তোমার_হাসিতে
ফারহানাকবীরমানাল
১৬.
চোখ জ্বলছে। একভাবে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে এমন করে চোখ জ্বালা করে। চোখে পানি এসে যায়। দু’হাতে চোখ ডলে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। ক্লান্ত লাগছে। ভীষণ রকমের ক্লান্ত লাগছে। দু’হাতে মাথার চুল খামছে আকাশের দিকে তাকালাম। পরক্ষণেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করে ফেললাম। বাদশা আমার জন্য কতকিছু করেছে। একটার পর একটা কাজ খুঁজে দিয়েছে। মামার ক্ষেতের ধান কেটেছে, এখানকার কাজ খুঁজে দিয়েছে, হোসেন উদ্দীনের সাথে ধানের ডিল করেছে৷ অথচ আমি ওর জন্য কিছু করতে পারছি না। ছেলেটা এতদিন ধরে নিখোঁজ হয়ে আছে। পুলিশও তেমন কিছু বলছে না। আবারও দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। পাশ ফিরে দেখি তিমু দাঁড়িয়ে৷ বেশ অনেকখানি চমকে উঠলাম। বিস্মিত মুখে বললাম, “তুই এখানে কেন এসেছিস?”
তিমু বলল, “একটা কথা বলতে এসেছি।”
“কী কথা?”
সে আশপাশে তাকিয়ে খুব ভালো মতো দেখে নিলো। গলার স্বর অনেকখানি নিচু করে বলল, “ধাঁধার মানে বুঝে ফেলেছি, সে কথাই বলতে এলাম। কাপড়ে মোড়ানো ফুল মানে আতরের গন্ধ।”
“মানে! কাপড়ে মোড়ানো ফুলের সাথে আতরের সম্পর্ক কোথায়?”
“সম্পর্ক আছে। তোমার মন মস্তিষ্ক ভীষণ রকমের অস্থির। সেজন্য তুমি কিছু বুঝতে পারছ না। তবে আমি খুব শান্ত মাথায় ভেবেছি। এটাই হবে।”
আমি কিছু বললাম না। চুপ করে রইলাম। তিমু বলল, “ফুলের কী থাকে?”
“বৃন্ত, বৃতি, পাপড়ি, পুংকেশর, গর্ভকেশর এগুলোই।”
তিমু ভীষণ বিরক্ত হলো। একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “বোটানির ক্লাস নিতে বলিনি।”
“ফুলের আর কী থাকবে? ওহ! হ্যাঁ! ফুলের ঘ্রাণ আছে।”
“এটাই বলতে চেয়েছিলাম। ওইদিন ওই পরিত্যক্ত স্কুলের ঘরে যে আতরের গন্ধ পেয়েছিলাম, তা একটা ফুলের ঘ্রাণ। কাপড়ে মোড়ানো ফুল মানে আতরের গন্ধ। আতর প্রায় সবসময়ই কাপড়ে লাগানো হয়।”
“ধরে নিলাম চিরকুটে আতরের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি দু’টো ঘর আর ওই অদৃশ্য সুতোর টান– এর মানে কী?”
তিমু কিছু বলল না। হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। খিদে পেয়েছে। পেটে ছুঁচো দৌড়াচ্ছে। রইস উদ্দিনের হোটেলের দিকে যেতে হবে। আগেরদিনের খাবার খুব ভালো ছিল।
কলমটা টেবিলের উপর রেখে খাতা হাতে হাঁটতে শুরু করলাম। তিমুও আমার পেছন পেছন এলো। রইস উদ্দিন বলল, “আজকে কিছু রান্না হয়নি। চিঁড়ে কলা আছে। বললে মাখিয়ে দিতে পারি।”
“আমার কিছু সমস্যা হবে না। তিমু, তোর কোন সমস্যা নেই তো?”
তিমু হ্যাঁ না কিছু বলল না। মাথা দোলালো। যার অর্থ হ্যাঁ হতে পারে আবার না-ও হতে পারে।
রইস উদ্দিন সময় নিয়ে হাতে সাবান ঘষলো। মগ তিনেক পানি দিয়ে হাত ধুয়ে কলা ছিলতে লাগল। তিমু থেমে থেকে নাক সিটকচ্ছে।
খাওয়া শেষ করে বের হতেই সে বলল, “রইস উদ্দীনের গা থেকে ওমন আতরের গন্ধ পেয়েছি।”
“নিশ্চিত?”
“হ্যাঁ, আমি নিশ্চিত।”
“ফিরে গিয়ে জিজ্ঞেস করব?”
“কী জিজ্ঞেস করবে? তার শরীর থেকে আতরের গন্ধ কেন আসছে– সে কথা জিজ্ঞেস করবে?”
“তা-ও ঠিক।”
“তোমার কী হয়েছে বলো তো। এমন আচরণ করছ কেন?”
“ভালো লাগছে না রে তিমু। নিজেকে অনেক বড় অপরাধী মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে আমার উপকার করতে গিয়ে বাদশার এমন দশা। ওর কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না৷ আবার বাদশা আমার জন্য কতকিছু করেছে কিন্তু আমি ওর জন্য কিছুই করতে পারছি না।”
তিমু আমার হাত ধরতে গিয়ে থেমে গেল। অসম্ভব কোমল গলায় বলল, “চিন্তা করো না। সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।”
রঘু এসেছে। আমার সাথে দেখা করতে এসেছে। সে বেশ চওড়া হাসি হাসল। পিচ করে পানের পিক ফেলে বলল, “তোমার টাকা দিতে এলাম। এই নাও।”
পাঁচশ টাকার একটা নোট। নোটের কোণে লাল কালির দাগ। আমি বললাম, “আমার কী হয়েছিল?”
“কী হয়েছিল মনে নেই?”
“না। আমার মনে নেই। কী হয়েছিল?”
“খাওয়া শেষ করে ঘন্টা খানেক কাজ করলে। তারপর বললে শরীরটা ভালো লাগছে না। আমি তোমাকে ধরে রিকশায় তুলে দিতে গেলাম।”
“তারপর? রিকশায় তুলে দিয়েছিলেন?”
“হ্যাঁ, দিয়েছিলাম তো। কেন তোমার কিছু মনে নেই?”
ডানে বামে মাথা দোলালাম। সত্যি বলতে এসবের কোন কিছু আমার মনে নেই। রঘু বলল, “আমার শিফট ছিল না, তাই বসে বসে তোমার কাজ করে দিলাম। তোমার ওই বন্ধুটি আমাকে বলেছিল– কেন তোমার কাছে প্রয়োজন। সেজন্যই এত সাহায্য করছি। আমার তো মা নেই। ছোটবেলায় মা’রা গেছে। মায়ের ভালোবাসা কী মনে করতে পারি না। যখন কেউ মন থেকে তাদের মাকে ভালোবাসে আমার অনেক ভালো লাগে।”
তার কথার জবাব দিয়ে পারলাম না৷ কোমল চোখে তাকিয়ে রইলাম। রঘুর চোখ ভিজে উঠেছে। সে দু-হাত দিয়ে চোখের পানি মুছল। জড়ানো গলায় বলল, “আমার দাদি আমার মায়ের সামনে থেকে ভাতের থালা কে’ড়ে নিয়ে যেত। ভালো মন্দ কিছু পাতে তুলতে দেখলে সেগুলোও নিয়ে যেত। আমি শুধু দেখতাম, কিছু বলতে পারতাম না। বাপ ছিল জু’য়া’রি, মা’তা’ল। তেড়েফুঁড়ে মা’র’তে আসত।”
রঘু কথা বাড়াল না। চোখ মুছতে মুছতে পেছন ঘুরে হাঁটা শুরু করল। কী আশ্চর্য! প্রাপ্ত বয়স্ক একজন পুরুষ মানুষ অচেনা একটা মেয়ের সামনে এমন নিঃসংকোচে কাঁদল!
তিমু বলল, “উনার কথা বিশ্বাস করলে?”
“করলাম।”
“কেন বিশ্বাস করলে?”
“আমার মনে হয়েছে যা বলেছে সত্যি বলেছে। রঘু আমাকে রিকশায় তুলে দিয়েছিল। রিকশাওয়ালা ওই স্কুলে নিয়ে গিয়েছে। কেন নিয়েছে এই রহস্য আমাকে জানতে হবে।”
“এইতো তোমার মাথায় বুদ্ধি ফিরেছে।”
“আত্মগ্লানি কে’টে গেলে মন হালকা হয়ে যায়।”
তিমু ফিরে গেল। কাজ শেষ করতে বেলা ফুরোলো না। সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে হোসেন উদ্দীনের কাছে গেলাম। ভদ্রলোক থমথমে মুখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। কথা বলছেন না।
“ধানের ব্যবস্থা আছে। এখান পর্যন্ত পৌঁছানোর উপায় কী?”
“আমার নিজস্ব ট্রাক আছে৷ ওতে ভরে নিয়ে আসবে।”
“টাকা কী হবে?”
“হবে। মণ পিছু যা কথা হয়েছে তাই পাবে। আমার লোক সাথে থাকবে। সে তোমাকে তোমার টাকা বুঝিয়ে দেবে।”
“বেশ। তাহলে আর দেরি করা উচিত হবে না। দিনের আলো থাকতে কাজ মিটিয়ে ফেলতে হবে।”
হোসেন উদ্দীন হাতের ইশারায় দু’টো ছেলেকে পাঠালেন।
ট্রাকে বসে আছি। অল্প বয়সী একটা ছেলে ট্রাক চালাচ্ছে এবং পান চিবুচ্ছে। পানের লাল পিক চোয়াল বেয়ে পড়ছে। খানিক পর পর হাত দিয়ে সেই পিক মুছে ফেলছে। গা গুলিয়ে ওঠার মত ব্যাপার। ছেলেটা বলল, “ভাইয়ের বয়স তো খুব অল্প।”
“ওই আর কী।”
“এই বয়সে কাজে ঢুকে পড়েছেন?”
“কাজে ঢোকার কী কোন বয়স লাগে? আপনার বয়সও তো অল্প।”
“কী আর করার! গরিবের আবার বয়স। পেটের টান কখনো বয়স দেখে না।”
“তা ঠিক।”
“আগে অভাব বেশি ছিল। এখন মোটামুটি ঠিক হয়েছে। বড় বোনের বিয়ে দিয়েছে। বর ভালো। ভালো আছে সে। মা’কে নিয়ে থাকি। বাপটা আগে তামাক বিড়ির নেশায় ছিল। এখন সে-সব ছেড়েছে। পান খায় শুধু। আমি আর না করি। পান তো খেতেই পারে। পান খাওয়ায় দোষের কিছু নেই। ঠিক বলেছি কি-না বলেন?”
“ঠিক বলেছেন।”
“এখন আমার একটা বিয়েশাদি করতে পারলে ঘর ভরে যায়।”
আমি কিছু বললাম না। ছেলেটা চলন্ত গাড়ি থেকে মাথা বের করে পানের পিক ফেলল। লালচে দাঁত বের করে বলল, “মেয়ে একটা পছন্দ আছে। বিয়ে করার শখ। তবে সে আমারে পাত্তা দেয় না।”
“দিয়ে দেব।”
“দোয়া করবেন ভাই। খুব ভালোবাসি ওরে।”
“আচ্ছা করব।”
ট্রাক থামল। এতক্ষণ বকবক করে মাথা ধরিয়ে দিয়েছে। ধান নেওয়ার ব্যাপারটা ঠিকভাবে মিটল। সবাইকে টাকা বুঝিয়ে দিয়ে হোসেন উদ্দীনের কাছে এলাম। তাকে হিসাব বুঝিয়ে দিতে তিনি বললেন, “কিছু ধান বাড়ি পড়ে গেছে, সেগুলোর কী হবে?”
“কাল পরশুর মধ্যে পেয়ে যাবেন।”
“ভালো।”
তিনি চকচকে দু’টো টাকার একটা নোট আমার হাতে গুঁজে দিলেন। থমথমে গলায় বললেন, “মিষ্টি খেও।”
এমনভাবে বললেন যেন কেউ তাকে টাকা দিতে জোর করেছে। ওখান থেকে বেরিয়ে জুয়েলার্সের দোকানে ঢুকলাম। নকশা দেখিয়ে আংটির বায়না দিলাম। হাতের একজোড়া বালা পছন্দ হলো। পুরোপুরি সোনার তৈরি না। সোনার পানি দিয়ে ধুয়ে চকচকে সোনালি রং এনেছে৷ দোকানদার খুব গ্যারান্টি দিলো। সারাজীবনেও কিছু হবে না। একদম চকচক করবে। একজোড়া বালাও বানাতে দিলাম। হাতে টাকাপয়সা যা এসেছে অনেক ভালো। শোকর আলহামদুলিল্লাহ। এত টাকা আশা করিনি। এসব কিছু সম্ভব হয়েছে– বাদশার জন্য। সে আমাকে সাহায্য না করলে এসবের কিছুই হতো না। মায়ের গহনা বানাতে দেওয়া শেষ। এখন আমার দু’টো কাজ বাকি– যে করেই হোক বাদশাকে খুঁজে বের করতে হবে। এবং তানহার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে। ছোট চাচাকে একটা জবাব দিতে না পারলে সারাজীবন আফসোস থেকে যাবে। সে আমার জন্ম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল, আমি তাকে ক্ষমা করে দিতে পারি না।
বাড়িতে ফিরতে একটু রাত হলো। দাদি আমাকে দেখে ভীষণ রেগে গেলেন। কঠিন মুখে বললেন, “এত রাত করে বাড়িতে ফেরা যাবে না। এটা ভদ্রলোকের বাড়ি। কোন সরাইখানা না।”
“আর ফিরব না।”
আমার এমন উত্তরে তিনি নিভে গেলেন। হতাশ স্বরে বললেন, “খেয়ে নিয়ে আমাকে উদ্ধার করো।”
হাত-মুখ ধুয়ে খেতে বসেই তিমু এলো। নিচু গলায় বলল, “বাড়িতে অনেক ঝামেলা হয়েছে।”
“কী হয়েছে?”
“ছোট মামা ভীষণ চিৎকার চেঁচামেচি করছিলেন– বোধহয় হবু মামানিকে নানি কিছু বলেছেন।”
“কী বলেছেন?”
“সে কথা জানি না। তবে নানি খুব খেপেছেন। দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে বলেছেন– বিয়ের আগেই বউয়ের লেজ ধরে ফেলেছে। এমন ছেলে পেটে ধরেছি। আল্লাহ! এই দিন দেখার আগে আমার ম’র’ণ হলো না কেন?”
তিমু চুপ করে গেল। খাওয়া শেষ করে তিমুর হাতে একটা শপিং ব্যাগ দিলাম। সহজ গলায় বললাম, “তোর স্বপ্ন সত্যি হয়েছিল তিমু। স্যার আমাকে বই রিভিউ দেওয়ার জন্য পুরষ্কার দিয়েছে।”
তিমু হাসিমুখে ব্যাগ ধরল। তার চোখ টলমল করছে। সামান্য এই ব্যাপারে এত আবেগি হওয়ার কী আছে কে জানে?
সকাল সকাল বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় দাদি আমার পথ আগলে দাঁড়ালেন। ভ্রু কুঁচকে বললেন, “তিমুকে ওসব কী দিয়েছিস?”
“কী দিয়েছি?”
“কিসব চকলেট দিয়েছিস দেখলাম। আমাকে একটা দিলো। খেতে ভীষণ ভালো।”
“দিয়েছি তো কী হয়েছে?”
“টাকা দিলে আমার জন্য নিয়ে আসতে পারবি?”
“পারব না কেন?”
“দাম বল। টাকা নিয়ে এসেছি।”
দাম বলতে দাদি আঁচলে পেঁচিয়ে রাখা টাকাগুলো আমার হাতে দিলেন। অল্প হেঁসে বললেন, “মনে করে নিয়ে আসবি কিন্তু।”
মাথা দুলিয়ে বের হতেই তিমু আমাকে ডাকলো। উৎসাহী গলায় বলল, “কোথায় যাবে?”
“ওই স্কুলে যাব।”
“আমাকে সাথে নিয়ে চলো। রহস্য খুঁজতে সাহায্য করতে পারব।”
“রহস্য অনুযায়ী কিছু থাকলে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। জীবনের ঝুঁকিও থাকতে পারে৷ ওখানে তোকে নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না।”
“আমার কিছু হবে না। আমি নিজের খেয়াল রাখতে পারি।”
“সে তোর কিছু না হতে পারে, আমি কোন ঝুঁকি নিতে চাই না।”
“কেয়ার করো আমার?”
“করব না কেন?”
তিমু কথা বাড়ালো না। ছলছল চোখে তাকিয়ে রইল। মেয়েটা আজকাল খুব কাঁদছে নাকি ওর চোখে সমস্যা হয়েছে। চোখে সমস্যা হলে দেরি না করে ডাক্তার দেখাতে হবে। চোখ নিয়ে হেলাফেলা করার সুযোগ নেই।
আগের দিনের চেয়ে আজ জায়গাটা একটু বেশি শুনশান লাগছে। ঘাসের উপর শিশির জমে আছে। খুব খেয়াল করে চারপাশে দেখলাম। পাশাপাশি কোন ঘর নেই। লম্বা দু’টো বিল্ডিং আড়াআড়ি ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। কী করব না করব ভাবতে ভাবতে সেই ঘরের ভেতরে ঢুকলাম, যেখানে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। ঘরের ভেতরে তেমন কিছু নেই। তীক্ষ্ণ চোখে বেশ অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। হঠাৎই নজরে এলো এই ঘরে পাশাপাশি দু’টো দরজা আছে। ঘর বলতে রুম বোঝাতে হয়নি তো? তড়িঘড়ি করে দরজার কাছে গেলাম। ওপাশ থেকে আটকানো। ধাক্কাধাক্কি করলে খোলে না। গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে একটা দরজায় ধাক্কা দিলাম। দরজা খুলল না। বিকট শব্দ হলো। দরজা খুলল না।
কাপড়ের মোড়ানো ফুল মানে আতরের গন্ধে ভরা এই ঘর। পাশাপাশি দু’টো ঘর মানে– এই দু’টো দরজা। তাহলে অদৃশ্য সুতোর টানের মানে কী?
মাথার চুল খামছে ধরে খানিকক্ষণ ভাবলাম। নাহ! কিছু বুঝতে পারছি না। তিমু থাকলে বোধহয় সে কিছু বুঝত। তবে ওকে এখান পর্যন্ত নিয়ে আসার ঝুঁকি নেওয়া উচিত কাজ হতো না। ওকে নিরাপদ রাখার দরকার ছিল। বলে এসেছি– বিকেলের মধ্যে ফিরে না গেলে পুলিশ নিয়ে এখানে আসবে। এইটুকু কাজ ওকে নিয়ে হয়ে যাবে৷ সে সাহস তিমুর আছে।
মিনিট বিশেক খুব ভালো করে দেখার পর মনে হলো– এই ঘরে অদৃশ্য কিছু আছে। খালি চোখে সে জিনিস আমি দেখতে পারছি না৷ তবে আছে। এমন কিছু যার সাহায্য এই দরজা খুলবে। কিন্তু কী আছে? কোথায় আছে?
দরজা সোজাসুজি দেয়ালের দিকে তাকালাম। কিছুই নেই। হঠাৎ মনে হলো দু’টো দরজার হাতলে একসাথে হাত রাখলে কাজ হতে পারে৷ চিন্তাটা ভীষণ উদ্ভট এবং অদ্ভুত। তবু মাথায় এলো বলে করলাম। এবং এতেই কাজ হলো। একটা দরজা খুলে গেল।
সাত পাঁচ না ভেবে দরজা গলে ভেতরে চলে গেলাম। চারদিক অন্ধকার। ভেপসা গন্ধ নেই। আতরের গন্ধ ছড়িয়ে আছে। ফোনের ফ্লাশ লাইট জ্বালিয়ে সামনে দিকে এগিয়ে গেলাম। মিনিট পনেরো হাঁটার পর বিশাল এক রুম নজরে পড়ল। মাথার উপরে ঝাড়বাতি ঝুলছে। পিলারের সাথে লোহার শিকল টানিয়ে রাখা, বাথটবে মত কয়েকটা পাত্রে স্বচ্ছ পানি। চোখ কচলে নিয়ে আবারও তাকালাম। নাহ! স্বপ্ন দেখেছি না। বিস্মিত চোখে সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম। শেষ প্রান্তে ছোট মতো একটা ঘরে পাশাপাশি দু’টো পিলার। মাঝখানে একটা ছেলে। তার দুই হাত, দুই পায়ে শেকল পরানো। ছেলেটা আমার পরিচিত৷ যেনতেন পরিচিত নয়৷ আমার বন্ধু, আমার আত্মীয়ের চেয়ে আপন। বাদশা! কে ওকে এখানে বেঁধে রেখেছে? কেন রেখেছে?
বিদ্যুৎ গতিতে বাদশার শরীর স্পর্শ করলাম। ঠিক তক্ষুনি দরজার পাশে একজোড়া চোখের মালিকের দেখা মিললো। রইস উদ্দিন দাঁড়িয়ে আছে। পান খেয়ে ঠোঁট লাল করেছে৷ শান্ত মুখ অথচ বিভৎস দেখাচ্ছে৷ কোথা থেকে খুব কর্কশ একটা কণ্ঠ ভেসে এলো।
“কে এসেছে?”
রইস উদ্দিন কিছু বলার আগে আমিই বললাম। খুব সহজ ভঙ্গিতে বরফ শীতল গলায় বললাম, “আমি সাজ্জাদ। সাজ্জাদ শিকদার।”
গলার স্বরের শীতলতা এত বেশি ছিল যে নিজের গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেল৷ রইস উদ্দিনও বোধহয় একটু কেঁপে উঠল। বাদশার জ্ঞান নেই। শরীরে অসংখ্য ক্ষত। যেন ওকে খুব মে’রে’ছে।
চলবে
Share On:
TAGS: তোমার হাসিতে, ফারহানা কবীর মানাল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তখনও সন্ধ্যা নামেনি পর্ব ১
-
তখনও সন্ধ্যা নামেনি পর্ব ২
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১১
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১৩
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১৪
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১২
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৪
-
তোমার হাসিতে গল্পের লিংক
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৮
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৬