নির্লজ্জ_ভালোবাসা
লেখিকাসুমিচোধুরী
পর্ব ৮২ (❌কপি করা নিষিদ্ধ❌)
তিথির কলিজা ফাটানো চিৎকার শুনে তুরা এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। কিন্তু যখনই সে তিথির দিকে তাকাল, তার বুকের ভেতরটা যেন হিম হয়ে এল। তিথি ফ্লোরে বসে যন্ত্রণায় ছটফট করছে, আর ওর চারপাশটা পানিতে ভিজে একাকার। দৃশ্যটা দেখে তুরা নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠল।
“তিথিইইই! মা… তোমরা কোথায়? তাড়াতাড়ি আসো, জলদি আসো।”
তুরার গলার সেই আর্তনাদ শুনে রৌশনি খান, তনুজা খান আর হিমি খান রান্নাঘর থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন। ড্রয়িং রুমে ঢুকেই তিথির ওই অবস্থা আর ফ্লোরে ছড়িয়ে থাকা পানি দেখে তাদের আর বুঝতে বাকি রইল না যে, তিথির প্রসব বেদনা শুরু হয়ে গিয়েছে। তনুজা খান পাগলের মতো ছুটে এসে তিথিকে দুই হাতে আগলে নিলেন, নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বললেন।
“মা কিচ্ছু হয়নি তোর, তুই ভয় পাস না। নিজেকে শক্ত রাখ মা, আমরা আছি তো।”
কিন্তু ব্যথার তীব্রতা তখন তিথির সহ্যক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। সে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে আর্তনাদ করে উঠল।
“আম্মু প্রচণ্ড ব্যথা করছে… আমি আর পারছি না… মরে যাচ্ছি আমি।”
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে রৌশনি খান কাঁপতে কাঁপতে রৌদ্রের নাম্বারে কল দিলেন।
এদিকে রৌদ্র আর আয়ন তখন কেবল ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকে কথা শুরু করেছে। হঠাৎ রৌদ্রের ফোনটা বেজে উঠল। স্কিনে বাড়ির নাম্বার দেখে বুকটা ধক করে উঠল তার। অসময়ে বাড়ির ফোন মানেই কোনো দুঃসংবাদ নয়তো? রৌদ্র ডাক্তারকে ইশারায় থামিয়ে দিয়ে কাঁপা হাতে ফোনটা কানে ধরল। ওপাশ থেকে রৌশনি খানের কান্নায় ভেঙে পড়া কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
“রৌদ্র! আয়ান। তোরা কোথায়? শীঘ্রই বাড়ি আয়… তিথির ওয়াটার ব্রেক হয়েছে, ওর প্রসব বেদনা শুরু হয়ে গেছে।”
রৌদ্রের হাত থেকে দামী ফোনটা কার্পেটে পড়ে গেল, কিন্তু সেদিকে খেয়াল করার মতো মানসিক অবস্থা তার নেই। আয়ান রৌদ্রের ফ্যাকাশে মুখ দেখে মুহূর্তেই অস্থির হয়ে উঠল। তার বুকের ভেতরটা অজানা এক আশঙ্কায় ঢিপঢিপ করছে। সে রৌদ্রের হাত আঁকড়ে ধরে চিৎকার করে বলল।
“কী হয়েছে ভাইয়া? বাড়িতে কিছু হয়েছে? তুরা, তিথি ঠিক আছে তো? কথা বলছ না কেন?”
রৌদ্র শুকনো ঢোক গিলল। তার চোখদুটো যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। সে কাঁপতে কাঁপতে আয়ানের দিকে তাকিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বলল।
“আ… আয়ান, তিথির ওয়াটার ব্রেক হয়েছে।”
মুহূর্তের মধ্যে আয়ানের মনে হলো যেন কেউ তার মাথার ওপর বিশাল এক পাহাড় আছড়ে ফেলেছে। সারা শরীর মুহূর্তেই অবশ হয়ে এল, হাত-পা নাড়ানোর মতো ন্যূনতম শক্তিটুকুও সে হারিয়ে ফেলল। আয়ানের চোখের মণি স্থির হয়ে গেছে, মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না।রৌদ্র আয়ানের এই অবস্থা দেখে বুঝতে পারল এখন ভেঙে পড়লে চলবে না। সে দ্রুত আয়ানের কাঁধ শক্ত করে ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল।
“আয়ান! শক্ত হো এভাবে ভেঙে পড়িস না। কিচ্ছু হবে না, তুই ভরসা রাখ। জলদি চল আমাদের এখনই পৌঁছাতে হবে। কুইক।”
কথাটা শেষ করেই রৌদ্র আয়ানকে এক প্রকার টেনেই সোফা থেকে তুলল। আয়ানের পা যেন মাটিতে আটকে যাচ্ছে, সে কোনো বোধশক্তি ছাড়াই যান্ত্রিকভাবে রৌদ্রের সাথে এগিয়ে চলল। রৌদ্র তাকে একরকম টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে গাড়িতে তুলল। আয়ান গাড়ির সিটে বসে রইল ঠিকই, কিন্তু সে যেন এক জ্যান্ত পাথরের মূর্তি প্রাণ আছে কিন্তু স্পন্দন নেই, চোখ আছে কিন্তু দৃষ্টি নেই।
রৌদ্র আর আয়ান ঝড়ের গতিতে বাড়িতে পৌঁছাল। ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই আয়ান দেখল তিথি ফ্লোরে পড়ে যন্ত্রণায় আর্তনাদ করছে। সেই করুণ দৃশ্য দেখে আয়ানের মনে হলো তার পায়ের নিচ থেকে বুঝি মাটি সরে যাচ্ছে হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। রৌদ্র একবার চট করে তুরার দিকে তাকাল। তুরাকে অক্ষত এবং ঠিকঠাক দেখে তার বুকের এক পাশ শান্তিতে ভরে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই তিথির অবস্থা দেখে সে স্থির থাকতে পারল না।রৌদ্র ক্ষিপ্র গতিতে এগিয়ে গিয়ে তিথির কাঁধ ধরল এবং আয়ানের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল।
“আয়ান! কী দেখছিস? তাড়াতাড়ি ধর তিথিকে! এখনই হাসপাতালে নিতে হবে, এক সেকেন্ডও দেরি করা যাবে না।
রৌদ্রের চিৎকারে আয়ান যেন সম্বিত ফিরে পেল। সে পাগলের মতো ছুটে এসে তিথিকে আগলে ধরল। রৌদ্র আর আয়ান দুজনে মিলে অতি সাবধানে তিথিকে পাঁজাকোলা করে গাড়িতে নিয়ে তুলল। গাড়ির পেছনের সিটে তিথির দুই পাশে তনুজা খান আর হিমি খান বসে তাকে শক্ত করে ধরে রাখলেন, তিথির ব্যথায় নীল হয়ে যাওয়া মুখটা দেখে তাদের চোখও ভিজে উঠেছে। রৌশনি খান বাড়িতেই থেকে গেলেন তুরার দেখাশোনার জন্য, কারণ এই অবস্থায় তুরাকে একা রাখা নিরাপদ নয়।
আয়ান আর রৌদ্র সামনের সিটে উঠে বসল। রৌদ্র স্টিয়ারিং ধরে পাগলের মতো গাড়ি ছুটিয়ে দিল হাসপাতালের দিকে। রাস্তার জ্যাম, সিগন্যাল কিছুই যেন আজ তাদের আটকাতে পারছে না। পেছনের সিট থেকে তিথির যন্ত্রণাকাতর গোঙানি যখনই আয়ানের কানে আসছে, আয়ান ডুকরে কেঁদে উঠছে। তার শুধু একটাই প্রার্থনা।
“আল্লাহ,আমার তিথিকে সুস্থ রেখো।”
হাসপাতালে পৌঁছানোর পর কোনো বিলম্ব না করে তিথিকে দ্রুত অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হলো। করিডোরে লাল বাতিটা জ্বলে ওঠার সাথে সাথে পুরো পরিবারের ওপর এক অসহ্য নীরবতা আর আশঙ্কার চাদর যেন বিছিয়ে গেল।
খবর পাওয়া মাত্রই আনোয়ার খান,আশিক খান আর আরিফুল খান ঊর্ধ্বশ্বাসে হাসপাতালে ছুটে এসেছেন। নিজের আদরের মেয়ের এই অবস্থা শুনে আশিক খান প্রায় জ্ঞান হারানোর মতো দশা আরিফুল খান তাকে কোনোমতে ধরে রেখে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, যদিও তার নিজের কণ্ঠস্বরও উদ্বেগে কাঁপছে।শিহাব, আরশি, নেহাল আর আরাফও খবর পাওয়া মাত্র পাগলের মতো ছুটে এসেছে। সবার মুখেই এখন ভয়ের কালো ছায়া। আরশিরও এখন শরীরের যত্ন নেওয়া প্রয়োজন, কারণ সে নিজেই এখন দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা, কিন্তু তিথির এই অবস্থায় সে নিজেকে স্থির রাখতে পারছে না।
অপারেশন থিয়েটারের বাইরে পুরো পরিবার যেন এক প্রার্থনার সভায় পরিণত হয়েছে। সবাই মনেপ্রাণে দোয়া করছে আল্লাহ যেন তিথি আর ওর অনাগত সন্তানকে সুস্থভাবে ফিরিয়ে দেন। কিন্তু এই ভিড়ের মাঝে আয়ানের দিকে তাকালে বুক ফেটে যায়। সে কি আর এই পৃথিবীতে আছে? আয়ান যেন এক জীবন্ত লাশে পরিণত হয়েছে। মানুষ যখন শোকে আর আতঙ্কে পাথর হয়ে যায়, তখন তার কান্না করার মতো শক্তিটুকুও থাকে না।আয়ানের অবস্থাও ঠিক তাই। সে একটা দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, যেন তার নিশ্বাসটা ভেতরে বইছে ঠিকই, কিন্তু আত্মাটা চলে গেছে ওই অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে।
অপারেশন থিয়েটারের ভেতরটা এখন যেন এক মৃত্যুযন্ত্রণার মঞ্চ। তিথি বেডে শুয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করছে, তার শরীরের নিচ থেকে পেট পর্যন্ত সাদা কাপড়ে ঢাকা। চারপাশ ঘিরে মেয়ে ডক্টর আর নার্সরা তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিথির কপালের রগগুলো ফুলে উঠেছে, ঘামে গায়ের কাপড় লেপ্টে আছে। সে হাতের কাছে পাওয়া বেডের চাদরটা সর্বশক্তি দিয়ে খামচে ধরে গোঙাচ্ছে।
“আহহহহহহহ! আয়াআআআন! আয়ান কোথায়? ওরে ডাকো… আয়ানকে ডাকো! আহহহহ, আমি আর নিতে পারছি না… ওরে ডাকো তোমরা!”
তিথির চিৎকারে ওটির দেয়ালগুলো যেন কেঁপে উঠছে। সিনিয়র ডক্টর দ্রুত তিথির হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলেন। তিথির চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে পেশাদার কিন্তু দৃঢ় গলায় বললেন।
“মিসেস তিথি! লিসেন টু মি! আপনি এভাবে ভেঙে পড়লে চলবে না। প্লিজ, ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড বেবির মাথা অলরেডি দেখা যাচ্ছে, কিন্তু আপনি ঠিকমতো পুশ করতে পারছেন না। আপনি শক্তি না দিলে আমরা ওকে সেফলি বের করতে পারব না। প্লিজ মিসেস তিথি, আপনার বাচ্চার জন্য হলেও শেষবারের মতো একটু শক্তি খাটান! জাস্ট ওয়ান মোর টাইম, জোরে পুশ করেন জোরে।”
তিথি যন্ত্রণায় চোখ মুখ খিঁচিয়ে আর্তনাদ করে উঠল। তার মনে হচ্ছে শরীরটা মাঝখান থেকে দুই ভাগ হয়ে যাচ্ছে।তিথি যন্ত্রণার চরম সীমায় পৌঁছেও যেন আয়ানের চিন্তায় অস্থির। সে কান্নারত কণ্ঠে চিৎকার করে বলল।
“আহহহহ! আয়ানকে ডাকো… ওকে বলো আমাদের বাচ্চা আসছে। ও নিশ্চয়ই বাইরে কষ্ট পাচ্ছে, ওরে বলো আমার কিছু হবে না! ওরে ডাকো, ও দেখুক আমি ঠিক আছি…প্লিজ ওরে ডাকো।”
ডক্টর বারবার তিথিকে ইনস্ট্রাকশন দিচ্ছেন, কিন্তু তিথি শুধু ‘আয়ান’ নামটা জপছে। তার সবটুকু মনোযোগ আর শক্তি যেন ওই নামটার মধ্যেই আটকে গেছে, যার ফলে সে ডেলিভারির জন্য প্রয়োজনীয় পুশ দিতে পারছে না। পাশ থেকে একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ডক্টর পরিস্থিতি বেগতিক দেখে মেইন সার্জনকে বললেন।
“ডক্টর, আমার মনে হয় এনার হাসবেন্ড আয়ানকে ভেতরে ডাকা উচিত। নাহলে যেভাবে ব্লাড প্রেশার ফ্ল্যাকচুয়েট করছে, তাতে মেয়েটার প্রাণ সংশয় হতে পারে। হাসবেন্ডকে পাশে দেখলে হয়তো ও মেন্টাল স্ট্রেন্থ পাবে।”
ডক্টর পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে দ্রুত মাথা নাড়লেন এবং একজন নার্সকে ইশারা করলেন। নার্স তৎক্ষণাৎ ওটির ভারি দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলেন। করিডোরে অপেক্ষারত বিধ্বস্ত মানুষগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে নার্স উচ্চস্বরে বললেন।
“এখানে মিস্টার আয়ান কে?”
আরিফুল খান মুহূর্তেই সামনে এগিয়ে এসে নিজের ছেলেকে দেখিয়ে বললেন।
“এই যে, এই আমার ছেলে আয়ান।”
নার্স সরাসরি আয়ানের স্থির হয়ে যাওয়া চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন।
“আপনি জলদি ভেতরে আসুন। আপনার স্ত্রী ভেতরে খুব স্ট্রাগল করছে, সে বারবার আপনার নাম নিচ্ছে। ওকে সাহস দেওয়ার জন্য আপনার পাশে থাকা খুব জরুরি। আসুন।”
আয়ান এতক্ষণ নিজেকে পাথর করে রাখলেও অপারেশন থিয়েটারের দরজায় পা রাখতেই তার সব বাঁধ ভেঙে গেল। ভেতরে সাদা আলোর নিচে তিথিকে যন্ত্রণায় নীল হয়ে ছটফট করতে দেখে আয়ানের কলিজা যেন ছিঁড়ে দু-টুকরো হয়ে গেল। সে টলমলে পায়ে এগিয়ে গিয়ে তিথির মাথার কাছে দাঁড়াল। তিথি ঝাপসা চোখে আয়ানকে দেখামাত্রই যন্ত্রণার তীব্র আর্তনাদ ছাপিয়ে এক টুকরো ম্লান হাসি ফুটিয়ে তুলল।
“আআআহ! আয়ান তুমি এসেছো? দেখো আমার কিছু হয়নি আমি ঠিক আছি আর দেখো দেখো আমাদের কলিজার টুকরোটা আসছে।”
ডক্টর আয়ানের কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে পেশাদার কিন্তু কঠোর গলায় বললেন।
“মিস্টার আয়ান, ইমোশনাল হওয়ার সময় এটা না! আপনার স্ত্রীকে সাহস দিন। শি ইজ লুজিং হার স্ট্রেন্থ! ও পুশ না করলে আমি বাচ্চা আর মা কাউকেই বাঁচাতে পারবো না। কুইক।”
আয়ান মুহূর্তেই তিথির ঘামে ভেজা হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরল। তিথির চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধরা গলায় বলল।
“তিথি, তুই না বলতি আমি তোর সাহস? তাহলে আজ কেন হেরে যাচ্ছিস? দেখ, তুই যদি এখন শক্তি না খাটাস, আমি কসম খেয়ে বলছি আমি আবার সেই আগের আয়ান হয়ে যাব। আমি আবার নেশায় ডুব দেব, নিজেকে শেষ করে দেব! তুই কি চাস আমি আবার ধ্বংস হয়ে যাই? যদি আমাকে ভালোবাসিস, তাহলে লড় তিথি! আমাদের বাচ্চার জন্য লড়।”
আয়ানের এই কঠোর অথচ আর্তনাদ মেশানো কথাগুলো তিথির মস্তিষ্কে বিদ্যুতের মতো কাজ করল। সে আবারও দাঁতে দাঁত চেপে শক্তি সঞ্চয় করার চেষ্টা করল। কিন্তু শরীর যখন আর সায় দিচ্ছিল না, তখন আয়ান তিথির কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে কান্নামিশ্রিত আদুরে গলায় ফিসফিস করে বলল।
“সোনা আমার, জানু… আর একবার, মাত্র একবার জোর দাও! আমাদের ছোট্ট রাজপুত্র বা রাজকন্যাটা আসার জন্য ছটফট করছে। ও এলে আমরা তিনজন মিলে সারাদিন খুনসুটি করব, আমি তোমাকে আর কোনোদিন কোনো কষ্ট দেব না। প্লিজ লক্ষ্মীটি, আমার দিকে তাকিয়ে আরো জোরে পুশ করো।
তিথি আয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো তার জীবনের সবটুকু নির্যাস এক করে এক আকাশ কাঁপানো মরণজয়ী চিৎকার দিল। “আয়াআআআআআআন!”
চিৎকার দিয়েই তিথি নিস্তেজ হয়ে এলিয়ে পড়ল বেডে। অপারেশন থিয়েটারের সেই থমথমে নিস্তব্ধতা ভেঙে মুহূর্তেই বেজে উঠল এক স্বর্গীয় সুর। “ওয়াউ… ওয়াউ… ওয়াউ…।”
একটি নতুন প্রাণের আগমনে ওটির বাতাস ভারী হয়ে উঠল। আয়ান কয়েক সেকেন্ড পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল, তার গাল বেয়ে তখন আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সে কাঁপাকাঁপা হাতে তিথির কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলল।
“তি… তিথি! সোনা আমার, দেখ… আমাদের জান পাখিটা চলে এসেছে! ও কাঁদছে তিথি, তুই চোখ খোল। দেখ আমাদের ভালোবাসার জয় হয়েছে।”
আয়ানের আনন্দাশ্রু মুহূর্তেই আতঙ্কে রূপ নিল। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! কয়েক সেকেন্ড শান্ত থাকার পর তিথি আবারও দ্বিগুণ শক্তিতে চিৎকার করে উঠল। তার শরীরটা যন্ত্রণায় ধনুকের মতো বেঁকে যাচ্ছে। আয়ান পুরোপুরি হ অপ্রস্তুত হয়ে গেল বাচ্চা তো হয়ে গেছে, তাহলে তিথি আবার এমন করছে কেন?আয়ান এবার ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে তিথির হাতটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে বাচ্চাদের মতো ডুকরে কেঁদে দিল। সে দিশেহারা হয়ে বলতে লাগল।
“তিথি সোনা আমার”এমন করছিস কেন”এমন
করিস না পাগলি”তুই এমন করলে আমি যে এখনি মরে
যাবো” বাঁচা আমাকে”তোর আয়ানের খুব কষ্ট হচ্ছে” প্লিজ
সোনা আমার চোখ খোল প্লিজ তাকা একবার আমার দিকে”
এইভাবে আমাকে যন্ত্রণা দিস না আমি সয়তে পারছি না।”
ডক্টর তখন মাত্রই প্রথম বাচ্চাটিকে পরিষ্কার করার কাজ শুরু করেছিলেন। হঠাৎ তিথির আকাশ কাঁপানো আর্তনাদ শুনে তিনি চমকে উঠলেন। দ্রুত বাচ্চাটিকে নার্সের কোলে দিয়ে তিনি তিথির কাছে ছুটে এলেন। তিথির কপালে হাত দিয়ে এবং শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করে ডক্টরের চোখ কপালে উঠল। তিনি উত্তেজনায় এবং কিছুটা বিস্ময়ে কপালে হাত দিয়ে বলে উঠলেন।
“উফফ শিট! শি ইজ ইন লেবার অ্যাগেইন! টুইন বেবি! আরেকটা বাচ্চা আছে ভেতরে!”
পুরো অপারেশন থিয়েটারে যেন আবার একটা ঝড়ের আমেজ ছড়িয়ে পড়ল। ডক্টর নার্সদের ইশারা দিয়ে বললেন।
“কুইক! প্রিপেয়ার ফর দ্য নেক্সট ওয়ান! মিস্টার আয়ান, শক্ত হোন, লড়াই এখনো শেষ হয়নি! আপনার স্ত্রী যমজ সন্তানের মা হতে চলেছেন।”
আয়ানের পায়ের নিচ থেকে যেন পৃথিবীটা সরে গেল। সে বাকরুদ্ধ হয়ে অপলক দৃষ্টিতে তিথির যন্ত্রণায় নীল হয়ে যাওয়া মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মানে, এই কারণেই তিথির পেটটা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বড় ছিল। সেখানে একটা নয়, তিলে তিলে বড় হয়ে উঠেছে দুটি ফুটফুটে প্রাণ। সে এক বাচ্চার বাবা হতে এসে এখন দুই বাচ্চার বাবা হওয়ার খবর পাচ্ছে।কিন্তু এই পরম আনন্দের বারতাও যেন আয়ানের কাছে এক ভয়ংকর কষ্টের পাহাড় হয়ে এল। প্রথম বাচ্চাটাকে পৃথিবীর আলো দেখাতে গিয়েই তিথি যেভাবে নিস্তেজ হয়ে পড়েছে, তার শরীর যেভাবে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে এখন দ্বিতীয়বার এই মরণপণ যন্ত্রণা সে সইবে কী করে?
আয়ান আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে অপারেশন থিয়েটারের সেই গুমোট অন্ধকারে দুই হাত আকাশের দিকে তুলে আর্তনাদ করে উঠল। তার চোখ ফেটে তখন অশ্রু নামছে, সেই অশ্রুতে কোনো আনন্দের রেশ নেই, আছে শুধু প্রিয়তমা স্ত্রীকে হারানোর ভয় আর আকুতি। সে হুহু করে কেঁদে উঠে বলল।
“ও নো নো নো… ইয়া আল্লাহ! তুমি এত বড় পরীক্ষা নিচ্ছ কেন? তুমি দয়ালু, তুমিই তো এক মায়ের গর্ভে দুটি প্রাণের স্পন্দন দিয়েছিলে। তাহলে আজ সেই মা-কে দুটি প্রাণ জন্ম দেওয়ার মতো অলৌকিক শক্তিটুকুও দিয়ে দাও মাবুদ! আমার তিথি তো ভেঙে পড়ছে,ও তো আর পারছে না! তুমি কি দেখছো না ওর কত কষ্ট হচ্ছে।দেখিয়ে দাও ওই নিষ্পাপ দুটি শিশুকে তোমার সৃষ্টি করা এই সুন্দর পৃথিবী। কিন্তু দোহাই লাগে আল্লাহ, ওই দুটি প্রাণের বিনিময়ে ওদের মাকে কেড়ে নিও না। আমার জানটা নিয়ে নাও, কিন্তু আমার তিথিকে সুস্থ রাখো। এই অভাগা স্বামীর মুখে হাসি ফুটাও আল্লাহ, আমার ভালোবাসাকে আমার বুকে ফিরিয়ে দাও।”
আয়ানের এই বুক ফাটা হাহাকার আর প্রার্থনা অপারেশন থিয়েটারের পাথরসম পরিবেশটাকেও যেন বিষণ্ন করে তুলল। ডক্টর আর নার্সদের চোখও যেন এক মুহূর্তের জন্য ভিজে এল। আয়ান তিথির কপালে নিজের ভেজা মুখটা ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল।
“তিথি… আমার দিকে তাকাও সোনা! দেখো, আল্লাহ আমাদের ওপর রহমত পাঠিয়েছেন। আর একটু কষ্ট করো,লক্ষ্মীটি, আমাদের আরেকটা জান পাখি আসার জন্য ছটফট করছে। তুৃৃমি না থাকলে আমি ওই দুটো বাচ্চাকে নিয়ে কোথায় যাব বলো? তুমি ছাড়া আমার পৃথিবী যে অন্ধকার! আর একবার সাহস করো কলিজা, আর একবার শোনা আমার।”
আয়ানের চোখের সেই তপ্ত নোনা জল তিথির কপালে পড়ে গড়িয়ে যাচ্ছিল। তিথি তখন যন্ত্রণার এক ঘোরলাগা অন্ধকারে ডুবে থাকলেও বুঝতে পারছিল।আয়ান ভেঙে পড়ছে। ওই মানুষটার কান্না যে তিথির বড় বেশি সহ্যর বাইরে! আয়ানের কষ্ট কমানোর এক অমানুষিক তাড়না অনুভব করল সে। আয়ানের হাত ছেড়ে দিয়ে তিথি বেডের দুই পাশ নিজের সর্বশক্তি দিয়ে খামচে ধরল। তার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরা তখন ছিঁড়ে আসার উপক্রম, তবুও সে লড়াই ছাড়ল না।
আয়ান তিথির সেই মরণপণ লড়াই দেখে নিজের চোখের জল মুছে চিৎকার করে সাহস দিতে লাগল।
“এই তো আমার সোনা! আর একটুখানি, আর একটু জোর দেও ! আমাদের আরেকটা পাখি আসছে। দেখো, ও তোমাকে ‘মা’ আর আমাকে ‘বাবা’ বলার জন্য ছটফট করছে! আর একবার শক্তি খাটাও আমার জান, আর একবার।”
পুরো অপারেশন থিয়েটারে তখন শুধু তিথির ভারী শ্বাস আর আয়ানের আকুতি। হঠাৎ তিথি তার জীবনের সবটুকু নির্যাস এক করে, নিজের অস্তিত্বকে যেন নিংড়ে দিয়ে এক বুক ফাটানো দীর্ঘ আর্তনাদ করে উঠল। সেই চিৎকারের শেষ রেশটুকু বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই চারপাশ মুখর করে বেজে উঠল সেই বহু প্রতীক্ষিত মধুর সুর। “ওয়াউ… ওয়াউ… ওয়াউ…!”
দ্বিতীয় প্রাণের আগমনে থমথমে অপারেশন থিয়েটারে যেন আলোর বন্যা বয়ে গেল। কিন্তু সেই অলৌকিক মুহূর্তেই তিথি তার শরীরের শেষ শক্তিটুকু হারিয়ে ফেলল। তার হাত দুটি শিথিল হয়ে এল, মাথাটা একদিকে এলিয়ে পড়ল আর চোখের পাতা দুটো নিথরভাবে বন্ধ হয়ে গেল।
আয়ান দ্বিতীয় বাচ্চার কান্না শুনে প্রথমে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে রইল, তারপর গভীর এক তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলে তিথির নিস্তেজ কপালে নিজের কপাল ঠেকাল। তার চোখ দিয়ে তখন অঝোরে জল পড়ছে, কিন্তু সেই কান্নায় এখন আর ভয় নেই, আছে পরম শান্তি। সে ফিসফিস করে বলল।
“এসে গেছে তিথি… আমাদের দ্বিতীয় পাখিটাও চলে এসেছে! আর কষ্ট হবে না রে তোমার, একদম আর কষ্ট হবে না। চলে এসেছে ওরা আমাদের পৃথিবীটা পূর্ণ করতে।”
ডক্টররা দ্রুত দ্বিতীয় বাচ্চাটিকেও সামলে নিলেন। একজন নার্স মুচকি হেসে বললেন।
“কনগ্রাচুলেশনস মিস্টার আয়ান! আপনার কোল আলো করে জোড়া চাঁদ এসেছে। একটি ছেলে আর একটি মেয়ে।”
আয়ানের কানে তখন নার্সের অভিনন্দন বা যমজ বাচ্চার কান্নার শব্দ কোনোটাই পৌঁছাচ্ছিল না। তার পুরো পৃথিবীটা যেন ওই একটা মানুষের ওপর থমকে গেছে। সে ধীরলয়ে নিজের মাথাটা তিথির কপাল থেকে সরাল। কিন্তু সরাতেই তার বুকটা ধক করে উঠল।তিথির মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে, চোখ দুটো নিথরভাবে বন্ধ। যন্ত্রণায় যে বুকটা একটু আগেও উঠানামা করছিল, এখন সেখানে এক অদ্ভুত, নিস্তব্ধ নীরবতা। আয়ান কাঁপাকাঁপা হাতে তিথির গালে একটু টোকা দিল।
“তিথি? এই তিথি… কথা বলছিস না কেন? দেখ, আমাদের বাচ্চারা কাঁদছে। চোখ খোল সোনা!”
কিন্তু তিথির কোনো সাড়া নেই। তার শরীরটা যেন নিস্পন্দ হয়ে বেডের সাথে মিশে গেছে। আয়ান মুহূর্তের মধ্যে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। সে পাগলের মতো ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বুক ফাটা আর্তনাদ করে উঠল।
“ডাক্তার! আমার তিথির কী হয়েছে? ও কথা বলছে না কেন? ও ঘুমাচ্ছে কেন ডাক্তার? এই তিথি! চোখ খোল! ডাক্তার, কিছু একটা করুন! আমার তো বাচ্চা চাই না, আমার শুধু আমার তিথিকে চাই! আপনারা ওকে কথা বলাতে বলুন ও কেন এমন হয়ে আছে।”
আয়ান তিথির নিথর দেহটা ধরে এক প্রকার ঝাঁকুনি দিতে লাগল। তার চিৎকার শুনে ওটির ভেতরে থাকা নার্সদেরও হাত থমকে গেল। মেইন ডক্টর দ্রুত এগিয়ে এসে আয়ানকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন এবং তিথির পালস চেক করতে শুরু করলেন।
“মিস্টার আয়ান, শান্ত হোন! প্লিজ দূরে সরুন! নার্স, তাড়াতাড়ি অক্সিজেন মাস্ক আর বিপি চেক করুন! শি ইজ লুজিং কনশাসনেস।”
ডাক্তারের গলার উদ্বেগ শুনে আয়ানের মনে হলো তার কলিজাটা কেউ জীবন্ত টেনে বের করে নিচ্ছে।সে ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার দুচোখ বেয়ে তখন নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। সে আর্তনাদ করে বলতে লাগল।
“আমি ওকে হারিয়ে ফেলব না তো ডাক্তার? এ আল্লাহ আল্লাহ, আমার তিথিকে কেড়ে নিও না… ও তো আমাকে কথা দিয়েছিল আমাকে ছেড়ে যাবে না। হে আল্লাহ আমাকে ভিক্ষা দাও ওকে,ওরে ছাড়া আমি থাকতে পারমু না শেষ হয়ে যামু দোহায় লাগে ওরে দিয়ে দাও আমায়।”
অপারেশন থিয়েটারের ভারি দরজাটা শব্দ করে খুলে গেল। করিডোরে অপেক্ষারত প্রতিটি মানুষের চোখ তখন দরজার দিকে। সবার বুকের ভেতরটা দুরুদুরু কাঁপছে। কিছুক্ষণ আগেই ভেতরে তিথির গগনবিদারী চিৎকার তারা শুনতে পেয়েছে, কিন্তু এখন যে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে, তা যেন আরও বেশি ভয়ংকর।হঠাৎ একজন নার্স হাসিমুখে দুটি কাপড়ে মোড়ানো ছোট ছোট প্রাণকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। সবার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললেন।
“আলহামদুলিল্লাহ! আপনাদের বাড়ির কোল আলো করে যমজ বাচ্চা এসেছে একটি ছেলে আর একটি মেয়ে।”
মুহূর্তের মধ্যে পুরো করিডোরে আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল। সবার মুখ থেকে একসাথে বেরিয়ে এল।
“আলহামদুলিল্লাহ।”
খুশিতে আশিকখান আর আরিফুল খান একে অপরকে জড়িয়ে ধরলেন। বাড়ির বড়রা যেন এই জোড়া খুশিতে নিজেদের সবটুকু দুশ্চিন্তা মুহূর্তের জন্য ভুলে গেলেন।শিহাব এক মুহূর্ত দেরি না করে এগিয়ে গেল। নার্সের কোল থেকে পরম আদরে ছেলে সন্তানটিকে নিয়ে নিজের বুকের কাছে ধরল সে। এরপর অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে বাচ্চার ডান কানে মহান আল্লাহর একত্বের ঘোষণা দিয়ে সুমধুর স্বরে আজান দিতে লাগল। সেই পবিত্র আজানের শব্দে হাসপাতালের করিডোরটা যেন এক প্রশান্তিতে ভরে উঠল।কিন্তু সেই আনন্দের রেশ বেশিক্ষণ টিকল না। তনুজা খান আর আশিক খান ব্যাকুল হয়ে এগিয়ে এসে নার্সকে জিজ্ঞেস করলেন।
“আমার মা কেমন আছে? তিথি ঠিক আছে তো।”
নার্সের মুখ থেকে হাসির রেখাটা মুছে গেল। তিনি করুণ দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বললেন।
“তিথির অবস্থা আসলে খুব একটা স্থিতিশীল নয়। ডেলিভারির ধকল ও নিতে পারেনি, ও বর্তমানে সম্পূর্ণ অচেতন। এখন ওকে অক্সিজেন সাপোর্টে রাখা হয়েছে। বাকিটা আল্লাহর হাতে, ওনার জীবনের জন্য আপনারা সবাই দোয়া করুন।
কথাটা শোনামাত্রই আনন্দের সেই রঙিন ঘরটা যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। সবার মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গিয়ে সেখানে জমা হলো রাজ্যের ভয় আর বিষাদ। আশিক খান মেয়ের এই অবস্থার কথা শুনে দেয়ালে ভর দিয়ে ফ্লোরে বসে পড়লেন, তার দুচোখ দিয়ে অঝোরে জল নামছে। তনুজা খান নিজের আঁচল মুখে চেপে ডুকরে কেঁদে উঠলেন।
“ও আল্লাহ! আমার মেয়েটাকে ফিরিয়ে দাও! আমরা যে এই আনন্দ সইতে পারব না ওকে ছাড়া!”
একদিকে দুই নতুন প্রাণের কান্নার সুর, আর অন্যদিকে তিথির জন্য পুরো পরিবারের নিঃশব্দ হাহাকার হাসপাতালের সেই করিডোরটা যেন এক অদ্ভুত ট্র্যাজেডির সাক্ষী হয়ে রইল।
রাত তখন গভীর। বারোটার স্তব্ধতা চারদিকে। তুরা ব্যালকনির রেলিং ধরে শূন্য দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। শরীরটা তার খুব একটা ভালো লাগছে না,কিন্তু মনের ভেতর তিথির জন্য যে উদ্বেগ কাজ করছে, তার কাছে নিজের শারীরিক কষ্টগুলো তুচ্ছ। একটু আগেই রৌদ্র ফোন করেছিল। রৌদ্রের কণ্ঠে একই সাথে আনন্দ আর বিষাদ তিথির যমজ সন্তান হওয়ার খবরটা শুনে তুরার ঠোঁটে হাসি ফুটেছিল ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই যখন শুনল তিথির অবস্থা ভালো নয়, তখন সেই হাসি মিলিয়ে গিয়ে এক অজানা ভয় জেঁকে বসেছে।
রৌদ্র প্রতি মিনিটে ফোন দিয়ে তুরার খবর নিচ্ছে, তাকে আশ্বস্ত করছে। কিন্তু তুরার মন মানছে না। সে মনে মনে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিল তিথি যেন তার সন্তানদের মুখ দেখার জন্য হলেও ফিরে আসে। ব্যালকনির ঠান্ডা বাতাসে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে তুরা ঘরের ভেতরে আসার জন্য পা বাড়াল।কিন্তু মাত্র দুই পা এগোতেই হঠাৎ মাথাটা তীব্রভাবে ঘুরে উঠল তুরার। তার শরীরের ভারসাম্য মুহূর্তেই নষ্ট হয়ে গেল। মেঝেতে পা ফেলার শক্তিটুকুও সে পেল না। তুরা নিজেকে সামলানোর জন্য হাত-পা ছড়াল, আসবাবপত্র ধরার চেষ্টা করল, কিন্তু সব বৃথা। ‘ঠাস’ করে এক বিকট শব্দে সে শক্ত ফ্লোরের ওপর আছড়ে পড়ল।পড়ার সময় তার পেটে প্রচণ্ড এক ঝাকুনি লাগল। সেই তীব্র ধাক্কায় তুরার পেটের ভেতরটা যেন মোচড় দিয়ে উঠল। যন্ত্রণায় তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। তুরা নিজের দুই হাতে পেটটা শক্ত করে চেপে ধরল, মনে হলো হাজার হাজার সুই একসাথে তার শরীরের ভেতরে বিঁধে যাচ্ছে। সে সহ্য করতে না পেরে আকাশ-পাতাল কাঁপিয়ে এক আর্তনাদ করে উঠল।
“আহহহহহহহহ! আল্লাহহহহহহহ্।”
রানিং…!
Share On:
TAGS: নির্লজ্জ ভালোবাসা, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৩২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৪
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৪
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৩৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৯
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১০
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২২