অন্তরালে_আগুন
পর্ব:৩৬
তানিশা সুলতানা
ভয়াবহ অস্ত্রপাচার হবে আনুর মাথায়। মস্তিষ্কে রক্ত জমেছে, ব্রেইনেও তীব্র আঘাত হেনেছে। অশ্র পাচার হলেই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবে, বা বেঁচে থাকবে এমন কোনো আশা দিতে পারে না ডক্টররা। কিন্তু অপারেশন করা অতিব জরুরি। তবে এতোটুকু নিশ্চিত করে বলেছে যে এখনো বেঁচে আছে আনু। একা একাই শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারছে না বলে অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়েছে।
আনুর চিকিৎসা সমস্ত দায়ভার অভি নিয়েছে। যত টাকা লাগে সে দিবে প্রয়োজনে দেশের বাইরে ভালো হসপিটালে পাঠাবে তবুও সে আনুকে ভালো করে তুলবে। সুস্থ হতেই হবে মেয়েটার। আজকে আনুর বাবা মা এবং বোন হাসপাতালে এসেছে। কাছে যাওয়ার অনুমতি পাইনি তবে দূর থেকে আনুর মুখটা দেখেছে। তাদের খবর দিয়েছে অভি। হয়ত মেয়ের ওপর রেগেছিলো কিন্তু মেয়ের খারাপ সময়ে পাশে থাকবে না এমন পাষাণ তারা নয় এটা ঠিক জানে সে। হলোও তাই। মেয়ের কঠিন পরিস্থিতির কথা শুনে ছুটে এসেছে হাসপাতালে। চোখের পানি বাঁধ মানছে না। এতোদিন সমাজের কথা ভেবেছে। তবে আজকে দু’হাত তুলে আল্লাহকে বলছে “আমাদের মেয়েটাকে শুধু বাঁচিয়ে রাখুন। প্রয়োজনে এই সমাজ থেকে দূরে কোথাও চলে যাবো”
আনুর বোন তনু আনমনে ভাবছে
“কি দোষ করেছিলো তার বোন?
ভালই তো বেসেছিলো। বিশাল বড় কোনো পাপ তো করে নি।
তবে কি ভালোবাসাই দুনিয়ার সব থেকে বড় পাপ? ভালোবাসার শেষ পরিণতি পতিতালয়? বা মৃ/ত্যু?
আনু মা সালমা বেগম কাঁদতে কাঁদতে আঁচল তুলে আল্লাহর কাছে বলে
“আমার মেয়েটার এই অবস্থা যে করেছে তার যেনো ভয়ংকর মৃত্যু হয়। আর মৃত্যুর পর কবরের একটু মাটি যেনো সে না পায়। শিয়াল কুকুরে ছিঁড়ে খাক তার দেহ খানা।
ওনার অভিশাপ সাথে সাথেই মিলে যায়। চট্টগ্রামের সেই গভীর জঙ্গলে অবস্থিত কুটিরে পড়ে থাকে আবিরের লাশ। ১২ ঘন্টা হয়ে গিয়েছে একইভাবে একই অবস্থানে পড়ে আছে। কেউ তার খোঁজ করেনি। করবেই বা কে? গোটা দুনিয়ায় মা আর বোন ছাড়া কেইবা আছে তার? বাবা?
সে তো শুধুমাত্র নিজের প্রয়োজনে তাকে ব্যবহার করলো। জন্ম দিলেই বাবা হওয়া যায় না। বাবা হতে গেলে আগে একজন ভালো মানুষ হতে হয়। বাবারা হয় বটগাছ, অন্ধকারে আলোর রশ্মি।
আবির জন্মের পর থেকে যতদিন বেঁচে ছিলো কোনদিনও বলতে পারবেনা তার বাবা তার সঙ্গে দু মিনিট ভালো করে কথা বলেছে। কখনো মাথায় হাত বুলিয়ে আশ্বাস দিয়েছে ” আমি আছি তো”
বরং সব সময় নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করে গিয়েছে। বোকা আবির বাবার থেকে একটু ভালোবাসা পাওয়ার লোভে, বাবার বিশাল সম্পদের একটুখানি ভাগ পাওয়ার লোভে কতই না খারাপ কাজে লিপ্ত হয়েছে। কত মেয়ের জীবন নষ্ট করেছে। কত মায়ের বুক খালি করেছে। শেষ মুহূর্তে তার মায়ের বুকটাও খালি হয়ে গেল।
পশু পাখিরা মানুষের গন্ধ পায়৷ তাইতো গন্ধ শুকে একদল পশু আসে আবিরের লাশের নিকটে।
মুহুর্তেই ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেতে থাকে তাকে। বড্ড মজা পাচ্ছে যেনো তারা। কিছু সময়েই গোটা আবির বিলুপ্তি হয়ে যায়। শেষ মুহূর্তে পড়ে থাকে শুধু আবিরের পরনের শার্ট এবং প্যান্ট। হাতের ঘড়িটাও পড়ে যায় এক কোনায়। এই ঘড়ি আনু গিফট করেছিলো।
পৃথিবী থেকে নিঃশেষ হয়ে যায় আবির নামক মানুষটি। কেউ জানলো না সে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। কেউ একটু কাঁদলো না তাকে হারানের শোকে। গোসল, জানাজা, কবর এসব জুটলো না তার কপালে। এমন মৃ/ত্যুই বোধ হয় তার প্রাপ্য ছিলো।
সকল পাপের শাস্তি মৃ/ত্যু দিয়েই শুরু হলো।
নুপুর নওয়ানের মুখ পানে তাকিয়ে আছে। লোকটার চোখমুখ কেমন শুকিয়ে গিয়েছে। চোখের নিচে কালি পড়েছে। ডান গালে একখানা লাল পিমপলস দেখা যাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগেই বোধহয় তার জন্ম হয়েছে। পরণে শার্টখানায় ময়লা লেগে আছে। র/ক্তের দাগ শুকিয়ে গিয়েছে। কেউ একজনের জীবন কেড়ে নেওয়া পাষাণ পুরুষটি বড্ড মায়াবী দেখাচ্ছে। ওই চোখ দুটোর পানে তাকালে নুপুরের মনে হয় “এই মানুষটা কোনো পাপ কাজ করতেই পারে না। সে ইনোসেন্ট। শুধু শুধু ভুল বুঝে সে।
আবার মন বলছে “ঠিক আছে মেনেই নিলাম সে পাপী। একবার চেষ্টা করে দেখিই না। ওই পাপী মনে একটুখানি শুদ্ধতা আনতে পারি কি না?
দীর্ঘশ্বাস ফেলে নুপুর। নওয়ানের মুখ পান থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়।
এতে যেনো বিরক্ত হলো লোকটা।
সিগারেটে দীর্ঘ টান দিয়ে নাক মুখে ধোঁয়া উড়িয়ে নুপুরের দুই গাল চেপে ধরে শক্ত করে। এবং নিজের দিকে ফেরায়।
বড্ড নরম স্বরে বলে
” আমায় দেখো চাঁদ।
তাকিয়ে থাকো আমার দিকে।
নুপুর নিজের গাল থেকে নওয়ানের হাত সরিয়ে দেয়।
“ঠিক করছেন না নওয়ান।
আমায় শক্ত থাকতে দিন। আমি শুধু প্রতিশোধ নিতে চাই। ভালোবাসতে চাই না।
নওয়ান সিগারেট ফেলে দেয়। শুকনো ওষ্ঠ এগিয়ে নুপুরের কপালে ঠেকায়। দীর্ঘ চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলে
” ভালোবাসতে হবে না।
শুধু আমার ভালোবাসাটুকু অনুভব করো।
প্রতিশোধ নিও তুমি। নিঃশেষ করে দিও আমায়। তবে সেটা আমার কাছে থেকে।
আমারই বুকে মাথা রেখে।
নুপুর আর কিছু বলতে পারে না। নওয়ান খুবই যত্ন সহকারে তার হাত থেকে কেনেলো খুলে দেয়। এবং মুহুর্তেই কোলে তুলে নেয়। পড়ে যাওয়ার ভয়ে নওয়ানের গলা জড়িয়ে ধরে নুপুর।
বেয়াদবটা বড্ড আদূরে স্বরে বলে
“ভয় নেই চাঁদ।
যতক্ষণ আমার দেহে প্রাণ আছে ততক্ষণ তুমি আঘাত পাবে না। প্রকৃতির সাহস নেই আমার চাঁদকে আঘাত করবে।
নওয়ান কথায় অশান্ত বুকটা শান্ত হয় নুপুরের। আঘাত প্রাপ্ত মাথা খানা ঠেকায় প্রসস্থ বুকে। আঁখি পল্লব বন্ধ করে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে।
মন্নু মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বিশাল বড়। প্রতিদিন শত শত জটিল এবং কঠিন রোগে আক্রান্ত মানুষ এখানে ভর্তি হয়। ভিড় লেগেই থাকে। আজকেও তার ব্যতিক্রম নয়। হাসপাতাল ভরে আছে মানুষ জনে। নওয়ান নুপুরকে কোলে নিয়ে চার তলা থেকে নিচ তলা পর্যন্ত আসে। সকলের দৃষ্টি তাদের দিকে। কেউ কেউ ফোন বের করে ভিডিও করছে। আবার কেউ কেউ কানাঘুষা করছে। মিডিয়ারা যখন তখন চলে আসবে ঠিক জানা আছে নওয়ানের। বল্টু রীতিমতো দৌড়াচ্ছে নওয়ানের পেছন পেছন। কানে তার ফোন। গাড়ির ড্রাইভারকে আসতে বলছে হাসপাতালের সামনে। সে ঠিক বুঝেছে তার ভাইয়ের ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।
তবে নওয়ানের মুখ দেখে সেটা মনে হচ্ছে না।
” তুমি ওকে নিয়ে যাবে না।
অভি দৌড়ে ওদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলে। রীতিমতো হাঁপাচ্ছে সে। নেহালও রয়েছে পেছনে। নাসির এবং সোনিয়া বাসায় গিয়েছে কিছু মুহুর্ত আগেই।
নওয়ান শান্ত নয়নে তাকায় অভির মুখ পানে। এবং গম্ভীর স্বরে বলে
“সী ইজ মাই ওয়াইফ।
তাকে আমি নিয়ে যাবো তাতে তোর বাপের কি?
অভি জবাব দিতে পারে না। মাথা নিচু করে দু পা পিছিয়ে যায়।
নেহাল বলে
” ও তোমার সাথে
বাকিটা শেষ করার আগেই নুপুর বলে
“আমি ওনার সাথে যাবো ভাইয়া।
থাকতে চাই ওনার।
চলবে
Share On:
TAGS: অন্তরালে আগুন, তানিশা সুলতানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৩৯
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ২৩
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৩৩
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ২
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১৪
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৩৪
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৯
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১৭
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ২৬+২৭
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১০