Love_or_Hate
|#পর্ব_১৫|
ইভেলিনা_তূর্জ
❌কপি করা সম্পূর্ন নিষিদ্ধ ❌
হোটেলের ঘূর্ণায়মান গ্লাস-ডোর ঠেলে বাইরে পা ফেলার সাথে সাথেই রোজের বুকের ভেতর বাতাসটা তীব্র ব্যথার মতো ধাক্কা দিলো।প্রচন্ড ঠান্ডা হাওয়ায় কাঁধ কেঁপে উঠলো, কিন্তু পিছনে তাকানোর সাহসও পেল না আর।মস্তিষ্ক যেনো যেনো কূলকিনারা হারিয়ে সর্বহারা হয়ে বসে আছে।গাড়ির চাবির রিংটা হাতে মুঠো থেকে খুলে পার্কিং ল’টের সমস্ত গাড়িগুলো দেখতে লাগলো। রোজ দূর থেকে চাবিটা ক্লিক করতেই,বিপ বিপ ধাতব শব্দে গাড়ির লাইট দু’বার জ্বলে উঠলো। দরজা খুলে বসতেই হাত দুটো কাঁপছিল এমনভাবে যেনো হাড়ের ভেতর কেউ হাতুড়ি মারছে।নিজের কার নিজে ড্রাইভিং করা মেয়ে যেনো কিছুদিনের ব্যাবধানে সব গুলিয়ে ফেলেছে,মনে হচ্ছে জীবনের এই প্রথম ড্রাইভিং সিটে বসেছে সে।শুষ্ক কাঁপন ধরা হাতে ইঞ্জিন স্টার্ট দিতে গাড়িটা গর্জে উঠলো, রোজ অ্যাক্সেলেটরে চাপ দিতেই গাড়ি সজোরে সামনের দিকে ছুটলো অসহায়, ব্যাকুল, কিন্তু ইউভানের খাঁচা থেকে বেঁচে থাকার মরিয়া যুদ্ধ যেনো প্রতিটি গিয়ার বদলে চিৎকার করে উঠছে।যেটা তার দেশে থাকা অবস্থায় করা উচিত ছিলো।তাহলে তো এতোদিন এতো অন্যয় অত্যাচার সহ্য করতে হতো না।পৃথিবীতে যারা অনাথ তারা কি বেঁচে থাকতে পারে না একা।তারা পারলে রোজের জন্যে একটা না একটা ব্যবস্থা করে দিবেন সৃষ্টিকর্তা।
ঐদিকে ইউভান সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে প্রায় লাফিয়ে শেষ ধাপে এসে পড়লো।মাথা ফেটে র’ক্ত তখনো ঝরছে, কিন্তু তার চোখে যেনো রক্তের চেয়ে বেশি আগুন।হোটেলের রিসিপশন ডেস্কের সামনে ম্যানেজার রিজভী টেলিফোন নামাতে, ইউভান এসে তার কলার চেপে কপালে রিভলবার ঠেঁকিয়ে হুমকিস্বরে বলল,
-“সবকটা কাপুরুষের দল।একটা মেয়েকে আটকাতে পারলি না।সবকটাকে জীবন্ত মাটি চাপা দিয়ে দিবো।”
নিজের কপালের উপর রিভলবার দেখে ঘামতে শুরু করলো রিজভী।বাকি স্টাফরাও মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকলো।তবে ফি’মেল স্টা’ফরা ঠোঁট ফাঁক করে ইউভানের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলো।ইউভান শরীরের উপর অংশ সম্পূর্ণ উ’ন্মুক্ত হওয়ায়,ছয় তাকের পেশিগুলো দৃশ্যমান হয়ে আছে।ইউভানের মন মাতানো সৌন্দর্যে মোহিত হয়নি তা এই কোপেনহেগেন সিটিতে খুব কম মেয়ে আছে,তবে তাকে এভাবে দেখার সৌভাগ্য ক’জন নারীর বা হয়ে থাকে।ফ্লোর ক্লিনিং করা অবস্থায় একজন ফিমেল স্টাফ মাথা ঘুড়িয়ে পড়ে গেলো অপরজনের কাঁধে উপর।মুখ থেকে অস্পষ্ট একটা স্বর ভেসে উঠলো,
-“ওমাই গড।ড্যাম’য়েইন হ’ট”
তবে ইউভান আশেপাশে তাকালো না,রিসিপশন ডেস্ক থেকে একটা চাবি নিয়ে উদম শরীরেই হোটেলের সামনে ভ্যালেটের বাইকটা টেনে তোলে, যেনো তার কাছে বাইকটা লোহার না, কাগজের টুকরো। তবে ইউভান বেরিয়ে যাওয়ার পর পরি ম্যানেজার রিজভী মাথার ঘাম মুছে টেলিফোন হাতে নিয়ে নাম্বার চেপে কল লাগায় তড়িঘড়ি করে।
ইঞ্জিন স্টার্ট হতেই হঠাৎ পুরো সিটি কাঁপন তুলে গর্জে ওঠে বাইকটা।পরমুহূর্তেই বাইকটা ছুটে গেল রাস্তায়, রোজের গাড়ির পেছনে। ইউভানের গলায় গর্জনমাখা শ্বাস যেনো ইঞ্জিনের সাথে মিলেমিশে আরও বি’কট হয়ে উঠলো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার পিচ্ছিল হাসি কানে বাজলো,
“ধরতে পারবো না কি ভেবেছিস।খোলা আকাশে মুক্ত পাখির ন্যায় ডানা ঝাপটালেও, দিনশেষে তোকে রিক নামক খাঁচায় ফিরে আসতে হবে।বোকা হরিণী। ইউ আর স্যাচ্ অ্যা ব্লাডি ফো’ল উই’মেন”
মূহূর্তেই রোজ গাড়ির ড্যাশ ক্যামেরায় চোখ ফেলতেই ভয়ার্তভাবে দেখলো ইউভানের বাইক নিয়ে তার পিছনে।এতো তাড়াতাড়ি কি করে এলো ভাবতে কলিজার পানি নিমিষেই শুকিয়ে এলো তার।ইউভানের বাইকের গতি অস্বাভাবিক। তার পেছনে আরও দুটো কালো SUV পুরো শক্তিতে তাকে অনুসরণ করছে। রোজের সারা শরীর ঠান্ডা ঘামে ভিজে গেলো,শার্টের উপরের দুটো গুতোমগুলোও লাগাতে পারে নি।পা অর্ধেক ন’গ্ন,হিমশীতল তুষারের ঝরছে আকাশ বেয়ে,উত্তরে হাওয়া গাড়ির জানালা বেয়ে ঢুকতেই রোজের গায়ের লোম দাঁড়িয়ে উঠলো। গাড়ি আরও স্পিডে তুলতেই স্টিয়ারিং তার হাত থেকে প্রায় ফঁসকে যাচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো বুকের ভিতর থাকা হৃদপিণ্ডটা লাফিয়ে উঠছে।পশ্চাৎ থেকে ইউভানের দানববীয় কর্কশ গলায় বলা কথাটা কানে ভেসে আসলো রোজের,
-“গড প্রমিস আই উইল ফা*ক ইউ ইডিয়ট। গাড়ির ব্রেকে পাঁ রাখ শয়তানি, গাড়ি থামা বলছি।আই স্যাড স্টপ দ্যা কার।আমি কিন্তুু সু’ট করে দিবো।
রোজ ব্রেকে পাঁ রাখলো ঠিকি তবে চাপ প্রযোগ করলো না।গাড়ির স্পিড আরও তিব্র করে আওরালো,
“-কখনোই না।যদি মরতে হয় এভাবে মরবো।তাও আপনার মতো শয়তানের হাতে না।নাহলে মরে গিয়েও আফসোস থেকে যাবে।শান্তি পাবো না আমি।আর না আমার আত্মা শান্তি পাবে।”
রোজের গাড়ি স্পিড বাড়তেই ইউভান বাইক ফুলস্পিড দিয়ে রোজের সামনতালে বাইক এনে,বন্দুক তাক করে চোয়াল টানটান করে শীৎকার দিয়ে বলল,
-“ওই বান্দি।গাড়ি থামাতে বলছি না।গাড়ি আমার, শার্টও দেখছি আমার।খুব তো আত্মসম্মানের বড়াই করলি।এখন কি রিক চৌধুরীর শার্ট গায়ে দিতে লজ্জা করলো না।”
ইউভান বাইক ছেড়ে দিয়ে দু’হাতে হেলমেট খুলে দিয়ে দু-ভ্রু উপর নিচ করে রোজের গাঁ জ্বালানো কথা ছুঁড়ে মারলো,
-“আমায় ফিল করা ভালোই নিন্জা টেকনিক অবলম্বন করেছিস।আগে বলতি ইংলিশ মুভির মতো খোলা আকাশের নিচেই না হয় রোমান্স করতাম।একেবারে মা’লে লাল হয়ে যেতাম”
রোজ গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে ঘাড় পাশ করে ইউভানের দিকে তাকিয়ে নাক ছিটকালো।চোখের কোনে জমা উঠা নোনা জল এক হাতে মুছে গাড়ির জানালাটাই লাগিয়ে দিলো।মৃত্যুর পরোয়া না করে এবার গাড়ি ফুল স্পিড দিলো।
এ জীবনে না হয় ম’রে যাক, কিন্তু ইউভানের হাতে নয়,কখনোই নয়।
সামনে তিন রাস্তার মোড় এসে পড়লো একটা সোজা যায় শহরের ব্যস্ত কেন্দ্রে, বামদিকের রাস্তাটা সেতুর দিকে, আর ডানদিকে রেলপথ পেরিয়ে যায় হাইওয়েতে। রোজ কোনটা নেবে ঠিক করার আগেই পিছনে বাইকের হর্ন এমনভাবে চিৎকার করে উঠলো যেনো ইউভানের রোষানল তাকে গ্রাস করছে। রোজ মরিয়া হয়ে ডানদিকের স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে দিলো। গাড়িটা মোড় নিতে না নিতেই পিছলে গেল, প্রায় ঘুরে যাওয়ার মতো অবস্থা তবুও থামলো না।
ইউভান বাইকের ব্রেক কষে বিপরীত পাশের ঘুরপথ ধরলো। হেডলাইটের ঝলকানি আর রক্তভেজা মুখের সাথে তার বিকৃত হাসিটা রোজের চোখে ছাপ ফেললো সে যেভাবেই হোক রোজকে ধরবে, ভেঙে ফেলবে, নিজের করেই নেবে।ইউভান রোজের বিপরীত পাশে মোড় নিয়ে সোজা তার গাড়ির মুখোমুখি হওয়ার উদ্দেশ্য গেলো।এ রাস্তা দিয়েও সোজা রেলওয়েতে যাওয়া যায়।তার পিছনের কালো দুটো গাড়িকে পাঠালো সেতু বরাবর যেনে সর্বত্র দিয়ে দিয়ে রোজকে ঘ্রাস করা যায়।
রাতের বাতাস হাহাকার করতে লাগলো, শহরের আলো লম্বা ছায়া ফেলল রাস্তার উপর। রোজের গাড়ি তখন রেলপথের ঠিক উপরে। দূরে বিশাল ট্রেনের আলো দেখা যাচ্ছে অতি কম সময়ে রেলওয়ে পার হলে বাঁচবে, নইলে চলন্ত রেলগাড়ীর নিচে চাপা পড়বে কালো মার্সিডিজটা।
গাড়ি তখনো পূর্ণগতিতে ছুটছে।
ইউভানের বাইক ট্রাফিক ছিঁড়ে বাজপাখির মতো কেটে এগিয়ে আসছে।কিন্তুু অপ্রত্যশিত ঘটনা ঘটলো ঠিক তখন যখন ইউভানের বাইক রং ট্রার্ন নিলো।অস্বাভাবিক ভাবে খালি রাস্তায় কোত্থেকে যেনো একটা বিশাল কন্টেইনার ট্রাক বাইকের সামনে ব্রেক করে দাঁড়িয়ে গেলো।ঘটনাটা আচমকা হুট করে ঘটলো যে বাইক স্টার্নিংয়ে পারদর্শী ইউভান ব্রেক চাপার সুযোগি পেলো না।বাইকের গতি তখনো ফুল স্পিড দেয়া।
এক মুহূর্ত,
একটা বিস্ফোরণ-সদৃশ ক্র্যাশ,
লোহার আর প্লাস্টিকের ভাঙাচোরা শব্দে রাতটা থরথর করে কেঁপে উঠলো।ইউভানের বাইক উড়ে ট্রাকের পাশে গিয়ে ভয়াবহভাবে আছড়ে পড়লো। ধোঁয়া, টায়ারের দাগ, ছিটকে যাওয়া লোহা সব মিলে যেনো কেউ রাস্তায় নরকের দরজা খুলে দিয়েছে।মাথায় গুরুতরো ভাবে আঘাত পেলো।হাতের পায়ের চা/মড়া ছিলে গেলো।ফর্সা শরীরে পুরনো ক্ষতের সাথে যুক্ত হলো আরও মারা’ত্মক ক্ষত চিহ্ন। হঠাৎ করে কি হলো ইউভান বুঝে উঠার আগে দু-চোখ জোড়া বন্ধ হয়ে এলো।মাথা ফেটে গরম র’ক্ত রাস্তায় জমাট বাঁধা তুষারে মিলেমিশে র’ক্তবর্ণ ধারণ করলো।
এদিকে ঠিক একই সময়ে,
রোজের গাড়ি রেললাইন পেরোতেই ট্রেনটা প্রচণ্ড শব্দ করে ছুটে এলো। গাড়িটা রেলপথ পেরোলো ঠিকি তবে, স্টেশন মাস্টার ছুটে এলেন, গাড়িটা ব্রেক ফিল হয়ে একটা বড় পাইন গাছের থাক্কা খেলো সজরে। গ্রাস করে নিলো,এক মুহূর্তে আগুনের লেলিহান শিখা ধোঁয়া হয়ে উপরে ভেসে উঠলো।ট্রেন মাস্টার শুধু চলন্ত রেলগাড়ির এক পাশ থেকে দাউ দাউ করে জ্বলা আগুনের শিখা দেখলেন।রেলরাস্তার ধারে শুয়ে থাকা গৃহহীন মানুষগুলো এসে দাঁড়িয়ে পড়লো।শুধু ট্রেনটা যাওয়ার অপেক্ষা।
রাত থেমে রইলো আগুনের গন্ধে, ভাঙা ধাতব শব্দে, আর এক দমবন্ধ অন্ধকার নীরবতায়।
|ঢাকা,বাংলাদেশ |
সকাল সকাল একটা পরিচিতো পুরুষালীর কন্ঠে তূর্জ হাউসের কিচেন থেকে বেরিয়ে এলো তিশা।ইমরান চৌধুরী তখন প্রথম আলো পৈত্রিকা পড়ায় ব্যাস্থ।তিশা রোজের বাবার জন্যেই চা বানিয়ে সবেই নিয়ে আসতো তবে হঠাৎ রোজের নাম ধরে বারবার ডাকতে থাকা পুরুষ কন্ঠের শব্দে তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে এলো।ইমরান চৌধুরী মুখের সামনের থেকে পএিকা রেখে চোখে চশমাটা লাগিয়ে নিলেন।
রোজ!রোজ!রোজ!
ইমরান চৌধুরী সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন। চিন্তে পাড়লেন না,তবে চেহারাটা পরিচিতো মনে হলো।হঠাৎ করে অচেনা ব্যক্তি বাড়িতে প্রবেশ করে রোজের নাম ধরে ডাকায় বেশ্ বিরক্তি স্বরে বললেন,
-“কে, তুমি?”
তিশা এসে ঠাঁই হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।প্রথমে চিন্তে না পারলেও এখন চেহারাটা স্পষ্ট তার কাছে।চিনবে নাই বা কেনো।তিশা চায়ের কাপটা টেবিলের উপর রেখে সামনে এগিয়ে এলো।অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ থেকে অবিশ্বাসো কন্ঠ ব’লে উঠে,
-“আমি যদি ভুল না করি, তাহলে আপনি রায়হান ভাই।মানে রায়হান মির্জা তাইতো।”
রায়হান মির্জা কাল রাতের ফ্লাইটেই সুদূর আমেরিকা থেকে বাংলাদেশ এসে পৌঁছেচে। এয়ারপোর্ট থেকে সোজা চলে এসেছে তূর্জ হাউসে।চারবছর পর ডাক্তারি শেষ করে দীর্ঘ আপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে রোজের খোঁজ এসেছে। কিছুক্ষণ পূর্বে,
রায়হান যখন গাড়ি থামিয়ে ছুঁটে আসে গেট ঠেলে ভিতরে ঢোকে। গেটে থাকা গেট ম্যান অবাক হয়ে উঠে দাঁড়ায়।
—”আপনি? কার সাথে দেখা করবেন?”
রায়হান শীতল চোখে তাকায়, তবে গলায় কোনো দম্ভ নেই শুধু ব্যাকুলতা।
—রোজ তূর্জ। ও কি আছে?
গ্যাট ম্যান কেমন যেন অস্বস্তিতে গলা খাঁকারি দেয়।
—”ম্যাডাম তো, এই বাড়িতে নেই স্যার।”
রায়হানের চোখ ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে ওঠে।
—”কোথায় গেছে?”আর তুমি কে।মোখলেস চাচা কই?”
—” অনেকদিন হলো ম্যাডাম বাড়িতে থাকেন না।মোখলেস তো আমার আব্বা ছিলো।তিনি একবছর আগে মারা যান।তারপর থেকে আমি এনে কাজ করি দারোয়ানের।”
রায়হানের বুকের ভেতরটা ঝাঁকুনি খায়।
ও গেটের গ্রিল ধরে এগিয়ে আসে, বাড়ির প্রতিটা দেয়াল যেন ওকে চেনে। আর রোজ নেই শোনেই ভিতরে পাঁ ফেলে রোজের নাম ডেকে চিৎকার করে ডাকতে থাকে।
তিশা রায়হানকে চিনে দেখে ইমরান চৌধুরী কিছুটা অবাক হয়ে তিশাকে জিজ্ঞেস করে,
“-কে এই লোক।তুমি চিনো তাকে।?
-” হ্যাঁ,চিনবো না কেনো।”
রায়হান তিশাকে চিনে ফেললো।তিশা রোজের বেস্ট ফ্রেন্ড। রায়হান তিশাকে দেখে তিশার সামনে এসে দাঁড়ায়।ব্যাকুল স্বরে ব’লে,
-“তিশা তাই না।আপনি যেহেতু এ বাড়িতে, তাহলে রোজেরও থাকার কথা। দারোয়ান যে বললো রোজ বাড়িতে নেই। কোথায় সে।ডেকে আনুন।বলুন আমি এসেছি।”
ইমরান চৌধুরী কিছু বুঝে উঠতে পারলেন না।তিনি কোনো ঝামেলা চান না।তার পরেও তিশার দিকে রাগান্বিত চোখে তাকিয়ে আবার রায়হানের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে জবাব দেয়,
-“কথা কি শুনতে পাওনি, রোজ এ বাড়িতে আর থাকে না।”
-“আঙ্কেল।আমি তো সেটাই জানতে চাচ্ছি।সে কোথায়।”
একটু থেমে ভারী শ্বাস নিয়ে রায়হান আবার বলল,
-“রোজ কোথায় তিশা, তুমি তো ওর বেস্ট ফ্রেন্ড। আমাকেও চিনো আমি কে।আমি কিন্তুু আজ ফিরেছি।বহুদিন দূরে ছিলাম রোজকে ছেড়ে, আমার আর সহ্য হচ্ছে না।লোকেশন দাও কোথায় আছে বলো।আমি সেখানে গিয়ে দেখা করবো।”
তিশা শুকনো ঢুক গিললো।এখনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে তার।ইমরান চৌধুরীর হাত ধরে তাকে বসিয়ে দেয়।রিলেক্স হতে বলল।তবে ইমরান চৌধুরী কড়া গলায় জবাব দিয়ে দিলো।
-“তুমি যেই হওনা কেনো।শুনে রাখো।রোজের যেখানে থাকার কথা, সে সেখানেই আছে।”
ইমরান চৌধুরীর বেখায়ালি কথায় রায়হান চটে যাচ্ছে দেখে,তিশা তড়িঘড়ি করে ইউভান যে নিয়ে গেছে তা সরাসরি না বললেও।এক কথায় দম ছেড়ে ব’লে দেয়।
-“রোজের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। রোজ স্বামীর বাড়ি,সংসার করছে। আর,কিছু বলতে পারবো না আমি।ভাইয়া আপনি এখন যেতে পারেন।রোজের বাবার শরীর তেমন ভালো না।গো প্লিজ। “
রোজের বিয়ে হয়ে গিয়েছে কথাটা কানে বজ্রাঘাত করলো রায়হান এর।বা হাতের ধূসর কোর্টটা পড়ে যায় ফ্লোরে।পায়ের নিচের মাটিটা যেনো মুহূর্তেই ফেটে দু ভাগ হয়ে গিয়েছে। রায়হানের অধর তিড়তিড় করে কাঁপতে শুরু করে।
“-রোজের বিয়ে হয়ে গিয়েছে মানে!এটা কি করে হতে পারে ।”
রায়হান ইমরান চৌধুরীর পরোয়া না করে সোজা দুতলার সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে উঠতে শুরু করে।রায়হানকে উপরে যেতে দেখে ইমরান চৌধুরী ক্ষ্যাপে দারোয়ানকে ডাকতে শুরু করেন।তবে তিশা তাকে শান্ত হতে ব’লে।বুঝিয়ে শুনে ব’লে,
-“একটু শান্ত হোন।আমি সব বুঝিয়ে বলবো।ব্যপারটা আপাতত আমাকে দেখতে দিন।আমায় বিশ্বাস করেন তো নাকি।প্লিজ।”
ইমরান চৌধুরী চুপ হতেই, তিশা রায়হানের পিছন পিছন উপরের করিডর বেয়ে রোজের বেড রুমে যেতে থাকে।রায়হান রোজের ডোর ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করে।বুকের ভেতরটা চিনচিন করে উঠছে।কানকে এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না।
রোজের পুরো রুম পিংক থিমে সাজানো।একদম সুন্দর করে পরিপাটি করে সাজানো।রোজ চলে যাওয়ার পরে রুমটা যেমন ছিলো তেমনি আছে বিছানার উপর সেলফোনটাও সেভাবেই পড়ে আছে।তিশাও আর এ রুমে আসে নি।তবে আজ রায়হানের পিছু পিছু প্রবেশ করলো।রোজকে ছাড়া রোজের বেড রুম সাজানো গোছানো হলেও শূন্য।তিশা চোখ বড় বড় করে আবার জিজ্ঞেস করে,
“-রায়হান ভাইয়া।আপনি কি সত্যিই….সত্যিই রোজের জন্যে এসেছেন?,আপনাকে বলার মতো কোনো ভাষা আমার নেই।”
রায়হান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।মুখের ভাষা যেনো হারিয়ে বসে আছে চিরতরে। নিথর গলায় বলল,
-“কেনো।আপনারা কি ভেবেছিলেন।আমি ভূলে যাবো তাকে।মানুষ প্রেম ভুলতে পারে ভালোবাসা নয়।
একটু থেমে,
-“রোজ তো আমায় কথা দিয়েছিলো।তাহলে কথার খেলাপ কেনো করলো?আপনি তো সব জানতেন।”
“-রোজ কি একবারো বলেছিলো সে আপনাকে ভালোবাসে?বলেনি,তাহলে কিসের কথার কথা বলছেন।আর কেউ না জানলেও আমি জানি।আপনি এক তরফা ভালো বেসেছেন।আর এগুলো তো চার বছর আগের কথা এসব নিয়ে আপনি এখনো পড়ে আছেন।আন ভিলি’বেভল”
আপনি কি জানেন রায়হান ভাই রোজ গত চারবছরে একবারের জন্যেও আপনার নামও উচ্চারণ করেনি।আর আপনি।ভুলে যান ওকে ।আমেরিকা যাওয়ার পর ভুলে যাওয়ার দরকার ছিলো।আর মনে রেখেও লাভ নেই আপনি আর রোজের ছায়াও মারাতে পারবেন না।”
রায়হান সামনে এগোলো।বিছানার পাশে রোজের একটা ছবি রাখা ল্যাম্পের পাশে।রায়হান সেটা হাতে নিলো।হাতটা কেমন কেঁপে কেঁপে উঠছে।কতো বছর পর রোজকে দেখলো।কোনো যোগাযোগ ছিলো না,দেখার সুযোগ হয়ে উঠেনি।ছবিটার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে রইলো।হৃদস্পন্দন টা যেনো থমকে গেলো।
সময়টা| ২০২১|
রোজ যখন সবে নাইন ক্লাসে উঠলো।তখন থেকে রায়হান মির্জা রোজের পিছন পিছন ঘুরতো।শিল্পপতির মেয়ে হওয়া দাপুটে স্বভাব রোজের তখন থেকে ছিলো।ভয়ে কোনো ছেলে গাঁ ঘেষতে না পাড়লেও স্কুলের প্রিন্সিপাল ছেলে রায়হান মির্জা থেকে ছাড় পায় নি।রায়হান তখন সবে ভার্সিটি শুরু করে।ছাত্রদলে বেশ্ নাম ডাকও ছিলো।রাজনীতিতে জড়িয়ে গিয়েছিলো।ভার্সিটির সকলে জানতো রায়হান মির্জার একমাত্র দূর্বলতার কথা। পাগলের মতো ভালোবাসতো স্কুল পড়ুয়া রোজকে।রোজের স্কুলের সামনে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো।তার আসক্তি এতোটাই দিন দিন বেড়ে যাচ্ছিলো যে তূর্জ হাউসের রোজের বেলকনির নিচে প্রতি রাতে এসে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো।রোজ কখনোই পাত্তা দিতো না।ইগনোর করতো।তারপরও বেপরোয়া বেহায়া রায়হান হাল ছাড়তো না।রোজকে পাওয়ার আকাঙ্খা দিন দিন তিব্র থেকে তিব্র হয়ে উঠলো।প্রায় পাগল প্রায় হয়ে যাচ্ছিলো।রোজকে কাছে পাওয়ার তিব্র ইচ্ছায় বশির্ভূত হয়ে উপায়ন্তর হিসেবে রোজকে বিয়ে করে নেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করলো।হেড মাস্টার আব্দুল মির্জা, জাহানারা মির্জা ছেলের মুখে বিয়ের কথা শুনে খুবই বিরক্ত হয়েছিলেন।জাহানারা বেগম রোজকে চিনতেন।ছেলে যে ভালো বাসে তাও জানতেন।তবে কিছুতেই রাজি হলেন না।কিভাবেই বা হতেন তিনি। রায়হান সবে মাত্র ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে।তার উপরে তার স্বামী চান রায়হান ডাক্তারি পড়তে বিদেশে যাক।তিনি স্কলারশিপে এপ্লাইও করে রেখেছে। তবে রায়হান নিজের ক্যারিয়ারে বিন্দু পরিমাণ ফোকাস করছিলো না।ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে যায়।তার মন মস্তিষ্ক জুড়ে শুধু রোজ আর রোজ।একদিন গোধূলি বেলায় রায়হান এসে মায়ের পায়ের কাছে বসে পড়ে ব’লে উঠে,
-“আমি বিয়ে করতে চাই।তোমরা রোজের সাথে আমার বিয়ের ব্যাবস্থা করবে কি না বলো।”
জাহানারা মির্জা সেদিন ছেলের মুখের উপর সাফ না জানিয়ে দেন।রায়হান বাড়ি থেকে বের হয়ে রাতের দিকে তূর্জ হাউসের পিছনে এসে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।এক পাঁ অব্দি না নাড়িয়ে।রোজ তখন বেলকনিতে দাঁড়িয়ে কানে হেটফোন লাগিয়ে গান শুনছিলো।রোজ গান শুনতে গান গাইতে ভিষণ ভালোবাসে। গান শুনতে শুনতে হঠাৎ বেলকনির নিচে চোখ পড়তেই দেখতে পায় রায়হান বাইকে গা হেলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।রায়হানের দৃষ্টিও তার দিকে।কম বয়সের তরুণী কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো সামনে থাকা শ্যামপুরুষটার দিকে।কিঞ্চিৎ ভেবে নিচে নেমে এসে দাঁড়ায় রায়হানের সামনে।হাতদুটো পিছনে নিয়ে ব’লে,
“-আপনাকে কতোবার বারণ করেছি।আমার বাসার সামনে আসবেন না।কেন শুনেন না বলুন তো।”
রায়হান মৃদু হাসলো।রোজ বারবার তাকে তাড়িয়ে দেয় বলেই তো সে রোজকে আরও বেশি ভালোবাসে।সে নির্ধিদায় বলল,
“-প্রেম করবে না।ভালোবাসবে না।ফাইন।বিয়ে করতে পারবে? ….ভালোবাসা না-হয় আমি শিখিয়ে দিবো।”
রোজ নিরুত্তর। না কোনো জবাব দিলো। আর না অবাক হলো।রায়হান চুলগুলো বেকব্রাশ করতে করতে বলল,
-“তুমি জানো, আমায় চলে যেতে হবে ভীনদেশে।আমি যেতে চাইনা।তুমি শুধু একবার বলো, রায়হান ভাইয়া যাবেন না।আমি তোমার জন্যে সব ছাড়তে রাজি।”
-“যদি বলি আপনি যাবেন।”
-“যেতে বলছো।আমায় মিস্ করবে?… জানি তোমার কষ্ট হবে না।তবে আমার যে খুব কষ্ট হবে।আমি যাবো না।যতোদিন পারবো তোমার পিছু নিবো।সারাজীবন হলে সারাজীবনই।”
রোজ কথা বাড়াতে চাইলো না। চলে যেতে নিলো বাড়ির ভিতর।তবে যাওয়ার আগে বললো,
-“আপনাকে আমেরিকার যেতে হবে,ডাক্তার হয়ে ফিরে আসুন।”
“-বিদেশ গেলে তোমায় পাবো?… যদি কথা দাও অপেক্ষা করবে তাহলে তোমার জন্যে হলেও আমি যাবো।”
“আমি কি অযোগ্য তোমার জন্যে?”
রোজ পিছন ফিরে জবাব দিলো।
-“আপনি অযোগ্য মুটেও না।আপনি আমার থেকে ভালো ডিজার্ভ করেন।আমি সত্যিই এখন এসব নিয়ে ভাবছি না।তবে হ্যাঁ আপনি পড়াশোনা শেষ করে ফিরে আসুন।যদি আপনার মন পরিবর্তন না হয়।এসে না-হয় আমার বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব জানাবেন।
তবে একটা শর্ত, আমার সাথে কোনো প্রকার যোগাযোগ করার চেষ্টা করবেন না।
|বর্তমান |
রোজের বলা শেষ বাক্যে টুকুর কথা বললো তিশাকে রায়হান।রায়হান তো রোজের কথা মতোই গিয়েছিলো ভীনদেশে তাহলে রোজ কি করে বিয়ে করতে পারে অন্য কাউকে।রায়হান রোজের ছবিটা বুকে আঁকড়ে ধরে ধপ্ করে বিছানার পাশে ফ্লোরে বসে পড়ে। মস্তিষ্ক ছিঁড়ে যাচ্ছে।বুক পুড়ে যাচ্ছে।রোজ বিয়ে করেনি করেছে রায়হানকে খু’ন।তিশা বিছানার অপর পাশে বসে পড়লো। তারপর ব’লে উঠে,
-“আপনি পুরোটা জানেন না।আমি জানি।রোজ সেদিন কথাগুলো,আপনার মায়ের বলার কারণে বলেছিলো।তিনি জানতেন রোজকে ছাড়া আপনাকে আর কেউ রাজি করাতে পারবে না।তাই তিনি রোজকে এ-সব বলতে বলেছিলেন।আমরা ভেবেছি অনেকগুলো বছর অনেকটা সময়।মানুষের মন পরিবর্তন হতে ন্যানো সেকেন্ড লাগে না।আপনিও সব ভুলে বিদেশের মাটিতে পা ফেলে ক্যারিয়ারে ফোকাস দিবেন।”
রায়হান হাসলো।করুন হাসি।নিজের নিষ্ঠুর করুণ ভাগ্যের পরিহাসের কথা ভেবে হাসলো।পকেট থেকে ওয়ালেট টা বের করলো।সেখানে রোজের ছবি চুলে দু-বেনুনি করা।গালের টোলটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।পুরুষ মানুষ নাকি কাঁদে না।তবে রায়হানের চোখে কেনো আজ জল জমে উঠলো।শব্দহীন কান্না।রায়হান আর্তশীৎকার দিয়ে উঠলো,
“-আমি কি করে থাকবো রোজ।আমি যে মরে যাবো।তুমি জানো চারবছর ঠিক কতোটা সময়।চলে গেলে তবে ভুলে যাওয়ার ঔষধ কেন দিয়ে গেলে না।আমার বুকটা পুড়ে যাচ্ছে।
তোমায় নিজের করে পেলাম না।হারালাম।
না পাওয়ার মাঝেই কি ভালোবাসার গভীরতা লুকিয়ে থাকে? যাকে চাইলেও জীবনে পাওয়া হয় না। তার জন্যেই চোখের কোণে জল জমে উঠে।পেয়ে গেলে কি মূল্য কমে যেতো? না পাওয়া মানুষটা থেকে যায় মনে অদেখা ঘরে।যেখানে সময় থেমে থাকে।ভালোবাসা জমে থাকে অপূর্ণ থেকে চিরস্থায়ী হয়ে।
তিশা চুপ রইলো।কিছুক্ষণ চুপ থেকে উঠে চলে যেতে নিলে রায়হান পিছন থেকে ভঙ্গা গলায় ব’লে উঠে,
আমার ভালোবাসাকে কোন ভাগ্যবান ব্যাক্তি পেলো?
তিশা একটু ইতঃস্ততবোধ করলো।গলা একটু খাঁকড়িয়ে তোতলানো,
-” আমি বেশি কিছু জানি না।নামটা ঠিক মনে নেই।ইউভান হবে মেইবি।বাকিটা রোজের বাবা জানেন।”
তিশা বেরিয়ে যেতেই রায়হান উঠে দাঁড়ালো।হাতের কনুই দিয়ে চোখ মুছে পকেট থেকে একটা ডায়মন্ড রিংয়ের বক্স বের করলো।রিংটা হাতে নিয়ে বুকের বাঁ পাশে পাঞ্চ মেরে বলল,
“-তোমাকে যে পেলো, না জানি সে কতোটা ভাগ্যেবান,যে কিনা আমার তাহাজ্জুদের অশ্রুকেও হার মানিয়ে দিলো।”
প্রায় তিনদিন কেটে গিয়েছে।
বছরের শেষ মাস শুরু।খ্রিস্টান কালচারের দেশ মানে ডিসেম্বর তাদের জন্যে স্পেশাল।শুরু থেকেই ক্রিসমাসের আয়োজন চলে।তবে সবার জন্যে সব কিছু কি আর আনন্দের হয় নাকি।কখনো কখনো বিষাদে ভরা ছোট ছোট প্রানভোমড়া গুলো স্মৃতি পাতায় ডুবে থেকে জীবনের সুখগুলো ভুলতে শুরু করে।এ্যাশ আলবার্ট এমিলিও ইউভানের এক্সিডেন্টের পর থেকে চার্চে এসে প্রার্থনা করে চলছেন।তিন দিন ধরে নির্ঘুমের ফলে শরীরটা আরও বেশি খারাপের দিকে যাচ্ছে।গির্জার ভিতরে ঠান্ডা হাওয়ার সাথে মিশে থাকা ধূপের গন্ধটা যেনো ইউভাবের দাদীর বুক ভেঙ্গে কান্না দীর্ঘশ্বাসের শব্দে মিশে যাচ্ছে,তিনি বিড়বিড় করেন,
“-holy father! God!deliver my grandson from the hands of darkness,have mercy on his fate”
তার গলা ভেঙে আসে।মোমবাতির আলো কাঁপে।
তিনি ধীরে ধীরে ইউভানের নামটা ফিসফিস করেন
“My Yuvan”
এ্যাশ আলবার্ট একটা বেঞ্চির মধ্যে বসে রইলেন।পাশে রাখা বাদামী রঙের একটা ডায়েরি। ডায়েরি টা খুলে লিখতে বসলেন।এ্যাশ আলবার্ট শুধু আজকের দিনটা মনে রাখতে পারেন। অতীতের সবকিছু যেন কুয়াশার মধ্যে হারিয়ে যায়। তার স্মৃতি নিজেই নিত্যদিন তাকে ছেড়ে চলে যায়।তাই প্রতিদিন তিনি ডায়েরি লিখেন।কিছু অংশ যা দেখলে তিনি স্মৃতিচারণ করতে পারেন।ইউভানকে তিনি আর.সি এর C.E.O বানিয়েছেন ঠিকি তবে ইউভান কখনো দায়িত্ব পালন করে নি। কম্পানির কাজে তাকে মানুষজন খুব কম দেখতে পায়।সব কিছু একা হাতে সামলিয়ে তিনি হাঁপিয়ে উঠছেন।
এ্যাশ “আলঝাইমার(Alzheimer’s disease “এর রোগী।|স্মৃতিভ্রংশ /পুরনো ঘটনা মনে রাখতে অক্ষম|
ডায়েরি লিখা শেষ হলে উঠে দাঁড়িয়ে পড়েন।হসপিটাল যেতে হবে ইউভানের কাছে।এক্সিডেন্টের পর ইউভানকে আনা হয় ডেনমার্কের সুপার হসপিটালগুলোর মধ্যে অন্যতম আরহুস সিটির আরহুস হসপিটালে।হাসপাতালের সেই সাদা বরফ-ঠান্ডা করিডোরে লাল আলোর টিউবগুলো কাঁপছে। তিন দিন আগের সেই রাতের হাহাকার এখনও দেয়ালের ভেতর আটকে আছে। ICU’র দরজার ওপর লাল আলোটা ঝিম ঝিম করছে”critical care” এখনো শেষ হয়নি।
রুমের ভেতর ইউভান শুয়ে, তার কপালের ডান দিকের গভীর কাটা জায়গাটা ব্যান্ডেজে মোড়া, রক্তের দাগ সাদা ব্যান্ডেজে হালকা বাদামি হয়ে শুকিয়ে আছে। নাকে অক্সিজেন লাইন। গলায় মোটা নীল ক্যানোলা। তুষার ডাক্তারের নোটে চোখ বুলাচ্ছে, সেখানে এক অংশে লিখা,
“সাইকোলজিকাল ভলাটিলিটি “
কারণ ICU তে আনার পর প্রথম রাতেই ইউভান তাঁর শারীরিক ব্যথা ভুলে বারবার হিংস্রভাবে উঠে বসতে চেয়েছিলো যেনো কোনো কিছু বা কাউকে খুঁজছে।ইউভানের ডান হাতটিতে স্লিং এক্সিডেন্টে হাড় সরে গিয়েছে।বাম হাতের আঙুলে গভীর ক্ষত।
তবু সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার
তার মুখের ওপর এখনো সেই দানবীয়তার ছাপ।
রাহা বসে আছে তুষারের পাশে।মাথায় ব্যান্ডেজ পেঁচানো।পার্টিতে ঝাড়বাতির কাঁচ টুকরো ভেঙ্গে তার কপালে পড়েছিলো।তুষার ইউভানের রিপোর্টগুলো চোখ বুলাতে বুলাতে বলল,
-“যে জিনিস পারো না, তা করতে যাও কেনো।”
“-মেয়ে মানুষ হয় কোমল পদ্ম ফুলের মতো, তাদের হাতে অস্ত্র শুভা পায় না।”
রাহা একবার মুখ উঁচিয়ে তুষারের দিকে তাকালো।তারপর আবার মুখ ফিরিয়ে বলল,
-“এসব কঠিন বাক্যের মানে আমি বুঝি না।আমি শুধু আমার ভাইকে হেল্প করছিলাম, দ্যা’টস ইট”
“-নেক্সট হেল্প এর চেষ্টাও করো না।”
তুষার রাহার হাতে ইউভানের ফাইল গুলো ধরিয়ে চলে যাওয়ার আগে রাহাকে উদ্দেশ্য করে বলে যায়,
-“নিকোলাস অ্যা বেড ম্যান।ওর থেকে দূরে থাকো”
-“মা নে।হুয়াট ডু ইউ মিন। “
-“টাইম হলে বুঝে আসবে।”
তুষারকে বেশ্ চিন্তিত দেখাচ্ছে।ডাক্তার বলেছেন সপ্তাহখানিকের মধ্যে ইউভানের হুঁশ ফিরতে পারে।তবে তুষার চিন্তিত ইউভানকে নিয়ে নয়।জ্ঞান ফিরার পর যখন জানতে পারবে তার মার্সিডিজ কারের ভিতর থেকে একটা পোড়া লাশ পাওয়া গিয়েছে।যা রোজ তুর্জ চৌধুরীর।তুষার কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না।আপাতত কাউকে কিছু জানায়নি।সবাই জানে রোজ নিঁখুজ।সেদিন কোপেনহেগেনের রেলওয়ে যেই গাড়িটা পোড়া অবস্থায় পুলিশ শনাক্ত করে তা ইউভান রিক চৌধুরী জানতে পেরে তারা খবর পাঠায়।সেখানে একটা মেয়ের পোড়া লাশ পাওয়া যায়।যা চিনার কোনো উপায় নেই।আগুনে জ্বলসে যাওয়া।
তুষার এখনো বুঝে উঠতে পারছে না তিনদিন ধরে মর্গে পড়ে লাশটা কি আসলেই রোজ তুর্জ চৌধুরীর!আর যদি হয় ও তারপর…..
.
.
.
.
|চলবে|
পরবর্তী পর্ব পেতে অবশ্যই রেসপন্স করবেন। গঠনমূলক কমেন্ট করে যাবেন|
|৪০০০ শব্দ সংখ্যা।| বড় করে না লিখলে চরিত্রগুলো ফুটিয়ে তোলা যায় না।নাহলে আমারও তাল আসে না লিখায়।আপনাদেরও তৃপ্তি আসবে না।তাই ধৈর্য ধরে পড়ার অনুরোধ। |
আচ্ছা। চার বছর আগে যদি রোজ বিয়ে করে নিতো রায়হানকে,আপনাদের কি মনে হয়, ইউভান ছেড়ে দিতো তাকে?
Share On:
TAGS: Love or hate, ইভেলিনা তূর্জ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
Love or hate পর্ব ২২
-
Love or hate পর্ব ২১
-
Love or hate পর্ব ২৩
-
love or hate পর্ব ১
-
Love or hate পর্ব ৫
-
Love or hate পর্ব ২৪
-
Love or hate পর্ব ৯
-
Love or hate পর্ব ১০
-
Love or hate পর্ব ৮
-
Love or hate পর্ব ১৪