নয়নারএমপিসাহেব
পর্ব-২
লেখনীতে – Sanjana’s – গল্পঝুড়ি
তরী গুটিশুটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে হৃদয়ের রুমে। হৃদয়ের নজর তখন তরীতেই নিবদ্ধ। তরী আড়চোখে একবার হৃদয়ের দিকে তাকাতেই হৃদয় ঠান্ডা গলায় বলল—
__ দ্রুত ভাঙা কাপের টুকরোগুলো পরিষ্কার কর।
তরী মাথা নুইয়ে ধীরে এগোলো। বাধ্য মেয়ের মতো হাত বাড়িয়েই যখন একটা টুকরো ধরতে যাবে, ঠিক তখনই হৃদয়ের গলা চাবুকের মতো পড়ল—
__হাত দিবি না একদম , হাত হাত কেটে আমাকে ফাঁসাতে চাইছিস?
মুহুর্তেই তরী ভড়কে গেল। শরীরটা কেঁপে উঠলো দৃশ্যমান রুপে। কী করবে, কী না করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না ও। বোকা তরী বুঝতে পারছে না হৃদয় আসলে চাইছেটা কি? হৃদয়ের কথার মানে ধরতে না পেরে চোখ দুটো ভয়ে ছলছল করে উঠল ওর।
তখনই হৃদয় এক পা এগিয়ে এসে কঠোর স্বরে আদেশ করল—
__এখনই টেবিলের সামনে গিয়ে এক পা তুলে কানে ধরে দাঁড়িয়ে থাকবি। সারারাত এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকবি। আমি না বলা পর্যন্ত পা যেন না নামে।
তরী অবিশ্বাসে তাকিয়ে রইল হৃদয়ের দিকে। ঠোঁট নড়ল ওর, কিছু বলতে চাইছিল ও। হয়তো ক্ষমা চাইবে, হয়তো অনুনয় করবে। কিন্তু হৃদয় এমন দৃষ্টি নিয়ে তাকালো ওর দিকে যা দেখে তরীর সমস্ত শব্দ গলায় আটকে গেল। হৃদয়ের দৃষ্টিতে চরম কঠোরতা। তরী আর সাহস পেল না। চুপচাপ উঠে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে হৃদয়ের বলা জায়গায় গিয়ে এক পা তুলে কানে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ঠিক যেমন আদেশ দেওয়া হয়েছে।
আবারও ঘরের ভেতর নেমে এলো ভারী নীরবতা।
হৃদয়ও আর কিছু বলল না। ঝুঁকে পড়ে মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা কাপের টুকরোগুলো এক এক করে তুলতে লাগল। প্রতিটা টুকরো তুলেই ডাস্টবিনে সশব্দে ফেলল যেন সেইভাবেই সে তরীকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে চায় খান বাড়ির ত্রিসীমানার বাইরে। ভাবনাটা অবশ্যই তরীর নিজের। অপমানে তরীর মুখখানা ছোট হয়ে গেছে, চোখের কোণে জল চিকচিক করছে তবুও ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। পা কাঁপছে, চোখ জ্বলছে, তবুও এতটুকু নড়ছে না।
সেই মুহূর্তে মনে হল ঘরের ভেতর সময় যেন স্থির হয়ে গেছে। একদিকে হৃদয়ের নীরব কঠোরতা, আর অন্যদিকে তরীর অসহায়তা। হৃদয় এবং তরীর মধ্যে নীরব যুদ্ধ চলাকালীন ঠিক তখনই রুমে প্রবেশ করলো হৃদি এবং অনিমা বেগম।
তরীকে এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, হৃদি অসহায় চোখে তাকালো। অনিমা বেগম শান্ত ভঙ্গিতে একবার তরীকে দেখে ছেলের দিকে তাকালেন। উনি কিছু বলবেন তার আগেই হৃদয় গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো,,,,
__কিছু দরকার তোমাদের?
ভাইয়ের কঠোর স্বর শুনে হৃদি ভয়ে ঢোক গিলল। যদি একবার জানতে পারে ওই অনিমা বেগমকে এখানে নিয়ে এসেছে, তাহলে আজ তরীর সাথে সাথে ওরও কপালে দুঃখ আছে। হৃদির ভাবনার মাঝেই অনিমা বেগম কোনো ভঙ্গিমা ছাড়াই বললেন,,,
__তরী এইভাবে দাঁড়িয়ে আছে কেন ? ওর তো পা ব্যথা করবে। তুই জানিস না ওর নার্ভের সমস্যা আছে?
জবাবে হৃদয় কিছুক্ষণ চুপ থেকে নির্বিকার ভাবে উত্তর দিল,,,
__কারণ আছে বলেই দাঁড়িয়েছে আম্মু ! আর এইটুকতে ওর নার্ভের সমস্যা বেড়ে যাবে না।
অন্যদিকে তরীর পা কাঁপছে, কানে হাত দেওয়া আঙুলগুলো অবশ হয়ে আসছে। হৃদি দাঁড়িয়ে আছে অসহায় হয়ে, কিছু করতে না পারার যন্ত্রণায় চোখ নামানো। আর অনিমা বেগম! হৃদয়ের কথা শুনে একমুহুর্তের জন্য চুপ করে গেলেন, তিনি ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন স্থির দৃষ্টিতে, যেন ওজন করছেন পরিস্থিতিটা। তিনি কিছুটা সময় নিয়ে অতঃপর চিন্তিত গলায় বললেন,,,,
__তোর মনি তরীকে আমাদের ভরসায় দিয়ে গেছে। বিশেষ করে তোর ভরসায় এখন যদি ও কোনো ভাবে অসুস্থ হয় তাহলে তোর মনি কি ভাববে?
অনিমা বেগমের এমন কথায় তরী এবং হৃদির মুখটা জ্বলজ্বল করে উঠেছে, কেননা হৃদয় তার মনিকে খুব ভালোবাসে। হৃদি এবং তরী এইটা ভেবে খুশি হয় যে অনিমা বেগম ঠিক জায়গায় ঢিল ছুড়েছে। তবে তাদের আশায় এক বালতি পানি ঢেলে এইবারও হৃদয়ের মধ্যে খুব একটা ভাবান্তর দেখা গেল না, সে আগের ন্যায় নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,,,,
__আম্মু তোমার এইসব নিয়ে চিন্তা করতে হবেনা। রাত হয়েছে তুমি তোমার রুমে যাও। আর হৃদি আম্মুর সাথে তুইও নিজের রুমে যা।
ছেলের এমন কথায় অনিমা বেগম অসন্তুষ্ট হলেন , উনি কিছু বলতে নিলেই হৃদয় এইবার গম্ভীর স্বরে বলে উঠে,,,
__আমি কি বললাম আম্মু?
ছেলের এই ভঙ্গিতে উনি আহত বোধ করলেন। অতঃপর একটা গভীর শ্বাস নিয়ে ধীরে বলে উঠলেন—
__চল হৃদি।
হৃদি অনিচ্ছাসত্ত্বেও একবার তরীর দিকে তাকাল। তরী ওদের দিকেই তাকিয়ে আছে, এতক্ষণের জ্বলজ্বল ভাবটা মিলিয়ে গেছে, আবারও চোখের কোণে অশ্রু জমেছে। কিন্তু মুখে কোনো শব্দ করার সাহস নেই। তারপর অনিমা বেগম এবং হৃদি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বেরিয়ে গেল হৃদয়ের রুম থেকে।
উনারা যেতেই আবারও ঘরের ভেতর সেই দমবন্ধ করা নীরবতা নেমে এল। তরী এখনও এক পা তুলে, কানে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে। পা ব্যথা করছে, নার্ভে টান পড়ছে খুব, কিন্তু মুখে কোনো শব্দ নেই। আর হৃদয়! সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, চোখে এক অদ্ভুত স্থিরতা।
প্রায় আধঘণ্টা ধরে তরী ঠিক সেই ভঙ্গিতেই দাঁড়িয়ে আছে। এক পায়ে ভর দিয়ে থাকা শরীরটা এখন আর কথা শুনছে না। পায়ের ভেতর যেন আগুন ধরে গেছে , অসহ্য যন্ত্রণা। তবু মুখ খুলে কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না । হৃদয়ের সামনে কিছু বললেই বিপদ। তাই চুপ থাকাই শ্রেয়।
হঠাৎই হৃদয় ধরাম শব্দে দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিল। তা দেখে তরীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল একমুহুর্তে। মাথার ভেতর একটাই ভাবনা চলছে ওর, হৃদয় আবার ওকে মারবে টারবে না তো?
কিন্তু না হৃদয় তখন ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে একটি অদ্ভুত প্রশ্ন করে বসলো —
__আমার বংশ নিয়ে তোর এত কী সমস্যা?
এমন কথায় তরী প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো। কথাটার মানে ও ঠিক বুঝতে পারছে না। চোখ দুটো পিটপিট করে তাকিয়ে আছে হৃদয়ের দিকে ভয়, ক্লান্তি আর বিভ্রান্তি মিলেমিশে একাকার । তরীর চোখের ঘন পলক বারবার ঝাপাটাচ্ছে, যা দৃষ্টি গোচর হয় হৃদয়ের। কেমন মায়াবী চোখ যেন সব রাজ্যের মায়া একাই এই চোখে রাজত্ব করছে। তবে হৃদয় নিজেকে প্রশ্রয় না দিয়ে আবারও গলা চড়িয়ে বলল—
__কী হল? কথা বলছিস না কেন? কথা কানে যায় না তোর , কানে শুনতে পাসনা? আমার সাথে বেয়াদবি করিস?
তরী সঙ্গে সঙ্গে মাথা নুইয়ে ফেলল। একদিকে পায়ে ব্যথা আর অন্যদিকে এই লোকটার ধমক দুটো মিলিয়ে যেন তার সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠছে বারম্বার। এই মুহূর্তে সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে।
হৃদয় হয়তো তরীর মনোভাব বুঝতে পেরেছে। সে এইবার ঠান্ডা কণ্ঠে বলল—
__এইদিকে আয়।
তরী একবার তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নিল। অতঃপর ভয় জড়ানো গলায় বলল—
__ আমি তো এখন কিছুই করিনি, দাভাই…
মুহূর্তেই হৃদয়ের শান্ত ভাব অশান্তি ঢেলে দিল এই মেয়ে। এইবার তার মুখের ভাব আগের চেয়েও কঠিন হয়ে উঠলো। সে দাঁতে দাঁত পিষে ফুঁসে
উঠল—
__থাপ্পর মেরে সব দাঁত ফেলে দেব বেয়াদব! আমি তোর কোন জন্মের ভাই লাগি? তুই কি আমার মায়ের পেটে জন্ম নিয়েছিস?
হৃদয়ের হঠাৎ এমন কথায় তরী ভড়কে গেল, পরপর দ্রুততার সাথে মাথা নেড়ে না বলল। বুকের ভেতরটা ওর ধুকপুক করছে। আবার হঠাৎ কেন হৃদয় এত রেগে গেছে তরী বুঝতে পারছে না।
তখনই হৃদয় আগের থেকেও ধারালো স্বরে বলল,,,
__ইউজ ইউর ওয়ার্ডস নয়ন।
শব্দটা শোনামাত্র তরী ভয়ে চোখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলল। যখনই এই লোক ওকে নয়ন বলে ডাকে তারপরই ওর গালে এই লোকের শক্ত হাতের থাবা বসে।
কিন্তু এইবার তেমনটা হয়নি, শুধু তরীর কানে এসে বারী খেল হৃদয়ের কঠিন স্বর ।
__আর একদিন যদি আমাকে দাভাই বা ভাই টাইপ কিছু বলে ডেকেছিস, সেদিন তোর হাত-পা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেব আমি। আই রিপিট তোকে জানে মেরে ফেলবো। এখন চুপচাপ আমার সামনে এসে দাঁড়াবি।
এমন হুমকি শোনার পর আর কিছু বলার সাহস তরীর ছিল না।ও দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল, হৃদয়ের কাছাকাছি এসে দাঁড়াতেই হৃদয় আবার বলল—
__চুপচাপ খাটে উঠে বস। আর পা টানটান করে বসবি।
তরী বাধ্য মেয়ের মতো সেটাই করল। বিছানায় উঠে বসতেই হৃদয় তার পায়ে হাত দিল। তরী একবার চমকে তাকাল।
হৃদয় নির্বিকার কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—
__পা ব্যথা করছে?
মুহুর্তেই তরীর মনে পড়লো ওর পায়ে ব্যথার কথা, হৃদয় জিজ্ঞেস করায় ব্যথাটা যেন দিগুন থেকে চারগুণ বেড়ে গেল। অতঃপর ও খুব নিচু গলায় জবাব দিল— হুম…
হৃদয় উঠে দাঁড়াল। ড্রয়ার খুলে একটা ছোট তেলের বোতল বের করে নেয়। সম্ভবত কোনো আয়ুর্বেদিক তেল। তারপর কোনো সতর্কতা ছাড়াই তরীর স্কার্টটা হাঁটুর অনেকটা উপরে তুলে ফেলল। যার দরুন তরীর হলুদ ফর্সা পা দুটো ভেসে উঠলো চোখের সামনে, তবে সেই সবে হৃদয়ের নজর নেই । কিন্তু তরী লজ্জায় পা সরাতে নিলেই। হৃদয়ের শক্ত হাত ওর দুই পা চেপে ধরল।
__বাঁদরের মতো নড়াচড়া করবি না।
জবাবে তরী দ্রুত বলে উঠল—
__আপনি পায়ে হাত দিচ্ছেন কেন? আমাকে দিন ওষুধটা, আমি নিজেই লাগিয়ে নেব।
হৃদয়ের চোখ ঠান্ডা। গলা নামিয়ে, স্পষ্ট আদেশের সুরে বলল—
__যতক্ষণ না কথা বলতে বলা হবে তোকে, ততক্ষণ মুখ বন্ধ রাখবি।
ব্যস তরীর মুখ বন্ধ। ঘরের ভেতর আবারও নেমে এল সেই দমবন্ধ করা নীরবতা।
তরী লজ্জায় হাঁসফাঁস করছে কিন্তু সেসবে হৃদয়ের কোনো ভাবান্তর নেই। সে একহাতে যত্ন করে তরীর পায়ে ডাইরেকশন অনুযায়ী ম্যাসাজ করছে।
চলবে।
❌❌কপি করা নিষিদ্ধ ❌❌
গল্পের নায়িকা তরীই। গল্পের নামের সঙ্গে মিলিয়েই নায়িকার নাম, সেটা আগামী পর্বে জানতে পারবেন।
Share On:
TAGS: নয়নার এমপি সাহেব, সঞ্জনা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE