কাজরী-৬
শিরিন দুদিন ধরে খুব ঠান্ডা রইলেন। ঘর থেকে বেরোলেন না একবারও। কাজরী এসেছিলো কথা বলতে তিনি রেসপন্স করেন নি। একমাত্র নিশান আর এশনার সঙ্গেই কথা বলেছেন। তার বোন আইরিনের সঙ্গেও কথা বলেন নি।
এদিকে আইরিন কাজরীকে রীতিমতো কানপড়া দিচ্ছে সকাল বিকাল। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বুঝাতে চাইলেন যে শিরিনের সঙ্গে ওরকম ব্যবহার করে কাজরী খুব বড় ভুল করেছে। ওর উচিত পা ধরে মাফ চাওয়া। এই বাড়িতে শিরিন যা চায় তাই হয়। শিরিনের এক হুকুমে বাড়ির পুরোনো কর্মচারীদেরও পাল্টানো হয়েছে।
কাজরী এই কথার পিঠে বলল,
“কিন্তু আমি তো কর্মচারী না, তাই না?”
আইরিন বিরক্ত গলায় বলল,
“আরেহ তোমাকে কে কর্মচারী বলেছে? তুমি সব কথার উল্টা মানে ধরো কেন?”
কাজরী বুঝতে পারলো যে এই মহিলা আসলে তার বোনের পক্ষের লোক। সেই কারণে কাজরীর সোজা কথাও তার কাছে উল্টা মনে হচ্ছে। কাজরী নিজেও অবশ্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে শিরিন কে সরি বলবে। পা ধরা পর্যন্ত ব্যাপার টা একটু বেশী বাড়াবাড়ি।
শিরিন অবশ্য ঠান্ডা অন্য কারণে। ইশান তার সঙ্গে চোখ রাঙিয়ে কথা বলেছে। ব্যাপার টা হজম করার মতো নয়। ইশানের তাকে নিয়ে অভিযোগ আছে। দুই ভাইয়ের মধ্যে নিশান কে অত্যধিক স্নেহ করার কারণ হিসেবে ইশানের আক্ষেপ কে তিনি হালকা হিসেবে নিয়েছেন সবসময়। কিন্তু কখনো বুঝতে পারেন নি যে ছেলের হেটলিস্টে এভাবে আছেন। এই ব্যাপার টা তিনি মানতে পারছেন না। আর কাজরী! দুই দিনের মেয়ে তার চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করার যে স্পর্ধা দেখিয়েছে সেটা রীতিমতো বিস্ময়কর। ইন্দন কে জুগিয়েছে সেটা তার অজানা নয়। এই মেয়ে তাকে চিনেনা, তবে চিনবে এবার। ভালো করে চিনবে।
কাজরী একরকম বিরক্তিকর সময় পাড় করছে। বাড়ির সদস্যরা ও’কে এড়িয়ে চলছে। আইরিন খালামনি যা একটু কথাবার্তা বলছে তাছাড়া বাকীরা স্পষ্ট এড়িয়ে যাচ্ছে। এশনা প্রথম থেকেই ওর সঙ্গে ভালো আচরণ করেছিল। আজ সকালে কথা বলতে গিয়ে টের পেল যে ওর কথাবার্তায় দম নেই। যা জিজ্ঞেস করা হচ্ছে সেটার ই উত্তর দিচ্ছে। ব্যাপার টা বোধহয় স্বাভাবিক। মেয়ে অবশ্যই তার মায়ের হয়ে কথা বলবে। সার্ভেন্ট দের সঙ্গে কথাবার্তা এগোয় না। ইশান দুদিন হলো নেই। বন্ধুদের সঙ্গে আফটার ম্যারেজ সেলিব্রেশনে গেছে। শবনমের কাছে খবর পেল ইশান শিলং গেছে। বন্ধুদের দলবল নিয়ে গেছে। কাজরীর সময় কাটছিল না বলে মন্যুজান খাতুনের ঘরে গেল। উনিও দুদিন ধরে চুপচাপ। বউশাশুড়ির ঝগড়াঝাটি নাকি অনেক দূর গড়িয়েছে।
মন্যুজান খাতুন কে দেখে মনে হলো কাজরীর এখানে আসায় খুশি হন নি। সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন,
“কিছু বলবা?”
“না। এমনিই দেখতে এলাম আপনাকে। “
উনি সুপুরি কাটছেন দক্ষ হাতে। কাজরী বলল,
“আমি হেল্প করব?”
“না।”
না শব্দটা উচ্চারণ করলেন গম্ভীর গলায়। কাজরী চুপচাপ বসে রইলো। মন্যুজান খাতুন বললেন,
“আমার স্বর্নকাতান ফেরত দিয়ে যাইয়ো। “
“আর গয়নাগুলো?”
বৃদ্ধা মহিলা একবার কাজরীকে দেখলেন। তারপর বললেন,
“গয়না একবার যার গায়ে উঠে তার হয়ে যায়। ওগুলো দেয়া লাগবে না। “
“শাড়িও তো গায়ে উঠেছে দাদী। তাহলে শাড়িটা আমার না?”
“না। ওই শাড়ি একজনের স্মৃতি। “
“কে সে? ইশানের কে হয়?”
দাদী হঠাৎ কাজরীর দিকে জ্বলন্ত চোখে তাকালো। বলল,
“সেও এই বাড়ির বউ ছিলো। তোমার মতনই সুন্দর ছিলো। টিকতে পারে নাই। তার রুপের বাহারে সবাই জ্বলতো৷ সে নরম ছিলো তাই থাকতে পারে নি। তুমি পারবা। কারণ তুমি আগুন। “
কথাগুলো বলে মন্যুজান খাতুন বিচিত্র ভঙ্গিতে হাসলেন।
কাজরী আচমকা প্রশ্ন করলো,
“তার নাম কোমল ছিলো? “
দাদীর জ্বলন্ত চোখে হতবিহ্বল ভাব। তিনি অস্পষ্ট গলায় কিছু একটা বললেন। সেই সময় শবনম এসে জানালো শিরিন কাজরীকে ডেকেছে তার ঘরে। কাজরী অনিচ্ছাসত্ত্বেও গেল। কোমলের ব্যাপারে জানার আগ্রহ ছিলো, সুযোগও ছিলো। এই সুযোগ আবার কবে আসবে!
শিরিনের হাতে কফিমগ। তাতে কফির বদলে গরম পানি দেখা যাচ্ছে। পরনে নাইট স্যুট। মুখে ফেসপ্যাক লাগিয়েছিল বোধহয়। ন্যাচারাল গ্লো করছে। কাজরী জিজ্ঞেস করলো,
“আপনি কেমন আছেন? “
“কেমন আছি সেটা জানার জন্যই কী তুমি আমার খোঁজ করেছিলে?”
“হ্যাঁ। তবে আরও একটা কারণ ছিলো। “
শিরিন জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন। কাজরী বলল,
“সরি আমি আপনাকে ওইদিন হার্ট করেছি। আসলে ওই সময়ে আমার মাথা ঠিক ছিলো না। একচুয়েলি আল্পনাকে নিয়ে আমি একটু বেশী পজেসিভ। জানেন তো আমাদের মা নেই।
শিরিনের চোখে কৌতুক। সে বললেন,
“আচ্ছা! তুমি তো দেখছি বোন কে খুব ভালোবাসো। তা তোমার মেজাজ বুঝে আমাদের কথা বলতে হবে এখন থেকে তাই তো? “
“না আমি সেটা মিন করিনি। ওই পরিস্থিতিতে আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনি। আমার ব্যর্থতা ছিলো। পরিবেশ, পরিস্থিতি ভুলে গিয়ে আমি রিয়েক্ট করে ফেলেছি।”
“বুঝলাম। “
“আপনি কী আমাকে ক্ষমা করেছেন? “
শিরিন জবাব দিলেন না। কাজরী একটু নাটকের আশ্রয় নিলো। বলল,
“আমি আসলে মা’কে সেভাবে কাছে পাই নি। মাদার ফিগার বলতে যেমন বুঝায় তেমন কিছু কখনও ফেস করিনি। যে পরিবেশে থেকেছি সেটার থেকে অন্যরকম একটা পরিবেশে এসে একটু লিমিটলেস কথা হয়তো বলে ফেলেছি। তার জন্য সরি। “
শিরিন উপলব্ধি করলেন যে তিনি এই মুহুর্তে অতি ধুরন্ধর, চালাক মেয়ের সামনে বসে আছেন। চৌধুরী সাহেব কেন এই মেয়েকে ইশানের বউ হিসেবে বেছে নিয়েছেন এখন সেটা একটু হলেও বুঝতে পারছেন।
“কাজরী ইশান আমার সঙ্গে কখনো ওই টোনে কথা বলেনি এর আগে। এবং সে এখনো পর্যন্ত একবারও সরি ফিল করে নি। এই ব্যাপার টা কী আমার জন্য মেনে নেয়া সহজ?”
কাজরী বিস্মিত হবার ভান করে বলল,
“আমি কিন্তু ইশানকে কিছু বলতে বলিনি। আর ইশান আমার কথা শুনবে কেন? আমাদের তো খুব ভালোবাসি ভালোবাসি টাইপ সম্পর্ক থেকে বিয়ে হয় নি। “
শিরিন আরও একবার বিস্মিত হলেন। কথার পিঠে কথা বলতে ওস্তাদ। ভাগ্যিস এই মেয়ের সঙ্গে নিশানের বিয়ে হয় নি। তাহলে তার পক্ষে এতোটা সহ্য করা সম্ভব হতো না।
“আচ্ছা তুমি যেতে পারো। “
“আপনি ক্ষমা করেছেন তাহলে?”
শিরিন কঠিন গলায় বললেন,
“রিসিপশনের দিন তুমি যা করেছ সেটার জন্য আমি তোমাকে কখনো ক্ষমা করব না। “
কাজরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ওটা আমি বাধ্য হয়ে করেছি। বয়স্ক একজনের আবদার ফেলে দেয়া যেত নিশ্চয়ই কিন্তু তাতে একটা পারিবারিক অশান্তি যে দেখা যেত সেটা এড়ানোর জন্য…..
শিরিন এই নাটকীয় বাক্যগুলো বিশ্বাস করলেন না। বরং বিস্মিত হচ্ছেন মেয়েটাকে দেখে। সত্যি বলতে মিষ্টি দেখতে মেয়েটাকে তিনি নরম সরম ভেবেছিলেন। কোমলের মতো একদম। যাকে কন্ট্রোল করা সহজ হবে।
রাতে ইশান ফিরলো। কাজরী ঘুমিয়ে পড়েছিল। আচমকা শব্দে ঘুম ভাঙলো। স্বভাবসুলভ প্রশ্ন করলো,
“তুমি এখানে? “
ইশানও পাল্টা প্রশ্ন করলো,
“তুমি এখানে? “
কাজরী শবনমের কাছে শুনেছে ইশান এরকম হুটহাট দেশের বাইরে গেলে আটদিন, দশদিনের আগে ফিরে আসে না। তাই নিশ্চিন্ত ছিলো।
ইশান বাইরের কাপড় না ছেড়েই বিছানায় শুয়ে পড়লো। কাজরীকে হুকুমের সুরে বলল,
“পানি নিয়ে এসো আমার জন্য। আর হ্যাঁ আইস আনতে ভুলো না।
কাজরী রুক্ষস্বরে বলল,
“আমি তোমার সার্ভেন্ট না।”
“আই নো। তুমি আমার বউ, বউয়ের দায়িত্বও তো পালন করছ না। বাই দ্য ওয়ে তোমার দিনকাল কেমন গেল? কী প্ল্যান করলে? “
“কিসের প্ল্যান? “
“কিভাবে আরেকটা নাটক সাজানো যায়।”
“আমি প্ল্যান পরিকল্পনা করার সুযোগ পাই নি। রিলাক্সে হাত, পা ছড়িয়ে ঘুমিয়েছি। তোমার প্ল্যান কেমন ছিলো। “
“আমার প্ল্যান! আমি তো আফটার ম্যারেজ পার্টি করতে গেলাম। আনন্দ করেছি, মদ খেয়েছি দ্যাটস ইট।”
“আফটার ম্যারেজ পার্টি? বন্ধুদের সঙ্গে? “
ইশান কাজরীর প্রশ্ন করার ধরনে হেসে ফেলল৷ বলল,
“তোমাকে নিয়ে যাই নি বলে ম্যুড অফ? সরি ডার্লিং তুমি আমার লাইফে এক্সিস্ট করো না। “
“সেইম টু ইউ। “
“বাট আনফরচুনেটলি তোমাকে আমার বাড়িতে, আমার ঘরেই থাকতে হচ্ছে৷ “
“আসলেই দুর্ভাগ্য আমার। “
ইশান মাথা নেড়ে হেসে বলল,
“নো, নো ডার্লিং। দুর্ভাগ্য এই বাড়ির লোকেদের, আর আমার শ্রদ্ধেয় প্রানপ্রিয় ফাদার ওয়াজেদ চৌধুরীর। তিনি তোমাকে অবলা ভেবে ভুল করেছেন। “
“ডোন্ট কল মি ডার্লিং। এসব শব্দ তোমার সো কল্ড গার্লফ্রেন্ডদের জন্য ইউজ কোরো। “
“ওকে ডার্লিং। ওহ সরি তুমি তো আমার গার্লফ্রেন্ড নও। মাই বিউটিফুল বেটারহাফ। সুইটহার্ট চলুক তবে। “
কাজরী কথা বাড়াতে চায় না। ইশানের সঙ্গে সময় কাটানো এই বাড়িতে এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে অসহ্যকর ব্যাপার। কথা কথা খেলায় ইশান জিতে যায়। না জেতা অবধি চলতে থাকে বকবক।
“তুমি এখানে ঘুমাবে? “
ইশান ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“তাহলে? “
কাজরী কথা না বাড়িয়ে বালিশ নিয়ে সোফায় শুয়ে পড়লো। ইশান হাই তুলে বলল,
“গুড নাইট সুইটহার্ট। একটা ব্যাপার মাথায় এলো, কেন যেন মনে হচ্ছে আল্পনার নাটক টা তোমার সাজানো। “
কাজরী হতভম্ভ গলায় বলল,
“কী?”
ইশান পাশ ফিরে চোখ বন্ধ করলো। কাজরী ডাকলেও পাশ ফিরলো না।
আল্পনা এর আগে এমন সুদর্শন ছেলে আর দেখে নি। ইশান দের বাড়ি থেকে যে লোক ও’কে গাড়ি পর্যন্ত নিয়ে গেছে তার সঙ্গে যেতে ওর খানিকটা ভয় ছিলো। ও কাজরীকে কল করেছে দু’বার৷ লোকটা তাড়াও দিচ্ছিলো খুব। গ্লাস নামিয়ে সুদর্শন লোক টা যখন ভরাট কন্ঠে বলল,
“হ্যালো আল্পনা, কেমন আছ তুমি এখন?”
আল্পনা যেন তখন এই জগৎ থেকে হারিয়ে গেল। হিপনোটাইজ ব্যাপার টা ও বই পড়ে জেনেছে। বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই। ওই সময়ে ও’কে হিপনোটাইজ করা হয়েছিল কী না সেই ব্যাপারেও সন্দিহান। অচেনা ওই মানুষ টার সঙ্গে ও কেন গেল সেই ব্যাপার টা ও এখনো বুঝতে পারছে না।
বেশ কয়েক ঘন্টা ছিলো। যেটুকু ভয় ছিলো সেটাও কেটে গেল কিছুক্ষনের মধ্যে। সুন্দর কাপে ও’কে লেবু চা পরিবেশন করলো। খুব অবাক হলো অবশ্য। কিন্তু জিজ্ঞেস করতে পারে নি লোক টা কী করে জানে ওর লেবু চা পছন্দ। আল্পনা সেই চা খেল ঠিকই। খাবার সময় ভয়ও হলো না। সুদর্শন লোকটার হাসিটাও ভীষণ মিষ্টি ছিলো। আল্পনাকে বলল,
“আল্পনা ভয় পাচ্ছ?”
আল্পনা জবাবে মাথা নেড়ে না বলল।
“ভয় পেও না। তোমাকে ঠিক সময়ে পৌছে দেয়া হবে। বই পড়বে? তিন গোয়েন্দা সিরিজ আছে কিন্তু। “
দ্বিতীয়বার চমকিত হলো আল্পনা। এবার সত্যিই বিশ্বাস হলো যে কাজরীই ও’কে এখানে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। তা না হলে এতো ডিটেইলে আল্পনার পছন্দ, অপছন্দ সম্পর্কে জানবে কী করে লোকটা। আল্পনা যতক্ষণ সেখানে ছিলো লোকটাও সেখানে ছিলো। ডিনারের ব্যবস্থাও করেছে। নামীদামী রেস্তোরার চাইনিজ ফুড আনা হয়েছিল ওর জন্য। বিদেশী খাবারের মধ্যে চাইনিজ টাই ভালো খায় ও। কিন্তু লোকটা খেল রুটি মাংস। খাবার সময় আল্পনা কোনো প্রশ্ন না করলেও সে নিজে থেকে বলল,
“আমি নিজের খাবার নিজে কুক করি। বাইরের খাবার একটু এড়িয়ে চলি। গুড কুক নই বলে তোমার জন্য রেস্টুরেন্ট থেকে আনানো হয়েছে। ওখানেও তো তুমি লেমন জ্যুস ছাড়া কিছু খাও নি। “
আল্পনা সাহস করে এবার একটা প্রশ্ন করে ফেলল।
“আপনি কী কাজরীর বন্ধু?”
লোকটা স্মিত হেসে বলল,
“কাজরীর সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কেমন? আই মিন টকিং টার্ম কেমন? “
আল্পনা প্রশ্নটা এড়িয়ে যায়। দেয়ালের পেইন্টিংগুলোর দিকে নজর যায়। জলরং এর ছবিগুলো অতো ভালোও লাগছে না। আচমকা মনে একটা প্রশ্ন এলো, সুন্দর মানুষের পছন্দ কেন সুন্দর হয় না।
লোকটা যেন ওর মনের কথা পড়ে ফেলল। বলল,
“আমিও জানি ছবিগুলো সুন্দর নয়। কিন্তু খুব পছন্দের একজন গিফট করেছে তাই দেয়ালে সাজিয়ে রাখা। “
আল্পনা লজ্জা পেল। একটু হাসার চেষ্টা করলো। দুই চামচ ফ্রায়েড রাইস আর একটু চিলি চিকেন খেয়ে বাকী খাবার টা ওভাবেই রেখে দিলো। লোকটা বারবার জিজ্ঞেস করেছিল আল্পনা অন্যকিছু খাবে নাকি। হরলিকস গুলে দিবে কী না কিংবা আরেক কাপ চা। আল্পনা রাজি হলো না। ফেরার সময় আল্পনা কে মাঝরাস্তায় ট্যাক্সিতে তুলে দেবার সময় বলল,
“ডোন্ট ওরি। ড্রাইভার তোমাকে সেইফলি পৌছে দিবে। “
আল্পনা হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো,
“আপনার নাম?”
সুদর্শন ছেলেটা জবাব দিলো,
“সাহির। “
কাজরী সারারাত ভালো করে ঘুমাতে পারে নি। সোফায় ঘুমিয়ে অভ্যাস নেই সেটা একটা কারণ হলেও আসল কারণ হলো ইশান। ইশানের বলা কথাগুলো মাথার ভেতর ঘূর্নিঝড়ের মতো ঘুরতে থাকলো বারবার। ইশান নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমিয়েছে। টায়ার্ড ছিলো, ঘুম শান্তির হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু কাজরী পাড় করেছে অস্থির একটা রাত। ইশান কী নতুন কোনো খেলা শুরু করেছে!
আজ ইশানের সকাল হলেও তাড়াতাড়ি। এটা একদিকে স্বস্তি কাজরীর জন্য৷ মনে ছটফটানি ভাব যাচ্ছে না কিছুতেই। কথা বলতে হবে ইশানের সাথে।
ইশান ওয়াশরুমে সময় কাটালো ঘন্টাখানেক। কাজরী অপেক্ষা করে করে বিরক্ত হচ্ছিলো। শবনম এসে বলে গেছে সবাই কে ডাইনিং হলে উপস্থিত থাকতে। চৌধুরী সাহেব কথা বলবেন। কাজরী অতো গুরুত্ব দিলো না, ইশান বেরোলে জানাবে ভাবলো।
ইশান বেরিয়েছে। মাথাভর্তি চুল চুইয়ে পানি পড়ছে। গলায় সাদা তোয়ালে জড়ানো। পরনে প্যান্ট ছাড়া আর কিছুই নেই। মোবাইল নিতে আসার সময় কাজরীর কাছাকাছি হলো। আফটার শেভের মিষ্টি গন্ধটা চট করে নাকে ঢুকে গেল। ইশান কাজরীর চোখে চোখ রেখে মৃদু হেসে বলল,
“কাল তো ডার্লিং ডাকতে বারন করলে অথচ আজ চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছ। খুব হট লাগছে আমাকে? “
কাজরী নিজেকে সামলে নিয়েছে আগেই তবুও ধরা পড়ে যাওয়ার পরও স্মার্টলি ব্যাপার টা হ্যান্ডেল করার চেষ্টা করলো। বলল,
“হট হও আর কুল হও আই ডোন্ট কেয়ার। এন্ড বাই দ্য ওয়ে, ইওর ফ্লার্টিং স্কিল ইজ ভেরি পুওর। দুই বছর আগেও এমন ছিলো। “
ইশানের মুখের উজ্জ্বলতা দপ করে নিভলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল টা ঠিক করতে লাগলো। কাজরী বলল,
“ইশান একটা কথা বলতে চাই….
ইশান থামিয়ে দিয়ে বলল,
“আমি এখন শোনার ম্যুডে নাই। “
কাজরী কঠিন গলায় বলল,
“অবশ্যই শুনবে তুমি, তুমি আমাকে মেন্টাল স্ট্রেস দেয়া বন্ধ করো। যা আমি করিনি সেটা জোর করে আমার উপর চাপাতে এসো না।”
ইশান অবাক হবার ভান করে বলল,
“কী বলছ বলো তো? আর আমি তোমাকে মেন্টাল স্ট্রেস কীভাবে দিচ্ছি?”
“আল্পনার ব্যাপার টা তুমি আমার দিকে ঘোরানোর চেষ্টা করছ!”
ইশান শব্দ করে হেসে ফেলল। বলল,
“এটা ভেবেই তোমার রাতের ঘুম হারাম। যদি তুমি কিছু না করেই থাকো, তাহলে তো তোমার ব্যাপার টা মাথায় নেবার দরকার নেই তাই না? এখানেই চোর ধরা পড়ে গেল। ইশ!”
কাজরী উত্তেজিত হয়ে গেল। ইশানের খুব কাছে গিয়ে আঙুল উঁচিয়ে বলল,
“আমাকে আমার মতো থাকতে দাও। তোমার নোংরা প্ল্যান অন্য কোথাও দেখাবে এরপর থেকে। “
ইশান দমে যাবার লোক নয়। কাজরীর বাহু ধরে নিজের কাছে টানলো। এতো কাছাকাছি এলো দুজন যে নি:শ্বাসের শব্দ টের পাচ্ছে। ইশান বলল,
“ডার্টি গেম তুমি খেলছ ক্রেজি গার্ল। তোমার বোন যে মহিলার বর্ননা দিয়েছেন সে একচুয়েলি আমার মায়ের বান্ধবী রিতা আন্টি। তিনি ওইদিন রিসিপশনে উপস্থিত ছিলেন। একবার প্রমাণ পেলে সব হিসাব নিকেশ চুকিয়ে দেব। তখন আর এভাবে দাঁড়িয়ে কথা বলার অবস্থায় থাকবে না। আমি নিজে অসম্মানের সাথে তোমাকে প্যালেস থেকে বের করব। জাস্ট ওয়েট এন্ড ওয়াচ। “
কথা শেষ করে কাজরীকে ধাক্কা মারলো সোফার উপর। কাজরী স্তব্ধ হয়ে গেল ইশানের কথা শুনে।
ইশানের জন্য আজ একটা বিশেষ দিন। ডাইনিং হলে সেজন্য সবাই উপস্থিত হয়েছে মূলত। আইরিন খালামনির স্বামী মোফাজ্জল আঙ্কেল কে দেখা যাচ্ছে। সাথে তার ছেলে আর পুত্রবধূও আছে। এই বউটা সারাক্ষণ ঘরে থাকে। প্রেগন্যান্সির লাস্ট স্টেজে আছে। যতবার কাজরীর সঙ্গে তার দেখা হয়েছে ততবারই ও দেখেছে ভদ্রমহিলা চোখমুখ শক্ত করে বসে আছে। রাজার চেয়ে সেনাপতির ঠাটবাট যেন বেশী।
ইশান বসলো কাজরীর পাশের চেয়ারটায়। ব্যাপার টা ইচ্ছেকৃত ই, কারণ আরও চেয়ার খালি আছে। কাজরীর একবার চোখ বুলিয়ে সবাই কে দেখলো। শাশুড়ী কে একটু নার্ভাস মনে হচ্ছে। নিশান কেও একটু ছটফটে লাগছে। নিশানের সঙ্গে ওর ভালো করে আলাপ হয় নি। রিসিপশনের দিন নিশান একজন ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় করানোর জন্য ও’কে ডাকছিল। নরমালি বলছিল,
“কাজরী একটু এদিকে আসবে? মেজবাহ আঙ্কেল একটু কথা বলবেন। “
ইশান সঙ্গে সঙ্গে ভাই কে পাকরাও করে বলল,
“ব্রো আমার বউকে নাম ধরে ডাকা যাবে না। ভাবী সম্বোধনে সমস্যা হলে মিসেস চৌধুরী তে চালিয়ে নিও।”
খুবই অস্বাভাবিক ঘটনা। স্বাভাবিক ভাবেই ছোট ভাইয়ের বউকে নাম ধরে ডাকা কোনো অন্যায় নয়।
চৌধুরী সাহেব এসে তার নির্ধারিত চেয়ারে বসলেন। তার স্ত্রী এগিয়ে গিয়ে প্লেটে রুটি আর সাদা দেখতে মিক্সড সবজি তুলে দিলেন। তিনি মাঝপথে বাধা দিয়ে বললেন,
“এক মিনিট শিরিন, আমি যা বলতে এসেছি সেটা আগে শেষ করে নেই। “
সকলে জিজ্ঞাসু চোখে তাকালো। একমাত্র ইশানকে দেখা গেল জ্যুসের গ্লাস হাতে নিতে। চৌধুরী সাহেব ইশানের উদ্দেশ্যে বললেন,
“ইশান তুমি আজ থেকেই অফিসে যাওয়া শুরু করবে। আমি চাই আমার ব্যবসা, প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব তুমি নাও।
বাজ পড়ার মতো একটা ব্যাপার ঘটে সকলকে যেন স্তব্ধ করে দিলো। একমাত্র কাজরী এখানে এমন একজন যার কিছু আসে যায় না। সে লক্ষ্য করলো ইশান চৌধুরীর ঠোঁটে লেগে থাকা ঈষৎ হাসিটুকু।
চৌধুরী সাহেব খেতে শুরু করলেন। একটু আগে তার স্ত্রী যত্ন করে খাবার পরিবেশন করতে গিয়েছিলেন। এখন তাকে অন্যমনস্ক লাগছে। নিশান মাথানিচু করে আপেলের টুকরো মুখে দিলো। সামনাসামনি তাকাতে সাহস পাচ্ছে না। তাহলে যে ইশানের সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে যাবে। ওকে নিয়ে ইশানের উপহাস সহ্য করতে হবে।
চলবে….
সাবিকুন নাহার নিপা
(যারা পড়ছেন তারা কমেন্ট করবেন প্লিজ।)
Share On:
TAGS: কাজরী, সাবিকুন নাহার নিপা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাজরী পর্ব ৭
-
কাজরী পর্ব ৫
-
কাজরী পর্ব ১
-
কাজরী পর্ব ৮+৯
-
কাজরী পর্ব ১০
-
কাজরী গল্পের লিংক
-
কাজরী পর্ব ২
-
কাজরী পর্ব ৩
-
কাজরী পর্ব ৪