Golpo কষ্টের গল্প পরগাছা

পরগাছা পর্ব ৪


পরগাছা |৪|

ইসরাত_তন্বী

(অনুমতি বিহীন কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)

“আত্মসম্মানহীন নারী আর হাতে বানানো পুতুলের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তাদের ইচ্ছে মতো আকৃতি দেওয়া যায়। কখনো ভালোবাসায় পরিপূর্ণ করে ঝুঁলিতে কখনো বা অবহেলায় যেখানে সেখানে ফেলে রাখা হয়। যেখানে তোমার দুই পয়সার মূল্য নেই সেখানে তুমি কেন অবস্থান করবে? আত্মসম্মানবোধ হারিয়ে বেঁচে থাকার থেকে মুক্তি শ্রেয় নয়কি? নারী তুমি নিজেকে এতটা স্বস্তা বানিও না যেখানে অন্যের কাছে কেবল হতে হবে উপহাস। নারী তুমি নিজের জন্য বাঁচবে। কেবল নিজের জন্য। তুমি তাদের ভোগের বস্তু নয়। তুমি তোমার আব্বার টানাপোড়েনের সংসারের আদুরে জ্যোতি। তুমি মায়ের ক্লান্ত শরীরের ঘামের প্রতিটা বিন্দু কণার অস্তিত্ব। তুমি কীভাবে নিজেকে এতটা তুচ্ছ ভাবতে পারো? হয় মুক্তি নয় অধিকার‌। এর ঊর্ধ্বে আর কোনো শব্দ থাকা উচিত নয়। একদমই নয়।”

হাতের কলম থেমে গেল গুঞ্জরিকার। আর লিখল না কিছু। মূলত লিখতে পারল না। সফেদ রঙা পাতাটা অসম্পূর্ণ রয়ে গেল। অধরের কোণে উঁকি দিলো তাচ্ছিল্যের হাসি। আলগোছে টেবিলে মাথা ছোঁয়াল। দৃষ্টি যেয়ে থমকাল বাতায়ন সংলগ্ন একটা বড়ো কাঠগোলাপ গাছে। বয়সের ভারে নুইয়ে পড়েছে গাছটা। নেই কোনো সতেজতা। গায়ের বাকল গুলো কেমন ফ্যাকাশে হয়ে খসে পড়ছে। মানুষ ও ঠিক ওই কাঠগোলাপ গাছটার মতোই। দুই সংখ্যার একটা বয়সের কত ক্ষমতা! সময়ের সাথে সাথে মানুষের বোধশক্তি, সহ্য ক্ষমতা বাড়িয়ে ধৈর্যশীল বানিয়ে দেয়। অথচ মানুষটা ক্রমশ নিঃস্ব হতে থাকে। কবরের দিকে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চলে। মানব জীবন বড্ড অদ্ভুত। এই একজীবনে সব মেলে না। কেউ মন প্রাণ দিয়ে চেয়ে পায় না, কেউ পেয়ে অবহেলা করে কেউ বা পেয়ে হারিয়ে ফেলে। এবং তৃতীয়টার মতো যাতনা আর কিছুতেই নেই।

আকাশ কুসুম ভাবনার মাঝেই গুঞ্জরিকার গাল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। মেয়েটা নেত্র যুগল বুঁজে অতীতে ডুব দিলো।

গুঞ্জরিকা তখন ষোড়শী কন্যা। চঞ্চলতা কমার বদলে বেড়েছে বৈকি। গ্রামে তখন সে পুরোদমে দস্যি কন্যা নামে পরিচিত। সেইবার গ্রামে নাচ গানের অনুষ্ঠান রাখল গ্রাম প্রধান চৌধুরী পরিবারের কর্তা নারায়ন চৌধুরী। গঞ্জের থেকে শিল্পী আসবে নাচ, গান পরিবেশন করতে। গ্রামের সকল শ্রেণীর মানুষের মাঝে একটা চাপা উচ্ছাস ছড়িয়ে পড়ল। জাব্বার আলীর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেন মেয়ের উপরে। আজকে সন্ধ্যার পরে যেন সে বাড়ির বাইরে এক পাও না রাখে। গুঞ্জরিকা তা শুনলে তো? সামনাসামনি বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নুইয়ে সবটা মেনে নিলেও ভেতরে ভেতরে অন্যকিছু ভেবে চলল।

সেদিন বিকালে গ্রামের স্কুলের তেঁতুল গাছের নিচে দেখা করল গুঞ্জরিকা এবং চন্দ্রা। একটু দূরেই অনুষ্ঠানের জন্য মঞ্চ সাজানো হচ্ছে। দুই সখীর হাতেই আধপাকা তেঁতুল এবং লবণ। খেতে ব্যস্ত তারা। খাওয়ার মাঝেই পরিকল্পনা করল বাড়ির সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়বে তখন ওরা দুজন একসাথে দেখতে যাবে অনুষ্ঠান। সারারাত ধরেই তো হবে অনুষ্ঠান। তাই কোনো ব্যাপার না। একটু দেখেই চলে আসবে। ধরা পড়ার ভয় নেই।

যেই ভাবা সেই কাজ। বাড়ির সবাই ঘুমিয়েছে যখন তখন ঘড়ির দশটার ঘরে। গুঞ্জরিকা আস্তে আস্তে পা টিপে টিপে হেঁটে নিজের ঘরের বাইরে পদ যুগল রাখল। দেখল দাওয়ায় শুয়ে থাকা আব্বা- মা ঘুমে বিভোর। পাশের বড়ো ভাইয়ের ঘরের মধ্যে থেকে লণ্ঠনের মৃদু আলোকরশ্মি ভেসে আসছে। তারমানে ভাইজান এখনো পড়ছে। গুঞ্জরিকা আল্লাহর নাম নিয়ে উঠানে পা দিতেই কোথা থেকে ওর সামনে এসে হাজির হলো তাইমুর। ছেলেটা কিছু বলার আগেই গুঞ্জরিকা একহাতে ভাইয়ের মুখ চেপে আরেকহাতে টেনে নিয়ে বাড়ির আঙ্গিনা পেরিয়ে এল। ফিসফিস করে বলল, “দোহায় লাগে ভাইজান। আব্বারে কিছু বলবে না। একটুখানি দেখেই চলে আসব।”

তাইমুর ইশারায় ওর মুখের থেকে হাত সরাতে বলল। ভরা পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় সেটা লক্ষ্য করতেই গুঞ্জরিকা ভাইজানের মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিল। তাইমুরের চোখে মুখে বিরক্তির রেশ ফুটে উঠল, “তুই বেশি বোঝা বন্ধ করবি গুঞ্জ। তোরে নিয়ে অনুষ্ঠানে যাব বলেই তো আমি বাইরে অপেক্ষা করছিলাম। বলদ একটা।”

গুঞ্জরিকা ফের চাঁপা স্বরে ফিসফিসিয়ে বলল, “আগে বলবে না আমায়? আমি কি জানি তোমার মতো ভদ্র ছেলে আমার সাথে অনুষ্ঠানে যাবে?”

গুঞ্জরিকার কথাতে তাইমুরের বিরক্তভাব বাড়ল। প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে প্রশ্ন করল, “তোর ওই সখী যাবে তো নাকি?”

ভাইজানের প্রশ্নে গুঞ্জরিকার মুখে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। বাহু দিয়ে তাইমুরকে আলতো করে ধাক্কা দিল, “কী গো ভাইজান? আজকাল বড্ড আমার সখী সখী করছ যে? ব্যাপার কী? মন টন খুইয়ে বসলে নাকি? তবে তোমার বউ হিসেবে চন্দ্রাকে মানতে আমার সমস্যা নাই।”

“ফালতু বকিস না। আমি যাচ্ছি। গেলে আয় না হলে থাক।”

কথাগুলো বলেই সামনে অগ্রসর হলো তাইমুর। গুঞ্জরিকা মৃদু শব্দে হেসে উঠল। চন্দ্রার নাম শুনতেই ভাইজানের মুখের আদলের সবটুকু পরিবর্তন ঠিকই লক্ষ্য করেছে গুঞ্জরিকা। প্রাণের সখী ওর ভাবী হবে ভাবতেই বুকটাতে সুখকর অনুভূতি দোলা দিয়ে গেল। দুজন তাহলে আমৃত্যু একটা সম্পর্কে জড়িয়ে থাকবে। কিন্তু কে জানত বিধাতার লিখন ছিল অন্যকিছু। হাহ্! সেদিন তিনজনে মিলে পরিবারের সবার থেকে লুকিয়ে অনুষ্ঠান দেখে মধ্যরাতে বাড়ি ফিরেছিল। ঘুরেছিল, খুব মজা করেছিল। ভাইজানের দেখা পেতেই চন্দ্রার ভেতরের ঈষৎ পরিবর্তন নজরে এসেছিল গুঞ্জরিকার। মন থেকে খুশি হয়েছিল মেয়েটা। অথচ সবকিছু আজ সোনালী অতীত। কোথাও কেউ নেই। গুঞ্জরিকা বড়ো একা। ভাগ্যের কাছে হেরে গেছে গুঞ্জরিকা‌।
.

গোধূলি লগ্নে বাড়ির বড়ো বারান্দার মেঝেতে বসে আছে গুঞ্জরিকা। পাশের একটা স্তম্ভে মাথাটা আলগোছে ঠেকেছে। দৃষ্টি নিবিষ্ট বাড়ির আঙিনায় ঘোরাঘুরি করা হাঁসমুরগি গুলোর দিকে। আরেকটু বেলা পড়লেই ঘরে তুলবে ওগুলো। ঠিক সেইসময় শাহরিয়ার এর বউ কমলিকা এল শেখ বাড়িতে। গুঞ্জরিকার সামনে দাঁড়িয়ে একগাল হাসল। শুধাল, “কেমন আছেন ভাবী? শরীর খারাপ আপনার? কেমন যেন দেখাচ্ছে।”

গুঞ্জরিকার ওষ্ঠজোড়া দুদিকে অল্প স্বল্প প্রসারিত হলো, “আরে ভাবী যে! বসুন, বসুন। আলহামদুলিল্লাহ ভাবী আমি ভালো আছি।‌ আপনি কেমন আছেন? “

কমলিকা হাসতে হাসতে পাশে বসল। কমলিকা মেয়েটা দেখতে যেমন রুপবতী, কাজে তেমন গুণবতী। ব্যবহার ও চমৎকার এবং মার্জিত। তাই গুঞ্জরিকার সাথে বেশ ভাব আছে। গুঞ্জরিকাকে দেখে কমলিকার খুব মায়া হলো‌। অদ্ভুত এক টানে চোখের কোণে জল জমল। ম্লান গলায় ছোট্ট করে জানতে চাইল, “সত্যিই ভালো আছেন ভাবী?”

“মনের কথা জিজ্ঞাসা করছেন নাকি শরীরের সেটা বলুন আগে।”

পুনরায় সামনে তাকিয়েছে গুঞ্জরিকা। সেভাবেই পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ল। কমলিকা আগের ন্যায় বলল, “আজ না হয় দুটোই বলুন।”

“মনের অসুখ হয়েছে ভাবী। তবে আশা রাখী শিঘ্রই সে সুস্থতার মুখ দেখবে। বাদবাকি সব ঠিকঠাক। তবে গাছের একটা শাখা মরণ রোগে আক্রান্ত হলে সম্পূর্ণ গাছকে তো তার রেশ বহন করতেই হয়।”

কমলিকা কিছু বলতে নিবে তৎক্ষণাৎ দোতলা সিঁড়ির সম্মুখ থেকে আরুষের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “গুঞ্জন কোথায় তুমি? দ্রুত কক্ষে এসো। আমার হাত ঘড়িটা খুঁজে পাচ্ছি না। আড়তে যেতে হবে আমাকে। ব্যবসায়ীরা অপেক্ষারত।”

সেই কণ্ঠস্বর অনুসরণ করে গুঞ্জরিকা এবং কমলিকা পিছনে ফিরল। দরজা দিয়ে দেখল আরুষ কথাটা বলেই হন্তদন্ত হয়ে ঘরের দিকে হাঁটা ধরল। নিচেই দাঁড়িয়ে আছে চন্দ্রা।‌ আঁখি জোড়া পানিতে টলমল করছে। মুখটা মলিন দেখাচ্ছে। গুঞ্জরিকার বুকচিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। পরপরই উচ্চ কণ্ঠে চন্দ্রার উদ্দেশে বলল, “চন্দ্রা তোদের কক্ষের আলমিরার বাম সাইডের ড্রয়ারে হাতঘড়িটা আছে। যা দিয়ে আয়।”

চন্দ্রা চকিতে ফিরে তাকাল। অবিশ্বাস্য চাহনি। নিজের কান দুটোকে ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না। গুঞ্জরিকা পুনরায় ইশারায় দ্রুত যেতে বলল। চন্দ্রা মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়ে শ্লথগতিতে সিঁড়ির দিকে অগ্রসর হলো। কমলিকা পাশ থেকে বেশ অবাক হয়েই শুধাল, “স্বেচ্ছায় নিজের জায়গা ত্যাগ করে অপরকে সুযোগ দিচ্ছেন ভাবী?”

“যেটা কখনো আমার ছিলোই না সেখানে কীভাবে নিজের অধিকার ধরে রাখি? আমার হলে তা তো কেবল আমারই থাকত। আমার চোখদুটোতে লুকোনো অজস্র কথা অপরপক্ষ বুঝত। যাইহোক আপনার কাছে কখনো কোনো ভুল করলে ক্ষমা করবেন ভাবী। হাড় মাংসের তৈরি মানুষ তো। ভুল ত্রুটির ঊর্ধ্বে নই।”

কমলিকার মনটা বিষাদে ছেয়ে গেল। কিছুক্ষণ একদৃষ্টে গুঞ্জরিকার দিকে তাকিয়ে রইল। হয়ত কিছু বোঝার প্রয়াস চালাল। বলল, “আপনার দ্বারা ভুল হওয়ার সুযোগ নেই ভাবী। কিন্তু আমি যেটার আভাস পাচ্ছি সেটা কখনোই না হোক ভাবী। মহান আল্লাহ কখনই ক্ষমা করবেন না।”

“ভুল ভাবছেন ভাবী। জীবনের এখনো অনেক অধ্যায় বাকি তো। একাকী অনেক পথ পাড়ি দেওয়া বাকি। এই শেখ বাড়ির বাইরের জগত দেখা বাকি। আমি এই জীবনের সবটুকু দুঃখ গভীরভাবে উপলব্ধি করতে চাই। তাদেরকে আলিঙ্গন করে বাঁচতে চাই। পাওয়া না পাওয়ার হিসেব মেলাতে চাই। একজনের অসম্পূর্ণ কাজ করা বাকি এখনো। নিজের মুক্তি চাইলে অন্যদের অনুশোচনা দেখার সুযোগ কোথায়? ভাগ্যের কাছে হারতে পারি। কিন্তু নিজের কাছে নয়। আমি আমার কাছে এখনো শীর্ষে আছি ভাবী। আমার যাওয়ার জায়গা নাই বা থাকতে পারে। তাই বলে কি আমি এই বাড়ির আঙিনা পেরিয়ে এই সুন্দর পৃথিবী দেখব না? শুধু সময়ের অপেক্ষা। এখানে পড়ে আছি মানে নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়েছি বিষয়টা এমন নয়। এটা আমার অধিকার।”

কমলিকা বলার কোনো শব্দ পেল না। নীরবতা অক্ষুন্ন রেখে চুপচাপ বসে রইল। গুঞ্জরিকা ভাবুক হয়ে পড়ল। পরপরই আনমনা হয়ে আওড়াল,
“মানুষ যতই ঘনিষ্ঠ হোক না কেন একটা সময় পরিবর্তন হবেই। শুধু পরিমাণটা কম-বেশি। আসলে সময় মূলত মানুষ চেনায়।”

চলবে

(রিচেক নেই আজ। ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। প্রিয় পাঠক আপনাদের সকলের রেসপন্স ও গঠনমূলক মন্তব্যের আশা রাখি।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply