born_to_be_villains
methuburi_মিথুবুড়ি
পর্ব_২০
❌কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ❌ কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ❌
‘ইমামা ছলছলে নয়নে তাকিয়ে থাকে বাবার দিকে। ওর ভেজা চোখে অবিশ্বাস। ইমান ওয়াসিম অপরাধীর ন্যায় মুখ ফিরিয়ে নেয় মেয়ের থেকে। একফোঁটা যন্ত্রণামাখা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল ইমামার চোখ থেকে। ইমামা বাবার দিকে এগিয়ে গেল। কাঁপা কাঁপা হাতে আগলে ধরল বাবার রোগাক্রান্ত চোয়াল। ওর কণ্ঠ কাঁপছে, ঠোঁট ভেঙে আসছে,”বাবা, আমি কি সত্যিই তোমার মেয়ে না?”
‘ইমান ওয়াসিম চোখ থেকে পাওয়ার গ্লাস খুলে প্রলম্বিত শ্বাস ফেললেন। বিস্ময়ে হতভম্ব বনে দাঁড়িয়ে থাকা ইমনের দিকে তাকিয়ে বললেন,”তোমার মাকে নিয়ে আসো, ইমন৷”
‘ইমন তৎক্ষনাৎ ছুটে গিয়ে মিসেস নীহারিকাকে নিয়ে আসল। আড়ালে প্রকৃতির মতো প্রফুল্ল ইমামাকে দেখে খুশি হলেও সামনে আসতেই তাকে দেখামাত্র মিসেস নীহারিকার চোখেমুখে বিরক্তির আভা ফুটে উঠে। ইমান ওয়াসিম ক্লান্তচিত্তে রকিং চেয়ারে বসলেন। স্ত্রীর উদ্দেশ্য বললেন,
“বহুবার বলতে চেয়েছি, বোঝাতে চেয়েছি। শোননি, বিশ্বাস করোনি। আজ আবার বলছি। সবটা বলছি। আশা করি আজকের নিরেট সত্যগুলো বিশ্বাস করবে। আমি হয়তো আজ পারবো তোমার সমস্ত ভুল ধারণা ভেঙে দিতে। তোমাকে আজকে আমার কথা বিশ্বাস করতে হবে নীহারিকা।”
‘বিরতি নিয়ে ইমান ওয়াসিম ঘাড় ঘুরিয়ে স্ত্রীর সংকুচিত মুখপানে তাকাল। চোখের ভাষায় বললেন,”কারণ, আজকের পরিস্থিতিটা ভিন্ন।”
‘এবার মেয়ের দিকে তাকালেন ইমান ওয়াসিম। চোখে ইশারা করলেন টেস্ট রিপোর্টটি মায়ের হাতে দেওয়ার জন্য। ইমামা যেন বিষন্নপুরের শীতল হাওয়ায় জমে স্তব্ধ হয়ে গেছে৷ সে কলের পুতুলের মতো রিপোর্টটি মায়ের হাতে দেয়। রিপোর্টের দিকে তাকানো মাত্র জ্বলসে উঠল মিসেস নীহারিকার চোখ। তিনি বিস্ফোরিত চোখে একবার স্বামীর দিকে তাকান, আবার ইমামার দিকে তাকান৷ ইমামা নিঃশব্দে কাঁদছে। চেপে রাখা কান্নার তোড়ে একটু পরপর কেঁপে উঠছে নাজুক শরীর৷
‘ইমান ওয়াসিম ফিরে গেলেন সেই বিভীষিকাময় অতীতে। ফিরে গেলেন আড়াই দশক আগের অন্ধকারে ঢাকা সময়টায়….
‘নভগোরোদ একসময় রাশিয়ার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এক স্বাধীন ও সমৃদ্ধ রাজ্য ছিল। অন্য রাজ্যগুলোর মতো এটি কেবল রাজার ইচ্ছায় শাসিত হতো না। এখানে ছিল ‘ভেচে’ নামে এক জনসমাবেশ। যেখানে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত শাসনব্যবস্থায় মত প্রকাশের অধিকার রাখত। রাজা থাকলেও তাঁর ক্ষমতা ছিল সীমিত। বাণিজ্য, জ্ঞান ও ধর্মের সম্মিলনে নভগোরোদ গড়ে উঠেছিল এক ভিন্নতর সভ্যতা। এই রাজ্যের একমাত্র রাজা ছিলেন ইভান তৃতীয়। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া রাজত্বে তিনি অভিষিক্ত হন। পারিবারিকভাবে ইভান তৃতীয় বিয়ে করেন এলিসাকে। তাদের দাম্পত্য জীবন সুখে ভেসে চলছিল। বিয়ের দুই বছরের মাথায় এলিসার কোল আলো করে আসে দুইটি জমজ কন্যা। রাজ্য, পরিবার আর স্বাধীনতার আবহে দিন কাটছিল ইভান তৃতীয়ের৷
‘কিন্তু এই স্বাধীনতাই একসময় তার দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে পশ্চিমে লিথুয়ানিয়া ও পোল্যান্ডের ক্রমাগত চাপ, অন্যদিকে পূর্বে ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে ওঠা মস্কোভি রাজ্য। নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নভগোরোদের অভিজাত শ্রেণি লিথুয়ানিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে চায়। মস্কো এটাকে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখে। যাকে কেন্দ্র করে ১৪৬২ (১৯৯২) সালে প্রথম বড় সংঘর্ষ ঘটে। মস্কোর যুবরাজ ইভান তৃতীয় নভগোরোদকে পরাজিত করলেও তখনই পুরো রাজ্য দখল করেননি। কিন্তু নভগোরোদের রাজা ইভান তৃতীয় পুনরায় মস্কোর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। এবার আর কোনো ছাড় দেওয়া হয়নি। ১৪৭৮ (২০০২) সালে ইভান তৃতীয় বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে চূড়ান্ত আঘাত হানেন। আর এই যুদ্ধে পরাজিত হয় নভগোরোদ। ‘ভেচের ঘণ্টা’ যা ছিল স্বাধীনতার প্রতীক, তা খুলে নিয়ে যাওয়া হয়। রাজপরিবার ও অভিজাতদের অনেককে নির্বাসনে পাঠানো হয়, অনেককে হত্যা করা হয়। এভাবেই অবসান ঘটে এক স্বাধীন রাজ্যের। সেই রাতে ইভান তৃতীয় শুধু তার রাজ্যই হারাননি, হারিয়েছিলেন তার পরিবারও।
‘ইমান ওয়াসিম তখনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। পারিবারিক ব্যবসার প্রয়োজনে তাকে নিয়মিতই বিভিন্ন দেশে যেতে হতো। সেই ব্যবসায়িক কাজেই পরপর কয়েকবার রাশিয়া যাওয়া হয় তার। এভাবেই একসময় বরফে মোড়া সেই দেশের প্রতি এক অদ্ভুত টান জন্ম নেয়। না। শুধু দেশের প্রতি নয়, এক বার ডান্সারের প্রতি প্রচন্ড টান অনুভব করেন। যার আকর্ষণেই বারবার রাশিয়ায় ছুটে যেতেন ইমান ওয়াসিম।
‘তখন তার সংসার পাঁচ বছরের মিসেস নীহারিকার সঙ্গে। কিন্তু বিয়ের এত বছর পরেও সন্তান না হওয়ায় দাম্পত্য জীবনে ধীরে ধীরে দূরত্ব তৈরি হচ্ছিল। তার উপর ইমান ওয়াসিমের ঘনঘন রাশিয়া যাওয়া মিসেস নীহারিকার মনে সন্দেহের বীজ বপন করে।
‘একদিন সেই বার ডান্সারকে নিয়ে ইমান ওয়াসিম ঘুরতে গিয়েছিলেন নভগোরোদ প্রদেশের এক ক্যামোমাইল ফুলের বাগানে—রাশিয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত ও প্রতীকী ফুলের বাগান। দুর্ভাগ্যবশত ঠিক সেই দিনই ঘটে যায় ইতিহাসের সেই ভয়াবহ ঘটনা। ইভান তৃতীয় যখন বুঝতে পারেন এই যুদ্ধের ফল আর পাল্টানোর নয়, পরাজয় নিশ্চিত, তখন তিনি যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে প্রাসাদের পেছনের গোপন ফটক দিয়ে স্ত্রী এলিসা ও সন্তানদের নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু সৈন্যদের চোখ এড়ানো যায়নি। তারা পিছু নেয়। দৌড়াতে দৌড়াতে একসময় স্বামী-স্ত্রী আলাদা হয়ে যায়।
‘ইভান তৃতীয়র কোলে তখন মাত্র দুই মাসের ছোট্ট এলিজাবেথ। সন্তানকে বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টায় ছুটতে থাকা পিতার সামনে সেদিন পড়ে যান ইমান ওয়াসিম। এক মুহূর্তের জন্য পিছনে তাকান ইভান তৃতীয়। ভীতিকর চোখে ভাসছিল শত্রুদের তেড়ে আসা। তিনি জানতেন তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। সেই রাতে নিজের মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও ইভান তৃতীয় নিশ্চিত করে গিয়েছিলেন তার কন্যার জীবন। কাঁপতে থাকা হাতে ইমান ওয়াসিমের কোলে তুলে দেন ছোট্ট এলিজাবেথ। বিদায়ের আগে শুধু একটি বাক্যই উচ্চারণ করেছিলেন তিনি,
“পালাও… পালাও। ওরা আসছে। গ্র্যান্ড ডাচেস এলিজাবেথকে বাঁচতেই হবে। পালাও দূরে। আমার এলিজাবেথ অন্ধকারে ভয় পায়।”
‘ইমান ওয়াসিম সম্পূর্ণ হতভম্ব হয়ে পড়েছিলেন। চারপাশে আগুন, রক্ত আর খুনোখুনির বিভীষিকা দেখে তিনি পাথরের মতো জমে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই বার ডান্সার ছিল অত্যন্ত সাহসী আর ধূর্ত। ঠিক সেই মুহূর্তে সেই বার ডান্সার তার তৎপরতা দেখায়। পরিস্থিতি বুঝে সে দ্রুত ইমান ওয়াসিমকে টেনে নিয়ে যায় কাছের একটি জোপঝাড়ের আড়ালে। জোপের আড়াল থেকে ভয়ার্ত চোখে তারা দেখেছিল ইভান তৃতীয় কীভাবে উন্মাদের মতো ছুটছে স্ত্রী সন্তানের খোঁজে। কীভাবে এক অসহায় স্বামী এবং পিতা জঙ্গলের ভেতরের দিকে ছুটে যায়। ছুটে যায় ঠিক সেই দিকেই, যেদিকে একটু আগেই ছুটে গিয়েছিল তার স্ত্রী ও সন্তান। কিন্তু পরমুহূর্তেই সৈন্যরা সেই পথ ধরেই জঙ্গলের দিকে ধেয়ে যায়। এরপরই জঙ্গলের গভীরতা চিরে ভেসে আসে একের পর এক গুলির শব্দ। কিছুক্ষণ পর নিশ্চিত হয় সবকিছু। প্রত্যেকের মৃত্যু নিশ্চিত করার পরই সৈন্যরা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসে।
‘সে রাতেই ইমান ওয়াসিম ছোট্ট এলিজাবেথকে নিয়ে পালিয়ে যান সোজা সেন্ট পিটার্সবার্গে। সারা রাত ঘুমাতে পারেননি তিনি। বুকে আগলে ধরে বারবার তাকিয়ে ছিলেন ছোট্ট নিষ্পাপ মুখটার দিকে। কী অদ্ভুত শান্তি আর কী ভয়ংকর নিষ্ঠুরতা যে ছিল সে রাতে! নিস্পৃহ চোখে তাকিয়ে ছিলেন ঘুমন্ত এলিজাবেথের মুখের দিকে। কতটা নিষ্পাপ সেই মোমঢালা লালিত মুখখানা। অথচ এক রাতের ব্যবধানেই এই নিষ্পাপ শিশুটি হারিয়েছে পুরো পরিবার। ফুলের মতো পবিত্র সেই মুখের দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠছিল বারবার।
‘একটা সন্তানের শখ বহুদিনের ছিল ইমান ওয়াসিমের। সেই রাত তার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ রাত হয়ে দাঁড়ায়। মায়া, ভয় আর দোটানার ভেতর ছটফট করতে করতে কেটে যায় সময়। যদি শিশুটির কিছু হয়ে যায় এই ভয় তাকে এক মুহূর্তও শান্ত হতে দেয়নি। এলিজাবেথকে বুকে নিয়ে হোটেল রুমে ভেতর পায়চারি করেছেন, সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগেছেন, মাথার ভেতর চিন্তা জমে ফেটে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। কী করবেন এই দুধের শিশুটিকে! কোনো পথই পরিষ্কার লাগছিল না।
‘অনেক ভেবে সকালে তিনি সিদ্ধান্ত নেন শিশুটিকে চ্যারিটিতে দিয়ে দেবেন। কিন্তু বেরোনোর প্রস্তুতির মুহূর্তে হঠাৎই ছোট্ট এলিজাবেথ তার কচি হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ইমান ওয়াসিমের শার্টের অংশ। আর সেই মুহূর্তেই সব সিদ্ধান্ত ভেঙে পড়ে। সেদিনের সেই নিষ্পাপ মুখটার মায়া থেকে নিজেকে আর আলাদা করতে পারেননি তিনি। সেদিনই স্থির করেন এই শিশুটি তার প্রথম সন্তান হবে। কোনো দিন, কোনো পরিস্থিতিতেই তাকে নিজের থেকে আলাদা করবেন না।
‘কিন্তু রাশিয়ার আইন ছিল অত্যন্ত কড়াকড়ি। তাছাড়া সন্তান না হওয়াকে কেন্দ্র করে তার স্ত্রীর মধ্যেও আগে থেকেই এক ধরনের অনীহা জন্মেছিল। সব দিক বিবেচনা করে অবশেষে তিনি কঠিন এক সিদ্ধান্ত নেন, সেই রাশিয়ান বার ডান্সারকে বিয়ে করবেন। তারপর আইনগতভাবে এলিজাবেথকে দত্তক নেবেন। যেহেতু নারীটি রাশিয়ান নাগরিক ছিল, তাই প্রক্রিয়ায় তেমন কোনো জটিলতা হয়নি। ভাবা অনুযায়ীই সব এগোয়। এলিজাবেথ হয়ে ওঠে ইমামা। নভগোরোদের রাজকন্যা থেকে সে হয়ে যায় ইমান ওয়াসিমের মেয়ে। নিজের দেশের সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে ছোট্ট ইমামাকে নিয়ে রাশিয়ায় শুরু করেন এক নতুন ছোট্ট কিন্তু সুন্দর জীবন।
‘কিন্তু সেই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। বিয়ের মাত্র নয় মাসের মাথায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় বার ডান্সারটি মারা যায়। আবারও শূন্যতায় পড়ে যান ইমান ওয়াসিম। একা হাতে দুধের শিশুকে লালন-পালন করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। বাধ্য হয়েই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেন বাংলাদেশে ফিরে আসার।
‘সব পরিস্থিতির ঝড় সামলে সে আবার দেশে ফিরতে পেরেছিল ঠিকই, কিন্তু নিজের পরিবারকে আর সামলাতে পারেনি। পারেনি সত্যটাকে বিশ্বাস করাতে, বোঝাতে। অবিশ্বাস আর দ্বন্দ্বের ভারে সময় গড়িয়ে যেতে থাকে নির্দয়ভাবে। নারী মন বড় কোমল; স্বামীর একটুকরো ছোঁয়াতেই গলে যায়। স্বামীর সঙ্গে নতুন করে সংসার শুরু করলেও ইমামাকে মেনে নিতে পারেনি সে। তার চোখে ইমামা ছিল বিষ, অবৈধ, অগ্রহণযোগ্য। সেই বিষাক্ত দৃষ্টিতেই ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে ওঠে ইমামার জীবন। মায়ের তুচ্ছতাচ্ছিল্য, অবহেলা আর কটু বাক্য ছিন্নভিন্ন করে দিত তার কোমল হৃদয়। একটু যত্নের আশায়, নরম হাতের একটুখানি ছোঁয়ার জন্য সে ছটফট করত। কিন্তু কিছুই পেত না। কখনোই না। দাদা-দাদী একসময় তাকে মেনে নিলেও মিসেস নীহারিকা কোনোদিনই পারেনি৷
‘আর তারপর নভগোরোদের প্রদেশের রাজকন্যা হয়েও ওয়াসিম মঞ্জিলের সবচেয়ে অবহেলিত, সবচেয়ে নীরব এক বস্তুতে পরিণত হলো সে। একদিন রাজা নিজ হাতে তার রাজকন্যা এলিজাবেথকে তুলে দিয়েছিল ইমান ওয়াসিমের কাছে। গলার স্বর ভাঙা ছিল রাজার, তবুও কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে শেষসময় বলেছিল,”আমার মেয়েটা অন্ধকারে ভয় পায়।”
‘ভয় পাওয়াটাই ছিল তার অপরাধ। কারণ ‘মা’ নামের বিষাক্ত এক নারী স্বামীর অনুপস্থিতিতে দিনের পর দিন তাকে অন্ধকার ঘরে বন্দী করে রাখত। খেতে দিত না, গোসল করাত না। রাজপরিবারে জন্ম নেওয়া সেই রাজকন্যাও দিনের পর দিন না খেয়ে থেকেছে।
তার পাপ একটাই সে এতিম ছিল। আর একজন মিথ্যে পরিচয়ে তাকে বুকে টেনে নিয়েছিল। ইমামার দাদী মারা যান, যখন সে মাত্র আড়াই বছরের। সেই বয়সেই শিখে নেয় নিজ হাতে খাওয়ার কৌশল। কারণ যে বাবা একসময় পরিবার ত্যাগ করেও তাকে আঁকড়ে ধরেছিল, সেই বাবাই একদিন রাজনীতির জালে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে। এরপর থেকে বাবা আর রাতে ফিরে এসে খোঁজ নেয়নি তার ছোট্ট পরি খেয়েছে কিনা। বাবাও খোঁজ নেয়নি, অভিমানী ইমামারও আর খাওয়া হয়নি।
‘বাবা আর ঘুরতে নিয়ে যায়নি, ইমামারও আর ঘোরা হয়নি। পাহাড়ি কলকলা নদীর মতো চঞ্চল শিশুটি ধীরে ধীরে নিজেকেই ঘরবন্দী করে ফেলল। তার ভেতরে জমতে থাকল এক আকাশ সমান কষ্ট। কিন্তু সেই কষ্ট প্রকাশ করার মতো কেউ ছিল না। কারোর বিশ্বস্ত কাঁধ ছিল না মাথা রেখে কান্না করার জন্য। জায়গা বলতে ছিল ঘরের অন্ধকারাচ্ছন্ন এক কোণ। ছোট্ট ইমামা যে কত কেঁদেছে তার কোনো হিসাব নেই। কিন্তু চোখের পানি মুছে দেওয়ার মতো একটি হাতও ছিল না। কেউ তার হোমওয়ার্ক দেখতে চায়নি। কেউ বলেনি “ভালো করেছিস।” কেউ বলেনি “তোর মুখটা আজ শুকনো লাগছে কেন, সকালে খাসনি?” কেউ বলেনি, জানতে চায়নি।তবুও ইমামা থেমে থাকেনি। শরীর ভেঙে পড়লেও, মনটাকে সে গড়ে তুলেছিল পাথরের মতো শক্ত করে। নীরবে, একা। এইভাবেই তার অনিন্দ্য সুন্দর মুখে স্থায়ী হয়ে বসে বিষণ্নতার ছায়া। আর সেই বিষণ্নতা থেকেই বন্ধুমহলে তার নাম হয়ে ওঠে বিষণ্নসুন্দরী। সুন্দর তো ছিলই সে, কিন্তু সেই সৌন্দর্যের প্রতিটা রেখায় লুকিয়ে ছিল অবহেলার ক্ষত, না-পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস, আর নিঃশব্দে বড় হয়ে ওঠা এক শিশুর কান্না।
‘অতীতের স্মৃতির ভাঙা দরজাগুলো খুলতেই ইমান ওয়াসিমের চোখ ভিজে ওঠে। বুকের ভেতর জমে থাকা গ্লানির হাহাকার আজ আর চেপে রাখা যায় না। তীব্রভাবে শ্বাসরোধ করে ধরে। সত্যিই তো, সে পারেনি। ইভান তৃতীয়র রাজকন্যার মতো করে সে পারেনি এলিজাবেথকে আগলে রাখতে। যার স্থান ছিল রাজসিংহাসনের আলোয়, তার ভাগ্যে জুটেছিল ঘৃণা আর অবহেলা। যে ভালোবাসা নিয়ে সে শিশুটাকে রাশিয়া থেকে বাংলাদেশে এনে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে নিয়ে এসেছিল, সেই ভালোবাসা দিয়ে তো পারেনি তাকে সারাজীবন মুড়িয়ে রাখতে। তার চোখের সামনেই এক টুকরো সতেজ প্রাণ ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল। সে দেখেছে, তবু কিছুই করতে পারেনি।
সে জানত সবটা, তবু থামাতে পারেনি। সে পারেনি ফুলের ভেতর লুকিয়ে থাকা প্রফুল্লতাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে। রাণী এলিজাবেথ হিসেবেই তো সে ঠিক ছিল। কেন সে তাকে ইমামাতে রূপান্তর করতে গেল। আর গেলই যখন, তখন কেন পারল না ভালো রাখতে! এরচেয়ে ভালো ছিল চ্যারিটিতে দিয়ে দেওয়া। অন্তত কোনো ভালো পরিবারের হাতে গিয়ে পড়ত মেয়েটা। বাংলাদেশের মতো এমন এক জাজমেন্টাল দেশে তাকে বড় হতে হতো না। যেখানে গায়ের রং একটু বেশি উজ্জ্বল বা একটু মলিন হলেই মানুষ জিহ্বা বিষ ঢালতে ছাড়ে না।
‘তার মেয়ের গায়ের রং, চুলের রং, ভিন্ন আদল সবকিছু নিয়ে ছোট থেকেই কত কথা শুনেছে তার ছোট্ট পরিটা।
গাল ফুলিয়ে কতবার নালিশ করত বাবার কাছে।
তার অপরাধ ছিল একটাই সে অসম্ভব সুন্দর ছিল। আর সব বাচ্চার থেকে উজ্জ্বল ছিল তার গায়ের রং। গোধুলির স্নিগ্ধতা ছড়াতো তার কেশরাশী, যার জন্য কেউ তার সাথে খেলা করতো না। মিশতো না। এই সৌন্দর্যের জন্যই কত কটুবাক্য, কত অপমান, কত অশ্রু। অথচ, এই সমাজে যার রূপ নেই, তার মূল্য নেই।
‘মানুষের কথায় কথায় কত রাত কেঁদে বালিশ ভিজিয়েছে ছোট্টো পরিটা। চোখমুখ ফুলিয়ে কান্না করতে-করতে।এখন তার ছোট্টো পরিটা বড় হয়েছে। এখন আর কারোর কথায় কান্না করে না। গাল ফুলিয়ে বাবার কাছে নালিশ নিয়ে আসে না। কারণ,,, ছোট্টো পরি এখন অভিমানে দূরে সরে গেছে। আর আগের মতো নালিশ আসে না। কাছে আসে ন। বায়না ধরে না। বাবার কাছে এতো আসে না। আসবেই বা কীভাবে সে পথ তো আর সে রাখেনি। মেয়ের সৌন্দর্য আর সম্মান বাঁচাতে সে শয়ে শয়ে গার্ড দাঁড় করিয়েছিল, কিন্তু পারল কি কটু কথা থেকে তাকে রক্ষা করতে? পারল কি বাবা না হয়ে মেয়ের বন্ধু হতে? না। পারেনি ইমান ওয়াসিম।
‘ইমান ওয়াসিম চোখ মুছে ইমামার দিকে তাকালেন। ভেবেছিলেন, হয়তো ইমামার দৃষ্টিতে ঘৃণার আগুন দেখবেন অতীত লুকোনোর অপরাধে, শৈশব ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগে। কিন্তু না। ইমামা তাকিয়ে ছিল একদৃষ্টিতে মায়ের দিকে। মিসেস নীহারিকার চোখ তখন মেঝেতে নিবদ্ধ। টপটপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। প্রতিটি ফোঁটার ভেতর জমে আছে একেকটা অনুচ্চারিত অপরাধবোধ। মনে পড়ে যাচ্ছে তারই বলা সেই কথাগুলো,
“যদি কোনোদিন এটা প্রমাণ হয়, সেদিন স্বইচ্ছায় তোমাকে কাছে টেনে নেব আমি। তুমি আমাকে মা বলে না ডাকলেও, মেয়ের মতো বুকে জড়িয়ে ধরতে চাইবো। ছোটবেলা থেকে যে ভালোবাসাগুলো চেয়ে এসেছ, সবটা তোমাকে দেব।”
‘আজ তো সব প্রমাণিত। ইমামা তাদের কেউ নয়। তাদের রক্ত নয়। কারোর পরকীয়ার ফলও নয়। সে রাজপরিবারের মেয়ে। একজন রাজকন্যা সে। এতদিনের অবহেলা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য কোনোটাই তার প্রাপ্য ছিল না। হঠাৎ মিসেস নীহারিকা জোরে ফুপিয়ে উঠলেন। গ্লানির পীড়া বোধহয় এমনই হয়।
‘ইমামা মায়ের দিকে এগোচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে ইমন ছুটে এসে মাঝপথেই বোনকে জাপ্টে ধরল। ফুপিয়ে উঠল তার কণ্ঠ,
“এ-সব মিথ্যে। সব মিথ্যে। আমি এসব কিছুই বিশ্বাস করি না। তুই শুধু আমার ইমায় আপু। আমার বোন। এর বাইরে তোর আর কোনো পরিচয় নেই। চল, আমরা আজই এই বাড়ি ছেড়ে যাবো। আর থাকবো না এখানে। আমি অনেক পরিশ্রম করবো আপু। সারাদিন কাজ করবো, তোকে ভালো রাখার জন্য। তোর ছোট ভাই এখন বড় হয়েছে ইমায়। তোকে আর কষ্ট পেতে দেবো না আমি।”
‘সত্যিই তো তার ছোট ভাইটা এখন বড় হয়েছে। সেই বড় হয়ে ওঠার সাথেই যেন ইমামার কষ্টের ভার কিছুটা হালকা হয়েছে। ছোট্ট ভাই এখন প্রতিবাদী। মায়ের কটুবাক্যের তীর তার দিকে ছুটে আসার আগেই ভাই এসে দাঁড়ায় ঢাল হয়ে। যে ভাইকে একদিন খাইয়ে দিতে হতো, আজ আর তাকে খাওয়াতে হয় না। বরং ভাই-ই তাকে খাইয়ে দেয়। জ্বর হলে সারারাত মাথার পাশে বসে থাকে। কপালে জ্বরপট্টি দেয়। নিঃশব্দ যত্নে আগলে রাখে। ইমামা ভাইকে সোজা করে দাঁড় করাল। তারপর ওর কপালে শক্ত করে একটা চুমু খেল। বোনের চোখের অশ্রুতে ভিজে গেল ভাইয়ের কপাল। ইমন কান্না থামাতে চাইলেও ঠোঁট ভেঙে এলো তার। কান্নার শব্দ বেরিয়ে আসতে চাইল। ইমামা পরম স্নেহে আবারও ভাইয়ের কপালে চুমু খেল, নিজের হাতে মুছে দিল ওর চোখের পানি। কান্নাভেজা কণ্ঠে দৃঢ়তা এনে বলল,
“একদিন কী বলেছিলাম, মনে আছে? পৃথিবীর সবকিছুর ঊর্ধ্বে আমরা ভাইবোন। এর চেয়ে বড় সত্য আর নেই। হতে পারে না। তুই আমার মিষ্টি ভাই।”
‘ইমামা তাকাল বাবার দিকে। মেয়ের দৃষ্টিতে ঠিক কী ছিল তা পড়তে পারলেন না ইমান ওয়াসিম। শুধু অনুভব করলেন বুকের ভেতর কোথাও যেন হাড়ভাঙা ব্যথা জমে উঠছে। ব্যথাক্লিষ্ট কণ্ঠে মেয়েকে ডাকলেন,
“ইমামা…
“এলিজাবেথ,” কণ্ঠে কোনো দ্বিধা নেই, “আমি এলিজাবেথ। এটাই আমার সত্যিকারের পরিচয়।”
‘ইমান ওয়াসিম শক্ত করে নিজের বুক চেপে ধরলেন। তার চোখ বুঁজে এল। এই নিরেট সত্যিটাই কি তবে তাকে চিরতরে মেয়ের কাছ থেকে আলাদা করে দেবে? ইমামা নয় আজ থেকে কি সে শুধুই এলিজাবেথ? হ্যাঁ, তাই। আর কতদিনই বা মিথ্যের পরিচয় বয়ে বেড়ানো যায়?
‘এলিজাবেথ এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল মায়ের সামনে। যে মেয়ের উপস্থিতি এতদিন গায়ে কাঁটা দিত, আজ সেই উপস্থিতিই বুকে ব্যথা হয়ে বিঁধছে। এলিজাবেথ গভীর করে শ্বাস নিল। খাদে ভাঙা কণ্ঠে বলল,
“এই কারণেই কি এতদিন আমায় আদর করোনি, মা? এজন্যই কি এত অবহেলা ছিল? তোমরা চাইলে তো একসাথে বসে সব খোলাখুলি বলতে পারতে। চাইলে একটা সমাধানেও যেতে পারতে। খুব সমস্যা হলে আলাদা হয়ে যেতে পারতে। কিন্তু শুধু শুধু আমার শৈশবটা কেন ধ্বংস করলে? কেন গড়ার বয়সে ভেঙে দিলে আমায়, মা? আমি তো তখন ছোট্ট একটা বাচ্চা ছিলাম। একটা বাচ্চার উপর এতটা অবহেলা জায়েজ ছিল?”
‘শেষের বাক্যে এলিজাবেথের শরীর ঝাঁকিয়ে কেঁপে উঠল। কথাগুলোর ভার আর বহন করতে পারল না সে। মিসেস নীহারিকা ছলছল চোখে তাকিয়ে রইলেন মেয়ের দিকে। তাকে দেখে মনে হলো তার ভিতরের কোথাও কিছু একটা চূর্ণ হয়ে ভেঙে পড়েছে। এই প্রথম তিনি হাত বাড়ালেন। মেয়েকে ছুঁতে চাইলেন। কিন্তু এলিজাবেথ হতে দিল না।মায়ের হাত সরিয়ে দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে গেল নিজের ঘরের দিকে। দরজার ওপাশে গিয়ে সে ভেঙে পড়ল। কিন্তু তার ভাঙন তার এই অসহ্য দুর্বলতা আর কারোর সামনে দেখাতে সে রাজি নয়।
‘মানুষ একা থাকতে পারে, কিন্তু ভালো থাকতে পারে না। প্রত্যেক মানুষেরই কাঁদার জন্য একটি বিশ্বস্ত কাঁধ দরকার। ইমামার সেই কাঁধটি বোধহয় সেই অজ্ঞাত মানুষটিই৷। চাদরের আড়ালে থাকা এক অস্তিত্ব, যাকে সে দেখেনি, তবু অজান্তেই ভালোবেসে ফেলেছে। যার কথায় সে আকৃষ্ট হয়েছে। যার যত্নে আর শাসনে সে নিজেকে নিরাপদ মনে করেছে। নয়তো জীবনের এত বড় সত্য জানার মুহূর্তে, সবার আগে তাকেই বা কেন মনে পড়বে? ইমামা অস্ফুট নিশ্বাসে হাতড়াতে হাতড়াতে ফোনটা খুঁজে নেয়। সমস্ত মান-অভিমানের প্রাচীর ভেঙে দ্বিধা ছাড়াই সে কল করে তাকে।
‘ওদিকে বিপরীত প্রান্তে চলছিল নির্মম উল্লাস। কাচে মোড়া সেউ ঘরটি দূর থেকে দেখা যায়। বাইরে ভেসে আসে ঝরর্নার শব্দ। । অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরের ভেতর একটি চেয়ারে একজনকে শক্ত করে বাঁধা। সে আর কেউ নয়, সেই ছেলেটি, যে একদিন ভার্সিটিতে ইমামার বুকে হাত দিয়েছিল। তার সেই হাতটি রাখা টেবিলের ওপর। টেবিলের অপরপ্রান্তে বসে আছে এক বি-ধ্বংসী মানুষ। তার নীল চোখের তারায় জমে আছে কেবল নৃ-শং-সতা। অদ্ভুত ধৈর্যে সে কাজ শুরু করে। সে শুরুতেই চিমটি দিয়ে ছেলেটির প্রতিটি আঙুল থেকে নখ তুলে নেয়। তারপর কা-টা-রি দিয়ে গাজর কা-টা-র মতো মাং-স ছাড়িয়ে নেয়। এমনভাবে একটা সময় হাড্ডি বেরিয়ে যায়। শূন্যে শুধু ভেসে থাকে পাঁচটি হা-ড়। হাড়ের গায়ে কিছু কিছু মাং–স লেগে আছে তখনও। প্রতিটি মুহূর্তই যেন আগে থেকে পরিকল্পিত, মেপে নেওয়া। ছেলেটির আর্তচিৎকারে ঘর কেঁপে ওঠে, শরীর কাঁপে। কিন্তু সম্মুখের মানুষটির মুখে কোনো রেখাপাত নেই।
‘সময় গড়ায়, য-ন্ত্রণা বাড়ে। টেবিলের পাশে ধোঁয়া ওঠা একটি শিশি রাখা। সে সেখান থেকে তরল ছেলেটার হাড্ডির উপর ঢালতেই বাতাসে ঝাঁঝালো গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। হাড্ডি মোমের মতো গলে গলে পড়ে। চেয়ারে বাঁধা দেহটি নরকযন্ত্রণায় ছটফট করে ওঠে। অথচ তখনও সামনে বসে থাকা মানুষটির চিবুকে পাহাড়সম গম্ভীরতা। চোখেমুখে কঠিন ভাব। সে ছেলেটির আরেকটি আঙুলের দিকে হাত বাড়াতেই টেবিলের এক কোণে রাখা ফোনটি হঠাৎ শব্দ করে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল ইমামার নাম্বার। মুহূর্তেই তার অভিব্যক্তিতে সামান্য এক ফাটল ধরা পড়ল। গম্ভীরতার দেয়াল সরে গিয়ে অজানা এক অস্থিরতা উঁকি দিল।
‘তার দু’হাত ছিল র-ক্তে ভেজা, সামনে চেয়ারে বাঁধা ছেলেটি অস্ফুট গো-ঙা-নি-তে কাঁপছে। সে তাড়াহুড়ো করে হাতের র-ক্ত পরনের জামায় মুছে নেয়। তারপর ফোন ধরতে যাবে, ঠিক তখনই ছেলেটির চিৎকার তীব্র হয়ে ওঠে। ক্ষণিকের মধ্যে তার চোখের সাদা অংশে জ্বলে ওঠে বিধ্বংসী ক্রোধ। টেবিল থেকে একটি হ্যান্ড না-ইফ তুলে নেয় সে। এক মুহূর্তেই সমস্ত শব্দ স্তব্ধ করে দেয়। হেঁচকা একটানে কে-টে ফেলল জিহ্বা। ঘরজুড়ে নেমে আসে ভয়ংকর নীরবতা। ফোনের দিকে তাকিয়ে তার অস্থিরতা আরও বেড়ে যায়। সে আবারও কল রিসিভ করতে যায়। কিন্তু তখনও ছেলেটার ভেতর থেকে ভেসে আসছে গো-ঙানির শব্দ। তার অস্থিরতা বাড়ে। তীব্র হয় রক্তচলাচল। এই মুহুর্তে যেন এই কলটাই পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কল কেটে যাওয়ার সময় যখন ঘনিয়ে আসে, তখন চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ আভা দিয়ে উঠে। আর কোনো চিন্তা না করে সে শেষ সিদ্ধান্ত নেয়। এক কোপে গলা থেকে মাথা আলাদা করে দিয়ে নিষ্পত্তি ঘটায় সকল শব্দের। নীরবতার স্থায়ী বন্দোবস্ত করে ফেলে। যদিও সে খেলা এতো দ্রুত শেষ করতে পছন্দ করে না, শিকারকে তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে মারতে বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করে সে৷ কিন্তু এমুহূর্তে সময় নেই।
‘তারপর আবার দ্রুত পোশাকে র-ক্ত মুছে ফোন রিসিভ করে সে। কিন্তু কল ধরামাত্রই তার শরীর জমে যায়। ওপাশে ইমামা কাঁদছে। উন্মাদের মতো কাঁদছে। চিৎকারে ভেঙে পড়া এক নারীর আর্তনাদ ভেসে আসে,
“আপনি জানতেন… সবটাই জানতেন আপনি, তাই না? জানতেন আমি ইমামা না। সবটা জানার পরও কেন আমাকে বলেননি? কেন ধোঁয়াশায় রেখেছিলেন? আমি দুর্বল বলে?”
‘রিচার্ড বুঝে যায় এলিজাবেথ তাহলে সবটা জেনে গেছে। বুকের ভেতর জমে থাকা তপ্ত শ্বাস একসাথে ছেড়ে দেয় সে। ক্লান্তিতে তার চোখ বুজে আসে। এবার আর লুকোনোর কিছু নেই। কিছুপল চুপ থেকে নিদারুণ এক স্বীকারোক্তিতে, ভারী কণ্ঠে সে বলে ওঠে,
“You are not weak, Princess.
You are my weakness.”
‘এলিজাবেথ তবু কাঁদে। চিৎকার করে কাঁদে। ওই চিৎকারে যেন রিচার্ডের ভেতরে কিছু ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। মস্তিষ্কে শুরু হয় রক্তক্ষরণের মতো যন্ত্রণা। সাধারণত প্রিয়ার কান্নায় প্রেমিকের ভেতর ঝড় ওঠে, কিন্তু এখানে দৃশ্যটা ভিন্ন। এলিজাবেথের কান্নায় রিচার্ড দু’হাতে কান চেপে ধরে। চুল খামচে ধরে হিংস্র গর্জনে চিৎকার করে ওঠে,
“চুপ… চুপ… একদম কাঁদবি না। আই রিকোয়েস্টেড ইউ, জান ডোন্ট ক্রাই। প্লিজ… ডোন্ট। একদম কাঁদবে না। আমার যন্ত্রণা হয়, মাথা ফেটে যায়। প্লিজ চুপ… প্লিজজজ…”
‘এলিজাবেথ শোনে না। দীর্ঘদিন ধরে চেপে রাখা কান্না আজ একসাথে মুক্তি পায়। সে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। ওর কান্নায় বিপরীত পক্ষের অন্তরে তোলপাড় শুরু হয়। রিচার্ড ক্রোধের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেলেও দৃঢ় কণ্ঠে বোঝাতে চাইল,
“মানুষ, পরিচয়, কে আপন কে পর এসব ভেবে কী লাভ?যেখানে আমি আপনার পাশে আছি, সবচেয়ে বেশি ভালো তো আপনাকে আমিই বাসি। প্লিজ কাঁদবেন না। অনেক হয়েছে। এবার কান্না থামান, মিসেস কায়নাত।”
‘তবু রিচার্ডের কোনো কথাই যেন এলিজাবেথের কানে পৌঁছায় না। ধীরে ধীরে রিচার্ডের কণ্ঠে, হুংকারে, ফিরে আসে তার আসল রূপ,
“তোর পৃথিবী লাগবে? আদর লাগবে? ভালোবাসা লাগবে? আমি আছি… সবকিছুর জন্য আমি আছি। দুনিয়ার সমস্ত সুখ তোর পায়ের নিচে এনে দেবো। পৃথিবীর সব সুখ তোর জন্য কিনে আনবো আমি, শুধু তোকে হ্যাপি রাখার জন্য। কে কী বলেছে, কী করেছে এসব কিচ্ছু দেখতে হবে না। তোর জন্য আমি একাই যথেষ্ট। পুরো এক দুনিয়ার ভালোবাসা তোকে আমি একাই দেবো। হ্যাঁ, আমি একা। আর প্লিজ কাঁদে না জান । আমার মস্তিষ্ক ফেটে যাচ্ছে।
আপনার জন্য আমি আছি…
আমি আছি…
আমি আছি…”
‘একই শব্দ তিনবার উচ্চারণ করে রিচার্ড। তাতেও কাজ না হওয়ায় হঠাৎ রূপ বদলায় তার কণ্ঠ,
“চোখ থেকে আরেকটা অশ্রু ঝরলে এক্ষুণি কিন্তু গেড়ে দেব।”
‘মেয়ে মানুষ এমনই। নরম–সরম আচরণে এদের সঙ্গে পারা যায় না। যতক্ষণ না মেয়েদের সঙ্গে কঠোর হওয়া হয়, ততক্ষণ তারা তাদের জিদ থেকে নড়ে না। রিচার্ডের শেষ হুমকিতে এলিজাবেথের কান্না থেমে যায়। কিন্তু মন শান্ত হয় না। বারবার ইমান ওয়াসিমের বলা কথাগুলো মনে পড়তে থাকে। মনে পড়ে তার জমজ বোন ছিল। তার পরপরই ভেসে ওঠে সুরাকারের মুখ। এলিজাবেথ শুরু থেকে সবটা ভেবে দেখে, মিলিয়ে নিতে চায়। কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব?
ইমান ওয়াসিমের ভাষ্যমতে সেদিন তার চোখের সামনেই এলিজাবেথের পুরো পরিবারকে ওরা মেরে ফেলেছিল। তাহলে…! তাহলে কি….!
‘না, এটা অসম্ভব। গত দুই বছর ধরে তার অলঝেইমার
রোগ ধরা পড়েছে। সুতরাং এর মাঝে এমন কিছু ঘটেনি এই বিষয়ে এলিজাবেথের পূর্ণ বিশ্বাস আছে। আর যদি মাঝখানের কোনো ঘটনা সে ভুলেও গিয়ে থাকে, তার পরিবার, বন্ধু–স্বজন নিশ্চয়ই জানত। তাছাড়া সুরাকার বলেছিল দুই বছরের সংসার, বাচ্চা… না, না, সম্ভব না। এখানে দীর্ঘ সময়ের কাহিনি রয়েছে। এলিজাবেথের জীবনে কোনো পুরুষ ছিল না। তার কঠিন মনে প্রথম প্রেমের ঝড় তুলেছিল পার্টির সেই অজ্ঞাত লোকটাই। এক দেখাতেই যে তাকে আগলে রাখতে শুরু করেছিল। বটবৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে গিয়েছিল তার মাথার ওপর। যার শরীরের ঘ্রাণ নিতে নিতে একসময় সে মানুষটাকে নিজের পুরো অস্তিত্বের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়েছিল এলিজাবেথ।
‘অনেক হয়েছে এই লুকোচুরি। অনেক হয়েছে অনুভূতি নিয়ে খেলা। অনেক হয়েছে ভেতরে ভেতরে কষ্ট চেপে রাখা। আর না। জীবনে আর যতদিন আছে, এলিজাবেথ বাঁচার মতো করে বাঁচবে। নিজের মতো করে বাঁচবে। যাকে ভালোবাসে, তার সাথেই বাঁচবে। কেউ যেন তার রোগের সুযোগ নিয়ে তাকে ছিনিয়ে নিতে না পারে, সে সুযোগ আর সে রাখবে না। নিজেকে ভুলে যাওয়ার আগেই সে নিজেকে সঁপে দিতে চায় এমন একজনের হাতে, যে তাকে কোনোদিন ভুলে যাবে না। এমনকি সে নিজেই নিজেকে ভুলে গেলেও না। এলিজাবেথ সমস্ত কান্না গিলে নেয়। জোরে শ্বাস টেনে সরাসরি বলেই ফেলল,
“I can’t do dating and the modern world relationships.If you love me, marry me.”
‘এলিজাবেথ ভেবেছিল, তার এমন হঠাৎ এতো বড় সিদ্ধান্তে অপরপক্ষ হয়তো গড়িমসি করবে। কিন্তু তাকে ভুল প্রমাণ করে উল্টো প্রস্তাব আসে,
“Want to get married? you confident?
iam asking you, if you can handle me..”
‘এলিজাবেথ শক্ত করে ঢোক গিলে নেয়,”yes, iam confident”
“Then let’s get married.”
“Let’s do it.”
“ওকে। রেজিস্ট্রার পেপারস পঁচিশ মিনিটের ভেতর পৌঁছে যাবে।”
“আমি আপনাকে দেখতে চাই।”
“ঝলসে যাবে, মেয়ে।”
“আপনার জন্য আমি জ্বলে-পুড়ে ছারখার হতে চাই।”
“ওটা আবশ্যক। তবে সময় হোক।”
‘সঙ্গে সঙ্গে কল কেটে গেল। এলিজাবেথ যেভাবে ছিল, সেভাবেই স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। কিছুই না। না নিজের বলা কথাগুলো, না তার বলা কথাগুলো। এত সহজে কেউ বিয়ের জন্য রাজি হয়ে যায় নাকি? তাও তার অতীত আর রোগ জানার পরেও!
এলিজাবেথ ধরে নিল লোকটা হয়তো তার সঙ্গে মজা করছে। আর সবার মতোই শেষমেশ ছলনা করবে। কিন্তু তার সব ধারণা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল, যখন অসময়ে ব্ল্যাকহকের ডানা ঝাপটানোর শব্দ ভেসে এলো। এলিজাবেথ ছুটে গেল জানালার কাছে। ব্ল্যাকহকের ঠোঁটে ধরা একটি পেপার। রেজিস্ট্রার পেপার!
‘শিরশিরে এক স্রোত এলিজাবেথের পুরো শরীর বেয়ে নেমে গেল। তার মানে কি সত্যিই লোকটা…? এটা কি ডিলিউশন নয় তো? হঠাৎ ব্ল্যাকহকের ডানা ঝাপটে উড়ে যাওয়ার শব্দে হুঁশ ফিরে পেল এলিজাবেথ। তাহলে কি এটা সত্য? সত্যিই কি লোকটা তার এক কথায় তাকে বিয়ে করতে প্রস্তুত! না দেখে, না ছুঁয়ে, এক কথায় বিয়ে! যেখানে বিয়ের আগেই অজস্রবার সিড তাকে বিছানায় নিতে চেয়েছে, সেখানে সে একবাক্যে রাজি হয়ে গেল! এলিজাবেথের মনে পড়ে গেল, কোথায় যেন পড়েছিল—’Someone’s toy is someone’s dream.’
‘সিডের কাছে সে কেবল একটি পুতুলই ছিল। অথচ এখন মনে হচ্ছে, এই মানুষটার কাছে সে তার স্বপ্ন। এলিজাবেথ রেজিস্ট্রার পেপার খুলল। ভেতরে দেখতে পেল একটি ডায়মন্ডের রিং আর দুটি চিরকুট। একটিতে লেখা,
“Mr Kaynat is enough for Mrs Kaynat.”
‘অপরটিতে লেখা,
“Sorry for coming late in your life, but know best comes late.”
‘আমি নিজেই নিজের কাছে প্রশ্নবোধক রেখা। সে কি আমার ব্যথা বুঝবে?’—কিছু মুহূর্ত আগে এমনটাই ভাবছিল এলিজাবেথ। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, তার ব্যথা বোঝার মানুষ আছে। সে পেয়ে গেছে তার স্বপ্নের পুরুষকে। যে আকৃষ্ট হয় না সৌন্দর্যে, না দেহে। যে ভালোবাসে। শুধুই ভালোবাসে। নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে তাকে।
‘হৃদয়কুঠুরে হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো লেপ্টে থাকা পুরুষালি শরীরের সুঘ্রাণ যেন হঠাৎই তার প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে সুখের বর্ষণ নামিয়ে আনে। মন ভিজে যাওয়া ঝিরঝিরে হাওয়া ছুঁয়ে গেল রমণীর হৃদয়মন্দির। অধরে হালকা আলোড়ন দোলা দিল। তারপর আর ভাবল না। সে সই করে দিল। এভাবেই সম্পূর্ণ হলো অদ্ভুত এক বিয়ে, যেখানে ভালোবাসা ছিল কানায়, কানায় পূর্ণ।
‘কিছুক্ষণ পর আবার রিচার্ডের কল এল। এলিজাবেথকে তখনও যেন বিস্ময় কুয়াশার মতো চারিদিক থেকে ঘিরে রেখেছিল। ও কল রিসিভ করতেই জিভের জড়তা কাটাতে না পেরে হিমশিমে কণ্ঠে বলে উঠল,
“বিয়ে করে নিলেন আমায়?”
“হেই ওয়াইফি।” কণ্ঠস্বর গম্ভীর, অথচ কতটা আদুরে শোনালো তার ডাক!
‘এলিজাবেথ তখনও বিস্ময়ের শিহরণে শিহরিত,”ওয়াইফি?”
“মাই ওয়াইফি। ইয়্যু আর মাই ওয়াইফ, ওয়াইফি।”
“এভাবে হঠাৎ, এমনভাবেই বিয়ে করে নিলেন আমায়?”
‘রিচার্ডের সেই দাম্ভিক কণ্ঠস্বর,”Yes, baby… you have understand that I am not others’ oversized, baggy, sneakers guy.”
“তাই বলে এভাবে এক কথায় বিয়ের জন্য রাজি হয়ে গেলেন?”
“কেন হবো না? আই’ম প্রিটি সিরিয়াস এবাউট ইয়্যু, মোর দ্যান মাই লাইফ, লাই লাভ৷”
“একবার ভালোবাসি বলবেন?”
“হুম৷”
“বলুন।”
“উঁহু, এখন না।”
“কখন?”
“কপালে ঠোঁটে রেখে।”
‘মধ্যরাতে হঠাৎ মনে হলো, সাপের মতো কোনো অচেনা অনুভূতি শরীর বেয়ে বেয়ে উঠে আসছে। উষ্ণতার এক নরম স্রোত চামড়ার ওপর দিয়ে বয়ে যায়। ধীরে ধীরে সেই অদৃশ্য উপস্থিতি পেঁচাতে পেঁচাতে ঘাড়ের কাছে এসে থামে। অকস্মাৎ কাঁধের কাপড় সরে যায় নিঃশব্দে। কপালে আলতো করে ছুঁয়ে যায় একটি ঠোঁট। ফিসফিসে এক শব্দ ভেসে আসে অন্ধকারে,
“ভালোবাসি!”
❌
Share On:
TAGS: born to be villains, মিথুবুড়ি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
born to be villains পর্ব ১৬
-
Born to be villains পর্ব ১১
-
born to be villains পর্ব ১৭
-
Born to be villains পর্ব ৪
-
Born to be villains পর্ব ৭
-
Born to be villains পর্ব ১৩
-
Born to be villains পর্ব ৯
-
Born to be villains পর্ব ৮
-
Born to be villains পর্ব ৩
-
Born to be villains পর্ব ১৫