মাই টক্সিক হাসব্যান্ড
পর্ব_৩৫
কলমেতাসনিমতালুকদার_বুশরা
হ্যাশট্যাগ ছাড়া কপি করা নিষিদ্ধ🚫
বেড রুমে ঢুকতেই আবরারের চোখে প্রথম যে দৃশ্যটা পড়ল,তা হলো—কুহেলি এখনো নিস্তব্ধ ঘুমে ডুবে আছে।রুমের জানালা খোলা হালকা বাতাসে পর্দা দুলছে,আর কুহেলির মুখের ওপর আলো পড়ে তাকে আরও শান্ত লাগছে।
আবরার ধীরে ধীরে বিছানার পাশে গিয়ে বসল। কুহেলির শ্বাস-প্রশ্বাসের ওঠানামা দেখলে মনে হচ্ছিল, তার ভেতরের ঝড়টা যেন কিছুক্ষণের জন্য থেমে আছে। ফাহিম মেডিসিন আনতে বেরিয়ে গেছে—এই মুহূর্তে তারা শুধু দু’জন, নিঃশব্দ রুমে আর অব্যক্ত কিছু প্রশ্ন।
আবরার আলতো করে কুহেলির মাথার কাছে হাত রাখল। তারপর খুব ধীরে তার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলল,
জান আজকের পর তোমাকে আর এই কষ্ট সহ্য করতে হবে না। আমি দেখে নেব—সবকিছু।
কুহেলি নড়ল না,কিন্তু তার মুখের কোণে যেন অবচেতন একটা কষ্টের রেখা ছিল।সেই রেখাটাই আবরারের বুকের ভেতর কোথাও খোঁচা দিল।
আর একটা কথা আবরারের গলাটা হালকা কেঁপে উঠল।
আমি জানি তুমি আমাকে ভালোবাসো। তবুও কনফিউস তোমার অনুভূতি নিয়ে। কারণ তুমি কোনোদিন নিজের মুখে বলোনি।কোনোদিনও না।
ওর চোখ অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল।
অদ্ভুত না, পাখি?তার গলা আরও নিচু।
একটা সময় ‘ভালোবাসা’ শব্দটা কে আমি বিষাক্ত মনে করত। মনে হতো, মানুষ এই শব্দটা ব্যবহার করে শুধু নিজেদের স্বার্থ লুকানোর জন্য।আর এখন… তোমার মুখ থেকে সেই শব্দটা একবার শুনার জন্য… আমি কেমন মরিয়া হয়ে আছি।
আবরার নিজের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওই নিস্তব্ধতার মাঝেই,
ঠুক…. ঠুক
দরজায় নক পড়ল।
আবরার সাথে সাথে সোজা হয়ে বসল।মুহূর্তেই তার মুখের আবেগ যেন গুটিয়ে গেল,বদলে গেল স্বাভাবিক, ঠাণ্ডা ভাবভঙ্গিতে।
কাম ইন, শান্ত গলায় বলল সে…!
তারপর দরজা খানা খুলতেই ফাহিম ভেতরে ঢুকল।হাতে ছোট ব্যাগ,মুখে সেই স্বভাবসিদ্ধ দুষ্টু হাসি।সে নিঃশব্দে হাঁটতে হাঁটতে কুহেলির অন্য পাশে বসতে উদ্যত হলো।
ঠিক তখনই
দাঁড়া।
আবরারের ঠাণ্ডা, ধারালো গলা রুমটাকে মুহূর্তে স্তব্ধ করে দিল।
ফাহিম থেমে গেল।কপাল কুঁচকে জিজ্ঞাসাভরা চোখে আবরারের দিকে তাকাল। যেন বুঝতে চাইছে—আবার কী হলো?
আবরার বিছানার পাশে রাখা ছোট একটা ঢুল তুলে ফাহিমের দিকে বাড়িয়ে দিল।
এতে বস ,তারপর আবরার ঠোঁট সরু করে বলল, এই বেডে শুধু আমার আর পাখির ছাড়া অন্য কারও স্পর্শ আমি কখনোই চাই না।
এক মুহুর্তেই ফাহিমের মুখের হাসি মিলিয়ে গেলো দাঁতে দাঁত চেপে কিছু বলতে যাবে তার আগে আবরার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,আগে কাজ। তারপর কথা। মনে রাখিস আমি বেশি কথা পছন্দ করি না।
রুমের বাতাস ভারী হয়ে উঠল।
ফাহিম এবার বুকের সামনে হাত ভাঁজ করে দাঁড়াল,যেন নিজের ভেতরের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে।ঠিক আছে,ফাহিম মৃদু বিদ্রূপ মেশানো গলায় বলল,কিন্তু যদি আমি এখন ইনজেকশনটা না দেই তখন?
আবরারের মুখে একফোঁটা আবেগ নেই।তাহলে অন্য ডাক্তার দিয়ে দিতে বলব।তারপর সামান্য ঝুঁকে, ভয়ানক শান্ত গলায় যোগ করল—আর এক মিনিট তোর কি মনে হয়, আমি আমার পাখিকে তোকে স্পর্শ করার অনুমতি দেব?!
ফাহিমের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
এই রুমে কার ক্ষমতা কতটা—তা বোঝার জন্য আর কোনো কথার প্রয়োজন ছিল না।
কুহেলি এখনো ঘুমিয়ে, কিন্তু দুই পুরুষের নীরব যুদ্ধ রুমের বাতাসে টানটান হয়ে ঝুলে আছে।
আবরার চোখ সরু করে ফাহিমের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে এখন রাজাধিরাজের মতো ঠান্ডা দৃঢ়তা
না দিলে এখন জোর করে নেব।কারণ তুই আমার রাজ্যে দাঁড়িয়ে আছিস। আর নিশ্চয়ই মেডিসিন এনেছিস তাই না?
ফাহিম ঠোঁটে টান তুলে হাসল।
ওমা ভয় পাচ্ছিস নাকি, আবরার?
ওর কণ্ঠে তীক্ষ্ণ বিদ্রূপ।
ঠিক কী বোঝাতে চাইছে তা আবরার খুব ভালোই বুঝল। বুকের ভেতর এক মুহূর্তের জন্য কাঁপুনি উঠল।তবুও মুখে বিন্দুমাত্র ফাঁটল ধরল না।
সে সোজা হয়ে দাঁড়াল।চোখে হালকা আগুন, ঠোঁটে অদম্য আত্মবিশ্বাস,
“নাহ” আবরার ধীরে ধীরে বলল,
এরিক আবরার খানের ডিকশনারিতে ভয় বলে কোনো ওয়ার্ড নেই আর হেরে যাওয়া নিয়েও কোনো ওয়ার্ড নেই। আর যখন কেউ আমাকে চ্যালেঞ্জ দেয় হয়তো আমি জিতি নয়তো যে জিততে চায়,তাকে ধ্বংস করে দিই। তবুও হারি না।
ফাহিমের মুখে এক মুহূর্তের জন্য স্নায়ুচাপ স্পষ্ট হলো, কিন্তু সে দ্রুত সেটা ঢেকে ফেলল।
ধীরে ঢুলে বসে ব্যাগ খুলল ঠাণ্ডা নিখুঁতভাবে ইনজেকশন বের করল।
কুহেলির হাত আলতো করে ধরে ইনজেকশনটা দিয়ে দিল।তারপর উঠে দাঁড়িয়ে আবরারের দিকে তাকিয়ে বলল—দেখা যাক… কে জেতে।
কথাটা ছুঁড়ে দিয়ে ফাহিম রুম থেকে বেরিয়ে গেল। দরজাটা বন্ধ হতেই পুরো রুম নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল।
আবরারের বুকের ভেতর এখনো ঝড়।কিন্তু তার চোখ শুধু কুহেলির ওপর।সে ধীরে ধীরে বিছানায় উঠে এসে কুহেলির পাশে শুয়ে পড়ল।মুখটা ঘুরিয়ে কুহেলির শান্ত,নিস্তেজ ঘুমন্ত মুখটা দেখল। যেন চারপাশে যত যুদ্ধ–বিবাদ–ক্ষমতার খেলা, সবই এই মেয়েটার এক নিঃশ্বাসের কাছে তুচ্ছ।
আবরার হাত বাড়িয়ে কুহেলির কপালের কাছে চুল সরিয়ে দিল।তার চোখে এবার আর রাগ নেই শুধু একটা গভীর, নীরব দুঃসহ ভয়!
~~
বিকেলের দিকে কুহেলি ধীরে ধীরে চোখ মেলে। প্রথমেই চোখে পড়ল আবরার তার দিকে তাকিয়ে আছে।লাল টকটকে মনিওয়ালা দু’টো চোখ দিয়ে।
কুহেলি চোখ পিটপিট করে বলল,
আমি দিনে ঘুমিয়েছিলাম সত্যি? আমি তো কখনোই দিনে ঘুমাই না। আজকে কিভাবে ঘুমালাম?
আবরার তার কপালের কাছে আলতো ছুঁয়ে দিল শান্ত ও আশ্বস্ত করা এক স্পর্শ।
আবরার নরম গলায় বলল,কি জানি! আমার বউ বড্ডো চোর হয়ে গেছে। আমাকে আদর করতেই চায় না।খালি আমাকে ফেলে ঘুমায়। এখন তো মনে হচ্ছে এই ঘুমটাই আমার সতিন হয়ে গেছে।
কুহেলি হকচকিয়ে গেল হাসবে, নাকি কেঁদে ফেলবে, কিছুই বুঝল না।মানুষটা কি সত্যি ঘুম নিয়েও জেলাস ফিল করে?এই ভাবনা মাথায় আসতেই তার মুখে অজান্তেই মিষ্টি একটা হাসি ফুটে উঠল।
কুহেলি ধীরে আবরারের বুকে মাথা গুঁজে বলল,
আপনি বড্ডো হিংসুটে হয়ে যাচ্ছেন।
আবরার সাথে সাথে বলল,
তোমার জন্যই।
কুহেলি চুপ করে রইল, শুধু হাসল। সেই হাসিটা রুমের আলোকে আরও উজ্জ্বল করে দিল।
আবরার ভিতরে ভিতরে একটা দীর্ঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।যাক আমার পাখি আমাকে চিনতে পেরেছে। ও ঠিক আছে। এর চেয়ে বেশি আর কিছুই চাই না।
তারপর কিছুক্ষণ রুমে নীরবতা নেমে এলো।বাইরে সন্ধ্যার আলো কমে আসছে,আর রুমে ভেতরে শুধু দু’জনের শ্বাস–প্রশ্বাসের নরম সুর।
আবরার কুহেলির চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে হঠাৎ একটু দ্বিধায়, খুব নরম কণ্ঠে ডাকল,
“রোজ…!”
কুহেলি চোখ আধখোলা করে বলল,
“হুঁ…? “
আবরার গলাটা কয়েকবার ভেজাল। তার মুখে অদ্ভুত এক দ্বিধা—তোমার কি… আজ সকালের কথা মনে আছে কিছু?
কুহেলি ভেবে ভুরু কুঁচকালো তারপর বললো,
কি মনে থাকবে? আপনি সকালে ইউনিভার্সিটি পৌঁছে দিলেন আবার দুপুরে বাড়ি পৌঁছে দিছেন এর বাইরে আর কিছু মনে নেই।
আবরারের বুকের ভেতর জমে থাকা পাথরটা যেন চট করে নেমে গেল।
যাক কিছুই মনে নেই। এটাই ভাগ্য।
সে স্বস্তির দীর্ঘশ্বাসটা চেপে রেখে স্বাভাবিক ভাবে বলল,
না না… কিছু না।
এরপর যেন আচমকাই তার মুখে দুষ্টু একটা হাসি ফুটে উঠল।সে এগিয়ে এসে কুহেলির কানের কাছে মুখ নিয়ে হাস্কি কন্ঠে বলল,
“বউ…!”
শব্দটা শুনেই কুহেলির হৃদয়ে যেন কে ঢেউ ছুঁয়ে গেল। বুকের ভেতর অচেনা উষ্ণতা উঠল।এই ডাকে তার ভেতরটা কেন জানি অস্থির হয়ে যায়।
আবরারের অনেক ডাকই তাকে ভালো লাগে কিন্তু এই ডাকটা,
এটা যেন আলাদা… অন্যরকম♡ღ
কুহেলি লাজুক গলায় বলল,
হুঁ..?
আবরার আগের মতোই একটু গভীর, হাস্কি কণ্ঠে বলল
তোমাকে আদর করতে মন চাইছে…!
আবরারের কথা শোনামাত্রই কুহেলির মুখের লজ্জা যেন আচমকা উড়ে গেল।সে আবরারের বুক থেকে সরে উঠে একদম সোজা হয়ে বসল।
আবরারও ভয়ে দ্বিধায় দ্রুত উঠে কুহেলির পাশে বসল।
কি হয়েছে, ডার্লিং?আবরার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।এভাবে হঠাৎ বসে পড়লে কেনো তুমি?
কুহেলির মুখ গম্ভীর। তারপর রাগে চোখ গোল করে বলল,
অসভ্য লোক! সারাদিন খালি অসভ্য–অসভ্য কথা বলেন কেনো? আর কোনো কথা নেই আপনার?
আবরার হতবাক হবার ভান ধরে বললো,
আরেহ!আমি কি বললাম? আমি তো শুধু বললাম তোমাকে আদর করতে চাই মানে..!
সে একটু থামল, তারপর নিরীহ মুখে বলল,
কেনো?আমি কি তোমার প্রতি ভালোবাসা দেখাতে পারব না? তুমি তো আমার বউ তাই না?
কুহেলি উঠে পড়ে বিছান থেকে নামতে চাইলো।
আবরার তাড়াতাড়ি তার হাত ধরে টেনে বসিয়ে বলল—কি হয়েছে? কোথায় যাচ্ছো হঠাৎ?
কুহেলি কিছু না বলে চুপচাপ বসে রইল। তার মুখে স্পষ্ট রাগ।আবরার তাকিয়েই বুঝল—মেয়েটা রেগে আছে, কিন্তু রাগের আড়ালে ভয়, লজ্জা আর অস্বস্তিও লুকানো।
হঠাৎ আবরার এক টানে কুহেলিকে নিজের বুকে টেনে নিল।শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
কি হলো? এভাবে রাগ করছো কেন, বলো তো?
কুহেলি দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে বলল,
ছাড়ুন…ভালো লাগছে না।
আবরার ঠোঁটে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,
আচ্ছা আচ্ছা, আমার কাছে একটা জিনিস আছে যেটা দেখলে তোমার ভালো লাগবে।
কুহেলি তৎক্ষণাৎ বলল,
আগে আমাকে ছাড়ুন।
আবরার সাথে সাথে তাকে ছেড়ে দিল।
কুহেলি হাত গুটিয়ে ভুরু কুঁচকে বলল,
কি জিনিস?
আবরার একটু ঝুঁকে এসে খুব দুষ্টুমি ভরা চোখে বলল,
কলা….!
কুহেলি বোঝেনি ভ্রু কুঁচকে বললো,
“মানে?”
আবরার নিজের মুখের পাশে হাত রেখে কুহেলির দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
এক সেকেন্ড…. দুই সেকেন্ড…
কুহেলি যখনি বিষয় টা বুঝতে পারলো সাথে সাথে
লজ্জায় আর কোমলতায় লাল আভা ফুটে উঠল।
মাথা নিচু করে ফেলল সে।
আর এই দৃশ্য দেখে আবরার শব্দ করে হেসে উঠল একদম খোলা, গভীর, প্রাণখোলা হাসিতে।
ওর হাসির শব্দ যেন রুমের সব অভিমান গলিয়ে দিল।
চলবে.....!
Share On:
TAGS: তাসনিম তালুকদার বুশরা, মাই টক্সিক হাসব্যান্ড
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ২৭
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৫১(সমাপ্ত)
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৪৪
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ১৬
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ২৮
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড গল্পের লিংক
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ১২
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৩০
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ২২
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৬