Golpo হিপনোটাইজ

হিপনোটাইজ পর্ব ৬


হিপনোটাইজ

তাজনিন_তায়্যিবা

পর্ব:6
⭕পূনর্জন্ম বা টাইম ট্রাবল কোন ধর্মে গ্রহনযোগ্য
_______________________________ নয়,এটি কেবল রুপকথার উপমা।
___________________

বদ্ধ ঘরে ভ্যাপসা গরমে ঘামছে ফ্লোরেন্সা, নাকের ডগায় জমেছে মুক্তদানার মতো ঘাম।আইরিশ ছাড় দেয় নি তাকে, বরং শাস্তি স্বরুপ গত এক ঘন্টা জাবৎ হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আইরিশের মাথায়। প্রেয়সীর তুলতুলে হাতের ছোয়া পেতেই যখন চোখ লেগে আসছিলো, ঠিক তখনি কাঠ কাঠ গলায় আদেশ ছুড়ে দিলো,

“আমার ঘুম না ভাঙা পর্যন্ত এইভাবেই মাথায় হাত বুলাতে থাকবি।”

আর সেই আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করছে ফ্লোরেন্সা। একই কাজ করতে করতে যখন একঘেয়েমি লাগতে শুরু করলো, ঠিক তখনি আইরিশের ঘরের খোলা জানালা দিয়ে সুফিকে দেখতে পেলো। সেই কখন থেকে শব্দবীহিন ইশারায় ডেকে যাচ্ছে সুফি, বোধ হচ্ছে কোন এক জরুরি কাজেই ডাকছে। ফ্লোরেন্সা একটু ঝুকে গিয়ে ঘুমন্ত আইরিশকে পরখ করলো, নাহ! জেগে নেই, গভীর তন্দ্রায় আচ্ছন্ন সে।

ফ্লোরেন্সা বড় করে নিশ্বাস নিলো, বুকে হাত দিয়ে ফু দিয়ে নিলো কয়েকবার, তারপর পা টিপেটিপে টিপটিপ বুকে ছিটকিনি খুললো আলগোছে।দরজা আলগা করেই এক দৌড়ে বাড়ির সীমানার বাইরে চলে গেলো,সুফির কাছে পৌছে হাটুতে দু হাত রেখে হাফাতে হাফাতে বললো,
“কি রে কি হয়েছে এভাবে ডাকছিলি কেনো?”

সুফির কন্ঠে উত্তেজনা,
“আরে সেদিনের সেই লোকটা বাড়ির পাশের ওই রাস্তাটায় আহত হয়ে পড়ে আছে, আমি ভয়ে এগোই নি তোকে ডাকতে এলাম।”

ফ্লোরেন্সার চোখেও স্পষ্ট হলো একই রকম উত্তেজনা,

“কি বলছিস কি, দ্রুত চল, লোকটা কে সাহায্য করা প্রয়োজন।”

কোনকিছু না ভেবেই সুফির হাত ধরে দৌড়াতে শুরু করলো ফ্লোরেন্সা,অদূরে গাছের হেলান দিয়ে বসে আছে প্রিন্স জোসেফ, সেদিনের মতো আজ আর সাথে সৈন্য সামান্ত কেউই নেই।ফ্লোরেন্সা দ্রুত এগিয়ে গেলো।সুফি ঠিকই বলেছে, লোকটার হাত কেটে তাজা রক্ত বের হচ্ছে।রক্ত দেখে ফ্লোরেন্সা হকচকালো, ব্যাতিব্যাস্ত হয়ে হাত চেপে ধরলো জোসেফের,
“একি আপনার এ অবস্থা কি করে হলো। “

প্রিন্স জোসেফের নীল চক্ষু জোড়া আহত, যন্ত্রণায় কেমন কাতর হয়ে আছে, যদিও বা প্রিন্স জোসেফ সে কাতরতা আড়াল করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তবুও ফ্লোরেন্সা বুঝতে পারলো তার চোখের ভাষা।তড়িঘড়ি করে নিজের মাথায় ঘোম দেওয়া ওড়নাটার একমাথা টেনে ছেড়ার চেষ্টা চালালো, কিন্তু ওড়না ছেড়া তার নগন্য শক্তি দ্বারা সম্ভব হচ্ছে না।হতাশ হয়ে সুফির দিকে তাকালো, এতক্ষণ ধরে সুফি মুখ হা করে ফ্লোরেন্সার কর্মকান্ড দেখছিলো। ফ্লোরেন্সার চোখ পাকালো,
“হা করে কি দেখছিস, সাহায্য কর না, ওড়নাটা ছিড়তে পারছি না।”

“তুই সত্যি লোকটার হাত বাধার জন্য পছন্দের ওড়না টা ছিড়ে ফেলবি?”

“পছন্দ অপছন্দ পরে,দেখছিস তো কি পরিমাণ রক্ত বের হচ্ছে, এখন যদি রক্ত বন্ধ না করি তবে তো ওনার ক্ষতি হয়ে যাবে।”

সুফি আর ফ্লোরেন্সা দুজনে মিলেই ওড়না ছেড়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, গাছের সাথে হেলান দিয়ে বসে থাকা লোকটা অনুভুতি শুন্য দুটো নীল চোখ দেখছে সে মুগ্ধতম দৃশ্য, ওড়না ছিড়তে না পেরে ফ্লোরেন্সার বার বার ঠোঁটে কামড় দেওয়া, পদ্ম সরবারের মতো আখি পল্লব কুচকে ফেলা আর সবচেয়ে সুন্দর তম দৃশ্য হলো কথা বলার ফাকে ফাকেই ফর্সা গালে স্পষ্ট হওয়া দুটো টোল। প্রিন্স জোসেফ মুগ্ধতা ভরা কন্ঠ প্রগাঢ় করে ডাকলো,

“এই মেয়ে?”

ডাক শুনেই ফ্লোরেন্সা দৌড়ে এসে হাটু ভেঙে বসলো তার মুখোমুখি, ব্যাস্ত কন্ঠে বললো,
“খুব কষ্ট হচ্ছে না আপনার?এইতো একটু ধৈ,,,,,,

বাকি কথাটুকু শেষ করতে পারলো না ফ্লোরেন্সা,চোখ জোড়া আটকে গেলো নীল রঙা নেত্রমনিতে, অস্থিরতা যেনো জলচ্ছ্বাসের মতো পাল্লা দিয়ে বাড়তে শুরু করলো তার।লোকটার শুন্য দৃষ্টি কেমন বিমোহিত করতে শুরু করলো তার কিশোরি মন। সেই যে ধ্যান আটকালো ধ্যান ছুটে যাওয়ার কোন লক্ষনই দেখা গেলো না, মহাপ্রলয় হলেও হয়তো এই ধ্যান ছুটবে না, এ মোহ কাটবে না, এই দৃষ্টি নত হবে না, কিছুতেই হবে না।

জোসেফ স্বযত্নে টান বসালো ফ্লোরেন্সার বুকের ওড়নায়,সুফি এবং ফ্লোরেন্সা দুজনেই হকচকালো, ফ্লোরেন্সা লজ্জায় আড়াআড়ি করে হাত রাখলো বুকের উপর।চোখে মুখে শঙ্কার রাজত্য,সুফি হাক ছুড়লো,

” একি কি করছেন আপনি? আপনাকে সাহায্য করতে এসেছি বলে এভাবে অসভ্য,,,,,

ওড়না ছেড়ার প্যাচ প্যাচ শব্দ হতেই সুফির মুখ বন্ধ হয়ে গেলো। ফ্লোরেন্সা কৌতুহলি দৃষ্টিতে তাকালো জোসেফের দিকে।জোসেফ তার অনুভূতিশুন্য নীল চোখ আবারো নিক্ষেপ করলো ফ্লোরেন্সার দৃষ্টি তাক করে, ফ্লোরেন্সার দিকে এগিয়ে ধরলো ওড়নার’ টুকরো অংশ,মিহি কন্ঠে বললো,

“ধরো।”

ব্যাস ফ্লোরেন্সা তরিঘরি করে ওড়না টা এক প্রকার ছো মেরে নিয়ে নিলো জোসেফের হাত থেকে, তারপর নিজের বক্ষ ঢেকে নিয়ে ছোট খন্ডটা দিয়ে জোসেফের হাতের কাটা স্থান বাধার চেষ্টা করলো।
নিজের কোলের উপর জোসেফের হাতটা রেখে খুব যত্ন করে সম্পূর্ণ কাজ টা শেষ করলো ফ্লোরেন্সা। জোসেফ বিমূর্ষ যন্ত্রণায় তখনও কাতরাচ্ছে।ফ্লোরেন্সার মায়া হলো খুব, জোসেফের মুখটাই যে এমন, যেনো আল্লাহ তায়ালা নিখুঁত ভাবে তৈরি করেছেন তাকে, কি অপরুপ দেখতে তার দুখানা নীল চোখ, যে চোখে একবার তাকালে গতি হারাতে হয়, পথ চিনে নিজের অবস্থানে ফেরা অসম্ভব হয়ে পরে।

“তোমাকে অনেক ধন্যবাদ মেয়ে।”
জোসেফের এইটুকুন সুরেলা কন্ঠে কেমন মোমের মতো গলে গেলো ফ্লোরেন্সার কোমল মন।রিনরিনে কন্ঠে সেও বললো,

“এভাবে ধন্যবাদ দিতে হবে না, বিপদে পাশে থাকা টা একজন মানুষ হিসেবে আমার দায়িত্ব ছিলো। আচ্ছা আপনার ঠিকানা কোথায়?কাছাকাছি হলে বলুন আমরা পৌছে দিবো।”

ফ্লোরেন্সার কথা শুনে সুফি পেছন থেকে চেপে ধরলো তার কাধ,ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,
“কি বলছিস তুই? লোকটার সেবা করেছিস ভালো কথা এখন বাড়িও পৌছে দিতে হবে? আইরিশ ভাইয়া জানতে পারলে কি হবে ভেবেছিস?”

সুফির কথায় পাল্টা জবাব দেওয়ার আগেই, শোনা যায় জোসেফের আহত কন্ঠ,

“আমাকে নিয়ে বিচলিত হবেন না, আসলে আমাকে আমার মহল থেকে বিতারিত করা হয়েছে, তাই আপাতত এই গাছতলাই আমার বাড়ি।”

ফ্লোরেন্সা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“কেনো?আপনাকে বিতারিত করার কারন কি?আপনি কি কোন অন্যায় করেছেন।”

“অন্যায়কে বাধা দেওয়ার অন্যায় করেছি?”

ফ্লোরেন্সা কপাল কুচকালো,
“আপনার কথা আমি বুঝতে পারি নি।”

“আসলে আমাদের মহলে আমার পিতা মহাশয় দিনের পর দিন অন্যায় অরাজকতা করা শুরু করেছেন।আর তাও তার করা সব অন্যায় আমার নাম করে চালিয়ে দিচ্ছিলেন। আমি সহ্য করতে না পেরে এর প্রতিবাদ করি এবং তার ফলস্বরূপ আমাকে মহল থেকে বিতারিত করা হয়।”

ফ্লোরেন্সার কোমল মন ভারাক্রান্ত হয়ে যায় মূহুর্তেই। দুঃখ ভরা মন নিয়ে বললো,

“তাহলে তো আপনার সাথে খুব অন্যায় হয়েছে, আপনার তো কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।”

“কে বলেছে যায়গা নেই, মহান আল্লাহর সৃষ্টি বিশাল ভ্রম্মান্ডে যায়গার অভাব হবে না।”

“তা কি করে হয়, আপনি চলুন আমাদের সাথে, আমার বাবা খুবই ভালো মনের মানুষ উনি আপনার একটা ব্যাবস্থা করে দিবে।”

“তুমি খুব বোকা মেয়ে,এই গঞ্জের সবাই প্রিন্স জোসেফ কে ভয় পায়, তারা আমার পরিচয় জানা মাত্রই অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করবে।”

“আমি সবাইকে বুঝিয়ে বলবো, এমন কিছু হতে দিবো না আমি।”

“তুমি সত্যিই খুব বোকা মেয়ে, তোমার মনে হয় এইটুকুন মেয়ের কথা পুরো গঞ্জের সবাই বিশ্বাস করবে?”

ফ্লোরেন্সার মনটা কেমন খারাপ হয়ে গেলো, যেমন করে আকাশে জ্বলতে থাকা তারা গুলো হটাৎ করেই খসে পরে তেমন করেই মনের আশা টুকু দপ করেই খসে গেলো তার।

“যাও মেয়ে আমার জন্য ভেবেছো এতেই আমি ধন্য, তোমার এই উপকার আমার সারাজীবন মনে থাকবে।”

ফ্লোরেন্সা দ্বিমত করলো,

“না না আপনাকে এভাবে ফেলে যাবো কি করে, আপনি আমাদের সাথেই যাবেন আমরা আপনার পরিচয় গোপন করে রাখবো।”

সুফি আঁতকে উঠল,
“কি বলছিস তুই? ভেবে বলছিস?এর পরিনতি খুব খারাপ হবে, কেউ যদি আমাদের মিথ্যাচার জানতে পারে তবে গর্দান যাবে।”

“ভয় পাস না সুফি, কিছু হবে না, তুই শুধু নিজের মুখটা বন্ধ রাখবি ব্যাস।একজন বিপদগ্রস্ত মানুষকে ফেলে রেখে যাওয়া অমানুষের কাজ হবে।”

সুফি চটে গেলো,
“যা ইচ্ছে কর, পরে বিপদে পড়লে আমাকে বলতে আসবি না। “

“তুই কিছু না বললে কোন বিপদ হবে না।”

“একটা অচেনা অজানা পথভ্রষ্ট পথিকের জন্য এতো কিছু করা সাজে না মেয়ে।”
আহত কন্ঠে কথাটা বলে ফোস করে নিশ্বাস ছাড়লো জোসেফ।

“আমি একজন মানুষ, মানুষ হিসেবে একজন মানুষের জন্য এইটুকু করতেই পারি।আপাতত বাবাকে আপনার পরিচয় জানাবো না আপনার নাম অন্যকিছু বলবো।”

“কি বলবে শুনি?”

ফ্লোরেন্সা একটু ভাবলো, তারপর হুট করেই বলে উঠলো,
“গঞ্জের লোকেদের কাছে আজ থেকে আপনার পরিচয় হবে তেজ।আপনি দয়া করে আপত্তি করবেন না”

জোসেফের কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো না, কিন্তু মনে মনে বিরবির করলো ঠিকই,

“তুমি এতো সরল কেনো মেয়ে?নিজের বিপদ সাদরে গ্রহণ করার এতো তাড়া কিসের?”


প্রিন্স জোসেফের এক হাত ফ্লোরেন্সার কাধে, শক্ত পোক্ত মানুষটার হাতের ওজনেই ফ্লোরেন্সার প্রান ওষ্ঠাগত হবে হবে ভাব। আব্দুল লতিফ সত্তিই ভিষণ দয়ালু একজন মানুষ, ফ্রিন্স জোসেফের এমন অবস্থা দেখে তিনি চুপ থাকতে পারলেন না, বরং প্রিন্স জোসেফ সুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত এই বাড়িতেই থেকে যাওয়ার কথা বললেন।যযদিও বা প্রিন্স জোসেফের আসল পরিচয় সম্পর্কে অবগত নন তিনি।

বকুল তলা থেকে বাড়ির গেট টা স্পষ্ট দেখা যায়। আইরিশ সেইখানটাতেই দাঁড়িয়ে ছিলো, তার খুব প্রিয় পুস্প ফ্লোরেন্সার কাধে অন্য পুরুষের হাত দেখতেই বুকটা দুমড়ে মুচড়ে এলো, ছলাৎ করে উঠলো কলিজা টা। ক্ষোভে মুস্টিবদ্ধ হলো হাত। হাতের মুঠোয় বকুল ফুল গুলো পিষে ছুড়ে ফেললো অদূরে, দ্রুত কদম এগিয়ে গিয়ে দাড়ালো ফ্লোরেন্সার সামনে, কোনরকম শব্দবিহিন চেপে ধরলো ফ্লোরেন্সার হাত, হেচকা টান দিতেই প্রিন্স জোসেফের থেকে আলাদা হয়ে গেলো সে, তবে হটাৎ আইরিশের রুক্ষ ব্যাবহারে ভয় পেলো ফ্লোরেন্সা,

“কি করছেন ভাইয়া, ব্যাথা পাচ্ছি আমি, ছেড়ে দিন দয়া করে।”

ফ্লোরেন্সার কোন কথাই কানে গেলো না আইরিশের,ফ্লোরেন্সা কে টানতে টানতে নিয়ে গেলো কলপাড়ে,বালতি থেকে ধুপধাপ কয়েক মগ জল ঢেলে দিলো ফ্লোরেন্সার গায়ে, ক্রোধান্বিত কন্ঠে ফ্লোরেন্সকে উদ্দেশ্য করে বললো,

“আমার ব্যাক্তিগত পুস্পে কারো স্পর্শ তো দূর কারো নিঃশ্বাসের দুষিত হাওয়াও সহ্য করবো না আমি।”

দূর থেকে প্রিন্স জোসেফ তার অগ্নিচোখের দাবানলে আইরিশকে জ্বালিয়ে পুরিয়ে দেওয়ার পায়তারা চালাচ্ছে মনের অতলে, এমন ভয়ংকর রাগের কারন তার জানা নেই তার কেবল মনে হচ্ছে ওই মেয়েকে শাস্তি দিতে হলে সেই দিবে, এ অধিকার একমাত্র তার। ক্রোদের দাবানলে যখন দাউদাউ করছে চক্ষু যুগল, ঠিক তখন ভয়ংকর ভাবে ঘার কাত করলো জোসেফ, ভয়াবহ টোনে বিরবির করলো,

“শুধু নিঃশ্বাস নয়, এই পাপির এক জোড়া চোখের ছোয়া লেগেছে ওই পবিত্র ফুলের উপর। আমিও দেখবো তুমি কতকাল সেই পুস্প সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হও।”

চলবে,,,,,,

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply