তাজমহল #দ্বিতীয়_খন্ড
পর্ব_২৯
প্রিমাফারনাজচৌধুরী
তাজদার বাড়ি ফিরে এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকেনি। তাকে যেতে হচ্ছে মামার বাড়ি, খালার বাড়ি। আত্মীয় স্বজনরা নইলে গাল ফুলিয়ে রাখবে। এদিকে শাইনার বড়ো আপার শ্বশুরবাড়িতে দাওয়াত দেওয়ার কথা। তাজদারের হাতে সময় নেই। শাইনা কথায় কথায় বলল,
আপনি প্রায়োরিটি লিস্টে কখনোই আমার আত্মীয় স্বজনরা থাকে না। ওদের আমি পরের বার বলে দেব যেন দাওয়াত দেওয়ার কথাও না ভাবে। বিয়ে হয়েছে সেই কখন আপনি একবারও আমার মামার বাড়ি যাননি। এমনকি কোনো আত্মীয়ের বাড়িতেও না। ওরা ভাগ্নীর জামাই হিসেবে শুধু দুলাভাইদের চেনে। সবসময় টাকা দিয়ে সব ম্যানেজ করা যায় না। আপনি আপনার আত্মীয় স্বজন ছাড়া আর কাউকে চেনেন না।
তাজদার চুপচাপ তার অভিযোগ শুনেছে। উত্তরে কিছু বলেনি। ব্যাপারটা তো ভেবে দেখেনি।
ড্রয়িংরুমে সবাই বসে চা খাচ্ছিল ঠিক তখুনি তাসনুভা শো-রুম থেকে ফিরলো।
“আসসালামু আলাইকুম আব্বু।”
তাজউদ্দীন সিদ্দিকী সাথে সাথে সালাম নিলেন,
“ওয়ালাইকুমুস সালাম। নুভামণি তুমি ঢাকায় কখন যাচ্ছ?”
“ভাইয়া যাওয়ার পর। কেন?”
“না, বলছিলাম যে তোমার বড়োমামা বললেন তোমাকে এখন কোথাও না যেতে। উনি একটা সম্বন্ধের কথা বলছিলেন।”
“কিন্তু আমি এখন চাইনা এসব।”
রায়হান একটু ধমকের সুরে বলল,
“তাহলে কখন? সময় দাও আমাদের। তুমি যেটা চেয়েছ সেটা তো হয়েছে। তোমার শো-রুমটা চালু হয়েছে। একটা পর্যায়ে এসেছ তুমি। এখন তো ভাবা উচিত বিয়ে নিয়ে।”
তন্মধ্যে তাজদার বাড়ি ফিরলো। হাতে কিছু ব্যাগপ্যাক আছে। তিতলি দৌড়ে এসে ব্যাগগুলো হাতে নিল। তাজদার ভেতরে ঢুকে সবাইকে একনজর দেখে নিয়ে বলল,”কি অবস্থা!”
তাসনুভার দিকে তাকালো সে।
“এখন ফিরেছ?”
“হ্যাঁ।”
তাজউদ্দীন সিদ্দিকী জানতে চাইলেন,”কোনো অসুবিধা হয়নি তো?”
“না।”
তাজদার সোফায় গিয়ে বসলো। তাশফিন বাবুকে নিয়ে এসেছে। কান্না করছে। তাজদার কান্নার কারণ জানতে চাইলো। তাশফিন বলল,
“ওর আম্মু কিচেনে। মাত্রই ঘুম থেকে উঠেছে।”
তাশফিন তাজনাহাকে নিয়ে বাইরে চলে গেল। ওর মামার বাড়িতে নিয়ে যাবে।
ঝিমলি এসে জানতে চাইলো,”চা নিয়ে আসবো?”
রায়হান বলল,”না, তাজ ফ্রেশ হয়ে খাবে। শোন যেটা বলছিলাম।”
তারা আসল কথায় ফিরে গেল।
“বড়োমামা বলেছে নুভার জন্য ওই ছেলেটাকে দেখতে। বাড়ি সাতকানিয়া কিন্তু ওরা থাকে টাউনে নিজেদের ফ্ল্যাটে।”
“আমাকেও বলেছে একবার গিয়ে তাদের ঘরবাড়ি দেখে আসতে। এখন আমার হাতে সময় কম। আমি বলেছি ভাইয়া আর চাচ্চু গিয়ে দেখে আসবে।”
রায়হান বলল,”সমস্যা তো সেখানে না। সমস্যা নুভা। ও কি বলছে দেখ।”
তাজদার সরাসরি তাসনুভার দিকে তাকালো। তাসনুভা অন্যদিকে চোখ স্থির করে দাঁড়িয়ে আছে। তাজদার বলল,
“কি বলছে ও?”
তাজউদ্দীন সিদ্দিকী বলল,”আর কি বলবে? একই কথা। বিয়ে করবে না।”
“এখন করবে না, তখনো করবে না। করবেটা কখন? নিজেও পছন্দের কথা জানাবে না। বাড়ির পছন্দের কাউকেও বিয়ে করবে না। তাহলে? আমি হয়তো এর পরের বার থেকে আর এই টপিকে কোনো কথাই বলবো না। তোমার যা ইচ্ছে হবে তুমি তাই তাই করবে।”
তাসনুভা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। তৌসিফ এসে তাজদারের পাশাপাশি বসলো। তাসনুভার দিকে তাকালো কপাল কুঁচকে।
“যা, ঘরে যা।”
তাসনুভা বকাঝকা খেয়ে মন খারাপ করে চলে যাচ্ছিল তখুনি রায়হান বলল,
“আমি বড়ো মামাকে তাহলে বলে দিচ্ছি।”
ঝিমলি বলল,”উনি মাত্রই এসেছেন। ফ্রেশ হোক। তারপর ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে। এত তাড়াহুড়োর দরকার নেই।”
রায়হান বলল,”ওকে অনেক সময় দেয়া হয়েছে। ওর কোনো রেসপন্স নেই। ও চুপ থাকলে আমাদের তো কিছু ভাবতে হবে। এভাবে সবাই মিলে চুপ থাকলে কেমন হবে?”
তাসনুভা বলল,”তোমাদের যা ভালো মনে হয়।”
“আর ইউ সিউর?”
তাসনুভা ছোট্ট করে বলল,”হুম।”
“তোকে মেয়ে দেয়ার জন্য কি ওরা বসে আছে? কাবিনের কথা শুনে ওরা আগেই ভাগছে। এই জনমে তোকে কেউ আর মেয়ে দেবে না। যা থাক তোরা তোদের বাপের বাড়িতে। আমি গেলাম।”
শাহিদা বেগম এই বলে বাপের বাড়িতে গিয়ে উঠেছে। ছেলে উনাকে দুঃখ দিয়েছে। খাইয়ে দাইয়ে পড়াশোনা করিয়ে মানুষ করার পরও এরা মাকে সমানতালে কষ্ট দিয়ে যাচ্ছে। আফসার সাহেব বললেন,”জামাই লন্ডনে চলে যাবে। তুমি এই সময় বাপের বাড়ি গিয়ে উঠলে কেন?”
“জামাই যাওয়ার আধঘন্টা আগে আমি চলে যাব।”
ফোনে তিনি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন। আনিস অফিস থেকে এসে দেখলো আম্মা বাড়িতে নেই। বাড়িটা নীরব। সাবরিনা দাদিমার সাথে রান্নাঘর সামলাচ্ছে। মোখলেসের মা এসে কাটাকুটি আর ধোয়ামোছার কাজ করে দিচ্ছে। শাহিদা বেগম ঠিক করে দিয়ে গেছেন ছেলের বউয়ের কষ্ট হবে ভেবে।
আফসার সাহেব নাতনিকে কোলে নিয়ে বসে আছেন। কিছুক্ষণ পরেই শাইনা এল।
“আম্মা আসছে না আজকে?”
“না রে মা।”
মেয়েকে কোলে তুলে নিল সে। সোফায় বসলো।
“ভাইয়ারা অফিস থেকে এসেছে?”
“আনিস এসেছে। আশরাফ আসেনি। ও বোধহয় বাজার-সদাই করে ফিরবে। তোর আম্মা বলছিল জামাইকে একবার বলতে তোর মেজোমামাকে গিয়ে দেখে আসতে। লন্ডন থেকে এল। ঘুরছে ফিরছে। অসুস্থ মানুষটাকে তো একটিবার দেখতে যাওয়া উচিত।”
“আমি কিছু বলতে পারবো না আব্বা। তোমরা ওই বাড়ির পরিস্থিতি কিছু বুঝবে না। আমি একাই গিয়ে মামাকে দেখে আসবো। উনি পরেরবার এলে যাবেন।”
“আচ্ছা থাক।”
“মেয়ের বাড়ি থেকে কিছু বলছে?”
“মেয়ের বোনের জামাই নাকি খারাপ ভাষায় কথা বলছে। আশরাফ এজন্য রাগারাগি করছে আনিসের সাথে। তুই বলতো মা কোনো মেয়ের বাবা এত কম কাবিন দিয়ে মেয়ে দেবে?”
শাইনা বাবার সাথে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে আবারও শ্বশুরবাড়িতে চলে গেল।
রওশনআরা তাজদারকে বলল, পারলে আর সাতদিন সময় নাও। নুভার সম্বন্ধটা ভালো করে যাচাই বাছাই করে দেখো। তুমি চলে গেলে ও আবারও সুযোগ পেয়ে বসবে। কারো কথা শুনবে না। ঢাকায় গেলে ওকে ফেরানো মুশকিল হয়ে পড়বে।”
তাজদার তৎক্ষনাৎ কিছু বললো না। তবে সে ভাবলো বিষয়টা নিয়ে। এটা ঠিক যে এবার গেলে আর এক বছরেও আসতে পারবে না।
রাতে ছাদে ছেলেমেয়েরা কি যেন পার্টি করছে। কেউ বলছে বারবিকিউ পার্টি। কেউ কেউ বলছে জগাখিচুরি পার্টি। ফিশ, চিকেন বিফ বারবিকিউ করা হবে। সাথে নান, পরোটা ইত্যাদি ইত্যাদিও থাকতে পারে। জম্পেশ খাওয়াদাওয়া হবে।
তৌসিফ, তাশফিন মিলে কাটাকুটি করছে। তিতলি বসে বসে পপকর্ন খাচ্ছে। ও কোনো কাজের না। শাওনকে আসতে বলেছে। ও এখনো আসেনি। তাসনুভা সাজগোছ করে আসতে আসতে খাওয়াদাওয়াও শেষ হয়ে যেতে পারে।
স্পেশাল মেহমান আনিস ভাই। যদিও তিনি দাওয়াত রক্ষা করবেন কিনা সন্দেহ আছে। দূরে একটা বেতের চেয়ারে বসা তাজদার। তার কোলে তাজনাহা। মাথাটা দু’হাতের তালুতে নিয়ে সে মেয়েকে সে অনবরত আদর করে যাচ্ছে। মেয়ে খিলখিল করে হাসছে। আবোলতাবোল কি যেন বলছে। শাইনা এসে দেখলো মেয়ে পায়ের তালুতে পর্যন্ত বাবার আদর নিয়ে যাচ্ছে। সে কিছুক্ষণ দৃশ্যটি উপভোগ করলো।
তিতলি কল রিসিভ করে বলল,”হ্যালো! আসাদুজ্জামান শাওন বলছেন?”
শাওন ওপাশ থেকে বলল,”জি।”
তিতলি বলল,”আপনার হাতে সময় মাত্র পাঁচ মিনিট। দ্রুত হাজির হোন। দশবার ফোন রিসিভ না করার জন্য আপনার ভাগ থেকে এক পিস মাংস কেড়ে নেয়া হবে।”
তৌসিফ ফোন করে নিয়ে বলল,”তুই কোথায়?”
“ভাইয়ের পাশে বসে আছি ছাদে। রাজি করাচ্ছি। শালা বসে বসে বিরহের গান শুনছে। উঁকি দে।”
ওই ছাদ থেকে উঁকি দিতেই শাইনাদের ছাদে দেখা গেল দুটো ছায়া। একটা দাঁড়িয়ে একটা চেয়ারে বসা। তৌসিফ চেঁচালো।
“আনিস ভাই তাড়াতাড়ি আসেন। নইলে আপনার জন্য হেলিকপ্টার পাঠানো হবে।”
শাওন বলল,”ফোন রাখছি। আমার ফোনে ব্যালেন্স নেই। আমি গরিব মানুষ। শোন আমি যদি না যাই আমার ভাগের গুলা পাঠিয়ে দিস।”
তৌসিফ বলল,”তুই গু খা।”
তিতলি বলল,”শাওন ভাই আপনি গু খান।”
তৌসিফ তার মাথায় চাটি মারলো।
“তোকে কে কথা বলতে বলেছে?”
তিতলি তার মাথায় চাটি মেরে বলল,”এই বেটা সবসময় মারিস কেন?”
বলেই সে শাইনার কাছে চলে গেল। বলল,”শাইনা আনিস ভাই আর শাওন ভাইকে আসতে বলো। নইলে জমবে না।”
সে ইনিয়েবিনিয়ে কথাটা তাজদারকে শোনাচ্ছে। মেজো ভাইয়া বললে আনিস ভাই নিশ্চয়ই আসবে। শাইনা তাজদারকে বলল,”এই শুনুন! ভাইয়াকে একটা ফোন দিন।”
“তুমি দাও।”
“ওকে।”
শাইনা ফোন করলো। আনিস রিসিভ করামাত্রই তাজদার বলল,”ছাদে আয়।”
“না ভালো লাগছে না। আম্মা নেই বাড়িতে।”
“আরেহ ব্যাটা এখনো মায়ের আঁচল ধরে বসে থাকবি? মা কেন রাগ করেছে এটা ভাব আগে। তোকে দিয়ে কোনো কাজ হবে না। তুই আর নুভাকে নিয়ে মারাত্মক ঝামেলায় ফেলে দিয়েছিস দুই পরিবারকে। চলে আয়। তোর জন্য শাওন আসছে না। ওরা অনেক আয়োজন করে ফেলেছে।”
আনিস তারপরও এল না। খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। অমন সময় হঠাৎ ফোন বাজলো। আনিস ঘুমঘুম চোখে রিসিভ করে কানে দিতেই ঝিমলি বলল,”আনিস ভাই আপনার জন্য আমরা বসে আছি। তাড়াতাড়ি আসুন।”
“ভাবি আপনি…
” হ্যাঁ, আমি। চটজলদি আসুন।”
সম্পর্কে বড়ো। তাই কথা ফেলা যায় না। সে কিছুক্ষণ বিছানায় বসে রইলো। আবারও ফোন বাজলো। আনিস নাম্বার না দেখেই রিসিভ করলো।
“হ্যালো আনিস ভাই!”
আনিস জানতে চাইল,”কে?”
“আমি জুনুনআরা সিদ্দিকী।”
“এটা আবার কে?”
ঝাঁজালো গলায় ওপাশের জন বলে উঠলো,”মানে?”
আনিস বিড়বিড় করলো,”নুভা?”
ওপাশে পিনপতন নীরবতা। তাসনুভা বিরক্ত হয়ে বলল,”পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসুন আনিস ভাই। নইলে খবর আছে আপনার।”
আনিসের কাশি উঠে গেল। সে কাশতে কাশতে উঠে দাঁড়ালো। পানি খেয়ে গলা ভেজালো। নিজেকে স্বাভাবিক করতে একটু সময় লাগলো। পরপর তাজদারের ফোন। তৌসিফের ফোন। সে শেষমেষ তৌসিফকে বলল,
“আসছি।”
সিদ্দিক বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কলিং বেল বাজাতেই কিছুক্ষণ পর কেউ একজন দরজা খুলে দিল। তাসনুভা বুকে হাত ভাঁজ করে দরজার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে তাকে আপাদমস্তক দেখলো।
“ঘুম থেকে কুঁচকানো শার্ট পরে, এলোমেলো চুলে চলে এলেন? আপনাকে বাড়িতে ঢুকতে দেয়া হবে না। শার্টটা আইরন করে আসুন নইলে চেঞ্জ করে আসুন। আর হ্যাঁ চুলও আঁচড়াবেন। আপনার বিয়ে এজন্যই বারবার ভেঙে যাচ্ছে।”
আনিস থতমত খেল।
“মানে আমি..
“মানে এটাই যে আপনি এখন আবারও আপনাদের বাড়িতে যাচ্ছেন।”
আনিস চলে গেল। শার্ট আইরন করালো না। নতুন শার্ট পরলো। তারপর চুলগুলো হালকা আচঁড়ে নিল। আঙুল বুলিয়ে ঠিকঠাক করে নিয়ে তারপর বেরোতে যাচ্ছিল। তখুনি সাবরিনার সামনাসামনি পড়ল গেল। সাবরিনা সরু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“এতরাতে সাজগোছ করে কোথায় যাচ্ছেন?”
আনিস কান চুলকে বলল,”ওই বাড়িতে। ছাদে নাকি কি কি করছে সবাই।”
“ওহ হ্যাঁ, আচ্ছা যান। দেখেন আম্মাকে ফেরাতে পারেন কিনা।”
বলেই সে চাপা হেসে চলে গেল। আনিস কিছুক্ষণ তার কথাটা মনে মনে জপলো। আম্মাকে ফেরানোর সাথে ওই বাড়ির কীসের সম্পর….
এবার দরজা খুললো তাজউদ্দীন সিদ্দিকী। তাকে দেখামাত্রই বলল,”কি ব্যাপার তুমি এত দেরিতে এলে কেন?”
“ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বড়ো আব্বু।”
“ছাদে এত আয়োজন। আর তুমি ঘুমোচ্ছিলে?”
“ঘুম চলে এসেছিল।”
“আচ্ছা যাও। শাওন কোথায়?”
“ও বোধহয় এসেছে আরও আগে।”
“আচ্ছা যাও। বিয়ে-শাদির কি খবর?”
“চলছে একপ্রকার।”
আনিস ছাদে যেতেই সবাই একসাথে হৈচৈ করে উঠলো। তাজানাহা কাঁদছে এত হৈচৈ শুনে। তাজদার মেয়ের গালে নিজের গাল চেপে ধরে আদর করতে করতে বলল,
“মজা করছে সবাই। আপনাকে কেউ বকেনি।”
শাইনা বলল,”বাপের মতোই ঢঙ।”
“মোটেও না। ঢঙ সব মায়ের মতো।”
ঝিমলি এসে আনিসকে বলল,”ফাইনালি এসেছেন। ভাবিকে নিয়ে আসতে পারেননি?”
“ভুলে গিয়েছি বলতে।”
“আচ্ছা থাক। উনি বললেও আসবেন না। খাবার পাঠিয়ে দেব। একি শার্টের ভাঁজ দেখে মনে হচ্ছে নতুন শার্ট পরে এসেছেন।”
“জি, এটা কিনেছি বেশি দেরি হয়নি।”
“মনে হচ্ছে আমার ননদিনীর কারসাজি আছে।” সাথে সাথে সে কথা ঘুরিয়ে বলল,”কাল আপনার অফডে। সো মজা করুন। আপনার বন্ধু চলে যাবে। তৌসিফও চলে যাবে। আমরাও ঢাকায় চলে যাব। বাড়িঘর তখন একা হয়ে পড়বে। আর কাউকে তখন পাবেন না।”
“হুম।”
তাসনুভা কয়েকটা প্লেট নিয়ে ছাদে পা রাখলো।
“তিতলি খবরদার প্লেটে হাত দেবে না। আমি ভালো করে ধুয়ে নিয়ে এসেছি। টিস্যু নাও। প্লেটে রাখো। এদিকে এসো। কাজে হাত দাও।”
বলতে বলতে সে আঁড়চোখে আনিসকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বলল
“গুড! হ্যালো তিতলি কথা কানে গিয়েছে?”
তিতলি কথা শুনলো না। টিস্যুর বক্স থেকে টিস্যু বের করে প্লেটের উপর একটা একটা করে রাখলো আনিস। তাসনুভা প্লেট সাজিয়ে ফেললো। কাঁটা চামচ রাখলো। শাইনা শসা কাটছে আর খাচ্ছে।
তাজদার তার পেছনে এসে দাঁড়ালো।
“এই খরগোশটা কোথা থেকে এল?”
শাইনা তার দিকে তাকিয়ে হাসলো। শসার টুকরো তাজদারের বাড়িয়ে দিল। তাজদার সেটা মুখে নিয়ে চিবোতে চিবোতে চলে গেল।
শাওন আর তৌসিফ টিকটিক করছে। যেমন একটা অডিও চালু করে দিয়েছে। সেখানে বলা হচ্ছে, ”হুজুর পরিমনি যদি শর্ত দেয় যে আপনি তাকে বিয়ে করলে সে দীনের পথে চলে আসবে, তাহলে আপনি কি তাকে বিয়ে করবেন?….
সবাই পুরো অডিওটা শুনে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। শাইনা বলল,”উফ এরা এত ফাজিল।”
আনিস বিরক্ত হয়ে শাওনকে বলল,”তুই যেদিকে যাস সেদিকে শান্তি নেই কারো।”
শাওন গলা টেনে টেনে ওয়াজ করার ভঙ্গিতে বলল,”শান্তি! তোমার বড়ো অভাব। আমার ভাইয়ের মনে শান্তি তোমার বড়ো অভাব। তুমি কোথায় শান্তি?”
তাজদার হেসে উঠে আনিসকে বলল,”তুই এদিকে আয়। ওরা যা ইচ্ছে করুক। তোর ওসব দেখতে হবে কেন?”
ঝিমলির কোল থেকে তাজানাহা শাইনার কোলে যাওয়ার জন্য কাঁদছে। শাইনা তার মুখের কাছে শসার টুকরো নিয়ে গিয়ে আবার টুক করে নিজের মুখে নিয়ে বলল,”এখন কোলে নেয়া যাবে না। হাত ধুতে হবে। মরিচ কেটেছি।”
সব আয়োজন শেষ। তাসনুভা তৌসিফ আর শাওনকে দিয়ে ফোল্ডিং চেয়ার টেবিল আনাতে চেয়েছে। কিন্তু পরে সেই পরিকল্পনা বাতিল। সবাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিচে গোল করে বসে খাবে। তাই বড়ো সাইজের একটা মাদুর আনা হয়েছে।
তাসনুভা খেতে খেতে তৌসিফকে বলল,”মাছটা ভালো হয়নি।”
তৌসিফ আনিসকে খেয়াল করলো হঠাৎ। বলল,”আনিস ভাই তো মাছটাই বেশি খাচ্ছে দেখছি।”
শাওন বলল,”ও মাংস কম খায়। ও হচ্ছে মাছে ভাতে পিউর বাঙালি বাবু।”
আনিস চুপচাপ খাচ্ছে। ঝিমলি বলল,”আনিস ভাই তাড়াহুড়ো করছেন কেন? ফোনে কারো সাথে কথা বলার তাড়া আছে নাকি?”
“না না ভাবি। কেউ নেই।”
রায়হান বলল,”তুমি কি বিয়েশাদি করবে না আনিস?”
আনিস মাথা তুললো না। তাসনুভা নিজের বাকি মাছ তিনটের একটা আনিসের পাতে দিল। অন্যটা তিতলি আর শাইনার।
ঝিমলি বলল,”তুমি খাচ্ছ না কেন?”
“এইসব মাছ আমি খাইনা।”
আনিস বলল,”মাংসগুলো নিয়ে ফেলো নুভা।”
“খাওয়ার পর কথা বলবেন।”
তাজদার বলল,”হুম খেয়ে দেখ। নুভা স্পেশাল মশলা বানিয়ে দিয়েছে।”
ঝিমলি বলল,”এক্সপেরিমেন্ট কিন্তু দারুণ হয়েছে ননদিনী।”
“থ্যাংক য়ূ!”
“আনিস ভাই ভালো লাগলে জানাবেন কিন্তু। আমার ননদিনীর নতুন আবিষ্কার।”
আনিস বিফস্টেক কেটে মুখে দিতে দিতে বলল,”ভালো হয়েছে।”
“থ্যাংক য়ূ আনিস ভাই।”
আনিস মাথা নাড়লো।
“হুম।”
তাসনুভা খুশিমনে কিছু চিকেন তুলে দিল তার পাতে। সাথে রায়হান, তৌসিফ, তাজদারকে আর শাওনকেও দিল। শাওন বলল,
“নুভা মনে হয় আমাদেরকে খাইয়ে দাইয়ে শ্বশুরবাড়ি চলে যাওয়ার ধান্ধা করছে।”
ঝিমলি বলল,”বাপের বাড়িতে আরও থাকতে বলছেন?”
নুভা বলল,”খাওয়ার সময় ফালতু কথা আমার ভালো লাগে না।”
ঝিমলির সাথে সাথে তৌসিফও হেসে উঠলো। রায়হান বলল,
“বিয়ের কথা বললেই ফালতু কথা, না?”
তাসনুভা চুপচাপ খেতে লাগলো। খাওয়াদাওয়া শেষ হতেই তাসনুভা বলল,”ডেজার্ট আছে। ওটাও খেতে হবে।”
আনিস তাজদারকে বলল,”আমি শুধু শুধু বাড়িতে খেয়েছি। আজ আর ঘুম হবে না। বেশি খেলে ঘুম হয় না আমার।”
ঝিমলি বলল,”ঘুম না হওয়ার জন্যই এত আয়োজন।”
তার কথার আগামাথা কেউ বোঝেনি এমন না।
তাসনুভা কিছুক্ষণ পর ডেজার্ট নিয়ে এল। ফ্রুট কাস্টার্ড জেলি ডেজার্ট। আর শাহী ফিরনি। বেশি কিছু করেনি। ডেজার্ট দুটো সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে এতটা মজা হয়েছে। সবাই খেয়ে প্রশংসা করলো। খাওয়াদাওয়া শেষ হওয়ার পরও সবাই অনেকক্ষণ ছাদে ছিল।
রায়হান শেষমেশ উঠে দাঁড়ালো। সে চলে গেল। বাবুকে নিয়ে শাইনা, তিতলি চলে গেল। শাওন আর তৌসিফও নেমে গেল। তাসনুভা প্লেটগুলো নিয়ে চলে গেল।
আনিস তাজদারের সাথে কথা বলতে বলতে এগিয়ে যাচ্ছিল দরজার দিকে। তখুনি ঝিমলি বলল,”আনিস ভাই আমার একটা একাউন্ট খুলতে হবে। আপনাদের ব্রাঞ্চে যাব ভাবছি।”
তাজদার বলল,”তুই আয়, আমি নিচে আসছি।”
আনিস বলল,”কি একাউন্ট খুলবেন?”
ঝিমলি কথা ঘুরিয়ে ফেললো।
“লোন নেব ভাবছি।”
“লোন? বড়ো এমাউন্টের।”
তাসনুভা এসে বলল,”মাদুরটা অব্দি তোলেনি। ওদেরকে আমি কাল…
বলতে বলতে সে থেমে গেল। ঝিমলি বলল,”ওহ আপনি এসেছেন। আনিস ভাই আমি না লোন নুভা নেবে। আপনারা কথা বলে নিন। ব্যাংক কর্মকর্তা ও গ্রাহকের ব্যক্তিগত আলোচনা গোপনীয় থাকাই শ্রেয়।”
বলেই সে একটা হাসি দিয়ে চলে গেল।
তাসনুভা দরজার দিকে চেয়ে রইলো। পেছনে আনিস। সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো চুপচাপ। তারপর তাসনুভা হালকা করে ফিরে তাকাতেই চার চোখ এক জায়গায় হলো।
আনিস বলল,”ব্রাঞ্চে গেলে ভালো হয়।”
বলেই সে চলে যাচ্ছিল পাশ কাটিয়ে। তার গাম্ভীর্যতা দেখে যদিও তাসনুভা ভয় হচ্ছিল। তারপরও সে বললো,
“আপনি চাচীআম্মাকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করুন।”
আনিস তার দিকে ফিরলো। তাসনুভা অবাক হয়ে বলল,
“এভাবে কি দেখছেন? কোনোদিন মেয়ে দেখেননি? আপনি নিশ্চয়ই আমাকে পছন্দ করেননা? আমিও করিনা। যেহেতু দুজনেই দু’জনকে অপছন্দ করি জুটি হিসেবে আমরা মন্দ হবো না। একজন পছন্দ করলে, অপরজন অপছন্দ করলে তখন মন্দজুটি হয়। আমরা রাজযোটক হবো। বোঝা গেছে? এবার যান।”
আনিস চলে যাচ্ছিল। তাসনুভা আবারও ডাকলো,
“আনিস ভাই দাঁড়ান।”
আনিস দাঁড়ালো। ফিরে তাকালো। তাসনুভা আঙুলে চুল প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে বলল,
“আপনি সবাইকে বলবেন আপনি আমাকে পছন্দ করেন। আপনি আমাকে ছাড়া বাঁচবেন না। আপনি আমাকে না পেলে পাগল হয়ে যাবেন।
থ্যাংক য়ূ!”
আনিস চলে গেল। তাসনুভা ছাদে খালি পায়ে হাঁটতে লাগলো। ঠোঁটের কোণায় মৃদু লাজুক হাসি।
আনিস নিচে যেতেই তার দিকে হাঁ করে তাকালো। ঝিমলি সবাইকে সবটা বলে দিয়েছে। আনিস সোজা বেরিয়ে গেল কারো দিকে না তাকিয়ে।
আজ রাতে কেউ আর ঘুমাবে না। তাজউদ্দীন সিদ্দিকী আর রওশনআরা স্তব্ধ হয়ে গেছেন। তাজদার চুপচাপ বসে আছে। শাইনা আর সে চোখাচোখি হয়েছে। কিন্তু দুজনেই যত দ্রুত সম্ভব চোখ সরিয়ে নিয়েছে। রওশনআরাও তার মুখোমুখি হতে চাচ্ছে না। আজ দুপুরেই তিনি ছেলের বউকে বকতে গিয়ে ওই বাড়িকে টেনেও অনেক কথা শুনিয়েছেন। সেই বাড়িতে নিজের মেয়ের সম্বন্ধ!
চলমান…
Share On:
TAGS: তাজমহল সিজন ২, প্রিমা ফারনাজ চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ৭+৮
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ২৪
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ১৭+১৮
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ১৫+১৬
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ২৩
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ২৫
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ১২+১৩
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ২২
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ২৭+২৭(২)
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ১৯