বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ২১
২১
বাবরি চুলওয়ালা বাসায় আসার পর একবারও নিচে নামিনি। অদ্ভুত এক লজ্জা আমাকে ঘরের কোণায় আটকে রেখেছে। একই ছাদের নিচে থেকেও তাকে দেখতে যাওয়ার সাহস হয়নি।
আমার চিরকুটটা পেয়েছে কিনা বোঝার উপায় নেই। জিজ্ঞেস করতেও লজ্জা লাগছে আমার। অস্থির হয়ে নিজের ঘরে পায়চারি করছি অথচ একবার তার কাছে যাওয়ার দুঃসাহস অর্জন করতে পারছি না!
এক ফাঁকে মায়ের রুমে এলাম। বাবা বাসায় নেই। ইনিয়ে বিনিয়ে বললাম, ‘আমি ওনাকে একটু দেখতে যাই আম্মু?’
মা ঘাড় বাঁকিয়ে আড়চোখে আমাকে দেখে বললেন, ‘যাবি যা। আমাকে জিজ্ঞেস করার কি আছে?’
‘তোমরা আবার কি ভাবো…’
‘কি আবার ভাব্বো? সকালে বাবাকে নিজের মুখে বললি মা আর আমি মিলে ওনার সেবাযত্ন করবো। এখন আবার দেখা করতে যাওয়ার জন্য পারমিশন লাগে? ঢং যতসব..’
আমি লজ্জামিশ্রিত কণ্ঠে বললাম, ‘না বলে গেলে তো আবার ভাব্বে সারাক্ষণ ওনার রুমে গিয়ে বসে থাকি..’
‘থাকলেই বা আমার কি। আমি নিষেধ করলে তো ঠিকই লুকিয়ে লুকিয়ে যাবি। শুক্রবারের পরে তো মনে হয় ঘর থেকে ডেকেও বের করা যাবে না।’
‘এখন কি নিষেধ করতে চাও?’
‘না। নিষেধ করার কি আছে? যা।’
আমি মাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, লজ্জা লাগছে গো আম্মু। কথাটা শুনে মা কেমন অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। আমি স্মিত হেসে চলে এলাম সেখান থেকে।
ধীরপায়ে নিচে নামলাম। আজ সকালেই যে রুমটা সাজিয়েছি নিজের হাতে, এখন সেই রুমটাতে ঢুকতেই গা কাঁপছে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছোট ছোট শব্দে ঠকঠক করলাম।
সে বললো, ‘আসো মীরা।’
আমি দরজা ঠেলে উঁকি দিয়ে জানতে চাইলাম, ‘আপনি কিভাবে জানলেন মীরা এসেছে?’
‘এত আদর করে কেইবা আমার দরজায় কড়া নাড়বে?’
আমি বোধহয় লজ্জা পেলাম। অন্যদিকে মুখ করে হেসে ফেলি আমি। তারপর গুটি গুটি পায়ে তার রুমের জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।
সে বললো, ‘ওখানে কেন? কাছে আসো।’
আমার গা শিরশির করে উঠলো। মাথা নেড়ে বললাম, ‘উহু।’
সে ভ্রু কুঁচকে বললো, ‘আমাকে দেখতে আসবে না?’
‘হুম।’
‘অত দূরে দাঁড়িয়ে দেখা যায়? আসো, আমার পাশে এসে বসো।’
‘সেটা আমি পারবো না।’
‘আচ্ছা বসতে হবে না। এক হাত দূরে দাঁড়াও।’
‘আমি এখান থেকেই দেখতে পাচ্ছি। আমার অসুবিধা নেই।’
‘অত দূরে দাঁড়ালে জোরে জোরে কথা বলতে হবে। আরেকটু কাছাকাছি আসলে নীচু গলায় কথা বলতে পারতাম।’
আমি লজ্জা পেয়ে হাসলাম। সামান্য কয়েক পা এগিয়ে এসে দাঁড়ালাম তার বিছানার পাশেই। সে মাথা ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালো। চোখ দুটো বড়বড় আকার ধারণ করে আমাকে দেখছে। জানিনা তার ভাবনায় কি! লজ্জায় মাথা নিচু করে আছি আমি।
‘খালি হাতে দেখতে এসেছো?’
‘হু। ফলমূল আনা দরকার ছিলো নাকি?’
‘তা বলিনি। মনের ঘরের চাবি এনেছো?’
আমি ফিক করে হেসে ফেললাম, ‘মনের ঘরে তালা দেয়া নেই। চাবি ছাড়াই ঢোকা যাবে।’
‘তালা খুলে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ।’
খানিকক্ষণ থেমে আবারও বললো, ‘একটা কথা ভেবে হাসি পাচ্ছে জানো?’
‘কি!’
‘সবসময় ছেলেরা বিয়ে করার সময় মেয়ের বাসায় গিয়ে মেয়েকে নিয়ে আসে। অথচ আমাকে দেখো। বিয়ের আগেই মেয়ের বাসায় এসে বসে আছি। বিয়ে করেও মেয়ের বাসায় থেকে যাবো। কী লজ্জার ব্যাপার।’
‘ভালোই তো হলো।’
‘কেন?’
‘এখন একসঙ্গে বিয়েবাড়ি সাজাতে পারবো।’
বলেই আমি হাসলাম। সেও হাসিমুখে বললো, ‘বিয়েবাড়ি সাজাতে আমার হাত লাগাতে হবেনা মনে হচ্ছে। তুমি একাই যথেষ্ট। ঘরটা কী সুন্দর সাজিয়েছো!’
‘এই ঘরটাই বিয়েবাড়ি। এর বাইরে আর কোনো সাজসজ্জা হবেনা।’
‘সেই ভালো। এর বেশী সাজসজ্জা আপাতত আমার সামর্থ্যে কুলাবে না। যেদিন সামর্থ্য হবে, শুধু বাড়ি না। পুরো এলাকা মরিচ বাতি দিয়ে সাজিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠান করবো ইনশাআল্লাহ।’
আমি আরও কয়েক পা এগিয়ে এসে দাঁড়ালাম। তার ব্যান্ডেজ দেখে মনটা আনচান করছে আমার। ইচ্ছে করছে একটু ছুঁয়ে দেখি। কিন্তু সাহস হচ্ছে না। কেন হচ্ছেনা, জানিনা! কীসে যেন আটকে রেখেছে আমাকে। বলছে, না না মীরা তাকে ছোঁয়া যাবে না!
খানিকটা সময় নীরবে কেটে গেলো। আমি পায়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এখন কি পায়ের অবস্থা একটু ভালো?’
‘আসার সময় নিজের চেষ্টায় হাঁটতে পারিনি। তিন চারজন মিলে ধরাধরি করে গাড়িতে তুলেছে, আবার গাড়ি থেকে ধরাধরি করে খাটে শুইয়েছে। আমি পা ফেলার শক্তি পাচ্ছিনা। তনয়ের টার্গেট মিস হয়নি। বলেছিলো শুক্রবারে বিয়ে করাচ্ছি। এখন নুলা বরকে কে মেয়ে দেবে?’
আমি ভড়কে গিয়ে বললাম, ‘আমার তো অসুবিধা নেই। এই অজুহাতে বিয়ে পেছানোর দরকার নেই। শুক্রবারেই বিয়ে হবে।’
সে আমার দিকে খানিকটা ঝুঁকে এসে মৃদু স্বরে বললো, ‘বিয়ের জন্য বুঝি তর সইছে না?’
‘না সইছে না। আজকে যদি আমাদের বিয়ে হয়ে যেতো, আমি ঠিকই সারা রাত হাসপাতালে আপনার পাশে থাকতে পারতাম। এখন যদি আপনার সেবাযত্ন করি, কত জনে কত কথা বলবে। অথচ শুধু বিয়েটা হয়ে গেলেই কেউ আর কিচ্ছু বলবে না। তখন বরং আমার ওপর আরও দায়িত্ব চেপে দেবে। যাও মীরা, দিনরাত এক করে স্বামীর সেবা করে স্বামীকে সুস্থ করে তোলো।’
সে ফিক করে হেসে বললো, ‘স্বামী? আমিও স্বামী হবো! যাহ, লজ্জা লাগছে।’
‘লজ্জা আমারও লাগছে। আপাতত কিছু করার নেই। অত লজ্জা পেলে আর সুস্থ হওয়া লাগবে না।’
কথা বলতে বলতে আমি তার পায়ের ওপর থেকে কাথা সরালাম। তার পরনে বাবার লুঙ্গী। আমি অনেক কষ্টে হাসি চেপে রাখলাম। এর আগে কোনোদিন তাকে লুঙ্গী পরিহিত অবস্থায় দেখিনি।
ঝটপট প্রশ্ন করে বসলাম, ‘পায়ের অবস্থাটা কি একটু দেখতে পারি?’
‘দেখতে চাইলে দেখো।’
সে খানিকটা লুঙ্গী সরিয়ে জায়গাটা দেখালো আমাকে। রক্ত জমাট বেঁধে আছে। রক্তিম দাগে ছেয়ে গেছে তার ফর্সা পা’খানি। দেখে মনটা কেমন করে উঠলো।
বললাম, ‘ডাক্তার বলেনি কতদিন লাগবে ঠিক হতে?’
‘পনেরো বিশ দিন ব্যথা থাকবে বলেছে।’
‘তাহলে হাঁটতে পারবেন কবে থেকে?’
‘আর দু একদিন পরেই পারবো আশা করি।’
‘আপনিও তনয়কে কয়েকটা বসিয়ে দিতে পারলেন না?’
‘হা হা হা, আমাকে দেখে কি তোমার মনে হয় আমি মানুষের সঙ্গে মারামারি করতে পারি?’
আমি ঠোঁট উলটে বললাম, ‘নাহ। তা মনে হয় না। আপনি নিতান্তই ভদ্র ঘরের সন্তান। খেয়েছেন কিছু?’
‘হুম।’
‘তনয় যখন মারলো, আপনি চুপচাপ মার খেয়ে গেলেন?’
‘থামানোর চেষ্টা করেছি।’
‘দৌড়ে পালাননি কেন?’
সে আমার কথা হেসে ফেললো। উত্তর দিলো না। হয়তো এর উত্তর নেই। কাছের বন্ধু যখন মারে, তখন দৌড়ে পালানোর জায়গা থাকে না।
বললাম, ‘হাত দিয়ে না ছুঁয়ে কি কোনো সেবা করতে পারি?’
‘অবশ্যই পারো।’
‘কিভাবে!’
‘সঙ্গ দিয়ে। তোমার কথার চেয়ে বড় মেডিসিন আর আছে?’
আমি লজ্জা পেয়ে মুচকি হাসলাম। তার গায়ের ওপর কাথা টেনে দিয়ে আরেকটু কাছে এসে দাঁড়ালাম। ভ্রু ওপরে তুলে হাত ও কাঁধের অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করছি।
সে বললো, ‘খুলে দেখাবো?’
‘না থাক। এমনিই দেখি।’
‘লজ্জা পেলে আমি পাবো। তুমি কেন পাচ্ছো?’
‘মেয়েদের বেলায় দেখতেও লজ্জা থাকে।’
‘মীরার ভালোই উন্নতি হয়েছে দেখছি। প্রথমদিন তোমার কথা শুনে ভেবেছিলাম এই পাগল মেয়ের পাল্লায় কোন জামাই যে জোটে! তার কপালে না জানি কী আছে…’
আমি হতভম্ব হয়ে তার হাতে একটা মাইর বসিয়ে দিতেই সে ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলো। ইস! ভুলেই গিয়েছিলাম তার হাতের এই জায়গাটায় ব্যথা। পরক্ষণেই জায়গাটায় হাত বুলাতে বুলাতে বললাম, ‘সরি। এখানে ব্যথা আছে বুঝতে পারিনি।’
‘জামাইয়ের কপালে কি আছে উদাহরণ দিলা?’
‘হা হা হা।’
খানিকক্ষণ তার রুমে বসে থেকে রান্নাঘরে এসে চিকেন স্যুপ বানালাম। তার এই অসুস্থতার সময়েও আমার মনে আনন্দ। কেন যেন মনে হচ্ছে এই দূর্ঘটনা আমাদেরকে আরও কাছাকাছি আসার সুযোগ দিয়েছে।
স্যুপের বাটিটা তার বিছানায় রেখে বললাম, ‘খেতে পারবেন তো?’
‘তা পারবো। একজন মুমূর্ষু রোগী হিসেবে আমি কি মুখে তুলে খাইয়ে দেয়া ডিজার্ভ করি না?’
‘আপনি মুমূর্ষু রোগী?’
‘রোগী তো। না ছুঁয়েও তো খাইয়ে দেয়া যায়।’
মুখ বাঁকা করে স্যুপের বাটিটা হাতে নিলাম। এক চামচ তুলে ধরলাম তার মুখের সামনে। সে মুখ টিপে হেসেই কূল পায় না, খাবে কীভাবে! আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। আরেকটু দেরী করলেই বকা দেবো।
কয়েক চামচ স্যুপ খাইয়ে দেয়ার পর সে বললো, ‘একটা চামচের যে কপাল, তোমার সেই কপাল হলোনা।’
‘চামচের কপাল ভালো না, খারাপ। খাওয়াটা শেষ হোক। তারপর ওকে আমি ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলবো।’
‘বেচারার অপরাধ কি? আমাকে ছুঁয়েছে তাই?’
লজ্জায় অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে ফেললাম আমি। অসাবধানতা বশত একটুখানি গরম স্যুপ তার বুকের ওপর গিয়ে পড়লো। সে কোনো শব্দই করলো না। ঠোঁট উলটে বললো, ‘জামাইয়ের কপালে কি আছে তার দ্বিতীয় উদাহরণ।’
‘সরি সরি।’
আমি ছোটাছুটি করে টিস্যু নিয়ে এসে তার টিশার্টের ওপরে মুছতে লাগলাম। হঠাৎ মনে হলো সে আমার খুব কাছেই! পুরো শরীরে অদ্ভুত এক কম্পন বয়ে গেলো আমার। দ্রুত মুছে দিয়ে পিছিয়ে এলাম।
‘শেষ। আমি যাই, আপনি টিশার্ট চেঞ্জ করে ফেলুন। আর কষ্ট করে স্যুপটা খেয়ে নিবেন।’
কথাটা বলে এক সেকেন্ডও দাঁড়ালাম না। এমন ছুট দিলাম যে, এক দৌড়ে নিজের রুমে চলে আসলাম। উফফ, হার্টবিট যেন দৌড়াচ্ছে আমার! বড় বড় করে কয়েকটা শ্বাস নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করতে চেষ্টা করলাম আমি। এইটুকুতেই এমন হলে, বিয়ের পরে কি হার্টবিট লাফাতে লাফাতে ফেটে যাবে নাকি! আশ্চর্য..
সারাদিন আর একবারও নিচে যাইনি। সন্ধ্যার পর থেকে সে বারবার মেসেজ দিয়ে যাচ্ছে, ‘ও মীরা, একবার দেখা দাও।’
আমি মেসেজের রিপ্লাইতে একটা অদ্ভুত ইমুজি পাঠিয়ে রাখছি। রাত দশটা নাগাদ আরো একটা মেসেজ, ‘বড় সাধ জাগে, একবার তোমায় দেখি…’
আমি মুখ টিপে হাসলাম। যাবো না নিচে। দেখি সে কী করে! ওপরে উঠে আসতে তো আর পারবে না। মাঝেমাঝে মেসেজে দুয়েকটা কথা আদানপ্রদান হচ্ছে। খুব বেশী সময় দিচ্ছি না।
রাতে মা এসে বললেন বাবা নাকি আমাকে ডাকছেন। বাবা নিচতলায় বসার ঘরে। এসে বাবাকে সালাম জানিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কি অবস্থা?
‘মুনযিরের বাসা থেকে ওর ভাই ভাবী আসবে।’
‘কবে?’
‘পরশু। ওনারা এসে যদি দেখে ওনাদের ভাই এমন অসুস্থ, ব্যাপারটা খারাপ দেখাবে।’
‘হুম। বিয়ের ডেট পিছিয়ে দিতে চাও?’
বাবা আমার মুখের দিকে তাকালেন না। মাথা নিচু করে ভাবছেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘পেছালেই মনে হয় ভালো হবে। তাহলে ওনাদেরকে আরো কিছুদিন পরে আসতে বলতাম। মুনযির সুস্থ হোক।’
আমি বললাম, ‘তুমি যা ভালো মনে করো।’
‘তোর কি মতামত?’
‘আমার মতামত তো তোমার পছন্দ হবেনা আব্বু। শুনলে আমাকে পাগল মনে হবে।’
‘আরে না। বল। তোরই তো বিয়ে রে মা। তোর মতামতের একটা গুরুত্ব অবশ্যই আছে।’
‘আমার মতামত হলো, বিয়ের ডেট আরো এগিয়ে আনলে ভালো হতো। ছেলেটা একা একা রুমে পড়ে আছে। হাসপাতালে তো নার্স থাকে, এখানে আছেটা কে? এভাবে সুস্থ হতে অনেকদিন লাগবে। বিয়ে হয়ে গেলে আমি সেবাযত্ন করে ওনাকে দ্রুত সুস্থ করে ফেলতে পারতাম।’
বাবা এবারও আমার দিকে তাকালেন না। ভুল কিছু বলে ফেললাম কিনা বোঝার জন্য মায়ের দিকে তাকালাম। মা মুখ টিপে হাসছেন। এমনিতে মা সবসময় গম্ভীরমুখে থাকেন। তার হাসি দেখেই বুঝে গেলাম উত্তরটা ভুলভালই দিয়েছি। অগত্যা, এক আকাশ সম লজ্জা নিয়ে আমি ধপ করে সোফায় বসে রইলাম। দৌড়ে পালাতে গেলে আরো লজ্জার হয়ে যাবে ব্যাপারটা।
বাবা বললেন, ‘হুম। এটা ঠিক বলেছিস। শুক্রবার আসতে আর মাত্র দুইটা দিনই বাকি। এখন আর ডেট এগিয়ে এনে কখন দিবো? তাহলে তাই হোক। শুক্রবারেই হোক। তোমরা কাল গিয়ে কেনাকাটা করে নিয়ে আসো।’
আমি মনেমনে খুশি হয়ে গেলাম। বাবাকে বললাম, ‘আমার কথায় তুমি কি কষ্ট পেয়েছো?’
‘না। তোকে তো আমি চিনি। কষ্ট পাবো কেন? তোর কাছে এরকম উত্তরই আশা করেছিলাম।’
‘আমি তো এখন অনেক ভেবেচিন্তে কথা বলি। আগের মতো যা মুখে আসে বলে দেইনা।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, অনেক ভেবেচিন্তেই তো বলেছিস। বুঝতে পেরেছি আমি।’
বাবাকে খুব সিরিয়াস দেখাচ্ছে। আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। সেখান থেকে উঠে রুমে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালাম। আমি ওপরে উঠতেই বাবা মা উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন। এত জোরে হাসলেন যে হাসির শব্দ এখান থেকে শোনা গেলো। আমাকে নিয়ে হাসাহাসি হচ্ছে নাকি? হয়তোবা। হাসলে হাসুক। বিয়ে যখন ঠিক হয়েই গেছে, তখন এত লাজ শরমের কি দরকার!
রুমে এসে দেখি আরো একটা মেসেজ, ‘শেষবারের মতো বলছি। এবার দেখা না দিলে আমি কিন্তু স্টেপ নিবো।’
আমি মুচকি হেসে রিপ্লাই দিলাম, ‘নেন। দেখি কি স্টেপ নিতে পারেন?’
মিনিট খানেকের মাথায় বাবার গলা শুনতে পেলাম। বাবরি চুল কি বাবাকে কিছু বলেছে নাকি! দ্রুত নিচে চলে এলাম আমি।
যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই। বাবা বললেন, ‘মুনযিরের কি হয়েছে দেখ তো?’
‘ আশ্চর্য! তোমরা গিয়ে দেখো।’
বাবা মাথা নিচু করে আছেন। পা দোলাচ্ছেন, মুখে হাসি। আমি দ্রুতপদে বাবরি চুলওয়ালার রুমে এসে বললাম, ‘কি হয়েছে?’
‘দাঁড়িয়ে থাকো এখানে। তোমাকে দেখি।’
‘আব্বুকে কি বলেছেন?’
‘একটা জরুরি কথা ছিলো মীরার সঙ্গে। মীরা নিচে থাকলে আমার রুমে একটু পাঠাবেন।’
‘জরুরি কথা না ছাই। সব দেখা করার ফন্দি।’
বাবরি চুলওয়ালা তার ফোনের স্ক্রিনটা বের করে তুলে ধরলো। আমি এগিয়ে গিয়ে দেখলাম সেখানে তনয়ের একটা মেসেজ, ‘তুই কাজটা ঠিক করলি না বন্ধু। তুই এভাবে বিট্রে না করলে মীরাকে যেভাবেই হোক আমি বিয়ে করতাম। বিয়ে করতে না পারলেও আমার কষ্ট হইতো না। কিন্তু তুই মীরাকে বিয়ে করে আনন্দে থাকবি সেইটা তো আমি মানতে পারবো না বন্ধু। আমাকে তুই ভালোই চিনোস। বিয়ে ভেঙে দে নয়তো আমি ভাংবো। আমি যদি মীরাকে না পাই, তুইও পাবিনা।’
মেসেজটা দেখে আমার ভেতর তীব্র এক রাগের সঞ্চার হলো। বাবরি চুলওয়ালা বললো, ‘ওর কাছে আমি ভিলেন হয়ে গেছি মীরা। মনে হচ্ছে আমার পা ভেঙেও ওর শান্তি হয়নি। বিয়েতে একটা গ্যাঞ্জাম করবেই।’
‘আপনি আছেন বিয়ে নিয়ে! আমি ভাবছি কোনোদিন আপনার বড় কোনো ক্ষতি করে বসে কী না।’
আনমনে তার পাশে গিয়ে বসলাম আমি। তাকে অসম্ভব চিন্তিত দেখাচ্ছে। বললাম, ‘চলুন দুজনে একসঙ্গে ওর সাথে গিয়ে দেখা করি? আমি ওকে সব খুলে বলবো। তাহলে আশাকরি ও বুঝবে।’
‘কি খুলে বলবা?’
‘ওকে বলবো আমি কোনোদিন ওকে বিয়ে করতাম না। কারণ আমি শুধু আপনাকেই চাইতাম।’
অনেক্ষণ পর বাবরি চুলওয়ালা আমার চোখের দিকে তাকালো। কী যে অসম্ভব শান্ত সেই চোখ! আমার বড্ড মায়া লাগলো ওর জন্য। বললাম, ‘প্লিজ। আমাকে ওনার সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা করে দিন। আমি ওনাকে বুঝিয়ে বলি?’
‘না মীরা। তোমাকে দেখলে বা তোমার গলার স্বর শুনলেও ওর ভেতরে আগুন ধরে যাবে। তখন সবকিছু কন্ট্রোলে রাখা আরো কঠিন হবে আমার জন্য।’
‘তাহলে? যদি আপনার কোনো ক্ষতি করে ও?’
‘আমি ওকে চিনি। বড় ক্ষতি করবে না। আপাতত আক্রোশে ভুগছে। ও চায় আমি বিয়ে ভেঙে দেই। সে যদি মীরার না হয়, মুনযিরও হতে পারবে না। আপাতত এটুকু করলেই সে খুশি।’
আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি। কী বলবো জানা নেই। একদৃষ্টে চেয়ে থাকি তার দিকে।
সে আমার হাতের ওপর হাত রেখে বললো, ‘ভয় পেও না। মনে সাহস রাখো। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমাকে একটু হেল্প করো প্লিজ।’
‘কিভাবে?’
‘আমার মনে হচ্ছে এখানে থাকাটা আমাদের জন্য নিরাপদ না। যেকোনো সময় ও বিয়ে ভাঙার জন্য কিছু একটা করবে। আমাদের অন্য কোথাও চলে যাওয়া উচিত।’
‘দাদাবাড়িতে?’
সে খানিকক্ষণ চিন্তা করে বললো, ‘ওই বাড়ির ঠিকানাও ওর চেনা।’
‘তাতে লাভ হবেনা। ওখানে গিয়ে কোনো ঝামেলা করতে চাইলে বাড়ির লোকজন ওকেই মে* রে তক্তা বানিয়ে ফেলবে। আমি একবার আপনাকে বলেছিলাম না আমার বিয়ের অনুষ্ঠান দাদাবাড়িতে করবো?’
‘হুম।’
‘এটাই ফাইনাল। বাবাকে বলি?’
‘যদি টেনশন করেন উনি?’
‘কোনো সমস্যা নেই। ছেলেমেয়েরা সবসময় এই ভুলটাই করে। নিজেরা টেনশন করবে অথচ বাবা মাকে কিচ্ছু বলবে না। আমরা এই ভুলটা করবো না। আমাদের এখন মা বাবার হেল্প দরকার। ওনারা পাশে থাকলে তনয় আমাদের কিচ্ছু করতে পারবে না।’
সে আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বললো, ‘ঠিক বলেছো। থ্যাঙ্কিউ মীরা।’
আমি শুকনো মুখে হাসলাম। তারপর হাতের দিকে তাকাতেই সে আমার হাতটা ছেড়ে দিয়ে বললো, ‘আই উইশ বিয়েটা তারাতাড়ি হয়ে যাক। তোমার হাত ধরতে গেলে যেন চোখ রাঙানির ভয়টা পেতে না হয়।’
আমি আবারও শুকনো হাসি দিয়ে বললাম, ‘বিয়ে নিয়ে আমি এত স্বপ্ন দেখে ফেলেছি যে, এখন বিয়ের কথা ভাবলেও ভয় হয়। আমাদের বিয়েটা আদৌ হবে তো?’
বাবরি চুলওয়ালা অদ্ভুত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। তার চোখের দৃষ্টিতেও একই আশংকা। এত স্বপ্ন, এত আশা, এত প্রেম। শেষ অবধি কি আমরা এক হতে পারবো!
চলবে..
(রিভিশন দেয়া হয়নি। ভুল বানান চোখে পড়লে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ করছি।)
Share On:
TAGS: বাবরি চুলওয়ালা, মিশু মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ২৫
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ৪
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ৬
-
বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ১৬
-
বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ২০
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ১৫
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ৯
-
বাবরি চুলওয়ালা গল্পের লিংক
-
বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ২২
-
বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ১৭