মেজর_শিকদার-০৩
ঈশিতা_ইশা
(কপি নিষিদ্ধ)
…
‘শিকদার ভিলা’ এক নামে এখানকার মানুষজন চেনে। নিরিবিলি আবাসিক এলাকায় দুইতলা বাংলো মাথা চিঁড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বিশাল এ বাড়িটি আকরাম শিকদার তার পৈতৃক সম্পত্তি এবং নিজের পরিশ্রমের পয়সায় গড়েছেন। এক সময় তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন দুর্ধর্ষ অফিসার ছিলেন। নিজের সাহসিকতার জন্য পুরস্কার হিসেবে পেয়েছেন কতশত মেডেল! চিরকাল আদর্শের পথে চলেছেন তিনি। বড়ো ছেলে রওনককে ছোট বেলা থেকেই ট্রেনিং দিয়েছেন। তিনি চাইতেন তার ছেলেও তার মতো দেশ প্রেমিক হোক, দেশের জন্য জান প্রাণ দিয়ে লড়ুক।
তৃণা এসমস্ত কথা মাহির কাছ থেকে বহুবার শুনেছে। মাহি যখনই তার বাবার সম্পর্কে বলতো বরাবর তৃণার গায়ে কাঁটা দিতো! তবে মাহি কথাগুলো বেশ গর্ব করেই বলতো।
তার বাবা তৈয়ব উদ্দিন ও একজন রিটায়ার্ড পুলিশ অফিসার। ছোট বেলায় কখনো কখনো এ নিয়ে আশেপাশের মানুষজনের তীক্ষ্ণ কথাও শুনতে হয়েছে। বাংলাদেশের পুলিশ নিয়ে বরাবর মানুষের মধ্যে বেশ কিছু ভুল ধারণা রয়েছে। হাতের পাঁচ আঙুল যেমন সমান না তেমনি সকল পুলিশও খারাপ না, এমনটা তৃণার বিশ্বাস। সে নিজের বাবাকে নিজের আইডল মানে। বাবা তাকে ছোট থেকেই নৈতিক শিক্ষা দিয়েছেন।
বসার ঘরের সোফায় বসে বিভিন্ন কথা ভেবে চলেছে সে। দুই তলা ডুপ্লেক্স এ বাড়িটিতে অনেকবার এলেও কখনো সেভাবে ঘুরে দেখার সুযোগ হয়নি। এসে মাহির সাথে তার রুমে ঢুকে যেতো এরপর আবার সেখান থেকে বেরিয়ে বাসায় চলে যেতো। আজ সে সেই শিকদার বাড়ির বউ! সবটা কেমন ভোরের সেই মিষ্টি স্বপ্নের মতো।
“তৃণা তুই বোস আমি উপর থেকে আসছি। দাদুন ঘুমুচ্ছে দেখে এলাম। কাল সকাল সকাল দাদুনের সাথে দেখা করিস নইলে রাগ করবে সে।”
মাহির কথায় তৃণার ধ্যান ভাঙে। তাকে বসিয়ে রেখে মাহি গিয়েছিলো নিজের দাদীর কক্ষে। তার মায়ের আদেশ যেনো তৃণা রওনকের দাদীর সাথে দেখা করে তারপর ঘরে যায়।
“তুই কোথায় যাচ্ছিস?”
“আহা বললাম তো, আসছি।”
তৃণাকে একা করে দিয়ে মাহি সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত উঠে করিডরে হারিয়ে যায়। এদিকে মেয়েটা একা একা বসে বিরক্ত হচ্ছে। রিশানকে রাহি নিজের রুমে নিয়ে গেছে।
রওনক তাকে বাসার ভেতর দিয়ে কল রিসিভ করতে বাহিরে গিয়েছে। মাহিও উপরে চলে গেলো!
দুই পা তুলে ভাজ করে সোফায় আরাম করে বসে সে। গালে এক হাত রেখে তৃণা একটু পরপর দোতলায় তাকাচ্ছে।
ফোন হাতে রওনক সদর দরজা দিয়ে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে। তার নজর যায় সোফায় বসা নববধূ বেশে বসা মেয়েটার দিকে। তৃণা তাকে খেয়াল করেনি।
“ফিলিং লোনলি?”
প্রশ্নটা কানে আসতেই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় তৃণা। রওনকের কি হলো কে জানে লোকটা এগিয়ে এসে একদম তৃণার মুখোমুখি দাঁড়ালো। লম্বু এ লোকটার চোখে চোখ মেলাতে তৃণা মুখ উঁচু করে তাকালো।
রওনক মৃদু গলায় বললো,
“এভাবে যার তার দিকে তাকাবা না।”
তৃণা বোকার মতো প্রশ্ন করে,
“কেনো?”
“মানুষ খু ন হয়ে তোমায় পুলিশে দিয়ে দেবে—সাবধান!”
রওনকের কথা শুনে তৃণা ঠোঁট চেপে হেসে ফেললো।
হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করে,
“এ আবার হয় নাকি?”
“হয় হয়। বুঝলে না এখনো। সাবধান করে দিলাম। বাদ বাকি তোমার ইচ্ছে।”
রওনকের কথার আগাগোড়া মস্তিকে ঢুকেনি তখনো তার।
এরি মাঝে মাহি উপর থেকে বলে,
“আমার হয়ে গেছে। ভাইয়া তৃণাকে নিয়ে উপরে আসো।”
রওনক বলে,
“রিশান কোথায়? ওর সাথে দেখা করে তারপর রুমে যাবো।”
“ঐ তো ছোট ভাইয়ার রুমে।”
রওনক তৃণার দিকে তাকিয়ে বলে,
“তুমি মাহির সাথে রুমে যাও আমি আসছি।”
তৃণা মাথা ঝাকায়।
নিচতলায় রাহির রুম। রওনক সেদিকে হাঁটা দেয়। তৃণা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে নিলে মাহি দ্রুত নামে।
“তুই উপরে যা। ঐ যে শেষের রুমটা ভাইয়া।”
আর কিছু না বলে সে-ও রাহির রুমের দিকে ছুটে। তৃণার মন খারাপ হয়। একটু পরপর সবাই তাকে একা করে দিয়ে যার যার মতো ছুটছে। তার যে কেমন লাগছে কেউ বুঝতেই চাইছে না। ভীষণ অভিমান হলো তার।
রিশান তার চাচ্চুর রুমের বিছানায় ঘুমিয়ে গেছে। রওনক ছেলের চুলের ভাজে আঙুল চালিয়ে কপালে আদরের পরশ দেয়। কমফোটার গলা অবধি টেনে দেয়।
“রাহি খেয়াল রাখিস ওর। সারারাত বসে গেসম খেলিস না। কি বলেছি শুনেছিস?”
জবাব না পেয়ে রওনক তাকিয়ে দেখে দুই ভাই-বোন তার দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছে।
“মাহি তুই এখানে? তৃণার সাথে না তোকে উপরে পাঠালাম?”
“তৃণা উপরেই আছে। তুমি জলদি যাও। আর শুনো। আমি একটা সারপ্রাইজ রেখেছি৷ কষ্ট করে ওটা লন্ডভন্ড করে দিও না।”
মাহির কথার মানে বুঝতে না পেরে রওনক প্রশ্ন ছুঁড়ে,
“মানে?”
“তুমি শীঘ্রই উপরে যাও। তৃণা একা একা গেলে সব লন্ডভন্ড হবে।”
মাহির কথার সাথে তাল মিলিয়ে রাহি বলে,
“বিগ ব্রো যাও জলদি।”
“আমাকে আগে সংক্ষেপে বল। নইলে জানবো কী করে?”
রওনকের কথায় দুজনে একে অপরের দিকে তাকায়।
রাহির রুম থেকে বের হয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে এলে দেখতে পায় তৃণা এখনো তার রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। মেয়েটা তাকে খেয়াল করেনি। রুমের দরজা সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বোধ-হয় কিছু ভাবছে! সে দরজার হাতলে হাত দিতে গেলে সঙ্গে সঙ্গে রওনক বলে ওঠে,
“ওয়েট..”
হালকা ভয় পেয়ে হাত সরিয়ে ফেলে মেয়েটা।
রওনক বড়ো বড়ো কদম ফেলে এগিয়ে এসে বলে,
“এক্ষুণি দিচ্ছিলে সারপ্রাইজ নষ্ট করে। এক মিনিট দাঁড়াও।”
বলেই লোকটা দরজা খুলে এক সেকেন্ডে ভেতরে ঢুকে গেলো।
তৃণা আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছে না। সারাদিন ভয়, চিন্তা আর খিদের জ্বালায় তার হালাত খারাপ। এদিকে রুমেও ঢুকতে পারছে না। আশে পাশে তাকালে কেমন ভুতুড়ে লাগে সব। একটা মানুষও নেই। সবাই যার যার রুমে।
মিনিট পাঁচেক পর রুমের দরজার লক খোলার শব্দ হয়। রওনক দরজা খুলে এক পাশে দাঁড়িয়ে বলে,
“আসো এখন।”
তৃণা তাকিয়ে দেখে রুমের মেঝেতে গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে রাখা। বিছিয়ে রাখা গোলাপের পাপড়িতে সে পা ফেলে ধীরে ধীরে ভেতরে প্রবেশ করে। পুরো রুম জুড়ে জ্বলছে অসংখ্য মোমবাতি। রুমের মাঝামাঝি পেতে রাখা খাটটাতে সাফেদ রঙের চাদর বিছানো। তাতে সুন্দর করে ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। অপলক দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে থাকে। এমন কিছু তো সে কল্পনাও করেনি। যেভাবে বিয়েটা হয়েছে তাতে সে ভেবেছিলো কেউ তাকে মানবে না। ঝুর ঝামেলা হবে। এমনটা হলো না বরং একের পর এক চমক সে পেয়ে যাচ্ছে!
“ডু ইউ লাইক ইট?”
রওনকের প্রশ্নে তার ধ্যান ভাঙে। ঘাড় ঘুরিয়ে সে তাকায়। লোকটা তার দিকে কেমন কোমল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
“এসব কখন করলেন?”
সাথে সাথে রওনক বলে,
“আরে আমি করিনি। মাহি করেছে। ও সার্ভেন্টদের বলে গিয়েছিলো রুমটা সাজিয়ে রাখতে। তবে তোমার সাথে বিয়ে হবে শুনে সার্ভেন্টদের কল দিয়ে স্পেশাল অর্ডারও দিয়ে রেখেছে। শত হলেও তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড বলে কথা।”
দৃষ্টি সরিয়ে তৃণা আবারো রুমের চারিদিকে তাকায়। বেড সাইডের ফুলদানিতে এক গুচ্ছ লিলি ফুল দেখা যাচ্ছে। তার প্রিয় ফুল এটা। মাহি এটা জানে। তৃণার মনটা আবারো খুশিতে নেচে উঠলো। ইচ্ছে করছে মাহিকে জড়িয়ে চুমুতে ভরিয়ে দিতে।
তার নজর যা টি-টেবিলের দিকে। সেখানেও সুন্দর একটা স্বচ্ছ ফুলদানীতে ধবধবে সাদা রঙের লিলি রাখা। এগিয়ে গিয়ে আঙুল দিয়ে ফুলগুলো ছুঁয়ে দেয়।
“কি হয়েছে?”
আনমনে তৃণা জবাব দেয়,
“আমার প্রিয় ফুল লিলি।”
“তোমার পছন্দ তোমার মতোই৷ স্নিগ্ধ, কোমল, মায়াবী।”
রওনকের মুখে এমন কথা শুনে তৃণা তার দিকে তাকায়। মোমের আলোতে লোকটাকে কেমন রহস্যময় লাগছে। সে চোখ সরিয়ে নেয়।
রিশানের কথা মনে হতেই তৃণা জিজ্ঞেস করে,
“রিশান কোথায়?”
“রাহির রুমে ঘুমুচ্ছে। বেশ টায়ার্ড তো। তাছাড়া ও ওর ফুপ্পি আর চাচ্চুর সাথে থাকতেই বেশি ভালোবাসে। আমার সাথে তেমন ঘুমাতে চায় না।”
কথাগুলো বলতে বলতে সে কাবার্ড থেকে টিশার্ট-ট্রাউজার বের করে নেয়।
“কেনো? আপনার সাথে ও ঘুমায় না?”
“ঘুমায় না এমন না আসলে। খুব কম ঘুমায়। সারাবছর তো আমাকে কাছে পায় না তাই অভ্যাস হয়ে গেছে। তাছাড়া আমার সাথে শুতে এলে জলদি ঘুমাতে হয় যা তার পছন্দ না। সে তার ফুপ্পির সাথে দুষ্টুমি করে, চাচ্চুর সাথে ভিডিও গেমস খেলে। এসব করে ক্লান্ত হয়ে তারপর ঘুমায়। আমি একটু বেশিই ডিসিপ্লিন মেইনটেইন করি যা তার অপছন্দ।”
কথাগুলো শুনে তৃণা বেশ অবাক হয়। অথচ সে ভেবেছিলো রিশান আর তার বাবার বন্ধন অনেক গাঢ়। যতবার রিশানের সাথে দেখা হতো ততবার সে বাবার কথাই জপতো।
“তুমি বসো আমি গোসল করে আসি। এরপর তুমি ফ্রেশ হয়ে নিও।”
কথাটা বলে উত্তরের অপেক্ষা না করে লোকটা বাথরুমে ঢুকে যায়।
তৃণা চারিদিকে চোখ বুলিয়ে বিছানায় বসে। কি তুলতুলে বিছানা! সে আরাম করে পা তুলে বসে। আবার পা নামিয়ে রাখে। এরপর ধপ করে শুয়ে পড়ে। পাশ থেকে বালিশ তুলে জড়িয়ে ধরে চোখ বুজে ফেলো। কতদিনের ইচ্ছে ছিলো এই রুমটা দেখার। আজ সে এই রুমের মালিকের স্ত্রী! ভাবতেই সারা অঙ্গে শিহরণ বয়ে যাচ্ছে।
এতো কিছু ঘটার পর বিয়েটা হয়েছে এতে সে নিজেকে ভাগ্যবতী ভাববে নাকি না তা বুঝতে পারছে না। দু-চোখ বুজে আগত ফুলের সুন্দর সুবাস নেয়।
কিছুক্ষণ বাদে বাথরুমের দরজা খোলার শব্দে তাড়াতাড়ি উঠে বসে। হাত থেকে বালিশ ছুঁড়ে দেয় পেছনে।
মাথা মুছতে মুছতে রওনক বের হয়।
তৃণা নিজের শাড়ি ঠিক করে বসে। কিছু জিজ্ঞেস করার পূর্বেই রওনক বলে,
“এতো ডিসিপ্লিনের মাঝে বড়ো হয়েছি যে এখন চাইলেও দৈনন্দিন কাজ সময় নিয়ে করতে পারি না। যতই স্লো করার চেষ্টা করি অতিদ্রুত হয়ে যায়।”
কথাগুলো বলেই আপনমনে সে হাসি দেয়। তৃণা চোখ তুলে সেই হাসি দেখে। মোমের আলোতে সেই হাসিতে ঘায়েল হলো সে। ইশ! লোকটার মতো তার হাসিও সুন্দর।
“শুনো, গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসো। গোসল করতে চাইলে করতে পারবে। গিজার অন আছে।”
“যাচ্ছি।”
লাগেজ থেকে পোশাক বের করে তৃণা চলে যায় বাথরুমে।
বেশ কিছু সময় পর গোসল সেরে থ্রি-পিস পরে বের হয় সে।
বের হয়ে দেখে সিঙ্গেল সোফায় বসে ফোন স্ক্রোল করছে লোকটা।
তৃণাকে দেখে সে ফোনটা টি-টেবিলের উপর রেখে দেয়। তখন সে খেয়াল করে টি-টেবিলের উপর দুটো প্লেট আর সালাদ রাখা। তার পাশে একটা বাটি ঢেকে রাখা হয়েছে।
“আমি ভেবেছিলাম তুমি এখন শাড়ি পরে বের হবা।”
রওনকের কথার পিঠে সাথে সাথে তৃণা বলে,
“তাহলে বদলে নিবো? আসলে আমি শাড়ি পরতে পারি না।”
“আরে না..না। এসে বসো।”
তৃণা এসে তার পাশের সিঙ্গেল সোফায় বসে। রওনক বাটি থেকে ঢাকনা সরায়। বিরিয়ানির ঘ্রাণে তৃণার খিদেটা চড়া দেয় আবার।
সে যত্ন করে দুটো প্লেটে খাবার বেড়ে নেয়। তৃণার সামনে দিয়ে বলে,
“খেয়ে নাও। নিশ্চয়ই খুব খিদে পেয়েছে?”
অবাক হয়ে তৃণা প্রশ্ন করে,
“আপনি কি করে জানলেন?”
“এটাও মাহির কাজ। ও জানে তুমি খাওনি তাই ব্যবস্থা করে রেখেছে।”
“ওহ।”
মনে মনে তৃণা আহত হলো। সব কিছুই মাহি করেছে। তার মানে লোকটা তার জন্য কিছুই করেনি? আচ্ছা সে কি এসব জোর পূর্বক মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছে? এতো স্বাভাবিক আচরণ তো সে প্রত্যাশা করেনি। কেনো জানি এতোক্ষণের খুশিটা মিইয়ে গেলো।
“কি হলো খাও?”
ভাবনা পাশে সরিয়ে খাওয়াতে মন দেয় সে।
“কোথায় পড়াশোনা করছো?”
প্রশ্নটা শুনে খানিকটা চমকায় তৃণা। এরপর জবাব দেয়,
“সলিমুল্লাহ মেডিকেলে।”
“তুমি ডাক্তারি পড়ছো! ওয়াও!”
প্রশ্নটা করে রওনক তার দিকে তাকায়।
তৃণা থতমত খায়। লোকটা এতোদিন জানতো না সে মেডিকেলে পড়ছে!
“হ্যা।”
“গ্রেট। কোন ইয়ার।”
“সেকেন্ড।”
“তৃণা তুমি তো ভীষণ মেধাবী! আমার ধারণা, শুধু মেধাবীরা ডাক্তার হয়। তুমি তাদের মধ্যে একজন।”
কথাগুলো শুনে শুনে তৃণা খাওয়া বন্ধ করে তাকিয়ে থাকে। রওনক এর মাঝে তাকিয়ে ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“কি হলো? এনি প্রবলেম?”
লজ্জা পেয়ে তৃণা বলে,
“না।”
সে আবার খেতে শুরু করে।
খাওয়া শেষ হলে রওনক একটা সুইচ চাপে। সার্ভেন্ট এসে সব বাসন নিয়ে যায়।
এসির পাওয়ার এডজাস্ট করে রওনক বিছানার দিকে তাকায়। মেয়েটা কেমন একপাশে জড়ো হয়ে বসে আছে।
“তোমার কি খুব ঘুম পেয়েছে?”
প্রশ্নের জবাবে তৃণা মিথ্যে বলে।
“না, তো।”
“তাহলে উঠে আসো। আমি বিছানা থেকে ফুলগুলো সরিয়ে দেই। এসবের মধ্যে শুতে তোমার অসুবিধা হবে।”
কথা মতো তৃণা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়। রওনক এগিয়ে এসে বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ফুলগুলো একত্রিত করতে শুরু করে।
তৃণার মনে হয়, লোকটা এসব কেনো করছে? তার কথা ভেবে নাকি নিজের কথা ভেবে?
ভাবনার মাঝেই রওনক বলে,
“ফুলের মাঝে আমার শুতে অসুবিধে নেই কিন্তু তোমার সমস্যা হতে পারে তাই সরিয়ে দিচ্ছি। আমার তো ইটে মাথা দিয়ে ঘুমানোর অভ্যাস। বর্ডারে থাকাকালীন খোলা আকাশের নিচে খড়কুটোতে শুয়েছি। যাতে বিপদ সিগনাল পেলেই ছুটে যেতে পারি।”
কথাগুলো শুনে মেয়েটা বেশ চমকায়।
ততক্ষণে ফুলগুলো তুলে পাশের ফুলদানিতে টুপ করে রাখতে শুরু করে সে।
“বিনে এসব ফেললে মাহি মন খারাপ করবে। তাই এখানে রাখলাম। মাহি জিজ্ঞেস করলে ওকে বলে দিও, কেমন?”
তৃণা বিস্ময় নিয়ে জবাব দেয়,
“আচ্ছা।”
ফুল সরানো শেষ হতেই রওনক বলে,
“বসো।”
তৃণা বিছানায় বসে।
লোকটা টিস্যু দিয়ে হাত মুছে এসে বিছানার অপরদিকটাকে বসে। ভাবান্তর হয়ে বিছানা হাত দিয়ে সমান করে নেয়।
তৃণা প্রশ্ন করে,
“কী ভাবছেন?”
“এতো তুলতুলে বিছানায় ঘুম হবে কিনা ভাবছি। শক্ত বিছানা ছাড়া আমি ঘুমাতে পারি না। মাহি আজকে বিছানার ম্যাট্রেস বদলে দিয়েছে।”
“তাহলে এখন কী করবেন? এখানে ঘুমাবেন না?”
“কি আর করবো? এই বিছানায় ঘুমানোর চেষ্টা করবো। তুমি শুয়ে পড়ো।”
তৃণা রুমে থাকা মোমবাতি গুলোর দিকে তাকায়। কিছু মোমবাতি নিভে গেছে। তবে কিছু এখনো জ্বলছে।
“মোম গুলোর কী হবে?”
“থাকুক। ওরা দগ্ধ হোক যতক্ষণ পারে। কেউ নিজ থেকে আলো ছড়াতে চাইলে তাকে থামানো অনুচিত।”
তৃণা আর কিছু না বলে মাথার কাছ থেকে একটা বালিশ এনে কোলের কাছে রেখে শোয়। বালিশ না জড়িয়ে ধরলে তার ঘুম আসে না। রওনক দুটো বালিশ একত্রে রেখে তাতে মাথা ঠেকায়। তৃণা শুয়েছে খাটের ডান দিকে রওনকের দিকে ফিরে। আর লোকটা বাম পাশে একদম সোজা হয়ে শোয়া। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে শ্বাস নিচ্ছে।
মোমের আলোতে রুমটা কেমন মায়াবী লাগছে। আলো–আঁধারিতে রওনকের মুখের রেখাগুলো আরও কঠিন মনে হয়, অথচ সেই কঠিনতার আড়ালে লুকিয়ে আছে অদ্ভুত এক ব্যক্তিত্ব।
তৃণা চোখ বন্ধ করে। ঘুম আসছে না।
তবুও ভয়টা আগের মতো তীব্র নয়। সবটা একটু একটু সহজ লাগছে।
প্রথমবারের মতো মনে হয়- এই মানুষটা হয়তো তাকে আঘাত করবে না।
“ঘুমিয়ে গেছো?”
রওনকের প্রশ্নে খানিকটা চমকায় সে। ধীরে ধীরে চোখ মেলে। লোকটা তার দিকে ঘুরে শুয়েছে। দৃষ্টিও বরাবর। কী দেখছে লোকটা? তাকে?
তৃণার মনের প্রশ্ন মনেই রইলো।
হঠাৎ রওনক স্বাভাবিক স্বরে জিজ্ঞেস করে,
“আমি যদি তোমাকে তৃণলতা ডাকি..আপত্তি আছে?”
তৃণা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। বুকের ভেতরটা ধুকধুক করে ওঠে। এই প্রশ্নটা সে আশা করেনি। তাকে নতুন নামে ডাকার অনুমতির এমন গুরুত্ব থাকতে পারে, এমন ভাবে কেউ প্রশ্ন না করলে সে কোনোদিনই বুঝতো না।
ধীরে মাথা নাড়িয়ে সে বলে,
“না..আপত্তি নেই।”
রওনক আর কিছু বলে না।
শুধু “হুম” শব্দটা বের হয় গলা থেকে।
মোমের আলোয় তার চোখ দুটো এক মুহূর্তের জন্য নরম হয়ে আসে—এটা তৃণা দেখে ফেলেও না দেখার ভান করে।
“ঘুমাও।”
স্বাভাবিক স্বরে বলে সে।
“কাল তোমার জন্য লম্বা দিন।”
রওনক আবার সোজা হয়ে শুয়ে পড়ে।
দুজনের মাঝে বালিশের দূরত্বটা আগের মতোই থাকে, কিন্তু অদ্ভুতভাবে দূরত্বটা আর দূরত্ব মনে হয় না।
তৃণা চোখ বন্ধ করে। এবার সত্যিই ঘুম এসে যায়।
…
(চলবে..)
(পড়ার পর অবশ্যই জানাবেন কেমন লাগলো। সকলের কাছে সুন্দর সুন্দর মন্তব্য আশা করছি।)
Share On:
TAGS: ঈশিতা ইশা, মেজর শিকদার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE