ভালোবাসার_সমরাঙ্গন ||১৮||
রণ’র পিছনের শার্টটা শক্ত করে টেনে ধরে আছে মৌন।মন সায় দিচ্ছে না রণকে যেতে দিতে।ভেতরে ভাঙনের চূড়ান্ত খেলা চলছে।শব্দ করে চিৎকার করতে ইচ্ছে হচ্ছে।পুরো পৃথিবী কে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে
“সে আমার ভালোবাসার মানুষ,আমার প্রাণ ,তারে বিনে শ্বাস নিতে আমার কষ্ট হবে।আমি তাকে ছাড়তে পারবো না।
মৌনতার পানে না ফিরেই রণ নরম গলায় বলল
“এভাবে আমায় আটকাস না।ছেড়ে দে।
মৌনতা শুনলো না।তাৎক্ষণিক রণ পেছন ফিরলো।এরপর বুক পকেটে থেকে একটা কচকচে নতুন দুশো টাকার নোট নিজের শরীরের সাথে ঘষে সেটা মৌনতার হাতে গুঁজে দিয়ে বলে উঠলো
“তোর পাওনাটা দিতেই ভুলে গিয়েছিলাম।পাওনার পাশাপাশি আমার গায়ের গন্ধটাও তোকে দিয়ে গেলাম।
মৌনতা টাকাটা নিয়ে স্তব্ধ দাঁড়িয়ে রইলো।টেবিলের উপর অনাদরে পড়ে রয়েছে মৌনতার গত রাতের খুলে রাখা ঝুমকা।রণ কিঞ্চিৎ ঠোঁট এলিয়ে হেসে সেই ঝুমকা হাতে তুলে নিলো।এরপর পকেট থেকে জিপের চাবি বের করে চাবির রিংয়ের সাথে লাগিয়ে বললো
“আসছি।
আর দাঁড়ালো না সে। তরতর করে বেরিয়ে এলো ।ড্রয়িং রুমের সমস্ত উৎসুক মুখ উপেক্ষা করে বাইরে এসে জিপে চেপে বসলো।যাবার আগে মাহির কে গলা উঁচিয়ে বললো।
“কালুর যত্ন নিস।কেউ যাতে ওকে একটা ফুলের টোকাও না দেয়।কালু আমার ট্রেনিং প্রাপ্ত ডগ।ওর কিছু হলে ফিরে এসে তোর চামড়া তুলে ডুগডুগি বাজাবো।
জিপ স্টার্ট করে সাই সাই গতিতে ধুলো উড়িয়ে ছুটে চললো রণ।মৌনতা নিজের জানালা দিয়ে চাতকের ন্যয় তাকিয়ে দেখল তা।জতখন রণকে দেখা গেলো ততক্ষণ সে গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে রইলো।সেই সাথে কপোল ডিঙিয়ে ঝরে পড়লো নোনা ধারার বর্ষণ।
রণ যেতেই নিজ কক্ষে দরজা টেনে গুমড়ে কেঁদে উঠলেন রেহনুমা।আজকে মির্জা বাড়ির সমস্ত আনন্দ তার কাছে বিষ কাটার ন্যয় বিধবে।ওই মজার মজার খাবার এক লোকমাও মুখে তুলতে পারবে না রেহনুমা।
এমন কঠিন চাকুরীর উপর বেশ ক্ষোভ জন্মালো রেহনুমার।ইচ্ছে হলো জেনারেল চিফ কে শক্ত দুটো বুলি শোনাতে।চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হলো
“পরিবার,পরিজন, মা-বাবার ঊর্ধ্বে ও কি তাদের দেশ রক্ষা মিশন?
বাবা মায়ের কি কোন হক নেই নিজ সন্তানের সাথে কয়েক দিন আনন্দ মুহুর্ত কাটানোর?
রণ’র দেয়া দুশো টাকার নোটটা হাতে নিয়ে নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে মৌনতা।টাকায় রণ’র শরীরের গন্ধ।মৌনতার মনে হচ্ছে রণ তার হাতের মুঠোয় বন্দি।মুঠ খুললে এখনই রণ উড়ে পালিয়ে যাবে।মৌনতা হাটু ভাঁজ করে হাঁটুতে মুখ লুকিয়ে শব্দ করে কেঁদে উঠলো।সেই কান্না বদ্ধ দরজা ভেদ করে বাইরে পৌছালো না।দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অল্প মিহি শব্দ শুনলেন শায়লা।নিজেও ব্যথিত হয়ে হতাশা মিশ্রিত দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে প্রস্থান নিলেন নিজ কক্ষে।ছেলেটা যাবার পর থেকে তার মনটাও বড্ড খারাপ।
ধীরে ধীরে সূর্যের আলো তেজ হলো সেই সাথে বাড়লো কর্ম ব্যাস্ততা।মির্জা বাড়ির কারোর মনই চলছে না।কাজে কারোর কোনো স্পৃহা নেই।সবাই কেমন নড়ন চড়ন হীন উদাসীন।আক্কাস নিজের মন মতো দু একটা কাজ করলো।দেওয়ান মির্জায় থমথমে মুখে দাওয়ায় বসে আছেন।না কোনো ওর্ডার করছেন না চিৎকার চেঁচামেচি করছেন।তিনি যেনো আজ নিষ্প্রাণ অথর্ব।
রেহনুমা বিছানায় শুয়ে মরার মতো পরে আছেন।পুরুষরা ঠেলে ঠুলে কাজে হাত লাগাচ্ছে।সৌম্য নতুন বউ নিয়ে ঘরে।মাঝে মাঝে বাইরে এসে দেখে যাচ্ছে সব ঠিক মতো এগুচ্ছে কি না?
দশটার পর রুলি নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।এসেই টেবিলে ব্রেকফাস্ট রেডি কি না তা খুজলো।এরপর চামেলিকে ডেকে উঠলো
“অ্যাই চামেলি বড় আপা কই রে?
চামেলি ব্যস্ততা দেখিয়ে বলে উঠলো
“নিজ ঘরে বিশ্রাম করে।
“এখনো উঠেনি?
“উঠছিলো।মিলিটারি ভাইজান সকালে হুট কইরা চইলা গেছে।তাই বড় আম্মার মন খারাপ।
বলেই চামেলি চলে গেলো।আজ বাড়িতে ম্যালা কাজ।এখানে দাঁড়িয়ে গল্প করার সময় নেই তার।
রণ চলে গেছে শুনেই রুলি স্তব্ধ হলো।তার মাথা ঘুরে উঠলো।এসেই শুনেছিলো দিন বিশেকের ছুটি নিয়ে বাড়িতে এসেছে রণ।মনে মনে ভেবে রেখেছিলেন সৌম্য’র বিয়েটা শেষ হলেই আদনান মির্জাকে ধরে একটা কিছু করবেন তিনি।কিন্তু রণ’ই যেখানে নেই সেখানে কাকে দিয়ে কি করবেন তিনি?
ব্রেকফাস্ট আর করা হল না রুলির।সে দৌড়ে গেস্ট রুমে গেলেন।ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে হাসে সাজছে কোয়েল।রুলি কোয়েলের হাত থেকে লিপস্টিক কেঁড়ে বলে উঠলেন
“সাজুগুজু করে লাভ নেই।রণ চলে গেছে।
কোয়েলের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো।সে লাফিয়ে দাঁড়িয়ে বলে উঠলো
“কিঃ!
মুহূর্তেই পায়ের ব্যথায় চোখ মুখ কুঁচকে ধপ করে চেয়ারে বসে গেলো কোয়েল।এরপর ব্যাথায় কালো হয়ে আসা মুখটা স্বাভাবিক করার বৃথা চেষ্টা করে বলে উঠলো
“কখন গেলো?বাড়ির একটা মানুষ ও আমাদের ডাকার প্রয়োজন মনে করলো না?
কোয়েলের নাকের ডগায় রাগ দেখা গেলো।সে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে রেহনুমার কক্ষে এলো।এরপর কাট কাট গলায় বললো
“রণ ভাই চলে গেলো একটা বার জানালেও না খালা মণি?
রেহনুমার মন মেজাজ এমনিতেই ভালো নেই।তন্মধ্যে কোয়েলের এমন ওকালতি রেহনুমার মেজাজ বিক্ষিপ্ত করলো।নিজেকে যথা সম্ভব শান্ত রেখে রেহনুমা চোখ বুজেই বলে উঠলেন
“এ বাড়ির কাউকেই ডাকতে হয়নি কোয়েল।সবাই উঠে এসেছে।তাছাড়া রণ বিয়ে করতে যায়নি যে,সবাইকে ডেকে ডেকে বিদায়ের জন্য ধরে আনতে হবে।বাইরে যা।খুব খারাপ লাগছে আমার।আমি একটু একা থাকতে চাই।
পাত্তা না পেয়ে ভোঁতা মুখে চলে গেলো কোয়েল।বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠানে আজ কোনো মজা হলো না।শুধু কনের বাড়ির মানুষ এসে খেয়ে সৌম্য আর অনুকে নিয়ে চলে গেলো।
এদিকে খাবারের টেবিলে কোনো ভাবেই আনা গেল না মৌনতা কে।সে মন ভার করে ঘরেই পরে রইলো সারাদিন।হাতের মুঠোয় এখনো সেই দুশো টাকার নোটটা চেপে ধরে রাখা।শায়লা একটা থালে অল্প পোলাও,রোস্ট আর গরুর মাংস এনে মৌনতার ঘরের পড়ার টেবিলে রেখে বলে উঠলেন
“সকালেও কিচ্ছু খেলি না।দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চললো এখনো খাচ্ছিস না।সৌম্য এতো করে ডাকলো ওদের সাথে বসে খেতে তাও গেলি না।হঠাৎ কি হলো বলতো?সবাই কি ভাববে?
মৌনতা উত্তর দিলো না।শুধু বললো
“শরীরটা ভালো লাগছে না মা।খিদে নেই।তুমি যাও।
শায়লা কথা বাড়ালেন না।মেয়ের খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দেবার কারন ঠাহর করেছেন তিনি সকালেই।তাই চুপচাপ কক্ষ ত্যাগ করলেন।
ধীরে ধীরে সময় গড়ালো।দিন পেরিয়ে রাত নামলো।ধোয়া উঠা পোলাও ঠান্ডা হলো কিন্তু মৌনতা মেঝে থেকে উঠলো না।
মেঝেতে স্থির দৃষ্টি পাততে পাততে মৌনতার চোখ মুদে এলো।করুন চোখে একবার টেবিলের উপর রাখা খাবারটায় নজর বুলালো।খাবার দেখে কোনো খুশি কাজ করলো না মৌনতার মনে।কিন্তু পেটের নাড়ি ছিড়ে যাবার উপক্রম হলো অধিক খিদেয়।বসা উঠে দাঁড়িয়ে টেবিলের পাশ থেকে মুড়ির কৌটা হাতে নিলো মৌনতা।এরপর এক মুঠো মুড়ি হাতে নিয়ে হুহু করে কেঁদে উঠলো সে।অতঃপর বললো
“তোমাকে ফেলে এতো মজার খাবার আমার গলা দিয়ে নামবে না রণ ভাই।
চট্রগ্রাম অপারেশনাল হেড কোয়ার্টার থেকে নিজের মিশনের সমস্ত তথ্য নিয়ে মানচিত্রে দেখানো রুট ধরে এগিয়ে চলেছে চার জন আর্মি অফিসার দুজন সোলজার।মিশন চন্দ্রঘোনা কাপ্তাই লেক।পাহাড়ের গহীনে না আছে নেটওয়ার্ক না আছে চলাচলের ভালো নিরাপদ রাস্তা।পুরোটা জঙ্গল বিচ্ছিন্ন পাহাড়ে ঠাসা সেই সাথে জলের ধারে পাহাড়ি গুহার মতো স্পট।দুচোখ যেদিকে যায় খালি অন্ধকার উপত্যকা আর পাহাড়ি খাল।বিগত দিনের চাইতে এবারের মিশন বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়াবে সকলের জন্য।কারন জলের ধারে ঘাপটি মেরে বসে থাকা আর অন্ধকার মাড়িয়ে পথের হদিস খুঁজে শত্রু পক্ষের নিশানা বের করা চাট্টি খানি কথা নয়।পাহাড়ের সকল পথ নখ দর্পণে তুলে নিয়েছেন ক্যাপ্টেন রাশেদ।পাহাড়ের সাথে তার দীর্ঘ দিনের মাখামাখি।আর্মিতে এসে থেকেই জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি।তাই কোথায় কি আছে তা নিয়ে বেগ পোহাতে হলো না কারোর।শত্রু পক্ষ কোন কোন পয়েন্টে নিশ্চিত অবস্থান করতে পারে তা মানচিত্র না দেখেই বলে ফেললো সে।
পাহাড়ের প্রবেশ মুখে এসে হাতের মানচিত্র বের করে মার্ক করলো রণ।উপস্থিত কমান্ডো দের বুঝিয়ে দিলো কে কোন জায়গায় অবস্থান নেবে।এরপর হাতের ওয়াকিটকি দিয়ে নিকটস্থ আর্মি ক্যাম্পে নিজেদের অবস্থান ইনফর্ম করে পা বাড়ালো যে যার মতো।
চন্দ্রঘোনা পাহাড়ে দিনের আলো হারিয়ে গেছে আরও বহু সময় আগে।এখানে সূর্য ডুবতেই ঘুটঘুটে অন্ধকারে গ্রাস হয় সব কিছু।ঘন বৃহৎ গাছ আর ঝোপঝাড় ভেদ করে খুব কাছের জিনিস ও নজরে আটকায় না।এমনকি কাছের জোনাকির আলোও যেন ঝাপসা লাগে চোখের সামনে। পাহাড়ের গা ছুঁয়ে ধেয়ে আসা ভেজা বাতাস এক অদ্ভুত ঠান্ডা শিরশিরে অনুভূতি জাগায়।মনে হয় কোনো অশরীরীর শীতল হীম নিঃশ্বাস গায়ে লাগছে।
এমনই ভয়ানক গা ছমছমে অন্ধকারে এগিয়ে যাচ্ছে মেজর রণ।
তার গায়ের কালো-সবুজ মাল্টিক্যাম ইউনিফর্ম অরণ্যের পাতা এবং গাছের সঙ্গে পুরোপুরি মিশে গেছে।হুট করে দেখলে কারোর বোঝার উপায় নেই এটা মানুষ নাকি গাছ।
রণ’র শ্যামবর্ণ মুখে গভীর দৃঢ়তা, শক্ত তীক্ষ্ণ চোয়াল আর চোখ দুটোতে ধারালো শকুনের দৃষ্টি।দেখতে এমন যেন অন্ধকারের ভিতর থেকেও ছায়া চিনে ফেলতে পারার অনন্য ক্ষমতা রয়েছে এই অফিসারের।অরণ্যের ভেজা মাটির সরু পথ ধরে নিঃশব্দে হাঁটছে রণ।এখানকার মাটি কিছুটা কাঁদা যুক্ত।হয়তো বিগত দিনে বৃষ্টি হয়েছে।এখানে আলো এবং তাপ পৌঁছায়না বললেই চলে।একটু অসাবধান হলেই পদচ্ছাপ ভয়ানক শব্দ তুলবে।
চলতে চলতে রণ এক হাটু গেড়ে বসলো এরপর মাটি খামচে তুলে আনলো কাদা।মাটি যথেষ্ট ভেজা।শত্রুর নিশানা খুঁজে পেতে সহজ হবে ।সেই সাথে কান সজাগ রাখলেই টের পাওয়া যাবে মানুষ চলাচলের শব্দ।
রণ’র কাঁধে ভারী ব্যাগ।বুকে বাঁধা ট্যাকটিকাল ভেস্ট।তাতে সাজানো ম্যাগাজিন, মেডিকেল কিট, স্মোক গ্রেনেড, ফ্ল্যাশব্যাং, আর ছোট ড্রোন।
কোমরে ঝুলছে Glock-19 রিভলবার আর ডানদিকে স্টিলের ধারালো মিলিটারি ছুড়ি।এখানে বন্দুকের ব্যবহার খুব কম হয়।নীরব যুদ্ধ করেই ঘায়েল করতে হয় শত্রু পক্ষকে।তাই হুটহাট গুলি চালানো কঠিন নিষেধাজ্ঞা।কারন লক্ষ মিস হলেই শত্রু পক্ষ পালিয়ে যাবে।যা একজন ইন্টেলিজেন্স কমান্ডো কিছুতেই হতে দিতে পারে না।
পথের নিশানা আরেকটু ভালো করে পরখ করতে রণ ধীরে হাত বাড়িয়ে নাইট ভিশন ডিভাইস মাথা থেকে টেনে চোখে নামাল।মুহূর্তেই সবুজ আলোয় সামনের জঙ্গল,ভেজা পথ আর দূরের জিনিস জীবন্ত হয়ে উঠল।নিশাচর প্রাণীর ন্যয় সেই আলোয় সূক্ষ দৃষ্টিতে রণ খুঁজে চলেছে কিছু।কমান্ডো রিপোর্ট মোতাবেক খাল আর অন্ধকার গুহায় সন্দেহ জনক কারোর উপস্থিতি টের পাওয়া গেছে।শুধু তাই নয়।ছোট খালের স্রোতে নৌকা ভাসিয়ে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয় ছোট শিশু গুলোকে এবং এই পথেই আনা নেয়া করা হয় দামি দামি নেশা দ্রব্য।পরে সময় সুযোগ বুঝে সেগুলো ছড়িয়ে দেয়া হয় দেশের বিভিন্ন জায়গায়।
শব্দহীন পায়ে চলতে চলতে রণ খেয়াল করলো বড় ঝোপের আড়ালে কিছু নড়ছে।মুহূর্তেই সতর্ক অবস্থান নিলো রণ।স্যাটেলাইট টাওয়ারে রণ’র অবস্থান দেখে যোগাযোগ এর চেষ্টা চালালো অপারেশন লিডার কর্নেল মেহেরাব।সে ফিসফিস করে কিছু বললো।যা ভেসে এলো রণ’র হেড সেট ডিভাইসে
“মেজর রণ ডু ইউ কপি?
রণ নরম গলায় বলল
“কপি প্রসেডিং।
নিজের নাইট ভিশন ডিভাইসের সাহায্যে তীক্ষ্ণ নজর তাক করে এক হাতে সাপ্রেসর লাগানো SR-15 কার্বাইন মিলিটারি বন্দুক টি ধরে পজিশন নিলো রণ।আরেক হাত দিয়ে সামনের ঝোপ সরিয়ে এগুতে লাগলো।নেটওয়ার্ক এ এখনো কর্নেল মেহেরাব রয়েছেন। যে কোনো মুহূর্তে ফায়ার মোড বদলাতে পারে।অবস্থা বুঝে ওর্ডার করবেন তিনি।
পাহাড়ের লতাগুল্মের নিচ দিয়ে অজানা কাটা যুক্ত ঝোপ ঝাড় ঠেলে ধীরে ধীরে শব্দহীন এক পা এক পা করে এগোতে লাগল রণ।
চারপাশের ঘন কালো অন্ধকার তাকে গিলে খেতে চাইছে।ভয়ানক শব্দে পাখা ঝাপ্টে উড়ে গেলো হুতুম পেঁচা।কাছে কুলে কোথাও ঝর্ণা আছে বোধ হয়।পানির কলকল শব্দ স্পষ্ট কানে লাগছে।
রণ যেখানে ছায়াটা দেখেছিল তার কিছুটা দূরে এসে দাঁড়িয়ে বন্দুক তাক করলো।কিন্তু একি!এখানে কেউ নেই।রণ মনে মনে বলে উঠলো
“আমার চোখ কখনো ভুল দেখতেই পারে না।ইটস ইম্পসিবল।
ডিসকানেক্টেড হলেন মেহেরাব।স্যাটেলাইট ক্যামেরায় কিছু ডিটেক্ট হলে তিনি আবার যোগাযোগ করবেন।
রণ বন্দুক নামিয়ে নিজের কান সজাগ করলো।সে চোখ বুজে শ্বাস বন্ধ করে স্থির দাঁড়িয়ে রইলো।ঝর্ণার শব্দ,পাখির ডাক সব ছাপিয়ে কানে এসে লাগলো কারো পায়ের নিখুঁত ধ্বনি।কেউ জলের কিনার ধরে সন্ত্পর্নে হেটে যাচ্ছে।রণ’র ঠোঁটে চাতুরী হাসি ফুটলো।একদম লক্ষ্যের কাছাকাছি চলে এসেছে সে।সতর্ক দৃষ্টিতে আশেপাশে খুঁজলেই মিলবে খাজানা।
রণ তাৎক্ষণিক চোখ মেললো।পুনরায় নাইট ভিশন ডিভাইস এ চোখ রেখে চারপাশে উদ্ভ্রান্ত নজর বুলালো।নাইট ভিশনের তীক্ষ্ণ আলোয় রণ স্পষ্ট দেখলো দূরের বাম দিকের পাহাড়ের ঢাল বেয়ে দৌড়ে যাচ্ছে একটি ছায়া।ছায়াটা কোনো অশরীরীর নয়।সে মানুষ।মানুষ রুপি অশরীরী।
খুব কাছ থেকে লক্ষ্য হারিয়ে গেলো ভেবেই রণ’র দম আটকে এলো।সে ট্যাকটিকাল ভেস্টের পকেট থেকে ছোট থার্মাল স্কোপ বের করল।অতি সূক্ষ হাতে কোনো তাড়াহুড়ো ছাড়াই আস্তে আস্তে সেই স্কোপ বন্দুকে লাগিয়ে তাক করল পাহাড় বরাবর।
বন্দুকের সাথে লাগানো ডিভাইস স্কিনে মুহূর্তেই স্পষ্ট হলো শরীরের তাপ চিহ্ন।এটি কোনো জন্তুর নয়।কারন জন্তু মানুষের মতো দেখতে হয় না ।রণ ঠোঁটের কোনো বিজয়ী হাসি ফুটিয়ে মিলিটারি ভাষায় নরম গলায় স্যাটেলাইট মোবাইলে বলে উঠলো
“Enemy at two o’clock. Grid Echo-7 confirmed.”
রণ’র বলা সাংকেতিক মিলিটারি ভাষার লোকেশন সবাই শুনলো।এরপর সকলেই নিজেদের স্থান ছেড়ে এগিয়ে আসার জন্য পা বাড়ালো রণ’র লোকেশনে।
নিজের পজিশন হোল্ড করে একটা গাছের গুড়িতে হেলান দিয়ে বসলো রণ।এমন সময় স্যাটেলাইট মোবাইলে ভেসে এলো রিনরিনে কান্নারত মেয়েলি স্বর
“তুমি বিহনে প্রাণ যাচ্ছে রণ ভাই।এ কেমন মরন জ্বালায় আমাকে জ্বালিয়ে মারলে তুমি?
রণ প্রশস্ত হেসে বলে উঠলো
“খুব শীঘ্রই ফিরে এসে সমস্ত কষ্ট মিটিয়ে ভালোবাসায় অবগাহন করাবো লাভ বার্ড।যতোটা ক্ষত হৃদয়ে তৈরি হচ্ছে তার চাইতে হাজার গুণ ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে দিবো।
অতঃপর চুমু ছুঁড়লো রণ।ব্যাথিত গলায় জানালো
“আলবিদা
ডিসকানেক্ট হলো স্যাটেলাইট ফোন।ভারী শ্বাস ফেলে গাছে হেলান দিয়ে চোখ বুঝলো রণ।চোখের সামনে স্পষ্ট দৃশ্যমান হলো মৌনতার অর্ধ নগ্ন পিঠ।রণ ঠোঁট এলিয়ে হেসে বলে উঠলো
“এমন মরনে প্রতি মুহূর্তে মরছি আমি, জ্বলছি নিরন্তর দহনে
চলবে
সারিকা হোসাইন ®
Share On:
TAGS: ভালোবাসার সমরাঙ্গন, সারিকা হোসাইন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১৪
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২০
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৩
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৬
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৩২
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৭
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৩০
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২৪
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১৫
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৪