Golpo romantic golpo নির্লজ্জ ভালোবাসা

নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৫


নির্লজ্জ_ভালোবাসা

লেখিকাসুমিচোধুরী

পর্ব ৭৫ (❌কপি করা নিষিদ্ধ❌)

দুপুরের রোদটা কড়া হয়ে জানলার গ্রিল দিয়ে ড্রয়িং রুমে এসে পড়েছে। তিথি অনেকক্ষণ রুমে নিজেকে বন্দি করে রাখার পর অবশেষে বের হলো। খিদেয় তার পেট যেন জ্বলে যাচ্ছে। তনুজা খান কয়েকবার ডেকে গিয়েছিলেন, কিন্তু তিথি পরে খাবে বার বার বলছে। সব শেষে এখন পেটের ভেতরে মোচড় দিয়ে ওঠা খিদের কাছে সে হার মানল।

ধীর পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল তিথি। পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ। শিহাব আরশি, নেহাল আরফা চলে গেছে৷ আনোয়ার খান, আশিক খান আর আরিফুল খান সবাই হয়তো যার যার রুমে বিশ্রাম নিচ্ছেন। ড্রয়িং রুমেও কেউ নেই। তিথি রান্নাঘরে গিয়ে দেখল টেবিলে সাজানো হরেক পদের খাবার। ইলিশ মাছ, মাংস, সবজি আরো অনেক কিছু! কিন্তু খাবারের ঘ্রাণ নাকে আসতেই তার ভেতরটা আবার ওলটপালট করে উঠল। এসব ভারী খাবার তার মুখ একদমই সইবে না।

অসহায় হয়ে তিথি ফ্রিজটা খুলল। পেছনের দিকে রাখা আমের আচারের বয়মটা ওর চোখে পড়তেই জিভে জল চলে এল। সে কোনো কথা না বাড়িয়ে প্লেটে সামান্য ভাত নিল আর অনেকটা আচার নিয়ে তৃপ্তি করে খেতে শুরু করল। ভাতের সাথে আচারের সেই টক-ঝাল স্বাদটা যেন এই মুহূর্তে ওর কাছে অমৃত মনে হচ্ছে।

ঠিক সেই সময় পানি পিপাসা পাওয়ায় হিমি খান নিজের রুম থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরে এলেন। ভেতরে ঢুকতেই তিথির কাণ্ড দেখে তিনি অবাক হয়ে থমকে দাঁড়ালেন। তিথি আয়েশ করে আচার দিয়ে ভাত খাচ্ছে দেখে তিনি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন।

“আরে তিথি! তুই এই অসময়ে আচার দিয়ে ভাত খাচ্ছিস কেন রে? বাড়িতে এতগুলো মাছ-মাংসের আইটেম রাখা আছে, তনুজা বুবুু কত করে তোকে ডাকল, আর তুই এসব ফেলে এই টক খাচ্ছিস?।”

হিমি খানের সরাসরি প্রশ্নে তিথি ভেতরে ভেতরে ভীষণ ঘাবড়ে গেল। মুখের ভাতটা কোনোমতে গিলে নিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল সে। একটু অপ্রস্তুত হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে বলল।

“আসলে আম্মু, সবসময় তো ওই মাছ-মাংস আর রিচ ফুড দিয়েই খাই। আজকে কেন জানি ওসব একটুও ভালো লাগছিল না। হুট করেই মনে হলো অন্য কিছু দিয়ে খাই, তাই এই আচারটা বের করলাম আর কী!”

হিমি খান এবার আরও গভীর সন্দেহ নিয়ে তিথির দিকে তাকালেন। তিনি ভালো করেই জানেন, তিথি আগে কখনও টক বা আচার দিয়ে এভাবে ভাত খেতে পছন্দ করত না। তিনি এক পা এগিয়ে এসে ভ্রু কুঁচকে বললেন।

“কিন্তু তুই তো আগে কখনও টক দিয়ে ভাত খেতে পারতিস না? তোর তো আবার টক খেলে দাঁত টকিয়ে যায়। আজকে হঠাৎ এত রুচি এল কোত্থেকে?”

হিমি খানের জেরা শুনে তিথির মনে হলো সে বুঝি এবার নিশ্চিত ধরা পড়ে যাবে। তার কপালে সামান্য ঘাম জমে উঠল। সে আবারও সেই জোরপূর্বক হাসিটা ধরে রেখে চটজলদি জবাব দিল।

“আরে আম্মু, আগে খাইনি বলে কি এখনও খেতে পারব না? আসলে অনেকদিন পর আচারের গন্ধটা নাকে আসতেই মন চাইল। জিভে জল চলে এল তো, তাই ভাবলাম একটু খেয়ে দেখি কেমন লাগে। খারাপ লাগছে না কিন্তু!”

হিমি খান তিথির মুখের দিকে কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। কী যেন একটা ভাবলেন, তারপর ছোট করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন।

“আচ্ছা খা। তোর, যা খেতে ইচ্ছে করে তাই খা।”

হিমি খান আর কথা বাড়ালেন না। তিনি জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে খেলেন এবং ধীরপায়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেলেন। তিনি চলে যেতেই তিথি প্লেটটা পাশে রেখে নিজের বুকে হাত দিয়ে একটা লম্বা স্বস্তির শ্বাস ফেলল। তার হৃদপিণ্ড তখনো ধকধক করছে ফিসফিস করে নিজেকেই বলল।

“উফ! যাহ বাবা, এ যাত্রায় বেঁচে গিয়েছি। আম্মু যেভাবে তাকাচ্ছিল, আমি তো ভেবেছিলাম সব বুঝে ফেলেছে।”

[রাত ১০:০০ টা]

রাতের আঁধার ঘন হয়ে চারপাশ ঢেকে ফেলেছে। তুরা একা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু তার মন পড়ে আছে অন্য কোথাও। বাম হাতের ফোনটা সে বারবার অন করে স্ক্রিনের দিকে তাকাচ্ছে। রৌদ্র কি এখনো পৌঁছায়নি? কেন সে কোনো কল বা মেসেজ দিচ্ছে না? অপেক্ষার প্রতিটা সেকেন্ড যেন তুরার কাছে এক একটা ঘণ্টার মতো দীর্ঘ মনে হচ্ছে।

হঠাৎ তুরার হাতের ফোনটা ‘টুন টুন’ শব্দ করে বেজে উঠল। খুশিতে তুরার বুকটা ধক করে উঠল। সে দ্রুত স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখল রৌদ্রই মেসেজ দিয়েছে। মেসেজটা পড়ে তুরার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।

“আমার বাবুর আম্মু, এত চিন্তা করতে হবে না। বাবুর আব্বু ঠিকঠাক মতো চলে এসেছে। এখন আর ওভাবে মন খারাপ করে মুখটা গোমরা করে রেখো না তো, একটু হাসো দেখি!”

রৌদ্রের এই পাগলামি ভরা মেসেজটা পড়ে তুরার সব ক্লান্তি যেন এক নিমিষে ধুয়েমুছে গেল। লোকটা আসলেই তার মনের সব খবর রাখতে পারে। তুরা তড়িঘড়ি করে রিপ্লাই লিখল।

“পৌঁছেছেন আপনি?”

ওপাশ থেকে প্রায় সাথে সাথেই উত্তর এল।

“হুম, মাত্র আসলাম। আই এম ফিলিং রিয়েলি টায়ার্ড।শরীরটা একদম চলছে না। আমি ফ্রেশ হয়েই তোমাকে কল দিচ্ছি। ডোন্ট স্লিপ বিফোর মাই কল, ওকে।”

রৌদ্রের ক্লান্তির কথা শুনে তুরার মায়া হলো। সে দ্রুত লিখল।

“আচ্ছা ঠিক আছে। আপনি আগে ফ্রেশ হয়ে একটু রেস্ট নিন।”

ফোনটা বুকের সাথে চেপে ধরে তুরা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। যাক, রৌদ্র অন্তত নিরাপদে পৌঁছেছে।

আয়ান ক্লান্ত শরীরে অফিস থেকে বাড়ি ফিরল। সারাদিনের কাজের চাপ আর মনের ভেতরের অস্থিরতা তাকে যেন কুরে কুরে খাচ্ছে। রুমে ঢুকে সে কোনো দিক না তাকিয়ে সোজাসুজি ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল। ফ্রেশ হয়ে টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে আয়ান যখন চুল মুছতে মুছতে আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল, তখন হঠাৎ তার নজর পড়ল চারপাশটা বড্ড বেশি ফাঁকা।

আয়ান লক্ষ্য করল তিথি রুমে নেই। সে না চাইতেও রুমের কোণায় কোণায় চোখ বুলাল, কিন্তু কোথাও তিথির দেখা মিলল না। আয়ান মনে মনে ভাবল, হয়তো তিথি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু সেখানে গিয়েও দেখল জায়গাটা জনশূন্য। রাত বাড়ছে, অথচ তিথি ঘরে নেই এই চিন্তাটা আয়ানকে হঠাৎই বিচলিত করে তুলল। সে অস্থির পায়ে তিথির সেই পুরনো রুমের সামনে গেল, কিন্তু দেখল দরজায় তালা ঝুলছে।

আয়ান বুঝতে পারছে না এত রাতে তিথি কোথায় যেতে পারে। হঠাৎ তার মাথায় এল ছাদের কথা। ধীর পায়ে সে ছাদে উঠে এল আর পা বাড়াতেই তার শরীরের গতি থমকে গেল। ছাদের এক কিনারে গ্রিল ধরে তিথি একাকী দাঁড়িয়ে আছে। রাতের দখিনা বাতাসে তার লম্বা চুলগুলো এলোমেলোভাবে উড়ছে, যেন এক বিষণ্ণ পরী দাঁড়িয়ে আছে আকাশের নিচে।

আয়ান পা টিপে টিপে তিথির দিকে এগোতে চাইল, কিন্তু কয়েক কদম যেতেই আবারও তার পা জমে গেল পাথরের মতো। তিথির গলার করুণ সুর বাতাসে ভেসে এসে আয়ানের বুকে আছড়ে পড়ল। তিথি চোখ বন্ধ করে আকাশের চাঁদটাকে সাক্ষী রেখে আপন মনে গেয়ে উঠল।

               ~যেটুকু সময় তুমি থাকো কাছে~
               ~মনে হয় এ দেহে প্রাণ আছে~
               ~বাকিটা সময় যেন মরণ আমার~
               ~হৃদয় জুড়ে নামে অথয় আঁধার~

আয়ান তিথির সেই করুণ সুরের গান শুনে বুকের ভেতর এক তীব্র দহন অনুভব করল। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না, তাই একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের পা ঘুরিয়ে চলে আসতে চাইল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে তিথির অস্ফুট কণ্ঠস্বরে কিছু একটা শোনার পর আয়ান থমকে দাঁড়াল। তিথি একা একা কার সাথে কথা বলছে, সেই কৌতূহল আয়ানকে এক পা-ও নড়তে দিল না। আয়ান আরেকটু এগিয়ে গিয়ে বেশ কৌতূহল নিয়ে শুনতে লাগল তিথির কথা গুলো।

এদিকে তিথির চোখ থেকে তখন শ্রাবণের ধারার মতো অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সে নিজের পেটে দুই হাত পরম মমতায় রেখে পরম আবেগে বলতে লাগল।

“বাবু,তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছো? জানো সোনা, তুমি যে এই পৃথিবীর আলো দেখতে আসছো, এই খবরটা তোমার হতভাগী মাম্মা ছাড়া আর কেউ জানে না। এমনকি তোমার বাবাও এই খবরটা জানে না।জানো সোনা, তোমার বাবা আমার ওপর পাহাড় সমান অভিমান করে আছে। আমার সাথে একটা কথা পর্যন্ত বলে না। আমাকে দেখলেই সে ঘৃণাভরে দূরে চলে যায়। আমি চাইলেও তোমার কথা তোমার বাবাকে বলতে পারছি না। কারণ, আমি এক মস্ত বড় অপরাধের বোঝা কাঁধে নিয়ে চলছি। আমার সেই ভুলের শাস্তি আজ তোমাকে আর আমাকে দুজনকে পেতে হচ্ছে। তোমার মাম্মাকে ক্ষমা করো সোনা, আমি তোমাকে তোমার বাবার অধিকারটুকুও দিতে পারছি না।”

রানিং….!

ছোট হলো মানিয়ে নিও শরীরটা অনেক খারাপ তাই বড় করে লিখতে পারলাম না ভুল ক্রুটি হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেইখো।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply