নির্লজ্জ_ভালোবাসা
লেখিকাসুমিচৌধুরী
পর্ব ৫৯ (❌কপি করা নিষিদ্ধ❌)
ডাক্তার অত্যন্ত নিচু আর ভাঙা স্বরে বললেন।
“সরি। আসলে মেয়েটার প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। আমরা কিছুতেই রক্ত জোগাড় করতে পারছি না। মেয়েটার ও নেগেটিভ রক্ত। এই রেয়ার গ্রুপের রক্ত কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা ইতিমধ্যে শহরের অনেক হাসপাতালে খবর পাঠিয়েছি কিন্তু কোথাও নেই। আর থাকলেও তা শহরের শেষ প্রান্তে। ওই জ্যাম ঠেলে রক্ত আনতে আনতে আমরা পেশেন্টকে বাঁচাতে পারব না।”
ডাক্তারের এই কথা শোনামাত্র করিডোর জুড়ে কান্নার রোল আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। শিহাব মুহূর্তের মধ্যে রৌদ্র আর আয়ানের বাঁধন ছিঁড়ে পাগলের মতো ডাক্তারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সে ডাক্তারের কলার শক্ত করে চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
“কীহ বললি তুই? আমার আরশিকে বাঁচাতে পারবি না? বাইন*চুদ! তাহলে তুই ডাক্তার হয়েছিস কেন? এইভাবে মাথা নিচু করে সরি বলার জন্য? খোদার কসম আরশির যদি কিছু হয় তোকে তো মারবই তার সাথে তোর এই হাসপাতাল আমি মাটির সাথে মিশিয়ে দেব।”
ডাক্তার কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে শিহাবকে শান্ত করার চেষ্টা করে বললেন।
“দেখুন মিস্টার শিহাব। আমি বুঝতে পারছি আপনি কতটা আঘাত পেয়েছেন। কিন্তু বাঁচানো আর মারা এখন একমাত্র আল্লাহর হাতের ওপর। আমরা তো শুধুমাত্র উছিলা। আমি তো বলছি মেয়েটার শরীর থেকে এত বেশি রক্ত বের হয়ে গেছে যে ওর শরীর এখন সাদা হয়ে গেছে। ও নেগেটিভ রক্ত পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছি কিন্তু সময় আমাদের হাতে নেই।”
সবার কান্না থামছেই না। প্রত্যেকের বুক ফেটে যাচ্ছে কিন্তু এখানে কারো ও নেগেটিভ রক্ত নেই। উপস্থিত সবাই যেন এক অসহায় মৃত্যুর অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। হঠাৎ রৌদ্র পাগলের মতো ডাক্তারের সামনে গিয়ে আর্তনাদ করে বলল।
“ডাক্তার আমি রক্ত খুঁজব। আমি যেভাবে হোক রক্ত নিয়ে আসব। আপনি শুধু আমার বোনটার নিশ্বাসটুকু আঁকড়ে ধরে রাখেন। ওকে যেতে দিবেন না ডাক্তার।”
শিহাব ইতিমধ্যে কোনো কথা না বলে হাসপাতালের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে। সে রাস্তার মাঝখানে উন্মাদের মতো দাঁড়িয়ে পড়ছে আর যাকে দেখছে তাকেই খামচে ধরছে। পথচারীদের পথ আটকে সে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করতে লাগল।
“আপনার কি ও নেগেটিভ রক্ত? আল্লাহর দোহাই লাগে বলেন আপনার রক্ত কি ও নেগেটিভ?”
কিন্তু সবাই মাথা নেড়ে না বলছে। কারো ও নেগেটিভ রক্ত নেই। শিহাবের দুচোখ বেয়ে তখন নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। যে মানুষের সামনে কোনোদিন মাথা নত করেনি আজ সে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভিখারির মতো রক্ত ভিক্ষা করছে।
আয়ান আর রৌদ্রও আলাদা আলাদা হয়ে বেরিয়ে পড়ল। তারা রাস্তার ধারের দোকানদার থেকে শুরু করে রিকশাচালক সবার কাছে গিয়ে ব্যাকুল হয়ে রক্ত খুঁজতে শুরু করল।
শিহাব দৌড়াতে দৌড়াতে এক সময় ক্লান্ত হয়ে মাঝরাস্তায় হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল। তার চারপাশে হাজারো মানুষের ভিড় আর গাড়ির শব্দ কিন্তু শিহাবের কানে তখন কেবল শ্মশানের হাহাকার। সে বুক ফাটানো এক চিৎকার দিয়ে বলতে লাগল।
“আরশি। প্লিজ ফিরে আসো একটা বার। কথা দিচ্ছি আর কষ্ট দিবো না অনেক ভালোবাসবো তোমায়। প্লিজ ফিরে আসো এইভাবে আমাকে ফেলে যেও না। আরশি আমার কলিজাটা ফেটে যাচ্ছে আমি শ্বাস নিতে পারছি না। আমার দম আটকে আসছে আরশি।”
মুহূর্তে শিহাব রাস্তার ধারে দুই হাত মোনাজাতের মতো তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল।
“হে আল্লাহ। তুমি আমার আরশিকে ভিক্ষা দাও। যদি ওর কিছু হয় তাহলে কিন্তু আমি আমার নিজের জীবন শেষ করে দিবো। তখন কিন্তু তুমি অভিযোগ জানাতে পারবে না। আমাকে একটা বার সুযোগ দাও আরশিকে ভালোবাসার। এইভাবে ওকে কেড়ে নিও না।”
শিহাব মাথা নিচু করে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। তার চোখের সামনে এখন সিনেমা রিলের মতো ভেসে উঠছে আরশির সাথে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত। আরশির সেই মিষ্টি দুষ্টুমি আরশির সেই মায়াবী হাসিমুখ। এইসব স্মৃতি যেন শিহাবের বুকটা এফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছে। শিহাব এই প্রথম হাড়ভাঙা সত্যটা বুঝতে পারছে। এই পৃথিবীতে আরশি না থাকলে তার চারপাশ একদম শূন্য। আগে কখনো যা মনে হয়নি আজ তা বিষের মতো নীল হয়ে ধরা দিচ্ছে। শিহাব বুঝতে পারছে তাকে বাঁচতে হলে আরশিকে চাই। এই জীবনে তার শ্বাস নেওয়ার জন্য হলেও আরশিকে বড় প্রয়োজন।
শিহাব কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎ নিজের ডান হাতের দিকে খেয়াল করল। মুহূর্তেই তার চোখের সামনে সকালের সেই বীভৎস ঘটনাটা ভেসে উঠল। এই হাত দিয়েই সে আজ আরশিকে মেরেছে। এই হাত দিয়েই সে তার প্রিয়তমাকে আঘাত করেছে। এক প্রচণ্ড ঘৃণা আর আক্রোশে শিহাবের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে গেল। সে উন্মাদের মতো নিজের হাতটা রাস্তার পিচের ওপর সজোরে ঘুষি মারতে লাগল আর চিৎকার করে বলতে লাগল।
“এই হাত দিয়েই আজ আমি তাকে আঘাত করেছি ভাবতেই শরীর শিউরে ওঠে। কিভাবে পারল এই হাত এতটা নিষ্ঠুর হতে? আমার মন কীভাবে সায় দিল এই হাতটা তুলতে? বিবেক কোথায় ছিল, যে আমাকে থামাতে পারল না, তাকে না বুঝেই মারতে বাধা দিল না? আমি কীভাবে এতটা পাষাণ হয়ে উঠলাম।আজ আমি এই হাতকেই ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে ফেলব! একে আমি আস্ত রাখব না।”
শিহাবের প্রতিটি ঘুষির আঘাতে রাস্তার তপ্ত পিচ যেন কেঁপে উঠছে। কয়েকবার আঘাত করার পরই তার হাতের চামড়া ফেটে রক্ত বের হতে শুরু করল। হাড়ের ভেতর থেকে এক তীব্র যন্ত্রণার ঢেউ খেলে যাচ্ছে কিন্তু শিহাবের তাতে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে যেন এক ঘোরের মধ্যে আছে। সে শুধু দেখছে আরশিকে আঘাত দেওয়া ওই হাতটাকে শাস্তি পেতে।
এদিকে রৌদ্রের চোখেমুখে রাজ্যের অন্ধকার। সে একটা দোকান থেকে বের হয়ে অন্য দোকানে যাওয়ার জন্য উন্মাদের মতো ছুটছে। শরীরের ক্লান্তি বা রাস্তার ধুলোবালি কোনো কিছুই তার নজর কাড়ছে না। তার মাথায় শুধু একটা শব্দ ঘুরছে রক্ত। ও নেগেটিভ রক্ত না পেলে তার আদরের বোনটা আজ নিভে যাবে। হঠাৎ কারোর সাথে সজোরে ধাক্কা লেগে রৌদ্র ছিটকে পড়ল। সে মাথা নিচু করেই কাঁপা গলায় বলল।
“সরি। সরি ভাই। আসলে আমি খেয়াল করিনি। আমি ঠিক নেই।”
যার সাথে ধাক্কা লেগেছে সে থমকে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে বলল।
“আরে আপনি? আপনার সাথে এইভাবে আবার দেখা হয়ে যাবে ভাবতেও পারিনি।”
রৌদ্র ঝাপসা চোখে তাকিয়ে দেখল সেইদিনের মেয়েটা। সৃজনী। রৌদ্রের বিধ্বস্ত চেহারা আর চোখ ভরা জল দেখে সৃজনী চমকে উঠল। সে ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“কী ব্যাপার। আপনার এই অবস্থা কেন? আপনি এভাবে কাঁদছেন কেন?”
রৌদ্র কোনোমতে চোখের পানি মুছে রুদ্ধশ্বাসে বলল।
“আমার বোনের খুব ভয়াবহ এক্সিডেন্ট হয়েছে। ওর শরীর থেকে সব রক্ত বের হয়ে গেছে। আমি রক্ত খুঁজছি কিন্তু কোথাও পাচ্ছি না।”
সৃজনী পরিস্থিতি বুঝতে পেরে দ্রুত জিজ্ঞেস করল।
“বলেন কী। কী গ্রুপের রক্ত লাগবে?”
“ও নেগেটিভ।”
সৃজনী এক মুহূর্ত দেরি না করে রৌদ্রের হাত টেনে ধরে বলল।
“ও নেগেটিভ। আপনার বোন ভাগ্য নিয়ে জন্মেছে। আমার ভাইয়ের ব্লাড গ্রুপ ও নেগেটিভ। ওই যে দেখুন আমার ভাই সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। আপনি আমার সাথে আসুন।”
রৌদ্রের নিভে যাওয়া চোখে যেন হঠাৎ একরাশ আলো জ্বলে উঠল। সে সৃজনীর সাথে দৌড়ে একটা প্রাইভেট কারের কাছে এলো। সৃজনী জানালার কাঁচ নামিয়ে চেঁচিয়ে বলল।
“ভাইয়া। তাড়াতাড়ি বের হও। ইমার্জেন্সি।”
গাড়ি থেকে একটা লোক ভ্রু কুঁচকে বের হলো। আর রৌদ্র তাকে দেখামাত্র স্মৃতি হাতড়ে উঠল। সে অবাক হয়ে বিড়বিড় করে বলল।
“তুমি নেহাল না? আরশির সেই ফ্রেন্ড কাম বড় ভাই? আরশি তোমাকে নিয়ে কত গল্প করত আমাদের কাছে।”
রৌদ্রের কথা শুনে নেহালও চিনতে পারল। সে হাসিমুখে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে বলল।
“আরে রৌদ্র যে। কেমন আছো ভাইয়া?”
রৌদ্র নেহালের হাসি বা সৌজন্যবোধের উত্তর দিল না। সে সরাসরি নেহালের হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরে ছোট বাচ্চার মতো কেঁদে ফেলল। সে ডুকরে উঠে বলল।
“নেহাল। আরশির এক্সিডেন্ট হয়েছে ও মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। ওর ও নেগেটিভ রক্ত দরকার। আরশিকে বাঁচানো যাবে না যদি তুমি সাহায্য না করো। প্লিজ নেহাল। আমার বোনটাকে এভাবে মরতে দিও না দয়া করো একটু।”
নেহালের মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। তার চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। সে রৌদ্রের কাঁধ ধরে ঝাকুনি দিয়ে বলল।
“কী বলছ এসব। আরশির এক্সিডেন্ট হয়েছে? কখন? কোথায়?”
“হাসপাতালে নেহাল। সময় নেই। আমাদের এখনই যেতে হবে।”
সৃজনী তখন পাশ থেকে অবাক হয়ে বলল।
“ভাইয়া। তোমরা কি আগে থেকেই পরিচিত?”
নেহাল ব্যস্তভাবে গাড়ির দরজা খুলতে খুলতে বলল।
“হ্যাঁ। সেসব পরে হবে। সৃজনী তুই গাড়িতে বস। রৌদ্র তুমি তোমার গাড়ি নিয়ে টানো। আমি ঠিক তোমার পেছনেই আসছি। এক সেকেন্ডও দেরি করা যাবে না।”
রৌদ্রের শরীরে যেন অমানবিক এক শক্তি ফিরে এল। সে দৌড়ে গিয়ে নিজের গাড়িতে স্টার্ট দিল। ইঞ্জিনের গর্জনে যেন তার মনের সব আর্তনাদ মিশে গেল। রৌদ্রের গাড়িটা বাতাসের গতিতে হাসপাতালের দিকে ছুটতে লাগল আর নেহাল তার ঠিক পেছনেই নিজের গাড়িটা ধাওয়া করতে লাগল।
হাসপাতালের সামনে টায়ার ঘষার বিকট শব্দে গাড়ি থামল। রৌদ্র এক মুহূর্ত দেরি না করে নেহালকে প্রায় টেনে হিঁচড়ে হাসপাতালের ভেতরে নিয়ে গেল। করিডোরে পা রাখতেই রৌদ্র উন্মাদের মতো চিৎকার করে ডাক্তার ডাকতে শুরু করল। তার গলার আওয়াজে পুরো করিডোর কেঁপে উঠল।
ডাক্তার এগিয়ে আসতেই নেহাল রৌদ্র কে থামিয়ে দিয়ে গম্ভীর অথচ দৃঢ় গলায় ডাক্তার কে বলল।
“ডাক্তার। কত রক্ত লাগবে আপনার? আমার শরীর থেকে সব রক্ত নিয়ে নিন। আমার শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও আরশিকে বাঁচান।”
ডাক্তার নেহালের কথা শুনে আশার আলো দেখতে পেলেন। তিনি কালক্ষেপণ না করে নেহালকে দ্রুত ইমার্জেন্সি রুমে নিয়ে গেলেন। ওপাশে রৌশনি খানের জ্ঞান ফিরেছে। তিনি তনুজা খানের কাঁদে মাথা রেখে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে শুধু আল্লাহকে ডাকছেন। তার চোখের জল শুকিয়ে এখন গাল নোনা হয়ে গেছে।
সৃজনী রৌদ্রের বিধ্বস্ত পরিবারের দিকে একবার তাকাল। সবার চোখেমুখে মৃত্যুর বিভীষিকা আর হারানোর ভয়। সে বুঝতে পারল এটাই রৌদ্রের পরিবার। এই মানুষগুলোর কাছে আরশি শুধু একটা নাম নয়। আরশি তাদের কলিজার অংশ। সৃজনী শান্ত হয়ে এক কোণে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখেও জল চিকচিক করছে।
রৌদ্র আয়ানকে ফোন করে জানিয়ে দিল যে রক্ত পাওয়া গেছে। আয়ান আসার পথে শিহাবকে বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখতে পায় এবং তাকে এক প্রকার জোর করেই সাথে নিয়ে হাসপাতালে আসে। হাসপাতালের করিডোরে এখন এক ভয়াবহ নীরবতা। রৌশনি খান থেকে শুরু করে পরিবারের সবাই এখন মন-প্রাণ খুলে দোয়া করছে আর আল্লাহকে ডাকছে। শিহাবের শরীরের সব শক্তি যেন নিভে গেছে সে করিডোরের এক কোণায় দুই পা বিছিয়ে ধপ করে বসে পড়ল। তার পিঠটা দেয়ালের সাথে ঠেকে আছে, চোখের জল শুকিয়ে এখন সেখানে কেবল নোনা দাগ অবশিষ্ট।
দীর্ঘক্ষণ পর অপারেশন থিয়েটারের ভারী দরজাটা খুলে গেল। ডাক্তার বের হলেন, আর তার ঠিক পেছনেই নেহাল। যে হাত থেকে রক্ত নেওয়া হয়েছে, নেহাল সেই হাতে শক্ত করে তুলা চেপে ধরে আছে, তার মুখটা রক্তশূন্যতায় কিছুটা ফ্যাকাশে। নেহালকে টলতে দেখে সৃজনী দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তাকে ধরল। ডাক্তারকে দেখামাত্রই আনোয়ার খান অস্থির হয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তার কণ্ঠস্বরে মিনতি ঝরে পড়ল।
“ডাক্তার! আমার মেয়ে কেমন আছে? ও ঠিক আছে তো?”
ডাক্তার এবারও মাথা নিচু করে অত্যন্ত অসহায় গলায় বললেন।
“দেখুন, রক্তের যে অভাব ছিল সেটা পূরণ হয়েছে। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। আপনার মেয়ে নিজেই এখন আর বাঁচতে চাইছে না। মেডিকেল সায়েন্সে আমাদের করার অনেক কিছু থাকে, কিন্তু পেশেন্টের যদি নিজের ইচ্ছাশক্তি না থাকে তবে আমরা নিরুপায়। আমার মনে হয় আপনার মেয়েকে কেউ প্রচণ্ডভাবে হার্ট করেছে, যার অভিমানে ও নিজেই নিজের জীবনটা ছেড়ে দিতে চাচ্ছে। রোগী যদি এমনভাবে নিজেকে গুটিয়ে নেয়, তবে আমি আগেই মাফ চেয়ে নিচ্ছি যেকোনো সময় ওর নিঃশ্বাস থেমে যেতে পারে।”
ডাক্তারের এই কথাগুলো প্রতিটি মানুষের বুকে তপ্ত সিসার মতো বিঁধল। শান্ত চৌধুরী এতক্ষণ স্থির হয়ে সব দেখছিলেন, কিন্তু এবার তার ধৈর্য বাঁধ মানল না। তিনি ধীর পায়ে এসে শিহাবের সামনে দাঁড়ালেন। শিহাবের শূন্য চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি তীব্র ঘৃণা আর আক্রোশে ফেটে পড়লেন।
“কী হলো? কাঁদছিস কেন? তুই তো এটাই চেয়েছিলি যে মেয়েটা তোকে মুক্তি দিক, তোকে শান্তি দিক! আজ ঠিক তাই হচ্ছে দেখ। মেয়েটা আর ফিরতে চাচ্ছে না। কতটা কষ্ট পেলে, কতটা অপমান সইলে একটা মেয়ে নিজের জীবনকে এভাবে তুচ্ছ করে দেয় শিহাব? আজ তোর ঘৃণা জিতেছে, আরশি হেরে গেছে।”
শান্ত চৌধুরীর প্রতিটি কথা বিষাক্ত তীরের মতো শিহাবের বুকে এসে বিঁধল। প্রতিটি শব্দ যেন কলিজার ভেতর কেউ ধারালো ছুরি দিয়ে জ্যান্ত চিরে ফেলছে। আরশি বাঁচতে চাইছে না? না, এটা হতে পারে না! আরশি না বাঁচলে শিহাব এই মৃতবৎ শরীর নিয়ে কার জন্য বাঁচবে? আরশিকে ফিরতেই হবে, যে কোনো মূল্যে, যে কোনো বিনিময়ে।
মুহূর্তে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে শিহাব টলতে টলতে গিয়ে ডাক্তারের পা জড়িয়ে ধরল। মেঝের ওপর মাথা ঠুকে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে সে বলতে লাগল।
“ডাক্তার, আমার নিশ্বাসের কসম লাগে! জাস্ট একটা বার আমাকে আরশির কাছে যেতে দিন। জাস্ট একটা মুহূর্তের জন্য ওকে দেখতে দিন! আমি আপনার পায়ে পড়ি ডাক্তার, দোহাই লাগে আপনার, আমাকে আমার আরশির সাথে একটু দেখা করতে দিন!”
ডাক্তার শিহাবের এই বিধ্বস্ত রূপ দেখে কিছুটা থমকে গেলেন। তিনি অত্যন্ত গম্ভীর মুখে বললেন।
“দেখুন মিস্টার শিহাব, রোগীর অবস্থা এখন চরম সংকটজনক। আপনি যদি ওখানে গিয়ে আবার কোনো পাগলামি করেন, তবে সেটা তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে।তার হার্টবিট খুব দুর্বল, আর সে কোনোভাবেই বাঁচার জন্য রেসপন্স করছে না।”
শিহাব এবার নিজের দুই হাত জোড় করে বুক ফাটানো আর্তনাদ নিয়ে বলল।
“ডাক্তার, আমি শপথ করছি আমি কোনো পাগলামি করব না! আমি কিচ্ছু করব না ডাক্তার। আমি জাস্ট একটু দূর থেকে আমার আরশিকে একনজর দেখব। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে ডাক্তার, আমার বুকের ভেতর কেমন যেন বিষম ব্যথা হচ্ছে! আমি আমি ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারছি না। ডাক্তার, আমার ওপর একটু দয়া করুন! আমাকে ওর কাছে যেতে দিন, আমি আর সহ্য করতে পারছি না আমি পাগল হয়ে যাবো ডাক্তার।”
শিহাবের সেই হাহাকারে হাসপাতালের করিডোরের ভারী বাতাস যেন আরও গুমোট হয়ে উঠল। তার চোখের জল ডাক্তারের জুতোর ওপর পড়ছে। যে শিহাব আরশিকে দেখতে পারত না, আজ সে আরশিকে একপলক দেখার ভিক্ষায় রাস্তার ধুলোয় মিশে গেছে। ডাক্তার শিহাবের চোখের সেই গভীর হাহাকার আর আকুতি দেখে আর না বলতে পারলেন না। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে নার্সকে উদ্দেশ্য করে বললেন।
“ওকে স্টেরাইল গাউন পরিয়ে ভেতরে নিয়ে যাও। তবে সাবধান, একদম কোনো শব্দ করা যাবে না।”
নার্স ডাক্তারের নির্দেশমতো শিহাবকে একটি নীল রঙের স্টেরাইল গাউন পরিয়ে দিল। শিহাবের প্রতিটি কদম যেন একেকটা পাহাড়ের মতো ভারী মনে হচ্ছে। সে যখন ধীরে ধীরে আইসিইউ-র সেই হিমশীতল কেভিনে ঢুকল, তার কলিজাটা যেন মুহূর্তেই ছ্যাত করে উঠল।
ভেতরে কোনো শব্দ নেই, শুধু যান্ত্রিক কিছু বিপ বিপ আওয়াজ আর আরশির টেনে টেনে নেওয়া নিঃশ্বাসের শব্দ। বেডের ওপর আরশি শুয়ে আছে অসহায়, নিথর।ওর মাথায় সাদা ব্যান্ডেজটা রক্তে ভেজা, মুখটা বিশাল এক অক্সিজেন মাস্কে ঢাকা। সেই মাস্কের ভেতর দিয়ে আরশির নিশ্বাসগুলো কাঁচের গায়ে কুয়াশা তৈরি করছে। ওর দুই হাতে অসংখ্য সূঁচ আর পাইপ ঢুকানো, যা দিয়ে জীবনদায়ী ওষুধ আর নেহালের দেওয়া রক্ত ওর শরীরে প্রবেশ করছে।
আরশি একদম সোজা হয়ে শুয়ে আছে, ঠিক যেন একটা সাদা পাথরের মূর্তির মতো। ওর সেই চঞ্চলতা নেই, সেই দুষ্টুমি নেই, নেই শিহাবের ওপর করা সেই হাজারো অভিমানী কথা। শিহাব কাঁপতে কাঁপতে আরশির বেডের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। ওর পায়ের শক্তি যেন একদম ফুরিয়ে গেছে। সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না, আরশির একদম কাছে ফ্লোরে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল।
শিহাবের চোখ থেকে টপটপ করে অশ্রু গড়িয়ে হাসপাতালের সাদা ফ্লোরে পড়ছে। চারদিকের হিমশীতল নীরবতায় কেবল শিহাবের কান্নার অস্ফুট শব্দ আর আরশির যান্ত্রিক নিশ্বাসের আওয়াজ। শিহাব নিজের কাঁপতে থাকা দুই হাত বাড়িয়ে আরশির বাম হাতটা পরম মমতায় নিজের মুঠোর মধ্যে নিয়ে নিল। সেই হাতটা আজ বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে। শিহাব নিজের কপাল আরশির হাতের ওপর ঠেকিয়ে আর্তনাদ করে বলতে লাগল।
“আ-আ-আরশি শুনতে পাচ্ছো? তোমার এই অপরাধী প্রেমিক কী বলছে ? আরশি শোনো না, আমি না অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি। জানি আমাকে মাফ করা যায় না আরশি, আমি ক্ষমার অযোগ্য। কিন্তু আমাকে একটা বার মাফ করো। প্লিজ আরশি, একবার ফিরে আসো।”
শিহাবের চোখের জল আরশির হাতের ওপর মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে। সে আরশির নিথর হাতের আঙুলগুলোতে নিজের মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার কণ্ঠস্বরে এক বুক হাহাকার।
“তোমাকে যতটা কষ্ট দিয়েছি আরশি, কথা দিচ্ছি তার থেকেও বেশি ভালোবাসা দিয়ে তোমার সব ক্ষত মুছে দেবো। তোমাকে আর কখনো চোখের জল ফেলতে দেবো না। শুধু একবার চোখটা খোলো না আরশি! তোমাকে এভাবে নিথর হয়ে শুয়ে থাকতে দেখে আমার কলিজাটা ফেটে যাচ্ছে। আমি যে আর নিতে পারছি না আরশি, আ-আ-আমি একদম মরে যাবো তোমাকে ছাড়া,প্লিজ আরশি চোখ খোলো।”
শিহাব আরশির হিমশীতল হাতের ওপর কপাল ঠেকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার চোখের উত্তপ্ত জল আরশির নিথর চামড়ায় মিশে যাচ্ছে। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! আজ আরশি মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে বলেই শিহাবের কাছে তার কদর এত বেড়েছে। এই আরশিই যখন সুস্থ ছিল, তখন সে একটুখানি ভালোবাসার জন্য শিহাবের পেছনে ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াত। আজ শিহাব যেভাবে কাঁদছে, আরশি যদি সুস্থ অবস্থায় এই দৃশ্য দেখত, তবে মেয়েটা খুশিতে পাগল হয়ে যেত। শিহাবের চোখের এক ফোঁটা জল মোছার জন্য সে নিজের সারা দুনিয়া বিসর্জন দিয়ে দিত।
কিন্তু আজ সেই চঞ্চল মেয়েটা বড্ড শান্ত, বড্ড চুপচাপ। তার এই নীরবতা যেন এক পাহাড়সম অভিমান। সে যেন বুঝিয়ে দিচ্ছে, অনেক তো অবহেলা করেছ, এবার আমি সারাজীবনের জন্য চুপ হয়ে যেতে চাই।
শিহাব এবার পুনরায় কাঁদতে কাঁদতে ভেঙে পড়া গলায় বলল।
“আমি বুঝতে পারছি আরশি, তুমি ছাড়া আমার এই জীবনটা একদম শূন্য। এই জীবনে বেঁচে থাকতে হলে আমার তোমাকে চাই। লাস্ট বারের মতো একটাবার সুযোগ দাও, ফিরে আসো আরশি! আমার জীবনের কসম দিয়ে বলছি, এরপর থেকে এক চুল পরিমাণও কষ্ট তোমাকে আর দেব না। আমার প্রিয়তমা আরশি, প্লিজ ফিরে আসো একটা বার!”
শিহাবের ঠোঁট দুটো আরশির হাতের ওপর কাঁপছে। সে পাগলের মতো আরশির হাতের আঙুলগুলোতে চুমু খাচ্ছে আর নিজের বুকের সবটুকু হাহাকার উজাড় করে দিচ্ছে।
শিহাব এবার একটু জোরেই কেঁদে উঠল, তার গলার স্বর কান্নায় ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। সে আরশির হাতের ওপর মুখ গুঁজে আর্তি জানাল।
“আরশি আমার সোনা, একটু চোখটা খোলো। আমি যে আর পারছি না! আ-আমার আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, বুকে ভী-ভী-ভীষণ কষ্ট হচ্ছে আরশি। একটু দয়া করো তোমার এই অপরাধী হাসবেন্ডের ওপর। এইভাবে আমাকে একা ফেলে যেও না, আমি আমি পাগল হয়ে যাব!”
শিহাবের মনে হলো, আরশি যেন খুব দূর থেকে তার ডাক শুনতে পাচ্ছে। সে নিজের সমস্ত আবেগ এক জায়গায় জড়ো করে ধীরে ধীরে মুখটা আরশির কানের কাছে নিয়ে এল। খুব কাছ থেকে আরশির কানের কাছে একদম মধুর স্বরে, গভীর মমতা নিয়ে বলল।
“আই লাভ ইউ আরশি আই লাভ ইউ সো মাচ।”
কথাটা শেষ হতে না হতেই যেন এক অলৌকিক ঘটনা ঘটে গেল। আরশি হঠাৎ এক দীর্ঘ আর বিশাল শ্বাস নিল, তার বুকটা অনেকটা উঁচুতে উঠে গেল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই সে তার অবশ হাত দিয়ে শিহাবের হাতটা শক্ত করে খামচে ধরল। আরশি সমান তালে বড় বড় শ্বাস নিতে লাগল, যেন সে ডুবন্ত অবস্থা থেকে তীরের দেখা পেয়েছে।
শিহাব ভয়ে আর আনন্দে উন্মাদের মতো হয়ে গেল। সে পাগলের মতো চিৎকার করে ডাক্তারকে ডাকতে লাগল।
“ডাক্তার! ডাক্তার! দেখুন আরশি শ্বাস নিচ্ছে! ও আমার হাত ধরেছে! ডাক্তার জলদি আসুন!”
ডাক্তার এবং নার্সরা ঝড়ের গতিতে ভেতরে ঢুকে পড়লেন। ডাক্তার আরশির পালস এবং মনিটর পরীক্ষা করে বিস্ময়ে আর খুশিতে নার্সের উদ্দেশ্যে বললেন।
“আলহামদুলিল্লাহ! রোগী রেসপন্স করছে! মিরাকল ঘটে গেছে! তাড়াতাড়ি পেশেন্টকে মেইন আইসিইউ সেটআপে নিন, কুইক! শিহাব সাহেব, আপনি বাইরে যান, আমরা এখন ওকে অবজারভেশনে নেব।”
রানিং…!
Share On:
TAGS: নির্লজ্জ ভালোবাসা, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৪২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৪৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২০
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৪৪
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৩৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৪৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৩