দিশেহারা (৩৯)
সানা_শেখ
সোহা মাজেদা আন্টির মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
“না, আন্টি। ইচ্ছে করে নেয়নি, হয়ে গেছে।”
“ভালোই হয়েছে, বাবু হলে বাবুকে নিয়ে তোমার সময় কে’টে যাবে। তোমাদের দুজনের উসিলায় হয়তো শ্রবণ আরও সুস্থ হয়ে উঠবে। এমনিতেও তুমি আসার পর শ্রবণ অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন।”
সোহা চুপ করে থাকে। মাজেদা আন্টি আবার বলেন,
“কি খাবে বলো সেটাই রান্না করি।”
“আর কিছু করতে হবে না, আন্টি। এত খাবে কে?”
“শ্রবণ তো তোমার জন্য আলাদা করে রান্না করতে বলল।”
“বলুক। আর কিছু করতে হবে না আপনার এত কষ্ট করে, যা যা করেছেন এগুলোই অনেক।”
“আচ্ছা।”
সোহা শ্রবণের কফির মগ হাতে নিয়ে রুমে ফিরে আসে। শ্রবণকে রুমে না পেয়ে ব্যালকনিতে উঁকি দেয়। শ্রবণ ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে সামনের দিকে দৃষ্টি রেখে। হয়তো কিছু দেখছে নয়তো গভীরভাবে কিছু ভাবছে।
“তোমার কফি।”
শ্রবণ ঘাড় ঘুরিয়ে সোহার দিকে তাকায়। কফির মগ হাতে নিয়ে আবার সামনের দিকে তাকায়। সোহা রুমে ফিরে এসে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে।
গতকাল দুজনেই ড্রেস খুলে ওয়াশরুমেই রেখে দিয়েছিল। দুজনের ড্রেস ধুয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হয়। মেলে দেওয়ার জন্য ড্রেস হাতে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়। শ্রবণ কফি শেষ করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। পেছন ফিরে একবার সোহার দিকে তাকিয়ে একটু সরে দাঁড়ায়। পুনরায় বাইরের দিকে তাকিয়ে সিগারেটের ধোঁয়া উড়াতে ব্যস্ত হয়।
সোহা চুপচাপ ড্রেস মেলে দিয়ে রুমে ফিরে আসে। সিগারেটের গন্ধ ওর একদম সহ্য হয় না। বেচারি শ্রবণকে কিছু বলতেও পারে না, সহ্যও করতে পারে না।
রাত পেরিয়ে নতুন ভোরের আগমন ঘটেছে। সোহা ঘুম থেকে জেগে শ্রবণকে পাশে পায়নি। ফ্রেশ হয়ে এসে ব্যালকনিতে দাঁড়ায়। বাইরে আজ রোদের দেখা নেই, আকাশে মেঘ জমে আছে। খুব শীগ্রই বৃষ্টি শুরু হবে বোধহয়।
সোহার ভীষণ মন খারাপ হয়ে আছে, কেন মন খারাপ সোহা জানে না। ঘুম থেকে জাগার পর থেকেই মন খারাপ লাগছে। সবকিছু বিষন্ন লাগছে। আকাশটাও আজ বিষন্ন হয়ে আছে, একটু পরেই ঝরঝর করে কেঁদে দেবে। সোহার চোখের কোণ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে।
“সোহা।”
শ্রবণের ডাক শুনে চমকে ওঠে সোহা। দ্রুত চোখমুখ মুছে নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করে ব্যালকনি থেকে রুমে ফিরে আসে। শ্রবণের দিকে তাকিয়ে বলে,
“বলো।”
শ্রবণ সোহার মুখের দিকে তাকিয়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যায়। সোহা পেছন থেকে তাকিয়ে রইল। ডাকলো অথচ কিছু না বলেই চলে যাচ্ছে। অদ্ভুত মানুষ।
শ্রবণ ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসে। বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখে সোহা বসে আছে চুপচাপ। গা শুকিয়ে পারফিউম স্প্রে করে নেয় তার পর কাভার্ড থেকে প্যান্ট বের করে পরতে শুরু করে।
সোহা মিনমিন করে বলে,
“আমার ফোনটা, ফোন আর ব্যাগ তো গাড়িতেই রয়ে গেছে।”
“স্টাডি রুমে এনে রেখেছি গতকালই।”
সোহা তাকিয়ে থাকে শ্রবণের দিকে, কখন এনেছে? ঔষুধ আর খাবার আনার জন্য গিয়েছিল তখন? হতে পারে। শ্রবণ ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে বলে,
“আমি জানি আমি হ্যান্ডসাম, তাই বলে এভাবে তাকিয়ে থাকার কিছু হয়নি।”
সোহা দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। নিজেকে কি মনে করে? হুহ, দেখতেই শুধু সুদর্শন, স্বভাবে তো আস্ত একটা বজ্জাত, খিটখিটে মেজাজের তিতা করলা।
“গিয়ে কানশা বরাবর দেবো একটা?”
সোহা অবাক হয়ে বলে,
“কেন? কি করেছি?”
“বকা দিচ্ছিস কেন আমাকে?”
“ক… কখন বকা দিলাম?”
“একটু আগেই।”
“কোথায়? আমি তো কিছু বলিনি।”
“মুখে দিয়েছিস নাকি? দিয়েছিস তো মনে মনে।”
সোহা হা করে তাকিয়ে রইল শ্রবণের মুখের দিকে।
“মুখ বন্ধ কর নয়তো হাতি ঢুকে যাবে মুখের ভেতর।”
সোহা মুখ ফিরিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে রইল।
“আবারও বকা দিচ্ছিস? তোর তো সাহস কম না।”
অতি নিকটে শ্রবণের গলার স্বর আর পারফিউমের তীব্র ঘ্রাণ পেয়ে ফট করে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় সোহা। শ্রবণ ওর সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। এখানে আসলো কখন?
“এভাবে কি দেখছিস?”
“কিছু না।”
“দেখবি, কিছু মিছু?”
“মা… মানে? কী দেখব?”
শ্রবণ সোহার উপর ঝুঁকে পড়ে। শ্রবণকে এভাবে ঝুঁকে পড়তে দেখে সোহা পেছনের দিকে ঝুঁকে যায়। শ্রবণ সোহার দু’পাশে দু’হাতে ভর করে আরও ঝুঁকে পড়ে। সোহা আরও ঝুঁকতে গিয়ে চিৎ হয়ে পড়ে যায় বিছানায়। শ্রবণ সোহার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে। চোখে চোখ রেখে বলে,
“দেখতে না পেয়েই তো বকা দিচ্ছিস।”
“বকা দেইনি, তোমাকে বকা দেওয়ার মতো কলিজা আমার হয়েছে নাকি?”
“দিসনি?”
সোহা দুদিকে মাথা নেড়ে বলে,
“না।”
শ্রবণ সোহার ঘাড়ে মুখ গুঁজে বলে,
“আদর আদর ফিলিংস হচ্ছে।”
সোহা শ্রবণকে নিজের ওপর থেকে সরানোর চেষ্টা করে বলে,
“তুমি না কোথায় যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছো, যাও সেখানে।”
“যাব না।”
“আন্টি আছে ফ্ল্যাটে।”
“চলে যেতে বলছি।”
“না।”
“কী না?”
“তুমি সরো আমার ওপর থেকে, এভাবে শুয়ে পেটে চাপ লাগছে।”
শ্রবণ হাতে ভর করে সোহার ওপর থেকে ওঠে। সোহা নিজের ঘাড়ে হাত বুলিয়ে বলে,
“এভাবে কা/ম/ড় দাও ব্যথা লাগে।”
শ্রবণ আবার ঝুঁকে আরও একটা কা/ম/ড় বসিয়ে দেয়। সোহা ঘাড়ে হাত চেপে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকে শ্রবণের মুখের দিকে। শ্রবণ ঝুঁকে থেকেই সোহার পেটের দিকে তাকায়। ডান হাত দিয়ে সোহার জামা উপরের দিকে তুলতে নিলেই সোহা শ্রবণের হাত চেপে ধরে। শ্রবণ চোয়াল শক্ত করে সোহার মুখের দিকে তাকাতেই হাত ছেড়ে দেয় সোহা। ভয় দেখানো ছাড়া আর কোনো কাজ নেই এই ছেলের।
জামা একটু উপরের দিকে তুলে সালোয়ার একটু নিচের দিকে নামিয়ে সোহার পেট উন্মুক্ত করে শ্রবণ। পেটের ওপর হাত বুলিয়ে চুমু খায় একটা। পেটে শ্রবণের ওষ্ঠের গভীর ছোঁয়া পেতেই সোহার শরীর ঝাঁকি দিয়ে গায়ের প্রত্যেকটা লোম খাড়া হয়ে গেছে। শ্রবণ পর পর আরও কয়েকটা চুমু খায় পেটে। সোহাকে ছেড়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ায়। চুল ব্রাশ করতে করতে সোহার দিকে তাকায় ঘাড় ঘুরিয়ে।
সোহা ড্রেস ঠিক করে শোয়া থেকে উঠে বসেছে।
চুলগুলো সেট করে শার্ট ইন করে। বাইকের চাবি আর ওয়ালেট পকেটে ভরে নেয়। সানগ্লাস শার্টের সামনে ঝুলিয়ে হাতে ঘড়ি পড়তে পড়তে বিছানার কাছে এগিয়ে এসে দাঁড়ায়। ফোন পকেটে ভরে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকায়। ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
বাইকে গেলে তো ভিজে জবজবে হয়ে যাবে। আবার ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে বাইকের চাবি রেখে গাড়ির চাবি নেয়।
সোহার দিকে তাকিয়ে বলে,
“খাব।”
সোহা দ্রুত বিছানা ছেড়ে নেমে দরজার দিকে আগায়, শ্রবণ ওর পেছন পেছন রুম থেকে বের হয়।
মাজেদা আন্টি নাস্তা তৈরি করে টেবিলের ওপর রেখেছেন।
সোহা দুটো প্লেটে নাস্তা নেয়, একটা শ্রবণের সামনে দিয়ে আরেকটা নিজে সামনে নিয়ে বসে। খাওয়ার প্রতি অনিহা তৈরি হয়েছে ইদানিং, খেতে ভালো লাগে না ইচ্ছেও করে না।
খাওয়ার মাঝেই শ্রবণের ফোন বেজে ওঠে। পকেট থেকে ফোন বের করে দেখে হাসান কল করেছে।
“বল।”
“কোথায়?”
“নাস্তা করছি।”
“দ্রুত আয়।”
“আসছি।”
কল কে’টে খাওয়ায় মনোযোগী হয় শ্রবণ। সোহা খেতে খেতে শ্রবণের মুখের দিকে তাকায় কয়েকবার। শ্রবণ মুখ তুলে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
“কী?”
সোহা দুদিকে মাথা নেড়ে বলে,
“কিছু না।”
“কিছু লাগবে?”
“না।”
শ্রবণ আর কিছু বলে না। দ্রুত খাওয়া শেষ করে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে যায়। সোহা ধীরে ধীরে খাওয়া শেষ করে রান্না ঘরে উঁকি দেয় একবার। মাজেদা আন্টি নেই, বাজারে গেছেন বোধহয়।
স্টাডি রুমে এসে ব্যাগ থেকে নিজের ফোন বের করে বেডরুমে চলে আসে। ফোন বন্ধ হয়ে গেছে চার্জ শেষ হয়ে। ফোন চার্জে লাগিয়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায় আবার। বৃষ্টি আস্তে আস্তে বাড়ছে। গেটের দিকে নজর পড়তেই দেখে শ্রবণের গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে। এই বৃষ্টির মধ্যে বাইরে না গেলে কি হতো?
ওর একা একা থাকতেও ভালো লাগছে না। মাজেদা আন্টি থাকলে ওনার সঙ্গে গল্প করতে পারত।
তখনকার কথা স্মরণ হতেই ডান হাতটা পেটের ওপর চলে আসে সোহার। দুদিনেই শ্রবণের এত পরিবর্তন আশ্চর্যজনক ব্যাপার। সোহা সত্যি অবাক হচ্ছে গত দুদিন ধরে শ্রবণকে দেখে। হঠাৎ করে এত পরিবর্তন অকল্পনীয়। এই ছেলে সত্যিই অদ্ভুত, কখন কি ভাবে-করে নিজেও জানে না বোধহয়।
শ্রবণ বন্ধুদের কাছে চলে এসেছে। ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। ওরা ছয় বন্ধু একটা ক্যাফেতে বসে আছে। হাসান ছয়টা কফির অর্ডার দেয়।
সিফাত শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
“শ্রবণ, তুই না বিয়েই করবি না জীবনে? যাক সে কথা, যে কারণেই হোক বিয়েটা করলি। শা’লা কোটিপতি ফকির, দেনমোহর দিতেই চাইলি না কারণ জীবনেও বউকে ছুবি না, কি মনে করে আবার দুই হাজার পনেরো টাকা দিলি। বিয়েই করবি না, বউকেও ছুবি না তবুও বিয়ের আধা বছর পূরণ হওয়ার আগেই বাপ হয়ে যাচ্ছিস। তোকে দেখে আশ্চর্য না হয়ে পারি না, ভাই।”
রাব্বি বলে,
“মনের কথা বলছিস তুই, আমিও এটাই বলতে চাইছিলাম। যেই ছেলে জীবনে বিয়েই করবে না, মেয়ে মানুষ দেখলেই নাক সিটকে দূরে সরে যায় সেই ছেলে আমাদের আগেই বিয়ে করে বাপ হয়ে যাচ্ছে।”
হাসান বলে,
“তোরা সারাদিন বিয়ে বিয়ে বউ বউ করিস সেজন্যই তোদের কপালে বিয়ে আর বউ কোনোটাই জুটছে না।”
সিফাত বলে,
“কবে জানি শুনি তুইও বিয়ে করে নিচ্ছিস।”
সাকিব বলে,
“ভাই আর যাই করিস আমাদের আগে বিয়েটা করিস না।”
হাসান নাকমুখ কুঁচকে বলে,
“বিয়ে করছে কে?”
“কিজানি, কবে জানি শুনি তুইও বিয়ে করে বাপ হয়ে যাচ্ছিস। তোদের দুজনের তো আবার এক রোগ, স্বভাবও প্রায় একই। না না করতে করতে একই কাজ করেও ফেলতে পারিস।”
শ্রবণ নীরব দর্শক হয়ে সকলের কথা শুনছে। এদের এত আজাইরা কথা কি খেয়ে আসে ওর মাথায় ধরে না। ওর তো প্রয়োজনীয় কথাও বলতে ইচ্ছে করে না।
কফি চলে আসে ছয় জনের। শ্রবণ কফির মগে চুমুক দিতে দিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে।
চোখমুখ গম্ভীর, কেমন বিষন্ন দেখাচ্ছে।
হাসান কফির মগে চুমুক দিতে দিতে শ্রবণের দিকে তাকিয়ে থাকে। বাকিরা গল্প করছে আর কফির মগে চুমুক দিচ্ছে।
“শ্রবণ।”
হাসানের ডাক শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকায় শ্রবণ।
“কী হয়েছে?”
শ্রবণ দুদিকে মাথা নাড়ায়। হাসান বলে,
“মন খারাপ কেন?”
“ভাল্লাগেনা কিছু।”
“স্ট্রেস কমা। কেন এত টেনশন করিস? যা হবে ভালোই হবে।”
শ্রবণ চুপ করে থাকে।
“কোথায় না যাবি বলেছিলি?”
“বাড়িটা দেখতে যেতে চেয়েছিলাম কিন্তু এই বৃষ্টির মধ্যে এখন আর যাবো না।”
“বৃষ্টি হচ্ছে তো কি হয়েছে? গাড়ি তো নিয়ে এসেছিস, চল গিয়ে দেখে আসি।”
“থাক, এখন আর যাব না।”
“কাজ কোন পর্যন্ত? কমপ্লিট হতে আর কতদিন?”
“আরও অনেক সময় লাগবে পুরোপুরি কমপ্লিট হতে।”
“তোর বাবু হওয়ার আগে হলে ভালো হবে, কি বলিস?”
“বাবু হওয়ার অনেক আগেই হবে।”
পাশ থেকে রাব্বি বলে,
“প্রেমিক প্রেমিকার মতো কি এত গুজুর গুজুর ফুসুর ফুসুর করছিস দুজন?”
“প্রেম করছি, করবি?”
“আস্তাগফিরুল্লাহ, লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। কি বলিস এসব? আমি কোনো গে নই, আমার কোনো সমস্যা নেই, ভাই। আমি কেন তোদের মতো ব্যাডাদের সঙ্গে প্রেম করতে যাব? তোরাই কর তোদের প্রেম।”
হাসান আর শ্রবণ দুজনেই দাঁতে দাঁত চাপে রাব্বির কথা শুনে। শ্রবণ কটমট করে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
“তোর কী মনে হয়, আমাদের দুজনের মধ্যে সমস্যা আছে?”
সিফাত টিটকিরি করে বলে,
“থাকতেও পারে, দুজনের এক সমস্যা, বিয়ে করতে চাস না। ভাই, সিরিয়াসলি বলছি, তোরা কি রিলেশনে আছিস?”
শ্রবণ হাত বাড়িয়ে খপ করে চেপে ধরে সিফাতের ঘাড়। হাসান বসা থেকে উঠে সিফাতের পেছনে দাঁড়িয়ে ধুমধাম লাগিয়ে দেয় কয়েকটা পিঠের ওপর।
“মারছিস কেন, ভাই? মজা করলাম তো। এ্যাই, শ্রবণ, ছাড়।”
বাকি তিনজন ওদের তিনজনের দিকে তাকিয়ে হাসছে। ক্যাফেতে বসে থাকা বাকিরাও ওদের ছয়জনের দিকে তাকিয়ে আছে।
এশার নামাজের পর ফ্ল্যাটে ফেরে শ্রবণ। ফোনে সামাদ চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলতে বলতে দরজা লাগিয়ে রুমের দিকে আগায়। রুমে এসে বিছানার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। কথা বলা শেষ করে ফোন রাখে। সোহার দিকে তাকিয়ে গাম্ভীর্য ভাব ধরে রেখে বলে,
“প্রত্যেকদিন যে ব্ল্যাঙ্কেট মুড়ি দিয়ে এভাবে বসে থাকিস তাতে তোর ভয় কমে যায়?”
সোহা উপর নিচ মাথা নাড়ায়। শ্রবণ আগের মতো একইভাবে বলে,
“ব্ল্যাঙ্কেট মুড়ি দিয়ে এভাবে বসে থাকলে ভূ’ত তোকে ধরতে পারবে না?”
“জানিনা তো।”
“এভাবে বসে থাকলে আরও ভালোভাবে ধরতে পারবে। পেছন থেকে আসবে তারপর তোর ঘাড়ে চেপে বসবে।”
শ্রবণের কথা আর গলার স্বর শুনে ভয় পেয়ে দ্রুত বিছানা ছেড়ে নেমে শ্রবণের গা ঘেঁষে দাঁড়ায় সোহা।
বিছানার দিকে তাকিয়ে শ্রবণের মুখের দিকে তাকায়। ভয়ার্ত কন্ঠে বলে,
“সত্যি সত্যিই পেছন থেকে এসে ঘাড়ে চেপে বসবে?”
শ্রবণ মাথা নাড়ায়, গলার স্বর আগের চেয়েও ভারি করে বলে,
“হুম।”
“সত্যি সত্যিই ভূ’ত আছে এই ফ্ল্যাটে?”
“হ্যাঁ।”
সোহা ভয়ে আতঙ্কে শ্রবণের বুকের সঙ্গে লেপ্টে যায়। এক হাতে জড়িয়ে ধরে অন্যহাতে শার্ট খামচে ধরে। রুমের চারদিকে নজর বুলিয়ে বলে,
“তুমি সন্ধ্যার পর কেন বাইরে থাকো?”
“এখন এই ভূ’তের জন্য কি দিন-রাত বউয়ের আঁচল ধরে ঘুরবো আমি?”
“যদি ভূ’ত এসে আমাকে মে’রে ফেলে?”
“মা’রবে কেন? তুই ভূ’তের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে নে, এমনিতেও তুইতো ডাইনিরই বাচ্চা জুনিয়র ডাইনি।”
“তুমি সন্ধ্যার পর কোথাও যেও না প্লীজ, আমার অনেক ভয় লাগে একা একা থাকতে।”
“একা কোথায়? বাবু তো আছেই তোর সঙ্গে”
“কোথায় বাবু? ও তো এখনো পেটের ভেতরেই রয়েছে।”
“ভূ’ত তো আছে। ওরা থাকতে কীসের ভয়? আমি তো কত বছর ধরে ওদের সঙ্গেই আছি।”
“তোমাকে ভয় দেখায় না ওরা?”
“না।”
“মিথ্যে বলছো তুমি তাইনা? কোনো ভূত নেই।”
“এই ডাইনির বাচ্চা, ভূত নেই তাহলে ভয় পাস কেন? দুনিয়ায় ভূত বলতে কিছু আছে? যদি কিছু থেকে থাকে তা হলো তোর মা, খালা আর নানি। ডাইনি, রা’ক্ষ’সী, শ’য়’তা’ন সব ওরাই। ওরা ছাড়া দুনিয়ায় আর কোনো ভূত প্রেত নেই।”
এক দমে কথাগুলো বলে থামে শ্রবণ। সোহাকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দিতে দিতে বলে,
“ছাড় এখন, সবসময় শুধু চিপকে যাওয়া, অসভ্য মেয়ে।”
সোহা শ্রবণের কাছ থেকে দূরে সরে দাঁড়ায়। আশেপাশে নজর বুলাতে বুলাতে সেন্টার টেবিলের কাছে এসে দাঁড়ায়। গ্লাসে পানি ঢেলে ঢকঢক করে পুরো এক গ্লাস পানি পান করে। ভয়ে গলা-ই শুকিয়ে গিয়েছিল।
শ্রবণ শার্ট খুলে বেল্ট খুলতে খুলতে সোহার দিকে তাকায় আবার। একটা মানুষ এত ভয় কীভাবে পায়? ভূত বলতে দুনিয়ায় আদৌ যে কোনো কিছু নেই এটা এই মেয়েকে কীভাবে বোঝাবে? রোজ রোজ ভূতের ভয়ে ব্ল্যাঙ্কেট মুড়ি দিয়ে বসে থাকে।
শ্রবণ গোসল সেরে বেরিয়ে আসে। চুল মুছতে মুছতে সোহার দিকে তাকিয়ে বলে,
“খাব।”
সোহা বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়িয়ে থাকে।
“দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
“তুমিও চলো।”
“গিয়ে বাড়তে থাক, আসছি।”
“একা একা যেতে ভয় লাগে।”
“ধরে একটা আছাড় মা’র’বো দেখিস। যা, কিছু নেই।”
ধমক খেয়ে ভয়ে ভয়ে রুম থেকে বের হয় সোহা। পুরো ড্রয়িং রুমে নজর বুলাতে বুলাতে রান্নাঘরের দিকে আগায় ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানি আনার জন্য।
রান্না ঘরের কাছাকাছি আসতেই নজর পড়ে শোকেসের পাশে। ওখানে লাইটের আলো পৌঁছায়নি, অন্ধকারের মধ্যে জ্বলজ্বলে আলো জ্বলে আছে কারো দুই চোখে। ভয়ে সোহার গলা শুকিয়ে কাঠ। চোখ বন্ধ করে এক চিৎকার দিয়ে রুমের দিকে দৌড় দেয় ‘ভূ’ত ভূ’ত’ বলে।
সোহার চিৎকার শুনে শ্রবণ-ও রুম থেকে বেরিয়ে আসে। দরজা পার হতেই সোহা এক লাফে ওর কোলে উঠে গলা জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে মুখ গুঁজে দেয়। হঠাৎ এমন হওয়ায় ঝোঁক সামলাতে না পেরে কয়েক কদম পিছিয়ে যায় শ্রবণ। শক্ত হাতে সোহাকে আগলে ধরে স্থির হয়ে দাঁড়ায়। আশেপাশে নজর বুলাতে বুলাতে উদ্বিগ্ন হয়ে বলে,
“কী হয়েছে?”
সোহা শ্রবণের ঘাড়ে মুখ গুঁজে রেখেই ভয়ার্ত কন্ঠে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে,
“রান্নাঘরের ওখানে ভূ’ত?”
“ভূ’ত! কীসের ভূ’ত? একটু আগেই না বললাম ভূত বলতে কিছু নেই।”
“আছে, আমি দেখেছি।”
“কোথায়?”
সোহা মুখ না তুলেই হাত দিয়ে ইশারা করে দেখিয়ে দেয়। শ্রবণ সোহাকে কোলে নিয়েই সেদিকে পা বাড়ায়। সোহা ছটফট করে অস্থির হয়ে বলে,
“যেও না, ভূ’ত আছে ওখানে। রুমে চলো।”
“চুপ করে থাক, দেখি কোন ভূ’ত এসেছে তোকে খাওয়ার জন্য।”
“সত্যি সত্যিই ভূ’ত আছে, চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছিল। আমি যাব না ওখানে।”
শ্রবণকে তবুও সেদিকে আগাতে দেখে সোহা আরও শক্ত করে ওর গলা জড়িয়ে ধরে। দুই পা দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে আছে কোমর।
রান্না ঘরের কাছাকাছি আসতেই দেখে ছোটো একটা বিড়াল ভয়ে জড়সড়ো হয়ে এদিক ওদিক দেখছে। ওদের দেখতেই দৌড়ে রান্নাঘরে ঢুকে যায়।
শ্রবণ রান্নাঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে ফোস করে শ্বাস ছাড়ে। নিজে তো ভয় পেয়েছেই সঙ্গে বিড়াল আর ওকেও ভয় পাইয়ে দিয়েছে। কারো পোষা বিড়াল ওটা। ফ্ল্যাটে ঢুকলো কীভাবে আর কখন ঢুকলো? ও যখন এসেছে তখন? হতে পারে, ও হয়তো খেয়াল করেনি।
রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
“এভাবে যে দৌড় দিলি ভুলে গেছিস তুই যে প্রেগন্যান্ট? ঠাস করে যদি পড়তি? বাবুর যদি কোনো ক্ষতি হয়? এত বড়ো একটা ডাইনি হয়ে সামান্য দুই ইঞ্চির একটা বিড়াল দেখে কীভাবে ভয় পাস?”
(3K রিয়েক্ট পূরণ হওয়ার পরেই নেক্সট পার্ট পাবেন। এখন দেখুন আপনারা যা ভালো মনে করেন। 3k রিয়েক্ট পূরণ হতে যদি সাতদিন লাগে তাহলে সাতদিন পরেই নেক্সট পার্ট পাবেন, তার আগে হলে আগেই পাবেন।
আমি কিছু বলিনা বলে আপনারাও চুপচাপ গল্প পড়ে চলে যান, কমেন্ট তো করবেন দূরের কথা সামান্য এক সেকেন্ড ব্যয় করে লাইকটা পর্যন্ত দেন না। আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করে কাদের জন্য লিখি আর কেন লিখি? এখন থেকে প্রত্যেক পার্টে 3K রিয়েক্ট পূরণ না হওয়া পর্যন্ত নেক্সট পার্ট আসবে না ইনশা-আল্লাহ। যারা এখনো পেজ ফলো না দিয়ে চুপচাপ গল্প পড়েন তারাও দ্রুত ফলো দিয়ে রাখবেন, ধন্যবাদ সবাইকে।)
চলবে…………
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৬
-
দিশেহারা পর্ব ১
-
দিশেহারা পর্ব ৪০
-
দিশেহারা পর্ব ১৪
-
দিশেহারা পর্ব ১৯
-
দিশেহারা পর্ব ১২
-
দিশেহারা পর্ব ২৪
-
দিশেহারা পর্ব ৩৬
-
দিশেহারা পর্ব ২৬
-
দিশেহারা পর্ব ২৮