বলল,
“ তুহিন নাউ আই নিড সেলিব্রেশন। উম, রবার্টের একটা গান বলো তো,গাই।”
তুহিন অসহায় মুখে বলল,
“ ওর গান আমি তেমন শুনিনি, বস। ইউটিউবে সার্চ করি?”
সম্রাট স্বায় দেয়। সাথে সাথে রিমোর্ট তুলে টেলিভিশন ছাড়ল সে। রবার্টের নাম লিখতেই হাজির হলো একের পর এক গান। বেছে বেছে একটা প্লে করল তুহিন। মিউজিকের সাথে কিছু সময় সম্রাট গুনগুন করল। হঠাৎ
চ সূচক শব্দ করে বলল,
“ স্যাড ফর হিম। একটা উজ্জ্বল প্রতিভা কেমন খসে গেল দেখলে?”
তুহিন মুখ শুকনো করে ঘাড় নাড়ল। দুহাতের তালু ঘষতে ঘষতে ইতস্তত বোধটা কাটাল কিছু।
পরপর ঠোঁট উলটে বলল,
“ বস, আপনি আজকাল আমাকে আগের মতো ভালোবাসেন না!”
“ আমি গে নই।”
হতভম্ব হয়ে মুখ তুলল ছেলেটা। মিনমিন করে বলল,
“ আমি বিশ্বাসের কথা বুঝিয়েছি।”
“ আচ্ছা?”
“ বস,রবার্ট…”
সম্রাট হাসল। কথা কেড়ে নিয়ে বলল,
“ রুমে চলো “
“ হ্যাঁ?”
“ আই সেইড আম নট গে,তুহিন। এসো।”
ভারি লজ্জা পেলো তুহিন। মাথা চুলকাতে চলকাতে চলল পেছনে। স্টকহোমের নর্দলিস গোরদেনে সম্রাটের কামড়া যেরকম? ঠিক একইরকম এখানেও। সেই একই বড়ো বুকশেল্ফ থেকে বিছানার পেছনের দেওয়ালের ওই ছোটো ছোটো কাচের বোতলগুলো অবধি একইভাবে সাজানো। হঠাৎ কেউ দুটো রুমে ঢুকলে গুলিয়ে ফেলবে কোনটা কোথায়!
সম্রাট আলো জ্বালাতেই ঘরের অন্ধকার পালাল। চারকোল গ্রে রঙের দেওয়ালগুলোয় ফ্যাকাশে প্রভা পড়ল কিছু।
তুহিন একটু কেমন কেমন করে চারপাশে চাইল। সম্রাটের ঘরে এলেই ওর ভয় ভয় করে। অজান্তেই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়।
সম্রাট হুট করেই বলল,
“ এসো, এইট বল পুল খেলি।”
“ এখন?”
“ একজন পাকা খেলোয়ার সময় দেখে না। লক্ষ্য দেখে। টেক্কা দিতে পারলে যা জানতে চাইছ বলব।”
তুহিনের মুখটা ঝলকে উঠল সবেগে। এগিয়ে এসে ত্রস্ত টেবিলের ওইপাশে দাঁড়াল।
একটা চারকোণা টেবিলে কয়েক রঙের বল ছড়ানো। আলাদা আলাদা নম্বর লেখা তাতে।
সম্রাট লম্বা কিউ স্টিকটা হাতে নিলো। সবুজ চোখের তীক্ষ্ণ নজর সাদা কিউ বলের দিকে। বিড়বিড় করে বলল,
“ আই হেইট হোয়াইট।”
“ বাট রিস্কি শট বস।”
সম্রাট হাসে,বিদ্রুপের একটা অল্প হাসি। স্টিকের দক্ষ ছোঁয়ায় কিউ বলটা ফেলে ত্রিভুজে সাজানো কয়েকটি বল ছড়িয়ে দেয় গোটা টেবিল জুড়ে।
তুহিন মন খারাপ করে বলল,
“ আমি জিতবও না, শোনাও হবে না।”
সম্রাট ফের হাসল। খেলায় ব্যস্ত থেকেই বলল,
“ ক্রিপথারের( ছদ্মনাম) নাম শুনেছ?”
“ ন-না বস৷ কী এটা?”
“ চারটে কেমিক্যাল মেশানো একটা ডেঞ্জার। রবার্টের খাবারে আমি ক্রিপথার মিশিয়ে দিয়েছিলাম।”
তুহিনের চোয়াল ঝুলে পড়ল। শ্বাস আটকে বলল,
“ হা-হাউ? এর মানে আমি ঠিক সন্দেহ করেছিলাম। রবার্ট এক্সিডেন্টে মরেনি?”
“ না।”
“ তাহলে, আপনি…”
“ আমি ওকে মারিনি, তুহিন।”
ছেলেটা গুলিয়ে গেল। গুলিয়ে গেল ওর সব কিছু। অথচ ওর হতভম্ব, হতবাক নজর দেখে সম্রাটের চোখদুটো বাজের মতো চকচক করে ওঠে। পৈশাচিক আনন্দ পায় সে। খুব ঠান্ডা গলায় বলে,
“ আমি রবার্টকে এমন একটা জায়গায় ঠেলে দিয়েছি,যেখানে ওর শরীর নিজেই নিজের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”
তুহিন বুঝল না। দ্বিগুণ কৌতূহল নিয়ে চেয়ে রইল। সম্রাট কণ্ঠ চেপে বলল,
“ আ হাই ডোজ অফ কেমিক্যাল। সোজা শ্বাসনালীতে যায়, ফুসফুস ফুলিয়ে রক্তনালী ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলে।”
তুহিন বাকরুদ্ধ,বিহ্বল। সম্রাট স্টিক দিয়ে টোকা দিলো ওর হাতে।
“ শট দাও।”
কিন্তু ছেলেটা নড়তে ভুলে গেল। চোখের পাতা ফেলতে পারল না। সম্রাট দেখল স্টিক ধরা হাতটা কাঁপছে ওর। ঠোঁট টেনে হাসল সে,
“ হাত কাঁপছে? এইটুকুতে?”
“ বস, বস রবার্টকে কেমিক্যালটা দিলো কে?”
“ টিপিক্যাল ব্রেইনলেস। আমি দিয়েছি।”
তুহিন হকচকিয়ে বলল,
“ হাঁ? ক-কখন! কীভাবে? আপনি তো আমার সাথেই ছিলেন। বস আমি পুরোটা শুনব প্লিজ। আপনি বিশ্বাস করতে পারবেন না এই চিন্তায় আমি দুদিন ঘুমাইনি।”
সম্রাট বলল,
“ আগে শট।”
তুহিন পড়ল বিপাকে। এই মন নিয়ে ও খেলবে কীভাবে? কোনোরকম স্টিক দিয়ে একটা বল ছুঁলো,কিউ বলটা সাথে সাথে পড়ে গেল পকেটে। কাচুমাচু মুখে চাইল সে।
সম্রাট ফোস করে শ্বাস ফেলে বলল,
“ তোমার খেলায় মনোযোগ নেই। আমি অমনোযোগী প্রতিপক্ষ পছন্দ করি না।”
ঘুরে এসে লাউঞ্জে বসল সম্রাট। জুতোয় হাত দিলো খুলতে। তুহিন ধড়ফড়িয়ে সামনে বসে বলল,
“ বস, প্লিজ এবারের মতো বলুন। আমি আজকেই এক ম্যাচ খেলব,আর জিতব। আই প্রমিস!”
“ প্রমিসের দরকার নেই। আমি তোমায় এমনিই বলতাম।”
তুহিনের চেহারায় আলো ফুটল।
সম্রাট পাশের সীট দেখাল – “ওপরে বসো।”
তুহিন মেঝে থেকে উঠে বসল সেথায়। সম্রাট পিঠ ছেড়ে দিলো লাউঞ্জের ফোমে। বলল,
“ রবার্টের ফুড এ্যাপ একাউন্ট স্যাল্মনকে দিয়ে হ্যাক করিয়েছিলাম। চেনো তো ওকে? আ পাওয়ার ফুল হ্যাকার।”
“ চিনি বস চিনি। এর আগেও তো আমাদের একটা কাজ করে দিয়েছিল।”
“ ইয়াপ। তারপর ওই একাউন্ট দিয়ে কিছু খাবার অর্ডার করে রবার্টের ঠিকানায় পাঠিয়েছিলাম। রবার্ট নিজের ফোন চেইক করে দেখেছে অর্ডার ওর এ্যাপ আইডি থেকে দেয়া। রিসিভ করল,খেলো,ব্যস মরে গেল।”
তুহিন কিছুই বুঝল না। সব ওর মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। খুব ব্যস্ত ভাবে বলল,
“ বস, তাহলে তো পোস্টমর্টেমে পয়জন পাওয়ার কথা। কিন্তু ফুনেরালে উনি যে বললেন..”
“ ডাফার,বললাম না এটা পয়জন হলেও পয়জন নয়? এটা শরীরে মেশে না। যে কোনো সাধারণ বিষ হলে সেটা পাকস্থলী থেকে রক্তে মিশে লিভারে গিয়ে জমা হয়। কিন্তু ক্রিপথার সাধারণ বিষ নয়। এটা একটা ভলাটাইল রিঅ্যাক্ট্যান্ট । এটা সোজা পাকস্থলীতে যাওয়ার পর শরীরের এসিডের সাথে মিশে যায়। একটা গ্যাস তৈরি করে যা সরাসরি শ্বাসনালী দিয়ে ফুসফুসে আক্রমণ করে। রক্তে এর কোনো অস্তিত্ব পাওয়ার আগেই কোষগুলো ধ্বংস হয়ে যায়। ফরেনসিক ল্যাবে ওরা মেটাবোলাইট খুঁজবে, কিন্তু পাবে শুধু একতাল দলা পাকানো ফুসফুস। যেটা দেখতে হুবহু অ্যালার্জিক শকের মতো। আর পার্থক্যটা সেখানেই।
পোস্টমর্টেমে ওরা খুঁজবে বিষ।
ওরা খুঁজবে শত্রু। কিন্তু ওরা পাবে শুধু ভাঙা গাড়ি, ভাঙা বুক, আর একটা রিপোর্ট- Cause of death: accident…..existing medical vulnerability….”
“ কিন্তু, যদি এক্সিডেন্ট না হতো? যদি ও ওইসময় রাস্তায় না বের হতো বস!”
“ তুহিন! স্যাম আঙুল চুষে বড়ো হয়নি। আর কেউ না জানলেও তোমার জানার কথা। আমি জানতাম ওর শো ছিল। তাই প্ল্যান আমি সেভাবেই সাজিয়েছি। তাছাড়াও যদি ওর এক্সিডেন্ট নাও হতো তাও কিচ্ছু পাওয়া যেত না। রবার্টের এলার্জিক হিস্টোরি আছে। আমি সেই হিস্টোরি বুঝেই কেমিক্যাল দিয়েছি। পোস্টমর্টেমে খুব বেশি হলে সিভিয়ার অ্যানাফিল্যাকটিক শক দেখাবে। আর তাছাড়া এই কেমিক্যালের রিয়াকশান শুরু হয়ই খাওয়ার দু ঘন্টা পর থেকে। এখন ও লাস্ট দু ঘন্টায় কী খেয়েছে, কোথায় খেয়েছে, কে বুঝবে? এত আগে হজম হওয়া খাবার থেকে তো কিছু নির্ণয় করা যাবে না, তুহিন। এটা যে মার্ডার, কারো বাপও বের করতে পারবে না। ”
তুহিন চোখ বিকট করে বলল,
“ বস, আপনি বের হলেন কখন?”
“ আমি বের হইনি।”
“ তাহলে এসব করলেন কখন?”
“ সব খেলায় মাঠে নামতে হয় না।”
সম্রাট নিজের চুলে হাত বোলায়। বলে,
“ রবার্টের জন্যে লিগ্যালি খাবার অর্ডার হয়েছিল। লিগ্যাল ওয়েতে খাবার এসেওছিল। কিন্তু একইসাথে ওই একই সিল ব্যবহার করা আরেকটা খাবার গোরদেন থেকে গিয়েছে। হোম মেড ফুড। শুধু বদল হয়েছে রবার্টের গেইটের গার্ডের হাতে গিয়ে। এই ছোট্ট কাজের জন্যে ও একটা মোটা এমাউন্ট পেয়েছে, তুহিন। যদিও আমি নিজে ওর সাথে লেনদেন করিনি। করেছে স্যালমন।”
তুহিন নির্বাক হয়ে বসে রইল কতক্ষণ। ওর স্তম্ভিত চেহারা দেখে বাঁকা হাসল সম্রাট। তুহিনের চোখ থেকে চশমাটা খুলে এনে নিজের চোখে পড়ল।
ভ্রু নাঁচিয়ে বলল,
“ বলেছিলাম না, অন্যভাবে খেলব?”
হঠাৎ দরজার বাইরে একটা ঘেউঘেউ শব্দ শোনা গেল। উচ্ছ্বল চিত্তে উঠে গেল সম্রাট। দরজা খুলতেই একজন ভদ্রলোক মাথা নুইয়ে সম্মান জানালেন। থমাসের শিকল তার হাতে।
সম্রাটকে দেখেই লাফ-ঝাঁপ দিয়ে ও কোলে উঠতে চাইল। খুব আদরে তুললও সে। ভদ্রলোক বললেন,
“ মিস্টার নাভেদ প্রথমে দিতে চাননি। পরে আপনার কথা বলায় ছাড়লেন।”
“ ওখেই, যাও তুমি।”
লোকটা যেতেই দোর আটকে পিছু ফিরল সম্রাট। দেখল তুহিন একইরকম হাঁ করে চেয়ে। ও আঙুল দিয়ে দেখাল,
“ ঐ টিপক্যাল গাধাটাকে দেখো থমাস।
ও যে কী করে আমার ম্যানেজার হল!
তুহিন তখনও ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। একটা মানুষ ঘর থেকে বের হলো না। কাউকে ছুঁলো না,ধরল না। তাতেই আরেকটা মানুষ খুন হয়ে গেল? সম্রাট থমাসকে কোলে নিয়ে ওর পাশে বসে। গায়ে হাত বুলায়। ফিসফিস করে বলে,
“ ইউ নো থমাস,
আমি কাউকে মারি না,
খুন করি না,
আমি শুধু পরিকল্পনা করি,
তাতেই ওদের বাঁচার রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়!”
**
সন্ধ্যে নামছে। আকাশে মেঘের আনাগোণা কমছে তাও। সম্রাট একটা লম্বা ঘুম শেষ করে উঠল সবে। বেড সাইড টেবিল হতে টেলিফোনের রিসিভার তুলে বলল – সেন্ড আ কফি।”
কফি হাজির দিলো মিনিট সাতের মাথায়। মেইড যেমন মাথা নিচু করে এলেন তেমনই বেরিয়ে গেলেন আবার।
সম্রাট দরজা আটকাল।
কফি শেষ করল অদূরের সমুদ্রের পাড় হতে ছুটে আসা হাওয়া গায়ে মেখে। একটা উন্মুক্ত, পেটানো শরীর ঢাকার প্রয়োজন পড়ল এবার।
এসে স্বীয় বিশাল কাঠের কাবার্ডটা খুলল সে। খুব অদ্ভুত ব্যাপার, ওর গোটা কাবার্ডে কোনো সাদা রঙের জামাকাপড় নেই। বেশিরভাগ কালো,নাহয় চকলেট ব্রাউন দিয়ে ভরা। এর মধ্যে থেকে একটা শার্ট নিয়ে পরল সম্রাট। হঠাৎ কী ভেবে ঘাড় ভেঙে তাকাল ঘরের ডান পাশের দেওয়ালের দিকে। পরপর এক পল পেছন ফিরে দেখল বাইরের দিকটা।
টেবিলের ড্রয়ার খুলে দুটো গ্লাভস আর মাস্ক বের করল। পরল নিজেই। দেওয়ালের কোনো একটা সুইচ টিপতেই আরামসে সে দেওয়াল সরে একটা ধাতব দরজা বেরিয়ে এলো অমনি। মাঝে খুব চিকণ ছোট্ট লকের মতো জায়গা। সম্রাট গলার চেইন থেকে চাবিটা খুলে আনে। ঢোকায় সেই লকের জায়গায়। সঙ্গে সঙ্গে দুভাগ হওয়ার মতো ফাঁকা হয়ে খুলে যায় দোর। সম্রাট ফের এক পল ওর ঘরের বন্ধ সদর দরজায় দেখল। ভীষণ সতর্ক ভাব মুখে। এরপর খুব ধীরে ঢুকল সেই গুপ্ত ঘরের অন্দরে। যা কেউ দেখল না,কেউ জানলোও না আজও।
তুহিন অনেকক্ষণ যাবত দাঁড়িয়ে আছে। দুবার টোকাও দিয়েছে দরজায়। বেশ কিন্তু সময় পর সম্রাট ভেতর থেকে বলল – “ এসো।”
ঢুকল ও। জিজ্ঞেস করল হাসিহাসি মুখে,
“ ডেকেছিলেন বস?”
সম্রাট ওর পরিপাটি বেশে নজর বুলিয়ে বলল,
“ কোথাও যাচ্ছো?”
“ হ্যাঁ মানে, না।”
পরপর তুহিন ঠোঁট টিপল। আসলে বের হচ্ছিল ও। খুব গুরুত্বপূর্ণ, আর গোপন একটা কাজে। এক সুইডিশ মেয়ের খোঁজ নিতে যাচ্ছে সে। যে মেয়েকে দেখার পর তুহিনের আর কিছুই ভালো লাগছে না। সম্রাটের ক্ষুরধার চোখে ধরা পড়ল ছেলেটার খুশখুশে ভাব। স্থুল স্বরে বলল,
“ সত্যিটা বলো । কোনো মেয়ের কাছে যাচ্ছ? ইজ ইট এবাউট ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড?”
“ নো নো বস,
ওসব না। একটু স্টকহোমে যেতাম।”
সম্রাটের ভ্রু-দুটো বেঁকে গেল অমনি। শান্ত নজর নামিয়ে এক পল চাইল স্বীয় কব্জির দিকে। সেই কামড়,সেই দাগ। সহসা
ঠোঁট কামড়ে কিছু একটা ভেবে বলল,
“ দেন লেটস গো টুগেইদার৷”
সাতটা বাজে। সুইডেনের সেই ছোট্ট ক্যাফেটা শীতেল আলোয় নরম হয়ে আছে। জানলার কাচ বেয়ে নামা বরফ ঠান্ডা রাতের রেখা,কফি মেশিনের ধোঁয়া আর ভ্যানিলা দারোচিনির গন্ধে ভরা বাতাস। আজ আহামরি ভিড় নেই। কুহু অর্ডার নিচ্ছিল। গলায় ঝুলন্ত নেমপ্লেট,পরনে ফুল হাতা টি শার্ট,চুলগুলো খুব গুছিয়ে পনিটেল করা। চোখেমুখে ক্লান্তি, অথচ ঠোঁটের কোণে চমৎকার অভ্যাসি হাসি।
বেশ কিছু আইটেমের অর্ডার পড়েছে। কুহু স্লিপের কাগজ সমেত কিচেনে গেল জানাতে। ঠিক তারপর-পরই গেইটের সামনে এসে ভিড়ল একটা ডার্ক চকলেট ব্রাউন মার্সেডিজ।
মুহুর্তে একজন নেমে দরজা খুলে দিলো। সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে নামল কুচকুচে কালো রঙের স্বাস্থ্যবান থমাস। লেজ নাড়তে নাড়তে পিছু ফিরে দেখল গাড়ির ভেতরে। ওভার কোর্ট পরা তার সুদর্শন মালিক নামল এরপরে। মুখে কালো মাস্ক,হেডক্যাপ দিয়ে ভ্রু অবধি ঢাকা। সানগ্লাসের আড়ালে সবুজ দুটো চোখ।
তুহিন,আর সাথে ছয়জন দেহরক্ষি নিয়ে ক্যাফের ভেতরে ঢুকল সম্রাট। সবার নজর এক পল আপনা-আপনি এদিকেই পড়ল। পরপর যে যার মতো ব্যস্ত হলো আবার।
ম্যানেজার লুকাস চেয়ে রইলেন। খুব দামি কাস্টমার নিশ্চয়ই! নিজে এগিয়ে এলেন দু পা। সম্রাট ঠিক সামনে থামে। রক্ষিরা বাইরে দাঁড়িয়ে রয়। তুহিন থমাসের শিকলটা ধরে রাখে হাতে।
ম্যানেজার হেসে বললেন,
“ হ্যাভ আ সীট প্লিজ।”
সম্রাট সানগ্লাস খুলল। গোলকধাঁধার মতো চোখদুটো মুক্ত হলো সাথে। নিষ্পৃহ চিত্তে বলল,
“ স্যাম!”
বিস্ময়ে যেন আকাশ থেকে ছিটকে পড়লেন ভদ্রলোক। চোখদুটো শৃঙ্গ ছাপিয়ে গেল। এই ছোট্ট ক্যাফেতে স্বয়ং রকস্টার স্যাম? অবাক হয়ে বললেন,
“ স্যায়ায়াম,মাই গুডনেস!”
সম্রাট কণ্ঠ চেপে বলল,
“ ডোন্ট মেক নয়েজ।” তারপর ওনার ঘাড় ছাপিয়ে একবার ক্যাফেতে চোখ বুলিয়ে বলল,
“ দশ মিনিটের মধ্যে পুরো ক্যাফে খালি করুন।”
লুকাস হতভম্ব হলেন,
“ জি,মানে ক-কেন?”
পাশ থেকে তুহিন বলল,
“ একচুয়েলি বস ক্যাফেটা বুক করতে চাইছেন। কম্ফোর্টের ব্যাপার আছে। আপনি ভাববেন না,আমরা আপনাকে একটা ভালো এমাউন্ট দেবো।”
“ নিশ- নিশ্চয়ই। আমি এক্ষুনি কথা বলছি! আপনি প্লিজ এদিকটায় বসুন। প্লিজ স্যাম।”
সম্রাট ফের সানগ্লাসটা চোখে পরল।
এগিয়ে এলো। ম্যানেজার নিজে চেয়ার ঝেরে দিলেন। বসল সে। তুহিন বসের পাশে বসতে চাইল,পূর্বেই সেই চেয়ারে লাফ দিয়ে উঠে পড়ল থমাস। মেজাজটা চটে গেল ওর। থমাস বিজয়ীর চোখে চেয়ে লেজ নাড়ল অমনি। তুহিন আরো বিরক্ত হলো। ভয়াবহ রেগে বিড়বিড় করল,
“ শালা কুত্তারবাচ্চা!”
লুকাস প্রতিটা টেবিলে গিয়ে জানালেন,একটা সমস্যার কারণে এক্ষুনি ক্যাফে বন্ধ হবে। যার যার বিল ফেরতও দিলেন তাকে। কেউ বিরক্ত হলো,কেউ চলল আপোষে। দশ মিনিটের আগেই চোখের পলকে ক্যাফে ফাঁকা হয়ে গেল। লুকাস এসে বললেন,
“ মিস্টার স্যাম,ক্যাফে খালি হয়েছে। নাউ এঞ্জয় ইয়রসেল্ফ।”
সম্রাটের বা হাত থমাসের গায়ের কালো পশমে। ওভাবে হাত বুলাতে বুলাতে বাঁকা হাসল সে।।
“ কিয়ু,আমি কিন্তু টিকিট কাটতে এসেছি। আমরা তাহলে আজ মুভিটা দেখতে যাচ্ছিই যাচ্ছি।”
কুহু আলোর মতো হাসল।
“ হ্যাঁ। আমি বের হয়ে তোমাকে ফোন করব।”
মেহেক বলল,
“ শোনো আটটার টিকিট কাটি? তুমি নাহয় আগেই বের হলে।”
“ আমার ছুটি নটায় যে।”
“ হ্যাঁ তো আমি নাহয় লুকাসকে ফোন করে বলে দি…”
কুহু মাঝপথেই বলল,
“ না মেহেক,সেটা ভালো দেখায় না। উনি তোমার পরিচিত,হয়ত তুমি বললে আমাকে যেতেও দেবে,কিন্তু আমি এই ফেবর নিতে পারি না। আমি এখানে বাকিদের মতোই চাকরি করি,আমাকেও সবার মতো নিয়ম মেনে চলে উচিত।”
মেহেক বুক ফুলিয়ে হাসল,
“ আচ্ছা বাবা বেশ। বলব না। তুমি তাহলে….”
কুহুর পুরো কথা শোনা হলো না। এর মাঝেই
জেনিফার খুব দ্রুত ছুটে এসে কিচেনে দাঁড়াল। ফিসফিস করে চ্যাঁচাল,
“ গাইস স্যাম এসছে,রকস্টার স্যাম এসছে ক্যাফেতে।”
চকিতে ফিরে চাইল মেয়েটা। একজন বললেন,
“ ওয়াও! তাহলে তো আমাদের ক্যাফে এবার দারুণ ভাবে হাইলাইটস হবে।”
কুহু লাইন কেটে দেয়। উদ্বেগী পায়ে এসে দাঁড়াল সবার মাঝে। আশ্চর্য হয়ে বলল,
“ কিন্তু এই লোক এখানে কেন এলো?”
“ কী বলছো কিয়ু,এটা তো আমাদের জন্যেই ভালো হয়েছে। মিস্টার লুকাস বলেছে সব ধরণের খাতির-যত্ন করতে। স্যাম যদি আমাদের ক্যাফে নিয়ে ভালো রিভিউ দেয়,আমাদের কত লাভ হবে বুঝতে পারছো না? ক্রাউড বাড়বে,ক্যাফে বড়ো হবে আমাদের স্যালারিও বাড়বে কিয়ু।”
সবাই চাপা আনন্দে হইহই করল। কিন্তু কুহুর ভেতরটা টলমল করে উঠল এক আশঙ্কার তোড়ে। কোনোভাবে ও কাল কামড় দেয়াতে, লোকটা আবার শোধ নিতে আসেনি তো? তক্ষুনি লুকাস ডাকলেন। সার্ভিসের জন্যে দায়িত্বরত যারা সবাইকেই বললেন বাইরে আসতে।
জেনিফার হাত ধরে টানল,
“ কী হলো কিয়ু,এসো।”
কুহু ঠোঁটে মেকি হাসি ঝোলায়। মনের শঙ্কা ঠেসে পা মেলায় সবার সাথে। সম্রাট দুটো টেবিল একা নিয়ে বসেছে। সামনের চেয়ারে পা-জোড়া ক্রস করে তোলা। হেড ক্যাপটা পড়ে আছে টেবিলে। বাকি পাশের চেয়ারে লেজ গুটিয়ে বসেছে থমাস। তুহিন খিটমিট করে ওকেই দেখছিল।
এই ক্যাফেতে ফুড সার্ভিসে মোট সাতজন কাজ করে। তিনটে ছেলে চারজন মেয়ে। সবাই একে একে হাই হ্যালো করে সম্রাটের সামনে এসে দাঁড়াল। একবার একবার করে প্রত্যেককে দেখল সে। শেষে সবুজ চোখজোড়া গিয়ে বর্তাল ওই কাঙ্খিত জিনিসে। একদম কোণে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কুহু। কপালে দুটো ভাঁজ। নাক চোখ গোটানো। বিরক্ত খুব!
সম্রাট বলল,
“ মিস্টার লুকাস,আপনার ক্যাফে বন্ধ হয় কটায়?”
“ এই নটা নাগাদ।”
“ এক কাজ করুন। আপনি এদের সবাইকে ছুটি দিয়ে দিন।”
লুকাস অবাক হলেন একটু। বাকিরাও তাই। কিন্তু বিস্ময় ছাপিয়ে গেল খুশির তীব্রতায়। কুহু নিজেও স্বস্তি পেলো।
মনে মনে ভাবল – বাঁচলাম।
তক্ষুনি একটা আঙুল ওর দিকে তাক করল সম্রাট। বলল ধীর স্বরে-
“ ইক্সেপ্ট দিস গার্ল।”
চমকে মুখ তুলল কুহু। বাকিদের দৃষ্টিও ঝট করে তার ওপর পড়ল সেই সাথে। কুহুর হতবাক চাউনি দেখে নীরব-নিষ্প্রভ উল্লাসে তলিয়ে গেল সম্রাট। ঠোঁটের কোন তুলে হাসল সে।
দৃষ্টিতে জ্বলন্ত কৌতুক নিয়ে বলল,
“ মিকি মাউস,আজ দেখব তুমি কত কামড়াতে পারো।”
চলবে..।
( ওপরে খু*নের বর্ণনা কাল্পনিক। এর সাথে বাস্তব ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই।)
Share On:
TAGS: নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি, হেই সুইটহার্ট
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২০
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৭খ
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৯
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১০
-
সমুদ্রকথন পর্ব ১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৪ খ
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৯
-
হেই সুইটহার্ট পর্ব ৪
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩
-
হেই সুইটহার্ট পর্ব ৩