Golpo হিপনোটাইজ

হিপনোটাইজ পর্ব ৪


হিপনোটাইজ

তাজনিন_তায়্যিবা

পর্ব:4
⭕পূনর্জন্ম বা টাইম ট্রাবল কোন ধর্মে গ্রহনযোগ্য
_______________________________ নয়,এটি কেবল রুপকথার উপমা।⭕


আকাশে দমকা হাওয়ার বেগ একটু বেড়েছে,সাজিয়ে রাখা ফুলের মালা গুলো দোল খাচ্ছে বাতাসের তালে। সন্ধ্যা নেমে এসেছে প্রায়, মাগরিবের আজান জানান দিলো সেই খবর।

অথচ সেই লম্বা চওড়া পুরুষ টা একইভাবে দাড়িয়ে আছে সেই ছোট্ট স্টলটায়।সময় গড়ায়, বিকেল থেকে সন্ধ্যা নামে, সন্ধ্যা থেকে অন্ধকার হতে শুরু করে অথচ গাছের খুটির মতো একইভাবে দাড়িয়ে আছে তাকরিম।

নিস্পাপ যদি দেখতে পেতো? তবে নির্দিধায় পড়ে ফেলতে পারতো এ পুরুষের চোখের ভাষা। প্রগাঢ় চাহুনি মেলে সেই বিকেলে আসা লোকটা এখনো তার দিকে তাকিয়ে আছে, খুব ভালো করেই আঁচ করতে পারলো নিস্পাপ।
মূহুর্তেই মুখাবয়ব কঠিন করে নিয়ে বলে উঠলো,

“কে আপনি? সেই কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছেন, বলবেন তো কি চাই?”

তাকরিম নড়েচড়ে দাড়ালো, পকেট থেকে বেড় করলো আলেকজান্দ্রা পাথর খচিত সেই আংটি।আলগোছে হাত চেপে ধরলো নিস্পাপের।বিদ্যুতিক সকড খাওয়ার মতো কেপে উঠলো নিস্পাপের শরীর, নিজের হাতটা টেনে সরাতে চাইলো, কিন্তু পারলো না, তাকরিমের শক্তপোক্ত হাতের মুঠোয় বন্দি তার হাত।

তাকরিম বিলম্ব করলো না,আংটি টি পড়িয়ে দিলো নিস্পাপের অনামিকায়।আরেকটু আলগোছে তুলে নিলো নিস্পাপের হাতখানি, দু ঠোঁট গোল করে চুমু খেলো আংটির উপর। গাড়ো নিঃশ্বাস আছড়ে পড়লো নিস্পাপের ফর্সা হাতে, ছলাৎ করে শব্দ করে উঠলো বুকটা, যেনো নিশ্বাস আটকে গিয়েছে। অথচ তাকরিমের কন্ঠে প্রেমের তরঙ্গ,

“আমার তোমাকে চাই আলেকজান্দ্রা।”

চট করেই টান মেরে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিলো নিস্পাপ। ভয় আর বিরক্তি দুটোই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।ভয়কে পাত্তা দিতে চাইলো না এই মুহূর্তে, কন্ঠে দৃঢ়তা টেনে বলে উঠলো,

“কে আপনি? আমাকে আলেকজান্দ্রা বলছেন কেনো?”

তারপর ব্যাস্ত ভঙিতে হাতের রিং খুলতে খুলতে বললো,

“এসব কি পড়িয়ে দিয়েছেন, বলা নেই কওয়া নেই সোজা একটা মেয়েকে আংটি পড়ানোর সাহস কি করে হয়?আমার হাত ধরার অনুমতি নিয়েছেন আপনি ?”

তাকরিম শক্ত করে চেপে ধরলো নিস্পার হাত, যার অর্থ আংটি টি খুলতে দিবে না সে।নিস্পাপ রেগে কিছু বলতেই যাবে তার আগেই আয়মানের কন্ঠ শুনা গেলো,

“আপনি আমাদের এমপি তাওসিফ তাকরিম না!”

আয়মানের বিস্মিত কন্ঠে চরম বিস্মিত হলো নিস্পাপ।দেশের এমপি তাওসিফ তাকরিম? হ্যাঁ এই নামটা শোনার সাথে সাথেই মনে পড়ে গেলো সেদিনের ঘটনা। কানের কাছে প্রতিধ্বনিত হলো সেই রাতের গম্ভীর কণ্ঠের কথাগুলো,
“তাওসিফ তাকরিম কাউকে কৈফিয়ত দেয় না।”

কথাগুলো বলতেই নিস্পার মস্তিষ্ক ঝাজিয়ে উঠলো, তরতরিয়ে বাড়লো রাগ, তিরিক্ষি কন্ঠে চেচিয়ে উঠলো,

“এই আপনার লজ্জা করে না দেশের এমপি হয়ে একটা অন্ধ মেয়েকে টিজ করছেন। “

আয়মান ভ্রু কুচকালো,খপ করেই চেপে ধরলো নিস্পাপের হাত,

“কি যাতা বলছো নিস্পা, উনি এমপি হয়ে তোমাকে কেনো টিজ করতে আসবে?”

আয়মানের এমন অধিকার খাটানো দেখে তাকরিমের ললাট শক্ত হলো, দাতের সাথে দাত পিষে এলো আপনা আপনি, চোখের আকৃতি হলো ভয়ংকর,নিজের শক্ত হাতে চেপে ধরলো আয়মানের হাত, দুমড়ে মুচড়ে সরিয়ে নিলো নিস্পাপের হাতের উপর থেকে, গম্ভীর কণ্ঠে ওয়ার্নিং দিয়ে গেলো,

“তাকরিমের জিনিসে হাত দেওয়ার মতো ভুল দ্বিতীয় বার করবেন না, সময় ফুরোতে দেরি জীবন ফুরিয়ে যাবে।”

আর কিছু বলার প্রয়োজন মনে করলো না তাকরিম, চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েও বাড়ালো না, দু কদম এগিয়ে গিয়ে আবারো পিছু ফিরে চাইলো,অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করলো আয়মানের উপর।যেনো চোখের অগ্নিতেই আয়মানকে ভস্ম করার পয়তারা তার।


আরো একটি অভিশপ্ত রাত। আরো একটি মেয়ের জীবনে চরম তম অভিশাপের মূহুর্ত এসে উপনিত হতেই শুনশান রাস্তায় শোনা গেলো সুমধুর সিস বাজানোর সুর।

সুরের গুঞ্জন কানে আসতেই মেয়েটির শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা ঘামের স্রোত বইতে শুরু করলো, আতংকে জর্জরিত মেয়েটি দ্রুত হাটতে শুরু করলো, হাটতে হাটতে সোজা এসে থামল একটি পুরনো বাড়ির সামনে। অথচ লাভ হলো না এক আনা,নীল চোখের অদ্ভুতুড়ে লোকটা পিছু ছাড়ে না তার, সোজা এসে দাড়ালো তার নাক বরাবর ঘেঁষে। মেয়েটি ঠিক যখনি নিজের ভয়াতুর চাহনি মেলে পুরুষটির অক্ষিপুটে তাক করলো, ঠিক তক্ষুনি পুরুষটি তার নীল নেত্র দ্বারা অবশ করতে শুরু করলো তার মস্তিষ্ক।

হটাৎ করেই এক নরম তুলতুলে হাত এসে পড়লো নীল চোখের নীলাদ্রি লোকটার তার মুখের উপর, ধ্যান ছুটে গেলো ওমনি, রমনি ছাড় পেয়ে জীবন নিয়ে পালালো।অথচ সে হাতের বিচরন তার মুখের উপর, হাতটা অদ্ভুত ভাবেই তার নাক, মুখ, চোখ স্পর্শ করে খুটিয়ে খুটিয়ে অনুভব করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

ত্রিজয়ের রাগ সপ্তম আকাশে, এই প্রথম কোন স্বীকার তার হাত থেকে বেঁচে ফিরলো।আর বেঁচে ফেরা মানে তার রহস্য উন্মোচন হয়ে যাওয়া, সেটা ত্রিজয় কিছুতেই হতে দিবে না।প্রচন্ড রাগে ক্ষোভে তুলতুলে হাতটি চেপে ধরলো মুচড়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে, কিন্তু কাজটা করতে গিয়েও করা হলো না, এক রিনরিনে মিষ্টি কন্ঠ কানে এসে ঠেকতেই কেমন বরপের মতো জমে গেলো বক্ষভাগ,

“কে আপনি? আমি কি আপনাকে চিনি?এতো চেনা মনে হচ্ছে কেনো?”

ত্রিজয় নিরব, নীল চক্ষুদ্বয়ের নেত্রমনির কোন প্রতিক্রিয়া নেই।এই মেয়েকে সে সম্মোহন করতে পারছে না, উল্টো ওই মেয়ের হরিনি চোখের দিকে তাকালে কেমন ভস্মীভূত হয়ে যাচ্ছে তার বক্ষকোষ।কিন্তু এটা তো হওয়ার কথা নয়, এটা তো নিয়মের বাইরে, তার বক্ষপটের প্রতিটি স্নায়ুকোষে যেখানে বহু আগে থেকেই অন্যকারো নাম খোদাই করা সেখানে এই মেয়ের প্রতি অসময় উতলা হওয়াটা মোটেই পছন্দ হলো না ত্রিজয়ের। কোনরুপ শব্দ বিহীন প্রস্থান করলো সেখান থেকে।

ফোস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো নিস্পা, মনে মনে ভাবলো সে অন্ধ হয়ে হয়তো কোন বোবাকে প্রশ্ন করে ফেলেছে।আজব ধারণা মনে হতেই ফিক করেই হাসি চলে আসলো ওষ্ঠদ্বয়ে।


অজ্ঞাত মেয়েটি বাড়ি ফিরেছে পর্যন্ত ভয়ে গুটিয়ে আছে , থরথর কাপছে ঠোঁট। চোখের পানি নাকের পানি এক হয়ে গিয়েছে।ভয়ে আতংকে সিটিয়ে গিয়েছে প্রায়। মশা উড়ার শব্দটাও যেনো ভয়ানক লাগছে তার,মনে হচ্ছে সেই নীল চোখের লোকটা এখনো আছে, তার আশেপাশেই আছে, তাকে দেখছে, এই বুঝি তাকে গলা টিপে ধরবে, আতংকে অশ্রুসিক্ত চোখ কেমন ভয়ংকর দেখাচ্ছে তার।

অত:পর ঠিক সেটাই হলো, যেটার শঙ্কায় প্রান ওষ্ঠাগত হতে যাচ্ছিলো প্রতিটি মিনিটের কাটা পাল্লা দিয়ে।জানালার পর্দা ভাজিয়ে বেড়িয়ে এলো ত্রিজয়, ঠোঁট গোল করে একই সুমধুর সুর বাজাতে বাজাতে এগিয়ে আসছে সে।মেয়েটি কান চেপে ধরলো, শুখনো ঢোক গিলে চিৎকার করতে যাবে তৎক্ষনাৎ শক্ত হাতে মুখ চেপে ধরলো ত্রিজয়।নিজের ধারালো প্রগাঢ় চাহুনি নিক্ষেপ করলো মৃত্যু ভয়ে জর্জরিত একজোড়া আতংকিত অসহায় চোখে। মেয়েটি খেই হারালো, কিছুতেই এড়াতে পারলো না সে তীক্ষ্ণ চাহুনি, কিছু সময়ের ব্যাবধানে রুপান্তর হলো এক কাঠের পুতুলে, যার শরীরটা তার নিজের হলেও মস্তিষ্কটা ত্রিজয়ের কন্ট্রোলে।

সাথে নিয়ে আসা ছুড়ি টা এগিয়ে দিলো মেয়েটির হাতে, শীতল কন্ঠে এক লোমহর্ষক আদেশ ছুড়ল,

“কিল ইউর পেরেন্টস, কুইক।”

আদেশ করা মাত্রই মেয়েটি নিজের ঘর থেকে বেড়িয়ে হাটা ধরলো নিজের বাবা মায়ের কক্ষের দিকে।তার বাবা মা ঘুমে আচ্ছন্ন, ঘুমের মধ্যে হয়তো নিজের মেয়ের ব্রাইট ফিউচার নিয়েই কতশত স্বপ্ন দেখছে, অথচ তারা ঘুনাক্ষরেও টের পেলো না তাদের মেয়ের হাতেই তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হতে চলেছে।

চালের বস্তা ফুটো করার মতোই অনবরত ছুড়ি চালাচ্ছে রমনি, নিজের বাবা মায়ের রক্তে সারা মুখ রঞ্জিত তার, অথচ প্রানহীন মেয়েটির হাত থেমে নেই, তার কাজে সে অনড়। যতক্ষণ না পর্যন্ত তার বাবা মায়ের শেষ প্রানবিন্দু খানি বেড়োলো ততক্ষন পর্যন্ত তার হাতটাও থামলো না। অত:পর সবকিছু শেষ করে নিজের গলায় ছুড়ি চালিয়ে দিলো সুক্ষ্মভাবে। আরেকটি অভিশপ্ত রাত কেড়ে নিলো একটি হাস্যজ্বল পরিবার। রাত পোহালে যাদের কতশত স্বপ্ন পুরনের কথা ছিলো।


“আমি তোমাকে ভালোবাসি আলেকজান্দ্রা, তুমি আমার কাছে মহা মূল্যবান রত্ন।যদি আরও একটি জন্ম সুযোগ পাই তোমায় বুকের ভেতর আগলে রাখবো আমি,এই জনমের সমস্ত অভিযোগ পুষিয়ে দিবো নাহয়।”

অপরদিক থেকে আরেকটি চিৎকারের আওয়াজ ভেসে আসে,

“পৃথিবী ধ্বংস হবে, জীবন ফুরিয়ে যাবে, কিন্তু ভালোবাসা ফুরাবে না।এ জন্মে না হোক পরের জন্মে তোমাকে আমার হতে হবে ব্লু ব্লাড গার্ল।”

মেয়েটির চেহারা ইতমধ্যে নীল বর্ন ধারন করলো,কণ্ঠনালী জখম হয়ে গিয়েছে, অনেক কথা বলতে চাইছে অথচ মুখে আনতে পারছে না।চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো ফোটা ফোটা জল, ঠোঁট কামড়ে আরেকটু সময় ভিক্ষা চাইলো প্রভুর নিকট, ভেঙে ভেঙে বললো,

“পূনর্জন্ম বলে কিছু না হোক, এমন বিষাক্ত ভালোবাসা দ্বিতীয়বার না আসুক।”

মেয়েটি ঘন অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠলো নিস্পাপ।কেমন হাসপাস লাগছে তার, যেনো স্বপ্ন গুলো জীবন্ত, তার সামনে ঘটছে। হাফাচ্ছে সে, এমন ভয়ংকর দৃশ্য কেনো আসে তার স্বপ্নে, কারা ওরা?কাকে ভালোবেসে পূনর্জন্ম চায়? আর ওই মেয়েটি কেনো মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটপট করছিলো? কেনো বলছিলো ভালোবাসা বিষাক্ত?

চলবে,,,,,,,,

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply