“সাদা শার্ট পরা, বোতাম খোলা যেই ছেলেটাকে দেখতে পাচ্ছ? ওর থেকে গুনে গুনে দশ হাত দূরে থাকবা। এলাকার এক নাম্বার গুণ্ডা।”
গুনগুন মাথা নাড়িয়ে বলল,
“আচ্ছা।”
“ওর আরো সাঙ্গপাঙ্গ আছে। ওরা আরো ব’দ, অ’সভ্যে’র দল। আকারে-ইঙ্গিতে কিছু বললেও কোনো উত্তর দিবা না। চুপচাপ চলে যাবা।”
গুনগুন এবারও মাথা নাড়িয়ে বলল,
“ঠিক আছে।”
“চা খাবা?”
“না, আমি চা খাই না।”
এতক্ষণ যে এত দিকনির্দেশনা দিচ্ছিল তার নাম শেলী চৌধুরী। তিন তলা বাড়ির মালকিন তিনি। স্বামী নেই। দুটো সন্তান নিয়ে তার জীবন। ছেলেটা চাকরিসূত্রে আলাদা দূরে থাকে। মেয়েটা ছোটো, ক্লাস ফাইভে পড়ে এবার। তারা থাকেন দুই তলায়। এক তলা এবং তিন তলা ভাড়া দেওয়া। গুনগুনরা তিনতলায় নতুন এসেছে দুদিন হয়েছে। নতুন বাড়ির ছাদটা ঘুরে দেখা হয়নি। সে আবার ছাদপ্রেমী। ছাদে সময় কাটাতে ভালো লাগে। সেই লোভেই এসেছিল ছাদে। তখনই শেলী চৌধুরীর সঙ্গে তার দেখা এবং আলাপ। গুনগুনকে ডেকে পাশে বসালেন। ছাদে বসার জন্য সিমেন্ট দিয়ে জায়গা বানানো হয়েছে। কিছুক্ষণ বসে আলাপ করে হাঁটছিল দুজনে।
গুনগুন চা খায় না শুনে ভীষণ অবাক হলেন শেলী চৌধুরী। ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“চা খায় না এমন মানুষও হয়?”
গুনগুন স্মিত হেসে জবাব দিল,
“আসলে চা খেলে রাতে আমার ঘুম হয় না।”
শেলী চৌধুরী বসে বললেন,
“এগুলো একদম ভুল কথা। মনের ভুল। বসো। এক কাপ চা খেলে কিছু হবে না।”
গুনগুন চুপচাপ বসল। শেলী চৌধুরী ফ্লাক্স থেকে দুই কাপে চা ঢালতে ঢালতে বললেন,
“যেই ছেলেটার কথা এতক্ষণ বলছিলাম ওর নাম প্রণয়। এমনি ভালো আবার খারাপ। বখাটে টাইপ।”
“ওহ।”
“নাও চা খাও।”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও চায়ের কাপ নিয়ে চুমুক দিল গুনগুন। শেলী চৌধুরী বললেন,
“তোমাকে দেখে মনে হলো তুমি অনেক নরম, শান্ত। একটু বোকাও হয়তো। তাই তোমাকে আগেই সাবধান করে দিলাম।”
গুনগুন ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,
“থ্যাঙ্কিউ আন্টি।”
“তুমি কী করো? পড়াশোনা?”
“জি আন্টি। এবার অনার্স ফাইনাল ইয়ারে আছি।”
“কী বলছো! অনার্স ফাইনাল ইয়ার? তোমাকে দেখলে তো মনে হয় বাচ্চা। আমি ভেবেছিলাম কলেজে পড়ো।”
প্রত্যুত্তরে মৃদু হাসল গুনগুন। আরো কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে নিচে নেমে গেল।
বাবা-মায়ের আদরের সন্তান গুনগুন নয়। সৎ মায়ের সংসারে আদুরে হয়ে থাকবে এটা গুনগুন আশাও করে না। তার ছোটো একটা ভাই আছে। সৎ ভাই। কিন্তু নিজের আপন ভাইয়ের থেকে কোনো অংশে কম ভালোবাসে না। তবে সুমনা বেগম এটা পছন্দ করেন না। তিনি গুনগুনকে সবসময় সৎ মেয়েই ভেবে এসেছেন।
সন্ধ্যায় গুনগুন পড়তে বসেছিল। সুমনা বেগম তখন এসে বললেন,
“ঘরে ডাল নেই। সামনের দোকান থেকে এক কেজি ডাল নিয়ে আয়। এই ধর টাকা।”
গুনগুন মাথায় ভালো করে কাপড় পেঁচিয়ে নিচে নামল। বাড়ির সামনেই মুদি দোকান। এরপাশেই চায়ের টং দোকান। বিকেলে এই দোকানেই সেই গুণ্ডা ছেলেটাকে দেখিয়েছিলেন শেলী আন্টি। আশেপাশে কোথাও না তাকিয়ে গুনগুন সোজা মুদি দোকানে গিয়ে দোকানদারকে বলল,
“আঙ্কেল, এক কেজি মসুর ডাল দেন।”
এরপর খেয়াল করল পাশের চায়ের দোকান থেকে অনেক হট্টগোলের শব্দ ভেসে আসছে। গুনগুন না চাইতেও একবার ফিরে তাকাল। প্রণয় ও ওর সাঙ্গপাঙ্গরা কী নিয়ে যেন খুব হাসাহাসি করছে। দোকানদারকে টাকা দিয়ে গুনগুন ডাল নিয়ে সোজা বাড়িতে চলে এলো। বারান্দায় গিয়ে দূর থেকে লক্ষ্য করতে লাগল প্রণয় ছেলেটাকে। কীরকম প্রাণবন্ত হাসি, প্রাণোচ্ছল চাহনি কিন্তু সে গুণ্ডা কেন? শেলী আন্টির কথা শুনে মনে হলো, তাকে কেউ খুব একটা পছন্দও বোধ হয় করে না।
“আপু? ভাত খাইয়ে দাও।”
শিহাবের ডাক শুনে গুনগুন ভেতরে চলে গেল। সৎ মা যতই শিহাবকে দূরে রাখার চেষ্টা করুক। পারে না। শিহাব খুব গুনগুনের নেউটা হয়েছে। শিহাবকে খাইয়ে দিয়ে গুনগুন নিজেও খেয়ে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছে। বাবার জন্য সে অপেক্ষা করে না। বলা ভালো, বাবার সঙ্গে তার সুসম্পর্কও নেই।
.
.
সকালে গুনগুনের ঘুম ভাঙল প্রচণ্ড শব্দে। প্রথমে ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল। পরক্ষণে নিজেকে ধাতস্থ করে বুঝতে পারল, বাইরে প্রচুর বৃষ্টি পড়ছে। বজ্রপাত হচ্ছে। মনে মনে কিছুটা বিরক্তও হলো সে। কারণ আজ তাকে ভার্সিটিতে যেতে হবে। প্রেজেন্টেশন আছে। তারওপর ড্রেসকোড রেখেছে শাড়ি। কী যে এক যন্ত্রণা!
একরাশ বিরক্তি নিয়ে গুনগুন ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করল, শাড়ি পরল, আর মনে মনে দোয়া করতে লাগল যেন বৃষ্টিটা কমে যায়। অদ্ভুত বিষয়, আল্লাহ্ সঙ্গে সঙ্গেই দোয়া কবুল করে নিয়েছেন। বৃষ্টি কমে গেছে। গুনগুন আর কাল-বিলম্ব না করে চটজলদি ছাতা নিয়ে বের হয়ে গেল। বাড়ির সামনে রাস্তা কিছুটা ভাঙা। কাদা জমে গেছে বৃষ্টিতে। গুনগুন খুব সতর্কতার সাথে পা টিপে টিপে হাঁটছিল। পাশেই সেই চায়ের টং দোকান। একদল ছেলের বেসুরো কণ্ঠ থেকে হঠাৎ-ই ভেসে এলো,
“চুমকি চলেছে একা পথে,
সঙ্গী হলে দোষ কী তাতে?
হার মেনেছে দিনের আলো,
রাগলে লাগে তোমায় আরো ভালো।”
গুনগুন বুঝতে পারছে যে গানটা ওর উদ্দেশেই গাওয়া হয়েছে। সে চুপচাপ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। মনেপ্রাণে চেষ্টা করছিল শেলী আন্টির কথা শোনার। এর মধ্যে একজন বলে বসল,
“হাঁটতে কি কষ্ট হচ্ছে? কোলে নিয়ে পার করে দেবো?”
গুনগুন দাঁড়িয়ে পড়ল। দাঁত কিড়মিড় করছে তার। সে সোজা চলে গেল টং দোকানে। শেলী আন্টি তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন।
“কে আমাকে কোলে নিয়ে পার করে দিতে চাইল?”
প্রশ্ন করল গুনগুন। সেই সাথে পুরো দোকানে একবার চোখও বুলাল। প্রণয় ছেলেটা নেই। একজন হাত তুলে ভাব নিয়ে বলল,
“আমি বলছি। তো কী হইছে?”
“কিছু হয়নি। আমার হাঁটতে তো কষ্ট হচ্ছে না। কিন্তু হাতটা ভীষণ ব্যথা করছে।”
কথা শেষ করেই ছেলেটার গালে চ’ড় বসাল গুনগুন। পুরো দোকান স্তব্ধ। শেলী আন্টি নিজেও অবাকের চূড়ান্ত পর্যায়ে আছেন। এই মেয়েকে কিনা তিনি ভেবেছিলেন বোকাসোকা! তবে যা-ই হোক গায়ে হাত তুলতে গেল কেন মেয়েটা? অন্য পথে প্রণয়কে আসতে দেখে তিনি দ্রুত বাড়ি থেকে বের হতে লাগলেন।
প্রণয় ততক্ষণে গুনগুনের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। ছেলেগুলো ক্ষেপে গুনগুনের কাছে আগাতে গেলে প্রণয় হাতের ইশারায় নিষেধ করে।
গুনগুন ছেলেগুলোকে শাসিয়ে বলল,
“আর যদি কখনো ইভটিজিং করতে দেখি, তাহলে ডিরেক্ট পুলিশে কল করব। মনে থাকে যেন।”
“পুলিশ কেন? তোমার বাপও আইসা কিছু করতে পারবে না।”
গুনগুন পেছনে ফিরে তাকাল। প্রণয় প্যান্টের পকেটে এক হাত পুরে দাঁড়িয়ে আছে। কথাটি সে-ই বলেছে। শেলী আন্টি গতকাল কী কী বলেছেন মুহূর্তেই গুনগুন সব ভুলে গেল। হতে পারে সে তার বাবাকে পছন্দ করে না। কিন্তু তাই বলে বাবা-মা তুলে গা’লি দিলে সে মাথা ঠান্ডা রাখতে পারে না মোটেও। গুনগুন মেজাজ দেখিয়ে বলল,
“বাপ তুলে কথা বলবেন না।”
প্রণয়ের অন্য হাতে জ্ব’লন্ত সিগারেট ছিল। সে সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়াগুলো গুনগুনের মুখের ওপর ছেড়ে বলল,
“তোমার ভাগ্য ভালো মুখে বলেছি। কাজে কিছু করে দেখাইনি এখনো।”
গুনগুন কাশতে লাগল। কিন্তু থেমে থাকার বা চুপ থাকার মতো মেয়ে সে নয়। সে তার তেজি কণ্ঠে বলল,
“কী করবেন আপনি?”
“কিছু করতে চাচ্ছি না। কিন্তু আমাকে বাধ্য কোরো না। ফলাফলও ভালো হবে না। আগে কখনো এলাকায় দেখিনি। নতুন? তাই হয়তো জানো না কিছু।”
গুনগুন ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল,
“জানি। সব-ই জানি। আপনি, আপনারা সবাই যে খারাপ ছেলে খুব ভালো করেই জানি।”
“বাহ্। তাহলে তো সবই জানো। এরপরও এত সাহস দেখাচ্ছ?”
“সাহস দেখাতে কলিজা লাগে। চেনা-জানা লাগে না।”
“সেই কলিজা যদি আমি টেনে বের করে ফেলি?”
“তাহলে আপনার প্রাণও আমি শেষ করব আমি।”
এর মধ্যেই দোকানে বেশ মানুষজন জড়ো হয়ে গেছে। কেউ কখনো প্রণয়ের সাথে এভাবে কথা বলার সাহস দেখায়নি। আর এই মেয়েটা নতুন এসেই কীরকম চটপটে কথা বলছে। কেউ কেউ অবশ্য মনে মনে খুশিও হচ্ছে। তবে সবাই অবাক না হয়ে পারছে না। আবার মায়াও লাগছে। শুধু শুধু নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনার কোনো মানে হয় না।
শেলী আন্টি ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন। গুনগুনকে ধরে বললেন,
“এই তুমি এখানে কী করছো? ক্লাস নাই তোমার? যাও ভার্সিটিতে যাও।”
এরপর হাত ধরে টেনে নিজেই নিয়ে যেতে লাগলেন। পেছন থেকে প্রণয় বলল,
“আপনার পরিচিত নাকি আন্টি? সাবধান করে দিয়েন।”
গুনগুন রুক্ষকণ্ঠে বলল,
“হবো না সাবধান। কী করবেন? মেয়েদের ই’ভ’টি’জিং করে আবার বড়াই করা হচ্ছে? এরপর যদি আবার ওকালতি করতে আসেন, তাহলে পরের থা’প্প’ড়টা আপনার গালে পড়বে।”
প্রণয়ের মাথায় এবার র’ক্ত উঠে গেছে। এতক্ষণ সে অনেকটা রয়েসয়েই কথা বলছিল। তবে এতগুলো মানুষের সামনে এত বড়ো অপমান তার বরদাস্ত হয়নি একদম। সে গুনগুনের সামনে গিয়ে পথরোধ করে দাঁড়াল।
চলবে..
প্রণয়ে_গুনগুন
সূচনা_পর্ব
মুন্নিআক্তারপ্রিয়া
[সবার রেসপন্স চাইইইইইইই।🫶]
Share On:
TAGS: প্রণয়ে গুনগুন, মুন্নি আক্তার প্রিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৬
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৭
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৮
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৪
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৩
-
প্রণয়ে গুনগুন গল্পের লিংক
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৫
-
তুমি অজান্তেই বেঁধেছ হৃদয় গল্পের লিংক