দিওতোমারমালাখানি – ৩
তৌহিদ অফিস থেকে ফিরে মায়ের জেরার মুখে পড়ল। তাহমিনা বেশ সুর করে বললেন,
–রোশনির বাবা আর অপেক্ষা করতে চাচ্ছে না কিন্তু!
তৌহিদের ভুরু কুঁচকে গেল। কৌতুহলী হয়ে বলল,
–অপেক্ষা করতে চাইছে না, মানে কী? তার মেয়ের বয়স কত?
–বয়স যাই হোক, সে যদি মেয়ে না রাখতে চায়, আমাদের কী করার আছে? আমাদের তো এগোনো উচিত। দিন-তারিখ নিয়ে বসা উচিত।
দুই পরিবারেই বিয়ের কথা জোরেশোরে চলছে। কথা হচ্ছে। উপহার আদান-প্রদান হচ্ছে। এর ভেতর মেয়ে রাখবে না, এই কথার অর্থ তৌহিদ বুঝতে পারল না। তাকিয়ে থাকল। তাহমিনা বললেন,
–বিয়ের আসর থেকে কত বিয়ে ভেঙে যায়! বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত মেয়ের লোকেরা ভয়ে ভয়ে থাকে সবসময়। কথা হয়ে বিয়ে না গড়ালে বদনাম তো মেয়েরই। আর তাদের মেয়ে তো ওই একটাই। রোশনির তো আর ভাই বোন নেই। এক মেয়ে। এক মেয়ে জামাই! আমি এই মাসেই দিন দিতে চাই।
তৌহিদ একটু ইতস্তত করল,
–মা, মেয়েটা অনেক ছোটো। বিয়ের বয়সও হয়নি। পরে দেখা যাবে, এডযাস্টমেন্টে সমস্যা হচ্ছে।
তাহমিনা হাসলেন,
–ওসব কোনো কথা না। মায়ের একটা কথা শুনে রাখ, বুড়ো হাড় জোড়া লাগে না। বয়স হয়ে গেলে শেকড় বসে না। সেই বাপের বাড়ির টানই যদি থেকে যায় শশুরবাড়ির লোককে আর আপন করতে পারে না। স্বামী শাশুড়ি পরই থেকে যায়। শুধু কী নেবে, কী বাপের বাড়ি দেবে সেই ধান্ধা থাকে। আর কম বয়স হলে সুবিধা হলো, এদের এখনো চোখ ফোটেনি। দুনিয়াদারি বোঝে না। চালাক-চতুর না। শিখিয়ে পড়িয়ে নিজের মতো করে গড়ে-পিটে নেওয়া যায়। স্বামিকে মানে-গোণে, কথা শোনে। সেইম এজের ফ্যাশন চলে এখন। সেসব সংসার টেকে? একটাও টেকে না।
তাহমিনা মুখ ভেংচালেন,
–স্বামী হয় বন্ধু! হুহ! মান দেওয়া না, কিছু না। তা থাক না, বন্ধুই থাক। মানা করছে কে? আজ তো বুঝবি না, বুঝবি পরে। মা যে ভালো চায়, ভালোর জন্যই পেটের ছেলের শত্রু হয়, সেসব বুঝবি ঠিকই।
তৌহিদ আর কথা বাড়াল না। তাহমিনার সব কথাই রুচিকে উদ্দেশ্য করে বলা। তৌহিদকে বিদ্ধ করে কথাগুলো। কাঁটার মতো। সহ্যও হয় না, উগড়েও দেওয়া যায় না। রুচির নামের মতোই মেয়েটা। রুচিশীল, ভদ্র, বিনীত। কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তা ওর সাথে যায়ই না। মায়ের সাথে তর্ক করা মানে এসব কথা আরও বাড়বে। প্রতি কথাতেই কথা বাড়বে। রুচির নামে আরও কতকগুলো কুৎসা গিলতে হবে। তার চাইতে এই ভালো – চুপচাপ মেনে নেওয়া। মাকে তো আর বাদ দেওয়া যায় না। মাকে কষ্টও দেওয়া যায় না। খুব অল্পবয়সে বিধবা হয়ে, দুই সন্তান নিয়ে অকূল পাথারে পড়েছিলেন তাহমিনা। তখন নানা জায়গা থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসতো, ছোটো বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন তিনি। না খেয়ে বাচ্চাদের খাইয়েছেন। উন্নত পড়াশোনা করিয়ে যোগ্য বানিয়েছেন। এখন বিনিময় দেওয়ার পালা সন্তানদের। ছোটোভাই তৌফিক প্রেম করে বিয়ে করে বউ নিয়ে আলাদা থাকে। তৌহিদের চাকরি ছিল না বলে বিয়ে করতে পারছিল না। ওর জন্য ছোটোজনের বিয়েও আটকে ছিল। ওদিকে প্রেমিকা বিয়ের জন্য তাড়া দিচ্ছিল। উপায়ান্তর না দেখে ও মায়ের অমতেই বিয়ে করে ফেলেছে। তাহমিনা পুত্র আর পুত্রবধূকে ঘরে উঠতে দেননি।
তৌহিদও যদি একই কাজ করে, তবে তাহমিনা বাঁচবেন কীভাবে?
তৌহিদের মন দ্বিধায় ভাগ হয়ে আছে। একদিকে রুচি, প্রথম প্রেম। অন্যদিকে রোশনি। মায়ের পছন্দ। পেন্ডুলামটা একবার এদিকে ভারী হয়, আরেকবার অন্যদিকে গিয়ে থিতু হয়!
রুচি ভীষণ একা হয়ে যাবে। দু:খ পাবে। ইনিয়েবিনিয়ে অনেকরকম করে বলবার চেষ্টা করেও রোশনির কথাটা ওকে বলে উঠতে পারেনি তৌহিদ। তবে রুচি হয়তো আঁচ করে ফেলেছে। অত্যন্ত বুদ্ধিমতি মেয়ে। আত্মসম্মানবোধ প্রখর। নিজেই দূরত্ব তৈরি করে ফেলেছে। সপ্তাহে দুই তিন দিন তো ওরা একসাথে সময় কাটাতোই। প্রায়ই রুচির অফিস থেকে ফেরার সময় তৌহিদ সঙ্গী হতো! তৌহিদের খেয়াল হলো, অনেকদিন রুচির সাথে কথা হচ্ছে না। তৌহিদও কল দেবে দেবে করে দেওয়া হয়নি। সম্পর্কের শুরু থেকে এরকমটা কখনো হয়নি। মান-অভিমান তো কম হয়নি। ঝগড়া হয়েছে, দুয়েকদিন কথা বন্ধ থেকেছে। আবার কেউ একজন মিলমিশ করে নিয়েছে। তবে, তৌহিদ যে ব্যস্ত নতুন চাকরিতে সেটা রুচি বোঝে। তৌহিদকে তৌহিদের চাইতেও ভালো বোঝে। সেই রুচিকে হারাতে হবে এই কথাটা মনে হলেই বুকের ভেতর চিনচিন করে ওঠে। দুলতে থাকা মনের পেন্ডুলাম রুচির দিকে ঝুঁকে আসে।
ও মোবাইল বের করে রুচিকে কল দিলো। ফোনে রিং বেজে গেল। ধরল না। ফেসবুকেও রুচিকে পাওয়া গেল না। আইডিই নেই। অদ্ভুত। এইজন্যই কয়েকদিন নিউজ ফিডে রুচির কোনো আপডেট নেই। ব্লক করে দিলো নাকি? তৌহিদের হার্টবিট মিস হলো। বুকের কোনো এক জায়গায় হাহাকার পড়ে গেল!
তড়িঘড়ি রুচির বোন রুলিকে কল দেওয়ার জন্য ফোনবুকে নাম খুঁজতে গেলে রোশনির কল এলো। অনুযোগ দিয়ে কথা শুরু করল মেয়েটা,
–আপনাকে আমিই সবদিন কল দিই। আপনি কেন দেন না?
–একজন দিলেই তো হলো। কিছু বলবে?
তৌহিদের কথার সুরে রোশনি আহতবোধ করল। অভিমান করে বলল,
–বিরক্ত হলেন? আপনি উপহার পাঠিয়েছেন যে, পেয়েছি সেটা। এটা বলার জন্যই ফোন করেছিলাম। আর কিছু না। রাখি।
–রেখো না, রেখো না! আরে আরে রাগ করলে নাকি? আমি ওভাবে বলিনি। আমি আসলে…
বন্ধুরা প্রায়ই ঠাট্টা করে বলে, রুচির সাথে শুধু বেডশেয়ার করা হয়নি। তাছাড়া স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যেমন সম্পর্কে থাকে, তার সবটাই রুচি আর তৌহিদ। অনেকদিনের সম্পর্কের পরে রুচির সাথে অভ্যস্ত কথা ছাড়া আর কিছু বলার থাকে না। নিত্যদিনের প্রয়োজন আর যাপিত জীবনের বারোভাজা প্যাচাল। কিন্তু রোশনি এক টুকরো চঞ্চল হাওয়া। বেশ লাগে টুকটাক কথা বলতে। একঘেয়ে হয়ে যাওয়া পুরোনো প্রেমের পরে বেশ নতুন ধরনের একটা অভিজ্ঞতা। অগোছালো আর বোকা বোকা কথাবার্তা। কিছুটা ন্যাকামো। হাবিজাবি। চটুল আবেগে নিখোঁজ উপাখ্যান। আর ফোনের ওইপাশে আদুরে কণ্ঠটা শুনতে ভারী ভালো লাগে। ক্লান্তি মুছে যায় নিমেষেই। অভিমানী ঠোঁটে আদর করে মান ভাঙাতে ইচ্ছে করে। সেই আদর খানিকটা গলায় এনে বলল,
–তোমার প্রিয় চকলেট পাঠিয়েছি। এরপরেও কি রাগ করবে? আমি আসলে তোমাদের জেনারেশনকে ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। কীসে রাগ করো, কীসে খুশি হও! আমাকে একটু শিখিয়ে দিতে তো পারো!
রোশনি খিলখিল করে হাসলো,
–কিছু না। শুধু আমার সব কথা শুনতে হবে। এক্ষুনি প্রমিজ করেন, যা বলব সব শুনবেন ?
–শুনব তো! প্রমিজ! কিন্তু তুমি তো শুনলে না।
–কোনটা শুনিনি, হ্যাঁ? এই যে বিয়ের আগে আপনার সাথে কথা বলা একেবারেই মানা, তবুও চুপিচুপি ফোন করি না? সারাদিন মিসড কল দিই। মেসেজ দিই। স্ন্যাপ পাঠাই।
–হুম। তুমি তো লক্ষি মেয়ে। কিন্তু আপনি করে বলছ যে এখনো! এটা তো শুনলে না।
রোশনি লজ্জা পায়। লাজুকলতা হয়ে বলে,
–তুমি করে বলব তো! যেদিন বিয়ে হবে, সেদিন থেকে!
–এখন বলো, শুনতে ইচ্ছে করছে।
রোশনি মুখচাপা দিয়ে হাসে। দুষ্টুমি করে বলে,
–কত বড়ো আপনি! আমার একটা ভাবি আছে। চাচতো ভাইয়ের বউ। খুব দুষ্টুমি করে। জানেন, কী বলে?
–কী?
–বলে, তোর বর তো বুড়ো রে রোশনি! ইয়ার্কি করে বলে, আমি জানি। আমাকে খোঁচায়। কিন্তু আমার রাগ লাগে শুনতে। আমিও বলে দিয়েছি, বুড়ো বরই ভালো। বউকে বেশি ভালোবাসবে। তাই না, বলেন?
তৌহিদের দ্বিধাটুকু কেটে যেতে থাকে। দুলদুল দুলে দুলে দুলুনিটা রোশনিতে এসে স্থির হয়। মনের আয়নায় রুচি মুছে যেতে থাকে। বিহ্বল হয় ও। ফিসফিস করে বলে,
–তাহলে তুমি করে বলো?
তৌহিদের ভাবাবেগে রোশনিও আপ্লুত হয়। জড়ানো গলায় রিনরিন করে বলে,
–আমার লজ্জা করে। মুখে আসে না তো! চেষ্টা করি, হয় না!
–এমন করলে কিন্তু কঠিন শাস্তি পাবে!
শাস্তির কথা শুনে রোশনি একটুও ভয় পেলো না। হাসিতে ভরিয়ে জানতে চাইল,
–কী শাস্তি?
তৌহিদ কথায় অপটু। কিন্তু সাহস বাড়ে। কিংবা দু:সাহসী হতে ভারী ভালো লাগে। ওর সংকোচ হঠাৎ করেই লাগামহীন হয়ে যায়। ঠোঁটের জড়তা কাটিয়ে বলে ওঠে,
–বুকের মধ্যে চেপে ধরে রেখে দেবো! এত শক্ত করে রাখব, শত চেষ্টাতেও দূরে যেতে পারবে না।
রোশনির কান লাল হয়ে গেল। ঠোঁট উলটে বলল,
–ইস, আপনি কেমন নির্লজ্জ! যান, আর কথা বলব না আমি।
–না বলে দেখো!
–কী করবেন?
–তুলে নিয়ে আসব না? যত অবাধ্য হবে তত তাড়াতাড়ি আমার ঘরে নিয়ে আসব। বাসায় ডেট ফিক্সড হচ্ছে জানো?
এলোমেলো কথোপকথন দীর্ঘ হতে লাগল। রুলিকে কল দিয়ে রুচির সংবাদ নেওয়ার ইচ্ছেটা চাপা পড়ে গেল। রুচির কথা বেমালুম ভুলে গেল তৌহিদ।
চলবে…
আফসানা আশা
Share On:
TAGS: আফসানা আশা, দিও তোমার মালাখানি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ১
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৭
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৬
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৮
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৫
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ২
-
দিও তোমার মালাখানি গল্পের লিংক
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৮ (খ)
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৪