নির্লজ্জ_ভালোবাসা
লেখিকাসুমিচৌধুরী
পর্ব ৮৩ (❌কপি করা নিষিদ্ধ❌)
[যারা কালো ডায়েরি পেইজে গল্প পড়ছেন তাদের কে বলছি ওইটা ফেক পেইজ আসল লেখিকার পেইজ নাম সুমি চৌধুরী যদি শিক্ষিত হোন গাদা না হয়ে বুদ্ধিমতি হোন তাহলে ফেক পেইজে না পড়ে আসল গল্প পড়ার জন্য সুমি চৌধুরী লেখিকার পেইজে আসেন। আর যদি না আসেন তাহলে ফেক পেইজে ফেক গল্প পড়ে ঘোড়ার ডিম পাড়েন বসে বসে]
রৌশনি খান রৌদ্র-তুরার রুমেই শুয়ে ছিলেন। সারা দিনের ক্লান্তিতে একটু ঘুমের কারণে চোখ লেগে গিয়েছিল তাঁর। কিন্তু হঠাৎ তুরার গগনবিদারী আর্তনাদে রৌশনি খান ঘুমের ঘোর থেকেই চমকে ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়লেন। তিনি বিছানায় তুরাকে না পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে এদিক-ওদিক খুঁজতে লাগলেন। তারপর রুমে না পেয়ে দ্রুত ব্যালকনিতে এসে দেখেন তুরা মেঝেতে শুয়ে পেট আঁকড়ে ধরে চিৎকার করছে। আর তুরার চারপাশ ঘিরে মেঝেতে রক্ত আর পানি গড়িয়ে পড়ছে। মুহূর্তে রৌশনি খানের পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। তিনি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে তুরাকে জাপটে ধরে চিৎকার করে উঠলেন।
“তুরা। এ কিভাবে হলো এত বড় সর্বনাশ হ্যাঁ।”
তুরা যন্ত্রণায় ঠিকমতো কথা বলতে পারছে না সে বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে। রৌশনি খানের দিকে ঝাপসা চোখে তাকিয়ে সে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে বলল।
“আম্মু… বাচ্চা ভেতরে নড়ছে… খুব লাথি দিচ্ছে আম্মু… আমি আর পারছি না।”
রৌশনি খানের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন তুরার পেটের ভেতরেই তার স্থুলি ভেঙে গিয়েছে। হঠাৎ তাঁর নজর গেল তুরার পাশে পড়ে থাকা ফোনটার দিকে। তিনি কাঁপাকাঁপা হাতে ফোনটা তুলে নিলেন এবং এক হাত দিয়ে তুরাকে শক্ত করে ধরে অন্য হাতে রৌদ্রকে কল দিলেন।
অন্যদিকে রৌদ্র মাত্র হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে বাড়ির দিকে আসছিল। সে তখন মাঝরাস্তায়। হঠাৎ ফোন বেজে উঠলে স্ক্রিনে ‘হার্টবিট’ লেখা দেখে রৌদ্রের মুখে এক চিলতে মুচকি হাসি ফুটল। সে ভাবল তুরা নিশ্চয়ই সে কখন ফিরবে তা জানার জন্য কল দিয়েছে। রৌদ্র এক হাত দিয়ে স্টিয়ারিং ধরে অন্য হাতে ফোনটা কানে ঠেকিয়ে হাসি মুখে কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই ওপাশ থেকে রৌশনি খানের হুহু করে কান্নার শব্দ ভেসে এল। রৌশনি খান আর্তনাদ করে বললেন।
“রৌদ্র বাবা। সর্বনাশ হয়ে গেছে রে। তুরার সর্বনাশ হয়েছে। তুই তাড়াতাড়ি বাড়ি আয় বাবা এখন হাসপাতালে না নিলে অনেক বড় অঘটন ঘটে যাবে রে রৌদ্র।”
জাস্ট এই কথাটুকুই যেন রৌদ্রের হুশ-জ্ঞান সব কেড়ে নিল। তার শরীরের রক্ত যেন এক মুহূর্তে হিম হয়ে গেল। রৌদ্র রাস্তার মাঝখানেই সজোরে গাড়ির ব্রেক কষল। তার হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল। সে এমন এক জায়গায় গাড়ি থামিয়েছে যে আশেপাশে অন্য গাড়িগুলো আটকে পড়েছে তারা অনবরত হর্ন দিচ্ছে আর চেঁচাচ্ছে। সেই হর্ন আর মানুষের চিৎকার শুনে রৌদ্রের যেন হঠাৎ হুশ ফিরল। মায়ের কথাগুলো কানে বাজতেই সে পাগলের মতো হয়ে গেল। গাড়ির যা স্পিড আছে একদম ফুল দিয়ে সে ঝড়ের বেগে বাড়ির দিকে ছুটল। রৌদ্রের গাড়ি যেন রাস্তায় চলছে না হাওয়ায় উড়ছে। রাস্তার কেউ তার গাড়িটা দেখার মতো সুযোগও পাচ্ছে না এতই দ্রুতগতিতে সে এগোচ্ছে কেউ দেখার মতো সুযোগই পাচ্ছে না।
রৌদ্র বাড়ির সামনে এসে ঝড়ের বেগে গাড়ি থামাল। ব্রেকের শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল। সে পাগলের মতো গাড়ি থেকে নেমে এক দৌড়ে রুমে গিয়ে ঢুকল। কিন্তু বিছানায় তুরাকে না পেয়ে তার বুকটা ধক করে উঠল। ঠিক তখনই ব্যালকনি থেকে ভেসে আসা তুরার সেই বুকফাটা আর্তনাদ শুনে রৌদ্র উন্মাদের মতো সেদিকে ছুটে গেল।
ব্যালকনিতে এসে রৌদ্রের চোখের সামনে যা ভেসে উঠল তা দেখার জন্য সে মানসিকভাবে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। সে দেখল রৌশনি খান তুরাকে জড়িয়ে ধরে আছেন আর তুরা যন্ত্রণায় লুটিয়ে পড়ে চিৎকার করছে। চারপাশ রক্তে ভেসে যাচ্ছে। যেন এক বিভীষিকাময় রক্তের বন্যা বয়ে যাচ্ছে মেঝেতে। রৌদ্রের পা কাঁপতে লাগল সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে তুরার পাশে আছড়ে পড়ল। তুরাকে একপাশ থেকে জড়িয়ে ধরে সে আকাশ ফাটানো আর্তনাদ করে উঠল।
“ইয়া আল্লাহ। কখন হলো এসব? কী করে হলো আল্লাহ? তুমি কি এসব দেখো নাই? আল্লাহ তুমি কোথায় ছিলে? কেন এই বিপদ আসতে দিলে তুমি।”
ছেলের এই অবস্থা দেখে রৌশনি খান নিজের কান্না চেপে ধরে ধমক দিয়ে বললেন।
“রৌদ্র। এখন এসব কথা বলার সময় নেই। পাগলামি করিস না তাড়াতাড়ি তুরাকে গাড়িতে তোল। এক এক সেকেন্ড এখন দামী।”
মায়ের কথায় রৌদ্রের যেন সম্বিত ফিরল। সে কোনো কথা না বলে মুহূর্তেই তুরাকে পাঁজাকোলে তুলে নিল। তুরার শরীর থেকে ঝরতে থাকা তাজা রক্তে রৌদ্রের সাদা শার্ট আর হাত ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছে কিন্তু তার সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে তুরাকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে এক প্রকার দৌড়ে নিচে নেমে এল।
গাড়ির পেছনের সিটে তুরাকে খুব সাবধানে বসিয়ে দিল সে। রৌশনি খান তড়িঘড়ি করে তুরার পাশে বসে তাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন। রৌদ্র ড্রাইভিং সিটে বসে দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। সে স্টিয়ারিং এমনভাবে চেপে ধরেছে যে তার হাতের রগগুলো ফুলে উঠেছে। রৌদ্র গাড়ির ফুল স্পিড দিয়ে পাগলের মতো ড্রাইভ করতে লাগল। পেছনের সিট থেকে তুরার প্রতিটি আর্তনাদ আর গোঙানি যখন রৌদ্রের কানে আসছে তখন তার মনে হচ্ছে কেউ জীবন্ত তার কলিজাটা ছিঁড়ে ফেলছে। প্রতিটা সেকেন্ড যেন এক একটা যুগের মতো কাটছে তার কাছে। রৌদ্র মনে মনে শুধু আল্লাহকে ডাকছে আর ঝড়ের গতিতে হাসপাতালের দিকে এগোচ্ছে।
হাসপাতালের সামনে রৌদ্রের গাড়িটা এক বিকট শব্দে ব্রেক কষে থামল। গাড়ি থামানোর আগেই রৌদ্র চিৎকার করে সাহায্য চাইতে লাগল। পরিস্থিতি দেখে নার্সরা এক মুহূর্ত দেরি না করে দ্রুত স্ট্রেচার নিয়ে দৌড়ে এলেন। তুরাকে গাড়ি থেকে বের করে স্ট্রেচারে শোওয়ানো মাত্রই দুজন নার্স তাকে নিয়ে হাসপাতালের ভেতরে ছুটতে শুরু করলেন।
রৌদ্র উন্মাদের মতো স্ট্রেচারের সাথে পাল্লা দিয়ে দৌড়াচ্ছে। হাসপাতালের করিডোর দিয়ে যখন তুরাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন সেখানে অপেক্ষারত আনোয়ার খান আশিক খান এবং পরিবারের বাকি সদস্যরা এই দৃশ্য দেখে যেন জীবন্ত পাথরে পরিণত হলেন। একটু আগেই তারা তিথির যমজ সন্তানের সুখবর আর তিথির জীবন-মৃত্যুর খবর নিয়ে লড়াই করছিলেন তার মাঝেই তুরার এই রক্তাক্ত অবস্থা দেখে তারা যেন কোনো এক দুঃস্বপ্ন দেখছেন বলে মনে হলো। রৌদ্র তুরার বরফ শীতল হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল।
“আমার কলিজা। কিছু হবে না তোমার কিচ্ছু হতে দেব না আমি। এই তো আমরা হাসপাতালে এসে পড়েছি। তুমি শুধু একটু সাহস রাখো তুরা প্লিজ চোখ বোজো না।”
ঠিক সেই মুহূর্তে ডিউটি ডাক্তার করিডোরেই তুরাকে পরীক্ষা করতে শুরু করলেন। তুরার শরীরের অবস্থা এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ দেখে ডাক্তারের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। তিনি গম্ভীর মুখে নার্সদের নির্দেশ দিতে দিতে বললেন।
“ওহ শিট। কন্ডিশন ইজ এক্সট্রিমলি ক্রিটিক্যাল। পেশেন্টের পালস রেট খুব দ্রুত পড়ে যাচ্ছে আর ইন্টারনাল হেমোরেজ হওয়ার চান্স খুব বেশি। প্রচুর ব্লাড লস হয়েছে অলরেডি। জাস্ট গেট হার ইনটু দ্য ওটি ইমিডিয়েটলি। এক সেকেন্ড দেরি করা যাবে না শি ইজ লুজিং হার কনশাসনেস। বাচ্চা এবং মা দুজনেই খুব বড় বিপদে আছে।”
ডাক্তারের কথাগুলো রৌদ্রের কানে তপ্ত সীসার মতো লাগল। নার্সরা যখন তুরাকে নিয়ে অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে ঢুকতে যাচ্ছে ঠিক সেই মুহূর্তে তুরা তার সমস্ত শক্তি এক করে রৌদ্রের হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। তার চোখে জল আর ঠোঁটে এক মরণজয়ী আকুতি। সে রৌদ্রের চোখের দিকে তাকিয়ে কাঁপাকাঁপা স্বরে বলল।
“রৌদ্র শোনো। আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি। জন্ম-মৃত্যু সব তো আল্লাহর হাতে লেখা। কিন্তু আজ যদি এমন কোনো মুহূর্ত আসে যেখানে তোমাকে বেছে নিতে হয় যে মা কিংবা বাচ্চার মধ্যে যে কোনো একজনকে বাঁচাতে হবে। তাহলে রৌদ্র তুমি দোহাই লাগে আমাদের বাচ্চাটাকে বাঁচিও। ও যেন এই পৃথিবীটা দেখতে পায়। আমার এই শেষ অনুরোধটুকু রেখো রৌদ্র। তুমি যদি ওকে না বাঁচিয়ে আমাকে বেছে নাও তবে আমি তোমাকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারব না। আমার শেষ চিহ্নটাকে তুমি আগলে রেখো।”
তুরার প্রতিটি শব্দ রৌদ্রের বুকে যেন ফুটন্ত সিসার মতো বিঁধল। রৌদ্রের মনে হলো তার কলিজাটা কেউ জীবন্ত উপড়ে ফেলছে। সে আর্তনাদ করে তুরার হাত দুটো নিজের গালের সাথে চেপে ধরে বলল।
“পাখি। খবরদার এসব কথা একদম মুখে আনবে না। আমি তোমার কোনো কথা শুনব না। আমি তোমার জন্য এখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করব তোমাকে ফিরে আসতেই হবে। তুমি না থাকলে আমি এই পৃথিবীতে এক মুহূর্তও শ্বাস নিতে পারব না রে পাখি। আমি পাগল হয়ে যাব আমি শেষ হয়ে যাব। আমাদের বাচ্চার জন্য নয় শুধু আমার জন্য তোমাকে ফিরে আসতে হবে… শুধু আমার জন্য।”
রৌদ্রের কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই নার্সরা সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে দেখে দ্রুত তুরাকে অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে টেনে নিয়ে গেলেন। স্ট্রেচারটা যখন ওটির দরজার ওপারে হারিয়ে যাচ্ছে তখন তুরা করিডোরে প্রতিধ্বনিত শেষ চিৎকার দিয়ে বলল।
“আই লাভ ইউ রৌদ্র। আই লাভ ইউ সো মাচ।”
ভারি দরজাটা শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেল আর ওটির ওপরের লাল আলোটা জ্বলে উঠল। রৌদ্র দরজার ওপারেই নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো তার অর্ধেক প্রাণ ওই দরজার ওপারে চলে গেছে। সে দেয়ালে মাথা ঠুকে ডুকরে কেঁদে উঠল।
করিডোরের থমথমে পরিবেশে রৌশনি খানের কাছ থেকে সবাই তুরার দুর্ঘটনার বিস্তারিত শুনল মুহূর্তে পুরো জায়গাটা শ্মশানের মতো স্তব্ধ হয়ে গেল। কেউ যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না যে একই রাতে একই হাসপাতালে দুই বোন জীবনের শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। আশিক খান আর তনুজা খান নিজেদের সামলাতে পারলেন না। তনুজা খান আর্তনাদ করে ফ্লোরে বসে পড়লেন। আশিক খান ডুকরে কেঁদে উঠে বলতে লাগলেন।
“আল্লাহ। এ কোন পরীক্ষায় ফেললে আমাদের? দুই মেয়েকে একসাথে আগুনের মুখে ফেলে দিলে? আমাদের কলিজা যে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।”
রৌদ্র তখন ওটির দরজার সাথে মাথা ঠেকিয়ে নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল। তার সারা শরীর কাঁপছে। শিহাব নিজের চোখের জল মুছে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। সে রৌদ্রের কাঁধে হাত রাখতেই রৌদ্র চমকে দেয়াল থেকে মাথা তুলল। শিহাবের করুণ মুখটা দেখামাত্রই রৌদ্রের সব বাঁধ ভেঙে গেল। সে পাগলের মতো শিহাবকে জড়িয়ে ধরে বাচ্চাদের মতো ডুকরে কেঁদে উঠল।
“শিহাব। বল না রে এসব কী হচ্ছে আমার সাথে? আমি তো নিজের চোখে সন্ধ্যায় দেখলাম তুরা একদম সুস্থ। কিছুখন আগেও ফোনে আমার সাথে কথা বলল। তাহলে হঠাৎ কী এমন হলো যে আমার সাজানো পৃথিবীটা এভাবে তছনছ হয়ে যাচ্ছে? কেন এমন হলো রে শিহাব কেন?”
রৌদ্রের কান্নায় করিডোরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। সে শিহাবের শার্ট খামচে ধরে হাহাকার করে বলতে লাগল।
“আমি আর নিতে পারছি না রে। আমার দম আটকে আসছে মনে হচ্ছে বুকটা ফেটে রক্ত বের হয়ে যাবে। তুরা যাওয়ার সময় ওসব কী বলে গেল? ও কি আর ফিরবে না? তুরার যদি কিছু হয়ে যায় আমি এক মুহূর্তও বাঁচবো না রে। আমি পাগল হয়ে যাব। ও ছাড়া আমার যে কেউ নেই কিচ্ছু নেই। সব শূন্য আমার কাছে ও ছাড়া। ও না আসলে আমিও শেষ হয়ে যাবো ও আমার নিশ্বাস যদি ওই নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যায় তাহলে তো নিশ্বাস ছাড়া আমিও শেষ হয়ে যাবো।”
শিহাব রৌদ্রের পিঠে পরম মমতায় হাত বুলাতে লাগল। রৌদ্রের এই বিধ্বস্ত রূপ সে আগে কখনও দেখেনি। পাথরের মতো শক্ত মানুষটা আজ খড়কুটোর মতো ভেঙে পড়েছে। শিহাব রৌদ্রকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে সান্ত্বনা দিয়ে বলল।
“শান্ত হ রৌদ্র নিজেকে এভাবে শেষ করিস না। ভেঙে পড়িস না ভাই। বিপদ যেহেতু এসেছে তবে জানবি সেই বিপদ কাটানোর মালিকও আল্লাহ। আল্লাহকে ডাক তাঁর ওপর ভরসা রাখ দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। তুই যদি এখন এভাবে ভেঙে পড়িস তবে বাকিদের কে সামলাবে? নিজেকে একটু শক্ত কর রৌদ্র একটু শক্ত হ।”
রৌদ্রের কান্না যেন বাঁধ মানছে না। তার দুচোখ দিয়ে অঝোরে জল নামছে। পরিবারের ছোট-বড় সবাই স্তম্ভিত হয়ে রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা রৌদ্রকে ছোটবেলা থেকে দেখেছে ভীষণ গম্ভীর শান্ত আর সাহসী এক যুবক। বড় হওয়ার পর পরিবারের কেউ কখনও রৌদ্রের চোখে জল দেখেনি। সেই রৌদ্র আজ হাসপাতালের করিডোরে সবার সামনে ডুকরে কাঁদছে যা দেখে উপস্থিত সবার বুক ফেটে যাচ্ছে।
হঠাৎ অপারেশন থিয়েটারের ভেতর থেকে তুরার তীব্র এক আর্তনাদ করিডোরে প্রতিধ্বনিত হয়ে এল। সেই চিৎকারে যেন অপারেশন থিয়েটারের দেয়ালগুলোও কেঁপে উঠল। যন্ত্রণায় তুরা যখনই চিৎকার করে উঠছে রৌদ্রের কান্নার বেগ ততগুণ বেড়ে যাচ্ছে। সে দুই কানে হাত চেপে ফ্লোরে মাথা ঠেকিয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠল।
“আহহহহ। তুরা। সইতে পারছি না রে… আল্লাহ ওর সব কষ্ট আমাকে দিয়ে দাও। তুমি ওকে আর কষ্ট দিও না আল্লাহ। তুরাআআ।”
রৌদ্রের প্রতিটি আর্তনাদে যেন হাসপাতালের বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। রৌশনি খান নিজের চোখের জল মুছতে মুছতে ছেলের পাশে এসে বসলেন। রৌদ্র মায়ের কোলের ওপর মাথা রেখে আছড়ে পড়ে বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল।
“মা ও মা ও ওইভাবে চিৎকার পারছে কেন? ওমা ওকে বলো না এইভাবে চিৎকার যেন না দেই। ওর চিৎকার যে আমার বুকের ভিতর এসে লাগছে। বুকটা যে ফেটে যাচ্ছে। ও কি বুঝতে পারছে না আমার কতটা কষ্ট হচ্ছে মা ওকে বলো না এইভাবে চিৎকার যেন না দেই। আমি সয়তে পারছি না। মাগো তোমার ছেলেটার বুকে ভিষন কষ্ট হচ্ছে শান্তি পাচ্ছে না কারন তোমার ছেলের সব শান্তি ওই অপারেশন থিয়েটারে ভিতরে আছে। মা ও মা মাগো কথা বলছো না কেন তুমি। শুনতে পাচ্ছো তোমার ছেলের হাহাকার। তুমি আল্লাহ কে বলো না আমার তুরাকে যেন কষ্ট না দেই সব কষ্ট আমাকে দিয়ে দিতে বলো সব নিঃশব্দে সহ্য করবো কিন্তু ওর কষ্ট যে আমি সয়তে পারছি না মাগো পারছি না আমি। তোমার ছেলে পারছে না মা সয়তে পারছে না।”
পুরো করিডোরে এক হাহাকার পড়ে গেল। এক ভাই আয়ান তিথির জন্য কাঁদছে আর অন্য ভাই রৌদ্র তুরার জন্য বুক ফাটা হাহাকার করছে। দুই ভাইয়ের এই করুণ দশা দেখে বিধাতাও যেন আজ চোখের জল ফেলছেন।
কিছুক্ষণের মধ্যে অপারেশন থিয়েটারের দরজাটা এক সময় শব্দ করে খুলে গেল। করিডোরের প্রতিটি মানুষ যেন নিশ্বাস বন্ধ করে সেদিকে তাকিয়ে রইল। ডাক্তার যখন বেরিয়ে এলেন তাঁর চোখে-মুখে ফুটে ওঠা অসহায়ত্ব দেখে পরিবারের সবার মনে এক নতুন ভীতি জেঁকে বসল। আনোয়ার খান টলমলে পায়ে এগিয়ে গিয়ে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন।
“ডাক্তার তুরা কেমন আছে? সব ঠিক আছে তো?”
ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ থেকে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত গলায় বললেন।
“আসলে… আমরা অনেকক্ষণ ধরে নরমাল ডেলিভারির চেষ্টা করেছি। কিন্তু পেশেন্টের আগেই স্থলি ভেঙে যাওয়ায় প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। যার কারণে শরীরের সেই শক্তিটুকু আর নেই যে নরমালি বাচ্চা জন্ম দেবে। এই মুহূর্তে সিজার করা ছাড়া আমাদের হাতে আর কোনো পথ খোলা নেই।”
ডাক্তার থামলেন এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলতে শুরু করলেন।
“তবে এখানে একটা বড় ঝুঁকি আছে। সিজার করলে হয়তো আমরা বাচ্চাটিকে বাঁচাতে পারব কিন্তু তার মাকে বাঁচানো অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে। কারণ তার শরীর থেকে ইতিমধ্যে অধিকাংশ রক্ত চলে গেছে। সিজার করার পর তিনি সেই ধকল সামলাতে পারবেন বলে মনে হচ্ছে না। যদিও আমরা বাইরে থেকে রক্ত দেওয়ার ব্যবস্থা করব কিন্তু ততক্ষণে পেশেন্টকে নিজের জীবনের মায়া আঁকড়ে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। তিনি যদি একবার হাল ছেড়ে দেন তবে বাকিটা আপনারা বুঝতেই পারছেন।”
ডাক্তারের মুখে এই মরণসংবাদ শুনে হাসপাতালের করিডোরে যেন প্রলয় নেমে এল। উপস্থিত প্রত্যেকের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। তনুজা খান চিৎকার দিয়ে ফ্লোরে লুটিয়ে পড়লেন আর আশিক খান দেয়ালে ভর দিয়ে কোনোমতে নিজের পতন ঠেকানোর চেষ্টা করলেন। সবার চোখের সামনে শুধু অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। একদিকে তিথির অনিশ্চিত জীবন আর অন্যদিকে তুরার এই চরম সংকট। রৌদ্রের মনে হলো তার মাথার ওপর আকাশটা ভেঙে পড়েছে। সে আর এক মুহূর্তও এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা সহ্য করতে পারল না। উন্মাদের মতো নিজের দুই হাত দিয়ে কান দুটো চেপে ধরল সে যেন ডাক্তারের ওই ভয়ংকর কথাগুলো সে আর শুনতে না পায়। তার ভেতর থেকে এক আদিম আর্তনাদ বেরিয়ে এল যা হাসপাতালের প্রতিটি ইটে গিয়ে ধাক্কা খেল।
“নাহহহ। নাহহহ। হতে পারে না এটা। ওহহহহ আল্লাহ ইয়া মাবুদ তুমি আমাকে মেরে ফেলো। আহহহহহহহহহ।”
রানিং…!
Share On:
TAGS: নির্লজ্জ ভালোবাসা, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৮
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৪
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৪৪
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৮
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা গল্পের লিংক
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৪৯
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৩৯