কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ ⚠️
খাঁচায় বন্দী ফুল
জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব – ১৮
মানিক দেখলো নদীর পাড়ে কেউ পরে আছে। তুযা মানিকের দিকে দু হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল
“ আমারে টেনে তুল। পিঠের হার ডা মনে হয় অবশ হইয়া গেছে”
মানিক হারিকেন হাতে নিয়ে চোখ বড় বড় করে নদীর পাড়ে তাকিয়ে বলল
“ভাইইইইইইইই। ওইডা কি?”
তুযা পিছন দিকে ঘুরলো ওমনি
“কোনটা?”
তুযা দেখলো নদীর পারে কেউ পরে আছে। ওদিকে ভালো করে দেখে বলল
“কোনো বাচ্চা হইবো হয়তো। হারিকেন ডা নিয়া চল তো। তার আগে আমারে টেনে তুল হাদা কোথাকার”
মানিক তুযাকে টেনে তুলল। পিঠের অংশ পুরো ভিজে চুপচুপে। কোমড় সোজা করে এগিয়ে গেলো সেদিকে। আসলেই একটা বাচ্চা। ৭-৮ বছরের একটা মেয়ে। পরনে একটা ফ্রক আর প্যান্ট। মানিক আহাজারি করে বলল
“আহারে এতটুক মাইয়া ডারে, কোন হা’রামি তে এমনে ফালাই রাইখা গেছে রে। মানুষের ইমান-আমান সব ধুইয়া খাইছে মনে হয়”
তুযা নাকের কাছে হাত দিয়ে বলল
“নিশ্বাস আছে।”
মানিক ব্যাস্ত হয়ে বলল
“তারাতাড়ি ডাক্তারের কাছে নেওন লাগবো। গরম কাপড় ও দেওয়া লাগবো। আপনে হারিকেন ধরেন ভাই। আমি কোলে নিতাছি”
তুযা নিজেই কোলে তুলল মেয়েটাকে
“ও ভিজে আছে। তুই তো শুকনা। ভিজা যাবি পড়ে। আমিই নিতেছি।”
মানিক আর তুযা হাটা শুরু করলো মেয়েটাকে নিয়ে। কিছুদূর গিয়ে মানিক বলল
“ভাই আমার বাড়ি তো কাছে। চলেন আমার বাড়িই যাই।”
তুযা অমত করলো না। মানিকের বাড়িতেই নিলো মেয়েটাকে। ঘরে তুলে মানিক মাকে বলল
“ ও মা, ছোট সাহেব আইছে বাইর হও”
মানিকের মা তুযা কে দেখে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো।
“ আরে ছোটসাহেব আপনে আইছেন এই গরিবের ঘরে? কই যে বইতে দেই”
তুযা তাড়া দিয়ে বলল
“ আমারে বসতে দেওন লাগবো না চাচি। এই মেয়েটারে কাপড় বদলাইয়া মেঘলার কোনো একটা জামা পড়াই দেন।”
মানিকের মা অবাক হয়ে দেখলো বাচ্চা টাকে
“ ও মানিক। কিডা এইডা?”
মানিক হারিকেন ডা বারান্দার খুটির সাথে ঝুলিয়ে বলল
“ অহন অত কথা কওয়ার সময় না মা। মাইয়া ডারে বাচাইতে হইবো। চালু করো। মেঘলার জামা পরাই দেও। ভাই আমনে বসেন আমি ডাক্তার নিয়া আইতাছি”
“ যা চালু আসবি”
মানিক দৌড়ে চলে গেলো ডাক্তার এর বাড়ি। মানিকের মা মেয়েটার কাপড় পাল্টে শুইয়ে দিয়েছে বিছানায়। গায়ের উপর কতগুলো কাঁথা কম্বল দিয়ে ঢেকেও মেয়েটার কাপুনি থামানো যাচ্ছে না। মানিকের মা মানিকের ছোট বোন মেঘলা কে বলল
“ যা তো সরষের তেলের শিশিটা নিয়ে আয়, মাইয়াটার হাতে পায়ে একটু মালিশ কইরা দিয়া দেখি গরম হয় নাকি”
মেঘলা সরষের তেলের বোতল এনে মানিকের মায়ের হাতে দিল। মেয়েটার হাত-পা বরফের মত ঠান্ডা। মানিকের মা সরষের তেল নিজের হাতে ঘষে মেয়েটার হাতে পায়ে ঘষে দিল। থর থর করে কাঁপছে মেয়েটা যেন খিঁচুনি উঠে গেছে ঠান্ডায়। প্রায় কুড়ি মিনিট পর মানিক ডাক্তার নিয়ে এলো। ডাক্তার এসে চেক করে মেয়েটাকে দুটো ইনজেকশন দিয়ে দিল তাপমাত্রা বাড়ার। কিছু ওষুধ লিখে দিয়ে চলে গেল। একটু পরে ফজরের আযান পড়বে। তুযাকে বাড়ি থেকে সমানে কল দিয়ে যাচ্ছে। তুযা কল রিসিভ করে জানায় সে মানিকের বাড়িতে আছে যেতে সকাল হবে। প্রায় ভোরের দিকে মেয়েটার জ্ঞান ফিরলো।
মানিকের মা মেয়েটাকে টুকটাক এটা ওটা জিজ্ঞেস করছে মেয়েটা উত্তর ও দিচ্ছে। মানিক তুযার কানে কানে বলল
“ভাই মাইয়াটা একবারও বাড়ি যাইতে চাইতেছে না। মায়ের কথাও কইতাছে না। বিষয়টা কেমন জানি না।”
“আমিও তো তাই ভাবতেছি”
তুযা ঘরে গিয়ে মেয়েটার পাশে চৌকির উপর বসলো।
“নাম কি তোমার?”
মেয়ে টা কাচুমাচু হয়ে জবাব দিল
“কবিতা”
“ তোমার বাড়ি কই? বাপ মায়ের নাম কি? আর নদীর পাড়েই বা আসলে কেমনে?”
মেয়েটা তুযার দিকে তাকিয়ে দেখলো একবার। তারপর কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল
“আমগো বাড়ি হরিপুর। আমার বাপ নাই, মাও নাই। নানার বাড়িতে থাকতাম। গত মাসে নানা মা’রা গেছে। তাই মামারা আইনা ফালাই দিয়া গেছে এখানে”
মেয়েটা কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতে বলল
“ আমার যাওনের কোনো জায়গা নাই”
তুযার বড্ড মায়া হলো মেয়েটার ওপর। মেয়েটার মাথায় হাত দিয়ে বলল
“আজ থেকে তুই আমগো বাড়িতে থাকবি। মানে জমিদার বাড়িতে। চল”
মেয়েটার কান্না এবার থামলো। বাইরে ভোরের আলো ফুটে গেছে। তুযা নিজের গায়ের শালটা মেয়েটার গায়ে জড়িয়ে দিল। হাত ধরে নিয়ে বাড়ির দিকে হাটা দিল।
মানিকের বাড়ি থেকে জমিদার বাড়ি হেঁটে গেলে ১০-১৫ মিনিটের পথ। তুযা হেটে গিয়ে দেখলো এখনো বাড়ির গেট খোলা হয়নি। গেটের দারোয়ান মনসুর চেয়ারে বসে লাঠি হেলান দিয়ে ঘুমাচ্ছে। তুযা গিয়ে গেটের ফাক দিয়ে হাত ঢুকিয়ে মনসুরকে ডাকলো।
“ ওই মনসুর কাকা। মনসুর কাকা। ওই ওঠো। গেট খুলো। আমি বাড়িত ঢুকমু”
তুযার ডাকে মনসুর হচকচিয়ক উঠলো। দ্রুতগেট খুলে দিলো ওমনি। তুযা মেয়েটার হাত ধরে নিয়ে সদর দরজার দিকে যাচ্ছে। কবিতা চারিদিকে চোখ ঘুরিয়ে শুধু বাড়িটা দেখছে। এত বড় বাড়ি সে আগে কখনো দেখেনি। তোরা সদর দরজায় কয়েকটা টোকা দিতেই কদভানু দরজা খুলে দিলো। কিন্তু তুযার সাথের মেয়েটা কে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। মুখে বলার সাহস পেল না।
মেহেরজান সোফায় বসে বসে তসবি পড়ছেন। তো যার সাথে মেয়েটাকে দেখে অবাক হয়ে বলল
“কিরে?এইডা কারে নিয়া আইছোত?”
তুযা মেয়েটার মাথায় হাত রেখে বলল
“ ওর দুনিয়ায় কেউ নাই দাদি। থাকতো নানার বাড়িতে নানা মইরা গেছে। মামারা আইনা নদীর পাড়ে ফেলে দিয়ে গেছে। দেইখা মায়া লাগলো খুব। কি করমু কও। পরে নিয়ে আইলাম”
মেহেরজান মেয়েটার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল
“ এদিকে আয় তো। এদিকে আয় । আয়। হায় হায় কস কি।”
কবিতা গিয়ে মেহেরজানের পাশে বসলো। মেহেরজান মেয়েটার পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল
“ তোরে সত্যিই নদীর পাড়ে ফালায় দিয়া গেছে?”
কবিতা উপর নিজ মাথা নাড়লো। মেহেরজান করুনার স্বরে বলল
“ আহারে কোন হা’রামিরা করছে এমন কাম? তুই কান্দিস না বাচ্চা তুই কান্দিস না। তুই এই বাড়িতে থাকবি কোন সমস্যা নাই।”
তুযার দিকে তাকিয়ে মেহেরজান বলল
“ এই প্রথম কোন বুদ্ধিমানের লাহান কাম করলি”
সকাল সকাল চৌধুরী বাড়িতে আগম ঘটেছে সারফারাজ কায়নাত এর একমাত্র মেয়ে জেবার। ব্যাগপত্র নিয়ে এসে উঠলো। পরনে জিন্স আর অফ সোল্ডার টপ। সানগ্লাস কপালে উঠানো। চুল গুলো কালার করা। ঠোটে পুরু করে লিপস্টিপ পড়েছে। একদম সেজে গুজে ফুলটুসি টি হয়ে এসেছে। সদর দরজা পেরিয়েই লাগেজ হাত থেকে নামিয়ে হাসান চৌধুরী কে বলল
“ হ্যালো আঙ্কেল। হাউ আর ইউ”
হাসান চৌধুরী চশমা ঠিক করে হাবিব চৌধুরীর দিকে তাকালো। হাবিব চৌধুরী হেসে বলল
“ ভাইজান ওই যে কাল আপনাকে যার কথা বললাম। আমার ভায়রা ভাই এর মেয়ে। নদীর খালাতো বোন।”
হাসান চৌধুরীর স্মরণ হতেই হাসলো
“ ভালো আছি মামনি। যাও ভিতরে যাও। হাবিব নদী কে ডেকে বলো ওকে গেস্ট রুম টা দেখিয়ে দিতে”
জেবা রান্না ঘরে গেলো সায়রার সাথে দেখা করতে। সায়রা কে দেখেই ন্যাকামো করে এগিয়ে গেলো
“খালামনি”
সায়রাও হাসি মুখে এগিয়ে এলো। জড়িয়ে ধরলো জেবাকে। মুখে হাত বুলিয়ে বলল
“ কত্ত বড় হয়ে গেছিস। কেমন আছিস তুই মা?”
“আ’ম গুড। আন্টিইইইইইই”
আঞ্জুমান এর দিকে এগিয়ে গিয়ে আঞ্জুমান কেও জড়িয়ে ধরলো। অদিতি রান্নাঘরেই ছিলো। কিন্তু জেবা অদিতি কে কিছুই বলল না। সায়রা কে বলল
“ খালামনি সাইফ কোথায়?”
“ নিজের ঘরে আছে”
জেবা সিড়ির দিকে তাকিয়ে বলল
“ আমি এক্ষুণি দেখা করে আসছি”
অদিতি তাকিয়ে রইলো জেবার দৌড়ে যাওয়ার দিকে। আঞ্জুমান সায়রা কে বলল
“ একটু বেশিই আধুনিক না?”
সায়রা হেসে বলল
“আসলে শহরে বড় হয়েছে তো। একটু বেশিই স্মার্ট”
জেবা সাইফের রুমে গিয়ে সাইফ পিছন থেকে আলতো জড়িয়ে ধরলো। সাইফ ওপর হয়ে শার্ট আইরন করছিলো। জেবার কান্ডে চমকে পিছনে ঘুরলো।
“ হাইইইইইইইই”
জেবার লম্বা একটা হাই পেয়ে সাইফ নাক কুচকালো। ছোট করে বলল
“হ্যালো”
জেবা আবারও সাইফের বাহু জড়িয়ে ধরে বলল
“কত্ত দিন পর আমাদের দেখা হলো বলো”
সাইফ হাত সরিয়ে নিয়ে ছোট করে বলল “হুম”
সাইফ ওখান থেকে সরে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গেলো। শার্ট গায়ে পড়ে নিলো। জেবা সাইফের সামনে গিয়ে দাড়ালো। আল্লাদি হাসি দিয়ে বলল
“আমি হেল্প করছি বাটন ক্লোজ করতে”
সাইফ একটু পিছিয়ে বলল
“আমি পারবো বোতাম আটকাতে। হেল্প লাগবে না”
জেবা নাছোড় বান্ধা হয়ে সাইফের দিকে এগিয়ে বোতাম লাগাতে শুরু করলো। সাইফ বিরক্ত হচ্ছে ওর এমন ব্যাবহারে। অদিতি কফির কাপ নিয়ে রুমে ঢুকলো। কিন্তু রুমে ঢুকে এমন দৃশ্য দেখবে কল্পনাও করে নি। জেবা সাইফের গা ঘেষে শার্ট এর বোতাম আটকে দিচ্ছে। অদিতি দরজার সামনেই দাড়িয়ে পড়লো। সাইফ আয়নায় দেখলো অদিতি পিছনে দাড়িয়ে আছে। চট করে জেবার থেকে সরে দাড়ায়। সাইফ সরতেই জেবা দেখে অদিতি দাড়িয়ে আছে। ও খুব ভালো করেই জানে অদিতি সাইফের স্ত্রী। তবুও জিজ্ঞেস করলো
“ হেই ইউ! কী এখানে হু? আর কে তুমি?”
সাইফ হাতে ঘড়ি পরতে পরতে বলল
“ ও অদিতি। আমার ওয়াইফ”
জেবা অদিতির দিকে এগিয়ে গেলো। ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত অদিতির চারিদিকে ঘুরে ঘুরে দেখলো। অদিতির অস্বস্তি হচ্ছে জেবার এমন ব্যাবহারে। সাইফ কে বলল
“ আপনার কফি”
জেবা হাত থেকে কফির কাপ টা নিয়ে নিলো। ঘাড় বাকা করে ব্যাঙ্গাত্বক হাসি দিয়ে বলল
“তুমি যাও আমি ওকে এটা দিয়ে দিবো। যাও”
অদিতি মাথা নিচু করে চলে গেলো। অদিতিকে ভেংচি কেটে জেবা সাইফের কাছে এগিয়ে যায়।
স্টাইল মেরে বলল
“ ইউর কফি”
সাইফ ওয়ালেট পকেটে ঢুকিয়ে বলল
“এখন ব্রেকফাস্ট করবো। কফি লাগবে না”
“ওকে। আমি খেয়ে নিচ্ছি” বলে আবারও হাসলো জেবা। সাইফ কোট টা পরে নিচে যাওয়ার জন্য বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। জেবা কফির কাপে ভালো করে নিজের ঠোঁটের লিপস্টিপ এর ছাপ বসিয়ে দিলো। নিজেও নেমে এলো পিছন পিছন।
অদিতির হাতে কফির কাপটা দিয়ে বলল
“এই নাও। খেয়েছে কফি”
অদিতি কাপটা হাতে নিলো। ধোয়ার জন্য বেসিনে নিতেই চোখে পড়লো লিপস্টিক এর ছাপটা। অদিতি সেখানে আঙ্গুল ছুইয়ে দেখলো। ডাইনিং এ বসে থাকা সাইফের দিকে একবার তাকালো। এখনো জেবা পাশে বসে সাইফ কে কথার ফাকে ফাকে টাচ করছে। অদিতি কাপটা ধুয়ে কিচেনে রেখে ডাইনিং এ আসলো।
এই গায়ে পরা মেয়েটাকে একদম ভালো লাগছে না অদিতির। সাইফ কে কেমন প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছে। সাইফ অদিতিকে খুজলো। চোখ দিয়ে ইশারা করলো অদিতিকে পাশের চেয়ারে বসতে।
অদিতি এগিয়ে আসছে সেদিকেই। এমন সময় চেয়ার টা টেনে জেবা বসে পড়লো। সাইফ খাবারের প্লেট হাতে উঠে গেলো। নদীর কাছে গিয়ে পরোটা ছিড়ে একবার অদিতির মুখে দিলো। তারপর নিজে একবার খেলো। অদিতির হাতে প্লেট টা দিয়ে বেসিন থেকে হাত ধুয়ে বেরিয়ে গেলো সাইফ।
অদিতির সব খারাপ লাগা ধুয়ে দিতে সাইফ এর এই কেয়ার টুকু যথেষ্ট ছিলো। জেবা এটা দেখে জিদে ফুসতে লাগলো। নদী সাইফের রেখে যাওয়া খাবার টুকুই খেলো। জেবা অদিতিকে অপমান করতে বলল
“ একি তুমি মানুষের এটো খাওওওও?”
বলেই নাক সিটকালো জেবা। সবাই অদিতির দিকে তাকালো। অদিতি হেসে জেবাকে উত্তর দিলো
“ মানুষের এটো খাই না। এটা আমার স্বামীর প্লেটের খাবার।”
দীঘি পাকনামি করে বলল
“ আর তাছাড়াও ভাইয়া – ভাবি রোজ এক প্লেটেই খাবার খায়। তাই না ভাবি?”
অদিতি দীঘির কথায় হেসে মাথা দোলালো। জেবা ভেংচি কেটে নিজের খাওয়ায় মন দিলো। নদী দীঘিকে আস্তে করে বলল
“ তোকে বড় দের মধ্যে কে কথা বলতে বলেছে?”
দীঘিও ফিসফিস করে নদীর কানে কানে বলল
“ দেখছিস না? জেবা আপু কেমন ভাইয়ার গায়ে পরছে।”
“ হয়েছে। চুপ করে খা। খালি পাকনামি”
সকলের খাওয়া হয়ে গেলে অদিতি সায়রা আর আঞ্জুমান এর সাথে এটো প্লেট গুলো কিচেনে নিচ্ছে ধোয়ার জন্য। অদিতি আঞ্জুমান কে ধুতে দিলো না পানি ঠান্ডা বলে। জেবা সোফায় বসে ফোন চাপছে। আঞ্জুমান কিচেনের কাজ অদিতি করছে বলে রুমে চলে গেলো৷ সায়রা কে তার ভাই ভিডিও কল দিয়েছে। কথা বলতে বলতে সায়রাও গেলো। অদিতি ধোয়া প্লেট গুলো টেবিলে সাজিয়ে রাখছে। জেবা অদিতির পিছনে গিয়ে দাড়ায়। ভাব নিয়ে বলে
“ নাম কি তোমার?”
অদিতি কাজ করতে করতেই জবাব দেয়
“অদিতি”
“শুধু অদিতি? তুমি আমার নাম জানো?”
অদিতি ছোট করে বলল “না”
জেবা সমনের চুল গুলো পিছনে দিয়ে বলল
“ জানভিয়া কায়নাত জেবা”
“ওহ”
“হুমম। তোমার নাম এর টাইটেল কি?”
নদী পিছন থেকে উত্তর দিলো
“ অদিতি চৌধুরী।”
জেবা কটমট করে নদীর দিকে তাকালো। নদী জেবার থেকে দুই বছরের ছোট।
“তোকে বলতে বলেছি?”
নদী স্মিত হেসে বলল
“ বলে দিলাম তবুও। আর তুমিও পারো জেবা আপু। সাইফ ভাইয়ার বউ, মানে এই বাড়ির বউ। চৌধুরীই হবে। জিজ্ঞেস করার কি আছে?”
জেবা রেগে চলে গেলো সেখান থেকে। গেস্ট রুমে গিয়ে ফোনটা ছুড়ে মারলো বিছানায়। “এই নদী দীঘি দুইজনই এই বস্তির মেয়েটার হয়ে কথা বলে কেন? ওরা জেবার বোন হয়, জেবার পক্ষে কথা বলা উচিৎ।” জেবা রাগে ফ্লোরে লাথি মারে।
নদী অদিতির দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে
“ তুমি কি সব সময় এমন বোকা ই থাকবে?”
নদী সামান্য হেসে বলে
“ আপু উনি তো মেহমান। ওনাকে কড়া ভাষায় কিছু বলা ভালো দেখায় না”
নদী আলতো করে অদিতির গাল টিপে দেয়। অদিতিও হাসে। নদীর হাতে ফোনটা বাজছে। নদী ফোনের দিকে একবার তাকিয়ে অদিতির দিকে তাকায়। হেসে চলে যায় সেখান থেকে। তুমুল কল করেছে। ফোন নিয়ে ছাদে চলে যায়।
অদিতি মাত্রই রুমে গেলো। গোসল করবে এখন। তারপর আবার দুপুরের রান্না করতে হবে। জেবা দরজার সামনে দাড়িয়ে আওয়াজ দিলো
“ উহুম, উহুম”
অদিতি চুলের বেণি খুলতে খুলতে বলে
“কিছু বলবেন আপু?”
জেবা ফোন চাপতে চাপতে বলে
“ এক্ষুনি এক কাপ কফি আমার রুমে দিয়ে এসো ফাস্ট। ওহহহ হ্যা। সুগার ফ্রি ওকে?”
অদিতি শুধু মাথা নাড়ে। চুল গুলো আবার বেধে কিচেনে যায়। কফি বানিয়ে জেবার রুমের দিকে যায়। জেবা দেখে অদিতি আসছে। ফোন কানে নিয়ে জোরে জোরে বলে
“ আর বলিস না। সাইফ ও একটা পাগল। সকালে বলছে কফির কাপে তুমি আগে চুমুক দাও তারপর আমি দিবো। পরে আমি একটু চুমুক দিলাম। খেয়ে কি বলল জানিস? কফির মিষ্টি নাকি কয়েক গুণ বেড়ে গেছে”
বলেই হা হা করে হাসতে লাগলো। অদিতি মৃদু শব্দে ডাকলো
“ আপু। আপনার কফি।”
অদিতি কে না দেখার ভান করে বলল
“ ওহহ তুমি? দাও”
জেবার কথা শুনে অদিতির মন টা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। কথাটা মিথ্যা না। অদিতি নিজেও কফির কাপে লিপস্টিক এর ছাপ দেখেছে। এসব ভাবতে ভাবতে অদিতির চোখ ভরে আসে পানিতে। কেউ কি নিজের স্বামীর সাথে কোনো মেয়ে কে সহ্য করতে পারে?
গোসল সেরে রান্না করতে হবে। রুমে চলে যায় অদিতি। গোসল করে কিচেনে আসে। আঞ্জুমান আর সায়রা কে হেল্প করে রান্না করতে। রান্না হয়ে গেলে আঞ্জুমান নদী আর দীঘিকে খেতে আসতে বলে। জেবাও বসে। জেবা একটা ফ্রক পড়েছে যেটা হাটুর সামান্য নিচে। পায়ের বাকি অংশ উন্মুক্ত। অদিতি সব খাবার একে একে টেবিলে আনছে। এমন পোষাক অদিতি কখনো কাওকে পড়তে দেখেনি। জেবার পোষাক দেখে বলল
“ আপু আপনি এটা কি পড়েছেন?”
জেবা ফোন থেকে চোখ তুলে রুক্ষ ভাষায় বলল
“ তোমার মতো আন কালচারড গাইয়া এসব বুঝবে না”
অদিতি অপমানে মাথা নিচু করে ফেলে। সবাই খেতে বসলেও অদিতি বসে না। খায় না দুপুরের খাবার। মনটা ভালো না তার।
সন্ধ্যায় সাইফ বাসায় আসে। গেট খুলে দিলো জেবা গিয়ে। গেট থেকে শুরু করে রুম পর্যন্ত সাইফের পিছন পিছন গেলো জেবা। অদিতি সাইফ কে দেখতেই মনে পড়লো সকালের কফির কাপের কথা। রাগে, অভিমানে রুমেও গেলো না। এমনিতে সাইফ আসলেই অদিতি যায় রুমে। কোট খুলে দেয়। জামা কাপড় বের করে দেয়। আজ গেলো না। মনে মনে ভাবলো
“ আমায় দিয়ে কি করবে? জেবা আপু তো গেছেই”
অদিতি চুপচাপ কাজ করছে। সাইফ রুমে গিয়ে কোট টা খুলে খাটের ওপর বসলো। জেবাও বসলো সাইফের গা ঘেষে। সকালে একবার এই বিরক্ত টাকে সহ্য করেছে। কিন্তু এখন আর সাইফ এর পক্ষে সম্ভব নয়। সারাদিন কাজ করে শরীরটা ভীষণ ক্লান্ত এমনি তেই। বিরক্ত হয়ে জেবা কে বলল
“ আমি ভীষণ ক্লান্ত। ফ্রেশ হয়ে একটু রেস্ট নিতে চাই। প্লিজ, গো এ্যাহেড।”
কিন্তু জেবা নাছোড় বান্ধা। সাথে নির্লজ্জও। সাইফ এর বাহু জড়িয়ে ধরে কাধে মাথা হেলিয়ে দিলোব। আদুরে গলায় বলল
“ কাম অন সাইফ। আমি আছি তো। তুমি ফ্রেশ হয়ে এসো। আমি তোমাকে দারুন একটা ম্যাসাজ দিচ্ছি।”
সাইফ জেবাকে সরিয়ে দিয়ে বলল
“ আমার চাই না। প্লিজ, লিভ মি অ্যালোন”
জেবার জিদ উঠলো খুব। কিন্তু সাইফ কে বুঝতে না দিয়ে বেড়িয়ে এলো রুম থেকে। সাইফ ফ্রেশ হয়ে এসে আবার ল্যাপটপ নিয়ে বসলো। বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে, এই বুঝি অদিতি এলো। কিন্তু অদিতির টিকি টার ও দেখা নেই। ল্যাপটপ বন্ধ করে নিজেই গেলো অদিতির খোজে। অদিতির এমন কেয়ার লেস ব্যাবহার ভালো লাগছে না সাইফের। সকালেও আসেনি। এখনও যে তার স্বামী বাড়ি ফিরেছে, সে খেলয়াল ই নেই তার। সিড়ি দিয়ে নিচে নামছে আর চারিদিকে চোখ বোলাচ্ছে সাইফ। কোথাও অদিতি নেই।
জেবা সাইফ কে দেখে এগিয়ে আসলো সাইফের দিকে। কিন্তু জেবা কে পাত্তা না দিয়ে সাইফ চলে গেলো কিচেনের দিকে। অদিতির খোজে। জেবাও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়।সেও গেলো সাইফের পিছন পিছন।
সাইফ কিচেনে গিয়ে দেখলো অদিতি একা একা দাড়িয়ে সবজি কাটছে। সাইফ কাছে গিয়ে আলগোছে জড়িয়ে ধরলো অদিতির সরু কোমর। অদিতি একটু চমকায়। ওপর দিকে মাথা তুলে তাকাতেই সাইফ তার কপালে আলতো করে চুমু খায়৷ অদিতির মন গলে না তাতে। কোনো কথা না বলে আবার সবজি কাটায় মন দেয়। সাইফ ভাবছে তুযার বিষয় নিয়েই হয়তো এখনো মন খারাপ। অদিতির কাধে থুতনি ঠেকিয়ে বলল
“আমি এসেছি জানো না? রুমে এলে না কেন?”
অদিতি তাও জবাব দিলো না। সাইফ অদিতির কাধে পর পর কয়েকটা চুমু দিয়ে অভিমানি কন্ঠে বলল
“সারা দিন তো অফিসেই থাকি।যেটুকু সময় বাড়িতে থাকি, তোমাকে ধারে কাছেও পাই না।”
জেবার এসব সহ্য হচ্ছে না। ওদের বিরক্ত করতে হুরহুর করে ঢুকে পড়লো
“সাইইইইইইইফ। দেখো না আমার……”
জেবার কথা শেষ হওয়ার আগে সাইফ বলল
“ কি সাইফ সাইফ করছো এসেছো পর থেকে। সিনিয়র তোমার। ভাইয়া বলো। যত্তসব”
সাইফ বিরক্ত হয়ে কিচেন ছেড়ে বেড়িয়ে গেলো। জেবা অদিতির কাছে গিয়ে বলল
“ও রেগে গেছে ভীষণ। আসলে কারো সামনে আমি ওর নাম ধরে ডাকি সেটা ও পছন্দ করে না। তুমি কাজ করো। আসছি”
সাইফ গিয়ে ড্রইং রুমে সোফায় বসেছে। জেবাও বসেছে গিয়ে পাশে। ফোনে ক্যামেরা অন করে এদিকে ওদিকে পোজ দিচ্ছে। সাইফ এর দিকে ঘেঁষে গিয়ে বলল।
“ সাইইইইফ। চলো না সেলফি তুলি। তাকাও এদিকে। প্লিইইইইজ”
সাইফ ভীষণ বিরক্ত এই মেয়েটার যন্ত্রণায়। জেবা বার বার করে বলছে। ওর জালাতন থেকে বাচতে সাইফ ক্যামেরার দিকে তাকালো। জেবা ফটাফট কয়েকটা ছবি ক্লিক করে নিলো। আঞ্জুমান চৌধুরী কে দেখে জেবা সরে বসলো।
ডিনারের সময় হয়ে গেছে। আঞ্জুমান সবাইকে ডাইনিং এ আসতে বলে। সাইফ, নদী, দীঘি সবাই বসে। আঞ্জুমান অদিতিকেও পাঠিয়ে দেয়। সায়রা আর আঞ্জুমান পরিবেশন করবে বলে। হাবিব চৌধুরীর আর হাসান চৌধুরী কেউই বাড়িতে নেই। জেবা সকাল বেলার মতোই সাইফের পাশে বসেছে। সাইফ অদিতি কে আসতে দেখে জেবা কে বলল
“ ওঠো”
“হ্যা?”
সাইফ দাতে দাত চিপে বলল
“ ওঠো। ওই চেয়ারে গিয়ে বসো। এখানে অদিতি বসবে।”
অদিতি নদীর পাশে একটা চেয়ার টেনে বসে বলল
“ সমস্যা নেই। আমি এখানেই বসছি”
দীঘি জেবার দিকে ভেংচি কেটে অদিতির কানে কানে বলল
“ এই ভাবি। তুমি এতো বোকাচোদা কেন হ্যা? তুমি কি কানা নাকি? জেবাপু যে এসেছে পর থেকে ভাইয়ার গা ঘেষছে। তুমি কি দেখতে পাও না নাকি?”
অদিতি মাথা নিচু করে রইলো। কোনো কথা বলল না। নদী দীঘিকে চোখ দিয়ে ইশারা করছে যাতে কথা না বলে। দীঘি মনে মনে বলল
“ এই দুটোই একরকম। ধুরররর। ভাবির জায়গায় আমি হলে এতক্ষণে জেবার চুল একটাও থাকতো না।”
অদিতি খাবার খেতে একটা চামচ নিলো। আঞ্জুমান বলল
“ কি রে। তোকে তো স্পুন দিয়ে খেতে দেখি না কখনো”
অদিতি নরম গলায় বলে
“ আসলে মা সবজি কাটতে গিয়ে অল্প একটু হাত কেটে গেছে। তরকারি লাগলে জ্বালা করবে তাই….”
সাইফ অদিতির হাত কাটার কথা শুনে চট করে উঠে দাড়ালো খাওয়া ছেড়ে। অদিতির দিকে এগিয়ে এসে বলল
“ দেখি কোথায় কেটেছে। কই দেখি হাত দেখাও”
অদিতি হাত দেখায় না। পিছনে লুকিয়ে বলে
“ বেশি কাটেনি”
সাইফ অদিতির হাত টেনে এনেই দেখলো। বৃদ্ধাঙ্গুলে কেটেছে। দীঘি সুযোগ বুঝে নিজের চেয়ার ছেড়ে দিলো সাইফ কে।
“ ভাইয়া, তুমি এখানে বসে ভাবিকে খাইয়ে দাও। আমি জেবাপুর ওখানে গিয়ে বসছি”
জেবা মুখ বেকিয়ে দীঘি কে বলল
“ও তো খাচ্ছে স্পুন দিয়ে।”
দীঘি জেবার পাশে গিয়ে বসলো নিজের প্লেট টা নিয়ে। সাইফ এর প্লেট টাও এনে দিয়ে গেলো। সাইফ অদিতি কে খাইয়ে দিচ্ছে। জেবার রাগে শরীর জ্বলে পুরে যাচ্ছে যেন। দীঘি খোচা দিতে বলল
“ ওদের জুটিটা কি সুন্দর লাগছে বলো জেবাপু? মাশাল্লাহ।”
চলবে?
এবার সেই মজা হবে মনে হচ্ছে 👀🌚। কেমন হলো বইলো পাখিরা 🥹
Share On:
TAGS: খাঁচায় বন্দী ফুল, জান্নাতুল ফেরদৌস
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৮
-
খাঁচায় বন্দী ফুল গল্পের লিংক
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১২
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৬
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৩