প্রণয়ে_গুনগুন
পর্ব_৫
মুন্নিআক্তারপ্রিয়া
শীতের সকালে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকার চেয়ে আরাম আর কিছু হয় না। কিন্তু এই আরাম বেশিক্ষণ উপভোগ করার ভাগ্য গুনগুনের নেই। তার প্রেজেন্টেশন আছে। আপাতত আগে সে বান্ধবীর বাসায় যাবে। প্রিপারেশনের ব্যাপার আছে একটা। সে উঠে আগে ওয়াশরুমে গেল। ফ্রেশ হয়ে এসে দেখে কুলসুম ওর অপেক্ষায় বসে আছে। গুনগুনকে দেখেই একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল,
“তোমাকে ডাকতে এসে দেখি তুমি উঠে গেছ অলরেডি।”
গুনগুনও প্রত্যুত্তরে মৃদু হাসি দিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, প্রেজেন্টেশন আছে যে।”
কিছু মনে পড়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে কুলসুম বলল,
“ওহ ভালো কথা মনে করিয়েছ। এদিকে এসো।”
কুলসুম গিয়ে আলমারি খুলল। গুনগুনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আসো এদিকে।”
গুনগুনও এগিয়ে গেল। কুলসুম বলল,
“দেখো এখান থেকে কোন শাড়িটা পরবে। তুমি চাইলে থ্রি-পিসও পরতে পারো। এপাশের তিনটা থ্রি-পিস একদম নতুন। একবারও পরিনি। গতমাসে তোমার ভাইয়া এনে দিয়েছিল। তোমার যেটা ইচ্ছে হয় পরো।”
গুনগুন অবাক হয়ে কুলসুমের দিকে তাকিয়ে আছে। একটা মানুষ এত ভালো আর বিনয়ী হয় কী করে? গুনগুনকে সে চেনে না এখনো ঠিক পর্যন্ত। তবুও ওর জন্য এত কেন করছে মেয়েটা?
গুনগুনকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে কুলসুম বলল,
“আমাকে কী দেখো? আমাকে কি পরে যাবে নাকি?”
বলেই কুলসুম হাসল। গুনগুনও হেসে বলল,
“থ্যাঙ্কিউ আপু। আপনি অলরেডি আমার জন্য অনেক করেছেন। সারাজীবন আপনার উপকার আমি মনে রাখব। আর ড্রেস নিতে হবে না। আমার বান্ধবীর বাসায় যাব এখন। ওর একটা শাড়ি পরে নেব।”
কুলসুম বিমর্ষ হয়ে বলল,
“কী আশ্চর্য গুনগুন! তুমি এভাবে কেন বলছ? আমি কারো জন্য কিছু করলে মন থেকেই করি। তোমার জন্যও যা করছি মন থেকেই। প্রথম দেখেই তোমাকে আমার ভালো লেগেছিল। এমন না যে, প্রণয় তোমাকে নিয়ে এসেছে বলে এত কদর করছি। তোমার মতো আমার একটা ছোটো বোন ছিল। কিন্তু আল্লাহ্ ওকে এতই ভালোবাসতো যে নিজের কাছে নিয়ে গেছে। এজন্যই হয়তো না চাইতেও বোনের জায়গাটা তোমায় দিয়ে দিয়েছি।”
গুনগুন আবেগপ্রবণ নয় তেমন। তবে কুলসুমের টলমল চোখদুটি দেখে ওর ভীষণ মায়া লাগছে। সে কুলসুমের হাত ধরে বলল,
“কাঁদবেন না প্লিজ!”
“তুমিই তো কাঁদাচ্ছ। এখন কথা না বলে কোন শাড়িটা পরবে দেখো।”
গুনগুন হালকা আকাশি রঙের একটা শাড়ি নিল। কুলসুম শাড়ির সাথে একটা সাদা ব্লাউজ বের করে বলল,
“আগে নাস্তা করে নাও। পরে রেডি হও।”
গুনগুন ডাইনিং রুমে গিয়ে দেখল বিশাল আয়োজন। কুলসুম নিজে থেকেই বলল,
“আসলে সবসময় একা থাকি তো তেমন রান্নাবান্না করা হয় না। তোমার ভাইয়া যখন আসে তখন ওর পছন্দের সব খাবার রান্না করি। রান্না করা আমার প্রিয় শখ। তাই তুমি আছো বলো ছোটোখাটো একটু আয়োজন করলাম। প্রণয়কে কত করে বললাম, আমাদের সাথে এসে খেতে। রাজি হলো না। তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেন? বসো।”
গুনগুন চুপচাপ খেতে বসল। খাওয়ার সময়ই প্রণয় ও কুলসুমের বন্ধুত্বের গল্প জানল সে। কুলসুম নিজেই বলল,
“আমি এই এলাকায় যখন নতুন আসি তখন তোমার ভাইয়া সিলেটে। একা একাই সব মালপত্র নিয়ে এসেছিলাম। কেউ ছিল না সাথে। আসলে আমার কেউ নেই-ই যে আসবে। তখন প্রণয় ওর বন্ধুদের নিয়ে আমার পুরো বাড়ি গুছিয়ে দিয়েছিল। আরেকদিন এলাকার কিছু উটকো ছেলেপুলে খুব বাজে বাজে কথা বলছিল আমাকে শুনিয়ে। তখন ও ইচ্ছেমতো মে’রেছিল ওদের। আমার সে কি কান্না তখন! আসলে এরকম আজেবাজে কথা আমি শুনতে পারি না। তোমার ভাইয়াকে জানালাম তখন প্রণয়ের কথা। ও ফোনে কথা বলল। বাড়িতে এসে দেখা করল। তখন থেকেই আমাদের বন্ধুত্ব। মাসুদের সাথেও ভালো বন্ধুত্ব আমার। যদিও মাসুদ তোমার চোখে ভালো নয় জানি। ও একটু বেশি ফাজিল আরকি।”
গুনগুন জিজ্ঞেস করল,
“আর প্রণয়?”
“ও তো আরো বেশি ভালো। তুমি আস্তে আস্তেই বুঝতে পারবে।”
গুনগুন কিছু বলল না। নাস্তা করে রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়ল। সাথে সাথে কুলসুমও এলো বাইরে। বাড়ির বাইরে বেরিয়ে দেখে প্রণয় বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখন আবার বাইক দিয়ে পৌঁছে দেওয়ার বাহানায় আছে নাকি? কিন্তু ওর ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করে প্রণয় বলল,
“ওভাবে চোখমুখ কুঁচকানোর দরকার নাই। তোমারে আমি দিয়ে আসব না।”
এরপর একটা রিকশায় উঠিয়ে ভাড়া দিয়ে বলল,
“যাও ওঠো।”
গুনগুন রিকশায় উঠে বলল,
“আপনার ল্যাপটপ কুলসুম আপুর কাছে।”
“আচ্ছা।”
মাসুদ এতক্ষণ টং দোকানে বসে দেখছিল। গুনগুন চলে যাওয়ার পর এগিয়ে এলো ও। চোখে-মুখে বিস্ময়ের অভাব নেই। বিস্মিত কণ্ঠেই বলল,
“আরিব্বাস! কী চলতাছে তগো মধ্যে?”
কুলসুম হেসে হেসে বলল,
“তোর বন্ধু তো প্রেমে পড়ছে।”
মাসুদ মুখে হাত দিয়ে বলল,
“কী! কী বললি তুই? এই কী বললি তুই?”
“এটা মারুফের ডায়ালগ না? এখনো আগের বাংলা মুভি দেখিস?”
“আর দেখব না। এখন থেকে প্রণয়ের মুভি দেখব।”
প্রণয় বলল,
“আমি কোনো মুভি করি না।”
“তাই নাকি? আমি তো দেখলাম সব-ই। কী চলতাছে সত্যি করে বল? তুই প্রেম করস?”
“মাসুদ, তুই কি পাগল? ভালো হবি না? আমি কোন দুঃখে ওর সাথে প্রেম করতে যাব?”
“তাইলে তুই ওরে রিকশায় উঠিয়ে দিলি ক্যান? আর ভাড়া দিয়ে দিলি ক্যান?”
কুলসুম বলল,
“শুধু কি রিকশা ভাড়া? গতকাল রাতে আমার বাসায় নিয়ে এসেছে। প্রেজেন্টেশনের স্লাইড বানাবে বলে নিজের ল্যাপটপ দিয়ে গেছে। আরো কত কিছু!”
মাসুদকে দেখে মনে হচ্ছে বেচারা এখনই কেঁদে ফেলবে। প্রণয় ভেতরে ভেতরে এতকিছু করছে, অথচ সে কিছুই জানে না। তাও আবার কিনা তার শ’ত্রুর জন্য! ও কিছু বলার জন্য উদ্যত হতেই প্রণয় কুলসুমকে বলল,
“ভেতরে যা।”
কুলসুম কোনো প্রশ্ন না করেই বাড়ির ভেতরে চলে গেল। মাসুদ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রণয় বাইক থেকে নেমে একটু সামনে এগিয়ে গেল। ওসমান গণি আসছেন। অফিসে যাওয়ার জন্য বের হয়েছিল। প্রণয় গিয়ে সালাম দিল,
“আসসালামু আলাইকুম, আঙ্কেল।”
ওসমান গণি ভ্রু কুঁচকালেন। কিছুটা বিরক্তও তিনি। রুক্ষকণ্ঠে সালামের জবাব নিলেন,
“ওয়া আলাইকুমুস-সালাম।
একটু থেমে বললেন,
“এখন আবার কী হয়েছে?”
“কিছু হয়নি। কিন্তু আপনি কি কাজটা ঠিক করেছেন?”
“বুঝলাম না। কী করেছি?”
“গুনগুনকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন কেন?”
“সেই কৈফিয়ত তোমাকে দেবো কেন?”
“কৈফিয়ত নেওয়ার ইচ্ছে নেই। কিন্তু একজন সাধারণ অচেনা মানুষও তো এতটা নির্দয় হয় না। সেখানে আপনি এত রাতে নিজের মেয়েকে বাড়ি থেকে কীভাবে বের করে দিলেন আমি বুঝতে পারছি না। যাই হোক, এত গভীরে যেতে চাই না। গুনগুনের ভার্সিটিতে যাবেন আজ। ওর প্রেজেন্টেশন শেষ হলে ওকে বাড়িতে নিয়ে আসবেন। ওকে আমার কথা বলার প্রয়োজন নেই কোনো।”
ওসমান গণি অবাক না হয়ে আর পারছেন না। তিনি বললেন,
“অদ্ভুত ছেলে তো তুমি! গতকাল এসে ওকে নিয়ে থ্রে’ট দিয়ে গেলে। আজ আবার বলছ ওকে বাড়িতে নিয়ে আসতে। চাও কি তুমি?”
প্রণয় চলে যাচ্ছিল। প্রশ্ন শুনে দাঁড়িয়ে বলল,
“গুনগুনের ভালো চাই।”
মাসুদ প্রণয়কে দেখছে আর অবাক হচ্ছে। কিন্তু কোনো প্রশ্ন করার সাহস পাচ্ছে না। এই মুহূর্তে ওর রাগের মধ্যে কিছু জিজ্ঞেস করা মানে আ’গু’নে ঘি ঢালা। তাই নিরব থাকাটাই সকলের জন্য শ্রেয়।
প্রেজেন্টেশন যতটা খারাপ হবে ভেবেছিল গুনগুন, তারচেয়েও অধিক ভালো হয়েছে। এতটা আশা করেনি সে। তাই মন খারাপ কিছুটা হলেও কমেছে। কিন্তু এখন চিন্তা হচ্ছে যে কোথায় থাকবে, কোথায় যাবে। রাধিকা গুনগুনকে চিন্তিত দেখছে ভার্সিটিতে আসার পর থেকেই। কিন্তু তখন প্রেজেন্টেশনের প্রিপারেশন নিচ্ছিল বলে কিছু জিজ্ঞেস করেনি। ভার্সিটিতে গুনগুনের সবচেয়ে কাছের বন্ধু রাধিকা। ধর্ম আলাদা হলেও দুজনের আত্মার বন্ধন এক।
রাধিকা গুনগুনের কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করল,
“কীরে তোতাপাখি আজ এত চুপচাপ কেন? এমনি তো সারাক্ষণ কথা বলতেই থাকিস। আর সকালে ফোন দিয়েছি কতগুলো? ধরিসনি কেন?”
গুনগুন নিস্তেজ কণ্ঠে জবাব দিল,
“ফোন আমার কাছে নেই।”
“কী হয়েছে?”
“ফোন বাসায়।”
“ফোন বাসায় মানে? তুই কোথায় ছিলি?”
“এক আপুর বাসায় ছিলাম। আব্বু বাড়ি থেকে থেকে বের করে দিয়েছে আমাকে।”
“হোয়াট! বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে মানে কী? ফাইজলামি পেয়েছে নাকি! কী হয়েছে?”
গুনগুন সংক্ষেপে পুরো ঘটনা খুলে বলল রাধিকাকে। সব শুনে রাধিকা কী রিয়াকশন দেবে বুঝতে পারছে না। তবে প্রণয়কে ওর কাছে খুবই জটিল চরিত্র মনে হচ্ছে। গুনগুনকে এতটা চিন্তিত দেখে রাধিকা বলল,
“তুই এত চিন্তা করিস না তো। আমার বাসায় চল। আমার সাথে থাকবি।”
“কদিনই বা থাকব? এরপর কী করব আমি?”
“সেটা পরে ভাবা যাবে। আপাতত এত চিন্তা বাদ দিয়ে আমার বাসায় চল।”
গুনগুনের কাছেও আপাতত আর কোনো পথ খোলা নেই। মাথায় এত জট নিয়ে হুট করে কোনো সিদ্ধান্তও নেওয়া যাবে না। তাই সে রাধিকার বাড়িতেই কিছুদিন থাকবে বলে মনস্থির করল।
ক্যান্টিন থেকে দুজনে মিলে হালকা কিছু খেয়ে ভার্সিটি থেকে বের হলো। ওসমান গণি অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছিলেন। গুনগুনকে আসতে দেখে এগিয়ে এসে ডাকলেন,
“গুনগুন?”
গুনগুন পাশে তাকিয়ে অবাক হলো। কিছু বলল না। তিনি নিজেই বললেন,
“বাড়িতে চল।”
গুনগুন তাচ্ছিল্য করে বলল,
“কেন? তুমি তো আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছ।”
“মাথা ঠিক ছিল না তখন। রাগ করিস না। সরি, মা। বাড়িতে চল এখন।”
ওসমান গণির এরকম সহজ-সরল ও বিনয়ী আচরণ দেখে গুনগুন ও রাধিকা দুজনই বেশ অবাক হচ্ছে। শেষ কবে তিনি গুনগুনকে ‘মা’ বলে ডেকেছিলেন গুনগুনের মনে নেই। অন্তত সৎ মা আসার পর তো কখনোই নয়! আজ হঠাৎ তাহলে এই মানুষটার কী হলো?
গুনগুনকে নিরব থাকতে দেখে ওসমান গণি আরো বিনয়ী কণ্ঠে বললেন,
“আর ঝামেলা বাড়াস না, মা। বয়স হয়েছে কী বলি, কী করি নিজেও জানি না। আর কখনো এমন কিছু হবে না। রাগ করে না থেকে বাসায় চল।”
রাধিকাও তখন গুনগুনকে বলল,
“থাক, আর রাগ করে থাকিস না তাহলে। আঙ্কেল তো নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে।”
গুনগুন যেত না আর কখনো। কিন্তু ওসমান গণির এতটা বিনয়ী আচরণে সে ‘না’ও করতে পারেনি। রাধিকার থেকে বিদায় নিয়ে সে বাবার সাথে বাড়িতে গেল। ওদের রিকশা যাওয়ার পর প্রণয়ও বাইক স্টার্ট দিল। ওর সাথে মাসুদ আছে। এতক্ষণ দুজনে দূরে দাঁড়িয়ে ছিল, গুনগুনের আড়ালে।
মাসুদ কিছুটা বিরক্ত হয়ে প্রণয়কে বলল,
“ভাই, তুই কি সত্যি সত্যি প্রেমে পড়ছস ক তো?”
প্রণয় সময় না নিয়েই বলল,
“না।”
“তাইলে এই মাইয়্যার জন্য তুই এতকিছু করতাছোস ক্যান? ওর জন্য তুই ওর বাপের অফিসে গিয়া নিয়া আসলি। আমি তো কিছুই বুঝতাছি না।”
“ভাই, গুনগুনের প্রতি আমার কোনো অনুভূতি নাই। এইসব বা’ল’ছা’লে’র কথা বলিস না আমাকে। তুই ভালো করেই জানিস যে, আমি ব্রোকেন ফ্যামিলির ছেলে। বাপ-মায়ের আদর ঠিকমতো পাই নাই। পরিবার ছাড়া থাকি। আমি জানি, এই দুঃখ কতটা অসহনীয়। তাই আমি চাই না, আমার কারণে অন্য কেউও পরিবার ছাড়া হোক। তাই এসব করতেছি। আর কিছু না।”
মাসুদ কিছুটা নরম হলো। যতটুকু রাগ প্রণয়ের ওপর ছিল তা মিটে গেছে।
.
.
দুদিন হয়েছে গুনগুন বাড়ির বাইরে যায় না। প্রয়োজন নেই বলেই যায় না। দুদিন পর সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা তাই এখন আর ক্লাস নেই। বাড়িতে বসে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। শিহাব এসে বায়না ধরল,
“আপু, চলো ছাদে যাই?”
গুনগুন পড়ছিল। ভ্রু বাঁকিয়ে বলল,
“কী? ছাদে? না। এখন অনেক বাতাস। ঠান্ডা লেগে যাবে।”
“কিচ্ছু হবে না। সুয়েটার পরে নাও।”
“না, শিহাব।”
“প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ! তুমি না গেলে আম্মু আমাকেও যেতে দেবে না।”
“এইসময়ে ছাদে গিয়ে কী করবি তুই?”
“কিছু করব না। হাঁটব একটু। চলো?”
আদরের ভাইয়ের আবদার উপেক্ষা করতে পারল না গুনগুন। তাই গায়ে একটা পাতলা শাল জড়িয়ে শিহাবকে নিয়ে ছাদে গেল। ছাদের গেইট খোলা। শেলী চৌধুরী, শিশির এবং আরেকটি ছেলে বসা।
শেলী চৌধুরী গুনগুনকে দেখে হাসি দিয়ে বললেন,
“আরে গুনগুন, কেমন আছো?”
গুনগুনও মৃদু হেসে এগিয়ে গেল। বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ্ আন্টি। আপনি?”
“আলহামদুলিল্লাহ্, আল্লাহ্ ভালো রেখেছে। বসো।”
শিহাবকে নিয়ে গুনগুন বসল এক সাইডে। শেলী চৌধুরী ছেলেটাকে দেখিয়ে বললেন,
“ও আমার বড়ো ছেলে সমুদ্র।”
গুনগুন ও শিহাব একসাথে সালাম দিল,
“আসসালামু আলাইকুম, ভাইয়া।”
সমুদ্র সালামের জবাব নিল। শেলী চৌধুরী সমুদ্রকে বললেন,
“ও হচ্ছে গুনগুন। এটা ওর ছোটো ভাই শিহাব। তিনতলায় নতুন উঠেছে। আগামী মাস থেকে গুনগুন শিশিরকে প্রাইভেট পড়াবে।”
সমুদ্র মুচকি হেসে বলল,
“ওহ আচ্ছা।”
গুনগুন ইতিউতি করছিল ওঠার জন্য। কিন্তু কী বলে উঠবে বুঝতে পারছে না। হঠাৎ সে খেয়াল করল শিশির ও শিহাব চোখে চোখে কথা বলছে, মুচকি মুচকি হাসছে দুজনে। গুনগুনের কেমন যেন একটু খটকা লাগছে। সুবিধার লাগছে না বিষয়টা। বাই এনি চান্স কি, শিহাব শিশিরের জন্যই ছাদে আসার বায়না করছিল? গুনগুন বিষয়টা আন্দাজ করেই মনে মনে বলল, ওহ গড!
“এই আজও কি চা খাবে না?” বললেন শেলী চৌধুরী।
গুনগুন হেসে বলল,
“না, আন্টি।”
শেলী চৌধুরী হাসতে হাসতে ছেলেকে বললেন,
“জানিস না, গুনগুন চা খায় না। ওর নাকি চা খেলে রাতে ঘুম হয় না।”
সমুদ্রও হাসল। গুনগুনকে পড়াশোনার ব্যাপারে কিছু প্রশ্ন করল। কিছু সময় পর গুনগুন তাড়া দিয়ে বলল,
“আমরা তাহলে এখন উঠি? পড়া আছে আমার।”
শেলী চৌধুরী বললেন,
“ঠিক আছে। বাড়িতে এসো।”
“আচ্ছা।”
এরপর গুনগুন শিহাবের হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে বসা থেকে উঠাল। ফিরে যাওয়ার পথে কুলসুমের শাড়িটা দেখে মনে পড়ল, সেই যে ধুয়ে ছাদে দিয়ে গিয়েছিল! এরপর আর নিতেও মনে নেই, ফিরিয়ে দিতেও মনে নেই। সে শাড়িটা নিয়ে ছাদেই শিহাবকে নিয়ে ভাঁজ করে বলল,
“চল বাইরে যাব।”
শিহাব মন খারাপ করে বলল,
“কোথায় যাবে?”
“দরকার আছে। চল।”
“আরেকটু ছাদে থাকা যায় না?”
গুনগুন শিহাবের কান ধরে বলল,
“খুব ইঁচড়েপাকা হয়ে যাচ্ছিস কিন্তু! এখন তোর প্রেমে পড়ার বয়স না। বাচ্চা একটা ছেলে! মা জানতে পারলে মে’রে একদম ত’ক্তা বানিয়ে ফেলবে।”
শিহাব ভয়ে জবুথবু হয়ে গুনগুনের হাত ধরে বলল,
“আপু, আম্মুকে কিছু বইল না প্লিজ!”
“বলব না যদি এসব বাদ দিস। আর যদি আমার চোখে পড়ে তাহলে আব্বু-আম্মু দুজনকেই বলে দেবো।”
“ঠিক আছে। আমি বড়ো হলে কি শিশিরের সাথে আমার বিয়ে দিবা?”
“আগে বড়ো হ, তারপর ভেবে দেখব।”
গুনগুন কুলসুমের বাড়িতে গেল শাড়ি নিয়ে। সাথে শিহাব আছে। কলিংবেল বাজানোর পর কুলসুম দরজা খুলে দিল। গুনগুনকে দেখে একইসাথে সে অবাক এবং খুশি হয়েছে। উল্লাসিত কণ্ঠে বলল,
“গুনগুন! কেমন আছো তুমি?”
“ভালো আছি, আপু। আপনি?”
“আমিও ভালো আছি। ভেতরে আসো।”
গুনগুন ভেতরে গিয়ে দেখে প্রণয় ও মাসুদ ডাইনিংরুমে বসে বিরিয়ানি খাচ্ছে। কুলসুম শিহাবকে দেখিয়ে বলল,
“এটা কে?”
“আমার ভাই। আচ্ছা আপু, আজ তাহলে আসি? আপনার শাড়িটা দিতে এসেছিলাম।”
“আরে বসো। বিরিয়ানি খাও আগে। তোমার ফোন নাম্বার তো নেই, না হলে কল দিতাম আগেই। আজ নাম্বারটা দিয়ে যেও তো।”
“এখন আর কিছু খাব না, আপু। পেট ভরা আছে।”
শিহাব ফট করে বলল,
“আমি খাব, আপু।”
গুনগুন চোখ পাকিয়ে তাকাল। শিহাব ভয়ে কাচুমুচু হয়ে বলল,
“থাক খাব না।”
কুলসুম অবশ্য না খাইয়ে ছাড়ার মেয়ে নয়। বাধ্য হয়ে গুনগুনকে খেতে বসতে হলো। কিন্তু প্রণয়ের সাথে কোনো কথা বলছে না সে। যেন কেউই কাউকে চেনে না। মাসুদ বলল,
“ঝাঁঝের রানি কেমন আছো?”
গুনগুন গম্ভীরকণ্ঠে বলল,
“আমার নাম গুনগুন।”
“তোমার নাম রাখা উচিত ছিল ঝাঁঝঝাঁঝ।”
“বাজে কথা বলবেন না। থা’প্প’ড় দেবো।”
“এই তুমি মা’রা’মা’রি ছাড়া আর কিছু পারো না?”
প্রণয় মাসুদকে ধমক দিয়ে বলল,
“আজাইরা কথা না বলে চুপচাপ খা।”
কেউ আর কোনো কথা বলল না। কুলসুম খাবার নিয়ে এসেছে। খাওয়ার সময়ে কুলসুমের জন্যই টুকটাক কথা হলো সবার। এরপর প্রণয় আর মাসুদ আগে বের হলো। গুনগুনও কুলসুমের থেকে বিদায় নিয়ে বের হয়েছে। গুনগুনকে আসতে দেখে মাসুদ দ্রুত লিফ্ট বন্ধ করে দিচ্ছিল। প্রণয় ওর দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাতেই আর বন্ধ করল না। কুলসুম তখন ফ্ল্যাটের গেইট খুলে বের হয়ে বলল,
“এই মাসুদ, বিরিয়ানি তো নিয়ে গেলি না?”
মাসুদ তড়িঘড়ি করে লিফ্ট থেকে নামার সময় শিহাবের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। ধাক্কা খেয়ে শিহাবও মাসুদের সঙ্গে লিফ্টের বাইরে চলে যায়। বাটন প্রেস করার আগেই লিফ্ট বন্ধ হয়ে যায় তখন এবং নিচে নামতে শুরু করে। গুনগুন রাগে দাঁত কিড়মিড় করছিল। প্রণয় ভাবলেশহীনভাবে লিফ্টের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বলল,
“যেভাবে দাঁত কিড়মিড় করো সারাক্ষণ, ক্ষয় হয়ে যাবে তো। আর এত প্যানিকড করছ কেন? নিচে অপেক্ষা করবে। মাসুদ নিয়ে আসবে তোমার ভাইকে।”
গুনগুন এসব কথার ধারেকাছেও না গিয়ে বলল,
“থ্যাঙ্কিউ।”
প্রণয় থতমত খেয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী বললে?”
লিফ্ট গ্রাউন্ড ফ্লোরে চলে এসেছে। গুনগুন লিফ্ট থেকে নেমে বলল,
“সেদিন আমার হেল্প করার জন্য থ্যাঙ্কিউ।”
“থ্যাঙ্কিউ লাগবে না। শুধু বে’য়া’দ’বি কইরো না। তাহলেই হবে।”
গুনগুন পুনরায় তেলেবেগুনে জ্ব’লে উঠে বলল,
“আমি বে’য়া’দ’বি করি?”
“করো না?”
“না।”
“আচ্ছা।”
মাসুদও ততক্ষণে শিহাবকে নিয়ে নিচে চলে এসেছে। গুনগুন শিহাবের হাত ধরে বলল,
“আমার সাথে এরকম ভাব ধরে কথা বলবেন না। বিরক্ত লাগে!”
এরপর প্রণয়কে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার সময় প্রণয়ের ঘড়ির সাথে গুনগুনের চুল আটকে চায়। চুলে টান লাগায় বাধ্য হয়ে গুনগুন দাঁড়িয়ে পড়ে। প্রণয় হকচকিয়ে বলে,
“আমি কিন্তু কিছু করিনি!”
মাসুদ উৎসাহের সঙ্গে বলল,
“আরে লাইগ্যা গেছে! প্রেমের প্রথম ধাপ।”
এরপর গানের সুরে বলতে লাগল,
“বিধাতার যে হাতে লেখা,
কার সাথে কার হবে যে দেখা…”
চলবে…
[প্রচুর প্যারায় আছি পরীক্ষার জন্য। ঠিকমতো তাই গল্প দিতে পারছি না, দুঃখিত। আগামীকালও একটা ভাইভা আছে আমার। তারপরও এত বড়ো একটা পর্ব দিলাম। এবার খুশি হয়ে যান]
Share On:
TAGS: প্রণয়ে গুনগুন, মুন্নি আক্তার প্রিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৩
-
প্রণয়ে গুনগুন গল্পের লিংক
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৭
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২
-
তুমি অজান্তেই বেঁধেছ হৃদয় গল্পের লিংক
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৮
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৬
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৪