Golpo কষ্টের গল্প পিদিম জ্বলা রাতে

পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৪


পিদিমজ্বলারাতে. ৪ ✍️ #রেহানা_পুতুল

তৌসিফ স্বাভাবিক থাকে। কোনো রা* গ ক্ষো*ভ প্রকাশ করল না। মায়ের সাথেও না। রাবেয়া এগিয়ে গেল ছেলের রুমের সামনে। দরজায় দাঁড়িয়ে বিচলিত গলায় বলল,
“কিরে বাবা,কই ছিলি সারাটাদিন? দুপুরে কই খাইলি?”

“মা,হোটেলে খেয়েছি এক বড় ভাইসহ। উনার কাজেই বের হয়েছি।”

তাওয়েল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে মাকে মিথ্যে করে বলল তৌসিফ।
“বুঝলাম। এখন ভাত খাইবি না অন্যকিছু?”

“ভাত খাবো। অন্যকিছু খেলে এখন পোষাবে না।”

মায়ের দিকে চেয়ে ঠোঁট ভিড়িয়ে হেসে বলল তৌসিফ। রাবেয়া চলে গেল খাবারের রুমে। একে একে সবকিছু বেড়ে টেবিলে নিয়ে রাখল। রুমের একপাশে একটি পুরোনো চৌকোণা সাইজের টেবিল পাতানো রয়েছে। অনুষ্ঠান উপলক্ষে টেবিলের কাগজ পরিবর্তন করা হয়েছে। নতুন টেবিল ক্লথ বিছানো হয়েছে। টেবিলে বসে সাধারণত পুরুষেরা খায়। মহিলারা মাটিতে পাটি বিছিয়ে খায়। তৌসিফ আয়েশ করে খেতে লাগল। রুই মাছের মাথা দিয়ে কাঁচাকলা রান্না, মলা শুটকি দিয়ে বেগুন চচ্চড়ি,কুঁচো চিংড়ি দিয়ে চিকন লতি ভুনা,কইমাছ দোপেয়াজা, আলু করলা ভাজি, মাষ কালাইয়ের ডাল। তৌসিফ খেতে খেতে বলল,
“বাহ! এতো আইটেম আজ? কাহিনী কী মা?”

“ঘরে মেহমান। তাই কারণ কারণে বেশী হয়ে গেছে। কাঁচা কলা আমাদের গাছ থেকে পাড়া। শুটকি আমাদের ঘরের দেওয়া। খুকীর পছন্দ বলে করতে হইলো। চিকন লতিও আমাদের কচুগাছের গোড়া থেকে তুলল তোর দাদী। করলা ভাজি তোর দাদার প্রিয়।”

“আচ্ছা। দারুণ হয়েছে। সবই কী তুমি রান্না করেছ মা?”

“তোর আর কে করবে?”

“তাও তো কথা। টেবিল ক্লথটা সুন্দর আছে। কে চেঞ্জ করছে?”

“সাথী। কলেজ থেকে আসার সময় কিনা আনল।”

“বাহবা! কবে থেকে এতো কাজের হলো সে?”
“তুই জিগাইস তারে।”

” বড় চিংড়িগুলা ভাজনা কেন আর? ফেলে রাখার দরকার কী?”

” আমার মন চাইতাছিল গাছের নারকেল বাটা দিয়ে চিংড়ির মালাই কারি করি। তোর দাদি মানা করলো উচ্চগলায়। বলল, খবরদার এই ইছামাছ ঘরের কেউই খাইব না আর। তোমার পোলায় আনছে। তাই সব তোমরা মায় পুতে খাইয়ো।”

তৌসিফ দাঁত কিড়মিড়িয়ে নিচু স্বরে বলল,
“এটা বলছে না সে,ঠিক তাই হবে। তুমি কালকে চিংড়ি মালাইকারী করবে অবশ্যই। দেখি কে না খায়?”

“আচ্ছা করবো। কাল তানভিরও আসব। পরশু শুক্রবার তো ঘরে অনুষ্ঠান। বাবা একটা কথা বলতাম।”

“শুনছি। বলো?”

“আমাদের ঘরে ফ্রিজ আছে। কিন্তু একটা ডাইনিং টেবিল নাই। কেমন দেখায় এটা। সামনে তোরে বিয়ে করামু। নতুন বউ আসব। তাই বলছিলাম সেকেন্ড হ্যান্ড হইলেই একটা ডাইনিং টেবিল দরকার বাবা।”

“বউ ঠিক করছ?”

“দেখতেছি তো।”

” দেখতে থাকো। আর শোন মা, ফ্রিজটা কেনা জরুরি ছিল বলে কেনা হয়েছে যৌথভাবে। আপাতত ডাইনিং থাক। পরে হলেও চলবে। আমি তোমাকে টেবিল কিনে দিব। তবে এখন নয়। পরে।”

ব্যক্তিত্বপূর্ণ কণ্ঠে জানাল তৌসিফ।
রাবেয়া মুখ গোঁজ করে বলল,
“তোর সবকিছু পরে আর পরে। তোর সেই পরে আসতে আসতে আমরা কবরে যাব।”

তৌসিফ খেয়ে উঠে দাঁড়ায়। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়েই বলল,
“এজন্য মন খারাপ করলে মা?”

রাবেয়া বলল,
“নারে বাপ। আল্লায় তো আমারে চুপ থাকা আর সবর করার মাটি দিয়ে বানাইছে। কইতেও পারি না। সইতে ও পারি না। আমার বিয়ার প্রথম শাড়িটা স্মৃতি হিসেবে যত্ন কইরা রাখছি। শাড়ির ভাঁজে কয়মাস পরপর কর্পূর দিয়া রাখি ভালো থাকার জন্য। সেই শাড়িটা খুকী কিছুদিন আগে নিয়া নিল কার বিয়েতে জানি পরার জন্য। আজ বিকালে বলতাছে,পরশু অনুষ্ঠানেও সে ওই শাড়িটাই পরব। এবং আমাকে আর দিব না। শাড়িটার রং খয়েরি রঙের কিছুটা। তাই নাকি বেশি ভালোলাগে পরতে তার। ক্যাটক্যাটা লাল রঙ হইলে সে নিতই না। কোথাও পরাও যাইতো না। মানাইতো কম।”

তৌসিফ রা* গে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠে। বলল,
“বাবাকে জানিয়েছো?”

“বলছি। উনি বলল তার একটা মাত্র বোন। কখনো তার কোনো আবদার অপূর্ণ রাখেনি বড়ভাই হিসেবে। এখন কীভাবে এই শাড়ির কথা বলবে। যেখানে মুখ খুলেই বলল আর দিবে না।”

“সে একটা মাত্র বোন। তুমি কী তার? তুমিও তো তার একটা মাত্র বউ। নাকি আরো কয়টা বউ আছে উনার? তোমার শাড়ি তোমার থাকা চাই আমি। সোজা আঙ্গুলে ঘি না উঠলে আঙ্গুল বাঁকা করার কৌশল অবলম্বন করব আমি।”

“তোরে কিছু কইলেও দোষ। হুনব হেরা। রাতের কথা আস্তে বললেও পাশের রুম থেকে শোনা যায়। অনুষ্ঠানটা আনন্দের সাথে শেষ হোক। পরে যা বলার, যা করার করিস।”

“আচ্ছা, সে দেখা যাবে৷ “

তৌসিফ উঠানে একটু হাঁটাহাঁটি করতে গেলো। খাওয়ার পর দশ মিনিট হাঁটা স্বাস্থ্যের জন্য ও হজমের জন্য ভালো। তৌসিফ নবনীকে হোয়াটসঅ্যাপ কল দিল। নবনী রিসিভ করেই প্রীতময় সুরে,
“কেমন আছো তৌসিফ?”

“এইতো নবনী। তবুও জীবন যাচ্ছে চলে জীবনের নিয়মে। তুমি কেমন আছ?”

“ব্যস্ততায় ভালো আছি। তার মাঝেও কাউকে মিস করি। যাইহোক বল তোমার কাজের কথা?”

মুঠোফোনের ওপ্রান্তে ছোট্ট করে শ্বাস ফেলে জবাব দিল ডাক্তার নবনী।

“নবনী,তোমার কথা রাইট। সেই মেডিসিন আমাদের দেশে নেই। ইন্ডিয়া হতে আনা হয়েছে। তুমি জানাতে বললে তাই জানালাম। দোয়া করো আমার জন্য। বাবা,মাকে নিয়ে আমি খুব সমস্যায় আছি।”

আহত গলায় বলল তৌসিফ।

“আমার দোয়া যেন তোমার জন্য খুব কাজে লাগে,সেই ব্যবস্থা করে ফেল।”
মুখের ভিতর রেখে চাপা স্বরে বলল নবনী।

তৌসিফ না বোঝার ভান করে বলল,
“বন্ধুর দোয়াও নেহাৎ কম গুরুত্বপূর্ণ নবনী।”

নবনী দরদমাখা সুরে বলল,
“হাহ! আমি তোমার নামেই বন্ধু মাত্র। খাঁটি বন্ধু হলে পারিবারিক বিষয়গুলোও শেয়ার করতে।”

“সরি নবনী।” বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করল তৌসিফ।

নবনীর চোখ ভিজে গেল তৌসিফের জন্য। সে তৌসিফকে ভালোবাসে। বিয়ে করতে চায়। কিন্তু তৌসিফের কাছে প্রেম,ভালোবাসা,বিয়ে এগুলোর কোনো পাত্তাই নেই। সে কেবল বোঝে পরিবার,মা,বাবা,ভাই। এর বাইরে যে বেলাশেষে নিজের একজন মানুষ থাকা চাই,সেই অমোঘ সত্যিটা তৌসিফ যেন উপলব্ধিই করতে পারে না।

ঘরে এসেই তৌসিফ সাথির রুমের সামনে গিয়ে থামল। নবনীর কথা তার হৃদয়ে সামান্যতম আঁচড় কাটতে পারেনি। এই বিষয়ে সে বড্ড উদাসীন।কেননা সে যে পিতার মতো পরিবারের বড় ছেলে। তার দায়িত্ব অনেক বেশী। সে চাপানো দরজাটা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করল। সাথি, অভ্র ও খুকীর মেয়ে মাইমুনা তিনজন মিলে গল্প করছিল। তৌসিফ ঠোঁটের কোণে ছল করা হাসি দিয়ে খাটের কিনারায় পা তুলে বসল। সাথি তাকে দেখে বেরিয়ে যেতে লাগল। তৌসিফ পুরু গলায় সাথিকে ডাকল।

“সাথি কই যাস। শোন।”
সাথি পা থামাল।

” বস বলছি।”
সাথি নিরস ভঙ্গিতে বসল অনিচ্ছাসত্ত্বেও। তৌসিফ হালকা হেসে বলল,
“তোর চয়েজটা আমার চয়েজ হয়েছে৷ টেবিল ক্লথটা নাইস! এভাবে সবকিছু করবি দায়িত্ব নিয়ে। ঠিক আছে?”

সাথি মৌন থাকে। তার ভিতর বলছে কথা বলতে তৌসিফের সাথে। বাহির বলছে চুপ থাকতে। তৌসিফ অভ্র ও মাইমুনার গতিবিধি দেখে নিল। তারা দুজন একটা ছড়ার বই নিয়ে ব্যস্ত।

তৌসিফ বলল,
“সাথি,আমি ইন্ডিয়া যাব এক কাজে। আসতে তোর জন্য কী আনব বল? ইন্ডিয়ার জিনিস তো কখনো চোখেও দেখিস নি।”

কথাটা সাথীর ইগোতে লাগল খুব। সে বলে উঠলো,
“হুহ্! চোখেও দেখিনি। কত ধরছি। দেখছি। পরছি। খাইছি।”

তৌসিফ চমক খাওয়া সুরে জিজ্ঞেস করলো,
“আমি তোর মুরুব্বি। আর মুরুব্বির সাথে মিথ্যা বললে জিহবা খসে পড়বে পলেস্তারার মতো।”

দাঁড়ান বলে সাথী শশব্যস্ত হয়ে,তার ড্রেসিং টেবিলের সামনে গেল। তৌসিফের চোখেমুখে উৎসুকতা খেলা করে। সে চোরাচোখে দেখে নিল সাথী কোন স্থান থেকে কী নিচ্ছে। সাথী হাতে করে তৌসিফের সামনে বিছানার উপরে এনে কিছু জিনিস রাখল।
বলল,
“দেখেন ভালো করে। এসবই সূদুর ওপার বাংলা হতে এসেছে মিস্টার।”

তৌসিফ নেড়েচেড়ে দেখল চুলের দুটো পাঞ্চ ক্লিপ। একটা ব্রেসলেট। দুটো ম্যাংগোবার চকোলেট। এবং বুঝল এসব দেশী পন্য নই। সে সহজ গলায় বলল,
“আমি হেরে গেলাম। তুই জিতে গেলি। কিন্তু কে দিল এতো সুন্দর উপহার তোকে? ক্লাসের কোনো বান্ধবী?”

“নাহ। অভ্রের মেজো মামা ইন্ডিয়া থেকে আনল। উনি দিল তার বোনকে। তার বোন দিল আমারে। চাচী বলল উনি মাঝে মাঝে বাইরে যায় ব্যবসার কাজে।”

“ওহ! বুঝলাম। নিয়ে রেখে দে। মন দিয়ে পড়াশোনা করিস।”

সাথীর আবেগী মনে তুফান ছোটে। প্রমোদ গোনে গোপনে। তৌসিফ ভাইয়াও কী আমার মতো করে আমাকে পছন্দ করে? ব্যক্তিত্বের জন্য প্রকাশ করতে পারে না। এমনকিছু?

তৌসিফ উঠে যায় নিজের রুমে। চোয়াল শক্ত করে মনে মনে বলে,
তার মানে ট্যাবলেট ওপার হতে আসে নিশ্চিত। আমাকে আরো স্ট্রং ক্লু রেডি করতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাবাকে খাওয়ানোর উদ্দেশ্য টা কী? কেই বা খাওয়ায়? কীভাবেই বা খাওয়ায়? ধীরে ধীরে সব জট খুলতে হবে।

রাতে সবাই খাওয়ার রুমে চলে গেলো। সেতো আগেই খেয়ে নিয়েছে। তাই সে তার রুমেই শুয়ে রইল। অনুসন্ধিৎসু চোখে সে সারাঘরে চোখ বুলিয়ে নিল। চুপিচুপি উঠে গিয়ে সাথীর রুমে গেল। খালি পায়ে নিঃশব্দে!

চলবে…৪

#

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply