দিশেহারা (২২)
সানা_শেখ
পেরিয়ে গেছে কয়েক দিন। শ্রবণ এখন সুস্থ তবে জ্বরের ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেনি এখনও সেভাবে।
সোহা দুপুরের রান্না শেষ করে গোসল করে বের হয় ওয়াশরুম থেকে। শ্রবণ গোসল সেরে শুয়ে আছে মুখের উপর বালিশ চেপে ধরে। ঘুমিয়ে গেছে বোধহয়। গতরাতে ঘুমায়নি ঠিক মতো।
টুকটাক শব্দে মুখের উপর থেকে বালিশ সরায় শ্রবণ। চোখ মেলে তাকাতেই লাইটের আলো এসে চোখে লাগে, সঙ্গে সঙ্গেই চোখ বন্ধ করে নেয়, কয়েকবার চোখ ঝাপটা দিয়ে আবার তাকায়। বিড়বিড় করে সোহাকে গালী দেয় লাইট অন করার কারণে।
ড্রেসিং টেবিলের দিকে তাকিয়ে দেখে সোহা চুল ব্রাশ করছে। গায়ে ওড়না নেই, ওড়নাটা পাশেই টুলের উপর রেখে দিয়েছে। চুলগুলো দুই কাঁধ দিয়ে দু-পাশে নামানো রয়েছে। ফরসা পিঠ আর ঘাড় উন্মুক্ত হয়ে আছে।
শ্রবণের দৃষ্টি স্থির সোহার পিঠ আর ঘাড়ে। জামার ফিতাটা নড়ছে সোহার নড়াচড়ায়। ফরসা পিঠ আর ঘাড় শ্রবণের কাছে আকর্ষণীয় লাগছে। লাল জামা পরনে সোহাকেও দারুন লাগছে।
রহস্যময় এক হাসি হেসে শোয়া থেকে উঠে বসে শ্রবণ। বিছানা ছেড়ে নেমে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে দাঁড়ায় সোহার পেছনে। সোহা চুল ব্রাশ করায় এতটাই মগ্ন যে শ্রবণ ওর পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে সেদিকে খেয়াল নেই।
শ্রবণ হাত তুলে সোহার নরম ফরসা আকর্ষণীয় পিঠে হাত ছোঁয়ায়। ভয় পেয়ে চমকে ওঠে সোহা। আয়নার দিকে তাকিয়ে শ্রবণকে দেখে চিৎকার করে ওঠে। উল্টো ঘুরে ড্রেসিং টেবিলের সঙ্গে ঠেকে গেছে। চরম বিরক্তিতে শ্রবণের কপালে ভাঁজ পড়েছে কয়েকটা।
এই মেয়ের চিৎকার করে ওর কান আর মাথার বারোটা বাজানো ছাড়া আর কোনো কাজ কী নেই?
ধমক দিয়ে বলে,
“চিৎকার করছিস কেন এভাবে? দেবো গলাটা চেপে?”
সোহা ভয়ে ভয়ে শ্রবণের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বিছানার দিকে তাকায়। বিছানায় শ্রবণকে দেখতে না পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয়। শ্রবণকে হঠাৎ নিজের পেছনে দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিল। ও-তো ভেবেছিল শ্রবণ ঘুমিয়ে গেছে আর শ্রবণের রূপ ধারণ করে জ্বীন ভূত এসেছে।
“কথা বলছিস না কেন?”
“তু তুমি ঘুমাওনি?”
“না।”
না শব্দটা উচ্চারণ করেই সোহাকে টেনে উল্টো করে দাঁড় করায় নিজের সামনে। পুনরায় দৃষ্টি স্থির করে ফরসা পিঠ আর ঘাড়ে। সোহা আয়নার দিকে তাকিয়ে শ্রবণের ভাব ভঙ্গি বোঝার চেষ্টা করছে। শ্রবণের দৃষ্টি পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে ভালোভাবেই বুঝতে পারছে সোহা। এই শ্রবণকে সোহা দেখেনি এর আগে।
শ্রবণ আবার হাত ছোঁয়ায় সোহার ঘাড়ে। সোহা কেঁপে ওঠে, পুরো শরীর শিরশির করছে, গায়ের প্রত্যেকটা লোম খাড়া হয়ে গেছে।
দ্রুত সরে যেতে চায় শ্রবণের সামনে থেকে। শ্রবণ টেনে ধরে সোহার কোমর জড়িয়ে ধরে এক হাতে। সোহার পিঠ ঠেকে গেছে শ্রবণের বুকের সঙ্গে। সোহার হৃদস্পন্দনের গতি অস্বাভাবিক। অচেনা অনুভূতিতে থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে সারা অঙ্গ।
শ্রবণ হাত তুলে সোহার নরম মসৃণ গালে হাতের উল্টো পিঠ ছোঁয়ায়। হাত গালের উপর থেকে যখন নিচের দিকে নেমে আসে সোহা তখন বারংবার কেঁপে কেঁপে ওঠে।
দ্রুত চেষ্টা করে নিজের কোমর থেকে শ্রবণের হাত সরিয়ে দেওয়ার। শ্রবণ আরও শক্ত করে চেপে ধরে। মুখ নামায় ঘাড়ে। সোহা কম্পিত স্বরে বলে,
“কী করছ? ছাড়ো আমাকে।”
“হুশ, ডোন্ট সাউন্ড।”
“তু তুমি নিজের মধ্যে নেই, ছাড়ো আমাকে।”
“আমি নিজের মধ্যেই আছি, তুই চুপ থাক।”
“ছাড়ো আমাকে।”
শ্রবণ ফট করে সোহাকে নিজের দিকে ফেরায়। সোহার চোখমুখ অন্যরকম কিন্তু শ্রবণের কাছে দারুন লাগছে। গোলাপি ওষ্ঠ জোড়া তিরতির করে কাঁপছে। ঘনঘন চোখের পলক ফেলছে।
শ্রবণ সোহার বাহু ছেড়ে চুল পেছনে ঠেলে দিয়ে চুলের ভাঁজে হাত গলিয়ে দেয়। সোহা পিছিয়ে যেতে চাইলে শ্রবণ ফট করে ওকে আরও ভালোভাবে আঁকড়ে ধরে অধর জোড়া চেপে ধরে নিজের অধর দিয়ে।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য সোহার নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ।
মুহূর্তেই সোহার ছটফটানি বেড়ে যায়। শ্রবণকে দুই হাতে ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছে।
দীর্ঘ চুম্বনের পর ছেড়ে দেয় সোহাকে। চরম বিরক্তি নিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
“কী হয়েছে? এমন করছিস কেন? চুপচাপ থাকতে পারিস না?”
“ছা ছাড়ো আমাকে।”
“ছেড়েই দেওয়া উচিত, তোর ঠোঁটের স্বাদ খুবই বিশ্রী, লাইক পাটের বিচি। ছিঃ, জঘন্য টেস্ট।”
এতক্ষণ ধরে ঠোঁট জোড়ার ওপর অত্যাচার করে এখন বলছে ‘ছিঃ জঘন্য টেস্ট!’ বদ লোক একটা।
সোহা টলমলে চোখ জোড়া নামিয়ে নিয়ে জড়ানো গলায় বলে,
“ছাড়ো আমাকে।”
“কোনো ছাড়াছাড়ি নেই।”
বলেই আবার চেপে ধরে ওষ্ঠ জোড়া। সোহার ছটফটানি এবার আগের চেয়েও বেশি। শ্রবণ ছেড়ে দিয়ে মৃদু স্বরে বলে,
“ডোন্ট ডিস্টার্ব।”
এক দুপুরে দ্বিতীয়বারের মতো গোসল করে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে সোহা।
বিছানার দিকে দৃষ্টি যেতেই দেখে শ্রবণ বিভোর হয়ে ঘুমিয়ে গেছে। লাইটের আলোও যেন এখন ওর চোখে লাগছে না।
সোহা এখনও একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছে। কি হলো এখনও সেটাই ভেবে চলেছে। আচমকা কোন ভূত ভর করেছিল এই বড়ো ভূতের মাথায়?
দূরে থাক, দূরে থাক করে আজকে নিজেই যত দূরত্ব ছিল সব ঘুচিয়ে দিয়েছে।
ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়াতেই নজরে আসে শ্রবণের দেওয়া চিহ্নগুলো।
চোখ নামিয়ে নেয় আয়নার দিক থেকে। নিজের দিকে নিজেই তাকাতে পারছে না।
ঘাড়ে রীতিমতো জ্বলছে এখনও। শ’য়’তা’ন রা’ক্ষ’স একটা।
বিড়বিড় করে বকা দিয়ে ব্যালকনিতে চলে যায়। খিদে পেয়েছে কিন্তু খেতে ইচ্ছে করছে না। চেয়ারে বসে তাকিয়ে থাকে দূর আকাশের দিকে।
ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে ঘুরতে চারটার ঘরে এসে ঠেকেছে। নিজের ফোনের রিংটোনের শব্দে ঘুম ভাঙে শ্রবণের। চোখ বন্ধ রেখেই বিছানা হাতড়ে ফোন হাতে নেয়। ঘুম জড়ানো চোখে স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে হাসান কল করেছে। রিসিভ করে কানে ধরে বলে,
“বল।”
“কোথায় তুই? ঘুমিয়ে ছিলি নাকী?”
“হ্যাঁ।”
“এই বেলায় তোর আবার কীসের ঘুম? শরীর খারাপ লাগছে নাকী আবার?”
“না, দুপুরে ঘুমিয়েছিলাম। কিছু বলবি?”
“বাইরে আসবি না?”
“হ্যাঁ।”
“আয় তাহলে।”
“ফ্রেশ হয়ে আসছি।”
“আচ্ছা, রাখছি তাহলে।”
শ্রবণ ফোন পাশে রেখে নিশ্চুপ হয়ে শুয়ে থাকে। ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছে করছে না, আরও কিছুক্ষণ ঘুমোতে পারলে ভালো লাগত।
আলসেমি ছেড়ে শোয়া থেকে উঠে বসে। চুলগুলো পেছনের দিকে ঠেলে দিতে দিতে গলা ছেড়ে সোহাকে ডাকে।
শ্রবণের ডাক শুনে দ্রুত ব্যালকনি থেকে রুমে ফিরে আসে সোহা। শ্রবণের সামনে দাঁড়ায় মাথা নিচু করে।
শ্রবণ সোহার দিকে তাকায় চোখ তুলে। আগা গোড়া পরখ করে বলে,
“কফি নিয়ে আয়।”
সোহা দ্রুত পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। শ্রবণের সামনে থাকতে অস্বস্তি হচ্ছে।
কফি বানিয়ে নিয়ে রুমে এসে দেখে শ্রবণ রুমে নেই। ওয়াশরুমের দিকে তাকিয়ে দেখে দরজা বন্ধ। কফির মগ বেড সাইড টেবিলের উপর রেখে বিছানা ঠিকঠাক করে রাখে। সোজা হয়ে দাঁড়াতেই ওয়াশরুম থেকে ভেসে আসে শ্রবণের গলার স্বর।
“সোহা, টাওয়েল দে।”
সোহা ওয়াশরুমের দিকে তাকিয়ে ব্যালকনির দিকে এগিয়ে যায়। গোসল করতে গেছে অথচ টাওয়েল নেয়নি।
টাওয়েল নিয়ে ওয়াশরুমের দরজায় নক করে। শ্রবণ দরজা খুলে সোহার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“টাওয়েল ওয়াশরুমে না রেখে কোথায় রেখেছিলি?”
“ব্যালকনিতে শুকিয়ে দিয়েছিলাম।”
ঠাস করে সোহার মুখের ওপর দরজা লাগিয়ে দেয়। শব্দে কেঁপে উঠেছে সোহা। বিড়বিড় করে বকা দিতে দিতে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়।
শ্রবণ রেডি হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। দরজার দিকে এগিয়ে যেতেই সোহা পিছু ডেকে বলে,
“কোথায় যাচ্ছ? খাবে না?”
শ্রবণ ঘাড় ঘুরিয়ে সোহার দিকে তাকায়। শান্ত স্বরে বলে,
“বাইরে খাব।”
“আমি যে রান্না করলাম।”
“নিজে গিলে শেষ কর।”
“সন্ধ্যা হয়ে আসছে।”
“তো আমার কী? আমি কী সূর্যকে ধরে বসে থাকবো যেন অস্ত না যায়?”
“সন্ধ্যার পর একা একা ভয় লাগে আমার।”
“ভয় তো আমার হয়, এই ফ্ল্যাটের জ্বীন ভূত গুলোর জন্য। তোর মতো এক ডাইনির সঙ্গে একই ফ্ল্যাটে ওরা কীভাবে থাকবে? বলা তো যায় না, যদি ধরে খেয়ে ফেলিস।”
শ্রবণের কথা শুনে সোহার ভয় আরও বেড়ে গেছে। মুখের রঙ ফ্যাকাশে। অনুরোধের সুরে বলে,
“প্লীজ, তুমি এখন বাইরে যেও না।”
কে শোনে কার কথা। সোহার আর কোনো কথা না শুনে ধুপধাপ পা ফেলে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে যায়। পেছন থেকে সোহা কয়েকবার ডাকে তবে শ্রবণ কানে নেয় না।
ভয়ে সোহার গলা এখনই শুকিয়ে যাচ্ছে। খিদের চোটে পেটে গুড়গুড় করছে।
নিজে থাকবি না ভালো কথা, ভয় দেখিয়ে কেন চলে যাবি? বেচারি সোহা।
চলবে………..
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ৫
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৫
-
দিশেহারা পর্ব ২
-
দিশেহারা পর্ব ৩৮
-
দিশেহারা পর্ব ২৫
-
দিশেহারা পর্ব ২৩
-
দিশেহারা পর্ব ৩৬
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৪
-
দিশেহারা পর্ব ৩০
-
দিশেহারা পর্ব ৪৩