Golpo কষ্টের গল্প খাঁচায় বন্দী ফুল

খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৫


কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ ⚠️

খাঁচায়বন্দীফুল

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব – ২৫

তিন তলা ভবন বিশিষ্ট প্রধান বাড়িটি যেন রাজবাড়ীর থেকে কোনো অংশে কম নয়। চারিদিকে লোকজনে গমগম করছে। আগামীকাল প্রধান ওয়াহাব চৌধুরীর মায়ের কুলখানি। বাইরের বিশাল আঙিনা জুড়ে বড় বড় চৌকা খুড়ে তাতে বড় বড় ডেকচি তে দুধ জ্বালাম করা হচ্ছে। তার মধ্যে সারা বাড়িতে হন্যে হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে তুযাউন। কবিতা কে খুজতে সারা বাড়িতে।

দুধ জ্বাল করতে করতে কেমন লাল হয়ে উঠেছে। তা দেখে কবিতার খেতে ইচ্ছে করছিলো খুব। সাইফ কবিতার জন্য কিছুটা উঠিয়ে দিতে বলেছিলো। কিন্তু বাবুর্চি জানালো একটা বড় কাজ হাতে নিয়েছে। এর একটা ভক্তি শ্রদ্ধা বলেও ব্যাপার আছে। ভাড়ে ঢালার আগে কাওকে দেবে না সে। আর মেয়েদের এত আগ জিনিস খেতে নেই।

সাইফ কি আর অত নিয়ম নীতি মানে? এসব ফালতু কুসংস্কার কোনো কালেই গ্রাহ্য করেনি সাইফ। চোখ রাঙানি দিয়ে বাবুর্চির হাত থেকে বড় অরুণ (দুধ নেরে দেওয়ার গোল চামচ) টা নিয়ে নিলো। এক অরুন উপরে দিতেই কাঁসার ঘটিটা ভরে গেলো। কবিতার মতো মানুষের কাছে তাই অনেক। অতটুকু মেয়ে এর চেয়ে বেশি খেতে পারবে নাকি।

একটু আগেই বারান্দায় দাঁড়ানো ছিলো কবিতা। এখন আর এখানে নেই। বারান্দা থেকে বাইরে পর্যন্ত ভালো করে চোখ বুলিয়ে দেখলো সাইফ। কোথাও কবিতাকে দেখা যাচ্ছে না। ভিতরে ঢোকার সময় মুখোমুখি হলো তুযার।
“ দাদাভাই কবিতা কে দেখছি না। কোথায় ও?”

“ আছে আশেপাশেই। কোথায় আর যাবে?”

সাইফ ব্যাস্ত ভঙ্গিতে বলল
“আচ্ছা তাহলে ওকে খুজে এই দুধটা খাইয়ে দাও। আমাকে বলল এনে দিতে, তখন বারান্দায় ই ছিলো। এখন দেখছি না। নাও ধরো”

তুযা ঘটিটা হাতে নিয়ে সেই থেকে খুজছে। কোথাও কবিতার দেখা নেই। তুযা ঘটি হাতে নিয়েই রান্না ঘরে গেলো। সেখানে ২-৩ জন কাজের মহিলা আর অদিতি। ওদের কেউ জিজ্ঞেস করলো তুযা
“অদিতি, কবিতা এসেছিলো তোর কাছে?”

অদিতি বলল
“ না তো। সেই যে খাবার নিয়ে এলো বাইরে থেকে তখন এসেছিলো। তারপর আর আসেনি তো”

তুযা ঘটিটা ওখানেই রেখে বাড়ির বাইরে গেলো সাইফ কে নিয়ে।
“ কি হয়েছে দাদাভাই? এত ঘামছো কেন?”

তুযা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল
“ কবিতা পুরো বাড়ির কোথাও নেই রে। আমি সব জায়গায় খুজেছি”

সাইফ এর কপালেও চিন্তার ভাজ পরলো। কোথায় গেলো ও। সাইফ দেখলো জেবা শাড়ি এলোমেলো করে বাড়ি ঢুকছে। জেবার দিকে তাকিয়েই তুযার বাহুতে খোচা দিলো। তুযা সাইফের দিকে তাকিয়ে ওর চোখ অনুসরণ করে জেবার দিকে তাকালো। তুযাও সাইফের মতো একই বিষয় সন্দেহ করছে।
“ এই ছিনাল কই থিকা আইলো? আর ওয় ও তো এতক্ষণ বাড়ি আছিলো না”

সাইফ তুযার বাহু ধরে বলল
“ ও আবার কবিতার সাথে…..

“ খোদার কসম কইরা কইতেছি, আমার মাইয়ার যদি কিছু হয়। ওই নচ্ছার শালিরে আমি কাইট্টা টুকরা টুকরা কইরা কুত্তা দিয়া খাওয়ামু”

“ কিন্তু এখন আমরা ওকে খুজবো কোথায়?”

কোথ থেকে কবিতা এক ছুটে এসে সাইফের হাঁটু জড়িয়ে ধরে বলল
“ চাচ্চু আমার লাল দুধ কোন হানে?”

কবিতার আসায় চমকে উঠে সাইফ। সাথে তুযা ও। তুযা কবিতার সামনে হাঁটু মুড়ে বসে জড়িয়ে ধরে তৎক্ষনাৎ। বুক থেকে যেন পাথর নেমে গেলো কবিতা কে পেয়ে।
“ তুমি কই গেছিলা আম্মা? তোমারে সারা বাড়ি খুঁজতাছি আমি”

কবিতা কোমড়ে হাত দিয়ে ব্যাঙ্গ করে বলল
“ওই জাবেদা আমাকে জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে আসতে চাইছিলো। উল্টা ওকে আমি লালু কুত্তার দৌড়ানি খাওয়াইছি”

খিলখিল করে হাসতে লাগলো কবিতা। সাথে সাইফও হাসলো। তুযা চোয়াল শক্ত করে বলল
“খালি দাদির কামডা হইতে দে। শালিরে আমি…..”

সাইফ মুখ চেপে ধরলো তুযার।
“ বাচ্চার সামনে কি বলো এসব। চুপ থাকো। আসো আম্মা। তোমাকে দুধ খাইয়ে দিচ্ছি।”

সাইফ কবিতার হাত ধরে নিয়ে গেলো বাড়ির ভিতর। তুযা গেলো বাবুর্চিদের কাছে। দই এর ভাড় ভরতে ভরতে রাত হলো তাদের। অদিতি সারাদিন সায়রা আর আঞ্জুমান এর সাথে কাজ করেছে। রাত হতেই বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। কতই বা বয়স হয়েছে মেয়েটার? এর মধ্যেই পাকা গিন্নি হয়ে উঠছে। শরীর আজ খুব ব্যাথা হবে। সারাদিন কতবার যে সিড়ি দিয়ে উঠা নামা করেছে হিসাব নেই।

সাইফ এখনো ঘরে আসেনি। অদিতি ভীষণ ক্লান্ত। শুতেই চোখে রাজ্যের ঘুম নেমে আসে। ঘরের দরজা হাট করে খোলা। পরনের শাড়ির আচলটা বিছানা ছেড়ে ফ্লোরে পরে আছে। রুমের আলো নেভানো। সাইফ ঘরে আসলো আরো ঘন্টা খানিক পর। রুম অন্ধকার দেখে ভাবলো অদিতি এখনো আসেনি ঘরে। মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে রুমে ঢুকলো। তার পছন্দের নারীটি তখন বিছানার সাথে মিশে ঘুমের দেশে পাড়ি জমিয়েছে। আনমনেই মুচকি হাসলো সাইফ।

ঘুমন্ত মুখখানা ভীষণ মায়াবী দেখাচ্ছে। ফ্লোরে হাটু মুড়ে বসে মাথা রাখলো অদিতির মাথার কাছে। ফোনের ফ্ল্যাশ সরিয়ে নিলো যাতে ঘুম ভেঙে বা যায় অদিতির। মুগ্ধ নয়নে দেখতে লাগলো স্বীয় স্ত্রীর অপরুপ মুখ খানা। ইচ্ছে করলো কপালে আলতো ঠোঁট ছোঁয়াতে।

ঠোঁট ছোঁয়ালো ঠিকই, তবে কপালে নয়। চোখের পাতায়। শাড়ির আচল মেঝে থেকে তুলে দিলো। কপালের পাশে থাকা এলোমেলো চুল গুলো কানের পিঠে গুজে দিয়ে, কানের লতিতেও একতা চুমু খেলো।

তুযা কবিতা কে সাথে নিয়ে ছাদে বসে আছে। এখান থেকে গ্রামটা স্পষ্ট দেখা যায়। পুরো গ্রামে এই একটাই উঁচু বাড়ি আছে। রাতের বেলা এর সৌন্দর্য আরো বাড়ে যেন। দূরে দূরে একেকটা আলো দেখা যায়। কবিতা তুযার পাশে বসে একমনে আপেল খাচ্ছে। তুযা মন দিয়ে দেখছে গ্রামটা। কবিতা হঠাৎ বলল
“আইচ্ছা আব্বা, বড় মা কি আর হাচাই আইবো না?”

তুযার বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরোলো
“ না রে মা। আর আইবো না”

কবিতা অবুঝের মতো প্রশ্ন করে
“ মানুষ মরলে আর আহে না ক্যা আব্বা?”

তুযা কথা বলতে বলতে খেয়াল করে জেবা গেট দিয়ে বাইরে বের হচ্ছে। তুযা কপাল কুচকে ভাবে, এ এতো রাতে কোথায় যাচ্ছে একা একা। তুযা কবিতা কে বলল
“ আম্মা, চলো ঘুমাইবা। রইত হইছে”

সবাই ঘুমিয়ে গেছে বাড়ির। নদী-দীঘিও নেই। মা কে ও ডাকতে ইচ্ছা করছে না তুযার। জেবার পিছন পিছন যেতে হবে। কিন্তু কবিতা কে কোথায় রেখে যাবে? তুযা ভাবলো অদিতির কাছে রাখার জন্য। ছাদ থেকে নেমে সাইফ – অদিতির রুমের সামনে গিয়ে দরজায় টোকা দিলো।

সাইফ বেশ প্রেম করছিলো ঘুমন্ত বউটার সাথে। এমন সময় বিরক্ত করায় খুব মেজাজ খারাপ হলো সাইফের। রুমের লাইট অন করে দরজা খুলল। তুযা দাঁড়িয়ে আছে কবিতার হাত ধরে। সাইফ এর কুচকে থাকা ভ্রু যুগল কিছুটা প্রশস্ত হলো।
“কি ব্যাপার দাদাভাই? হঠাৎ তোমরা এত রাতে? সব ঠিক আছে তো?”

তুযা বলল
“কবিতা কে একটু তোদের কাছে রাখতে পারবি? আমি একটু পরেই এসে নিয়ে যাবো”

“হ্যা নিশ্চয়ই। আম্মা আসো”

কবিতা কে সাইফের কাছে দিয়ে তুযা দ্রুত পায়ে চলে গেলো গেটের কাছে। কিন্তু জেবা কে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। তুযা চারিদিকে ভালো করে চোখ বুলিয়ে নিলো।
নাহহ কোথাও নেই জেবা। পিছন থেকে জোরে কারো চিৎকার শুনতে পায়।
“এটা তো ওই সাদা গরু টার চিৎকার”

তুযা দৌড়ে যায় ঝোপের দিকে। হাতের হারিকেন টা দিয়ে চারিদিকে খুজতে থাকে। আরেকবার চেচালে ভালো করে বুঝতে পারতো কোন জায়গায় আছে। তুযা একা একাই বলে
“ঢেমনি শালি এখন চিৎকার দেস না ক্যান?”

চারিদিকে খুজতে থাকে হারিকেন ধরে। কোথাও কোনো শব্দ নাই। তুযা এবার জেবা কে ডাকতে শুরু করে।
“জাবেদা, ওই জাবেদা। সাদা গাই, ওই মটুউউ। মোডা, ওই মোডা কোন হানে তুই? খাসি ওই ধারি খাসি।”
“ এই আটকুন্নি, নিপর্দাশি রে লইয়া আর পারি না। ওই মোডা মা’গি। অহন চিল্লান মারাস না কিয়ের জন্যে।”

জেবার কোনো সারা শব্দ না পেয়ে তুযা হারিকেন হাতে ফিরে আসতে আসতে বিরবির করে বলে
“জান বাইরাই গেছে মনে হয় লাংচুন্নির। নাইলে সারা দেয় না ক্যান।”

মেহগনির বাগান থেকে বের হয়ে আসছে তুযা এমন সময় পিছন থেকে আবার শব্দ শোনে
“আআআআআআ”

তুযা চমকে পিছনে ফিরে। চেচিয়ে বলে
“ওই বলদ মা”গি। আমি চইলা আইতে নিলে মরস ক্যান? যহন ডাকি তহন কি মুখে কি আঙ্গুল ডুকাই রাহোস।”

ফের এগিয়ে গেলো তুযা। এবার পেলো জেবা কে। তুযাকে এগিয়ে আসতে দেখেই ছেলে তিনজন পালালো। তুযা দৌড়ে গিয়ে হারিকেনটা জেবার পাশে নামালো। জেবার ঠোটের কার্ণিশ বেয়ে রক্ত পরছে। চোখ দুটো খোলা। পরনের নাইট ড্রেস টার বিভিন্ন জায়গায় ছেড়া। শরীরে বিভিন্ন আঁচড় এর দাগ। হাতে, গলায়, গালে নানান জায়গায় ক্ষত। তা থেকে রক্ত পরছে। এক মূহুর্তের জন্য থমকে যায় তুযা। জেবার গা ঝাকিয়ে ডাকে
“জাবেদা! ওই জাবেদা। জাবেদা?ওই জাবেদা?”

জেবা কোনো সারা শব্দ দেয় না। তুযা ভাবলো ওকে আগে এখান থেকে বাইরে নিয়ে যেতে হবে। হারিকেন টা রেখেই কোলে তুলে নেয় জেবা কে
“শালি খাইয়া খাইয়া মোডা হইছে খালি। ওজন কি বাপরে বাপ । মনে হইতেছে যেন আস্ত একটা দুম্বা কোলে নিছি। আইজ থিকা তোর খাওন বন্ধ লাংচুন্নি”

তুযা অনেক গুলি পায়ের শব্দ পাচ্ছে জঙ্গলের ভিতর। এখানে সময় নেওয়া যাবে না। দ্রুত বাড়িতে যেতে হবে। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী জেবাকে কোলে নিয়ে হাটতে বেশ হিমশিম খাচ্ছে তুযা। সাথে নেওয়া হারিকেন টাও নামিয়ে রেখে এসেছে। অতি দ্রুত বাড়ি পৌছাতে পারলে বাচে।

পায়ের শব্দ গুলে ক্রমশ এগিয়ে আসছে। আরেকটু এগোতেই তুযা ধাক্কা খেলো কারো সাথে। চাদের স্বল্প আলোয় তুযা ঠিকই চিনেছে সাইফ কে।
“তুই এখানে কি করছিস?”

সাইফ এর গলা স্বাভাবিক
“তুমি এখানে কি করছো?”

তুযা বল
“দ্রুত চল। বাড়ি গিয়ে সব বলছি”

সাইফ গেলো না। তুযা কিছুটা এগিয়ে গিয়েও আবার পিছনে ফিরে আসলো।
“কিরে আয়”

“তুমি ওকে নিয়ে এত রাতে এখানে কেন এসেছো?”
“তুই কি পাগল হয়েছিস? আমি কেন ওকে নিয়ে আসতে যাবো। আমি তো…….

তুযার কথা শেষ হওয়ার আগেই সাইফ গম্ভীর গলায় বলল
“মেরে ফেললে ওকে?”

“কি যা তা বলছিস? ও মরবে কেন?”

সাইফ এর কন্ঠ স্বাভাবিক
“লাশ কোলে করে দাঁড়িয়ে আছো। আবার বলছো মরবে কেন?”

তুযা তখন খেয়াল করলো ওর কোলে থাকা জেবার সত্যিই কোনো নড়ন চড়ন নেই। তুযার চোখ যেন কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম। কাপা কাপা গলায় বলল
“ওওও ও মারা, মারা গেলো কি…কি করে? হ্যা? ও কি করে মারা গেলো সাইফ? একটু আগেও তো চেচালো”

সাইফ ফিসফিস করে বলল
“পাপের শাস্তি পেয়েছে”

“তুই কিছু করেছিস ওর সাথে?”

সাইফ বলল
“ আমি কেন কিছু করতে যাবো? যা করার ও নিজেই করেছে”

“কি করেছে ও?”

চলবে?

কয়েক দিন হলো আপনাদের সাথে একটা বিষয় নিয়ে আলাপ করতে চাচ্ছি। কথাটা হলো দীঘির বিষয়টা নিয়ে। এই গল্পটা তে দীঘি খুব ইন্টারেস্টিং একটা ক্যারেক্টার আমার মতে। বলতে পারেন স্ট্রং আর বুদ্ধিমতিও বটে। কিন্ত এই গল্পে দীঘির তেমন ভূমিকা নেই। আমার পরবর্তী গল্প হবে দীঘিকে নিয়ে। যেখানে নায়কটাও থাকবে রগচটা ভিলেন টাইপ, আর দীঘিও থাকবে ভীষণ স্ট্রং। ভার্সিটি রিলেটেড হবে খুব সম্ভবত। তো আপনাদের মতামত চাচ্ছি সেক্ষেত্রে। কি বলেন?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply