নবরূপা
পর্ব_২
কলমেঅনামিকাতাহসিন_রোজা
এই প্রথমবার ছেলের আচরণেই আয়েশা বেগম বুঝলেন অবশেষে তবে তার ছেলে পাত্রী পছন্দ করেছে। মনে মনে শুকরিয়া আদায় করলেন ভদ্রমহিলা। ইশারায় ইয়াহিয়া কবিরকেও বললেন, যে বউমা কনফার্ম। ও বাড়ি থেকে ‘কবির মহল’ এ ফেরা মাত্রই ইরফান বসার ঘরে সোফায় বসে গা এলিয়ে দিলো। আয়েশা বেগম খাবারের ব্যবস্থা করতে দ্রুত ফ্রেশ হতে গেলে ইয়াহিয়া কবির এসে বসলেন ইরফানের সামনের সোফায়। সোজাসুজি প্রশ্ন করলেন,
—” মেয়ে তবে পছন্দ হয়েছে?”
ইরফান মাথা এলিয়ে উপরে থাকা ঝাড়বাতির দিকে তাকিয়ে ছিল। বাবার কথায় সোজা হয়ে বসে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে উল্টো বলল,
—” তোমাদের নীহারিকাকে পছন্দ হয়েছে?”
ইয়াহিয়া কবির মনে মনে খুশি হলেন। ছেলের এই আচরণ তিনি ছোটবেলা থেকেই দেখেছেন। কখনোই আগে আগে সিদ্ধান্ত জানায় না সে। ইয়াহিয়া তবুও ছেলেকে একটু পরীক্ষা করে দেখতে চাইলেন। গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
—” যদি বলি আমাদের পছন্দ হয়নি, তাহলে?”
ইয়াহিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে হাসলো। উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
—” তাহলে আর কি। মা নীহারিকার হাতে যে সোনার বালা টা পড়িয়ে দিয়ে আসলো, ওটা ফেরত নিয়ে আসি।”
আয়েশা বেগম কেবলই বসার ঘরে পা রাখলেন। ছেলের কথা শুনেছেন তিনি। ‘নীহারিকা’ নামটা ছেলের মুখে শুনে বেশ খুশি হয়েছেন বটে। ইয়াহিয়া কবিরের মুখের অবস্থা দেখে ফিক করে হেসে ফেললেন, ভাব নিয়ে বললেন,
—” তুমি আমার ছেলের সাথে কখনোই পারবে না বুঝলে। উল্টো এভাবেই তব্দা খেতে হবে। ওকে বোকা পেয়েছো?”
ইয়াহিয়া কবির মোটেই অপমানিতবোধ করলেন না। তবে তব্দা খেয়েছেন বটে। ছেলে যখন বুঝেছেই যে সব কিছু পাকা করে আসা হলো, আর বাবা-মায়েরও পছন্দ হয়েছে, তবে ভদ্রতা দেখিয়ে আবার জিজ্ঞেস করার কী দরকার ছিল?
ইয়াহিয়া কবির তপ্ত শ্বাস ফেলে কিছু একটা বলতে গেলেই, সিঁড়ি দিয়ে গুটিগুটি পায়ে “বাবা বাবা” বলে আসতে দেখা গেলো তিন বছর বয়সী ইনায়া কে। বেচারি সিঁড়ির রেলিং ধরে ধরে এক পা এক পা করে আস্তেধীরে নামছে, আর হাসোজ্জল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে ইরফানের দিকে। বাবা ডাক শুনে ইরফান তৎক্ষনাৎ তাকিয়ে রীতিমতো দৌঁড়ে সিঁড়ির কাছে গিয়ে কোলে তুলে নিল ইনায়াকে। ‘ মা আমার’ বলে কপালে, গালে চুমু খেয়ে আদুরে ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলো,
—” কী ব্যাপার মা? সোয়েটার কোথায় তোমার? ঠান্ডা লেগে যাবে তো! পায়ে জুতোও নেই দেখছি!”
এরমধ্যেই পেছন থেকে তাড়াহুড়ো করে নামতে দেখা গেলো এক নারীকে। পরনে তার সালোয়ার কামিজ, হাতে পায়ে কোনো প্রসাধনী না থাকলেও চোখেমুখে একরাশ আনন্দ। চুল খোপা করে বাঁধা। দেখে বয়স চব্বিশ বছরের বেশি মনে হবে না। হাতে ছোট্ট একটা সোয়েটার নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে সে রীতিমতো চেঁচিয়ে বলে উঠলো,
—” আর বলবেন না ইরফান ভাই। ইনায়া তো আপনার কন্ঠ শুনেই একদম দৌঁড়ে এসেছে। মাত্র গোসল করালাম তো। সোয়েটার পড়াতেই যাচ্ছিলাম, তাতেই সে ভোঁ দৌড় দিয়েছে! সত্যি বাবা, মেয়েটা এই বয়সে এত্ত তিড়িংবিড়িং করা শিখেছে!”
মেয়েটির নাম তামান্না, ইরফানের ছোট খালার মেয়ে। বাবা বিদেশে, ও জন্মের সময়ই মা মারা যাওয়ায় ছোট থেকেই এ বাড়িতে থাকে। আর, এখন ইনায়াকে দেখাশোনা করে। ইরফানের ছোট বোন ইয়াশার পিঠাপিঠি সে। তামান্নার কথা শুনে ইরফান ফিক করে হেসে মেয়ের গালে আবারো চুমু খেলো। ছোট্ট ইনায়া বাবা বলতে একদম পাগল। লোকমুখে শোনা যায়, মেয়েরা নাকি তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যায়। তেমনটাই হয়েছে ইনায়ার ক্ষেত্রে। এই বয়সে আর যা-ই পারুক না কেনো, অন্তত সারাদিন বাবা বাবা বলতে পারে ভীষণ। ছোট্ট ইনায়ার শব্দের ভান্ডারে এখন কয়েকটা শব্দই বিদ্যমান— বাবা, দাদা, দাদি আর ফুপি। এছাড়া ছোট ছোট কথা আধো স্বরে বলতে পারে। কিন্তু এতো কিছুর পরেও মা শব্দটা এখনো বলেনি সে। আর সেটা শোনার জন্যই এত তোরজোড়।
তামান্নার কথা শুনে আয়েশা বেগমও হেসে বললেন,
—” ঠিকই আছে। আমার নাতনি কারো অপেক্ষা করে নাকি? তুই ওকে কখন কোলে নিবি আর কখন আনবি! তাই নিজেই বাবার গন্ধ পেয়ে ছুটে এসেছে।”
ইরফান তামান্নার হাত থেকে সোয়েটার টা নিয়ে নিজেই পড়িয়ে দিলো ইনায়াকে। সাথে জিজ্ঞেস করল,
—” ও খেয়েছে?”
তামান্না অপলক দৃষ্টিতে ইরফানের দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক ছিল। হঠাৎ করা প্রশ্নে চমকে উঠে হাসি মুখে বলল,
—” হ্যাঁ ইরফান ভাই। এক বাটি সুজি খাইয়েছি। একটু পর গুড় দিয়ে পায়েশ বানাব ইনায়ার জন্য। যশোর থেকে ছোট মামা খাঁটি খেঁজুর গুড় পাঠিয়েছে, তাও এক হাঁড়ি।”
ইরফান হাসলো। ছোট মামা পারেও বটে। এই বয়সে এসেও ভাগ্নের প্রতি এত আদর যত্ন! ইনায়া এর মধ্যেই ইরফানের শার্টের পকেট হাতাতে শুরু করেছে। ছোট্ট ছোট্ট হাতে কিছু একটা খুঁজছে সে। কাঙ্ক্ষিত জিনিস না পেয়ে মুখ কুঁচকে ইরফানের গালে হাত দিয়ে বলল,
—” বাবা, তোতো। বাবা, তোতো।”
ইরফান হাসলো। চকো চকো কে ইনায়া আধোস্বরে ‘তোতো’ বলে। প্রতিদিন ইরফান একটা করে হলেও ইনায়ার জন্য এই চকো চকো আনে, কারন এটা ওর সবচেয়ে প্রিয় খাবার। ইনায়া এও জানে বাবার শার্টের বাম পকেটেই এই তোতো থাকবে। তাই নিজেই কোলে উঠে সেটা হাতিয়ে নেয়। আজ তাই না পেয়ে মুখ কালো করে ফেলল। ইরফান অস্থির হলো। দ্রুতগতিতে ইনায়াকে আদর করে প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বলল,
—” তোতো? এনেছি তো মা। এনেছি আমি। এইযে তোমার তোতো।”
বলেই পকেট থেকে দুটো চকো চকো বের করে দিলো ইরফান। তবুও ইনায়ার মন ভরলো না, সে আবারো একটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
—” চিলে দাও।” যার অর্থ ছিঁড়ে দাও।
ইরফান সেটাও করলো। একটা ছিঁড়ে দিল। আদুরে কন্ঠে বলল,
—” এখন দাদির কাছে যাও মা। আমি গোসল করে আসি। এরপর খেলব আমরা হুম?”
এরপর তামান্নার দিকে তাকিয়ে বলল,
—” দুটোই যেন এখন না খায়। আর পায়েশ বানিয়ে আমায় দেবে। আমি ওকে খাইয়ে দেব।”
তামান্না মাথা নেড়ে ঠিক আছে বলল। ইরফান এবারে ইনায়াকে আয়েশা বেগমের কোলে দিলো। বলল,
—” আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। তারপর আমার ঘরে ইনায়াকে দিয়ে এসো মা।”
আয়শা বেগম কোলে নিলেন নাতনিকে। কিন্তু কিছু একটা মনে পড়তেই ইরফানের হাতে একটা ছোট কাগজ গুঁজে দিয়ে বললেন,
—” এটা রাখ।’
ইরফান ভ্রু কুঁচকালো।-” কী এটা?”
আয়েশা বেগম ফিসফিস করে বললেন,
—” নীহারিকার নাম্বার।”
ইরফান কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো মায়ের দিকে। কিছু না বলে পকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে গটগট করে চলে গেলো ঘরে। তামান্না ইরফানের যাওয়ার পথে চেয়ে রইলো। আয়েশা বেগমের দিকে এগিয়ে এসে বলবে না বলবে না করেও আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলো,
—” ইরফান ভাই কি পাত্রী পছন্দ করেছে খালামনি?”
আয়েশা বেগম কোলে থাকা ইনায়াকে আদর করছিলেন। তামান্নার কথা শুনে হাসি মুখে বললেন,
—” হ্যাঁ, আলহামদুলিল্লাহ। অবশেষে পছন্দ করেছে সাহেব। আমি অবশ্য আগেই জানতাম বুঝলি, এবারে ও না করতে পারবে না। এমন হীরের টুকরো মেয়ে পছন্দ করেছি! আগামী সপ্তাহে বিয়ের দিন ঠিক করা হয়েছে। খুব একটা জাঁকজমকভাবে হবেনা। তোর হবু ভাবিরও ইচ্ছে নেই। তাই আগামী শুক্রবারই কবুল পড়ানো হবে, সাথে আইনগত বিয়েটাও হবে।”
তামান্না জোরপূর্বক হাসলো। শুকনো ঢোক গিললো মেয়েটা। আবারো সিঁড়ির দিকে উপরে তাকালো। ইরফান ইতোমধ্যে ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়েছে। তামান্না বদ্ধ দরজার দিকে চেয়েই রইলো। হয়তো তার ভাগ্য খারাপ, আর নইলে তার চাওয়াটা অন্যায়। তার আকাঙ্খা টা হয়তো ভালো না। কিন্তু খুব করেই চেয়েছিল সে। ইরফানকে খুব করে ভালোবেসেছিল। প্রথম থেকেই। আর এই ভালোবাসার মাত্রা এতটাই তীব্র যে ইরফানের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরও সে ভালোবেসে গিয়েছিল তাকে। এমনকি নিজেকে সামলাতে তাহিয়ার সাথে ইরফানের বিয়ের পরে সে কিছুদিনের জন্য বলে মামার বাড়িতে চলে গিয়েছিল। বিভিন্ন অযুহাত দিয়ে এ বাড়িতে বেশি থাকেনি। বারবার মামা বাড়িতে চলে যেত। তারপর গত বছরে মামা মারা যাওয়ার পর সে এ বাড়িতে আবারো ফিরে এসেছিল। আর কয়েকমাস আগে তাহিয়া মারা যাওয়ার পর সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছিল। সে তার বোকা মনটা দিয়ে নিজেকে বুঝিয়েছিল হয়তোবা তার জন্যই সৃষ্টিকর্তা তাহিয়া কে নিয়ে গিয়েছে, হয়তো ইরফান তার ভাগ্যে লেখা রয়েছে, কিন্তু না। এবারও মনে হচ্ছে তার ভাগ্যে নেই।
তামান্নার জানামতে ইরফানের আর কখনোই বিয়ে করার কথা না। তাই সে মনে মনে ভেবেছিল যে সারাটা জীবন ইরফানের সাথে এই বাড়িতে থেকে ইনায়ার দেখাশোনা করবে। অন্তত মানুষটা চোখের সামনে তো থাকবে। অন্য কোনো নারীর সামনে তো থাকবে না। ভালোবাসার মানুষের মৃত্যু সহ্য করা যায়, তার একাকী সহ্য করা যায়, কিন্তু তাকে অন্য নারীর সাথে কল্পনা করাটাও সবচেয়ে বেশি অসহ্যকর আর যন্ত্রণাময়।
নীহারিকা আজ প্রথমবার আয়নার সামনে বসেছে। ড্রেসিং টেবিলের এত বড় আয়নাটা সে আজ পর্যন্ত অনেকবার দেখেছে, অনেকবার নিজেকেও দেখেছে। কিন্তু কখনো সেভাবে দেখা হয়নি। আজ সে রীতিমতো টুলে বসে নিজেকে দেখছে। কেনো দেখছে জানে না। তবে তার মধ্যে অন্যরকম একটা ম্যাজিক কাজ করছে।
কেনো যেন ভীষণ কান্না পাচ্ছে। এতগুলো বছর, এতগুলো মাস, এতগুলো দিন সে কতই না পাত্রের সামনে গিয়েছে। কতই না অবহেলা, অবজ্ঞা, প্রত্যাখ্যান সে পেয়েছে। গায়ের রং কালো বলে বুড়ো বয়সের কোনো লোকও তাকে বিয়ে করতে চায়নি। অথচ আজ একজন সুদর্শন, শিক্ষিত, সৎ, সবকিছু মিলিয়ে একটা পারফেক্ট পুরুষের সাথে তার বিয়ে ঠিক হলো। থাকুক না একটা অতীত! তাতে কী হয়েছে। মানুষের মৃত্যু তো সৃষ্টিকর্তার হাতেই লেখা।
নীহারিকা সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছে ইফান কবিরের ব্যবহারে। আজ পর্যন্ত যতগুলো পাত্র তাকে দেখতে এসেছিল, আর যাদের সাথে সে আলাদা করে কথা বলতে গিয়েছিল, সবাই তাকে সব সময় গায়ের রং নিয়ে জিজ্ঞেস করেছে। কেউ তাকে বলেছে,’ তোমার গায়ের রং কি ছোট থেকে এমন? নাকি অযত্নে হয়েছে? ‘ কেউ বলেছে, ‘বেশি খাওয়া-দাওয়া আবার করোনা যেন। এমনিতেই কালো, এরপর মোটা হলে আরো বিশ্রি লাগবে দেখতে।” আবার কেউ কেউ আলাদা করে কথা বলার সুযোগ টাও দেয়নি। প্রথম দেখাতেই মুখ কুঁচকে নিয়েছে।
অথচ এত এত কিছুর পরও সব শেষে নীহারিকা এমন একজন মানুষকে পেতে যাচ্ছে, যে কিনা প্রথম দেখাতে আগে তাকে জিজ্ঞেস করেছে, ‘ তোমার নাম কী’ এরপর আবার নামের প্রশংসা করেছে। কেনোই বা এত সুদর্শন, এত ভালো একজন মানুষ তাকে বিয়ে করার জন্য রাজি হলো, তা দেখার জন্যই সে আজ আয়নার সামনে বসেছে। অথচ বোকা মেয়ে জানে না, ভালো মানুষ বলেই সে মানুষরূপে দেখেছে নীহারিকাকে। রূপ বিচারই করেনি।
ঘরের দরজা বন্ধ করেই ইরফান পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। বুকের ভেতরটা অদ্ভুত রকম ভারী লাগছে। হাত ঢুকিয়ে পকেট থেকে ছোট কাগজটা বের করল। ভাঁজ খুলতেই চোখে পড়ল নামটা—
নীহারিকা। নামের নিচে লেখা নম্বর।
ইরফান গভীর নিশ্বাস নিল। কাগজটা আবার ভাঁজ করে বেডসাইড টেবিলের ওপর রাখল। এখনই ফোন করার কোনো তাড়া নেই। বরং অকারণ তাড়াহুড়ো করলে সবকিছু নষ্ট হয়ে যেতে পারে—এটা সে ভালোই জানে। তবু মনে হলো, এই নামটার সাথে আজ তার জীবনের অনেক কিছু জড়িয়ে গেল।
বাথরুমে ঢুকে আয়নার সামনে দাঁড়াল সে। নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হলো, বহুদিন পর নিজের চোখে কোনো দৃঢ়তা নেই। বরং আছে এক ধরনের স্থির সিদ্ধান্ত। তাহিয়ার মৃত্যুর পর এই প্রথম সে নিজেকে ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে দেখছে। অপরাধবোধ নেই, নেই আত্মগ্লানিও। কেবল একটা দায়িত্ববোধ—ইনায়ার জন্য, আর সেই দায়িত্বের সাথে আজ নতুন করে জড়িয়ে গেল নীহারিকার নাম।
অন্যদিকে নীহারিকা আয়নার সামনে বসেই আছে। চোখের কোণে জমে থাকা জল গড়িয়ে পড়েনি এখনো। সে নিজের গালে হাত বুলিয়ে দেখল—রঙটা একই আছে। কালোই। কোনো ম্যাজিক হয়নি। অথচ আজ এই রঙটাই যেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক না হয়ে, সবচেয়ে নীরব সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে মনে মনে ভাবল— এই মানুষটা আমাকে কেনো আলাদা চোখে দেখল?
ইরফান কবির তাকে আশ্বাস দেয়নি, সান্ত্বনা দেয়নি, এমনকি বড় বড় কথা বলেও মুগ্ধ করার চেষ্টাও করেনি। সে শুধু স্বাভাবিক ছিল। ঠিক যেভাবে একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে দেখে। নীহারিকার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। এতদিনে প্রথমবার মনে হলো, হয়তো তার রঙটাই সমস্যা ছিল না—সমস্যা ছিল মানুষের দৃষ্টিতে।
ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার খুলে সে একটা পুরোনো ডায়েরী বের করল। এই ডায়েরীর পাতায় পাতায় জমে আছে তার না-বলা কষ্ট, ভাঙা আশা, আর প্রত্যাখ্যানের গল্প। আজ হঠাৎ মনে হলো, এসব আর লিখতে ইচ্ছে করছে না। বরং অন্যকিছু নতুন করে লেখা যাক।
ড্রইংরুমে তামান্না একা দাঁড়িয়ে আছে। টিভিতে ইয়াহিয়া কবির খবর দেখছেন, কিন্তু তার কানে কিছুই ঢুকছে না। বুকের ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছে নিঃশব্দে। সে জানে, তার কষ্টের কোনো বৈধ নাম নেই। সে কারো কাছে অভিযোগও করতে পারে না। সে ধীরে ধীরে আয়েশা বেগমের ঘরের দিকে গেল। ইনায়া, ছোট্ট মেয়েটা দাদির কোলে বসে আধো আধো স্বরে কিছু বলছে। তামান্না তাকিয়ে দেখল, বুঝলো, এই শিশুটার জন্যই আজ সবকিছু বদলে যাচ্ছে। হঠাৎ তার ভেতরে একটা তীব্র অপরাধবোধ কাজ করল। মনে মনে উপলব্ধি করলো, শুধু কি ইরফানকে পাওয়ার জন্যই সে ইনায়াকে এতটা ভালোবাসছিল, আদর করেছিল? নাহ। এতটা নিষ্ঠুর সে নয়।
ইনায়া হঠাৎ তামান্নাকে দেখে হাত বাড়িয়ে দিল। আধো স্বরে ডাকল,
—”আ… ফুপি! “
তামান্না চোখের পানি লুকিয়ে নিজেকে সামলে নিলো। এসব আর ভাববে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্রুত গিয়ে ইনায়ার গালে আদর করলো। হাসিমুখে খেলতে শুরু করলো তার সাথে। মা না হোক, সে তো ইনায়ার ফুপি। মনে মনে ভেবেই নিলো, কারো স্ত্রী না হতে পারলেও, সে ইনায়ার জন্য থেকে যাবে। হয়তো এইটাই তার নিয়তি। হয়তো এইটাই তার প্রায়শ্চিত্ত।
ইনায়াকে খাইয়ে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়িয়েছে ইরফান। এরপর বিছানায় শুইয়ে দিয়েছে। মেয়ে তাকে ছাড়া ঘুমোতেই পারে না। ইরফান ঠিক করে কম্বল দিয়ে ঢাকা দিলো ইনায়ার ছোট্ট শরীর টা। নিজেও গরম পানি খেয়ে শুয়ে পড়লো বিছানায়। পাশ ফিরে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ইনায়ার দিকে। ছোট্ট ইনায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। বিড়বিড় করে বলল,
—” আমার মা, আমার ইনায়া। তোকে একটা রঙিন শৈশব দেয়ার চেষ্টা করছি রে। ভবিষ্যতে আমায় ভুল বুঝিস না কখনো। আমি যে নিরূপায়। বিশ্বাস কর, তোর মা কে দেখে এসেছি। অনেক ভালো একটা মেয়ে সে। তোকে খুব আদর করবে। হয়তো আমাকেও…হয়তো আমাকেও একটু ভালো রাখবে।”
রাত গভীর হলে ইরফান বিছানায় শুয়ে আবার সেই কাগজটার দিকে তাকাল। এবার আর দেরি করল না। ফোনটা হাতে নিল। নম্বর ডায়াল করল, তারপর আবার কেটে দিল। হালকা মলিন হাসি ফুটল ঠোঁটে। মন চাইছে কল দিতে, আবার অস্বস্তিও লাগছে। নাহ, কল দিলো না ইরফান। প্রথম দিনই কল করাটা বোধহয় ভালো দেখাবে না। বাইরে হালকা বাতাস বইছে। ইরফান চোখ বন্ধ করল। ভাবতেই তার অবাক লাগছে, এই শুক্রবার রাতে সে নিজের সন্তানকে পাশে নিয়ে ঘুমোচ্ছে, আগামী শুক্রবার হয়তো স্ত্রী সন্তান দুজনকে নিয়ে ঘুমোবে।
চলবে…
😒 রেসপন্স কম কম পাচ্ছি। এই পর্বে ১ হাজার প্লাস রিয়েক্ট চাই জনগনস! কিপ্টামি না করে লাইক, কমেন্ট করো, তাহলেই প্রতিদিন নতুন পর্ব পাবে ইনশাআল্লাহ। 👀❤️ আজকের পর্ব কেমন হয়েছে জানাও!
Share On:
TAGS: অনামিকা তাহসিন রোজা, নবরূপা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নবরূপা পর্ব ১
-
নবরূপা গল্পের লিংক
-
নবরূপা পর্ব ৬
-
নবরূপা পর্ব ৭
-
নবরূপা পর্ব ৫(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
নবরূপা পর্ব ৩
-
নবরূপা পর্ব ৪
-
নবরূপা পর্ব ৮