দিও তোমার মালাখানি
পর্ব ১
–মা বলতেছে, তোমার বয়স বেশি, আমার চাইতে নাকি তোমাকে বয়স্ক লাগে…
“প্রেম করার সময় মারে জিগাইছিলি, এখন বিয়ের সময় মা না মানলে বিয়ে করতে পারবি না?”
জবাবটা রুচির মুখে এসেই গিয়েছিল, কিন্তু তৌহিদের অহেতুক অজুহাতের উত্তর করার আগ্রহ হলো না। কিংবা বয়স আসলেই হয়েছে। নিব্বা-নিব্বিদের মতো উত্তেজনা কাজ করে না। অবসাদ ছুঁয়ে ফেলেছে।
তৌহিদের গলায় উদ্বেগ। অনিশ্চিত মাথা নেড়ে বলল,
–এইসব হাবিজাবি ঝামেলা আর ভালো লাগছে না! কী করব না করব, কিছুই বুঝতে পারছি না!
শীত পড়তে শুরু করেছে। বিকেলের আগেই কুয়াশা নেমে আসে। সন্ধে হতে হতে পুরো শীতকাল!
রুচির কণ্ঠে আবহাওয়া কিংবা পরিস্থিতি কোনোটারই তাপ-শীত কিছুই প্রকাশ পেল না।
খানিকটা অপ্রাসঙ্গিকভাবেই বলল,
–ঠান্ডা লাগে। বাসায় যাই, চলো।
তৌহিদ খানিকটা বিরক্ত হলো। গলার স্বর উঁচু শোনাল,
–কোনোকিছুতেই কিছু আসে যায় না তোমার? আমি একটা বড়ো সমস্যায় আছি! মায়ের সাথে যুদ্ধ করে তো লাভ নাই! আল্টিমেটলি, শি উইল বি দ্য উইনার!
অন্ধকারে তৌহিদের মুখ দেখা না গেলেও রুচি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল ওর দিকে। মৃদু গলায় অপরাধী ভঙ্গিতে বলল,
–নয়টা পাঁচটা অফিস করে আর কিছু ভালো লাগে না আসলে! মাথায় কোনো চাপ নিতে পারি না।
–আচ্ছা, ফুচকাটা খেয়ে যাও।
–এসিডিটি ফর্ম করে বলে আজকাল এসব টক-ঝাল ছেড়ে দিয়েছি!
–তাহলে চা খাও? আদা দিয়ে সুন্দর রংচা করে এরা। আমি কালকেই খেয়েছি।
–আচ্ছা। চা-ই ভালো। মামা, চিনি দিয়েন না। কালোজিরে, মশলা, লেবু কিছু দিয়েন না। শুধু আদা আর হালকা লিকার দিয়ে লাল চা দেন একটা।
রুচি নিজেই অর্ডার করল।
তৌহিদ ভুঁরু কুঁচকে তাকাল রুচির দিকে। রুচির হঠাৎ মনে পড়ল। দোকানিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
–আরেকটা দিয়েন অল্প চিনি দিয়ে।
কথা আর বাড়ল না। রুচিকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে তৌহিদ চলে গেল।
অন্ধকারে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল রুচি। গলার কাছে কিছু একটা ডেলা বাঁধতে চাইছে। সেটাকে ঝেড়ে ফেলতে ফেলতে সিঁড়ির ধাপে পা বাড়াল।
দোতলার ওই কয়েকটা সিঁড়ি ভাঙতে আজকে লম্বাসময় লেগে গেল ওর। ড্রয়িংরুমের টিভিতে অনুরাগের ছোঁয়া নাটক চলছে। মঈন কাগজের ঠোঙা উঁচু করে ধরল,
–বাসস্টপের পাশেই দোকানটা। নতুন বসছে। চুলার উপর থেকে নামিয়ে নিয়ে আসলাম, আপু। ফুলকপি আর আলুর সিঙারা। বোম্বাই মরিচ আর ধনেপাতা মেশানো। টেস্টবাড ব্লাস্ট করবে পুরাই।
–তোরা খা। আমি গোসল করব।
–গোসল করে আয়। একসাথে না খেলে এই জিনিসে মজা নেই।
রুলি উঁকি দিলো,
–আপু, তুই কি শ্যাম্পু করবি আজকে?
–কেন?
–সময় বেশি লাগলে দুধ চা বানাব। গরুর দুধের চা সেই হবে! তুই শ্যাম্পু করে আসলে দেরি হবে, ততক্ষণে দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করব। আর তড়িঘড়ি আসলে ডিপ্লোমা মেশাব।
–দুধ নষ্ট করলে আম্মু রাগ করবে।
–আধাকেজি তো এক্সট্রা হয়েছে। কালকে দুধ দেয়নি বলে দুধওয়ালা আজকে দুইদিনের দুধ একসাথে দিয়ে গেছে। এক কেজি পুরো।
–এক্সট্রা নিলি কেন? কালকে দেয়নি, মাসশেষে হিসাব থেকে পঞ্চাশ টাকা কম হতো বিল।
রুলি মুখ বেজার করল,
–আপু, তুই তো পুরো আম্মু হয়ে যাচ্ছিস!
রুচি থতমত খেয়ে গেল। আসলেই কি বুড়ো হয়ে গেছে ও?
মাথায় পানি ঢেলে গোসলের আয়নার সামনে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। এই তো কয়েকদিন আগেও একঢাল কালো চুল ছিল। এখন গোছে পাতলা হয়ে গেছে। কত শ্যাম্পু বদলে বদলেও চুল পড়াটা আটকানো যায়নি। বয়সটাকেও না। প্রায় একত্রিশ এখন। চোখের কোণে বয়সের ছাপ পড়তে শুরু করেছে। চামড়ার লাবণ্য কমে রুক্ষ হয়েছে। ঠোঁটের কমনীয় গোলাপি আভায় কালচে ভাব প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। অনেক মেয়ে আছে যারা ত্রিশ পার করেও দিব্যি টলটলে, স্নিগ্ধ!
ভেজা চুলে তোয়ালে জড়িয়ে মায়ের কাছে এসে বসল ও। ইতস্তত করে বলল,
–আম্মু, শান্তি খালা যে প্রপোজাল এনেছিল, আমার আপত্তি নেই! তোমরা কথা বাড়াতে পারো।
খুব লজ্জা করল বলতে, বলেই চলে আসছিল রুচি, জাকিয়া ডাকলেন। বললেন,
–শান্তি প্রস্তাব আনছে তোর জন্য না, রুলির জন্য!
রুচি তাকিয়ে থাকল মায়ের দিকে। জাকিয়া বললেন,
–তোর জন্য তো কথা বলাই ছেড়ে দিয়েছি কয় বছর! তুই তো তৌহিদরে ছাড়া বিয়ে করবি না। আমরা তো বাধা দিই নাই। বেকার ছেলেরে মেয়ে দিতে তোর বাপে শুরুতে নারাজ ছিল। তারপরে তো মেনেই নিলো মানুষটা। কত করে বললাম, কাবিনটা করে রাখি। চাকরি হলে তুলে নেবে। তাতেও রাজি হলি না। আমি তো বলি, তোর বিয়ের টেনশনেই তোর বাপে মরল। মানুষটা ঠিকই জানত, তৌহিদ শেষপর্যন্ত বিয়েটা করবে না!
দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন জাকিয়া। পরলোকগত স্বামীর কথা মনে পড়ে গেল। তখন রুচির বয়স কম ছিল, দেখতেও সুন্দরী। তাদের তিন সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবীও রুচিই। মাস্টার্স করতে করতে কোনোরকম ধরাধরি ছাড়াই নিজের যোগ্যতায় টেলিকম কোম্পানিতে ভালো বেতনের চাকরি জুটিয়ে ফেলল। কত ভালো ভালো পাত্রের সন্ধান এনে মেয়েকে রাজি করাতে চেষ্টা করতেন ওর বাবা। কিন্তু রুচিকে কিছুতেই টলানো যায়নি। কঠিন সংকল্প ছিল ওর।
জাকিয়া বিড়বিড় করলেন,
–যেদিন শুনছি ওর বিসিএস হয়ে গেছে, সেদিন থেকেই ইয়া নফসী পড়তেছি। কেমন করে যেন জানতামই আজকের দিন দেখা লাগবে, এইজন্য অবাক হই নাই। তোর বিয়ে আটকায় রাখছে এত বছর। যেই না চাকরি হইছে অমনি কচি মেয়ে বিয়ে করার শখ জাগছে।
রুচি আপত্তি করল,
–ওর মা রাজি হচ্ছে না।
জাকিয়া মেয়ের বাস্তববুদ্ধির দৌড় দেখে শুকনো হাসলেন,
–ওর বাপ-মায়ের কদর আছে। তাদের অনুমতির বাইরে যাওয়া যায় না। তোর বাপ মা ছিল না কোনোদিন। এইজন্য আইবুড়ো মেয়ে বাপের ঘরে লন্ঠন হয়ে বসে আছিস। তৌহিদ রোশনিরে বিয়ে করতেছে!
–কোন রোশনি? ইটখোলায় সোবহান কাকার মেয়ে?
–হ্যাঁ।
রুচি মনে মনে হিসেব করল। বলল,
–মেয়েটা স্কুল পাশ করেছে? রুলির চাইতেও ছয় সাত বছরের ছোটো হবে। রোশনি হলো সেইবছরই তো রুলি স্কুলে যায়, তাই না? ওকে স্কুল থেকে নিয়ে আমরা খেলনা কিনতে মার্কেটে গেলাম। তারপর সোবহান আংকেলের বাসায় গেলাম। রুলি স্কুলের ইউনিফর্ম পরা ছিল সেদিন। তুমি জানলে কীভাবে?
–দুনিয়াটা যে গোল তার বহুত প্রমাণ পাইছি সারাজীবন ধরে। তোর রেহানা আন্টি আসছিল। তৌহিদের বায়োডাটা সাথে করে নিয়ে আসছে। ভার্সিটিতে তোর সেইম ব্যাচ দেখে আসছে তোরে দিয়ে খোঁজখবর করতে। আমারে বলল, তোর কাছে যেন জানি, ছেলে কেমন।
–তুমি কিছু বলো নাই তো?
–পাগল আমি? আমার মেয়ে যে পোড়াকপালি সেটা জনে জনে বলে বেড়াব? এমন তো না যে, রোশনিরে বিয়ে না করলে তৌহিদ তোকে বিয়ে করবে! অন্য কোনো অল্পবয়সী মেয়ে খুঁজে নেবে। আর রেহানার কথায় বুঝলাম, অনেকদূর কথা এগিয়েছে। ছেলে-মেয়ে বেশ মেলামেশা করে ফেলেছে। ওদের খুব পছন্দ তৌহিদরে। রোশনিও তো রেহানার গায়ের রঙ, কাটিং পেয়েছে। তৌহিদের মা নাকি বৌ করার জন্য পাগল। আমার কী দরকার ভাঙানি দেওয়ার? আমি বললেও রেহানা হয়তো বিশ্বাস করত না। শুনে শুরুতে একটু দ্বিধা করলেও পরে ঠিকই তোর বদনাম গাইত। সেধে সেধে কেন পরের বদদোয়া নেবো?
বলতে বলতে থেমে গেলেন জাকিয়া। মেয়েটা নিজেই না জানি কতখানি কষ্ট পাচ্ছে। মনে হলো, মেয়ের ক্ষত খুঁচিয়ে ঘা করে দিচ্ছেন। গলায় দরদ এনে বললেন,
–মুখটা ওরকম শুকিয়ে আছে কেন? খাস নাই দুপুরে? আমার কাছে এসে বস তো একটু। এই রাতে চুল ভিজাইছিস কেন? ঠান্ডা লাগবে না? এত বড়ো মেয়ে, একটাও কথা শুনিস না! নিজের ভালো বুঝবি কবে? দুনিয়াটা কত স্বার্থপর, জানিস?
সত্যি বলতে খুব একটা কষ্ট হচ্ছিল না রুচির। তৌহিদের পরিবর্তন কয়েক মাস ধরেই একটু একটু করে দেখা যাচ্ছিল। মেনে নিতে নিতে সয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মায়ের আদরে বিগলিত হয়ে গেল আত্মসম্মান, সম্ভ্রম সব। শিশুর মতো কেঁদে উঠল রুচি!
জাকিয়া আলিঙ্গকে নিলেন দুহিতাকে। ভেজা তোয়ালে খুলে চুল নেড়ে দিতে দিতে বললেন,
–ভালো হইছে। এইসব বিয়া-শাদির দরকার নাই। হয় নাই যখন, হয় নাই। সবাই চলে গেলে বুড়ো মা-কে কে দেখবে? দেখবি না আমারে? আমার মা তো তুই! রুলিরে বিয়ে দিয়ে পার করে দেবো। আর মইনকে বিয়ে দিয়েই বলব, বউ নিয়ে আলাদা সংসার করো, বাপু। আমরা বউ-শাশুড়ি ক্যাচাল করতে পারব না। আসবা, বেড়াবা, যাবাগা! নিজের সংসার নিজে গুছাবা, নিজেরা প্যারা খাবা। তাতে সম্পর্ক ভালো লাগবে। আর আমরা দুইটা মা মিলে পায়ের উপর পা তুলে বসে সিরিয়াল দেখে, আয়েশ করে জীবন পার করে দেবো। আজকের পর্বে সুদীপা, দীপা সেনগুপ্তর ছবি পেয়েছে। একদম ওর চেহারা। প্রথমে তো ভেবেছে ওই। পরে জেনেছে, না ওটা দীপা। লাবন্যজের মালিক। চেহারার এত মিল কীভাবে হয় সেটা খুঁজে খুঁজে এবারে সবাইকে পেয়ে যাবে!
চোখভরা পানি নিয়ে হেসে ফেলল রুচি,
–এই সিরিয়াল এখনো চলে? সূর্য-দীপার নাতনি না সুদীপা? সোনা-রুপা বাচ্চা দুইটারেই ভাল্লাগত।
রাত দশটার পরে রুচি একা একা ছাদে উঠে গেল। সাততলার উপর আকাশটা অনেক কাছাকাছি! নি:সঙ্গ চাঁদটা ঝুলছে উন্মুক্ত প্রান্তরে, আর তার ধবল পূর্নিমার আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারিধার…
চলবে?
দিও তোমার মালাখানি – ১
আফসানা আশা
পরের পর্ব পড়তে পেইজ ফলো করুন Afsana Asha:আফসানা আশা
Share On:
TAGS: আফসানা আশা, দিও তোমার মালাখানি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৬
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৩
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৫
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৪
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৮ (খ)
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৮
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ২
-
দিও তোমার মালাখানি গল্পের লিংক
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৭