দিশেহারা (৩২)
সানা_শেখ
বাইরে বেরিয়ে গেলেও এক ঘন্টা পরেই আবার ফ্ল্যাটে ফিরে আসে শ্রবণ। বাইরে আজ মন টিকছে না, কেমন ছটফট ছটফট লাগছে।
রুমে এসে চেঞ্জ করে নেয়। শিস বাজাতে বাজাতে রুম থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরে আসে। কপালে কয়েক ভাঁজ ফেলে ফ্লোরে জুবুথুবু হয়ে বসে থাকা সোহার দিকে তাকায়। এভাবে বসে আছে কেন? চুলার দিকে তাকিয়ে দেখে চুলার উপর রান্না চাপানো।
“কী হয়েছে? এভাবে বসে আছিস কেন?”
চমকে ওঠে সোহা। মাথা তুলে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রবণের দিকে তাকায়।
শ্রবণ পুনরায় বলে,
“কী হয়েছে? এভাবে এখানে বসে আছিস কেন? ভয় পেয়েছিস?”
সোহা দু’দিকে মাথা নাড়ায়, ভয় পায়নি।
শ্রবণ ভালোভাবে খেয়াল করে দেখে সোহার হাত সহ পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে।
এগিয়ে এসে পায়ের উপর ভর করে বসে সোহার সামনে।
“ভয় পাসনি তাহলে কাঁপছিস কেন এভাবে?”
সোহা চুপ করে থাকে। শ্রবণের গলার স্বর এখন কিছুটা নরম হয়।
“বল, কী হয়েছে?”
“পেট ব্যথা করছে।”
“কেন? গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হয়েছে?”
সোহা দু’দিকে মাথা নাড়ায়।
“তাহলে কী হয়েছে? খুলে না বললে বুঝবো কীভাবে কী হয়েছে?”
কিছু বলতে না পেরে উঠে দাঁড়ায় সোহা। তীব্র ব্যথায় ককিয়ে ওঠে। থরথর করে কাঁপছে পুরো শরীর। ব্যথার কারণে দাঁড়িয়ে থাকতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। চোখ দুটো পানিতে টলমল করছে আবার।
তরকারি প্রায় হয়েই এসেছে। ঢাকনা তুলে নাড়া দিয়ে আবার ঢেকে দেয়। শ্রবণ উঠে দাঁড়ায় ওর পাশে। কিছুটা কর্কশ গলায় বলে,
“এই, কী হয়েছে তোর? ভালোভাবে জিজ্ঞেস করছি ভাল্লাগছে না? কানের নিচে দুইটা দিয়ে মুখ থেকে কথা বের করতে হবে?”
সোহা বসে পড়ে আবার। শ্রবণ রেগে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। জোরে ধমক দিয়ে বলে,
“এই কু/ত্তা/র বাচ্চা, কী জন্য পেট ব্যথা করছে জিজ্ঞেস করছি না?”
“পিরিয়ড হওয়ার কারণে ব্যথা করছে।”
কথাগুলো বলেই আবার মুখ নামিয়ে নেয় সোহা। শ্রবণ তাকিয়ে রইলো ওর দিকে। ওর মাথা থেকে তো বেরিয়েই গিয়েছিল ব্যাপারটা। এইভাবে ঠকঠক করে কাঁপছে আবার রান্নাও করছে।
সোহার সামনে বসে বলে,
“পেট ব্যথা নিয়ে রান্না করছিস কেন?”
“রান্না না করলে দুপুরে কী খাবে?”
“রুমে যা।”
“রান্না শেষ হোক।”
“আমি যেতে বলেছি, যা।”
“রান্না?”
“করতে হবে না।”
“খাবে কী?”
“অর্ডার দিয়ে দেব।”
সোহা বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। শ্রবণ তাকিয়ে দেখে ওকে। সোহার শরীর থরথর করে কাঁপছে, সামনের দিকে ঝুঁকে আছে কিছুটা।
“এসব কী করবি?”
“ফ্রিজে তুলে রাখি নয়তো নষ্ট হয়ে যাবে।”
শ্রবণ উঠে দাঁড়িয়ে নিজেই ফ্রিজে তুলে রাখে সব। সোহা চুলা বন্ধ করে দেয়। শ্রবণ ওর হাত ধরে বলে,
“আর কিচ্ছু করতে হবে না, পরে করবি সব, চল এখন।”
হাঁটতে গিয়েও হাঁটতে পারছে না সোহা। ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে। ওর অবস্থা দেখে শ্রবণ ওকে পাঁজা কোলে তুলে নেয়। হকচকিয়ে যায় সোহা। তাড়াহুড়ো করে বলে,
“কী করছ?”
শ্রবণ বলে না কিছু। রুমে এসে সোহাকে বিছানায় শুইয়ে দেয়। কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সোহা তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। কী ভাবছে বোঝার চেষ্টা করে।
শ্রবণ ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে,
“প্রত্যেকবার এমন ব্যথা করে?”
সোহা দু’দিকে মাথা নাড়িয়ে বলে,
“অনেক আগে দুই তিনবার এমন হয়েছিল। আজকে আবার হয়েছে।”
“ঠিক হবে কী করলে?”
“আম্মু কী যেন একটা ঔষুধ এনে দিয়েছিল।”
“নাম কী?”
“মনে নেই।”
“কোন বা/ল মনে থাকে তোর?”
সোহা চুপ করে থাকে। ব্যথায় জড়সড়ো হয়ে গুটিয়ে শুয়ে আছে। রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে,
“আসছি আমি, চুপচাপ শুয়ে থাক।”
শ্রবণ চলে যেতেই সোহা উপুর হয়ে শোয় হাঁটু ভাঁজ করে। গলা ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। শ্রবণের ভয়ে চিনচিনে পেট ব্যথা নিয়েই রান্না করতে গিয়েছিল। রান্না করতে করতেই ব্যথা বেড়ে সহ্য ক্ষমতা ছাড়িয়ে গেছে। শ্রবণ ফিরে এসে খাবার না পেয়ে যদি ওকে ধরে উত্তম মাধ্যম দেয় সেই ভয়েই রান্না করতে গিয়েছিল। কিন্তু এই বদ রাগী দয়া মায়া হীন ছেলের মনে তো আজ ওর জন্য একটু হলেও দয়া মায়া জন্মেছে দেখা যায়।
অল্প কিছুক্ষণ পরেই শ্রবণ ফিরে আসে ফ্ল্যাটে। গ্লাসে পানি ঢেলে একটা ট্যাবলেট বের করে বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে বলে,
“উঠে এটা খা, ব্যথা ঠিক হয়ে যাবে।”
সোহা সোজা হয়ে উঠে বসে। দ্রুত ট্যাবলেটটা খেয়ে আবার শুয়ে পড়ে।
শ্রবণ গ্লাসটা রেখে রুম থেকে বের হতে হতে বিড়বিড় করে বলে,
“মেয়ে মানুষ জীবনে রাখা অনেক ঝামেলা আর প্যারা। পুরুষ মানুষ কেন বিয়ে করতে পাগল হয় বুঝি না।”
সন্ধ্যার পর পর চৌধুরী বাড়ির কলিং বেল বেজে ওঠে। মেড এগিয়ে এসে দরজা খুলে দিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। স্পর্শ বিরক্ত হয়ে বলে,
“ভেতরে যেতে দেবেন নাকী এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকবেন মূর্তির মতো?”
মেড দ্রুত রাস্তা ছেড়ে দাঁড়ায়। স্পর্শ কাঁধে ব্যাগ আর দুই হাতে দুটো স্যুটকেস নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে।
তনিমা চৌধুরী সোফায় বসে ছিলেন। ছেলেকে ফিরে আসতে দেখে খুশিতে ওনার চোখ দুটো চকচক করে ওঠে। দ্রুত সোফা ছেড়ে এগিয়ে আসেন ছেলের দিকে। ছেলেকে জড়িয়ে ধরার জন্য উদ্যত হতেই স্পর্শ ভীষণ বিরক্তি নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
“দূরে থাকবেন আমার কাছ থেকে, আদিখ্যেতা দেখাতে আসবেন না কেউ।”
তনিমা চৌধুরী ছেলেকে দেখে যতটা না খুশি হয়েছিলেন ছেলের কথা শুনে তার চেয়েও বেশি কষ্ট পেয়েছেন।
স্পর্শ না থেমে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পেছন থেকে ছলছল নয়নে তাকিয়ে রইলেন তনিমা চৌধুরী।
সিয়াম সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার সময় মেঝো ভাইকে দেখে খুশি হয়ে যায়। দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরে খুশি হয়ে বলে,
“ভাইয়া, তুমি ফিরে এসেছো, আমার অনেক আনন্দ হচ্ছে। আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না যে তুমি ফিরে এসেছ।”
“আসলাম ফিরে।”
“তোমার শরীর কেমন এখন? জ্বর ঠিক হয়েছে?”
“হুম। দাদা ভাই কোথায়?”
“রুমেই আছে।”
“একটা স্যুটকেস নিয়ে আয় আমার রুমে।”
“চলো।”
করিডোরে আসতেই বাবার সঙ্গে দেখা হয় স্পর্শের। বাবাকে দেখেও না দেখার ভান ধরে নিজের রুমের দিকে আগায়। শামীম রেজা চৌধুরী ছেলেকে পিছু ডেকে এগিয়ে আসতে আসতে বলেন,
“কেমন আছো, স্পর্শ?”
স্পর্শ উত্তর দেয় না, দ্রুত পায়ে নিজের রুমের ভেতরে ঢুকে যায়। সিয়াম ভেতরে প্রবেশ করতেই দরজা লাগিয়ে দেয় ভেতর থেকে।
শামীম রেজা চৌধুরী বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইলেন। একদম বড়ো ভাইয়ের মতো হয়ে গেছে। উনি তো ভেবেছিলেন ওনার এই ছেলেটা ভদ্র, কিন্তু এখন তো দেখা যাচ্ছে বড়ো ছেলের মতোই অভদ্র হয়েছে। হোস্টেলে ভার্সিটিতে কতবার গিয়েছেন হিসেব নেই স্পর্শ একবারও কথা বলেনি বরং ইগনোর করেছে সবসময়। স্বভাব চরিত্র একদম বড়ো ভাইয়ের মতো হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। এখন রাগের মাথায় বড়ো ভাইয়ের মতো বাপের গায়ে হাত না তুললেই হয়।
নিচে নেমে আসতেই স্ত্রীকে দেখতে পান সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে থাকতে। কাছে এগিয়ে এসে বলেন,
“এভাবে সিঁড়ির দিকে কী দেখছ? স্পর্শ কথা বলেছে তোমার সঙ্গে?”
তনিমা চৌধুরীর চোখ দুটো পানিতে টুইটুম্বর হয়ে গেছে। কম্পিত স্বরে বলেন,
“কথা তো বলেছে তবে —
“তবে কী?”
“ওর কাছ থেকে দূরে থাকতে বলেছে, আদিখ্যেতা দেখাতে নিষেধ করেছে। আমার ছেলেটা কেন এমন হয়ে গেল? সব তোমার বড়ো ছেলের দোষ। ওর জন্যই এত অশান্তি সৃষ্টি হয়েছে এই বাড়িতে। তোমার বড়ো ছেলে আমার ছেলেকে কেড়ে নিয়েছে আমার কাছ থেকে।”
চলবে………..
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ২
-
দিশেহারা পর্ব ২৩
-
দিশেহারা পর্ব ৪২
-
দিশেহারা পর্ব ৩৬
-
দিশেহারা পর্ব ১০
-
দিশেহারা পর্ব ১২
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ১
-
দিশেহারা পর্ব ১৪
-
দিশেহারা পর্ব ২০
-
দিশেহারা পর্ব ৩৫