প্রেয়সীর_অনুরাগ
লেখনিতে —#সাদিয়াজাহানসিমি
পর্ব_১১
রাফসা ড্রইং রুমে এসে দেখে ছেলেরা বসে আছে। দেখেই মনে হচ্ছে, বেশি সময় হয়নি ঘুম থেকে উঠার। রোহান রাফসাকে দেখে কাছে ডাকে। রাফসা গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেল সেইদিকে। রাফসা রোহানের সামনে দাঁড়াতেই ও চোখ দিয়ে ইশারা করলো বসতে। রাফসা বিপরীত সোফায় বসে পড়ে। বেচারি এখনো ঘোরে আছে, উদ্যানকে দেখে। এই খচ্চর কখন দেশে এলো। আর ও মুখের উপর ডিজগাস্টিং বয় কিভাবে বলে দিল। পরক্ষনেই ভাবে,ভালো হয়েছে। এই খচ্চর লোক সম্মানের অযোগ্য। রাফসার আকাশ কুসুম ভাবনার মাঝেই রোহান বলে উঠল। ” তুই এমন চুপ, কিন্তু কেন? আচ্ছা,তুই কি উদ্যানকে দেখেছিস? আজ সকাল সাতটায় চট্টগ্রাম এয়ারপোটে নেমেছে। আমি,রিশান গিয়ে এনেছি উদ্যানকে।”
রাফসা মুখ বাঁকাল। বোধহয় বিরক্ত হয়েছে। চোখ মুখ কুঁচকে নিরস গলায় বলল। ” আচ্ছা। তা আমাকে এতো কিছু বলছো কেনো? ভালো লাগছে না শুনতে।”
রোহান থমথমে খেয়ে গেল। পাশে বসা জায়িন, মাহিন ওরা দুজনেও ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
” রাফু,তুই কি খুশি হসনি? উদ্যান ভাই এতো বছর পর ফিরে এলো দেশে। “
মাহিনের কথায় জায়িন ও তাল মিলিয়ে মাথা নাড়িয়ে বলল। “ঠিক তো। আগে ভাইয়া মেডিকেল থেকে বাড়ি ফিরবে কখন,তার জন্য অপেক্ষা করতি। ভাইয়া বাড়ি এলে , তোর থেকে খুশি কেউ হতো না।”
রাফসা এবার বেশ বিরক্ত হয়। কপালে বিরক্তিকর ভাঁজ পড়ে । উদ্যানের কথা শুনলে যে গা জ্বলে উঠলো। এই লোকের মতো এমন আর কখনো দেখেনি। রাফসার আগের কথাগুলো মনে আছে। কিভাবে ওকে অপমান করেছিল। এই লোকের সামনে কখনো পা মাড়াবে না রাফসা। কালো রঙের ওড়নাটা মাথায় তুলে দিয়ে বলল। “আগের দিন বাঘে খাইছে, তখন তো ছোট ছিলাম। তাই খুশি হতাম, কিন্তু এখন আমি বড় হয়েছি। অনেক কিছু পাল্টেছে। সবকিছু তো আর আগের মতো থাকে না সবসময়।”
“তখন খুশি হতি কারণ , উদ্যান বাদে তোর জন্য কেউ চকলেট আনতো না। তোর চকলেট খাওয়া বারণ ছিল, তবুও উদ্যান মাঝে মাঝে তোকে চকলেট এনে দিতো। ছিঃ রাফসা, তুই এতো লোভী?”
রোহানের কথা দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে রাফসা। আগে চকলেট এর জন্য ঘুরতো, নাকি অন্যকিছুর জন্য ঘুরতো সেটা ও ছাড়া কে জানে।
” এই উদ্যান, দেখ রাফসা খুশি হয়নি তোকে দেখে। ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বসে আছে। যেন তোকে চিনেই না।”
এ কথায় রাফসা সামান্য ঘাড় বাঁকিয়ে পেছনে তাকালো। উদ্যান ভ্রু কুঁচকে ওর পানেই চেয়ে আছে। চুলগুলো ভেজা লাগছে। হয়তো ফ্রেশ হয়ে এসেছে। গম্ভীর শীতল দুটি চোখে প্রশান্তি মিশে আছে যেন বহুবছরের। সিক্স প্যাক গুলো কাপড় ভেদ করে যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে। ফর্সা শরীরে কালো শার্টটা টান টান হয়ে আছে। খোঁচা খোঁচা চাপদাড়ি, মাঝের হালকা গোলাপি অধরযুগল কামড়ে ধরে রেখেছে। ফর্সা হাতে দামি ব্র্যান্ডের ওয়াচ। রাফসা খেয়াল করে আগের উদ্যান আর এখনকার উদ্যানের মাঝে আকাশ পাতাল পার্থক্য। উদ্যান ডান হাতটা প্যান্টের পকেট থেকে বের করে আনে। দুহাত দিয়ে ভেজা চুলগুলো কপালের অগ্রভাগ থেকে সরিয়ে দিল। উদ্যানকে সামনের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে রাফসা ঘাড় ঘুরিয়ে সামনে তাকায়। উদ্যান এসে রোহানের পাশে বসে, ঠিক রাফসার মুখোমুখি। উদ্যান রাফসার চোখে চোখ রেখে ভ্রু নাচিয়ে বলল। ” মোহ কেটে গেছে, তাই। মানুষ মাত্রই পরিবর্তন। সময়ের তালে তালে, অনেক কিছুই পাল্টে যায়।”
“ কিসের মোহ? উদ্যান ভাই!”
উদ্যান মাহিনের কথায় একপলক ওর পানে তাকায়। বাঁকা হেসে বলল। ” চকলেটের মোহ। সেটাই বলছি।”
উদ্যানের খোঁচা মারা কথা শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো শরীরটা। খুব ভালো করেই বুঝেছে কিসের কোন কথা ইঙ্গিত করছে। রাফসা আর বসে থাকতে পারেনি। উঠে ধুপধাপ শব্দ করে কিচেনের দিকে ছুটে। ওরা সকলে হেসে উঠলো। ঊষা নিচে নেমে আসে। সোফায় দৃষ্টি ফেলতেই চোখ আটকে গেল। উদ্যানকে দেখে ঢ্যাপ ঢ্যাপ করে তাকিয়ে রইল। মনের ভুল ভেবে, দুহাত দিয়ে চোখ কোচলায়। পুনরায় চোখ খুলেও ভাইকে দেখে অবাক হয় বেশ। ও মুর্তি মতো ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল। রিশান ওর পেছনে দাড়িয়ে মাথায় মৃদু টোকা দিয়ে বলল। ” এই চুন্নি, এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ভাইকে দেখে অবাক হয়েছিস! এতো অবাক হতে হবে না।”
ঊষা পেছন ফিরে তাকায়। রিশানকে দেখে ঘোরের মাঝেই বলল। “আসলেই, ভাইয়া এসেছে? কিন্তু, কখন? আর বলা নেই, কওয়া নেই। আমার চোখে কি সমস্যা, আসলেই ভাইয়া?”
রিশান ঠোঁট কামড়ে হেসে কপালে টোকা দিল।
” হ্যাঁ। উদ্যান ভাই এসেছে। সারপ্রাইজ ছিল এটা।”
ব্যাস, ঊষাকে আর পায় কে। রিশানের কথা শোনার প্রয়োজন নেই। ডানে বামে না তাকিয়ে দৌড় লাগায়। সোজা গিয়ে ভাইয়ের বুকে পড়ে। উদ্যান ফোন দেখছিল। হঠাৎ কেউ জড়িয়ে ধরাতে হকচকিয়ে গেল। ব্যক্তিটা বুঝতে পেরে মুচকি হাসলো। হাত বাড়িয়ে নিজেও বোনকে জড়িয়ে ধরে। ঊষা মুখ উঠিয়ে ভাইকে দেখলো।
” ভাইয়া, তুমি আসবে বললে না কেন? “
” বললে কি আর সারপ্রাইজ দিতে পারতাম? বাড়ির কেউই জানতে পারেনি, রোহান রিশান ছাড়া।”
ঊষা অভিমানে গাল ফোলালো। ওকে জানালে কি এমন ক্ষতি হতো। ভাইয়ের পাশ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে। ভেংচি কেটে বলে। ” তোমার সারপ্রাইজ, তোমার কাছেই রাখো। কথা নেই তোমার সঙ্গে।”
” ও আচ্ছা, তাহলে আমার গিফট গুলো, তোকে দেবো ভেবেছিলাম। এখন তুই না নিলে কি করার। এসব বরং, মাইশা জারাকে দিয়ে দেবো।”
উদ্যানের কথায় অভিমানি চোখে তাকায় ঊষা। আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায়নি। ছুট লাগায় কিচেনে।
কিচেনে এসে মা চাচিদের এতো এতো তোড়জোড় দেখে মুখ বাঁকায় ঊষা। রাফসাকে ও এখানে দেখে জিজ্ঞেস করল। ” তুই এখানে কি করছিস? নাস্তা বানাচ্ছিস নাকি?”
” দাঁড়িয়ে আছি,দেখতেই তো পারছো। চোখ কি আনন্দে তোমার ভাইয়ের কাছে রেখে এসেছো? “
বিরক্ত নিয়ে কথাটা বলল রাফসা। দাঁড়িয়ে আছে দেখতেই পাচ্ছে , তবুও বলছে উল্টো কথা। এমনিতেই মাথার মেজাজ বিগড়ে আছে। কিছুক্ষণ আগে ভাই খোঁচা মেরে কথা শোনাল। এখন আবার বোন এসে তাতে ঘি ঢালছে। রাফসার ত্যাড়া কথায় ভ্রু কুঁচকালো ঊষা। এমন করে কথা বলছে কেন। রেগে আছে বোধহয়। ভাইকে দেখেও রেগে আছে। ঊষা রাফসার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ওর কপালে পড়ে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে মৃদু হেসে বলে। ” কি হয়েছে ভাবী? আমার ভাইকে দেখে খুশি হননি? সবার থেকে বেশি খুশি তো হওয়ার কথা আপনার। কিন্তু তা না করে, আপনি এমন টাকি মাছের মতো লাফ মেরে উঠছেন কেন? “
ঊষার মুখ থেকে ভাবী ডাক শুনে স্তব্ধ হয়ে যায় রাফসা। হ্যাবলার মতো তাকিয়ে রইল ওর পানে। আজ প্রথম এমন রশিকতা করছে ঊষা।
” তোমার কি মাথা গেছে আপু? কিসব উল্টো পাল্টা কথা বলছো?”
ঊষা একপলক বড়দের দিকে তাকালো। ওনারা কাজ করতে ব্যস্ত। এদিকে কোনো হুঁশ নেই। তারপর রাফসার দিকে তাকায়। ও এখনো অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। ঊষা ওর গাল দুটো হালকা চেপে ধরে আস্তে করে বলল। “ভুল বললাম কি? তুই ভাইয়াকে ভালোবাসিস। বিয়ে করবি না। তাই তো ভাবী বললাম। আগে থেকেই ট্রাই করছি। কি দিনকাল এলো, আমার থেকে গুনে গুনে দুবছরের ছোট মেয়েকে ভাবী ডাকতে হবে। আফসোস!”
রাফসার কপালে বিরক্তিকর ভাঁজ। ঊষার কথা শুনে বিদ্রুপ করে বলল। ” কে বলেছে, আমি তোমার ভাইকে ভালোবাসি? তুমি ভুল জানো আপু। আর হ্যাঁ, দয়া করে ভাবী বলবে না। বিরক্ত লাগে শুনতে।”
রাফসার এহেন কথায় তব্দা খেয়ে গেল ঊষা। রাফসার চোখে মুখে স্পষ্ট ঘৃণা ফুটে উঠেছে। নাকের পাটা ফুলে উঠেছে। ঊষা জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজালো। ” ভুল জানি মানে? তুই তো বলেছিলি, ভাইয়াকে ভালোবাসিস। তাহলে, এমন কথা বলছিস কেন সোনা?”
” আগে হয়তো বেসেছিলাম। কিন্তু, এখন আর বাসি না আপু। ওটা মোহ ছিল। সময়ের তালে তালে সেই মোহ বিলীন হয়ে গেছে। তার জন্য বিন্দুমাত্র ভালোবাসা আমার মনে নেই। “
রাফসার এমন কঠিন কথা শুনে চক্ষু ছানাবড়া ঊষার। এটা সেই মেয়ে? যে কিনা বছর তিনেক আগেও ওই মানুষটার জন্য পাগলামি করেছিল।আজ সে কিনা এতো কঠিন শব্দ বের করছে মুখ দিয়ে। ” তুই নিশ্চয়ই রেগে আছিস ভাইয়ার উপর। তাই জন্য এমন কথা বলছিস। “
রাফসা পুনরায় চোখ মুখ কুঁচকে বলল। ” তোমার ভাইয়ের সাথে আমার তেমন কোনো সম্পর্ক নেই আপু। তার উপর রাগ করার অধিকার আমার নেই। আগের কথা সব ভুলে যাও। আমার সামনে আর ওমন কথা বলবে না। “
কথাগুলো একদমে বলে রাফসা আর দাঁড়ায়নি। কিচেন রুম ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। এদিকে ঊষার স্তব্ধ হয়ে বিমূঢ় চেয়ে রইল।
রাফসা ঘরে এসে গা এলিয়ে দিল বিছানায়। মাথাটা ধরে আছে। উদ্যানকে সামনের দেখে পুরনো ঘা গুলো তাজা হয়ে উঠল যেন। চোখ বন্ধ করে রাফসা চুপ করে রইল। দীর্ঘ রাতের নির্ঘুম। নিজের সাথে নিজেই লড়াই করে আজ এ পর্যায়ে এসেছে। তবে, আজকের রাফসার তৈরি হয়ে উঠার পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান একজনের। সেই পুরুষ যদি সেই সন্ধ্যায় অপমান না করতো, ছেড়ে না যেতো — তাহলে আজকের রাফসা হয়ে উঠতে পারতো না। এতো সংগ্রাম কখনোই সম্ভব হতো না। রাফসার ভাবনার মাঝেই ওয়াশরুমের দরজা খট করে খুলে যায়। শব্দ শুনে রাফসা চোখ মেললো। মাইশা ফ্রেশ হয়ে বেরিয়েছে। রাফসাকে রুমে দেখে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে। ” রুমে কেন তুই? আমি এক্ষুনি যাচ্ছিলাম নিচে। কষ্ট করে আসলি শুধু শুধু। “
মাইশার কথায় রাফসার তেমন ভ্রুক্ষেপ নেই। ঠাঁই শুয়ে আছে। মাইশা পুনরায় ডাকতেই উঠে বসে। রাফসার চোখ মুখ লাল হয়ে আছে। তা দেখে আঁতকে উঠে মাইশা। সচরাচর রাফসা রাগ বা কষ্ট পেলে এমন হয়। মাইশা উদগ্রীব হয়ে উঠে। ” রাফসা, কি হয়েছে তোর? চোখ মুখের এই হাল কেন?”
রাফসা চোখ বন্ধ করে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে। নিজেকে ধাতস্থ করে চোখ মেলে। মাইশা উওরের আশায় তাকিয়ে আছে। তা দেখে রাফসা হেসে বলল। ” কিছু হয়নি আপু। মাথা ধরে আছে। তাই হয়তো এমন লাগছে। “
” কফি খাসনি? নিচেই তো ছিলি।”
রাফসা মাথা নাড়িয়ে না বলে। মাইশা টাওয়াল দিয়ে মুখটা মুছে নিল। তারপর রাফসার কাছে এসে ওর হাত ধরে টেনে তুলে বলল। ” নাস্তা করিসনি। চল, নিচে গিয়ে কিছু খেয়ে একটু রেস্ট নিলে ঠিক হয়ে যাবে।”
রাফসা যেতে না চাইলেও মাইশখ জোর করে নিয়ে যায়।
নিচে কাউকে ড্রইং রুমে না দেখে সোজা ডাইনিং এ যায়। উদ্যানকে এখনো চোখে পড়েনি মাইশার। রাফসাকে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে নিজে ও ওর পাশে বসতেই সামনে চোখ পড়ে। ওর আর বসা হলো না। সেভাবেই গোল গোল চোখে তাকিয়ে রইল। উদ্যানকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠেছে। উদ্যান মাইশার পানে একপলক তাকিয়ে বলল। ” বোস, আমি কোনো ভূত নয় যে এমন করে চমকাবি। “
উদ্যানের কথার সাথে সাথেই মাইশা বসে পড়ে। ” ভাইয়া! আপনি এখানে কি করছেন?”
উদ্যান কিছু বলার আগেই জায়িন দুম করে বলে উঠলো। ” এখানে না থাকলে কি, তোর শ্বশুরবাড়ি থাকবে পেত্নী? তোরা সবাই এমন চমকা চমকি করছিস কেন বোইন? তোদের এমন চমকা চমকি দেখে আমি চমকিত হয়ে যাচ্ছি।”
জায়িনের কথায় মাইশা চোখ রাঙানি দিল। জায়িন তা থোরাই কেয়ার করল না।
” বেকুবের দল, কথা না বলে তাড়াতাড়ি খা। উদ্যান বস্তা ডুবিয়ে মাল এনেছে। আমার তো আর সহ্য হচ্ছে না।”
রিশান খেতে খেতে বলল। ” তোমার জন্য মনে হয় স্বর্ণ এনেছে। খুশি হয়ে লাভ নেই। ভাইয়া স্বর্ণ আনেনি। কারণ, স্বর্ণের দাম প্রায় আড়াই লাখ টাকা ছুঁই ছুঁই।”
রিশানের কথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো রোহানের মাথায়। চোখজোড়া কপালে উঠে গেছে। জোরে চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো। ” হিছা মার বিয়ার কোয়ালে। হিছা মারি স্বর্ণে কোয়ালে।”
রোহানের হঠাৎ চিৎকারে ভরকে যায় সকলে। রাফসা সবে পানি মুখে নিচ্ছিলো, এমন চিৎকারে হাত কেঁপে উঠলো। যার ফলে কিছু পানি ওর শরীরের উপর পড়লো। অবাক হয়ে ওর পানেই তাকিয়ে রইল। পরক্ষণেই কথার মানে বুঝতে পেরে জোরে হাসতে শুরু করলো। শুধু রাফসা না, ওর সাথে সবাই হাসছে। রাফসা অবস্থা খারাপ। হাসতে হাসতে চোখ বন্ধ করে ফেলেছে। বেচারি যেন এক্ষুনি চেয়ার থেকে পড়ে যাবে।
“ভা,, ভাই,, ভাইয়া এ,এটা
রাফসা নিজের কথা শেষ করতে পারেনা হাসির জন্য। রোহান চোখ গরম করে সবার দিকে তাকিয়ে আছে।
” কিছু কইতাম না, খালি তোগো কাহিনী ডা দেখমু।”
এ কথায় যেন হাসিটা আরো বেড়েছে। রোহান এইবার কাঁদো কাঁদো মুখ নিয়ে তাকিয়ে আছে ওর হাসতে থাকা পাগল ভাই বোনদের দিকে। ওর বিয়ের আগে যেমন করে স্বর্ণের দাম বাড়ছে তড়তড় করে, বিয়েটাই বোধহয় আর করা হবে না। উদ্যান নিজের খাওয়া রেখে রাফসার পানে তাকিয়ে আছে। চোখে মুগ্ধতা নাকি রাগ, বোঝা যাচ্ছে না। হাসতে হাসতেই হঠাৎ উদ্যানের চোখে চোখ পড়ল রাফসার। হাসি থামিয়ে দিল সঙ্গে সঙ্গেই। উদ্যান নিজেও চোখ নামিয়ে নিল।
নাস্তা করে সবাই ড্রইং রুমে বসেছে। উদ্যানের আনা সামানগুলো খুলেছে। রাফসা থাকতে চায়নি অবশ্য। ঊষা জোর করে রেখেছে। সবাইকে গিফট বুঝিয়ে দিয়ে একটা ছোট্ট বক্স নিয়ে রাফসার সামনে দাঁড়ায় উদ্যান। ওকে সামনে দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকালো রাফসা। উদ্যান হাতের বক্সটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে ঠান্ডা স্বরে বলল। ” এটা তোর জন্য। দেখ, পছন্দ হয় কিনা?”
রাফসা বক্সটা নিল না। ঠাঁই চেয়ে রইল। উদ্যান ওর পানে তাকিয়ে জিভ দিয়ে গাল ঠেললো। মৃদুস্বরে বলে উঠলো। ” আমি কোথাও চলে যাচ্ছি না আর। মনযোগ দিয়ে পরে দেখিস। এখন,এটা ধর।”
রাফসা চোখ সরিয়ে নিল। তবুও বক্সটা নিল না। সবাই ওদের পানেই তাকিয়ে আছে। উদ্যান আস্তে কথা বলেছে, তাই কেউ শুনতে পায়নি। মেয়েকে বক্সটা নিতে না দেখে হুমাইরা ফরাজী ধমকে বললেন। ” কি হলো? ছেলেটা আর কতক্ষন দাঁড়িয়ে থাকবে? “
মায়ের কথায় হাত বাড়িয়ে বক্সটা নিল রাফসা। ওমনি ঊষা রাফসার কাছে এসে বক্সটা নিয়ে খুলল।
চকচকে সাদা সোনার তৈরি একটি ডায়মন্ডের পেনডেন্ট। নরম আলো পড়তেই অসংখ্য কোণা থেকে হীরার ঝিলিক ছড়িয়ে পড়ে, যেন ক্ষুদ্র নক্ষত্রগুলো একসাথে জ্বলে উঠেছে। পেনডেন্টটির মাঝখানে নিখুঁতভাবে খোদাই করা একটি “R” অক্ষর। অক্ষরটির প্রতিটি বাঁক ঘিরে বসানো ছোট ছোট উজ্জ্বল ডায়মন্ড, যা অক্ষরটিকে আরও গভীর ও রাজকীয় করে তুলেছে।
“R” লেখাটির গঠন এতটাই সূক্ষ্ম যে দূর থেকেও চোখে পড়ে, আবার কাছে এলে তার কারুকাজ মন কেড়ে নেয়। ডায়মন্ডগুলোর আলো একে অপরের সঙ্গে মিশে এক ধরনের কোমল দীপ্তি তৈরি করে—না খুব তীব্র, না খুব ম্লান; ঠিক ভালোবাসার মতোই শান্ত অথচ স্থায়ী।
পাতলা রূপালি চেইনের সঙ্গে ঝুলে থাকা এই পেনডেন্টটি শুধু একটি অলংকার নয়, যেন কারও নামের প্রথম অক্ষর ধরে রাখা এক নিঃশব্দ প্রতিশ্রুতি—ভালোবাসা, স্মৃতি আর আবেগের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
ঊষা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। ওকে ইয়ার রিং দিয়েছে একজোড়া। ঠিক এমনই সুন্দর। রাফসা নিজেও তাকিয়ে আছে। ঊষা পেনডেন্টটা হাতে তুলে নিল। কোনো কথা ছাড়াই রাফসার পেছনে দাঁড়িয়ে ওকে পড়িয়ে দিতে শুরু করে। রাফসা মৃদু চেঁচিয়ে বলল। ” আপু, আমি পড়বো না এটা। তোমার কাছে রেখে দাও। “
হুমাইরা ফরাজী মেয়ের সামনে এসে দাঁড়ায়। ততক্ষনে ঊষা পড়িয়ে দিয়েছে। গলার সাথে লেগে বসে আছে পেনডেন্টটা। ওনি তাতে একটু হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল। ” মাশাআল্লাহ, আমার উদ্যান বাবার পছন্দ আছে বলতে হয়। কি সুন্দর লাগছে।”
রোহান হেসে পেছন থেকে বলল। ” চাচি, শুধু পেনডেন্ট না। উদ্যানের পছন্দ করা সবকিছুই সেরা। “
রোহানের কথায় উদ্যান মাথা নিচু করে ঠোঁট কামড়ে হাসে। হুমাইরা ফরাজী মেয়েকে চোখ রাঙানি দিয়ে বলল। ” খবরদার, একদম গলা থেকে এটা খুলবি না। মেয়েরা কত কিছু পড়ে থাকে গলায়। আর এই মহারানী কিছু পড়তে চায় না। আমি যেন গলা খালি না দেখি। “
তারপর পেছন ফিরে জা’দের বলল রান্নাঘরে যেতে। দুপুরের জন্য রান্না বান্না করতে হবে। ওনারা আর বসে থাকেনি। দুপুরের জন্যে জোগাড় করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
রাফসা চলে যেতে নিলে রিশান থামিয়ে দিল। ওকে বসতে বলে রুমে চলে যায়। দুই মিনিটের মধ্যে ফিরে আসে। হাতে অনেক বড় ব্যাগ। এগুলো এনে রাফসার সামনে রেখে ইশারা করে খুলতে। রাফসা কিছু সময় লাগিয়ে এতো বড় প্যাকেটটা খুলে। পরক্ষনেই ভেতরে কালো রঙের মেলা বসে যায়। একটা কাপড় হাতে নিয়ে খুলে। বোরকা, কালো বোরকা। একে একে সব গুলো বের করে। ওদের চোখ যেন কপালে। গুনে মোট আঠেরোটা বোরকা, আঠেরোটা হিজাব পেয়েছে। একেকটা ভিন্ন ভিন্ন ডিজাইনের। সবগুলোই কালো। রাফসা অবাক হয়ে বলল। ” এতো গুলো বোরকা কেন?”
” তোর বর্তমানে আঠেরো বছর চলছে। তাই আঠেরোটা বোরকা তোকে গিফট দিলাম। আর হ্যাঁ, আরেকটা গিফট আছে তোর জন্য। “
পাশ থেকে মাঝারি সাইজের একটা কাঠের বাক্স তুলে। ঢাকনা খুলতেই
বিদেশী সাদা বিড়াল। প্রথমেই চোখে পড়ে তার ঝকঝকে তুষারসাদা লোম—মখমলের মতো নরম, । চোখ দুটো গভীর নীল বা কখনো সবুজ। দৃষ্টিতে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে। কান দুটো খাড়া ও পরিপাটি, ছোট্ট গোলাপি নাকের সঙ্গে মানিয়ে তাকে আরও অভিজাত করে তোলে। হাঁটার ভঙ্গি রাজকীয়—নীরবে পা ফেলে, লেজটি আলতো করে দুলে ওঠে।
রাফসা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। ওরাও অবাক হয়েছে। বিড়ালটা রাফসার কাছে দিয়ে বলল। ” এটা ও তোর জন্য। “
রাফসা বিড়ালটাকে হাতে নিয়ে চুমু খায় হালকা। বিড়াল ওর খুব পছন্দের। কিন্তু মা কখনো পালতে দেয়নি। রাফসা নিজের খেয়ালই রাখতে পারতো না। বিড়ালের খেয়াল কি করে রাখবে। তাই কখনো বিড়াল এনে দেয়নি। রাফসা খুশি হয়ে বলল। ” ভাইয়া, এই বিড়াল কোথায় পেলে?”
” হালিশহর থেকে কিনে এনেছি। পছন্দ হয়েছে তোর?”
রাফসা মাথা নাড়ালো। রিশান হাসে। সোফায় বসতে বসতে উদ্যানের পানে তাকালো। এই বান্দার এখানে মন নেই। ফোন নিয়ে ব্যস্ত।
আভিয়ান গোসল সেরে বের হয়।
গোসলখানার দরজা খুলতেই ভেজা চুল থেকে টুপটাপ করে পানি ঝরে পড়ছে। গায়ে লেগে থাকা উষ্ণ পানির ভাব এখনো কাটেনি। সাদা তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে আয়নার সামনে দাঁড়ায় সে। আয়নায় নিজের দিকে একবার তাকিয়ে হালকা নিঃশ্বাস ফেলে—মনে হয় যেন ভোরের ক্লান্তিটুকু পানির সাথে ধুয়ে গেছে। শরীরে হালকা একটা সতেজতা, মনটা অদ্ভুত শান্ত।
হালকা রঙের শার্ট আর আরামদায়ক প্যান্ট পরে নেয় আভিয়ান। চুলে একটু পানি থেকেই গেছে, সেটুকু এলোমেলোভাবেই ভালো লাগছে। ঘড়িটা হাতে পরেই ডাইনিংয়ের দিকে পা বাড়ায়।
টেবিলে সাজানো ব্রেকফাস্ট—গরম রুটি, ডিম, ফল আর এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা। চেয়ারে বসতেই চায়ের কাপে ঠোঁট ছোঁয়ায়। প্রথম চুমুকেই শরীরটা যেন জেগে ওঠে পুরোপুরি।
ধীরে ধীরে খাবার খেতে থাকে আভিয়ান। তাড়াহুড়ো নেই, মনে কোথাও একটা প্রশান্তির আবেশ। নতুন দিনের শুরুটা ঠিক এমনই হোক—শান্ত, পরিপাটি আর নিজের মতো।
আভিয়ানের খাওয়ার মাঝেই একটা ছেলে এসে বলল। ” ভাই, শাইলা এসেছে। আপনার সাথে দেখা করতে চাইছে। আমি অনেক বার বলেছি, চলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ওনি এখানেই দাঁড়িয়ে আছে।”
আভিয়ান খাওয়া বন্ধ করে বলল। ” বাড়ির চৌকাঠ যেন মাড়াতে না পারে। বিদায় করার ব্যবস্থা কর। আর বলে দিবি, এখানে দ্বিতীয় বার এলে প্রাণ নিয়ে বেঁচে যেতে পারবে না। “
ছেলেটা আদেশ পেয়ে চলে যায়। আভিয়ান পুনরায় খাওয়ায় মন দেয়।
রাফসা ছাদে দাঁড়িয়ে আছে। সন্ধ্যায় জিনিয়া পড়িয়ে গেছে। তারপর খাওয়া দাওয়া করে আড্ডা দিয়েছে অনেক সময়। মনটা ফ্রেশ করতে রাতের অন্ধকারে ছাদে এসেছে। চাঁদের আলোয় ঝলমল করছে ছাদটা। রাফসা রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে চাঁদের পানে তাকিয়ে রইল।
Love you o my darling
love do something something
Love you o my darling
love do something something
Sabana mindu banda
Tu me sakc chanda
Love you o my darling
Love do something something
Love you o my darling
Love do something something
গানের সুর শুনে পেছনে ফিরে রাফসা। উদ্যান দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওর পানে তাকিয়ে।রাফসা উদ্যানকে এতো রাতে ছাদে দেখে ভ্রু কুঁচকালো। পা চালিয়ে ছাদ থেকে নেমে যেতে নিলেই উদ্যান হাত ধরে আটকায়। রাফসা দাঁড়িয়ে যায়। চোখ বন্ধ করে ফেলল। উদ্যান কিছুটা ঝুঁকে রাফসার মুখে ঠোঁট গোল করে ফুঁ দেয়। কপালে ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো সরে যায়। রাফসা চট করে চোখ খুলে ফেললো। উদ্যানকে চোখ রাঙিয়ে বলে। ” আপনার সাহস তো কম নয়। কোন অধিকারে আমার হাত ধরেছেন? ছাড়ুন বলছি।”
উদ্যান সোজা হয়ে দাড়ালো। সামান্য ঘাড় বাঁকা করে তাকায় ওর দিকে। ঠোঁট কামড়ে ভ্রু নাচিয়ে বলল। ” অধিকার! সেটা বোধহয় আমার একটু বেশিই। সবকিছুতেই আমি অধিকার ফলাতে পারি। “
” ভাইয়া, আপনাকে দেখে আমার ডিজগাস্টিং ফিল হচ্ছে। হাত ছাড়ুন। “
উদ্যান এক ভ্রু নাচিয়ে বলল। ” উদ্যান ভাই থেকে ভাইয়া, তুমি থেকে আপনি? এতো নিচে চলে এলো! ভেরি বেড। “
রাফসা বিরক্ত হয় বেশ। চোখ মুখ কুঁচকে বলল। ” তো কি ডাকবো? সরেন তো ভাই। আপনার সাথে কথা বলতে আমার রুচিতে বাধে। হাত ছাড়ুন।”
রাফসার কথায় হাত কিছুটা শিথিল হয়ে গেল উদ্যানের। চোখে গাম্ভীর্যতা এসে ভিড় করে। ভ্রু যুগোল শিথিল হয়ে গেল। সেই সুযোগে রাফসা হাত ছাড়িয়ে নিল। ” আমার সামনে হুটহাট করে পড়বেন না। সহ্য হয় আমার। “
তারপর ধুপধাপ পা ফেলে ছাদ ত্যাগ করে রাফসা। উদ্যান ধীরে ধীরে রেলিং এর সামনে এসে দাঁড়ায়। দূর আকাশের জ্বলতে থাকা চাঁদের দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিলে উদ্যান।
চলবে…?
ক্ষমা ভাই। আমার জায়গায় অন্য কেউ হলে একমাস গল্প দিতে না। আমার সমস্যা ও আপনাদের বুঝতে হবে। অনেকদিন পর লিখেছি। কেমন হয়েছে জানাবেন। আপনাদের সুন্দর সুন্দর মন্তব্য দেখলে মনটা ভালো হয়ে যাবে।
Share On:
TAGS: প্রেয়সীর অনুরাগ, সাদিয়া জাহান সিমি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেয়সীর অনুরাগ গল্পের লিংক
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৬
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৪
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৮
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৯
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৩
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১০
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৭(প্রথমাংশ + দ্বিতীয়াংশ)