Golpo romantic golpo তাজমহল সিজন ২

তাজমহল সিজন ২ পর্ব ২৮


তাজমহল #দ্বিতীয়_খন্ড

পর্ব_২৮

প্রিমাফারনাজচৌধুরী

“আমি তোর মেয়েকে ডাকবো সেহেরি।”

শাওনের কথা শুনে সবাই ফিক করে হেসে উঠলো। শাইনা মেয়ের ভেজা গেঞ্জিটা খুলে ফেলতে ফেলতে বলল,”আমার মেয়ে জবাব দিতে শিখুক। তখন তোমাকে দেখে নেবে।”

“কেন তোর মেয়ে আমাকে কি করবে?”

তৌসিফ পাশ থেকে বলল,”মামু তোর কলিজা খামু।”

সবাই একদফা হাসলো।

তাজদার মেয়েকে নিয়ে সমুদ্রে নেমেছিল কিছুক্ষণ আগে। তারপর বালি মাটিতে ছোটো ছোটো পা দুটোর ছাপ রেখেছে তার মা বাবার পায়ের ছাপের মাঝখানে। পুরো সময়টা জুড়ে ও হাসছিল। একটুও কান্না নয়। অবশ্য ঘুরতে পারলে ওরমতো খুশি আর কে হয়?

তিতলি এসে শাইনার হাতে একটি সাদা টিশার্ট দিল।

“ভাইয়া দিয়েছে। ভালো করে গা মুছে দিতে বলেছে।”

“তোমার ভাইয়া কোথায়?”

“পুরোনো বন্ধু পেয়ে গেছে। আনিস ভাইও ওখানে। মনে হচ্ছে ওরা একসাথে লাঞ্চটা ওখানেই করবে।”

ঝিমলি বলল,”ঠিকই বলেছে, গা ভালো করে মুছে দাও। ঠান্ডা লেগে যাবে।”

রায়হান বলল,”সবাই চলো। এখানে আর থাকতে হবে না। খুব বাতাস এখানে। ঠান্ডা লেগে গেলে সব আনন্দ মাটি।”

আশরাফও একই কথা বললো। তাসনুভা বলল,

“বাবুর মায়েরা চলে যান। আমি আর তিতলি থাকবো এখানে।”

তিতলি বলল,”একদম একদম।”

শাইনারও যেতে ইচ্ছে করছে না। সাবরিনা বলল,

“আচ্ছা আমি আর ঝিমলি ভাবি চলে যাই। শাইনা বাবুনিকে আমার কোলে দাও।”

শাইনা বলল,”তাজদার সাহেব বলেছেন মা মেয়ের ছবি তুলবে।”

সাবরিনা হেসে ফেললো।

“তাহলে থাকো।”

আশরাফ বলল,”ওর ঠান্ডা লেগে যাবে।”

শাইনা বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে চাদরের আড়ালে রেখে ওর মাথা ঢেকে দিয়ে বলল,

“লাগবে না। তোমরা চলে যাও।”

ঝিমলি রায়হানের দিকে তাকালো গলা হেলিয়ে। রায়হান আশরাফের দিকে চেয়ে হেসে উঠলো।

“যেতে চাচ্ছে না।”

আশরাফ সাবরিনাকে বলল,”তুমিও একই দলের নাকি?”

সাবরিনাও হেসে ফেললো। তৌসিফ রুহাবকে কাঁধে নিয়েছে। শাওন তার ভাইপো আফনানকে। ওরা খুব মজা পাচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর সেখানে ঘোড়া এল। তিতলি ঘোড়ায় চড়বে বলে বায়না ধরলো। তৌসিফ ঘোড়াসরওয়ারকে বলল, ওকে নিয়ে যেন সমুদ্রের মাঝখানে ফেলে দিয়ে আসে।

তিতলি মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। তৌসিফ হো হো করে হাসতে হাসতে বলল,

“শাওন একে এখানে বেচে দিয়ে চলে যাব।”

শাওন বলল,”আমার কাছে বেচে দে।”

“পয়সা দে। নগদ পাঁচ কোটি।”

“ধুর হালা পাঁচ টাকাও নাই।”

তিতলি বলল,”শাওন ভাই মজা করবেন না। আমি সত্যি সত্যি ঘোড়ায় চড়বো।”

“তুমি পারলে মাথায় চড়ে বসো। কোনো আপত্তি নেই তালতো বোন।”

তিতলি রাগ করে বলল,”আপনারা আমার সাথে মজা করছেন।”

তৌসিফ ব্যঙ্গ করে বলল,”য়াফনারা আমার মঝা খরছেন।”

শাওন হো হো করে হেসে উঠলো। তিতলি শেষমেশ ঘোড়ায় চড়লো। তাসনুভার এইসবে ইন্টারেস্ট নেই। সে আশেপাশের মানুষজনকে লক্ষ করছে। বেশিরভাগ মানুষের ড্রেস সেন্স ঠিক নেই। এরাই আবার মানুষকে হাজারটা জ্ঞান দেয় এটা সেটা নিয়ে। সামান্য ড্রেসসেন্সটুকু নেই।

একটা মেয়ে কোমরে বাচ্চা নিয়ে চোখ কুঁচকে সমুদ্রের দিকে চেয়ে আছে। ড্রেসটা ঠিকঠাক আছে। কিন্তু চুল এমন করে বেঁধেছে মনে হচ্ছে পাড়ার ঝগরুটে মহিলা। বাচ্চা খুব কিউট। সে কাছে এগিয়ে গেল। বাচ্চাটাকে আদর করলো। বাচ্চাটা হাসলো। আদর করে তাসনুভা আবারও দূরে গিয়ে দাঁড়ালো। কিছুক্ষণ পর ওই মহিলার স্বামী এল। মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে ডাকলো,

“মেহবুব!”

তাসনুভার ধারণা ঠিক। বাচ্চাটা বাবার মতো হয়েছে। গায়েগতরে দেখে মনে হচ্ছে আইনের লোক। লোকটা এসে স্ত্রীর উঁচু করে বাঁধা চুল খুলে দিল ক্লিপটা খুলে নিয়ে। তারপর বাচ্চাকে কোলে নিয়ে স্ত্রী হাত শক্ত করে ধরে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো। তাসনুভা ছোট্ট করে বলল,

“নাইস!”

কিন্তু কিছুক্ষণ পর দেখা গেল মেয়েটি ছেলেকে কোলে নিয়ে বালুর উপর অদ্ভুতভাবে বসে বলছে, ছবি তুলতে। তার হাসবেন্ড কোমরে হাত দিয়ে হতাশ হয়ে মা ছেলেকে দেখছে। বেচারাকে নিশ্চয়ই মেয়েটা খুব জ্বালায়। উইয়ার্ড বাট সুইট কাপল!


তাজদার এল তার বন্ধু-বান্ধব নিয়ে। সে সবার আগে দৌড়ে দৌড়ে এল। শাইনা চাদরে ভালো করে মাথা ঢেকে ঢুকে নিল তার ইশারায়। আনিসের সাথে আসছে তারা। তাজদার হাতের ইশারায় তাসনুভা, তিতলি আর তৌসিফদেরও ডেকে নিল।

তারা সবাই কলেজে একসাথে পড়েছিল। যদিও আনিসের সাথে পরিচিত হয়েছে ব্যাংকের গ্রাহক হিসেবে।

সবার সাথে তাজদার পরিচয় করিয়ে দিল। ওরা সবাইকে দেখে বলল,”এখানে তো চাঁদের হাট বসে গেছে।”

তাজদার শাইনাকে দেখিয়ে দিল।

“শাইনা জামান।”

শাইনা সালাম দিল। তারা সালাম নিয়ে কুশলাদি বিনিময় করলো। বাবুকে কোলে নিয়ে তাজদারকে বলল,”বাপকা বেটি।”

তাজদার বলল,”সেটাই বেশি ভয়ের।”

সবাই একসাথে হো হো করে হেসে উঠলো। তাসনুভা আসতেই তাজদার বলল,”নুভা!”

তাসনুভা সালাম দিল। তারা সালাম নিল।

“নুভার শোরুমে আমরা গিয়েছিলাম কিন্তু।”

“জি মনে আছে। আবার যাবেন। গতবার আমি বিজি ছিলাম। আপনাদেরকে সময় দিতে পারিনি।”

“অবশ্যই যাব।”

আনিস বলল,”ওটা জেন্টস শপ জানলে আমিও যেতাম।”

সবাই তার কথা শুনে হেসে উঠলো।

“আরেহ না আনিস সাহেব। বোনকে নিয়ে গিয়েছিলাম। ও তো নুভাকে চেনে। পেজে দেখে ড্রেসের কালেকশন। এই আর কি।”

তাসনুভা বলল,”ভাইয়া আরেকবার ঘুরে আসবেন। চা কফি মাস্ট খেতে হবে। আনিস ভাই আপনিও।”

ঝিমলি বলল,”আনিস ভাইয়ের বিরিয়ানি চাই। চা কফিতে হবে না। বেয়াই লাগে কিন্তু। হুম।”

তাসনুভার ফোনে কল এসেছে। সে যাওয়ার অনুমতি চেয়ে বলল,

“এক্সকিউজ মি!”

তাজদার অনুমতি দিল। তাসনুভা কানে ফোন চেপে যেতে যেতে ঝিমলিকে চোখ রাঙালো। ঝিমলি হাসলো।

রায়হান বলল,”সবার লাঞ্চ একসাথে হবে। যাওয়া যাবে না। চলুন।”

তারা রাজি হতে চাইলো না। কিন্তু তাজদার সিদ্দিকীকে তারা চেনে। সে নাছোড়বান্দা। দূর্ভাগ্যবশত তার সাথে দেখা হয়ে গিয়েছে। এখন আর ছাড়াছাড়ি নেই। বন্ধুদের পেয়ে তাজদারের উচ্ছ্বাস দেখে শাইনা বিড়বিড়িয়ে বলল,

“সাহেবের খুশি তো ধরে না।”

তাজদার তার কথা শুনে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো। শাইনা বলল,”ক্যারি অন।”

তাজদারের চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেল। সর্বনাশ! সে ছবি তুলবে বলেছিল।

“থাক। মাফ সাফ করে দিলাম।”

শাইনা মেয়েকে নিয়ে সরে গেল। সাবরিনা আর ঝিমলির সাথে কথা বলতে বলতে চলে যেতে লাগলো।


সবাই ফ্রেশ হবে। কিছুক্ষণ পর লাঞ্চ। তাজদার বন্ধুদের রায়হান আর আশরাফের সাথে পাঠিয়ে দিল। তারা সবাই একসাথে কথা বলতে বলতে রিসোর্টের দিকে এগোচ্ছে।

তাজদার ক্যামেরা নিয়ে শাইনাকে ডাকলো।

“মমতাজ বেগম আসা হোক!”

ঝিমলি আর সাবরিনা অনেক কাপল ছবি তুলেছে। তাই তারা শাইনাকে বলল,

“যান! আপনার জন এসেছে।”

শাইনা শেহরীনকে বুকের সাথে জড়িয়ে তাজদার সিদ্দিকীর দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে এগিয়ে আসতে লাগলো। মেয়েকে সে শেহরীন বলে ডাকবে ঠিক করেছে। কারণ তার নামের সাথে মিল আছে। অবশ্য আদর করে ময়না শালিক কতকিছু ডাকে।

তাজদার তার সামনে গিয়ে কাছ থেকে ছবি তুলছে। শাইনা হাঁটতে হাঁটতে বলল,

“দরকার নেই আমার।”

তাজদার ক্লিক করেই যাচ্ছে।

“আমার ছানাটিকে দেখান।”

শাইনা মেয়েকে আরও ভালো করে ঢেকে দিল।

কিন্তু মেয়ে চাদরের নিচে থাকতে চাইলো না। মাথা আর হাত তুলে বাবার দিকে তাকিয়ে ফোকলা হাসি। তা দেখে তাজদার সিদ্দিকী বিশ্বজয়ী হাসি দিল।

শেষমেশ তৌসিফকে ডেকে নিল সে। অনেকগুলো কাপল ছবি তুললো মেয়েকে সাথে নিয়ে। তৌসিফ শেষমেশ ক্যামেরাটা আনিসের দিকে ছুঁড়ে মেরে ক্লান্ত হয়ে বালুর উপর হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়লো। শাওনও তার দেখাদেখি শুয়ে পড়লো। তিতলি ওদের দেখাদেখি বালুতে বসে পড়েছে সবে তৌসিফ উঠে এসে ধমাধম পিঠের উপর কিল বসিয়ে টানতে টানতে নিয়ে যেতে লাগলো।

“বেকুবের বাচ্চা বেকুব।”

“আম্মু আব্বু তো বেকুব না।”

“তাহলে তোর বাচ্চা বেকুব।”

দুজনেই ঝগড়া করতে করতে চলে যেতে লাগলো রিসোর্টের দিকে।


আনিস চারপাশের দৃশ্যগুলো মন দিয়ে ক্যামেরাবন্দি করছিল। হঠাৎ তাসনুভা এগিয়ে এসে বলল,

“ক্যামেরাটা দিন তো আনিস ভাই।”

আনিস চমকে তাকালো।

“কেন? আমি তো এই মাত্রই নিয়েছি।”

তাসনুভার ঠোঁটে হালকা ব্যঙ্গ,

“ক্যামেরা দিয়ে আপনার কী কাজ? আপনি তো ভালোভাবে ছবি তুলতেই পারেন না।”

আনিসের ভ্রু কুঁচকে গেল।

“কে বলেছে আমি ছবি তুলতে পারি না?”

“আজ পর্যন্ত আপনাকে দিয়ে যতগুলো ছবি তুলিয়েছি, সবই ফালতু এসেছে।”

আনিস একটু গম্ভীর গলায় বলল,

“আমি খুব ভালো ছবি তুলতে পারি।”

তাসনুভা ঠোঁটের কোণে হাসি চাপতে চাপতে বলল,
“ভালো। তাহলে একটা তুলে দেন।”

এই কথা বলেই সে ভিড়ের দিকে এগিয়ে গেল। মানুষের কোলাহলের ভেতরে তার রঙিন ওড়না মিলিয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পর আনিস দ্রুত পায়ে ফিরে এলো। ক্যামেরাটা তাসনুভার হাতে গুঁজে দিয়ে বলল,“নাও।”

তাসনুভা অবাক হয়ে তাকাল।

“ছবি তুলেছেন?”

“না।”

এইটুকু বলেই সে ব্যস্ত পায়ে রিসোর্টের দিকে হেঁটে যেতে লাগল।

তাসনুভা কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে ক্যামেরার স্ক্রিনে তাকাল।

ভিড়ের ঠিক মাঝখানে অগণিত মুখ, রঙ আর কোলাহলের ভেতর একজনই পরিষ্কার, স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সেটা সে নিজেই।

চারপাশটা ঝাপসা, শুধু সে স্পষ্ট। মনে হলো, ছবিটা কেউ তুলেনি, খুব মন দিয়ে খুব গভীর নীরবতায় দেখেছে। ওটাই ক্যামেরা ধরতে পেরেছে।


কক্সবাজারের একটি নামি রেস্টুরেন্টে বিশাল এক টেবিল ঘিরে বসেছে সবাই। টেবিলের একপাশে তাজদার তার বন্ধুদের সাথে পুরোনো দিনের গল্পে মেতেছে। অন্যপাশে রায়হান আর আশরাফ তদারকি করছে কোনো কমতি যেন না থাকে।

শাইনা শেহরীনকে কোলে নিয়ে কোনোমতে খাওয়ার চেষ্টা করছে। মেয়েটা কোলে থাকতে রাজি নয়, সে হাত-পা ছুড়ে টেবিলের চামচ ধরার চেষ্টা করছে। তাজদার আড়চোখে তার অবস্থা দেখে নিজের বন্ধুদের গল্প থামিয়ে উঠে এল। শাইনার পাশ থেকে মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে বলল,

“তুমি খেয়ে নাও। আমি ধরছি।”

শাইনা কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তাকালো। তাজদার মেয়েকে নিয়ে রেস্টুরেন্টের কাঁচের দেয়ালের পাশে দাঁড়ালো যেখান থেকে নীল সমুদ্রের ঢেউ দেখা যায়।

বন্ধুদের একজন টিপ্পনী কেটে বলল, “তাজ তো পুরাই ফ্যামিলি ম্যান হয়ে গেছে রে!”

সবাই এটা নিয়ে একচোট হাসলো।
তাজদার মেয়েকে নিয়ে ঘুরে এসে আবারও চেয়ারে বসলো। বলল,”উনি সব খেতে চাইছে। এখন কি করা যায়?”

রায়হান বলল,”থেঁতলে নরম করে মাংস খাইয়ে দে।”

তাজদার বলল,”উহু, ওর কাপড় নষ্ট হলে শাইনা বকবে। ও খাওয়াবে। ও আস্তেধীরে সময় নিয়ে খাওয়ায়।”

আনিস অনেকটা চুপচাপ।

হঠাৎ তিতলি বলে উঠলো, “আনিস ভাই, আপনি তো আজ লাঞ্চের পর আমাদের ইনানি নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছিলেন। যাবেন না?”

আনিস সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বলল, “হ্যাঁ, অবশ্যই। চাঁদের গাড়িতে করে যাব।”

তিতলি খুশিতে বাকুমবাকুম। তাসনুভা বলল,”চুপচাপ খাও।”

“তুমি খাও।”

খাওয়া-দাওয়ার মাঝখানে ঝিমলি আর সাবরিনা বাচ্চাদের সামলানো নিয়ে হাসাহাসি করছে। তৌসিফ আর শাওন তখনো লবস্টার আর সামুদ্রিক মাছের আইটেম নিয়ে মহাব্যস্ত। তৌসিফ একটা বড় কাঁকড়ার পা মুখে দিয়ে বলল,

“একটি সুসংবাদ। পরের বার শাওন বউ নিয়ে হানিমুনে আসবে।”

আনিস বলল,”ও তো চাকরিবাকরি করবে না বলছে। ওকে বউ দেবে কে?”

শাওন রেগে গিয়ে বলল,”ভাই আমার ইজ্জত সম্মান নিয়ে টানাটানি করবে না কিন্তু।”

ঝিমলি বলল,”তৌসিফ সাহেব ভুল কথা বলেছেন বলে আনিস ভাই রেগে গেছে। পরের বার উনিই বউ নিয়ে আসবেন। শাওন কেন উনার আগে বউ নিয়ে আসতে যাবে।”

তৌসিফ বলল,”ও ভাই মুঝে মারো, মুঝে মারো।”

সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। আনিস শাওনের উপর বিরক্ত হয়ে চুপচাপ খেতে লাগলো।


দুপুরের কড়া রোদ যখন একটু পড়ে এল, সবাই রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে গাড়ির দিকে এগোলো। আনিস সবার পেছনে হাঁটছিল। তাসনুভা তার পাশে এসে বলল,

“ছবিটা ভালো তুলেছেন আনিস ভাই। বাট নো থ্যাংকস! আরও ইমপ্রুভ দরকার তবেই ইমপ্রেস হবো।”

আনিস থমকে দাঁড়িয়ে তাকালো। তাসনুভা হালকা হেসে চশমাটা চোখে দিয়ে এগিয়ে গেল সামনের দিকে। আনিস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই মেয়েটাকে বোঝা দায়, আবার না বুঝে থাকাও দায়।

তাজদার শাইনার হাত ধরে গাড়িতে ওঠার সময় ফিসফিস করে বলল, “পরের বার আপনার ময়নার একটা সঙ্গীর দরকার পড়তে পারে।”

শাইনা লজ্জা মিশ্রিত রাগে বলল, “কী!”

তাজদার হাসলো, সেই দিগ্বিজয়ী হাসি। নীল জলরাশি পেছনে ফেলে তাদের গাড়িগুলো এবার ছুটলো ইনানি বিচের দিকে।

ইনানি বিচে নামতেই তাসনুভা একটুখানি দৌড়ে গিয়ে একটি পাথরের উপর উঠে দাঁড়াল। দু’হাত মেলে সে সমুদ্রের হাওয়াকে বুকে টেনে নিল।

শাইনা, ঝিমলি আর সাবরিনা পাথরের উপর বসে পড়েছে। বসে বসেই তারা নিজেদের বরদের খাটাচ্ছে ক্যামেরার এঙ্গেল ঠিক করতে, আবার একই ছবিটা দশবার তুলে আনতে।

তবে সেখানে তারা বেশিক্ষণ থাকল না। মেরিন ড্রাইভে নামার পরিকল্পনা আগে থেকেই ছিল। খোলা জিপে করে অনেকদূর ঘুরবে। এই উত্তেজনাই সবাইকে তাড়া দিচ্ছিল।

ছবি তোলা শেষ হতেই সবাই প্রায় দৌড়েই গাড়ির দিকে এগোল। লেটলতিফ আনিস বরাবরের মতো সবার পেছনে। তার একটু আগেই তাসনুভা। তাকে চাইলে লেটলতিফা বলা যায়। তাই শেষমেশ দু’জনকেই পেছনের গাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো।

তাসনুভা গাড়িতে বসেই চুলের ওপর চশমাটা তুলে তিতলির দিকে তাকিয়ে বলল,

“তিতলি চিৎকার করবে না কিন্তু।”

শাওন সঙ্গে সঙ্গে লুফে নিল,
“তিতলি, চলো কে বেশি জোরে চিৎকার দিতে পারি তার প্রতিযোগিতা হোক!”

তৌসিফ ভ্রু কুঁচকে হুমকি দিল,
“দুটোকেই নামিয়ে দেব রাস্তার মাঝখানে।”

আনিস চুপচাপ বসে ছিল। চোখ দুটো জানালার বাইরে। কিছু একটা গভীরভাবে ভাবছে সে।
তাসনুভা কানে লাগানো ইয়ারপিস খুলে তৌসিফকে বলল,

“কোনো গান চলবে না ভাইয়া।”

“চুপ থাক।” তৌসিফ বলেই গান ছেড়ে দিল।

গাড়ি কাঁপিয়ে ডিজে গানটা বেজে উঠল,

“সোয়াগ সে কারেঙ্গে সাব কা সোয়াগাত।”

আনিস ধমকে উঠল। গানটা থামিয়ে নিজের পছন্দের ট্র্যাক সিলেক্ট করল।

“আমি কি তোমায় খুব বিরক্ত করছি
বলে দিতে পারো তা আমায়।
হয়তো আমার কোনো প্রয়োজন নেই,
কেন লেগে থাকি একটা কোনায়।”

তাসনুভা সহ্য করতে না পেরে গর্জে উঠল,“ইয়েস! আপনি এইসব আদিমকালের প্যানপ্যানে গান শুনিয়ে বড্ড বিরক্ত করছেন আনিস ভাই। দয়া করে থামান।”

তিতলি মিনতি করে বলল,“ভাইয়ে, চল না সুজন গানটা দাও না।”

শাওন নাক সিটকাল,“ধুর মিয়া ওসব জমবে না।”

তাসনুভা গম্ভীর গলায় ঘোষণা দিল,“আমি চুজ করবো মিউজিক।”

শেষমেশ তার হাতেই ছেড়ে দেওয়া হলো গান বাছাইয়ের দায়িত্ব। একটু স্ক্রল করে সে ছেড়ে দিল,

“Let me love you.”

শাওন সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি তুলল,“ইংলিশ গান বুঝিনা নুভা। জমতেছে না। আরেকটা দাও।”

এইবার আর সহ্য করতে পারলো না আনিস। ফোনটা কেড়ে নিয়ে বলল,“এবার আমি যেটা দেব, সেটাই চলবে।”

বলেই সে গান সিলেক্ট করল। গাড়ির ভেতর ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল সুর,

“তোমারে দেখিলো পরানো ভরিয়া,
আসমান জমিন দরিয়া
চলিতে চলিতে থামিয়া
দেখিবো তোমারে আমিও

হো… রূপে দিলা তুমি পাগল করিয়া…”

তাসনুভা বলল,“হুঁ… নাইস!”

এক পাশে নীল সমুদ্রের অবিরাম ডাক, অন্য পাশে সবুজে মোড়া ছোট-বড় পাহাড়ের সারি।

কোথাও কোথাও পাহাড়ের বুক চিরে নেমে এসেছে স্বচ্ছ ঝর্ণাধারা, সূর্যের আলোয় ঝিলমিল করছে তার জলরাশি। প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য চোখে ভরে নিতে নিতে, নীরব মুগ্ধতায় তাদের সফরের ইতি টানল।


শাহিদা বেগম কপালে হাত দিয়ে রান্নাঘরে বসে আছেন। আফসার বাজারের থলে রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করলেন,

“কি হয়েছে আবার?”

শাহিদা বেগম বললেন,”আমি এই বাড়িতে আর থাকবো না। আমি আমার বাপের বাড়িতে চলে যাব। একটা রিকশা এনে দাও। ওদের সংসার ওরা যা করার করবে। আমি এখানে আর থাকবো না।”

শাহিদা বেগম বললেন,”ওই ছেলে আমাকে শেষ করে দিছে।”

“কোন ছেলে?”

“কক্সবাজারে আবার কোন মেয়ের ধান্ধায় পড়লো জানিনা। অফিসে যাওয়ার সময় আনিস আমাকে বলল, আম্মা আমি বিয়েশাদি করবো না। আমার ভালো লাগছে না।”

“এ কেমন কথা?”

“ওই ছেলে যদি আর কখনো বলে আম্মা আমি বিয়ে করবো। ওর বউ আমি ঘরে তুলবো না। যেদিকে ইচ্ছে সেদিকে চলে যাবে ও বউ নিয়ে। বড়ো বৌমা আমি তোমাকে বলে রাখলাম কিন্তু।”

সাবরিনা মিটমিট করে হাসছে।

চলমান..

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply