তাজমহল #দ্বিতীয়_খন্ড
পর্ব_৩৬
প্রিমাফারনাজচৌধুরী
কাক ডাকা ভোরে ঘুম থেকে উঠে দু’জনেই নামাজ আদায় করেছে। আজকেই যেহেতু ওয়ালিমা। সকাল থেকেই বাড়িতে কাজ শুরু হয়েছে। মেহমান অনেকেই বাড়িতে আছে। সকাল সকাল তাসনুভার নাকে নাকফুল না দেখে শারমিলার শ্বাশুড়ি বলে বসলো, “বিয়ের পর বউদের নাক খালি রাখতে নেই।”
তাসনুভার নাকে প্রচন্ড ব্যাথা। তাই সে কোনোকিছু পরলো না। ব্যাথা কমলে ডায়মন্ডের নোজপিনটা পরবে। গোল্ড পরতে তার ভালো লাগেনা।
মুরব্বি তার নাকে তারপরও নাকফুল না দেখে বিরক্ত হয়ে ছেলের বউকে বললেন, “তোমার ভাইয়ের বউ তো কথাটা কানেও নিল না বৌমা।”
শারমিলা বলল, “সব মেয়ে আপনার ফুতের বউয়ের মতো না।”
“শানুও দেখি নাকফুল পরেনা। শ্বাশুড়ি মনে হয় এজন্যই কথা শুনিয়েছিল। বলেকয়ে একটা সাদা নাকফুল কোনোমতে পরিয়েছি। বাপরে বাপ আজকালকার মেয়েরা এত ত্যাদড়।”
“নাকফুল আর চুড়ি এখন অনেক মেয়েই পরেনা মা। আমরাও পরতাম না। আপনাদের কথার ভয়ে পরি।”
শারমিলা সুযোগ বুঝে শ্বাশুড়িকে কথা শুনিয়ে বেরিয়ে গেল।
সারবিনা এসে তাসনুভার সুবিধা অসুবিধার কথা জেনে গেল। তাসনুভা জানালো কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। তবে কফি হলে ভালো হতো। সে চা খায় না। এই বাড়ির কেউ কফিতে অভ্যস্ত না। সবাই চা খোর। সারাক্ষণ চায়ের কাপে টুংটাং লেগেই থাকে। সাবরিনা বলল,”আচ্ছা শাইনা ভালো কফি বানাতে পারে। ওকে বলি।”
তাসনুভা বলল,”আমি কিচেনে যাই? আমি বানিয়ে নিতে পারবো। সব তো আছে তাই না?”
সাবরিনা বলল,”হ্যাঁ আছে। আপনি রান্নাঘরে যেতে পারবেন না। আম্মা বকাঝকা করবে। আপনি বসেন। আমি পাঠাচ্ছি।”
সাবরিনা বেরিয়ে যাচ্ছিল। তাসনুভা বলল,”আপনার দেওর কোথায়?”
সাবরিনা বলল,”আপনার ভাইয়ার সাথে বাজারে গিয়েছে।”
“আচ্ছা। বাবুরা কোথায়?”
“আফনান ওর নানুর কোলে। তাজনা বুড়ি এখনো ঘুম। উনার ঘুম ভাঙতে দেরি আছে।”
“আচ্ছা ঘুম ভাঙলে এদিকে পাঠাবেন।”
“আচ্ছা।”
সকালের নাশতাটা ননদ ভাবি সবাই একসাথে বসে করলো। শারমিলা আর শাবরিন স্বাভাবিকভাবে কথাবার্তা বললেও শাইনা অতটা বললো না। সে বাসায় উঠা নিয়ে চিন্তিত আছে। কারণ দেশে আর মাত্র তিনদিন আছেন তাজদার সিদ্দিকী। এরিমধ্যে তার একটা ব্যবস্থা করে ফেলতে হবে। এই বাড়িতে সে থাকবে না। ওই বাড়িতে যাওয়ার প্রশ্নেই উঠছেনা। একটা বছর কোনোমতে কষ্ট করতে হবে তাকে।
শাইনার মামী আর খালাম্মারা নতুন বউয়ের সাথে এটা ওটা নিয়ে কথাবার্তা চলছে। তাসনুভা জবাব দিচ্ছে ঠান্ডা মাথায়। শাইনা ছোটো মামী বললেন,
“মিশু তো আপনার পেজ থেকে দুই তিনবার ড্রেস নিয়েছে। বিয়ে ঠিক হওয়ার পর ও আমাকে বলেছে আম্মু আনিস ভাইয়ের বউয়ের পেজ থেকে এই ড্রেসগুলো নিয়েছিলাম।”
মিশু শাইনার মামাতো বোন। তাসনুভা জেনে খুশি হলো। বলল,”নেক্সট টাইম পরিচয় দিতে বলিয়েন।”
খালাম্মা বলল,”বউ নিশ্চয়ই ডিসকাউন্ট দেবে।”
“কেন নয়?”
তাদের খাওয়াদাওয়ার সময় হুট করে চৌকাঠ মাড়িয়ে ভেতরে পা রাখলো তাজদার। সবাই তাকে দেখামাত্রই মাথার কাপড় তোলার জন্য অস্থির হয়ে উঠলো। তাসনুভা সালাম দিল। তাজদার সালাম নিয়ে বলল,”খাওয়াদাওয়া শেষ?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে বারান্দায় আসো একটু কথা আছে। আপনাদের সকালের নাশতা হয়েছে?”
শাইনা মামী জবাব দিল,”জি হয়েছে বাবা। আপনার হয়েছে?”
“জি, শাইনা বাবু ঘুম থেকে উঠেছে। কাঁদছে।”
শাইনা খাওয়া রেখে উঠে চলে গেল। তাজদারের পিছু পিছু বেরিয়ে গেল তাসনুভা।
শাইনা মেয়েকে নিয়ে চলে এল। ঘুমঘুম চোখে সবাইকে দেখছে সে। সে এখন সলিড খাচ্ছে। শাইনা চেষ্টা করছে একেকদিন একেকটা খাবার দিতে। যাতে ও সব খাবারের টেস্টের সাথে পরিচিত হয়। ভাত দেয় না বলে মুরব্বিরা হাজারটা কথা বলে। “আমাদের বাচ্চাদের ভাত খাইয়ে বড়ো করছি। এতকিছু দেওয়া লাগেনাই। নতুন নতুন মা হলে আজ-কালকার মেয়ে কতোকিছু যে দেখায়।”
শাইনা অবশ্য এইসব কানে নেয়নি। তার মা চাচীরাও এভাবে বড়ো করেছে সন্তানদের। তাদের জানাও ছিল না বাচ্চাদের ভারী খাবার নয় পুষ্টিকর খাবার দিতে হয়। তাছাড়া তাদের তখন সামর্থ্যও ছিল না। শাইনা নিজেই মেয়ের খাবার দাবার তৈরি করে। কাউকে এইসব নিয়ে মাথা ঘামাতে হয় না।
তার ছোটোবেলাটা ভয়ংকর ছিল। সে নিজেদের ছোটোবেলার ছবি অ্যালবাম থেকে বের করে একবার ছিঁড়ে ফেলেছিল।
এখন সে তার মেয়ের ব্যাপারে খুব সচেতন। সে যা পায়নি সব দেবে তার মেয়েকে। কোনোদিন একফোঁটাও অযত্ন হতে দেবেনা। যে যাই বলুক না কেন সে এইসব বিষয় নিয়ে খুব একটা ভাবেনা।
শাবরিন বলল,”ওকে আমার কোলে দে। তুই আগে খেয়ে নে।”
শাইনা খালার কোলে দিয়ে ফেললো তাজনাকে। সে ঠোঁট টেনে টেনে কান্না শুরু করে দিয়েছে ততক্ষণে। সবাই বলছে,
“এক্কেবারে ঢঙী হয়েছে তাজদার সিদ্দিকীর মেয়ে।”
সে যেন কথাগুলো বুঝতে পারছে। তাই এবার শব্দ করে কাঁদতে শুরু করলো। শাইনা হেসে বলল,
“ঘুম থেকে উঠলে এরকম করে। আপা ছোটো ভাইয়ার কোলে দে। একটু ঘুরিয়ে আনুক। আমি ওর খাবারটা রেডি করি।”
সে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। শাবরিন বোনঝিকে নিয়ে চলে গেল। তাজনা তারপরও কাঁদছে। সবাই বলাবলি করছে, বাসায় মেয়েকে নিয়ে একা থাকতে ওর কষ্ট হয়ে যাবে।
তাজদারের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার পর তাসনুভা বলল,”খালামণিদের বলো আম্মুকে নিয়ে যেতে।”
তাজদার মাথা নাড়লো।
“যাবে না। তুমি বলে দেখতে পারো। কাল আনিসকে দাওয়াত খাইয়ে আমাকে শাইনাকে নিয়ে বাসায় উঠতে হবে। এখন আম্মু ওয়ালিমায় না গেলে আনিস নিশ্চয়ই আমাদের বাড়িতেও যাবে না। ও তো বুঝে যাবে বাড়িতে কি চলছিল। ক্লাবে আম্মুকে দেখে ও আমাকে প্রশ্ন করেছিল। আমি কিছু বলতে পারিনি।”
“বড়ো ভাইয়া কিছু বলেনি।”
“আম্মু বড়ো ভাইয়ার কথা কবে শুনেছে?”
“আব্বু, দাদু?”
“কারো কথা শোনার নয়। রান্নাঘরও বাকিরা সামলাচ্ছে। উনি ঘর থেকেই বের হচ্ছে না ভালো করে। যদি আজকে ক্লাবে না যায় আনিসকে আমি সবটা বলে দেব। বাকিটা তুমি ম্যানেজ করে নেবে। এখানে সব ঠিকঠাক?”
“হ্যাঁ।”
“আচ্ছা, দেখি কি হয়। তুমি টেনশন নিওনা। শাইনার সাথে কথা হয়েছে?”
তাসনুভা মাথা নাড়লো,”না।”
শাওনের কোলে কেঁদে যাচ্ছিল তাজনা। তাজদারকে দেখে শাওন এগিয়ে এল।
“বাপরে এটা কি জিনিস। কিছুতেই থামছে না।”
তাজদার কোলে নিতেই কান্না থেমে এল। সে বাবার কাঁধে মাথা রেখে ফোঁপাতে লাগলো। তাজদার বলল,
“খায়নি বোধহয়।”
আনিস আর আশরাফ তখন বাড়িতে এল। তাসনুভা তাদের দেখে ভেতরে চলে গেল। আশরাফ বলল,”বাবা মেয়ে কি করছে? একি মামার চোখমুখ ফোলা কেন?”
“ঘুম থেকে উঠেছে সবে তাই।”
আনিস বলল,”চা কফি খাবি। ভেতরে চল।”
তাজদার বলল,”আমি খাব না। রান্নার কাজ কতদূর?”
“আব্বারা আছে ক্লাবে। সব তো ঠিকঠাক বলছে।”
ওয়ালিমায় পরার জন্য তাসনুভা লেহেঙ্গা কিনেছিল। লেভেন্ডার কালার। লেহেঙ্গাটির বিশেষত্ব হচ্ছে তার কারুকাজ। তাকে মানিয়েছেও বেশ। আনিস পরেছে কালো পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবিটা তাসনুভার পছন্দের।
রওশনআরা ওয়ালিমায় এসেছেন। আসার পেছনে লম্বা একটা কাহিনী আছে। সকালে রায়হান স্পষ্ট করে বলে দিয়েছিল যদি তিনি ওয়ালিমায় না গিয়ে তাদের সবাই প্রশ্নের মুখোমুখি ফেলতে চায় তাহলে সে ওয়ালিমায় অ্যাটেন্ড করবে না। এমনকি তাজউদ্দীন সিদ্দিকী আর তার ভাইবোনেরা কেউ যেতে পারবেন না। ব্যস! এতেই কাজ হয়ে গেল। সবাই চেপে ধরে রওশনআরাকে নিয়ে গেল। রায়হানের এই সিদ্ধান্তের বেশ প্রশংসা করলো ঝিমলি। ছেলেটা কাজের হচ্ছে আজকাল।
রওশনআরা সহ বেয়াইনরা সবার জন্য একটা টেবিলে বসেছিল। আনিস তার কলিগদের খাবার টেবিল থেকে ঘুরে এসে তাজদারকে বলল,
“বড়োআম্মুরা টেবিলে বসেছে। একটু দেখে নে তো। সবার খাওয়াদাওয়া ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা।”
তাজদার গেল। সবার পাতে মাছ মাংস তুলে দিয়ে আবার অন্য টেবিলে চলে গেল। রওশনআরা এককোণায় বসে চুপচাপ খাচ্ছেন। আনিস এল কিছুক্ষণ পর।
“বড়োআম্মু রান্না ভালো হয়েছে?”
রওশনআরা মাথা দোলালো।
“হয়েছে।”
তাসনুভা দূর থেকে মাকে দেখে যাচ্ছিল।
শাহিদা বেগমের হিজাব সরে গিয়ে এলোমেলো হয়ে গেছে। তাসনুভা ছবি তোলার আগে ঠিকঠাক করে দিল। তারপর মা আর শ্বাশুড়ির মাঝখানে বসে ছবি তুললো।
খাওয়াদাওয়া শেষ করে দুই পরিবারের ফ্যামিলি ফটো তোলা হলো আলাদা আলাদা করে। আবার একসাথেও তোলা হলো। তৌসিফ সবশেষে শাওনকে বলল,
“এটাই শেষ বিয়ে যেটাতে আমরা সবাই আছি। তারপর তুই শালা একা একা খাবি সব বিয়ে।”
শাওন তার পিঠ চাপড়ে বলল,”লন্ডনে গিয়ে এই গরিবকে ভুলে যাস না।”
তৌসিফের মন খারাপ লাগছে। দেড় মাস পর সে চলে যাবে। অনেক চড়ে বেড়ানো হয়েছে। এবার ক্যারিয়ারে ফোকাস করার পালা।
ওয়ালিমার শেষের দিকে সবাই একজোট হয়েছিল তখন রায়হান ভয় পাচ্ছিল কোনো তর্কাতর্কি না লেগে যায়। যেটার ভয় পাচ্ছিল সেটাই হলো। তাজউদ্দীন সিদ্দিকী শাইনাকে বাসায় নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের জন্য তাজদারের উপর খেপেছে। আফসার সাহেব আর শাহিদা বেগমকে বলছেন, তাদের জামাইকে যেন আটকায়। একটা ছোটো বাচ্চা নিয়ে একা একা বাসায় থাকা অনেক কষ্টের।
তাজদার বলল,”কষ্টের হলে কষ্টের। কষ্ট ও করবে। তোমরা করবে না। ওর বাসায় যাওয়াটা কনফার্ম। সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে। এখন আর বলে লাভ নেই।”
লাভ হতো যদি রওশনআরা বলতো। কিন্তু তিনি খাওয়াদাওয়া আর ছবি তোলা শেষে চলে গিয়েছেন বোনদেরকে নিয়ে। তাজউদ্দীন সিদ্দিকী বললেন,
“এরা মা ছেলের মাঝখানে আমি শেষ। এদের কেউ আমার কথা কানে তোলে না। যাও, যার যেদিকে ইচ্ছে চলে যাও। বেঁচে থাকতে এইসবও আমাকে দেখতে হলো।”
আশরাফ বলল,”অন্তত সম্পর্ক ভালো থাকার জন্য আলাদা থাকতে হয় বড়োআব্বু। সংসারে এইসব হয়। শাইনা এখন আলাদা থাকুক। আমার খালার মেয়েরা আছে। ওদের একজন থাকবে শাইনার সাথে।”
তাজউদ্দীন সিদ্দিকী আর কিছু বললেন না। তাজদারের ফুপুরা বলল,
“যেমন আমার ভাইয়ের বউ। তেমন তার ফুতের বউ। খাপে খাপ।”
তাসনুভা এককোণায় মন খারাপ করে দাঁড়িয়েছিল। শাহিদা বেগম তাকে গিয়ে বলল,
“তুমি চলো। এইসব শুনে আর লাভ নেই। আনিস চলে আয়।”
আনিস সাবরিনা, শাইনা, শারমিলা আর শাবরিনকে গাড়িতে তুলে দিল। তারপর বাকিদেরও ডেকেডেকে গাড়িতে তুলে দিল। তাজদার রায়হান আশরাফ তৌসিফ এরা ছিল ক্লাবে। সবাই মিলে পারিবারিক বিষয়গুলো আলাপ আলোচনা করে যে যার বাড়ি ফিরে গেল। রায়হান তাজদারকে বলেছে যাওয়ার আগে নুভার সাথে শাইনার মিল করিয়ে দিতে। ওদের মধ্যে দূরত্ব আছে বেশ। ওদের সম্পর্ক স্বাভাবিক না।
আনিস পাশেই দাঁড়িয়েছিল। সে কথাটা চুপচাপ শুনলো।
আনিসের জামাই আদরের দিন বাড়িতে সবাই সতর্ক ছিল। যাতে কোনোরূপ ঝামেলা না হয়। তাই দিনটা ভালোভেবে কেটেছে। তাজদারের মামী, ফুপু আর খালারা ছিল। তারা বেশ ভালোভাবে জামাই আপ্যায়ন করেছে।
ওইদিন রাতে শাইনা বাসায় চলে যাচ্ছিল। পাড়াপ্রতিবেশিরা সবাই জড়ো হলো। শাইনা তার বাড়ি থেকে বের হলো। তাজনা এই কোল, ওই কোলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে তৌসিফকে ডাকলো। তৌসিফ তাজনাকে নিয়ে আসতেই শাইনা বলল,”ভাইয়া ওকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যাবেন না।”
তৌসিফ মাথা নেড়ে বলল,”ওকে।”
শাইনার কথাটার অর্থ হচ্ছে বড়োআম্মুর কাছে যাতে বাবুকে না নিয়ে যাওয়া হয়।
তাজদার দাঁড়িয়ে আছে রওশনআরার ঘরের সামনে। সে বাসা থেকে এয়ারপোর্টে চলে যাবে। বাড়িতে আর আসবে না। তাই দাদিমার কথায় শেষমেশ দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। রওশনআরা ভেতরে।
রায়হান দরজা ধাক্কালো। তাজউদ্দীন সিদ্দিকী দরজা ধাক্কালো। শেষমেশ দাদিমাও এলেন। কড়া কয়েকটা কথা শোনাতেই তিনি ধীরেধীরে দরজা খুললেন। তাজদার সাথে সাথে নিচু হবে কদমবুসি করলো। রওশনআরা মাথার উপর আলতোভাবে হাত রাখতেই তাজদার ওয়েস্টকোটের বোতাম লাগাতে লাগাতে বেরিয়ে এল।
শাইনা গাড়িতে উঠে বসেছে সবাই সালাম করে। তাজউদ্দীন সিদ্দিকী কিছু বলতে গিয়েও থেমে গিয়েছিলেন। কি বলবেন খুঁজে পেলেন না। তবে দাদিমা বললেন,”তোমার শ্বাশুড়ি দেখতে চাইলে নাতনীকে একবার দেখিয়ো। সবাই অবুঝ হলে তো চলবে না।”
শাইনা মেয়েকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে গাড়িতে বসে রইলো। তাজদারও উঠে বসলো। গাড়িটা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েছিল উঠোনে। শেষমেশ গাড়ি ছেড়ে দিল। তাজদার জানালার কনুই রেখে ঠোঁটের কাছে হাত রেখে গম্ভীর হয়ে জানালার বাইরে চোখ রেখে বসে আছে। শাইনাও জানালার বাইরে চেয়ে আছে। চোখদুটো লালচে আর ফুলে গেছে কান্না রুখতে গিয়ে। শ্বশুরবাড়িতে তার ভালো বউ হয়ে থাকা হয়নি।
গাড়িটা এগিয়ে যাচ্ছে নতুন বাসার দিকে। তাজদার তাজনাকে কোলে নিয়ে গুমোট পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো। একদিন ঠিক হয়ে যাবে। সব। কিন্তু সে কথাটা শাইনাকে বলতে পারলো না।
রাতে শাওন, আশরাফ, তৌসিফ, তাশফিন, রায়হান, তিতলি সবাই বাসায় গেল। আনিস বাইকে করে গিয়েছে তাসনুভাকে নিয়ে। তাজদার সবাইকে যেতে বলেছে। রাতের ডিনার সেখানে হবে। যদিও আনিসের রাতে শ্বশুরবাড়িতে খাওয়ার কথা। কিন্তু তাজদারের কথায় সবাই বাসায় চলে গেল।
বাসায় সব লন্ডভন্ড তখন। সবাই যাওয়ায় সুবিধা হলো। হাতে হাতে সব জিনিসপত্র ঠিকঠাক করে দিল। তিতলি বলল, “আমি এখানে দুইদিন থাকবো।”
তাসনুভা বলল,”ভাইয়া চলে গেলে তখন। এখন চুপ করে বসে থাকো সোফায়।”
তিতলি বলল,”তুমি আর আনিস ভাই হানিমুনে যাবে না?”
“ননসেন্স।”
“ননসেন্স কেন? বিয়ের পর সবাই তো হানিমুনে যায়। আমিও যাব।”
“তিতলি চুপ।”
“আচ্ছা আনিস ভাই তোমাকে কি গিফট দিয়েছে?”
“কীসের গিফট?”
“বিয়ের রাতে গিফট দেয় না? ফুল, চেইন, আংটি।”
“এইতো আংটি। এগুলো তো বিয়ের দিনই দিয়েছে।”
হাতটা বাড়িয়ে দেখালো তাসনুভা। তিতলি বলল,”তুমি কি দিয়েছ?”
“পেন্ডিংয়ে আছে।”
“ঘড়ি দেবে?”
“না, ওটা খুব সিম্পল হয়ে যায়। গর্জিয়াছ কিছু দেব। কি দেয়া বলো তো তিতলি।”
তিতলি বলল,”ফোন?”
“উঁহু উনার ফোন আছে।”
তিতলি বলল,”পারফিউম, ঘড়ি, শার্ট-প্যান্ট ইত্যাদি ইত্যাদি…
“নো এইসবে হবে না। অন্য কিছু।”
তিতলি বলল,”তোমার মাথাটা দাও।”
তাসনুভা বলল,”আনিসুজ্জামানের মাথা আছে, মগজও আছে। তুমি তোমার মাথাটা তোমার বরকে দিও।”
সবাই একসাথে হওয়ায় ভীষণ হাসিঠাট্টা মজামাস্তি হচ্ছিল। তাজদার বাইরে থেকে খাবার অর্ডার করেছে যদিও। তবুও তৌসিফ আর শাওন মিলে ঝালমুড়ি মাখার প্ল্যান করলো। কিন্তু তাসনুভা পুরো দায়িত্বটা নিজের কাঁধে তুলে নিল। কারণ ভাইয়া আর শাওন ভাইয়ের হাতে মাখা ঝালমুড়ি সে খাবে না। রাক্ষসগুলো ঠিকই হাত ধোয় কিনা সন্দেহ। হাত ধুয়ে মাখলেও সে খাবে না। কাউকে খেতে দেবে না।
পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে তার চোখ জ্বলতে লাগলো। তৌসিফ আর শাওন মজা নিতে লাগলো।
“আনিস ভাই তোমার বউ কাঁদছে।”
ওরা গুরুতর আলোচনা করছিল। এদের ঠাট্টা মশকরা তাদের বিরক্ত করায় রায়হান একটা ধমক দিল। সাথে সাথে সবাই ঠান্ডা। তাসনুভা হাসলো।
“কেমন লাগলো?”
তৌসিফ বলল,”তুই বহুত ডেঞ্জারাস মেয়ে।”
শাইনা এসে বাটিতে চানাচুর ঢালতে ঢালতে বাদাম বাছাই করে খেতে লাগলো। বাদাম তার খুব প্রিয়। তাসনুভার বাদাম অপছন্দ। সে অন্য প্যাকেটটা ছিঁড়ে বাটিতে ঢেলে সব বাদাম বাছাই করে একটা ছোট্ট বাটিতে তুলে রেখে গ্লাভস পরে ভালো করে ঝালমুড়িটা মাখলো। শাইনা ছোটো বাদামের বাটিটা নিয়ে হেঁটে হেঁটে বাদাম খাচ্ছে। তাজনা খাওয়ার জন্য হাত নাড়াচ্ছিল। শাইনা তার মাথায় চুমু খেয়ে বলল,
“আপনি খেতে পারবেন না মা।”
বড়ো বোলটা নিয়ে এসে তাসনুভা টি টেবিলের উপর রাখলো। আশরাফ বলল,
“কিছুক্ষণ পরেই ভাত খাবে। এখন এইসব কেন?”
“গল্প করতে করতে খান। কিন্তু এখন না ভাইয়া। সবাই আগে হ্যান্ডওয়াশ করে নিন প্লিজ।”
সবাই তার জোরাজোরিতে উঠে গেল। আনিস উঠলো না। তাসনুভা বলল,
“আপনি বসে আছেন কেন?”
আনিস ফোনে মগ্ন ছিল। তাসনুভা ডাকলো,
“আনিসুজ্জামান?”
আনিস চোখ তুলে তাকালো। তাসনুভা হাত বাঁকিয়ে বলল,”কোন দুনিয়ায় আছেন?”
“কী?”
“হাত ধুতে যান।”
“আমি চামচ দিয়ে খাব।”
“চামচে জীবাণু লাগবে। তারপর চামচ দিয়ে খাবারে। তারপর পেটে। সো প্লিজ।”
আনিস উঠে গেল। সে হাত ধুতোই। তাসনুভাকে একটু নাচানো এই আর কি। সবাই বোল দিয়ে ঝালমুড়ি নিয়ে খেতে লাগলো। মজা হয়েছে খুব। তবে ঝালটা বেশি।
তাজদার তাসনুভাকে বলল,”এটা খাইয়ে সবার খিদে নষ্ট করে দিয়েছ।”
তাসনুভা বলল,”ভাত তাহলে বারোটার দিকে। এখন সবাই গল্প করুক।”
সে চলে যাচ্ছিল। তাজদার তাকে ডাকলো,
“নুভা দাঁড়াও।”
তাসনুভা ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো। শাইনা আর তাজদার চোখাচোখি হতেই শাইনা সোজা হয়ে দাঁড়ালো মেয়েকে কোলে নিয়ে।
তাজদার বলল,”আমি কালই চলে যাব। সো তুমি মাঝেমধ্যে এখানে এসে শাইনাকে আর বাবুকে দেখে যাবে। তোমাদের মধ্যকার ঝামেলা থাকলে মিটিয়ে ফেলবে। শাইনা?”
শাইনা বলে উঠলো,”জি, আমাদের মধ্যে কোনো ঝামেলা নেই। ঝামেলা হবে কি নিয়ে।”
সবাই চুপচাপ শুনছে। এবার আশরাফ বলল,
“তাও, হয়ে থাকলে দুজনের বসে কথা বলে নেয়া উচিত। কথাবার্তা বন্ধ থাকলে এগুলো সমস্যা বাড়ায়।”
রায়হান বলল,”কাজটা নুভা করবে। ও বড়ো। ওর এগিয়ে আসা উচিত। ছেলেরা সব কথা ধরে বসে থাকেনা। মেয়েরা বসে থাকে বলে বাড়ির মধ্যেকার পরিবেশ নষ্ট হয়। নুভা ভাইয়া কি বলেছি শুনেছ?”
তাসনুভা সাথে সাথে সাড়া দিল,”জি শুনেছি। আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।”
“শাইনা?”
“জি ভাইয়া। আমি তো বলেছি আপুর সাথে আমার কোনো ঝামেলা নেই। আর এইসব নিয়ে আপনাদের ভাবতে হবে না। আমরা ঠিক করে নেব।”
“তাও পুরোনো রাগ ক্ষোভ সম্পর্কের মধ্যে ফাটল তৈরি করে। এগুলো চেপেচুপে রাখার জিনিস না।”
তাজদার তাসনুভার দিকে তাকিয়ে বলল,”তাহলে আমি গেলাম? ওর ফাইনাল পরীক্ষার পর নিয়ে যাব। ততদিন ও বাসায় থাকবে। সবাই তো আছে। তুমি আর তিতলিও আসা-যাওয়া করবে।”
“ওকে।”
ভাত খাওয়ার পর সবাই বেরিয়ে পড়েছে। তাসনুভা আনিসের বাইকের পেছনে বসতে বসতে বলল,
“বাড়ি ফিরবো না এখন।”
“নতুন বউ নিয়ে রাতে বেশিক্ষণ বাইরে থাকা যায় না।”
“কে বলেছে?”
“তোমার শ্বাশুড়ি।”
“মুরব্বি মানুষ এইসব উনি বলবেনই। আপনি সোজা যান। আজ সারা রাত ঘুরবো। আপনার কাল ছুটি আছে।”
সে বাইকে বসে আনিসের কাঁধে হাত রাখলো পূর্ণ অধিকার নিয়ে। সালোয়ার কামিজ পরে এসেছে। এখন মনে হচ্ছে শাড়ি পরে আসা উচিত ছিল।
বাইকের গতি বাড়তেই তাসনুভা আচমকা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল আনিসকে। বুকের ওপর বরফশীতল দুটো হাতের স্পর্শ পেতেই আনিসের ভেতরে একটা অস্বস্তি খেলে গেল। বাইকের থ্রটল কমিয়ে দিল সে। স্পর্শ আলগা হতেই তাসনুভাও হাত সরিয়ে নিল দ্রুত।
খানিকটা সময় চুপ থেকে তাসনুভা হুট করেই প্রশ্ন করল, “আনিস ভাই আপনি কোন রঙটা সবথেকে বেশি পছন্দ করেন?”
“সাদা গাধা।”
তাসনুভা থতমত খেয়ে গেল। খানিকটা ভ্রু কুঁচকে বলল, “মানে? গাধা কে?”
” তুমি। আমি কোন দিক দিয়ে তোমার আনিস ভাই? এইসব মানুষে শুনলে কি বলবে?”
তাসনুভা খিলখিল করে হেসে উঠল। তারপর আবার আনিসের পিঠে মুখ গুঁজে দিয়ে বলল, “এই ডাকটা বেশ কিউট!”
আনিসের পিঠে একটা অদ্ভুত শিরশিরানি অনুভূত হচ্ছে। সে অপ্রস্তুত! মেয়েটা বিপজ্জনক।
চলমান…
Share On:
TAGS: তাজমহল সিজন ২, প্রিমা ফারনাজ চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ৭+৮
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ২৮
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ১
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ২৩
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ১০
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ৩
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ৩১
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ২১
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ৩৪
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ১৫+১৬