জাহানারা
জান্নাত_মুন
পর্ব :১৯
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ
🔞 সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।
রাতের প্রকৃতির তান্ডব শেষ হয় ভোরের দিকে। সকাল হওয়ার সাথেই কেটে যায় সকল অন্ধকার। সূর্য উদয়ের সাথে প্রকৃতি আবারো ফিরে আসে তার চাকচিক্য রুপে। পূর্ব দিকে থেকে আসা সূর্যের তীর্যক রশ্মি বৃষ্টি ভেজা সবুজ ঘাসের উপর জমে থাকা বিন্দু বিন্দু কণাগুলোর উপর পড়ায় মুক্তোর মতো চকচক করছে। ব্যস্ত শহরটা আবারও ব্যস্ততায় রুপ নিয়েছে।সকাল হতে না হতেই পথিকরা ছুটছে নিজ গন্তব্যে।যানবাহন, মানুষ, পশুপাখি একথায় সকল কিছুর কোলাহলের মিশ্রণে ভরপুর এই ব্যস্ত জন নগরী।
গতরাতে আমার উপর দিয়ে গেছে ভয়ংকর একটা ঝড়। এই ঝড় প্রকৃতির নয়, আমার চোখের বি’ষ ইফান চৌধুরীর তোলা। সেই ঝড় কখন যে থেমেছে আমি বলতে পারবো না। সকাল আটটা বাজে। আমি এখনো সেন্স লেস হয়ে বিছানায় শুয়ে আছি। বাম হাতে ক্যানুলা লাগানো। শেষরাত থেকে এখনো সেলাইন চলছে। অনেক সময় ধরে হিমশীতল পানিতে ডুবে ছিলাম বলে রাত তিনটার দিকে শরীর কাঁপিয়ে জ্বর আসে। আমার এমন অবস্থা দেখে ইফান ভীষণ বিরক্ত হয়। কারণ আমার দোষেই শরীরের এমন বেহাল দশা হয়েছে। কিন্তু বেশিক্ষণ বিরক্তি ধরে রাখতে পারেনি। অধিক মাত্রায় জ্বর উঠায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। পরে আর কি চৌধুরী বাড়ির ফ্যামিলি ডাক্তারকে কল করে। মাঝ রাত হওয়ায় তিনি আসতে রাজি হয় নি। এতে খ্যাপা বাঘ আরও খেপে যায়।সারে তিনটার দিকে চৌধুরী বাড়িতে ডক্টরকে ইফানের লোকজন তুলে নিয়ে আসে। তারপর আমাকে সেলাইন, ওষুধ পত্র দেয়। উনার কাজ শেষ হলে আবারও ইফানের লোকেরা দিয়ে আসে।
সেই তখন থেকেই জেগে আছে লোকটা। রুমের আলোটা ম্লান। সকল দরজা জানালা বন্ধ, কিন্তু তার সামনে সাজানো ক্রিস্টাল-টপ টেবিলটা ঝলমল করছে দামি “হুইস্কি”বোতলের প্রতিফলনে। প্রতিটি বোতলই যেন অহংকারে দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনে সিঙ্গেল কাউচটায় পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে ইফান চৌধুরী। উদাম শরীর নিচে একটা পেন্ট তাও আবার বিপদ সীমার নিচে নেমে আছে। ঠোঁটের কোণে সিগারেটের শলাকা। কিছুক্ষণ পরপর কুন্ডলী করে মুখ বড়তি ধোঁয়া ছাড়ছে। সে ধীরে ধীরে একটা ডেক্যান্টার তুলে নিল, গাঢ় অ্যাম্বার লিকুইডটা গ্লাসে ঢেলে swirling করলো, যেন প্রতিটি ফোঁটার দাম পরিমাপ করছে। গম্ভীর মুখাবয়ব, গ্লাস ঠোঁটে ঠেকিয়ে একবার ছোট ছোট চুমুক নিচ্ছে আরেকবার সিগারেট ধরছে ঠোঁটের ফাঁকে। তার নিস্প্রভ দৃষ্টি আমার দিকেই নিক্ষিপ্ত আছে। অনেকটা সময় আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে যেন আমার মধ্যে কোনো কিছুর সন্ধান করছে আপন মনে। তারপর ঠোঁটে জ্বালিয়ে রাখা সিগারেটের শলাকাটার শেষ অংশটুকু পায়ের নিচে পিষে কাউচে শরীর এলিয়ে দেয়। চোখ বন্ধ রাখে বেশ কিছু সময়। অতঃপর অস্পষ্ট ভাবে বিরবির করে,
“নারী তুমি ভীষণ ভয়ংকর। তাই তো তোমাকে পুড়াতে আমার এত আয়োজন।”
ইফান আর বেশিক্ষণ ভাবতে পারলো না। তার ভ্রম ভঙ্গ হয় দরজায় জোরে জোরে করাঘাতে। অতন্ত্য বিরক্তি নিয়ে দরজার দিকে একবার তাকায়। তখনই নোহার চেঁচানো গলা শুনতে পায়।
–“ডার্লিং এখনো বেড রুমে কি করছো? ওপেন দ্যা ডোর, আমিও তোমাকে একটু কোম্পানি দেই।”
নোহার গলার আওয়াজ শুনে বিরক্তি তে চোখ মুখ কুঁচকে ফেলে ইফান। আমার দিকে একবার তাকিয়ে দরজার দিকে পা বাড়ায়। ইফান দরজা খুলতেই ওর প্রশস্ত বুকে শরীর লাগিয়ে দু হাতে গলা জড়িয়ে ধরে নোহা। নেকামি করে বলে,
–“বেইবি কাল রাতে কখন রুম থেকে চলে এলে? ডু ইউ নো সকালে তোমাকে দেখতে না পেয়ে কতটা হার্ড হয়েছিলাম?”
–“না এভাবে হবে না। এখন দেখছি থাপ্প”ড়েই তর কু”রকু’রানি থামাতে হবে।”
ভীষণ রাগে চোয়াল শক্ত করে বাক্যটা ছুড়লো ইফান। এতেও নোহার কোনো হেলদোল নেই। গলা জড়িয়ে ধরা নোহার হাতটা ছাড়তে ছাড়তে ইফান দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
–“দূরে সর বান্দির বাচ্চা। আর না তো এখানেই পুতে দিয়ে সারা জীবনের জন্য বেডা মানুষের সাথে তর ঘষলা-ঘষলি বন্ধ করার ব্যবস্থা করবো।””
–“দিন রাত চব্বিশ ঘন্টায় রুমে কি করিস? নাকি ভাবি চব্বিশ ঘন্টায় তোকে সার্ভিস দেয়।আউচচচ!”
আরেকটা পুরুষালী কন্ঠ স্বর কানে পৌঁছাতেই সেদিকে দৃষ্টি ঘুরায় ইফান। পঙ্কজ হাসতে হাসতে নোহা আর ইফানের মাঝে দাড়ায়। পঙ্কজের নোংরা ইঙ্গিত পূর্ণ বাক্যটা শুনে রাগে চোখ লাল টকটকে হয়ে গেছে ইফানের। নিজের রাগ কন্ট্রোলে রাখতে দু হাত মুষ্টি বদ্ধ করে ফেলে। এদিকে পঙ্কজ একই ভাবে দাঁত কেলিয়ে হাসছে। তার চোখগুলো ইফানের চেয়ে অত্যধিক লালচে। অধিক মাত্রায় নে”শা করলে এমনটা হয়ে থাকে। ইফান চোখ বড় বড় করে চোয়াল শক্ত করে পঙ্কজের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে।পঙ্কজ সে সবে পাত্তা দিলো না।
–“আর কত একা একা এমন সুন্দরীর সার্ভিস নিবি? আমাকেও একবার সুযোগ করে দে ভাই।”
শেষ কথাটা বলতে বলতেই ইফানের বাহুতে সামান্য ধাক্কা দিয়ে রুমে প্রবেশ করতে চায় পঙ্কজ। কিন্তু তা তো হলোই না বরং ইফানের শক্ত পোক্ত হাতের চাপেঘাত পঙ্কজের বাম গালে পড়ে। আচমকা ইফানের শক্ত হাতের থাপ্পড় খেয়ে তাল সামলাতে না পেরে পড়ে যেতে নিলে নোহার উপর পড়ে যায়। নোহা শক্ত ভাবে না দাঁড়ালে দু’জনেই মুখ থুবড়ে পড়তো। ইফানের হাতের চড় খেয়ে পঙ্কজের হাত মাত্রা অতিরিক্ত কাঁপতে থাকে। রাগে ওর চোখ গুলো আরও ভয়ংকর রুপ নেয়। ইফান এক পা এগিয়ে পঙ্কজের সামনে দাঁড়ায়। নোহা ভয়ে কাঁপছে। সে ইফান কে খুব ভালো করে চেনে। এখন ইফানকে দেখে তার মনে পড়ে যায় আজকের মতোই একই ভাবে ইফানকে নোহা ভীষণ রাগতে দেখেছিলো।তারপর যা হয়েছিলো, না নোহা আর ভাবতে পারে নি। তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এদিকে দু জোড়া ক্রোধিত নয়ন নির্ভয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। এভাবেই দাঁতে দাঁত চেপে রাগে রিরি করতে করতে ইফান আরেকটি বাক্য ছুড়লো,
–“এটাই লাস্ট টাইম ওয়ার্ন করছি। ওর থেকে তোর কু দৃষ্টি দূরে রাখবি বা”স্টার্ড। আই রিপিট এগেইন,
আমার বউকে ছোঁয়া তো দূর আমি ওর ত্রিসীমানায়ও যদি তোকে দেখি তাহলে তোর বা*ল চুলগুলো একটা একটা করে ছিড়বো।”
পঙ্কজের রাগ আরও বেড়ে চলেছে। সে জন্যই হাত দুটো মুষ্টি করে নিয়েছে। এদিকে ইফানের কথাটা নোহার মুটেও পছন্দ হয় নি। তাই নাক ছিটকে বলেই ফেলে মনের কথাটা,
–“বেইবি বা*ল চুল তো মেয়েদের থাকে ব্রো তো ছেলে….”
বাকিটা আর শেষ করতে পারে নি মেয়েটা। তার আগেই ইফান কড়া দৃষ্টি ওর দিকপ তাক করে ৷ অতঃপর চেঁচিয়ে উঠে ইফান,
–“তুই শা*লি চুপ থাক। না হলে তর সা’উয়ার ভাইয়ের বদলে তর গুলোই ছিরবো, বি’চ।”
ইফানের রাম ধমকে মেয়েটার অন্তর আত্মা কেঁপে ওঠে। এদিকে পঙ্কজ ইফানের দিকে তেড়ে আসতে নিলেই পেছন থেকে আরেকটি মেয়েলি কন্ঠ স্বর কানে আসে। যার ফলে নিজেকে কোনো মতে সামলে নেয় পঙ্কজ।
–“What are you doing here? You’ve all gone crazy. এত সকালে তোমরা বাচ্চাদের মতো চেচামেচি করছ! What happened?”
ধমকাতে ধমকাতে নুলক চৌধুরী ওদের তিন জনের মধ্যে এসে দাঁড়ায়। অত্যন্ত দাপটে একজন মহিলা। মধ্যবয়সী অথচ নাবিলা চৌধুরীর মতোই তার পদচারণ, ভাব ভঙ্গিমা। এখনো যুবতী মেয়েদের মতো নিজেদের সৌন্দর্যকে ধরে রেখেছে। উচ্চতায় নাবিলা চৌধুরীর থেকে সামান্য উঁচু। তারপরও হাই হিল পড়ে চলাফেরা করে। সকল দিক দিয়েই ফরেনার বুঝালেও পড়নের শাড়ি তাদের বাঙালি নিশ্চিত করে। আজকেও একটা কালো Singhania’s এর প্রিমিয়াম কালেকশনের দামি শাড়ি পরনে। বলতে গেলে এই বাড়ির সকলেই শাড়ি পড়ে আর শাড়ির প্রাইজ হাই লেভেলের। যেমনটা আমি আর পলি ও পড়ে থাকি।
–Why aren’t you answering?”
নুলক চৌধুরীর কাটকাট প্রশ্নের উত্তরে ইফান মুখ খুললো। দাঁত কটমট করে বললো,
–“নিজের ছেলেকে সামলে রাখবে মিমি। এক কথা আমি বারবার রিপিট করবো না। এর পরও যদি আমার নির্দেশ না মানে তাহলে আমিও ভুলে যাব পঙ্কি তোমার ছেলে।”
ইফান রাগে বাক্যটা বলেই রুমে ঢুকে ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দেয়। এদিকে অনুভূতিহীন ভাবে বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে নুলক চৌধুরী। তার চোখ মুখ স্বাভাবিক, নেই কোনো রাগ আর না তো হিংসার প্রতিচ্ছবি। বেশ কিছু সময় সেভাবে তাকিয়ে থেকেই পিছন ফিরে যে পথ দিয়ে এসেছিল সেই দিকেই চলে যায়। যাওয়ার আগে নোহা আর পঙ্কজ কে ডাকে,
–এখুনি আমার রুমে আস দু’জন।
মায়ের সাথে নোহাও হাঁটা ধরে।এদিকে পঙ্কজ আরও কিছুক্ষণ ক্রোধিত নয়নে বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে। আর বার বার হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে নাকে ঘষতে থাকে। অতঃপর ক্রুর হেসে বিরবির করে,
–“আর কতদিন পাখিকে খাঁচায় বন্দী করে রাখবি ডিয়ার? very soon, তোর বেড থেকে এই পরীটাকে তুলে এনে আমার বেডে শুয়াবো।
I swear.”
প্রায় সারে বারোটার দিকে আমার ঘুম ভাঙে। তখন আমার শরীর একদমই ফুরফুরে লাগছিল। রাতের সেই ক্লান্তি আর দুর্বলতা কেটে গিয়েছে। তবে শরীর এখনো গরম। ভেতরে জ্বর এখনো কিছুটা আছে। রুমের সকল দরজা জানালায় পর্দা ফেলা। তাই রুমটা মৃদু অন্ধকারাচ্ছন্ন। চোখটা ঘুরাতেই দেখতে পাই আমার পাশে পলি আর ইতি বসে আছে। তখুনি রাতের সব কিছু পরিষ্কার মনে পড়ে যায়। আমি সারা রুমে একবার চোখ বুলিয়ে দেখি লোকটা এখনও রুমে আছে কিনা। আমার দৃষ্টি বুঝতে পেরে পলি বলে,
–“ইফান ভাইকে খুঁজছ ভাবি? কিন্তু ভাইয়া তো তাড়াহুড়ো করে বাবা আর কাকাইকে নিয়ে বেড়িয়ে গেছে রাজনৈতিক কাজে। কি সব ঝামেলা হয়েছে তাই।”
পলির কথার পিছে মুখ কাঁদু কাঁদু করে ইতি বলে উঠলো ,
–“বড় ভাইয়া দিনদিন শ’য়তান হয়ে যাচ্ছে। দেখনা তোমার নাকি রাত থেকে শরীর খা’রাপ আর আমাদের কে বেড়িয়ে যাওয়ার আগে জানিয়েছে।”
আমি ইতির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। মেয়েটা আমাকে আর পলিকে ভীষণ ভালোবাসে। আমি মৃদু হেসে বললাম,
–“বোকা মেয়ে মন খা’রাপ করছ কেন? এই দেখ আমি ঠিক আছি।”
আমার কথার পিছে পলিও মুখটা গুমরা করে বলে,
–“আর বলো না ভাবি, সকাল থেকে ইতি ভীষণ ভয় পেয়ে আছে। আর এখন তোমার শরীর খা’রাপ দেখে তখন কেঁদেও ছিল।”
পলির কথায় আমি চোখ সরু করে তার দিকে তাকালাম,
–“কেন পলি কি হয়েছে?
পলি একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেললো,
–“আর কি বলবো ভাবি কদিন ধরে দেশে যা শুরু হয়েছে। এই দেখ সকাল সকাল নিউজ টিভিতে দেখলাম একটা দশম শ্রেণির স্কুল ছাত্রীকে দুর্বৃত্তরা রে*প করে দিয়াবাড়ি লেখের পাশের জঙ্গলটায় ফেলে দিয়ে গেছে।”
–“আবারো?”
পলির কথা শুনে আমি অবাক হয়ে প্রত্যুত্তর করলাম।এদিকে ছোট ইতি ভয়ে আমার সাথে আরও মিশে গেছে। পলি মনমরা হয়ে উত্তর দিলো,
–“না জানি মেয়েটার পরিবারের কি অবস্থা। কিন্তু জানো ভাবি..”
আমি প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে। সে আবারো বলতে আরম্ভ করলো,
–“যে মেয়েটার লাশ পুলিশ উদ্ধার করেছে তার পরনে আগের লা”শগুলোর মতোই লাল শাড়ি। লাশ দেখে মনে হচ্ছিল নববধু। অথচ শরীরের ভিতরে শতশত কাটাছেঁড়া দাগ।”
ফ্রেশ হয়ে যোহরের নামাজ আদায় করলাম। কিছুক্ষণ পরেই রুমে দাদি আসে। মানুষটার বয়স হচ্ছে দু তলায় কখনো উঠে না হাঁটুতে ব্যথা তাই। কিন্তু আমার শরীর খা’রাপ বলে আর না এসে থাকতে পারে নি। বেশকিছু সময় আমার কাছে বসে গল্প গুজব করেছে। আর দাদির গল্প গুজব মানেই হাদিস শুনানো। এই বৃদ্ধ বয়সে তছবি জপা ছাড়া মানুষ টার আর কোনো কাজ নেই। উনার আদরের ছেলেরা পানিটাও ওনাকে নিজের হাতে খেতে দেন না। মা’র প্রতি সন্তানের এমন আদর যত্ন দেখে ভীষণই ভালো লাগে। তবুও দাদির একটা কষ্ট রয়েই যায়। এই যে হাদিস শুনানোর ফাঁকে ফা্কে মৃত দাদা কে নিয়ে নিজের ভালোবাসার কথা শেয়ার করেন। এটা ভীষণ ভালো লাগে। কষ্টও লাগে নিজের জন্য। দাদার মতোন যদি আমার ঘরের মানুষটাও হতো। অনেকক্ষণ আমার কাছে দাদি থাকে তারপর দাদিকে ইতি নিয়ে যায়। ইফান কড়া আদেশ দিয়ে গিছে বাড়ির সকলকে, আমি যাতে কিছুতেই নিচে না নামি। তাই তো একটু পরপর পলি না হয় ইতি আবার কাকিয়াও এসে দেখে যাচ্ছে।
দুটোর দিকে পলি দুপুরের খাবার নিয়ে রুমে আসে। তার পিছে পিছেই আসে নাবিলা চৌধুরী। এই প্রথম আমি এই বাড়িতে আসার পর এই রুমে ঢুকে নাবিলা চৌধুরী। শুধু নাবিলা চৌধুরীই নয় তার বড় বোন নুলক চৌধুরীও এসেছে। নাবিলা চৌধুরীর আচরণ খিটখিটে। যদিও ওনার ব্যক্তিত্বটাই এই স্বভাবের যা এতদিনে বুঝলাম। কিন্তু নুলক চৌধুরীর আচরণ কেমন যেন অস্বাভাবিক। এই যে সব সময় অনুভূতিহীন ভবে আমার দিকে কেমন তাকিয়ে তাকে যা ভীষণ অস্বস্তিকর। তবে একদমই কথা বলে না।একদিনে যা বুঝলাম এই বাড়ির সদস্য ছাড়া কারও সাথেই তেমন কথা বলে না। এমনকি পলির সাথেও ঠিকঠাক করে বলে না।
–“এখন শরীর কেমন?”
নাবিলা চৌধুরীর গম্ভীর স্বর কানে বাজতেই ভাবনা থেকে বেড়িয়ে আসলাম। নাবিলা চৌধুরী আমার শরীরের অবস্থা জানতে চাইছে এটা অবাক করা বিষয়। আমি পলিকে জিগ্যেস করলাম,
–“এই পলি আমি কি ঠিক শুনছি?”
আমার কথায় পলি ভরকে গেল। ভয়ে ভয়ে নাবিলা চৌধুরীর দিকে তাকালো। একটু আগের স্বভাবিক চেহারাটা নিমিষেই শক্ত হয়ে গেল নাবিলা চৌধুরীর। এদিকে নুলক চৌধুরী আমার দিকে তাকিয়েই কেমন বিরবির করলো। অতঃপর তিনি বিনা বাক্যে রুম ত্যাগ করলো। এদিকে নাবিলা চৌধুরী চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
–“অসভ্য মেয়ে একটা। বেশ হয়েছে শরীরের এমন হাল হয়ে। আরো সারাদিন জামাই নিয়ে পড়ে থাক ঘরে। এখন তো শুধু জ্বর হয়েছে কালে কালে আরও কত কি যে দেখবো!”
তিনি একদমে বলেই যাওয়া ধরলেন। ওনার এমন কথায় আমার মুখ হা হয়ে গেছে। উনার কথা শুনে আবার পলির দিকে তাকালাম,
–“এই পলি সাসু মা শেষে কি বললো এটা?”
এরই মাঝে নাবিলা চৌধুরী রুম থেকে বেড়িয়ে পড়লেন। আমি আর পলির উত্তর শুনার অপেক্ষায় রইলাম না। কারণ এই প্রথম উনি আমাকে বেশি কথা শুনিয়ে চলে যাচ্ছে। এটা আমি কি করে হতে দিই।তাই আমিও গলা ছেড়ে উনাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললাম,
–“সে তো দেখবেনই। কদিন পর আমার বাচ্চা কাচ্চারা আমারই রেপিস্টকে বাবা বাবা বলে ডেকে সারা বাড়িতে ছুটে ছুটে বেড়াবে। তখন আরো ভালো করে দেখবেন….”
চলবে,,,,,,,,,,
জাহানারা
জান্নাত_মুন
পর্ব :২০
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ
🔞 সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।
সন্ধ্যা সাতটা বাজে। আজ সারাদিন রুমেই ছিলাম।তাই রুমে আর বসে থাকতে পারলাম না। আমি নিচে নামতেই ইমরানের সাথে দেখা। গতকাল রাজনৈতিক ঝামেলায় দুই দলের অনেক মা’রামারি হয়েছে। সেই সব ঝামেলার মধ্যে ইমরানও অনেক আ’ঘাত প্রাপ্ত হয়। তারপর থেকেই সেও আমার মতো অসুস্থ হয়ে যায়। আমাকে নিচে নামতে দেখে হেসে বলে,
–“কি ভাবি জান এখন কেমন আছেন?”
ইমরান অনেক মিশুক প্রকৃতির আর ভালো একটা ছেলে, ব্যবহারও অসাধারণ। এই চৌধুরী বাড়ির প্রতিটি মানুষ ভিষণই ভালো। শুধু ব্যতিক্রম ইফান চৌধুরী। আমার তো মাঝে মাঝে মনে হয় নাবিলা চৌধুরী অন্য কোনো বেডার সাথে আকাম-কুকাম করে এই চরিত্রহী”নটাকে জন্ম দিয়েছে। না হলে আমার শ্বশুর মশাইয়ের মতো এত ভালো মানুষের সন্তান কুলা*ঙ্গার কিভাবে হয়? কাকাই আর শ্বশুর মশাই ও ড্রয়িং রুমে ছিলেন। ইমরানের কথায় উনারাও সিঁড়ির দিকে তাকালেন।
–“আরে বড় আম্মুজান এখন শরীর কেমন?”
ইকবাল চৌধুরী আমাকে বিয়ের পর থেকেই এই নামেই ডাকেন। উনি এভাবে যখনই ডাকেন তখনই আমার নিজের আব্বুর কথা মনে পড়ে যায়। আমার বাবা আমার উপর ভিষণ অভিমান করে আছেন। কেন এমন খা’রাপ লোককে শাস্তি না দিয়ে বিয়ে করলাম? তাই তো বিয়ের পর থেকে এখনো তার সাথে কথা হয় নি। এদিকে এগিয়ে এসে ইকবাল চৌধুরীর কথায় আমি হাসিমুখে উত্তর দিলাম,
–“আলহামদুলিল্লাহ ভালো।”
ইকবাল চৌধুরী হেসে বললেন,
–“ফি আমানিল্লাহ। অসুস্থ শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে না থেকে এখানে এসে বস।”
আমি এগিয়ে গিয়ে ইতি আর ইমরানের পাশে সোফায় বসলাম। ইমরান বলল,
–“আপনাকে দেখে এখনো সিক লাগছে।”
আমি ইমরানের দিকে তাকিয়ে তারপর হেসে উত্তর দিলাম,
–“আমার মতো মেয়েরা কখনো দু”র্বল হয় না দেবরজি। আমাদের নিরবতা প্রলয়ঙ্কারী ঝড় তুলার পূর্বাভাস। কখন যে বিনা বার্তায় হানা দিই তা সকলের কল্পনার বাহিরে।”
–“যা বললেন ভাবি। আপনার উপর অঘাট বিশ্বাস আছে আমার। নাহলে কি আমার ভাইয়ের মতো সাংঘাতিক মানুষ কেও পোষ মানিয়ে ফেলেন।”
–“কি নিয়ে এত কথা হচ্ছে দেবর ভাবির মধ্যে আমিও শুনি।”
আমাদের কথাবার্তার মধ্যে কাকিয়া আর পলিও হাজির। কাকিয়ার হাতে ট্রে তাতে গরম গরম পকরা ভাজা। তিনি সবার সামনে টি-টেবিলে রেখে আমাদের পাশে বসলেন। সকলে একটা একটা পকরা হাতে তুলে নিই। আমি পকরায় একটা কামড় দিয়ে বললাম,
–“কি আর কথা বলবো কাকিয়া। এই ভালো মন্দেরই খোঁজ খবর নিচ্ছিলাম।”
কাকিমার সাথে কথা বলে আবার ইমরানের দিকে তাকালাম।
–“তো ভাই শুনলাম গতকাল নাকি বিরোধি দলের হাতে ধুলাই খেয়ে এসেছেন।”
–“ভাবি আর ল’জ্জা দিবেন না এসব বলে।”
ইমরান লাজুক হেসে উত্তর দিয়ে আমার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পলির দিকে তাকালো,
–“এই বউটাও হয়েছে পেট পাতলা। স্বামী ধুলাই খেয়েছে সেটা আবার ঢোল বাজিয়ে সবাই কে জানিয়ে দিয়েছে। ধুর ধুর প্রেস্টিজ আর কিছু বাকি রইলো না।”
ইমরানের কথায় সকলে হেসে দিয়েছে। পলি ইমরানের কথায় মুখ ঝামটি মেরে চোখ উল্টায়। এসব খুনসুটির মধ্যে ইকবাল চৌধুরীর গলা কানে আসে,
–“তো আম্মুজান, বিয়ের পর থেকে আমরাও কেউ তোমার পরিবারের সাথে কথা বলে দূরত্ব ঘুচাইনি। আর তোমার পরিবারও আমাদের সাথে যোগাযোগ করেনি। এভাবে আর কতদিন চলবে বল? তাই আমি ভাবছি আমিই না হয় ভাইসাবের সাথে কথা বলে ছেলের হয়ে আবার মাপ চেয়ে নিবো।”
ইকবাল চৌধুরীর কথার পিছে ইরহাম চৌধুরী বলে উঠলো ,
–“তুমি মা আমাদের ভুল বুঝ না। কি করবো বল? ছেলেটা এমন একটা জঘন্য কাজ করবে আমরা ভাবতেও পারি নি। আমরা ভিষণই ল’জ্জিত। তাই তো এখনো তোমার পরিবারের সাথে কথা বলার সাহস করে উঠতে পারি নি। না হলে ভাই এ নিয়ে আমাকে অনেক আগেই বলেছিল কথা বলতে। আমি লজ্জায় আর এগোতে পারি নি।”
আজ হঠাৎ এই বিষয় গুলো নিয়ে কথা উঠবে আমি ভাবতেও পারি নি। এই পরিস্থিতিটা ভিষণ অস্তিত্বকর আর ল’জ্জাজনক। উনারাও অনেক সংকোচ নিয়ে কথাগুলো বলছে। এই যে বারবার বলতে গিয়েও কেমন যেন দ্বিধা বোধ করছে।
–“আমি আর কি বলবো, আপনারা যা ভালো বুঝেন।”
–“ও এম জি আমাকে ছাড়ায় তোমরা ফ্যামেলি পার্টি করছ?”
আমার বাক্যটা শেষ হলো কি হলো না তার মধ্যেই নোহা এসে হাজির। আচমকা এসে ইমরান আর আমার মধ্যে ফাঁকা জায়গাটায় বসে পড়েছে। তরপরই এক হাত দিয়ে আমার আরেক হাত দিয়ে ইমরানের গলা জড়িয়ে ধরেছে। এতে ইমরান ক্ষিপ্ত না হলেও আমি ভীষণ বিরক্ত। এদিকে পলির চেহারাটাও বাংলার পাঁচের মতো হয়ে গেছে। নোহার বড় হওয়াটা লন্ডনে। তাই তার ব্যবহারও ঐ রকম বেহায়া টাইপের। গুরুজন কিছুই মানে না। আসার পর থেকে কিসব পোশাক পড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর বেশি না ভেবে আমার উপর থেকে ওর হাতটা সরাতে সরাতে রেগে বললাম,
–“অসভ্য মেয়ে আমার উপর থেকে হাত সরাও।”
আমার রা’গের ধার ধরলো না মেয়েটা। বরং করে বসলো আরেকটা আচানক কান্ড। আমার বাক্য শেষ হতে না হতেই শব্দ করে আমার গালে চুমু খেয়ে বসলো। এতে আমার রাগ আরও বেড়ে গেছে। ঠাস করে আমার উপর থেকে হাতটা সরিয়ে উঠে দাঁড়ালাম।
–“বেয়াদব মেয়ে। আমাকে তুমি পুরুষ মানুষ পেয়েছ– যে ডলাডলি করে বেড়াবে।”
–“হেই প্রিটি গার্ল, What does it mean ডলাডলি।”
আমি দাঁতে দাঁত চেপে বললাম _
–“আমার মাথা যত্তসব ফাউল।”
নোহার আগমনে সবাই প্রথমে খুশি হলেও আমার রেগে যাওয়ায় সবার মুখের হাসি নিভে যায়। এদিকে পলি বেশ মজা পেয়েছে তাই তো ঠোঁট টিপে হাসছে। কাকিয়া লতাকে সাহায্য করতে আবার রান্না ঘরে চলে গেলেন। সেখান থেকেও অবশ্য ড্রয়িং রুমে কি হচ্ছে না হচ্ছে সব দেখা যায়। ইকবাল চৌধুরী আর ইরহাম চৌধুরী ও নিজেদের মধ্যে দরকারী আলোচনা শুরু করেছেন। এদিকে নোহা পকরপকর করেই যাচ্ছে। এরই মাঝে ইমরানকে বলে,
–“ব্রো তুমি কি জান ইফান বেইবি কোথায়?”
নোহার কথা শুনে ইমরান আমার দিকে তাকালো,
–“তাই তো, ভাইয়াকে তো আজ সারাদিন দেখলাম না। বের হওয়ার আগে একবার দেখা করে গিয়েছিল। এর পর কি আর বাসায় আসে নি।”
ইমরান জানে না বুঝতে পেরে নোহা আমার সাথে আরও চেপে বসলো,
–“হেই গার্ল আমার ডার্লিং কে কোথায় লুকিয়ে রেখেছ?”
নোহার নেকামি আর গায়ে পড়া বিষয় টা আমার অসহ্য লাগছে। তাই রাগে দাঁতে দাঁত পিষে ফিসফিস করে বললাম,
–“আমার সাউয়া’র চিপায় ভরে রেখেছি দেখতে পরছ না ?”
আমার বাক্য নোহার কানে যেতেই চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। সেও আশ্চর্য হয়ে আমার কাছে ফিসফিস করে জানতে চাইলো,
–ও এম জি where is সাউয়ার চিপা? তুমি বেইবি কে সেখানে কেন লুকিয়ে রেখেছ? তুমি জান আমি কত মিস করছি ওকে? তাড়াতাড়ি বেবিকে বের করে নিয়ে আস।”
নোহার কথা শুনে রাগে মাথায় আগুন ধরে গেল। এই মেয়ে কি ধরনের আবাল বুঝতে পারছি না। রাগে মুখ দিয়ে “চ” বর্গীয় উচ্চারণ বেরিয়ে আসলো। সকলে আমার আর নোহার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। কারণ নোহা এমন ভাবে ফিসফিস করে বলেছে যা তিন মাইল দূর থেকেও মানুষ শুনতে পাবে। হঠাৎ আমার বায়োব্রেট করা ফোনটা বেজে উঠলো। আমি একবার ফোনের স্কিনে তাকিয়ে আরেকবার সকলকে দেখে কল রিসিভ করলাম।
–“হ্যালো!”
অপর প্রান্ত থেকে কি বললো তা আমি ছাড়া আর কেউ শুনতে পেলো না। তবে আমার বিরক্ত চেহারা টা হাস্যোজ্জ্বল হয়ে উঠলো। আমি হাসিমুখে ফোনকলের অপর প্রান্তের ব্যক্তিকে উত্তর করলাম,
–“ওয়াও ভেরি গুড নিউজ। শুনে অনেক খুশি হলাম।”
সবাই আমার হাস্যোজ্জ্বল চেহারার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি কাউকে খুশির কারণ শেয়ার করার প্রয়োজন মনে করলাম না। বরং উঠে দাড়িয়ে পড়লাম ,
–“স্কিউজ মি,আমি একটু আসছি।”
আমি সবাই কে বলে উপরে চলে যেতে লাগলাম। পেছন থেকে নোহা এখনো বলে যাচ্ছে তার বেবির খোঁজ দিয়ে যেতে। এই মেয়েটাকে দেখে আমার এখন যা মনে হচ্ছে ষাঁড়ের মতো খালি বড়ই হয়েছে বুদ্ধিশুদ্ধি বলতে কিছুই নেই মাথায়। যা আছে সবটাতে গোবর ভরা। আমি কয়েকটি সিঁড়ি ডিঙ্গাতেই কারো ফোন কলের শব্দ কানে আসে। আমি পেছনে ফিরতেই দেখি ইমরান ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরেছে। কে বা কেন ফোন করেছে সে সব কিছু জানি না। তবে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ইমরানের মুখটা অন্ধকারে ছেয়ে গেছে ।
–“কি বললে? এটা কিভাবে হলো, আমি এক্ষুনি আসছি।”
ইমরান উচ্চ স্বরে কথা বলায় সকলে তার দিকে দৃষ্টি ঘুরায়। আমি এসবে নাক না গলিয়ে গটগট করে নিজের রুমে চলে গেলাম। এদিকে ইকবাল চৌধুরী আর ইরহাম চৌধুরী উৎসুক হয়ে ইমরানের উত্তেজিত হওয়ার কারণ জানতে চাইলো। ইমরান নিজের রুমের দিকে ছুটতে ছুটতে এটুকু বলে গেল,
–“আব্বু এখন কিছু বলার সময় নেই তাড়াতাড়ি বের হতে হবে। এসে সব বলবো,,”
গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার একটি এলাকা মাওনা। মাওনা চৌরাস্তা খুব বিখ্যাত, কারণ এটি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক এবং শ্রীপুর-কালিয়াকৈর রোডের মিলনবিন্দু। এর আসে পাশে তৈরি হয়েছে অনেক নামি দামি টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস কোম্পানি। মাওনা চৌরাস্তা থেকে ভিতরে বাম দিকে পয়তাল্লিশ মিনিট গেলেই দেখা যায় পুরাতন একটা ফ্যাক্টরি। এই লোকেশনটা লোকালয় থেকে বেশ কিছুটা দূরে। এই ফ্যাক্টরিটা বর্তমানে বন্ধ হয়ে আছে। চারপাশ বাউন্ডারি করা, ফলে ভেতরে প্রবেশ করা সহজ ব্যপার নয়।এটা চৌধুরী বাড়ির পুরাতন একটা ফ্যাক্টরি। মেইন চৌরাস্তার পাশে নতুন করে নির্মাণ করায় এটাকে নতুন ফ্যাক্টরির গোডাউন ঘর হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে গত কয়েক বছর ধরে। এখনো এই গোডাউনে বেশ সিকিউরিটি প্লাস কিছু কর্মী মালামাল সাপ্লাইয়ে কর্মরত।
অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে এখানে আ’গুন ধরে যায় সন্ধ্যা সাতটার দিকে। আজ ইফান আর পঙ্কজ এসেছে এই ফ্যাক্টরিতে। তবে তারা ভেতরে প্রবেশের আগেই ধাও ধাও করে আগুন জ্বলে উঠে। কোনো মতে ভেতরের শ্রমিক রা বেরিয়ে এসেছে। পুরো ফ্যাক্টরিতে আগুন ছড়ানোর আগেই আগুন নিভাতে সক্ষম হয়। তবে যে অংশটা পুরেছে তাতেই যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে। পঙ্কজ রাগে সকল শ্রমিকদের সাথে চেঁচামেচি করছে।অনেকের উপর হাতও তুলেছে। এদিকে ইফান নিষ্পলক ভাবে পুড়ে যাওয়া অংশের দিকে চেয়ে। ইফানের চুপচাপ থাকা পঙ্কজের রাগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
–“ব্রো 78 কোটি টাকার মাল আমাদের চোখের সামনে পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে। আর তুমি স্টিল চুপ করে আছ। How,,!!”
–“তোর কি মনে হচ্ছে পঙ্কি? এমনি এমনি আগুন লেগে গেছে?”
–“I don’t understand anything. তোমার কি মনে হয়?”
–“মনে তো হচ্ছে কেউ ইচ্ছাকৃত লাগিয়েছে। নাহলে এত বড় গোডাউন, যেকোনো সাইডে লাগতে পারতো ঐ জায়গার মতো খালি রুমে কিভাবে লাগলো? I’m sure কেউ খবর পেয়ে গিয়েছিলো মালগুলো এখানে রেখেছি।”
–“যদি কেউ আগুন লাগিয়েও থাকে তাহলে বাইরের মানুষ হওয়া ইম্পসিবল। এই জায়গার আসে পাশে আসারও সাহস করে না কেউ। করলেও আমাদের লোকদের নজরে থাকে। তাহলে কিভাবে কি?”
তাদের কথার মাঝেই ইফানের গাড়ি এসে থামে। ইমরান এখানে আসায় পঙ্কজ আর ইফান দুজনেই একে অপরের দিকে চোখাচোখি করে। এই গোডাউন ঘর যে ইফান আর পঙ্কজ তাদের ইল্লিগাল কাজে ব্যবহার করে তা চৌধুরী বাড়ির আর কেউ জানে না। কিন্তু পারমিশন ছাড়া কে ইমরানকে জানালো? ইফান রাগে একবার সকল শ্রমিকদের দিকে তাকায়। শ্রমিকরা ভয়ে কেউ মুখ খুলে নি। এখানে ইফানের লোক আলাদা। তারা শুধু ড্রা*গস সহ নে’শার জিনিসগুলোকেই সাপ্লাই আর দেখাশোনা করে। তবে এখানে অনেক সাধারণ শ্রমিকও আছে। যারা সাধারণ কাজ করে। এসব বিষয়ে কিছুই জানে না। ওদের মধ্যেই হয়তো কেউ খবর দিয়েছে।
–“ভাইয়া তোমরা ঠিক আছ। গোডাউনের ভেতরের কেমন অবস্থা?”
সন্ধ্যায় খবর পেয়ে ইমরান ছুটে এসেছে উত্তরা থেকে। তাকে খবর দেওয়া হয়েছে ইফান আর পঙ্কজ ভেতরে আছে। তখনই আগুন লেগে গেছে। ইফান ইমরানের কাঁধে হাত রেখে বলে,
–“চিন্তার কিছু নেই সবকিছুই ঠিক আছে। তুই এই রাতে ছুটে আসতে গেলি কেন?”
–“আমি তো ভয় পেয়ে গেছিলাম। যখন কল করে বললো তোমরা ভেতরে আর তখনই আগুন লেগে গেছে।”
ইমরানের কথা শুনে ইফান চেঁচিয়ে উঠলো,
–“এই কোন মাদার*বোর্ড ইমরানকে এই বাল ফালানির খবর দিয়েছে?”
ইফানের কথায় যে লোকটা খবর পাঠিয়েছে সে ঘামতে থাকে। ভয়ে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে সবার পিছন দিয়ে কেটে পরে। বেশ কিছু সময় পর ইফান আর পঙ্কজ স্থান ত্যাগ করে। তবে ইমরান থেকে যায়। কারণ এখানে কোম্পানির পুরনো অনেক দরকারী জিনিস আছে। সব ঠিকঠাক করে আগামীকাল আবার উত্তরা ফিরবে।
রাত বারোটা বাজে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ইফানের গাড়ি উত্তরার চৌরাস্তায় ঢুকে যাবে। ইফানের পারসোনাল ড্রাইভার ফারুক ড্রাইভিং করছে। ব্যাক সিটে বসে আছে ইফান আর পঙ্কজ। ইফান খুব মনযোগ দিয়ে ল্যাপটপ ঘাটছে। আর পঙ্কজ বসে বসে ড্রিংক করছে।
–“কিরে পঙ্কি লন্ডন কবে বেক করছিস?”
খুব মনযোগ দিয়ে আয়েশ করে ড্রিংকস করছিলো পঙ্কজ। ইফানের কথায় এদিকে তাকালো,
–“এখন আপাতত ফিরছিনা।”
–“কেন বিডিতে কি নতুন মধুর সন্ধান পেয়েছিস?”
ইফানের কথায় ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো পঙ্কজ। অতঃপর হেয়ালি করে জবাব দিলো,
–“শুধু মধু না পুরো মৌচাকেরই সন্ধান পেয়েছি। তাই মধু না খেয়ে বিডি ছাড়ছি না।”
পঙ্কির কথায় ল্যাপটপের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ওর দিকে তাকালো ইফান। জিহ্বা দিয়ে গাল ঠেলে ঠোঁট বাকিয়ে পঙ্কির কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,
–“যাই কর বাপজান, আমার মৌচাকের মধু খেতে আসিস না। জিহ্বা কে”টে কু”ত্তা দিয়ে খাওয়াবো।”
এরপর দুজনেই হেসে দিলো। ফারুক মনযোগ দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। ওদের গাড়িটা যখন চৌরাস্তায় উঠবে ঠিক তখনই একটা ট্রাক তাদের গাড়ির সামনে দিয়ে তেড়ে আসলো। ইফানের গাড়ি আর ট্রাকের দূরত্ব মাত্র এক মিটার তখনই কোনো মতে স্টিয়ারিং ঘুরালো ফারুক। তবুও ট্রাকের সাথে সংঘর্ষ থেকে নিজেদের গাড়িকে রক্ষা করতে পারলো না। ফলস্বরূপ গাড়িটার সকল কাচ ভেঙে আরেকটি দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের সাথে ধাক্কা খেলো। সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ জনগণ ভাংচুর মার্সিডিজ টাকে ঘিরে ধরলো। প্রথম ট্রাকের সাথে যখন ধাক্কা লাগে তখনই রক্তাক্ত হয়ে ফারুকের চোখ বুজে যায়। দ্বিতীয় ধাক্কায় পেছন সাইটটা ভালো ভাবেই ভেতরের দিকে ডেবে যায়।
রাস্তায় বড়সড় হাঙ্গামা বেঁধে গেছে। সকলে দাড়িয়ে থেকে চেচামেচি করে যাচ্ছে। কেউই এদিকে আসতে পারছে না। গাড়ির আসেপাশে ভাঙা কাচ পড়ে ফুল ফুটে আছে। এদিকে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের দুটো গাড়ি দুর্ঘটনার স্থানে অবস্থান নেয়। সাধারণ জনতাকে সরিয়ে বেরিকেড দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে দেয়। বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টার পর ভাঙচুর হওয়া গাড়ি থেকে এক এক করে দুটো র”ক্তাক্ত নিথর দেহকে বের করে সাথে সাথে এম্বুলেন্সে তুলে দেওয়া হয়। আরও কিছুক্ষণ চেষ্টার পর বের করে আনা হয় ইফানকে। এতক্ষণে সাংবাদিক রা নিউজ দিচ্ছিলো সাধারণভাবে। তবে জানতো না এটা ইফানের গাড়ি আর ভেতরে ইফান চৌধুরী আছে। মাথা ফেটে সারা দেহ রক্তে ভেসে যাচ্ছে। তবে তাকে চিনতে কারো দেরি হলো না।নিউজের সুর বদলে নতুন করে প্রচার করা হয়,
❝ব্রেকিং নিউজ। মন্ত্রী ইকবাল চৌধুরীর বড় ছেলে ইফান চৌধুরী সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত।অনেকক্ষণ চেষ্টার পর উনার নিথর দেহ বিধ্বস্ত গাড়ি থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। তবে অবস্থা শংকাজনক।❞
ইফানকে স্ট্রেচারে তুলা হয়। এখনো তার জ্ঞান কিছুটা আছে। আসেপাশে কোলাহল হচ্ছে তা শুনতে পারছে। একটা হাত স্ট্রেচার থেকে ঝুলে আছে। সেই হাতের ঘড়িটা ভেঙে কাচ হাতে ঢুকে গেছে। এই তো হালকা চোখগুলো খুলা। সে কি কাউকে খুঁজছে? কি জানি তার কানে আর কোনো শব্দ পৌঁছাতে পারছে না। চোখগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ঠিক তখনই তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো একটি তেজস্বী মুখ। হ্যা, এই তেজস্বী মুখটাকেই গতরাতে ভীষণ স্নিগ্ধ লাগছিলো। অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা হাসিটা ফুটে উঠলো। অ্যাম্বুলেন্সে উঠানোর আগ মূহুর্ত পর্যন্ত নিভু নিভু চোখগুলো নিয়ে অস্পষ্ট ভাবে বিরবির করলো,
–“Now I’m gonna be destroyed. Be happy.”
একটু থামলো। অতঃপর চোখগুলো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে তখনই আবার মৃদু হাসার চেষ্টা করে, শেষ বারের মতো অস্পষ্ট ভাবে বিরবির করে আওড়ালো,
–“Goodbye.My Dear ফা*কিং বুলবুলি।”
চলবে,,,,,,,,,
Share On:
TAGS: জান্নাত মুন, জাহানারা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জাহানারা পর্ব ৬
-
জাহানারা পর্ব ১১+১২
-
জাহানারা পর্ব ২৭+২৮
-
জাহানারা গল্পের লিংক
-
জাহানারা পর্ব ৫৩+৫৪
-
জাহানারা পর্ব ৩৫+৩৬
-
জাহানারা পর্ব ১৭+১৮
-
জাহানারা পর্ব ৫৯+৬০
-
জাহানারা পর্ব ৪৫+৪৬
-
জাহানারা পর্ব ৪১+৪২