ভালোবাসার_সমরাঙ্গন || ২ ||
সারিকা_হোসাইন
পাংশু মুখে ফোন হাতে দাঁড়িয়ে আছে মৌন।ফোনের ওপাশে আস্ত একটা বাঘ দাঁড়িয়ে।বেশ বেকায়দায় পড়লো মৌন।মানুষটার সাথে তার সম্পর্ক বড্ড বাজে।কাছে পেলেই অকারণে গালে চড় মারে খবিস লোক।আর কথায় কথায় মিলিটারি শিডিউল জারি করে বাড়িতে।টাইম টু টাইম ঘুম থেকে উঠা, পড়তে বসা,খাওয়া,রাতে ঘুমানো উফ অসহ্য যন্ত্রনা।যেই মানুষটাকে দুই চোখে সহ্য করতে পারে না মৌন সেই মানুষটার সাথে নাকি চার মিনিট কথা বলতে হবে।ভেবেই চোখের পলক ঝাপ্টে ঠোঁট বাঁকালো সে।মৌনতার নীরবতা সহ্য হলো না ওপাশের অধৈর্য মানবের।সে ধমকে উঠলো
“তোর বাপের টাকা দিয়ে ফোন করেছি?মুখে কথা আসছে না?সারাদিন তো হাজারটা বকবক করিস।আজ সব হাওয়া ফুস?
মৌন নড়েচড়ে উঠলো।এরপর মিন মিন করে বললো
“ক ক কি বলবো খুঁজে পাচ্ছি না।
“তাহলে গান গা।
মৌন চোখ গোল করে বললো
“ভুলে গেছি।
রণ ফস করে শ্বাস ছেড়ে বললো
“এলাকার খবর বল।
মৌন চারপাশে নজর বুলালো।তার মা বা বাড়ির অন্য কোনো সদস্যই নজরে লাগছে না।অথচ অন্য সময় বাড়িতে মানুষে ধরে না।আজ মৌনতার বিপদে কেউ এগিয়ে এলো না ভেবে মৌনতা মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো সে আজ ভাত খাবে না।এরপর ধীর গলায় বলে উঠলো
“জমিলা চাচীর মেয়ে নাসরিন দুদিন আগে ভেগে গেছে খায়রুল ভাইয়ের সাথে।বাড়িতে যেই বিড়াল টা ছিলো ওটা হারিয়ে গেছে।খুসবুর বর ওকে তালাক দিয়েছে।বড় দুঃখী মেয়েটা।আমার বান্ধবী তুলি!ওর বিয়ের সমন্ধ চলছে।ছেলে দেশের বাইরে থাকে।আর বাড়ির কালো গরুটা একটা বাছুর দিয়েছে।ষাঁড় বাছুর।বড় মার রাম ছাগলের পেটে বাচ্চা।আর….
“তোকে এলাকার খবর বলতে বলেছি মৌন।গরু ছাগলের বাচ্চার খবর শুনতে চাইনি।
ঠান্ডা গলায় বলে উঠলো রণ।মৌন ফাঁকা ঢোক গিলে চোখ বুজে এলাকায় কি কি ঘটনা ঘটেছে মনে করার চেষ্টা করলো।এরপর ভয়ার্ত গলায় বলে উঠলো
“বিল্লাল ভাই কয়েক দিন আগে ফাঁ সি দিয়ে মারা গেছে বট তলায়।জানো উনার পা মাটিতে লাগানো ছিলো।কিন্তু গলায় দড়ি।পুলিশ আত্ম হ ত্যাই বলছে।কিন্তু আমার বিশ্বাস হয় না।বিল্লাল ভাই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন।মানুষকে ধর্মের পথে আনেন।উনি কেনো অযথা ফা স নিবেন?
বলেই দাঁত দিয়ে নখ কাটলো মৌন।বিল্লালের মৃত্যু সংবাদে কপাল কুঁচকে এলো রণ’র।সে কিছু প্রশ্ন করবার আগেই রেহনুমা শুধালো
“কার সাথে কথা বলছিস?
মৌনতা যেনো প্রাণ ফিরে পেলো।রেহনুমার হাতে ফোন গুঁজে বলে উঠলো
“নাও মিলিটারি সাহেব।
মৌনতার বলা কথাটা রণ’র বেশ মনে ধরলো।ঠোঁট নাড়িয়ে নামটা উচ্চারণ করে ঠোঁট টিপে হাসলো।এদিকে ছেলে ফোন করেছে শুনেই কানে ফোন চেপে রেহনুমা বলে উঠলো
“বেঁচে আছিস তো বাবা?
রণ কুশলাদি বিনিময় করে বলে উঠলো
“আগামী সপ্তাহে বাড়ি ফিরবো মা।প্লিজ কাউকে কিচ্ছুটি বলো না।তুমি তো জানো আমার সবকিছু কত সিকিউর্ড।
রেহনুমা সায় জানিয়ে বললেন
“তুমি কিচ্ছু ভাবো না বাবা।আমি কাউকেই বলবো না।সহি সালামতে এসো।
রেহনুমার সাথে আরো কিছু কথা বলে লাইন কেটে বিল্লালের ভাবনায় বসলো রণ।মন বললো
,”থানার ওসির সাথে কথা বলে একবার পোস্টমর্টেম রিপোর্ট টা দেখতে হবে।
শান্ত স্নিগ্ধ পূব আকাশে ভোরের রক্তিম আলো ফুটতেই নির্মল বাতাসে ভেসে এলো তাল লয় হীন হারমোনিয়াম এর বাজনা সেই সাথে বেসুরা গলায় রবীন্দ্র সঙ্গীত।প্রথম প্রথম যে কেউ এই বিশাল অর্থবহ গানটা এহেন বে -ঢংয়ি গলায় শুনলে ভাববে রবীন্দ্রনাথের বিরহে কেউ গলা ফাটিয়ে কাঁদছে।কিন্তু বিষয়টি এমন নয়। মৌনতার ভোর বেলায় পাখ পাখালীর সাথে মিলেমিশে নিত্যদিনের সঙ্গীত রেওয়াজ করার অভ্যেস ।তারই কর্কশ সুর ভেসে আসছে নির্মল সমীরনে নিশ্চুপ শান্ত ভোরে।
মির্জা বাড়ির প্রধান কর্তা মির্জা দেওয়ান সাহেব সঙ্গীত মনা মানুষ।গান ভালোবাসেন এই ভদ্রলোক।তার স্ত্রী রাবেয়া বড্ড সুরেলা গলায় গান করতেন।প্রতিদিন সকাল বেলা স্বামীর শিয়রে বসে গুনগুন করে গান ধরতেন ভদ্র মহিলা।দেওয়ান মির্জা রোমাঞ্চিত হতেন সেই গানে।ডুবতেন সুখময় লহরিতে।বলতে গেলে দিনের সূচনা হতো সহধর্মীনির মিহি সুরেলা গলায়।এভাবেই রাবেয়ার কন্ঠ নিঃসৃত সুর বৃদ্ধের নিত্যদিনের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছিল।স্ত্রীর অকাল মৃত্যুর পর বৃদ্ধ অসহায় হয়ে পড়েন ।সঙ্গী হীন একাকী জীবনে নেমে আসে বিষাদের ছায়া।স্ত্রী এবং স্ত্রীর হাসি মাখা কন্ঠ বৃদ্ধকে বড্ড পীড়া দিতো।নানা দেশ বিদেশ ঘুরে একাকীত্ব কাটানোর চিকিৎসা নিয়েছেন এই ভদ্রলোক।কিন্তু ফলাফল হতাশা জনক।বৃদ্ধের দুর্দশায় চারপাশের মানুষ জন বুদ্ধি দিতেন দ্বিতীয় বিবাহের।কিন্তু ছোট ছোট ছেলে দুটোর মুখের পানে তাকিয়ে একাকী জিবন কাটিয়ে দেন বৃদ্ধ।কালের বিবর্তনে মির্জা দেওয়ানের ছেলেরা বড় হয়ে বিয়ে সাদি করে সংসার পাতলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি বৃদ্ধ।অ-দমনীয় রাগ ,চিৎকার ,চেঁচামেচি আর হাই প্রেসার দখল করে নিয়েছে পুরো শরীর টাকে।ঘুমের ঘোরেও আজকাল চিৎকার করেন তিনি।কিন্তু যখন স্বপ্নের মাঝে স্ত্রীর সেই সুর শুনেন তখন তার রাগ ঝরে পড়ে বালির বাঁধের ন্যয়।জাগ্রত হলেই আবার বিষাদময় তর্জন গর্জন।
নিঃসঙ্গ একাকী জীবনে বৃদ্ধ চেয়েছিলেন মির্জা বাড়ির কেউ একজন তার স্ত্রীর স্থান দখল করুক।যার হাসি এবং গলার স্বরে বৃদ্ধ মানসিক শান্তি আর কানের তৃপ্তি খোঁজে পাবেন।দুই পুত্রের ঘরে দুটো দুটো ছেলে সন্তানের পর দীর্ঘ দিন বাদে বিধাতার অশেষ রহমতে কন্যা সন্তান আসে মির্জা বাড়িতে।দেখতে হুবুহু রাবেয়া সাবেরির মতো।কতশত আদুরে নাম নির্বাচনের পর মৌনতা সাবেরি নামখানা মনে ধরে বৃদ্ধের।তাই আদর করে নাতনির নাম রাখেন মৌনতা।নাতনি তার চোখের মণি।বৃদ্ধ ভেবেছিলেন সব কিছুতেই মির্জা বাড়ির নাম উজ্জ্বল করবে এই নাতনি।কিন্তু বৃদ্ধের মুখে তরতাজা পায়খানা ছুড়ে মেরেছে এই মৌনতা সাবেরি।মুখ উজ্জ্বল তো দূর মানুষের সামনে মুখ দেখাতেও লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করে দিনে পঞ্চাশ বার।না গান বাজনায় ভালো না লেখাপড়ায় দক্ষ,না মাথার বুদ্ধিতে।শুধু তাই নয়।ধরে বেঁধে হাজার টাকা বেতন বাড়িয়েও আটকে রাখা যায়নি গানের মাস্টার কে।প্রথম কয়েক দিন এলেও সুরের রাগী মূর্ছনায় কোথায় লুকিয়ে পড়েন সেই মাস্টার বিধাতা বিহীন তা কেউ জানেনা এই ভ্রম্মান্ডের।কিন্তু এতো কিছুর পরেও কিছুতেই আফসোস নেই এই কিশোরীর।সে আটঘাট বেঁধে পড়তে বসে।কিন্তু মন তার পড়ার টেবিলে থাকে না।মন থাকে পাড়ার অলিতে গলিতে।আর ছোট ছেলে মেয়েদের খেলার আড্ডায়।বয়সের গন্ডি সতেরো পেরুলেও মন এখনো বারোর ঘরেই।শিশুসুলভ আচরণ এখনো তার পিছু ছাড়েনি।মির্জা দেওয়ানের কলিজার টুকরা বলে পরিবারের কেউ শাসন টুকু করতে পারে না এই মেয়েকে।লাগাম হীন এই মেয়ের অত্যাচারে কপাল ডিঙিয়ে ঘাম ঝরে বাড়ির প্রত্যেক সদস্যের।কিন্তু তাকে বাগে আনা দুঃসাধ্য।এই বাড়িতে তাকে শাসানোর মতো দ্বিতীয় কেউ নেই।তবে আছে একজন।যাকে মৌনতা যমের ন্যয় ভয় পায়।মানুষটা এবাড়িতে সব সময় থাকে না।বছরে দু,একবার সেই জমের সাথে মৌনতার সাক্ষাৎ হয়।তখন বাঁশের কঞ্চির ন্যয় সোজা তরতরে হয়ে থাকে সে।কিন্তু মানুষটা চলে গেলেই আবার বাঁকানো লতা,ঘিয়ে ভেজা চুঙের কুকুরের বাঁকা লেজ।দীর্ঘদিন লাগাম হীন উড়া হয়েছে।এবার বোধ হয় পায়ে বেড়ি পড়লো বলে।
“ডাকে পাখি ,মেলে আখি,
দ্যাখো সোনালী আকাশ……
গাহে ভোরের ও বাতাস…..
এলোমেলো বাজনা আর বেসুরে গলায় অর্ধেক গান শেষ করে দম ফেললো মৌনতা।বৃদ্ধ দেওয়ান নিশ্চুপ শুনলেন সেই সুর সাধনা।গানের শব্দে কানের পোকা ইতোমধ্যে অক্কা পেয়েছে বৃদ্ধের।কিন্তু তা মুখে প্রকাশ করে নাতনির মন ভাঙলেন না বৃদ্ধ।গানের শব্দে কিচিরমিচির সুর তোলা চড়ুই,শালিক সব কবেই পালিয়েছে।শুধু কয়েকটা দাঁড় কাক কা কা শব্দে ডেকে উঠছে।উঠানের আমগাছের পানে তাকিয়ে কপালের ঘাম মুছলেন বৃদ্ধ।শুভ্র সুন্দর ঠান্ডা সকালেও গানের সুরে তার ঘাম বেরিয়ে গেছে।তর্জনী আঙুলে কপালের ঘাম মুছে হাফ ছেড়ে শ্বাস টানলেন দেওয়ান মির্জা।এরপর মৌন কে বলে উঠলেন
“এবার পড়তে বসো দাদুভাই।অনেক গান বাজনা হয়েছে।আমরা আবার কাল সুর সাধনা করবো।
বলেই কাজের ছেলে আক্কাস কে হাঁক ছাড়লেন
“এক কাপ চা দিয়ে যা আক্কু।
মৌনতা হাসি মুখে নিজের হারমোনিয়াম আর গানের খাতা গুছাতে মনোনিবেশ করলো।যেনো খুব বড় সুনামের কাজ শেষ করলো মাত্রই।চোখে মুখে তার দম্ভের ছিটেফোঁটা।স্কুলের অংক স্যার তাকে কাঁধ চাপড়ে বলেছে আর কয়েকদিন চেষ্টা করলে রুনা লায়লা কে ছাপিয়ে যাবে সে।সেই আশায় রেওয়াজ বাড়িয়েছে দ্বিগুন হারে।প্রশংসা যেহেতু অংক স্যার পর্যন্ত পৌঁছেছে তবে টিভিতে অডিশন দিতে আর দেরি কিসের?
দেওয়ান মির্জার হুকুম পেয়ে আক্কাস দৌড়ে এক কাপ চা এনে হাঁপিয়ে বলে উঠলো
“এই নেন নানা জান।আফনের চা।
চায়ের পেয়ালা হাতে নিয়ে নাক ফুলালেন ভদ্রলোক।এরপর চোখ গরম করে দাঁত কটমট করে শুধালেন
“এই চা কে দিয়েছে?
চায়ে নজর বুলিয়ে জিভ কাটলো আক্কাস।চা ভর্তি পিঁপড়ের মরদেহ।কি সুন্দর সেগুলো চা’কেলী খেলছে গরম দুধ চায়ে।আক্কাস উত্তর করবার আগেই দেওয়ান মির্জা আবার ধমকে উঠলেন
“কে করেছে এই চা?তাকে ধরে আন আমার সামনে।তাকে দিয়ে এই পিঁপড়া গেলাবো আমি।
আক্কাস দৌড়ে গিয়ে কাজের মেয়ে চামেলিকে নিয়ে এলো।এরপর ভয়ার্ত চামেলির হাতে চায়ের কাপ তুলে দিয়ে বলে উঠলো
“এই চা চামেলি করছে নানা জান।ওরে কি করতে হইবো হুকুম করেন খালি।বাকিডা আমি দেখতাছি।
আক্কাস এই বাড়ির ক্ষমতাধর কাজের লোক ।দেওয়ান মির্জার খুব কাছের মানুষ বলে বাড়ির অন্যান্য কাজের লোক তাকে দেখে ভয়ে তটস্থ থাকে।সেই ফায়দা লুটে সকলের উপর অদৃশ্য চাবুক চালায় আক্কাস।আক্কাসের ঠোঁট মুখ আর চোখের অবস্থা দেখে ভয়ে কেঁদে দেবার অবস্থা হলো চামেলির।হাতের ইশারায় আক্কাস কে সরে যেতে বলে নিজের তিরিক্ষী মেজাজ আরেকটু চটিয়ে দেওয়ান মির্জা বলে উঠলো,
“পিঁপড়া গুলো চা থেকে তুলে চেটে চেটে খা চামেলি।শুধু তাই নয়।আগামী এক সপ্তাহের প্রতিদিন সকালে জ্যান্ত পিঁপড়ে ধরে গিলে খাবি।বেখেয়ালি পনার জন্য এটাই তোর শাস্তি।
চামেলি ঘাড় কাত করে সায় জানিয়ে পিঁপড়ে গুলো গিলে ভয়ে ভয়ে শুধালো
“আরেক কাপ আনমু নানা জান?
উত্তর করলেন না দেওয়ান মির্জা।ভয়ে চুপসে গিয়ে কাপ সমেত সটকে পড়লো চামেলি।যেনো খুব বাঁচা বাঁচলো সে।
এদিকে নিজের সব কিছু গুছিয়ে মৌনতা বলে উঠলো
“চিনিতে পিঁপড়ে থাকবে এটাই স্বাভাবিক দাদুভাই।এটা নিয়ে অযথা তুমি রাগ করছো।পিঁপড়ে তো আর ডায়বেটিস এর রোগী নয় যে,চিনি খেতে তার মানা।
দেওয়ান মির্জা এবারও জবাব দিলেন না।কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে নাতনির উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন
“সামনে তোমার টেস্ট পরীক্ষা।আপাতত গানের রেওয়াজ বন্ধ দিয়ে সকাল বিকাল লেখাপড়াতে মন দিলেই আমি খুশি হবো।একই গান দু মাস ধরে শুনছি।পরীক্ষার পর নতুন গান শুনবো।
মৌনকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই হনহন করে উঠে গেলেন দেওয়ান মির্জা।মৌনতা ঠোঁট উল্টে দাদার যাবার পানে তাকিয়ে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইলো।এরপর আক্কাস কে শুধালো
“গানটা কেমন হলো আক্কু ভাই?
ফাকা ঢোক গিলে আক্কাস বলে উঠলো
“মিছা কৈলে পাপ হয়।আর আমি মিছা করতেও পারিনা। মিলিটারি ভাইজানের কঠিন নিষেধ আছে মিছা না কইতে।কিন্তু বিশ্বাস করেন অফামনি এই গানের সুরে আমার পায়খানা করতে কষ্ট হয়।বেসুরা চিৎকারে আমি বিরক্ত হই।আমার পেটে মোচড় ধরে না।সারাদিন খুব কষ্টে কাটে।গান বাজনা সবার জন্য না।আফনে এইবার খ্যামা দেন।মিলিটারি ভাইজান বাড়ি আইলে আফনেরে গলা টিপপা মাইরা ফালাবো এই বেসুরে গলায় তার ঘুম ভাঙলে।বাকিডা আফনের ইচ্ছা।আমি গেলাম।সঙ্গীত সাধনার নাম কইরা অনেক অত্যাচার করতাছেন আফনে।
আক্কাসের করা অপমানে চোখ ফেটে জল এলো মৌনতার।সে গানের খাতা শক্ত হাতে চেপে ধরে কাঁদলো।কিন্তু কোনো শব্দ হলো না।তার কান্নার ধরণই এমন।হা করে কাঁদলেও গলা দিয়ে এক বিন্দু আওয়াজ গড়ায় না।শুধু দাঁত গুলো দেখা যায়।বড্ড বিশ্রি সেই কান্না।কিন্তু আক্কাসের এই দুঃসাহস এর ও একটা বিহীত করা প্রয়োজন।কান্না কাটি পরে।আগে তার গলা সত্যিই বেসুরে নাকি সুরেলা তার প্রমান হোক।
গানের শব্দ থামতেই নিজেদের কান থেকে গুঁজে রাখা তুলো ছুড়ে ফেললো মির্জা বাড়ির প্রত্যেকে।মৌনতার বাবা সাদমান মির্জা রক্ত চক্ষু নিয়ে স্ত্রীর পানে তাকিয়ে ধমকে উঠলেন
“যদি জানতাম মেয়ে এমন গাঁধী আর বেসুরে গলার শিল্পী হবে তবে জন্মের পরেই নুন খাইয়ে মেরে জেলে গিয়ে বসে থাকতাম।বুঝলে?প্রতিদিন এতো এতো কানের অত্যাচার আর নেয়া যাচ্ছে না।তাছাড়া মানুষের সামনে মুখ দেখাতেও লজ্জা।বিয়ের একটা সমন্ধ পর্যন্ত আসেনা তোমার মেয়ের ।কি পাপ যে করেছিলাম আল্লাহ জানে।ছেলে দুটোকে তবু লাইনে আনতে পেরেছি।মেয়ে টা একেবারে খোদার ছেড়ে দেয়া লাল ষাড়।মাঝে মাঝে আমার কি মনে হয় জানো?এ আমার মেয়েই নয়।মির্জা বংশের মেয়ে তো এমন পাগল ছাগল হতে পারে না।সত্যি করে বলতো শায়লা এই মেয়ে কার?
স্বামীর এহেন প্রশ্নে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন শায়লা।তিনি প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগেই রাগে গজগজ করতে করতে খাবার না খেয়েই উঠে গেলেন সাদমান মির্জা।স্কুলের হেড মাস্টার তাকে পথে পেলেই আকার ইঙ্গিতে মেয়ের বুদ্ধিহীন ঘিলু নিয়ে কথা শোনায়।দেওয়ান মির্জার দাপটে তেমন শক্ত করে কিছু বলতে না পারলেও উপমা ব্যবহার করে কিছু বলা বাদ ও রাখেন না ভদ্রলোক।প্রতিদিন একই ঘ্যানর ঘ্যান আর শুনতে ইচ্ছে করে না।এদিকে রাত পোহালেই আরেক আযাব এসে হাজির হয়।বারবার বারণ করা সত্ত্বেও হারমোনিয়াম নিয়ে বসে চিৎকার চেঁচামেচি করে মেয়েটা।এই পরিস্থিতি মোকাবেলার উপায় কি?
নানাবিধ ভাবতে ভাবতে বাড়ি ছেড়ে বাইরে বেরুতেই পাড়ার ঘটক টুক্কু মোল্লার সাথে দেখা হলো।ভদ্রলোক তর্জনী আঙ্গুল থেকে অল্প চুন নিয়ে জিভের ডগায় লাগিয়ে পান চিবুতে চিবুতে সাদমান মির্জার সামনে এসে সালাম দিলেন
“সালাম মির্জা সাব।খবর ভালা?
সাদমান কপাল কুঁচকে নিজের পথে হাটলেন।পাত্তা পেতে টুক্কু মোল্লা উঁচু গলায় বললেন
“মাইয়ার লাইগা একটা সমন্ধ আনছি।পোলা হাজারে একটা।পুরাই সোনার টুকরা।শহরে বিশাল ব্যবসা।কোটি পতি বাপের একটাই পোলা।যদি চান তাইলে কথা কইতে পারি।
মেয়ের বিয়ের সমন্ধের কথা শুনে পা থামালেন সাদমান।এরপর উজ্জ্বল মুখে বললেন
“দেখি কেমন সোনার টুকরা?
লাল লাল দাঁত বের করে প্রশস্ত হাসলেন টুক্কু মোল্লা।এরপর বায়োডাটা বের করার বাহানায় গড়িমসি করে বললেন
“চলেন আফনের দোকানে বসি।খাঁড়ায় খাঁড়ায় শুভ কাজের আলাপ করলে ভালো দেখায় না।
সাদমান বুঝলো হাতের মুঠোয় টাকা না গুজলে এই বজ্জাত ঘটক ছবি দেখাবে না।তাই মাথা ঝাকিয়ে নিজের মটর সাইকেল এর পিছনে ঘটক কে তুলে ছুটলেন বাজারে নিজের বিশাল কাপড়ের দোকানে।
গায়ে বাসন্তী রঙের সুতি জামা জড়িয়ে চোখে মোটা করে কাজল টানলো মৌন।বড় বড় চোখ জোড়া দেখতে বেশ লাগছে।গোলাপি ঠোঁটে অল্প লিপস্টিক মেখে ঠোঁট পিষে মিলিয়ে নিলো।ফর্সা কপালে কালো একটা টিপ পরে পিঠ জোড়া চুল গুলো বিনুনি করলো।সামনের বেবি হেয়ার গুলো কপালের দু পাশে ছড়িয়ে গালে একটু ফেসপাউডার মেখে আয়নায় নিজেকে পরখ করলো।দেখতে বেশ লাগছে।গ্রামের সব চেয়ে সুন্দরী বললেও কম হবে।গায়ের ওড়নাটা ঠিক করে অংক বই হাতে নিয়ে ঘরের বাইরে বেরুতে পা বাড়ালো মৌন।এমন সময় শায়লা পথ আগলে দাঁড়িয়ে শুধালেন
“সিনেমার শুটিং করতে যাচ্ছেন আম্মা?
কপাল কুঁচকে ঠোঁট ফুলিয়ে মৌন বললো
“কাঁচারি ঘরে প্রাইভেট পড়তে যাচ্ছি মা।শুটিংয়ে কেনো যাবো?
শায়লা চোয়াল শক্ত করে ঠোঁটে কাঠিন্য ভাব ফুটিয়ে বলে উঠলেন
“দূতলা থেকে নেমে দশ কদম বাদে কাঁচারী ঘর।তাতেই এতো সাজ সজ্জা?মাস্টারের চোখে ভেলকি লাগানোর ধান্দা করছিস তাই না?
মৌন কপাল কুঁচকে রাগ দেখিয়ে বললো
“কি বলছো মা?শিক্ষক বাবার সমান।
“কিন্তু উনার বয়স তো তোমার বাপের সমান না।
বলেই পিঠে এক কিল বসিয়ে ধমকে বলে উঠলেন
“টিপ খোল হারামজাদী।মাথায় ঘোমটা দে।আর স্যার কে বলবি আগামী মাসে থেকে তাকে আর আস্তে হবে না।তার হাবভাব সুবিধার না।
“কিন্তু মা উনি অনেক ভালো পড়ান।
“ভালো পড়ানোর মাস্টার আইতাছে।তুই ইয়ানাফাসী পড়।লম্বা ঠ্যাঙ আর লম্বা থাকবে না তোর।কারেন্টের তারের মতো সোজা টনটনে হয়ে থাকতে হবে বুঝলি?
চলবে…
Share On:
TAGS: ভালোবাসার সমরাঙ্গন, সারিকা হোসাইন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২৯
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২৫
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১৯
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২৪
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৯
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৭
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২২
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১৮
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১৬
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২৭