কাজরী-১২
সাবিকুননাহারনিপা
দীর্ঘ ষোলো ঘন্টা জার্নির পর জেনেভা এয়ারপোর্টে এসে পৌছালো কাজরী ও ইশান। কাজরী ভেবেছিল প্লেন জার্নির পুরোটা সময় ইশান ও’কে বিরক্ত করবে। কিন্তু সেসব হলো না। বরং চৌধুরী প্যালেস থেকে বেরিয়ে ইশান যেন খোলস বদলে অন্য মানুষ হয়ে গেছে। কাজরীর সঙ্গে নরম গলায় কথা বলছে, খাওয়ার দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছে। কাজরী একটু অবাক হলেও সেটা প্রকাশ করলো না৷ এমন ভাবে ব্যাপার টা নিলো যে এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার৷
এয়ারপোর্টে ওদের জন্য গাড়ি অপেক্ষা করছিল। গাড়ি করে কোনো হোটেল কিংবা রিসোর্টে এলো না। একটা ভিলায় এসে পৌছালো। কাজরী স্টাফ ও ভিলার সাজসজ্জা দেখে বুঝলো এটা ওদের নিজেদের। ইশান ভিলায় ঢুকেই একটা ঘরে ঢুকে গেল এবং যাবার আগে কাজরীকে বলে গেল,
“নিজের পছন্দমতো একটা ঘরে থাকতে পারো। হানিমুন বলে কথা! এনজয় ইওর ফ্রিডম। “
কাজরীও কাঠ কাঠ গলায় জবাব দিলো,
“থ্যাংক ইউ। “
ফ্রেশ হয়ে কাজরী বিছানায় শুয়ে ইশানের আচরণ নিয়ে ভাবতে লাগলো। একটু বেশী অন্যরকম আচরণ করছে ইশান। ওর মাথায় কোনো প্ল্যান চলছে না তো।
কাজরী ফোন চেক করলো। দুজন মানুষ ওর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে। একজন ওর বাবা অন্যজন হলো হুমাইরা। হুমাইরাকে ও আল্পনার আপডেট দিতে বলেছে। এই মুহুর্তে বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেয়ে হুমাইরার সঙ্গে যোগাযোগ করা বেশী দরকার।
হুমাইরাকে প্রথম বার কল করেই পেল।
“হ্যালো ম্যাম। “
“বলো। আজও আল্পনা বেরিয়েছিল?”
“এখনো আসে নি। সকালে গেছে, এখন পর্যন্ত কোনো খবর নেই। কল দিলেও কেটে দিচ্ছে বারবার। “
“বাবা কোথায়? “
“উনি তো দুদিন থাকবে না। আল্পনা আপু উনি বের হবার পর ই বেরিয়েছে। “
কাজরীর টেনশন হলো। আল্পনার আচরণ সন্দেহজনক। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় আল্পনার মতো ভীতু একটি মেয়ে এভাবে রহস্যজনক গল্পের জন্ম দিচ্ছে।
“আমি কী বিষয়টা স্যার কে জানাব?”
কাজরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“না। তুমি খেয়াল রাখো, রাত বেশী হলেও ফিরে আসার কথা। সকালে আমাকে আপডেট দিও। “
হুমাইরার সঙ্গে কথা শেষ করার পর কাজরীর অস্থিরতা কমার বদলে বাড়তে লাগলো। সেই যে বউভাতের রাতে কয়েক ঘন্টার জন্য আল্পনা গায়েব হয়েছিল। বিষয় টা নিয়ে সেভাবে আর কেউ কথা বাড়ালো না। কাজরীও বিষয় টা নিয়ে কাউকে প্রেশার দিলো না, কারণ ইশানের কথার পর ওর মনে হলো আল্পনা পুরোপুরি মিথ্যে গল্প বলছে। তাছাড়া সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো আল্পনার কথার ধরনে পরিবর্তন এসেছে। আগে শান্ত স্বরে ওর সঙ্গে কথা বলতো, এখন কথার ধরনে সূক্ষ্ম খোঁচা টের পাওয়া যায়। কাজরীকে তো একদিন স্পষ্ট গলায় বলেই দিলো,
“এতো ভালো ঘর, সুদর্শন বর সবকিছু পেয়ে তো তোমার খুশি থাকার কথা কাজরী। তবে এবারও আমার জন্য সবকিছু পেয়েছ তুমি! “
কাজরী জবাব দেবার বদলে বিস্মিত হয়েছিল। আল্পনা কী জানে কাজরী কখনো এমন ধরনের স্বপ্ন দেখে নি, নিজেকে সবসময় বড় জায়গায় দেখতে চেয়েছে ঠিকই কিন্তু কারোর স্ত্রী কিংবা পুত্রবধূর পরিচয়ে নয়। বাবা ও’কে সব ধরনের সুযোগ সুবিধা দিয়েছিলেন বটে তবে ওর নিজের জন্য নয়। একদিন ও’কে চৌধুরী প্যালেসে পা রাখতে হবে সেটার জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। এমনকি এবার দেশে আসবার আগে কাজরী ঠিক বুঝতে পেরেছিল যে জীবনের যাত্রাপথ বদল হতে যাচ্ছে।
আল্পনা মরিয়ম খালার ঠিকানা যোগাড় করেছে পুরোনো কাগজপত্র থেকে। তার ছেলে ও’কে সাহায্য করে নি, বোধহয় বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হয়েছে যে তার পক্ষ থেকে কেউ যোগাযোগ করে নি। আল্পনা বাসার গাড়ি থেকে মগবাজার নেমে সেখান থেকে কল্যানপুর গিয়ে চট্টগ্রাম এর বাস ধরেছে। সচরাচর বাসে জার্নি করার অভ্যাস নেই বলে একটু অস্বস্তি হলো বটে। তবুও গন্তব্যে যেতে চায়। একমাত্র মরিয়ম খালা ই ওর সব প্রশ্নের জবাব দিতে পারবেন।
আল্পনা চট্টগ্রাম পৌছালো সন্ধ্যেনাগাদ। নাসিরাবাদ যেতে যেতে সন্ধ্যের আলো প্রায় মিলিয়ে গেল। মরিয়ম খালার ছেলের নাম মিরাজ। মিরাজ আল্পনাকে দেখে ভারী অবাক হলো! জিজ্ঞেস করলো,
“আপনি একা আসছেন আপা?”
আল্পনা গলার স্বরে রুক্ষতা বজায় রেখে বলল,
“আপনার মা কোথায়? “
“নামাজ পড়তেছে। বসেন আপনি। “
আল্পনা বসলো। ফোন টা অফ করে নি, হুমাইরা ছাড়া এখনো পর্যন্ত আর কেউ ও’কে কল করে নি। প্রচন্ড ভয় পাচ্ছে, যদি বাবা ও’কে কল করেন! তিনি সুবর্ন নগরে থাকবেন দুদিন। এই সুযোগটাকে ও কাজে লাগিয়েছিল। ড্রাইভার কে বলা আছে যেন কিছু না জানায় বাবাকে। কিন্তু হুমাইরা মেয়েটাকে নিয়ে ভয়। যদি চালাকি করে ড্রাইভার কে জিজ্ঞেস করে কিছু।
আল্পনাকে ঠান্ডা পানি দেয়া হলো। নভেম্বরের শেষে হালকা শীতেও গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। ঢকঢক করে পুরো গ্লাসের পানি খেয়ে নিলো। মরিয়ম খালা এসেছেন ঘরে। বয়সের ভারে কুজো হয়ে গেছেন। শরীরে বার্ধক্যও এসেছে। তিনি আল্পনাকে দেখে চিনতে পারলেন। আল্পনা এগিয়ে গিয়ে বলল,
“খালা আমি আল্পনা। “
খালা ওর গালে, মুখে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে কেঁদে ফেললেন। আল্পনা জড়িয়ে ধরলো বৃদ্ধাকে।
দর্শনাকে এখন নিশানের ম্যানেজারের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এরপর আর কতো দায়িত্ব ওর উপর বর্তাবে কে জানে! ভেবেছিল বড়লোকি চাকরিতে হয়তো মাথা কম খাটাতে হবে, কিন্তু প্রচুর টাকা পয়সা উপার্জন করে শান্তির লাইফ কাটাবে। কিন্তু এখানে এসে মনে হচ্ছে এসব কিছুই হবে না। উল্টো মাথার সিল্কি, শাইনি চুলগুলো নষ্ট হবে টেনশনে।
“হ্যালো স্যার, আমি দর্শনা। “
নিশানের কপাল কুঁচকে গেল। মেয়েটিকে প্যালেসে দেখেছে এর আগে। স্বাভাবিক গলায় বলল,
“হ্যালো দর্শনা। ভেতরে আসো। “
দর্শনা ভেতরে এলো। এদের বেডরুম গুলো একেকটা ফ্ল্যাটের মতো। প্রথমে ড্রইং স্পেস, সেখানে বসার গদির পাশাপাশি ছোট ডাইনিং টেবিল আছে। এরপর রিডিং স্পেস। এবং সবশেষে বেড এড়িয়া। কী বিশাল জায়গা জুড়ে বাড়ি বানিয়ে আরাম, আয়েশ করে থাকছে। দর্শনা ঘরে ঢুকে এদিক, ওদিক তাকিয়ে এসব ভাবছিল। নিশান কৌতূহল বোধ করলো, এই মেয়েটি তার কাছে কী চায়!
“তুমি কী ব্যাপারে কথা বলতে এসেছ?”
দর্শনা একটু হাসলো। নরম গদিতে বসতে বসতে বলল,
“সব ব্যাপারে। “
নিশান মেয়েটিকে আপদামস্তক দেখলো। অফ হোয়াইট শার্ট জিন্সের সাথে ইন করে পরা। কানে বৃত্তের মতো রুপোলী কালারের দুল। ডাই করা চুলগুলো ক্লিপ দিয়ে বাঁধা। দর্শনা মৃদু হেসে বলল,
“স্যার আমাকে আপনার ম্যানেজার হিসেবে এপোয়েন্ট করা হয়েছে। তাই আপনার সমস্ত ব্যাপারে ইন্টেরেস্ট আছে। “
নিশান বিস্মিত গলায় বলল,
“আমার ম্যানেজার? তুমি? “
দর্শনা নড়েচড়ে বসলো। এমন ভাবে তুমি শব্দটা উচ্চারণ করলো যেন ওর ম্যানেজার হবার যোগ্যতা নেই।
অপমানে নিশানের কান গরম হয়ে উঠলো। খানিকটা রুক্ষ স্বরে দর্শনাকে বলল,
“তুমি এখন আসো, আমি পরে কথা বলব। “
দর্শনা বেরিয়ে এলো। ওর অবশ্য মন খারাপ হলো না। কাজরীর ম্যানেজার হওয়ার বিষয়ে কিছুটা নির্ভার হয়েছিল কারণ কাজ কী হবে সেটা সম্পর্কে আইডিয়া হয়ে গেছিলো। পার্লার, জিম, মেকওভার, পার্টি এসবের বাইরে অন্য কোনো কাজ কাজরীর থাকার কথা না। কিন্তু নিশান চৌধুরীর ম্যানেজার মানে তো প্রচুর খাটুনি!
দর্শনা সময় দেখলো। ওয়ার্কিং আওয়ার শেষ। আপাতত কিছু না ভাবলেও হবে, কাল সকাল থেকে আবার ভাবতে বসলেই হয়ে যাবে।
“খালা আপনি কতো আগে থেকে আমার মা, বাবাকে চিনতেন?”
মরিয়ম খালা জবাব দিতে সময় নিচ্ছেন। আল্পনা আবারও প্রশ্ন করলো,
“আপনি কী তাকে সবসময় একইরকম দেখেছেন?”
“হ মা। এই সুস্থ থাকতো, আবার অসুস্থ হয়ে যাইতো। “
“মা অসুস্থ হবার আগে কী কোনো ঘটনা ঘটেছিল? কোনো এক্সিডেন্ট? “
“আমি তোমার জন্মের পর থেকে ছিলাম গো মা। তহন থিকা তার অসুখ ছিলো। “
“কাজরীর জন্মের সময়ও আপনি ছিলেন? “
মরিয়ম খালা শুকনো ঢোক গিললেন। প্রশ্নটা শুনে তাকেও কেমন বিব্রত মনে হচ্ছিলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
“কাজরী কই এখন?”
আল্পনা মরিয়ম খালার এড়িয়ে যাওয়া বুঝতে পেরে বলল,
“খালা একটা সত্যি কথা বলবেন। মা বলতেন কাজরী তার মেয়ে না, এটা কী সত্যি? “
মরিয়ম খালা আহাজারির মতো করে উঠে বললেন,
“আমি জানিনা। তোমার বাপে জানে তুমি এখানে আসছ! মা গো তুমি সকাল হলেই চলে যাইয়ো। আমি কিছু বলতে পারব না। “
আল্পনা নাকি অনেক কিছু বুঝতে পারে না। কাজরী প্রায় ই তাচ্ছিল্যের সুরে বলতো, আল্পনা তুমি এতো বোকা কেন! সত্যিই কী তাই। কাজরীর বিয়ের দিনে বাবার দেয়া সেই গয়নার বাক্সটার কথা মনে পরে। এটা কাজরীর জন্য ওর মায়ের রেখে যাওয়া। আল্পনা তো মায়ের কাছে বেশী ছিলো, তখন তো মনে হয় নি যে কাজরীর জন্য মা আলাদা করে গয়না রাখতে পারে। সেই ঘটনায় আল্পনার সন্দেহ প্রায় সত্যি হলেও এই বিষয় নিয়ে আর ভাবতে চায় নি। কিন্তু কাজরীর বলা গল্পটায় একটা খটকা আছে। ওই গল্পের মহিলা চরিত্র টি কী আল্পনার মা ছিলেন নাকি কাজরীর মা। কে ছিলেন আসলে…!
কাজরী চোখ খুলতে পারছে না। ঘুম কেটে গেলেও প্রচন্ড ব্যথা অনুভব করছে। হাতে এতো ব্যথা কেন লাগছে! একি ওর হাত বাঁধা কেন! পা’ও বাঁধা যে। কাজরী উঠে বসার চেষ্টা করলো। বিছানার পাশে কিছু যন্ত্রপাতি রাখা। কাজরী তাকিয়ে রইলো সেদিকে। অত্যন্ত শান্ত ও নির্লিপ্ত গলায় একজন জানালো, ওগুলো ইলেক্ট্রিক শক দেবার জন্য।
চলবে…..
(#আকাশপ্রিয়ার প্রুফ নিয়ে প্রচন্ড ব্যস্ত হবার কারণে এটা দিতে দেরি হলো। আর আপনাদের রেসপন্স কম বলে আমিও আগ্রহ হারিয়ে ফেলি মাঝেমাঝে। #আকাশপ্রিয়ার প্রি অর্ডার শুরু হবে দুই একদিনে। গেট রেডি রিডার্স।)
Share On:
TAGS: কাজরী, সাবিকুন নাহার নিপা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাজরী পর্ব ৮+৯
-
কাজরী পর্ব ১০
-
কাজরী পর্ব ১৪
-
কাজরী পর্ব ১৩
-
কাজরী পর্ব ৫
-
কাজরী পর্ব ৪
-
কাজরী পর্ব ২
-
কাজরী পর্ব ৬
-
কাজরী গল্পের লিংক
-
কাজরী পর্ব ১