কাজরী-৩
“কাজরীকে সামনাসামনি দেখে ভরকে গেলে কেন? তুমি ওর ছবি দেখো নি?”
ইশান চটজলদি মুখের অভিব্যক্তি পরিবর্তন করে ফেলল। হেসে নিশানের উদ্দেশ্যে বলল,
“একচুয়েলি আখতারউজ্জামান এর মেয়েকে এমন চোখ ধাধানো সুন্দরী ভাবিনি। ব্র্যান্ডেড মেকাপ প্রোডাক্ট ব্যাবহারে সৌন্দর্য্য প্রকাশের ধারে কাছে না গিয়েও এতো সুন্দরী! হজম করতে তো একটু সময় লাগছিলো, কিন্তু তারপর মনে পড়লো আরে ইশান চৌধুরীর বউ কে তো এমন ই হতে হবে। “
নিশান ধাক্কা খেল। ইশানের সঙ্গে তর্কে গেল না।
টমাসের বার্থডে পার্টিতে কাজরীকে প্রথম দেখেছিল ইশান। সেই দেখা হওয়ার ঘটনা সুখকর নয়। ইশান হাসলো, ঘুরেফিরে কাজরী ওর মুখোমুখি হলো না শুধু জীবনের সঙ্গে জড়িয়েও গেল। ইশান চৌধুরীর মুখে রেড ওয়াইন ছুড়ে মেরে অপমান করার শোধ নেবার প্রচুর সুযোগ পাওয়া যাবে এখন।
“কাজরী…!
কাজরী চমকে উঠলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো। বাবার গলা শুনে সেখান থেকে সরে এলো।
“বেয়াই সাহেব তোমাকে নিয়ে যেতে চাইছেন। “
“আচ্ছা।”
আচ্ছা শব্দটা প্রশ্নসূচক নাকি বিস্ময়সূচক সেটা স্পষ্ট বোঝা গেল না।
“তুমি তৈরী হয়ে নাও। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে ওনারা বের হবেন।”
আখতারউজ্জামান দ্রুত প্রস্থান করলেন। তিনি কাজরীর সামনে বেশীক্ষন থাকতে চান না।
কাজরী বিছানার উপরে ছড়ানো জিনিসপত্র দেখতে লাগলো। এতো এতো জুয়েলারি এনেছে! নিশ্চয়ই নিজেদের বিত্তবান প্রমানের চেষ্টা ছিলো।
ইশান কোনো উচ্চবাচ্য করে নি। রেজিস্ট্রি পেপারে সাইন করেছে সুন্দরমতো। তবে একবারও কাজরীর দিক থেকে চোখ সরায় নি। কাজরী অনামিকার আংটি টা দেখলো। মেহেদী পরা হাতের আঙুলে আংটি টা বেশ ভালো মানিয়েছে বটে।
কাজরী নিজেই সাজলো। সাজার জন্য লোক আনা হলেও কাজরী তাদের কাছে সাজলো না। ও বাড়ি থেকে বেরোনোর সাথে সাথেই এটা নিয়ে চারদিকে কথা উঠবে। ওর সামনে কারোর কিছু বলার সাহস নেই। আল্পনা দরজা বন্ধ করে আছে নিজের ঘরে। নিশ্চয়ই ওর খারাপ লাগছে। কাজরী ওর মাথার মধ্যে যে গল্পটা ঢুকিয়ে দিয়েছে সেটা ভেবে অস্থির হচ্ছে হয়তো। কানে ডায়মন্ডের দুল পরার সময় কাজরী ভাবলো আল্পনার জায়গায় যদি ও থাকতো তবে ওরও কী এখন এরকম খারাপ লাগতো! মনে হয় না, কাজরী শক্ত ধাচের। এমন শক্ত ধাচের করেই ও’কে তৈরী করা হয়েছে।
সোনালী পাড়ের লাল রঙের বেনারশী শাড়িতে সেজে কাজরী শ্বশুর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো। বিদায়ের আয়োজনে কোনো আড়ম্বর নেই। এ যেন বাড়ির মেয়ে কদিনের জন্য কোথাও বেড়াতে যাচ্ছে। কাজরী বাবাকে বলল,
“আপনার লাইসেন্স করা বন্দুক টা সাথে দিলে ভালো হতো না? যুদ্ধক্ষেত্রে যাচ্ছি অথচ অস্র ছাড়া! আমাকে আবার কেউ দূর্বল না ভেবে বসে। “
আখতারউজ্জামান মেয়ের মাথায় হাত রাখতে গিয়ে টের পেলেন তার হাত কাঁপছে। তিনি বললেন,
“তুমি দূর্বল নও। জলন্ত আগুনের শিখা তুমি। তোমার মধ্যে যে আগুন আছে সেটাই তোমার শক্তি। “
কাজরী স্মিত হাসলো। বাবা আবারও বললেন,
“আল্পনার সঙ্গে দেখা করে যাও একবার। “
কাজরী আল্পনার ঘরের দিকে গেল। দরজায় মৃদু ধাক্কা দিতেই আল্পনা দরজা খুলল। কাজরী হাতে রাখা গয়নার বাক্স টা আল্পনাকে দিয়ে বলল,
“এগুলো আসলে আমার না, তোমার।”
আল্পনা তাকিয়ে রইলো কাজরীর দিকে। ও’কে উদভ্রান্তের মতো লাগছে
“আমার এসব লাগবে না। “
“অলংকার শুধু স্মৃতি নয় আল্পনা। স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মায়া, স্নেহ আন্তরিকতা। তিনি আমাকে কখনোই পছন্দ করতেন না। সবসময়ই বলতেন আল্পনা তার মেয়ে। তার রেখে যাওয়া স্মৃতি দিয়ে আমি কী করব! “
আল্পনার চোখ ভিজে উঠলো। কাজরী বলল,
“আমি আসি। “
আল্পনা সিড়ির কাছাকাছি আসলো কাজরীর পিছনে পিছনে। বলল,
“একটু শোনো কাজরী। তুমি যে গল্পটা বলেছ সেটা কার গল্প? ওটা কী সত্যি? ওই ঘটনার সঙ্গে কী তোমার বিয়ের যোগসূত্র আছে? ” “
কাজরী দাঁড়ালো। আল্পনার চোখে চোখ রেখে বলল,
“তুমি আমার জন্য একদিন অনেক বড় ত্যাগ করেছিলে। আমি সেটা কখনো ভুলব না। যদি কখনো তোমার কোনো বিপদ হয় তাহলে নির্দ্বিধায় আমাকে ডেকো। হতে পারে আমরা কথা বলছি না, কিংবা তোমার থেকে অনেক দূরে আছি। তবুও আমি তোমার জন্য ছুটে আসব। “
আল্পনা আর কিছুই বলল না। কাজরীর পদক্ষেপ গুলো অপলক দেখলো শুধু।
গাড়িতে কাজরীর পাশে ইশান বসেছে। দুজনের চোখাচোখি হতেই ইশান হাসলো। বিনিময়ে কাজরীকেও হাসতে হলো। এখনো পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কথাবার্তা দুজনের হয় নি, কারোরই আগ্রহ ছিলো না। তবে এখন ইশান অপেক্ষা করছে কাজরীর সঙ্গে একা কথা বলার। ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে আছে নিশান। সতর্কতার সাথে লক্ষ্য করছে ইশান ও কাজরীকে। কিছু একটা ঝামেলার আভাস পাচ্ছে। ইশান কে এতো ঠান্ডা, বাধ্য মেজাজে দেখেই মূলত ভয়টা হচ্ছে।
ইশানের হাতে অপশন খুব একটা ছিলো না। কাজরীকে বিয়ে না করলে চৌধুরী গ্রুপের একচ্ছত্র আধিপত্য পাওয়ার সম্ভাবনা ছিলো না। আশ্চর্য হয়েছিল তখন যখন ওয়াজেদ চৌধুরী ওর প্রস্তাব মেনে নিয়েছিল। ইশান হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর ছিলো যে বাবা ওর অদ্ভুত শর্ত মেনে নিবে না। ছোট থেকেই ও দেখে এসেছে বাবা কিভাবে নিশান কে তার মতো করে গড়ে নিয়েছেন। ইশানের বেপরোয়া স্বভাব, লাইফস্টাইল নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই। কখনো ইশান কে বলেও নি যে অফিসে বসো, বিজনেস দেখো, ক্যারিয়ারে ফোকাস করো। কিংবা পলিটিক্সে আগ্রহ থাকলে আমার সাথে থাকো। কিছু বলে নি। ইশান কে সে মুক্ত পাখির মতো ছেড়ে দিয়েছে। ইশানের সমস্ত কন্ট্রোভার্শিয়াল দিকগুলো নিজে সামলেছে। ও নিজেও ইচ্ছে করে এমন সব কর্মকাণ্ড করেছে যেন বাবা বুঝতে পারেন ও’কে অযোগ্য ভাবার কারণে সবকিছু হচ্ছে। কিন্তু তিনি কখনো ইশানকে সরাসরি কিছু বলেন নি, এমনকি কাঠগড়ায় তুলে প্রশ্নও করে নি কেন ইশান এমন আচরণ করছে। ব্যাংকে প্রতি মাসে মোটা টাকা ঢুকে যায়, তারপরও ইশান যদি বাড়তি চাইতো তিনি বারণ করতেন না। ইশান খুব সহজে খেলাটা ধরে ফেলেছিল। ইশান বেপরোয়া বেহিসেবী হলে নিশান কে যোগ্য প্রমাণ করা সহজ হবে। এইসব বিষয় ভেবে ইশানের মনে বাবার সম্পর্কে শ্রদ্ধা, সম্মানের পরিবর্তে ঘৃনা জন্মেছে। আর মা! তিনিও কম যান না। মায়েদের সব সন্তান দের প্রতি সমান মমতা থাকা উচিত হলেও শিরিনের স্পষ্ট স্নেহ কেবল নিশানের জন্যই ছিলো। তিনি দুই ভাইয়ের মধ্যে তুলনা করে ইশানের আত্মবিশ্বাস ভেঙে গুড়োগুড়ো করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
কাজরীকে নিয়ে বিশেষ চিন্তা ওর মাথায় নেই। সিঙ্গাপুরের ঘটনাটা হয়তো বড় কিছু নয়, তবে শত্রু শত্রু খেলা ভালোই চলবে।
ইশান চকিতে পাশে ফিরে তাকালো। কাজরী ওর দিকেই তাকিয়ে আছে, জিজ্ঞাসু চোখে। কাজরী জিজ্ঞেস করলো,
“আমাদের পৌছুতে কতক্ষণ লাগবে? “
সম্ভবত একই প্রশ্ন আরও একবার করেছিল কাজরী। ইশান নিজের মধ্যে এতোটা ব্যস্ত ছিলো যে খেয়াল করে নি। ইশান জবাব দেবার আগেই নিশান বলল,
“আরও এক ঘন্টার মতো। তোমার কিছু লাগবে? “
কাজরীর দৃষ্টি ইশানেই আবদ্ধ। তবে নিশান কে বলল,
“না কিছু লাগবে না। “
ইশান শক্ত চোখে নিশানের দিকে তাকালো। নিশান দেখতে পেল না ভাইয়ের দৃষ্টি। ইশানের মনে হলো এখানে নিশান নিজেকে জেন্টলম্যান প্রমাণের চেষ্টা করছে।
বধূবরণ এর আয়োজন বেশ আড়ম্বরপূর্ণ। চারদিকে আলো, রোশনাই ফুলের সমারোহ। শিরিন প্যালেসের বাইরে এসে দাঁড়িয়েছেন। ইশান চৌধুরী গাড়ি থেকে নেমে গাড়ির গেট খুলে হাত বাড়িয়ে সুইট জেশ্চার দেবার চেষ্টা করল। কাজরী ইশানের বাড়িয়ে রাখা হাত টা’কে প্রত্যাখ্যান করলো না। শিরিন দৃশ্যটা দেখলেন। ইশানের নাটকীয় ব্যাপার টা হজম করতে তার একটু কষ্টই হলো।
ছবিতে সাধারণত যেমন দেখায় বাস্তবে তার চেয়ে কম সুন্দর লাগে। কাজরীকে ছবির মতো সুন্দর ই লাগছে। চেহারায় ধার আছে একটা। মাথাভর্তি সিল্কি চুলগুলো পিঠময় ছড়ানো। চলাফেরায় রাজকীয় ভাব আছে, নেই কোনো আড়ষ্টতা। তবে একটা দৃষ্টিকটু ব্যাপার শিরিনের ভালো লাগে নি। কাজরী তার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে নি। তিনি ভেবেছিলেন কাজরী হয়তো নরম ফুলের মতো হবেন। শ্বশুরালয়ে ঢোকার সময়ে ঘোমটায় মুখ ঢাকা থাকবে। এতোটা আধুনিকতা আশা করেন নি।
মন্যুজান খাতুনের কাছে নিয়ে যাবার সময় শিরিন খানিকটা আদেশের সুরে বললেন,
“দাদীশাশুরির পায়ে হাত দিয়ে সালাম কোরো।”
কাজরী সেই কথার জবাবে বলল,
“আমি এই ব্যাপার টা পছন্দ করি না। তবে আপনাদের বাড়ির রিচুয়াল হলে নিশ্চয়ই ফলো করব। “
শিরিনের এই ব্যাপারও পছন্দ হলো না। বুঝতে পারলেন যে এই মেয়েকে তিনি জোর করে হলেও পছন্দ করতে পারবেন না।
মন্যুজান খাতুন নাতবউয়ের মুখ দেখে বিস্মিত হলেন। তার মুখাবয়ব পাল্টে যাওয়া কারোরই চোখ এড়ালো না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
“এই মেয়ে কে? কে এই মেয়ে?”
শিরিন দ্বিধাগ্রস্ত চোখে একবার কাজরীকে দেখলেন একবার শাশুড়ীকে দেখলেন। বলল,
“আখতারউজ্জামান এর মেয়ে কাজরী। এখন আপনার নাতবউ। “
“না, না না। ও কোমল… ও কোমল। “
এরপর মন্যুজান খাতুন জ্ঞান হারালেন।
আকস্মিক ঘটনায় কাজরী হতভম্ব হয়ে গেল। মন্যুজান খাতুন কে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো সবাই। শিরিন একবার কাজরী কে কঠিন দৃষ্টিতে দেখলেন। সেই দৃষ্টির অর্থ করলে দাঁড়ায়, তোমার জন্য সব হয়েছে। তবে কিছুক্ষনের মধ্যেই পরিস্থিতি অনুকুলে এলো। কাজরী বসে ছিলো এশনার ঘরে। এশনা এক গ্লাস অরেঞ্জ জুস দিয়ে গিয়েছিল ও’কে। যেটা ও ছুঁয়েও দেখে নি। কিছুক্ষনের মধ্যে ইশানের খালামনি এলেন। তিনি যশোরে গিয়েছিলেন মামাশ্বশুর এর মিলাদে। ইশানের বিয়েতে যেতে না পারার দু:খ প্রকাশ করলেন। কাজরীর সঙ্গে তিনি আন্তরিকতার সুরে কথা বললেন। কাজরী সুযোগ পেয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলেন,
“কোমল কে?”
“কোমল তো এই বাড়ির সার্ভেন্ট ছিলো। খালাম্মার মহব্বতের লোক ছিলো। “
কাজরীর উত্তর টা মন:পুত হলো না। তবে ও খেয়াল করলো ভদ্রমহিলা জবাব দেবার সময় ভনিতা করেন নি এবং খুব ই স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে সময় না নিয়ে জবাব দিয়েছেন। কাজরী আবারও জিজ্ঞেস করলো,
“কোমল কে উনি ভয় পান কেন?”
এবার ওনার মুখের রঙ পাল্টে গেল। বলল,
“তুমি নতুন এখন। পরে শুনবা এসব। বুবু বলবে সব। “
কাজরী খানিকটা বিরক্ত প্রকাশ করে বলল,
“একটা অস্বস্তিকর ঘটনা ঘটে গেছে। ব্যাপার টা না জানা পর্যন্ত শান্তি পাচ্ছি না। “
ভদ্রমহিলা এবার মুখ খুললেন। উনি আসলে গল্পটা বলার জন্য উন্মুখ ছিলেন। ওনার কথার ধাচে টের পাওয়া গেল যে ইশানের দাদীকে একদম পছন্দ করেন না। ইশানের দাদী বদমেজাজী, অহংকারী মহিলা। নিজের বংশ খানদান নিয়ে খুব অহংকার তার। কোমল ওনার খাস লোক ছিলো। একদিন ওনার কথার অবাধ্য হবার কারণে উনি কোমলের মুখে গরম পানি ছুড়ে মেরেছিলেন। কোমলের এক চোখ তাতে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এরপরও কোমল এই বাড়িতে ছিলো তবে ওনার হয়ে কাজ করতেন না। একদিন সুযোগ পেয়ে কোমল রাতে ওনার ঘরে গিয়ে গলায় ছুড়ি ধরেছিলেন। বৃদ্ধা নিজেকে বাঁচাতে পারলেও হাতে আঘাত পেয়েছিলেন। সেই থেকে উনি কোমল কে ভয় পান।
কাজরী গল্পটা বিশ্বাস করলো। তবে অস্বস্তি বাড়তে লাগলো। এই ধরনের ঝামেলা হয়তো প্রায় ই হবে। এবং এটা নিয়ে যথেষ্ট রসিকতাও চলবে।
বাড়িতে অনেক মানুষজন দেখা যাচ্ছে। এদের মধ্যে কে সার্ভেন্ট আর কে আত্মীয় বোঝা যাচ্ছে না। নিশান, এশনা, শাশুড়ী এদের ছাড়া পরিচয় হলো খালা শাশুড়ীর সঙ্গে উনি এখানেই থাকেন স্বামী সহ। ওনার স্বামী ইশানদের বিজনেসের কোনো একটা অংশ দেখেন। ওনার ছেলে আর তার বউয়ের সঙ্গেও আলাপ করানো হলো। বউটার নাম তানিশা। তানিশার আচরণে মনে হলো ও এই বাড়ির বিশেষ কিছু। কাজরীকে কেমন তাচ্ছিল্যের চোখে দেখছিল।
ওয়াজেদ চৌধুরী কাজরীর সঙ্গে দেখা করতে এলেন। ঘরের সবাই তটস্থ হয়ে যে যার মতো বেরিয়ে গেল। কাউকে কিছু বলার দরকার হলো না। ওয়াজেদ চৌধুরী কাজরীকে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“তুমি ঠিক আছ?”
কাজরী মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। তিনি বললেন,
“আম্মা বুড়ো মানুষ। উনি কথাবার্তা হিসেব করে বলেন না। ওনার কথা মনে নেয়ার দরকার নেই। “
কাজরী মাথা নাড়লো। ওয়াজেদ চৌধুরীর সচরাচর কারোর প্রতি মায়া অনুভব হয় না। রাজনীতির মঞ্চে ইমোশন শেষ হয়ে যায়। ওনার ব্যাপার টা ব্যতিক্রম নয়। এই মুহুর্তে কাজরীর ছোট হওয়া মুখ দেখে তার মায়া হলো। তিনি ওর হাত ধরে বললেন,
“আসো আমার সঙ্গে। “
ত্বরিতা খবর টা পেল মিডিয়ার মাধ্যমে। ওর হাত, পা কাঁপছিল রীতিমতো। ফোন হাতে নিয়ে বসে ছিলো খানিকক্ষণ। ইশান কে কল করার সাহসও হয় নি ওর। সাহস সঞ্চার করে যখন ইশান কে কল করলো তখন কল টা রিসিভ হলো না। ত্বরিতা খুব ভেঙে পড়েছে। বেশ কিছু দিন ধরে ওর সন্দেহ হচ্ছিলো ইশান ও’কে ছেড়ে যাবে। সেই সন্দেহ সত্যি হলো, কিন্তু এভাবে সব দরজা বন্ধ হয়ে যাবে সেটা ভাবে নি। তবুও আরেকটা চেষ্টা ও করবে। ইশানের সঙ্গে ও কথা বলবে। সেদিন পার্টিতে বলেছিল বাবা ওর সঙ্গে কথা বলতে চায়। সেই ব্যাপার টা নিয়ে খুব আপসেটও ছিলো। হতে পারে ওর বাবাই জোর করে বিয়ে দিয়েছেন।
মন্যুজান খাতুন এবার কাজরীকে ভালো করে দেখে বললেন,
“না ও কোমল না। কোমলের মতো দেখতেও লাগে না। “
কাজরী হাসার চেষ্টা করলো। ঘরে শ্বশুর শাশুড়ী আর এশনা উপস্থিত আছে। তিনি কাজরীকে হাত ধরে বসিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“আখতার এর বড় মাইয়া তুমি? “
“না ছোট। “
“তাইলে ঠিক আছে। বড়টা তো শুনছি মায়ের মতো পাগল। “
কথাটা বলে বৃদ্ধা ফিক করে হাসলেন। শিরিন বসে আছেন গম্ভীর মুখে। ওয়াজেদ চৌধুরী গলা পরিষ্কার করে বললেন,
“আম্মা এশনার হাতের গয়নাটা নাতবউকে পরিয়ে দোয়া করে দিন। “
উনি অস্বীকার করে বললেন, না।
ওয়াজেদ চৌধুরী কিছু বলতে গেলে উনি বললেন,
“আমার সিন্দুকের চাবি কই? সিন্দুক খোলার ব্যবস্থা করো। “
শিরিন তার শাশুড়ীকে ভালো করে চিনেন। উনি বড় বাড়ির একমাত্র মেয়ে ছিলেন। বিয়েও হয়েছিল খানদানি পরিবারে। যাদের পূর্বপুরুষ জমিদার ছিলো। বাপের বাড়ি থেকে একশ ভরি স্বর্ন পেয়েছিলেন যেগুলো এখনো বুক আগলে রাখছেন। একটা গয়নাও আজ অবধি কাউকে দেন না। পরিচিত স্যাকরা ছাড়া আর কেউ ওই গয়না হাতে নিয়ে দেখতে পর্যন্ত পারে না।
দাদী তার সিন্দুক থেকে পানপাতা হার টা বের করলেন। পানপাতা ডিজাইনের ভারী হার টা দেখে শিরিনের চক্ষু চড়কগাছ। কাজরীকে পরানোর সময় বলল,
“আমার দাদায় দিছিলো মায়েরে। খাটি সোনা। সবার কপালে জুটে না এই জিনিস। তোমার কপালে জুটছে, যত্ন কইরা রাখবা। হাতের আংটি টা এই বাড়ির জিনিস। বউগো হাতে যায়। তোমার পড়ে পাইবে তোমার পোলার বউ। যত্নে রাখবা। “
দাদীর সুইট জেশ্চার টুকু কাজরীর ভালো লাগলো। এই বাড়িতে ওর চলার পথ মসৃন হবে না। তবুও এই মুহুর্তটুকু ওর জন্য আনন্দের ছিলো। ওয়াজেদ চৌধুরী নিজেও অবাক হলেন। এশনা হা করে তাকিয়ে আছে দাদী কাউকেই আজকাল পছন্দ করেন না, সেখানে নিজের সিন্দুকের গয়না বের করে কাজরীকে পরানো! ব্যাপার টা অবিশ্বাস্য এবং বিস্ময়কর।
মন্যুজান খাতুন এই কাজটা করেছেন ছেলের বউকে জ্বালানোর জন্য। তিনি ধারণা করেন শিরিন বউ হয়ে এসে তার সংসারের গুটি পাল্টে দিয়েছে। এবার শিরিনের সংসারের গুটিগুলো পাল্টাবে। সেই মজা দেখতে পারবে। এসব দেখার জন্য তিনি আরও কিছু বছর বেঁচে থাকতে চান।
ফুল দিয়ে সাজানো ঘরে কাজরীকে শিরিন নিয়ে এলো। যাবার সময় বলল,
“রেস্ট নাও তুমি। আর হ্যাঁ, ইশান নিজের মর্জিতে চলে। ওর জন্য অপেক্ষা করার দরকার নেই। “
বিয়ে যেমন ই হোক, আজ বাসর রাত। আজ এই ধরনের কথা নববধূকে বলা মানে প্রত্যক্ষ অপমান। কাজরী গলার স্বর স্বাভাবিক রেখেই বলল,
“কেন আসবে না ইশান?”
শিরিন সরু চোখে দেখলেন। বললেন,
“ওই যে বললাম! ইশান নিজের মর্জিতে চলে। “
কাজরী এরপর আর কথা বাড়াতে চাইলো না । চুপ করে থাকা, সয়ে থাকা ওর স্বভাবে নেই। এটা সম্ভবত ওর জন্য সমস্যা বয়ে আনবে। শিরিন আবারও বললেন,
“তুমি এসেছ মাত্র কয়েক ঘন্টা। তবুও ব্যাপার টা বলে রাখি। এই বাড়িতে আমাকে কেউ প্রশ্ন করে না। আমার কথার উপরে কথাও বাড়ায় না। পায়ে হাত দিয়ে সালাম করা ব্যাপার টায় মনে হলো তুমি তর্ক করতে পছন্দ করো। এই ব্যাপার টা এভয়েড করার চেষ্টা করবে। “
কাজরী বলতে চাইলো, আপনিও অহেতুক কিছু আমার উপর চাপিয়ে দিবেন না। আমারও সেটা পছন্দ নয়। কিন্তু বলল না শিরিনের প্রথম কথাটা ভেবে। ও এই বাড়িতে এসেছে একদিনও হয় নি।
শিরিন চলে যাবার পর কাজরী নিজের ফোন টা খুলল। বাবার নাম্বার থেকে অনেকগুলো মিসড কল। কলব্যাক করার প্রয়োজন মনে হলো না। যতটুকু খবর তার দরকার সেটা অন্যদের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছেন নিশ্চয়ই।
ফ্রেশ হয়ে নিলো। ওর একটা ভালো ঘুমের দরকার। দুই রাত ধরে ভালো ঘুম হয় নি। ঘরের দিকে একবার তাকালো। বিশাল বড় রুম টা সম্ভবত নতুন করে সাজানো হয়েছে। পুরো ঘর ফুল দিয়ে সাজানো। দেখতেও অসহ্য লাগছে। কাজরী বিছানার একপাশে শুয়ে পড়লো। শিরিনের কথামতো ধরেই নিয়েছে ইশান আসবে না। নিশ্চয়ই কোনো ক্লাবে পার্টি করছে। আসার দরকারও নেই। যা ইচ্ছে করে করুক।
কিন্তু দরজার শব্দ পেতেই ও উঠে বসলো। ইশান ঘরে ঢুকেই বলল,
“লাইট অফ কেন।”
প্রশ্ন ছিলো নাকি নিজের মনেই কথাটা বলা সেটা বোঝা গেল না। কাজরীর দিকে এক পলক দেখে চলে গেল ফ্রিজের কাছে। একটা ওয়াইনের বোতল হাতে নিয়ে সোফায় বসে পড়লো। কয়েক চুমুক গলায় ঢেলে বলল,
“তোমার ফেক হাসিটা দেখা যাচ্ছে না কেন?”
কাজরী তাকালো ইশানের দিকে। ওর সত্যিই খুব টায়ার্ড লাগছে। ইশান কথা বলার ম্যুডে আছে। কাজরী যদি কথা বলতে না চায় তবে ওর রিয়েকশন কেমন হবে!
“তুমি এখানে হঠাৎ? “
ইশান কৌতুক স্বরে বলল,
“এক্সকিউজ মি! এটা আমার বাড়ি, আর আমার বেডরুম। প্রশ্ন তো আমার করা উচিত যে তুমি এখানে কেন?”
“তোমার মা বলল তুমি আসবে না। সেজন্য প্রশ্ন টা করা। “
“ওহ রিয়েলি! তুমি তাহলে এক্সপেক্ট করেছিলে আমি আসব… তারপর… “
ইশান চোখ ঘুরিয়ে ঘরের চারদিক দেখলো। কাজরী কৃত্রিম হাই তুলে বলল,
“কাল কথা বলি। আই নিড প্রোপার স্লিপ। “
“উঁহু! আজ তো তুমি ঘুমাতে পারবে না। “
কাজরী এক মুহুর্তের জন্য চমকে উঠলেও দ্রুত সামলে নেবার চেষ্টা করলো। ইশান কী হাজবেন্ড টাইপ আচরণ দেখানোর চেষ্টা করতে পারে। পরিস্থিতি সামলানোর জন্য ও খানিকটা আদুরে গলায় বলল,
“ডিয়ার হাজবেন্ড, আমি খুব ই ক্লান্ত। কাল কথা বলি প্লিজ। “
ইশান কৌতুকবোধ করলো। তবে ওর গলার স্বর স্বাভাবিক।
“ঠিক আছে তুমি ঘুমাও। এই মুহুর্তে তোমাকে খুব অসহায় ও বেচারি লাগছে। এভাবে কথা বলতে ভালো লাগবে না। আজকের রাত টা ভালো করে ঘুমিয়ে নিজেকে চার্জ করে নাও। “
কাজরী চুপ করে রইলো। ইশান চোখের ইশারায় ও’কে শুয়ে পড়তে বলল। ও করলো সেটা। চোখ বন্ধ করেও টের পেল ইশান ও’কে দেখছে। ঠিক এই মুহুর্তে নিজেকে আন্ডার কনফিডেন্ট লাগছে।
ইশান কেন তাকিয়ে আছে কাজরীর দিকে জানেনা। না মনে কোনো ফিলিংস কাজ করছে না। একদম শূন্য অনুভূতি নিয়ে তাকিয়ে মেয়েটাকে দেখছে। তবে চোখ সরাতে ইচ্ছে করছে না।
চলবে…..
সাবিকুন নাহার নিপা
(বেশী বেশী লাইক কমেন্ট করুন।)
Share On:
TAGS: কাজরী, সাবিকুন নাহার নিপা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাজরী পর্ব ৭
-
কাজরী পর্ব ৪
-
কাজরী পর্ব ৫
-
কাজরী পর্ব ৮+৯
-
কাজরী পর্ব ৬
-
কাজরী গল্পের লিংক
-
কাজরী পর্ব ১০
-
কাজরী পর্ব ১
-
কাজরী পর্ব ২