Golpo romantic golpo তোমার হাসিতে

তোমার হাসিতে পর্ব ১৫


তোমার_হাসিতে

ফারহানাকবীরমানাল

১৫.
দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুম উড়ে যায়। তবে আজ আমার বেলায় ব্যতিক্রম ঘটলো। বিছানায় পিঠ ঠেকাতেই চোখে ঘুম জড়িয়ে এলো। সারারাত অঘোরে ঘুমলাম। ঘুম ভাঙল অনেক বেলায়। রোদে ঝলমল করছে চারদিক। ঘড়িতে বাজছে আটটা উনপঞ্চাশ। চমৎকার সকাল। মন ভালো করে দেবার মত চমৎকার।

তিমু আমার চেয়ারে বসে পা দোলাচ্ছে। রাতে দরজার ছিটকিনি তুলেছিলাম কি-না মনে করতে পারলাম না। শুকনো গলায় তিমুর নাম ধরে ডাকলাম। তিমু আমার কণ্ঠ শুনেই পেছনে ফিরল। উজ্জ্বল গলায় বলল, “মনে হচ্ছে আমি চিরকুটের সমাধান করতে পেরেছি।”

চোখ-মুখে বিস্ময়ের ছাপ পড়ল।

“এত সহজে?”

“উদ্ভট কথার মানে খুব সোজা হয়।”

“ঠিক বুঝলাম না।”

তিমু উঠে এসে খাটের উপর বসল। হাতের খাতা খুলে বলল, “এই দেখো। বলেছিলে এগুলো গল্পের ফ্ল্যাপ। আসলেই তাই। প্রথম, চতুর্থ এবং পঞ্চম চিরকুটের বইয়ের নাম– অদৃশ্য সুতোর টান। দ্বিতীয় চিরকুটের বইয়ের নাম– পাশাপাশি দু’টো ঘর এবং তৃতীয় চিরকুটের বইয়ের নাম– কাপড়ে মোড়ানো ফুল।”

“তুই কীভাবে জানলি?”

“ইন্টারনেট ঘেঁটে বের করেছি। বইয়ের গল্পে খানিকটা রহস্য এবং তদন্তে ছাপ আছে। তবে আসল রহস্য নামের ভেতরে।”

“বলতে চাইছিস বইয়ের নামের ভেতরে সব রহস্য লুকিয়ে আছে?”

“আমার তেমনটাই মনে হচ্ছে।”

“কিন্তু আমার তেমন মনে হচ্ছে না। সবকিছু খুবই বিরক্তিকর লাগছে রে তিমু।”

কথাগুলো বলে একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেললাম। তিমু বলল, “সবকিছু বিরক্তিকর লাগছে! কিন্তু কেন?”

“কী চেয়েছিলাম আর কী হচ্ছে! ভেবেছিলাম নিজের রোজগারের টাকায় মাকে সোনার আংটি গড়িয়ে দেব। কাজও শুরু করেছিলাম। কিন্তু মাঝপথে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল।”

“জীবনের সবকিছু আমাদের ইচ্ছেয় হয় না। হয়তো তুমি খুব সহজে আংটি বানিয়ে ফেলতে পারতে, ভীষণ কঠিন পরিশ্রম করলে এমন কিছু সম্ভব হতো। তবে!”

“তবে?”

“সবকিছু তোমার পছন্দের হবে এমন কোথাও লেখা নেই। যদি তুমি ছোট মামানির ব্যাপারে আগ্রহ না দেখাতে অথবা সে এক ছেলের হাত ধরেছিল– এ কথা বাড়ি না বলতে তাহলে ব্যাপারটা ভিন্ন হতো।”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিমুর দিকে তাকালাম। সে বেশ গুছিয়ে কথা বলছে। তিমু বলল, “চিরকুটের ব্যাপারে বলি?”

“বল।”

“আমার মনে হয় বাদশা ভাইকে কেউ বা কারা অপহরণ করেছে। এবং এই ঘটনার এক বা একাধিক সাক্ষী আছে। তবে তাদের কেউ সামনে আসতে চাইছে না।”

“কিন্তু আমি কীভাবে বুঝব?”

“বইয়ের নামগুলোর মধ্যে কিছু রহস্য লুকিয়ে আছে। আচ্ছা আমাকে একটা কথা বলো। তুমি যে জায়গায় কাজ করতে যাও সেখানে পাশাপাশি দু’টো ঘর আছে?”

মাথা দুলিয়ে না বললাম। তিমু বলল, “এই চিরকুটগুলোয় এমন একটা জায়গার কথা বলা হয়েছে– যেখানে পাশাপাশি দু’টো ঘর আছে। ঘরের ভেতরে, সামনে কিংবা আশেপাশে কাপড়ে মোড়ানো ফুল বা এই জাতীয় কিছু আছে। অদৃশ্য সুতোর টান ধরে এগোলে এসবের খোঁজ পাব।”

তিমু আমার চোখের দিকে তাকালো। আমি খুব শান্ত ভঙ্গিতে বললাম, “বুঝেছি।”

“মুখ হাত ধুয়ে সকালের নাস্তা করে নাও। কাজের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে।”

“তুই আমার সাথে যেতে চাইছিস?”

তিমু বলল, “মা যেতে দিবে তো?”

ওর কণ্ঠস্বর খুব অসহায় শোনালো।

সকালে খাওয়ার আয়োজন ভালো না। রুটি বানিয়েছে, শক্ত। হাত দিয়ে ছেঁড়া যাচ্ছে না। সবজিতে লবণ নেই। কোন রকমের নাকেমুখে গোঁজার চেষ্টা করছি। ফুফু আমার পাশের চেয়ার টেনে বসল। নরম গলায় বলল, “তোকে একটা কথা বলি।”

ফুফুর দিকে তাকালাম না। দাঁত দিয়ে রুটি ছিঁড়তে ছিঁড়তে মাথা দোলালাম। ফুফু বলল, “বড় ভাবীকে নিয়ে আসবি? বাড়িটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।”

“আসব।”

“তিমুটা তোর সাথে যেতে চাইছে। ওকে নিয়ে যাস।”

“তৈরি হতে বলো। দুপুরে খেয়েদেয়ে আসব।”

“আচ্ছা।”

ফুফু উঠে গেল। তিমুর পরিকল্পনা, তাই হ্যাঁ মিলিয়ে গেলাম। বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর তিমু বলল, “আমাদের কাজ কী?”

“আপাতত কাজে যাব। আমি বসে বসে কাজ করব। তুই খৈ ভাজবি।”

“সে না হয় ভাঁজলাম। তবে আমার মনে হয় না– তোমার কাজের জায়গাতে আমকে এলাউ করবে।”

“করবে না কেন?”

“জানি না। তবে আমার এমনই মনে হচ্ছে।”

তিমুর কথা সত্যি হলো। মনির তিমুকে দেখেই রে রে করে উঠল। ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল, “এইখানে বাইরে লোক এলাউ না৷ কেন এনেছ?”

প্রশ্ন করল ঠিকই তবে কথার জবাব দেওয়ার সময় দিলো না। চিল্লাপাল্লা শুরু করল। তার চিৎকার শুনে বড় স্যার পর্যন্ত উঠে এলেন। স্বাভাবিক গলায় বললেন, “কী হচ্ছে? এত চিৎকার চেঁচামেচি কীসের?”

মনির বলল, “সাইডে মেয়ে ঢুকিয়েছে।”

“কে ঢুকিয়েছে?”

“সাজ্জাদ। নতুন এসে ধরাকে সরা জ্ঞান করছে।”

আমি তার কথার জবাব দিলাম না। তিমু বলল, “ভাইয়ের কাজকর্ম দেখতে এসেছি। এখানে দোষের কী আছে?”

মনির চোখ মোটা করে তিমুর দিকে তাকালো। বড় স্যার বললেন, “সমস্যা নেই। দেখো। তবে আমাদের এখানে কোন মেয়ে কাজ করে না। সবাই পুরুষ মানুষ। নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে মেয়ে মানুষের আসা নিষেধ। তবে সমস্যার কিছু নেই। তুমি ঘুরেটুরে দেখো। এই মনির, বাবুকে একটা চেয়ার এনে দে।”

তিমুর জন্য আমার পাশে একটা চেয়ার বরাদ্দ হলো। তিমু চেয়ারে বসে পা দোলাতে দোলাতে বলল, “এখানে একটা ঝামেলা আছে।”

“কী ধরনের ঝামেলা?”

“আমার মনে হয় এইসব জিনিস চোরাকারবারির।”

আৎকে উঠে তিমুর দিকে তাকালাম। সে সরল ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে। যেন তেমন কিছু বলেনি।

“তুই কীভাবে বুঝলি?”

“জায়গাটা নিরিবিলি। আশেপাশে লোকজন নেই। আমাকে দেখেই অমন চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করেছে মানে ঝামেলা আছে। বহিরাগত লোক ঢুকলে সমস্যা।”

“কীভাবে এত নিশ্চিত হচ্ছিস?”

“বড় স্যারের ব্যবহার দেখে।”

তিমু আর কোন কথা বলল না। লাঞ্চ ব্রেক পর্যন্ত নিরিবিলি বসে পা দোলালো।

“আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে, সকালে যা খেয়েছি!”

তিমু বলল, “বাজে খাবার ছিল?”

“নাহ! ভালো ছিল৷ আমার জীবনে এত ভালো খাবার খাইনি।”

তিমু খিলখিল করে হেঁসে উঠল। ওকে নিয়ে রইস উদ্দিনের হোটেলে গেলাম। রইস উদ্দিন উনুন জ্বালিয়ে আগুন পোহাচ্ছে। আমাদের দেখে দাঁত বের করে হাসল। কোমল গলায় বলল, “আজকে রান্নার আয়োজন ভালো। মাদুর বিছিয়ে দেব?”

মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালাম। রান্নার আয়োজন ভালো। সত্যিই ভালো। গরুর গোশতের কালা ভুনা, দেশি মুরগির কোরমা। হাত ধুয়ে খেতে বসে পড়লাম৷ রান্না স্বাদ ভালো। তিমু তো খাওয়ার ভেতরেই রান্নার প্রশংসা শুরু করে দিলো৷ রইস উদ্দিন বলল, “ম্যাডামকে তো চিনলাম না।”

“আমার বোন। কাজ দেখতে এসেছে।”

“মেয়ে মানুষের এই অঞ্চলে যাতায়াত করা ঠিক কথা না।”

খাওয়া থামিয়ে তার দিকে তাকালাম। ভ্রু কুঁচকে বললাম, “যাতায়াত করা ঠিক হবে না কেন?”

“পুরুষ লোকগুলো ভালা না। বোনকে সাথে সাথে রাখবেন সাহেব।”

“রাখব।”

রইস উদ্দিন খাবারের দাম রাখল না। মাথা চুলকে বলল, “মেহমান নিয়ে এলেন। দাম রাখা মন্দ দেখায়।”

আমি তার সাথে কথা বাড়ালাম না৷ এই লোকটাকে খুব বেশি সুবিধার মনে হচ্ছে না। আবার তেমন অসুবিধার লাগল না।

কাজে ফিরে রঘুর খোঁজ করলাম। সে কাজে আসেনি। ছুটি নিয়েছে। পুরো ব্যাপারটা গোলমেলে লাগল। গতকাল কী হয়েছে না হয়েছে জানতে হলে রঘুকে প্রয়োজন। সে ছাড়া আর কেউ সঠিক তথ্য দিতে পারবে না।

কাজ একটু তাড়াতাড়ি শেষ হলো। হিসাবে বুঝিয়ে দিতে বড় স্যারের রুমে ঢুকলাম। স্যার হিসাব বুঝে নিয়ে পাঁচশ টাকার একটা নোট ধরিয়ে দিলেন। সহজ গলায় বললেন, “হিসেবটা নিজে এসে দিলে ভালো হয়। গতকাল রঘুর হাত দিয়ে পাঠিয়েছ। ভীষণ বিরক্ত হয়েছি। তোমার কাজ অল্প দিনের৷ এজন্য হেলাফেলা করবে তা হবে না।”

লজ্জিত মুখে মাথা নিচু করে রইলাম। নরম গলায় বললাম, “ভুল হয়ে গিয়েছে।”

“রঘু তোমার বেতন নিয়ে গিয়েছিল। দিয়েছে?”

মাথা দুলিয়ে বেরিয়ে এলাম। বড় স্যার কী বুঝল কে জানে। খানিকক্ষণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। তিমু বলল, “হিসেব বুঝলে?”

“কীসের হিসেব?”

“তোমাকে একশ বিশ টাকার বিরিয়ানি খাইয়ে পাঁচশ টাকা হাপিস করে দিয়েছে।”

“ব্যাপারটা এত সহজ মনে করলি?”

“না। সরল হিসেব বললাম।”

“বেলা আছে ভালোই। কালকের ওই জায়গায় একবার যাব।”

“চিনতে পারবে?”

“লোকেশন দেখে এসেছি। যেতে অসুবিধা হবে না।”

কাল রাতে যা ভেবেছিলাম তাই। পরিত্যক্ত স্কুল! দেয়াল খসে পড়েছে। আগাছা জন্মে আছে। তবে লোকের চলাচল আছে৷ আগাছার মাঝে রাস্তা হয়ে আছে। খুব সাবধানে তিমুকে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম। যে ঘরে পড়ে ছিলাম ওটা খুঁজতে তেমন অসুবিধা হলো না। পুরো স্কুলে ওই একটা ঘরের দরজায় তালা ঝোলানো নেই।

সূর্য হেলে পড়েছে। বিকেলের বাতাস বেশ ঠান্ডা। তিমু হাত দুটো জড়সড় করে রেখেছে৷ ওর দিকে তাকিয়ে একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেললাম। ক্লান্ত গলায় বললাম, “ভেতরে যাবি?”

সে মাথা দোলালো। তিমুকে নিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকলাম। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ঘর। মাত্রই ঝাঁট দেওয়া হয়েছে এমন। তিমু ঘরে ঢুকেই চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলল। তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “আতরের গন্ধ।”

“তাতে কী যায় আসে? এখানে লোকের আসা যাওয়া আছে।”

“না না৷ আমি এই গন্ধ অন্য একটা জায়গাতেও পেয়েছি।”

“কোথায় পেয়েছিস?”

“ঠিক মনে করতে পারছি না। তবে আজকেই পেলাম।”

“এখানে ঢোকার সময় তো কোন গন্ধ লাগে লাগেনি।”

“বুঝতে পারছি না।”

খানিকক্ষণ ঘোরাঘুরি করে তেমন কিছুই পেলাম না। হতাশ স্বরে বললাম, “বাড়িতে চল তিমু। এখানে কিছু নেই।”

তিমু কেমন যেতে চাইল না। থম মে’রে দাঁড়িয়ে রইল। ধমক দিয়ে বললাম, “এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? সন্ধ্যা নেমে যাবে তো।”

“না, দেখছিলাম।”

“কী?”

তিমু খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ছোট্ট করে বলল, “না, কিছু না।”

ওখান থেকে বের হতেই তীব্র লজ্জাবোধ এবং আত্মগ্লানি মনকে বি’ষি’য়ে তুলল। এমন নির্জন জায়গায় তিমুকে নিয়ে আসা উচিত হয়নি। একদমই উচিত হয়নি। ফুফুকে বলেছিলাম– মাকে নিয়ে যাব। অথচ সারাদিনে মাকে একবার কল পর্যন্ত দেওয়ার সময় পাইনি।

সারাপথ দুজনের কেউ কোন কথা বললাম না। তিমুকে দেখে মনে হলো সে বেশ চিন্তায় আছে। বাড়িতে ঢোকার আগ মুহুর্তে ফোন বেজে উঠল। কল রিসিভ করতে গম্ভীর কন্ঠস্বর কানে লাগল।

“সাজ্জাদ কথা বলছ?”

“জ্বি বলছি। আপনি..”

কথা শেষ করতে পারলাম না৷ ভদ্রলোক বললেন, “এক্ষুনি আমার গুদামে চলে এসো। কথা আছে। বাদশা ছেলেটা এমন করে ঝুলিয়ে দেবে বুঝতে পারিনি।”

তিমুকে বাড়িতে ঢুকিয়ে দিয়ে রিকশায় উঠে বসলাম। হোসেন উদ্দীন কল দিয়েছিলেন। বাদশার বাবার বন্ধু। যার সাথে ধান কেনার ব্যাপারে কথা বলতে গিয়েছিলাম। ভদ্রলোক তখন তেমন আগ্রহ দেখাননি। আজ হঠাৎ কী হলো কে জানে!

হোসেন উদ্দীন আমাকে দেখে তেঁ তেঁ উঠলেন। তীব্র এবং তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, “তোমার বন্ধুর কোন কাজ হয় না। তোমারও কোন কাজ হয় না।”

অত্যন্ত শান্ত গলায় বললাম, “এ কথা বলছেন কেন?”

“তোমার ওই বন্ধুটি আমার সাথে ধান দেওয়ার ব্যাপারে পাকাকথা বলে গিয়েছি। আজ এতদিন হয়ে গেল। তার কোন খোঁজ নেই।”

“বাদশা আপনাকে ধান দেওয়ার কথা বলেছিল?”

“বলেছিল বৈকি? পাঁচশ মণ ধান দেওয়ার পাকা কথা বলেছে। কিন্তু তারপর থেকে তার কোন খোঁজ নেই।”

“আসলেই বাদশার কোন খোঁজ নেই। নিখোঁজ হয়ে গিয়েছি।”

হোসেন উদ্দীন আৎকে উঠলেন।

“সত্যি বলছ? নিখোঁজ হয়ে গিয়েছে?”

“হ্যাঁ, সত্যি বলছি। পুলিশে মিসিং ডাইরি করেছি। এখনো কোন খোঁজ দিতে পারেনি।”

হোসেন উদ্দীন হাসলেন। তাচ্ছিল্যের হাসি। মুখ বেঁকিয়ে বললেন, “সাধারণ মানুষের সাথে পুলিশের তেমন সম্পর্ক নেই।”

“এ কথা কেন বলছেন?”

“একটা ছেলেকে মে’রে ফেলা হয়েছিল। ওসমান হাদি নামে। চেনো নাকি?”

“চিনবো না কেন? হাদি ভাইকে কে না চেনে?”

“সেই ছেলের খু’নের বিচারের দাবীতে দেশের জায়গায় জায়গায় আন্দোলন হচ্ছে। দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে খবর ছাড়িয়ে৷ সে বিচারের হদিস পাও?”

“না পাই না।”

“তাহলে বাদশার খোঁজ পাবে– সে আশা করো কীভাবে?”

“আশা করব না?”

“করতে পারো। আশার গুড়ে বালি পড়তে খুব বেশি সময় লাগবে না।”

“এ কথা কেন বলছেন? পেতেও তো পারি।”

“হ্যাঁ, ভাগ্য খুব বেশি ভালো থাকলে পেতে পারো। তবে না পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আমার এক বন্ধুর ছেলে নিখোঁজ হয়েছে প্রায় বছর। এখনও তার কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।”

“সেকি কথা?”

“সেটাই কথা। এখন আমার কাজের কথা বলো। এত ধানের ব্যাপার। শেষ মুহূর্তে আমি এমন লস করতে পারব না।”

“কিন্তু আমি তো এসবের কিছু জানি না।”

“না জানলেও আমার ধানের ব্যবস্থা করে দেবে।”

কথা বাড়ালাম না। হ্যাঁ-তে হ্যাঁ মিলিয়ে চলে এলাম।

পরদিন কাজে যাওয়ার আগে বাদশার মামার সাথে দেখা করতে গেলাম। দুদিনেই মামার চেহারা ভেঙে পড়েছে৷ চোখের নিচে কালচে দাগ, চোয়াল ভেঙে গেছে। তিনি আমাকে দেখেই হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন। জড়ানো গলায় বললেন, “ছেলেটার কোন খোঁজ পাওয়া গেল না রে বাবা।”

মামাকে স্বান্তনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পেলাম না। চুপচাপ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর বেরিয়ে গেলাম। গ্রামে একটু খোঁজ খবর করতেই ধানের কথা বেরিয়ে এলো। বাদশা সবার বাড়িতে গিয়ে বলে এসেছে। কে কয় মণ ধান দিবে তা-ও নাকি নোট করে নিয়ে গেছে। ইসস! ছেলেটা আমার জন্য কত কী করেছে। অথচ আমি! আমি তার জন্য কিছুই করতে পারলাম না। নিজেকে ভীষণ রকমের অপদার্থ মনে হতে লাগল।

বাড়ি বাড়ি ঘুরে ধানের হিসেব করলাম। পাক্কা পাঁচশ মণ। পুরো গ্রামের ধান। তবে এখন আর পাঁচশ মণ হবে না। অনেকের ধান বিক্রি করে দিয়েছে। মাঝ বয়সী এক ভদ্রলোক তো বলেই বসল, “ধান এতদিন ঘরে রাখি না। বাদশা বলেছিল বিধায় রেখেছিলাম। তুমি আজ না এলে কাল গিয়ে গঞ্জের হাঁটে বেচে দিতে আসতাম।”

আমি তার কথার জবাব দিলাম না, হাসলাম। ভদ্রলোক বলল, “কোন আশায় ধান ঘরে রাখি বলো তো বাবা? বাদশা নিখোঁজ। তারপর আর কেউ কিছু বলে না। আমাদের তো এই দিয়েই সংসার চলে।”

“জ্বি বুঝেছি।”

“ধান কম পড়লে অসুবিধে হবে না তো?”

“অসুবিধে? তা কিছু হবে বৈকি।”

“পাশের গায়ে আমার পরিচিত কিছু লোক আছে। ওদের ধান এখনো মাঠে। কাটা হয়নি। তুমি বললে কথা বলে দেখতে পারি।”

“ঠিক আছে দেখুন।”

“আমায় কিছু দিবে তো বাবা?”

“হ্যাঁ, হ্যাঁ। ওসব নিয়ে ভাবতে হবে না।”

কথা শেষ করে কাজে চলে এলাম। হোসেন উদ্দীন চাচাকে কল দিয়ে বললাম, “সন্ধ্যায় দেখা করছি৷ ধানের জোগাড় আছে। আনলেই হয়।”

শুনে তিনি তেমন খুশি হলেন না। গম্ভীর গলায় আচ্ছা বলে বল কে’টে দিলেন।

চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply