পিদিমজ্বলারাতে. ৩ ✍️ #রেহানা_পুতুল
পড়া শেষে তৌসিফ বিমূঢ় হয়ে যায়। ঘাবড়ে উঠে অনেকটা। সে জোরে জোরে শ্বাস ফেলতে থাকে। যেভাবেই হোক এই নিষিদ্ধ ট্যাবলেটের রহস্য তাকে উদঘাটন করতেই হবে। তৌসিফ উদভ্রান্তের মতো ঘরে ঢুকল। সবাই যার যার রুমে অবস্থান করছে। মাকে ইশারা দিয়ে নিজের রুমে ডেকে নিল সে। রাবেয়া এল ছেলের রুমে।
“কিরে,কী হইছে?”
“মা,আমি গ্রামে থাকি না। মাসে একবার আসি। তাও সারাদিন বাইরে বাইরে থাকি। তাই জানিনা। আমাদের ঘরে কারো কোনো বড় অসুখ আছে?”
রাবেয়া ভিমড়ি খেল ছেলের কথায়। অদ্ভুত দৃষ্টি নিক্ষেপ করল ছেলের মুখপানে। হতবাক স্বরে নিরস ভঙ্গিতে বলল,
“হ্যাঁ আছে তো। তোর।”
“মা, সিরিয়াস কথা বলছি আমি।” ভার কণ্ঠে বলল তৌসিফ।
“আমিও সিরিয়াস কথা বলছি। তোর হইছেটা কী বল তো? কার কী অসুখ থাকব? কারোই তেমন অসুখবিসুখ নাই। সব চাইতে ঘরে যা একটু কাহিল থাকে তোর আব্বা। সেতো আগে থেকেই নরম সরম মানুষ। বহু বছর ধরে শরীরে ডায়াবেটিস। ধীরে ধীরে আরো নরম হইব সামনের দিকে। এইটা তো সবারই জানা কথা।”
“বাবার ঔষধের প্রেসক্রিপশনটা আনো। যাও।”
রাবেয়া তপ্ত শ্বাস ফেলল। উঠে গিয়ে নিয়ে এলো। তৌসিফ সেই ট্যাবলেটের নাম মুখস্থ করে নিয়েছে৷ সে দেখল প্রেসক্রিপশনে এমন কোনো মেডিসিনের নাম নেই। সে মাকে বলল,
” এমনিতেই একটা জিনিস চেক করলাম। যাও। ঘুমিয়ে পড়ো। শোন,পতিভক্তি পত্নী হয়ে তোমার ভোলাভালা স্বামীকে ও বাকিদের আবার বলে ফেলনা যেন।”
রাবেয়া বোবামুখে উঠে গেল। ছেলে কেন কারো অসুখ আছে কিনা জানতে চাইল, কেন বাবার প্রেসক্রিপশন দেখল, আবার কেন কাউকে বলতে নিষেধ করল সাবধানী সুরে, এসব নিয়ে রাবেয়ার মাঝে কোন হেলদোল দেখা দিলনা। কোনো প্রশ্ন বা কৌতুহল সৃষ্টি হলনা। বরং উল্টো তার মাঝে বিষয়টা হাস্যকর ঠেকল। মনে মনে ছেলেকে পাগল আখ্যা দিল সে। তার দৃষ্টিতে ঘরের সবই ঠিক আছে। কিন্তু ছেলে এবার বাড়ি এসে এমন শুরু করেছে কেনো। অতিরিক্ত হয়ে যাচ্ছে। সংসারে একসাথে বাস করতে গেলে অমন ছোটখাটো বিষয় ঘটবেই।
রাবেয়া মশারি খাটিয়ে স্বামীর পাশে শুয়ে পড়ল। ছেলের কথানুযায়ী সে কাউকে বলবে না। এমনকি পাশে শুয়ে থাকা স্বামীকেও না। নইলে সত্যি সত্যি সে এখন সব গড়গড় করে বলে দিতো।
তৌসিফ সোজা হয়ে সিনা টান টান করে শুয়ে পড়ল। তার অস্থির লাগে। কষ্টে, দুঃখে, ঘৃণায় বুকটা ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে। তার বাবা মা দুজনের অন্তরটা এতো সারল্যতায় মাখামাখি কেন? কেন জানি তার মন বলছে এই ট্যাবলেট তার বাবাকে কৌশল করে খাওয়ানো হচ্ছে। কিন্তু কে সেই ব্যক্তি বা তারা কারা? কেনই বা খাওয়াচ্ছে? কিসের স্বার্থ আর সুবিধাভোগের জন্য? পরিবারের প্রতিটি মানুষের সাথে বাবার সম্পর্ক অতি মধুর। কেননা এই সংসারে তার বাবা বড় ছেলে হওয়াতে অবদানটাও বাকিদের চেয়ে ঢের বেশি তার। তৌসিফের চোখ জড়িয়ে আসে। চিৎ হওয়া থেকে উপুড় হয়ে শোয় সে। শত দুর্ভাবনা মাথায় নিয়ে আর জেগে থাকতে পারল না। চোখের পাড়ে নেমে এলো গভীর ঘুম।
পরেরদিন ঊষালগ্নেই তৌসিফের ঘুম ছুটে গেল। তার জানালা বরাবর বাইরে একটি কবুতরের বাসা রয়েছে। বুঝতে পারল এরাই তাকে ডেকে ডেকে ঘুম ভাঙিয়েছে। এই কবুতরগুলোর কাজও তার মা সবার চেয়ে বেশী করে। অথচ তার মায়ের প্লেটে কোনদিন ভুনা কবুতরের পা বা পাখনা দুটো ছাড়া আর কিছুই জোটেনি। এটার উসুলও সে নিবে এবার। কিছুই বাকি থাকবেনা আর। ব্রাশ নিয়ে আলস্য ভঙিতে হাই দিতে দিতে তৌসিফ বাড়ির সামনের দরজার দিকে গেল। কাচারিঘরের সামনের পুকুর ঘাটের সিঁড়িতে গিয়ে বসল অল্পক্ষণ। মুখ ধুয়ে বাড়ি ফিরে এলো। বাইরে উড়ন্ত ধোঁয়া দেখে বুঝতে পারল চুলায় আগুন জ্বলছে। সে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে উঁকি মারল ভিতরে। দেখল মা রাবেয়া রোজকার মতো নাস্তা বানাতে ব্যস্ত। দুহাতে সমানতালে কাজ করছে।
তৌসিফ শব্দ করেই বলল,
“তুমি একা কেন করছ মা? ঘরে আর কেউ নেই? বড় চাচী,ছোট চাচী,দাদী,সাথি, ফুফু এরা উঠেনাই? ঘরে যেহেতু এখন মেহমান বেশি, এরা তোমাকে হেল্প করতে পারেনা?”
সাতসকালে ছেলের কথা শুনে রাবেয়ার মেজাজ বিগড়ে গেল। পিঁড়িতে মাথা ঝুঁকিয়ে রুটি বেলতে বেলতে বলল,
“ওরেহ বাপ থাম। শুনব সবাই। তোর মানসিক সমস্যা দেখা দিছে। পাবনায় চইলা যা। সুস্থ হয়ে বাড়ি আসিস। হঠাৎ তোর এসব কথাবার্তা আমার কাছে আদিখ্যেতা ঠেকছে। বুঝলি। আমার তো কোনো সমস্যা হচ্ছে না। বাপের সব পাইলেও এইদিক দিয়া অমিল দেখতাছি তোর মাঝে।”
তৌসিফ মায়ের উপর রে* গে গেল। রুক্ষ ভাষায় বলল,
” তোমার সমস্যা হবে কেন? তোমাকে তো সেই শুরু থেকেই বোবা ও গাধা বানিয়ে রাখা হয়েছে। যেন সব সহ্য করতে পারো। হজম করতে পারো। চুপ থাকতে পারো। তাইতো সমস্যাকেও সমস্যা মনে হয়না তোমার কাছে। সেই উপলব্ধি করার সময়টুকুও তোমার কাছে অবশিষ্ট নেই ভাবার মতো। রাতদিন গাধার মতো খাটুনি ছাড়া আর কিইবা পারো তুমি? সমস্যাগুলো তো আমি দেখতেছি ধীরে ধীরে। আর বাপের স্বভাব বললে না? এমন বলদ মার্কা স্বভাব যেন আমার বা কোন মানুষেরই না হয়।”
“আমার কী সমস্যা বল তুই?”
উত্তেজিত গলায় বলল রাবেয়া।
“তোমাকে বলে লাভ নেই। যাদেরকে বললে কাজ হবে তাদের সামনেই বলব।”
“ওরে বাবা,মাফ চাই! এই বয়সে তুই আমার রিজিক কেড়ে নিসনা এই সংসার থেকে। স্বামী ছাড়া করিস না আমাকে। তুই উলটাপালটা কিছু বলিস না তোর দাদা,দাদীরে।”
করুণ গলায় আর্তি করে বলল রাবেয়া।
তৌসিফ মায়ের ভীতমুখ দেখে নির্বাক হয়ে যায়। এতটা বছর সংসার করে মা কী তাহলে ভয়! ধৈর্য! অপেক্ষা! চুপ থাকা,মানিয়ে নেওয়া,মেনে নেওয়া এসবই অর্জন করলো? এর বাইরে একজন মানুষ হিসেবে কোথায় তার মায়ের সাহস! অধিকার! প্রতিবাদ! আবদার! চাওয়া-পাওয়া? কোথায়?
তৌসিফ থমথমে পায়ে ঘরের ভিতরে যায়। চাচাতো বোন সাথির রুমে গেল। সাথি ওড়না খুঁজে নিয়ে বুকের উপর মেলে দিতে দিতে আহ্লাদী সুরে বলে উঠল,
“অনুমতি ছাড়া কোনো তরুণীর শয়ন কক্ষে এভাবে একটা যুবক ছেলে আসা উচিত নয়।”
“চাপটে পিঠের চামড়া তুলে ফেলব। ঢং! ন্যাকামো! আমার মাকে গিয়ে কাজে সাহায্য কর। এটা ধনী পরিবার নয়। আমার মা কোনো দাসী নয়। তিনি করবেন, আর আপনারা বসে বসে গিলবেন? এটা একটা মধ্যবিত্ত পরিবার। এখানে সবাই সমান। সবাই সমানভাবে কাজ করবে ভাগাভাগি করে।”
সাথী ভয়ে,লজ্জায় আড়ষ্ট ভঙ্গিতে চোখ নামিয়ে ফেলে। তৌসিফ টিশার্ট, প্যান্ট পরে নেয়। মায়ের উপর অভিমান করে নাস্তা না খেয়ে বেরিয়ে পড়ে। পাছে মা কষ্ট পাবে বলে, বলে যায়,তার একটা জরুরী কাজ আছে। নাস্তা বাইরে খেয়ে নিবে। রাবেয়া তখনো রান্নাঘরে হাতের কাজে মশগুল। বোবা অশ্রুপাতে ভেসে গেল তার দুগাল। বরাবরের মতো মাথায় বড় করে কাপড়ের আঁচল থাকার দরুন সবার অদেখাই রয়ে গেল রাবেয়ার নিরব অশ্রুপাত!
আজ ছেলের কথায় রাবেয়ার স্মৃতিতে,স্মরণে ফিরে এলো অতীত। ঠিক মৌমাছির চা * কে কেউ ঢিল ছুঁড়লে যেমন করে সেগুলো দিগবিদিক ছুটতে থাকে বিশৃঙ্খলভাবে। সতেরো বছর বয়েসী কিশোরী রাবেয়া বহুবছর পূর্বে জাহেদ নামের ভদ্র,অমায়িক,মহৎ মনের একজন সুপুরুষের বউ হয়ে এসেছিল এই ঘরে। তখন এদের ঘরে বিদুৎ ছিল না। গ্রামে অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারেই বিদুৎ ছিল না।
বাড়িতে বিয়ে। ঘরে নতুন বউ। রয়েছে অতিথির সমাগম। তাই সারাঘরে জ্বলেছিলি বেশকিছু কূপি ও হারিকেন। রাবেয়ার কিশোরী হৃদয় দুলে উঠেছিলো নবসুখে। পুলক অনুভব করেছে সে ক্ষণে ক্ষণে! এতগুলো পিদিম এক সঙ্গে জ্বলতে সে আর কোনদিন দেখেনি। সখীদের কাছে শুনেছে সিনেমায় না-কি এমন দৃশ্য দেখা যায়। লাল শাড়ির ঘোমটার ভিতর হতে সারাঘরের সেই আলো আঁধারি পরিবেশের দিকে রাবেয়া সম্মোহনী চোখে চেয়েছিলো বারকয়েক পলক তুলে তুলে।
অথচ সেই পিদিম জ্বলা রাতে রাবেয়া ফুলসজ্জা পায়নি। ঘরে রুম সংকট, এই কারণ দেখিয়ে বাসর ঘর প্রস্তুত হয়নি তারজন্য। স্বামী বা কারো আদর সোহাগ পায়নি। জাহেদ ঘুমিয়েছিল অন্যত্র। তাই কোনো মধুর অভিজ্ঞতারও মুখোমুখি হয়নি সে। বরং সংসারের বড় বউ হিসেবে তার দায়িত্ব বেশি। শ্বশুর মশাই তাকে সেই কীর্তন শুনিয়েছিল বেশ রসিয়ে রসিয়ে। সতেরো বছরের বয়সটাতে যেন ভারিক্কিভাব এনে পঁচিশ বছরের পরিপূর্ণ সংসারী নারী ভাবা হয়,এই ছবক দিতেও ভুল করেনি শাশুড়ী। বোনাস হিসেবে শুনেছিলি ভয়ের বাণী! নয়তো তার ঘর ও জীবন ভেসে যাবে বানে। রাবেয়ার কিশোরী মনে সেই ভয়ের ছাপ দারুণভাবে লেগে গিয়েছে। তা টের পেয়ে গোপনে উল্লসিত হলো শাশুড়ী মর্জিনা।
“ভাবি চা হইছে?”
খুকীর চঞ্চল গলায় রাবেয়া সংবিৎ ফিরে পায়। কল্পনার ইতি ঘটে সেখানেই।
তৌসিফ সেই ট্যাবলেটের পাতাটি হাতে নিয়ে সব ফার্মেসীকে দেখাল। বড় বাজার,সদর,উপশহর সব স্থানে সি.এন.জি করে ছুটল। প্রতিটি হাসপাতালে গেল। জানতে পারল কারো কাছে বা কোথাও এই ট্যাবলেট নেই। এসব ছুটাছুটি করতেই সারাদিন লেগে গেল তার।
সন্ধ্যার পরে এক সরকারি হাসপাতালে গিয়ে সে জানতে পারল,
বাংলাদেশে এই ট্যাবলেট নিষিদ্ধ হয়েছে দুই হাজার দশ সাল হতেই। তবে ভারতের কিছু কিছু হাসপাতালে এখনো আছে। প্রয়োজন হতে পারে এই ধারণা থেকেই ডাক্তাররা কিছু মজুদ রেখেছে। তৌসিফ বুঝতে পারল, তার মানে এই ট্যাবলেট তাদের ঘরে ইন্ডিয়া হতে এসেছে। কিন্তু ইন্ডিয়া কে গেল? কবে গেল। ছোট চাচার রুমে পেল ট্যাবলেট। তার মানে ছোট চাচা ইণ্ডিয়া গিয়েছে? কই কোনদিনও তো এমন কিছু সে শুনেনাই। সাধারণ একজন কারখানা ব্যবসায়ীর ইন্ডিয়া কী কাজ?
তৌসিফ দিকভ্রান্ত নাবিকের মতো বিক্ষিপ্ত পায়ে বাড়ি ফিরে। তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত। তৌসিফের মাথায় আসে কলেজ পড়ুয়া সাথীর কথা। সাথী তার প্রতি দুর্বল। এই সুযোগটাই কাজে লাগাতে হবে। সাথীর সাথে তার সদয় আচরণ করতে হবে।
তৌসিফ স্বাভাবিক থাকে। কোনো রা* গ ক্ষো*ভ প্রকাশ করল না। মায়ের সাথেও না।
চলবে…
Share On:
TAGS: পিদিম জ্বলা রাতে, রেহানা পুতুল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৭
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৯
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৪
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৬
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৬
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৪
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১০
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১২
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৮
-
পিদিম জ্বলা রাতে গল্পের লিংক