ভবঘুরে_সমরাঙ্গন
পর্ব_৬৮
তাজরীন ফাতিহা
সময় পেরিয়ে যায় স্রোতের গতিতে। মানহার প্রেগন্যান্সির প্রায় আট মাস। হাত, পা ফুলে গেছে। গর্ভবতী মায়ের আদর্শ উদাহরণ মানহা আফরিন। অল্ট্রাসোনোগ্রাফি করে জানা গেছে ছেলে বাচ্চা হবে। উর্মি ভুঁইয়া আগে থেকেই ছেলে বাচ্চার সংবাদ দিয়েছিলেন। কারণ ভুঁইয়া পরিবারে প্রথম বাচ্চা সবসময় ছেলেই হয়। এ নিয়ে ইহাবের সামান্য মন খারাপ। সে চেয়েছিল মেয়ে অথচ হবে ছেলে। আসলে কারো চাওয়ায় তো কিছু আসে যায়না এখানে মহান আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছেই মুখ্য। মানহা অবশ্য এসব নিয়ে মোটেও চিন্তিত নয়। ছেলে মেয়ে যাই হোক আল্লাহর দান। আদর্শ সন্তান হিসেবে যেন বেড়ে উঠতে পারে এই দোয়াই প্রতিনিয়ত করে সে। কুরআন তেলাওয়াত, নামাজ কোনো কিছুই বাদ দেইনি প্রেগন্যান্সির সময়ে। ইহাব যথেষ্ট খেয়াল রাখে তার। আজকে তাকে বাবার বাড়িতে রেখে আসবে। কারণ ইহাবের ঢাকায় যেতে হবে। যাওয়াটা জরুরি। কোন মিশন আছে নাকি।
মানহা কুরআন তেলাওয়াত করছিল মনোযোগ দিয়ে। এরমধ্যে ইহাব এল। ইদানিং নামাজ পড়ছে, কুরআন তেলাওয়াত মোটামুটি করার চেষ্টা করছে। মানহাকে কুরআন তেলাওয়াত করতে দেখে নিজেও এসে পাশে বসল। মানহা তেলাওয়াত শেষে ইহাবের দিকে ফিরে মুচকি হাসল। ইহাবও হাসল। হেসে বলল,
“কিছু লাগবে?”
মানহা উপর নিচে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে বলল,
“লাগবে।”
“কি?”
মানহা উঁচু পেটটা নিয়ে একটু হেলান দিতে চাইলে ইহাব সাহায্য করল। মানহা ইহাবের হাত ধরে বলল,
“আমাকে একটা সূরা তেলাওয়াত করে শোনান।”
ইহাব আমতা আমতা করে বলল,
“আসলে এখন ওযু নেই।”
“নামাজ, তেলাওয়াতের কথা বললেই একটা অজুহাত দাঁড় করানো লাগবেই? আপনি জানেন একজন সন্তান ভালো নাকি খারাপ হবে তা ডিপেন্ড করে মা, বাবার আমলের উপর?”
“তুমি তো করছই।”
“শুধু মায়ের আমলেই হবে? বাবার আমলের প্রয়োজন নেই? সন্তান কি আমার একার আপনার নয়?”
“আমি তো তা বলিনি। আমি এখন যথেষ্ট চেষ্টা করি নামাজ ও কুরআন পড়ার।”
“চেষ্টা করেই ক্ষান্ত হবেন কেন? আপনি একজন দ্বীনদার মানুষ হওয়ার চেষ্টা করবেন। সন্তান হচ্ছে দেখে সব করবেন তারপর ছেড়ে দেবেন এই মেন্টালিটি পরিত্যাগ করুন। মনে রাখবেন, দিনশেষে সকলকে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হবে। আর আমি চাই আমার স্বামী, সন্তান আর পরিবারের সকলকে নিয়ে একসাথে জান্নাতের অমিয় সুধা পান করতে। তাই গড়িমসি চিন্তা বাদ দিন। আল্লাহ আমাদের সকলকে পাঠিয়েছেন তার ইবাদতের জন্য আর আমরা কি করছি? প্রশ্নটা কখনো নিজেকে করেছেন?”
ইহাব ফোঁস করে নিঃশ্বাস নিয়ে বলল,
“আমার তেলাওয়াত শুদ্ধ নয়। তেলাওয়াত শুদ্ধ না হলে তুমিই তো বলেছ গুনাহ হয়। এখন নাহয় তুমিই পড়।”
“শুদ্ধ নয় শুদ্ধ করবেন। শুদ্ধ নয় বলে তো থেমে থাকা যাবে না। আসুন আপনাকে শিখিয়ে দেই।”
এরপর ইহাবকে এক ঘন্টা কুরআনের বিভিন্ন ছবক দিল মানহা। ইহাব মনোযোগ দিয়ে সব শুনল, উচ্চারণের চেষ্টা করল। কিছুটা আয়ত্তে এসেছে তার। মানহা প্রায়ই তাকে শুদ্ধভাবে কুরআন পড়ানোর চেষ্টা করে। মানহার ইদানিং প্রচণ্ড ভয় কাজ করে। মনে হয় পৃথিবীটা সংকীর্ণ হয়ে আসছে। সে বোধহয় বেশিদিন বাঁচবে না। তাই নিজেকে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার সর্বত্র চেষ্টা করে। ভাবি প্রায়ই তার খোঁজখবর নেয়। এসময়ে বেশিবেশি ইবাদত করতে বলেছেন। আল্লাহর কাছে সন্তান সুস্থভাবে যেন ভূমিষ্ট হয় এরজন্য দোয়া করতে বলেছেন। বিভিন্ন দোয়া শিখিয়ে দিয়েছেন। ভাবির কাছে এজন্য সে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে।
উর্মি ভুঁইয়া মা সব জামাকাপড়, ওষুধ গুছিয়ে দিচ্ছেন। মানহা ছলছল চোখে সব দেখছে। এই মানুষটা তাকে এত আদর আহ্লাদে রেখেছেন যে তাকে ছেড়ে যেতে মানহার মোটেও ইচ্ছে করছে না। উর্মি ভুঁইয়া ওষুধ ঢুকাতে ঢুকাতে বললেন,
“সময় করে ওষুধ খাবে। ফেলে রেখ না যেন। মায়ের কাছে যাচ্ছ এখন তো আর সমস্যা হবেনা। আদর, যত্নের ত্রুটিও হবেনা।”
মানহা পেটে হাত রেখে ধীরে ধীরে এসে উর্মি ভুঁইয়াকে পিছন থেকে হালকা জড়িয়ে ধরে বলল,
“আম্মু তোমাকে ছাড়া যেতে ইচ্ছে করছে না।”
উর্মি ভুঁইয়ার নিজেরও খারাপ লাগছে। মানহার যত্ন আত্তি কম করেনি সে। কিন্তু উপায় নেই কোনো। ইহাব থাকবে না। উর্মি ভুঁইয়া অসুস্থ থাকেন, ইমতিয়াজ ভুঁইয়া থাকেন বাইরে ব্যস্ত। এত বড় বাড়িতে মানহার ভয় লাগতে পারে। তাই ইহাবই ডিসিশন নিয়েছে যে মানহার বাচ্চা তার বাবার বাড়িতেই হবে। তাছাড়া প্রথম বাচ্চা নাকি বাবার বাড়িতে হওয়াই ভালো। অনেকগুলো আচারের বয়াম, রাতে টুকটাক খাওয়ার জন্য বিভিন্ন জিনিস সব সুন্দর করে গুছিয়ে দিলেন। সেখানে গিয়ে মায়ের আদরের যেন হাঁটাহাঁটি করতে ভুলে না যায় তাও বলে দিলেন। খুব সাবধানে কয়েকটা দিন পার করার নির্দেশ দিলেন। মানহা কান্নাচোখে সেই উপদেশ শুনল। এক মায়ের থেকে আরেক মায়ের কাছে যাত্রা শুরু করবে সে।
গাড়ি মাহাবুব আলমের বাড়ির সামনে থামতেই ইহাব হর্ন বাজালো। মানহা এতক্ষণ শক্ত থাকলেও এখন কেন যেন অসুস্থ অনুভব করছে। সে ইহাবের হাত খামচে ধরে বলল,
“এই শুনুন, আপনি যেখানেই যাবেন আমাকে নিয়ে যান। আমার আপনাকে ছাড়া একটুও ভালো লাগেনা।”
ইহাব কিছু বলতে নিলেই গেট খুলে মাহাবুব আলম আর মাহদী বেরিয়ে এল। ইহাব গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এল। তারপর মানহার পাশের দরজা খুলে তাকে ধীরে ধীরে বের করলো। মাহাবুব আলম এসে মেয়েকে ধরতে চাইলে মানহা বলল,
“বাবা, উনি নাকি চলে যাবেন। আমাকে ভেতরে দিয়ে আসুক।”
মাহাবুব আলম সম্মতি জানালেন। ইহাব মানহাকে ধরে মানহার রুমে বসালো। বোরকা খুলে দিল। মাহদী সব জিনিসপত্র বের করে বাড়িতে নিয়ে এসেছে। তারপর শরবত এনে ইহাব আর মানহাকে দিল। মানহা একটু খেল আর বাকিটুকু ইহাবের খেতে হলো। মাহদী গ্লাস নিয়ে বেরিয়ে যেতেই মানহা ইহাবের হাত খামচে ধরে বলল,
“আপনি থাকুন না।”
ইহাব মানহার গাল দুপাশ হাতের আঁজলায় নিয়ে বলল,
“আমার কাজ না থাকলে অবশ্যই থাকতাম। কাজটা ইম্পর্ট্যান্ট মানহা। তুমি চিন্তা করো না কাজ শেষে দ্রুত ফিরে আসব।”
মানহা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,
“একটা কথা বলি?”
“বলো?”
“আপনি কি কাজ করেন আমাকে বলা যাবে?”
“প্রশ্নটা আমার কাছে কঠিন। কাজ শেষ করে ফিরে এসে তোমাকে বলব। এসব নিয়ে দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। রিল্যাক্স মুডে থাকবে। ভয় পাওয়ার কিছু নেই।”
“আপনার কাজ শেষ হতে কতদিন লাগবে?”
“সঠিক জানি না। সাতদিন, একমাস এমনকি তিনমাসও লাগতে পারে। ডোন্ট ওয়ারি শীগ্রই এসে যাব।”
বলেই মানহার ললাটে চুমু এঁকে দিল। মানহা ইহাবের হাত দুটো ধরে বলল,
“ওখানে গিয়ে আবার নামাজ, কুরআন পড়ার কথা ভুলে যাবেন না যেন। বাবু কিন্তু বাবার প্রতীক্ষায় থাকবে।”
“আর বাবুর মা?”
মানহা অভিমানে মুখ ঘুরিয়ে বলল,
“সে তো বাবুর বাবাকে যেতে দিতেই নারাজ।”
ইহাব মানহার মাথাটা বুকে চেপে বলল,
“বাবুর বাবাও বাবুর মাকে ছেড়ে যেতে চাইছে না কিন্তু সে নিরুপায়।”
মানহা ভালো করে ইহাবের শার্টের কলার থেকে ঘ্রাণ নিল। পারফিউমের ঘ্রাণ নয়। কেমন যেন নেশাক্ত একটা ঘ্রাণ পাচ্ছে সে। শার্টের কলার সরিয়ে গলায় নাক ঠেকাতে সেই মাদকতা পূর্ণ ঘ্রাণটা আবারও নাসিকরন্ধ্রে বারি খেল। মানহা ঘ্রাণটা নাক দিয়ে শুষে নিতে চাইল। খানিকক্ষণ পর ইহাব মানহার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
“মানহা যেতে হবে। বেশি দেরি করলে রাত হয়ে যাবে পৌঁছতে পৌঁছতে।”
মানহা কেঁদে ইহাবের শার্টের কলার ভিজিয়ে ফেলেছে। ইহাব চোখের পানি মুছিয়ে দিতে দিতে বলল,
“কি শুরু করেছ বলো তো? এভাবে কাঁদলে আমি কিভাবে যাব? মায়েরা বেশি কাঁদলে বাচ্চার ক্ষতি হয়। আমি তো একেবারের জন্য যাচ্ছি না। শীগ্রই চলে আসার চেষ্টা করব। তাছাড়া তুমি এত কান্নাকাটি করলে আমার কাজে মন বসবে? গর্ভবতী স্ত্রীকে রেখে কাজে যাচ্ছি নিজের কাছেই তো খারাপ লাগছে। এই ইয়ার গ্যাপটা না দিলে পড়াশোনায় মন দিতে পারতে। এখন তো সারাক্ষণ আমার চিন্তা করেই তুমি অসুস্থ হয়ে যাবে।”
মানহা চোখ মুছে নিজেকে শক্ত করে বলল,
“হবো না। আপনি সহিসালামতে কাজ শেষ করে আসুন।”
ইহাব মানহার মাথায় চুমু খেয়ে নিচু হয়ে মানহার বাড়ন্ত পেটে চুমু খেয়ে বলল,
“পাপা মায়ের দায়িত্ব তোমাকে দিয়ে গেলাম। মাকে কখনো কষ্ট দেবেনা। আমার চ্যাম্প।”
পরপর পেটে অনেকগুলো চুমু দিয়ে সেখানে হাত রাখতেই মনে হলো কেউ ছুঁয়েছে তাকে। মানহা চিৎকার করে বলল,
“লাথি দিয়েছে।”
ইহাব হেসে বলল,
“লাথি নয় বাবার সাথে মোলাকাত করলো।”
তারপর দোয়া পড়ে মানহার সমস্ত শরীরে ফুঁ দিয়ে দিল। চলে যাওয়ার জন্য দাঁড়াতেই মানহা আবারও ফুঁপিয়ে উঠল। ইহাব মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই শান্ত হয়ে গেল। ইহাব বলল,
“তুমি শুয়ে থাকো আমি যাই।”
মানহা শার্ট খামচে ধরে বলল,
“না। আমি আপনাকে দিয়ে আসি।”
“হেঁটে আসতে কষ্ট হবে।”
“হবেনা।”
ইহাব মাথা নাড়িয়ে তাকে নিয়ে বের হতেই দেখল মায়মুনা বেগম ট্রেতে করে খাবার নিয়ে আসছেন। শাশুড়িকে দেখে ইহাব সালাম দিল। মায়মুনা বেগম জবাব দিয়ে বললেন,
“সেকি বাবা, কোথায় যাচ্ছ?”
“মা আমার কাজ আছে। এখন যেতে হবে।”
“কিছু মুখে দিয়ে যাও।”
“আজ আর সময় নেই।”
মানহা বলল,
“কিছু মুখে দিয়ে যান। সারা রাস্তায় কি খান না খান।”
“আরে এখন পেট ভরা। নাস্তা খেয়ে বের হয়েছি না। আরেকদিন এসে খাবো।”
মায়মুনা বেগম আবার জোর করতেই মানহা বলল,
“মা, জোর কোরো নাতো।”
মায়মুনা বেগম আর কিছু বললেন না। মাহাবুব আলম, মাহদী ইহাবকে বিদায় দিতে বেরিয়ে এল। বেপর্দা ভাবে মানহা আর বাইরে বেরোবে না। মাহাবুব আলম আর মাহদী গেটের বাইরে গিয়ে দাঁড়ালো। ইহাব মানহার কপালে ও মাথায় চুমু দিয়ে বেরোতে নিলে মানহা কান্না চেপে ডাকল,
“এই বাবুর বাবা?”
ইহাব ঘুরে ইশারায় জানতে চাইল কি? মানহা ফুঁপিয়ে উঠে ভাঙা গলায় বলল,
“প্রতিদিন ফোন দিবেন।”
ইহাব সম্মতি জানিয়ে বেরিয়ে গেল। সবাইকে বিদায় জানিয়ে ইহাব গাড়িতে বসে গাড়ি স্টার্ট দিতেই মানহা বাঁধ ভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়ল। তাকে একলা রেখে লোকটা গাড়ি হাঁকিয়ে চলে গেল। কি পাষাণ, নিষ্ঠুর লোক!
_
নিশাত ছেলের মাথা আঁচড়ে দিচ্ছে। নাহওয়ান মায়ের দিকে তাকিয়ে হাসল। নিশাত বলল,
“হাসলে লাভ হবেনা। আপনাকে একটা ছোট্ট দোয়া শিখিয়েছি ওটা মুখস্ত বলতে হবে।”
নাহওয়ান ঠোঁট উল্টে বলল,
“মা, বুলে গেসি।”
“কেন ভুলে যাবেন? আপনাকে শিখিয়েছি না?”
নাহওয়ান মন খারাপ করে বসে রইল। নাহওয়ান বড় হয়ে গেছে। সামনের মাসে চার বছরে পা দেবে সে। নিশাত ছেলেকে সূরা, দোয়া শেখাচ্ছে। নাহওয়ান এখন স্বরবর্ণ লিখতে পারে। নিশাত আস্তে আস্তে সব শিখিয়ে দিচ্ছে। ছয় বছরে একেবারে ওয়ানে ভর্তি করিয়ে দেবে। ঘরে বসিয়ে প্লে, নার্সারি, কেজি এসবের পড়া পড়িয়ে ফেলছে। ছেলেকে পরিপাটি করতে করতে জিজ্ঞেস করল,
“বলো তো কোন হাতে পানি খেতে হয়?”
“ডান হাতে।”
“খাবারের শুরুতে কি বলতে হয়?”
“বিসমিল্লাহ।”
“কোন কাত হয়ে ঘুমাতে হয়?”
“ডান কাত।”
“বাথরুমে কোন পায়ে ঢুকতে হয়?”
নাহওয়ান এবার মাথা চুলকাতে লাগলো। অর্থাৎ সে ভুলে গেছে। তবে এই বয়সে যতটুকু মাথায় আয়ত্ত করতে পেরেছে সেটার জন্যই নিশাত শুকরিয়া জ্ঞাপন করে। আস্তে আস্তে সব শিখে যাবে। নিশাত খেয়াল করেছে নাহওয়ান সবকিছু দ্রুত মাথায় ঢোকাতে পারে। ভুলে গেলেও একটা জিনিস বললে সেটা অনেকদিন মাথায় থাকে। এইটুকু বয়সে যতটুকু পারছে তারজন্য আলহামদুলিল্লাহ। অনেকের তো এ বয়সে কথা বলতেও সমস্যা হয়। নাহওয়ান এদিক দিয়ে আবার এগিয়ে। নিশাত ছেলেকে কোলের মধ্যে নিয়ে বলল,
“বাথরুমে দোয়া পড়ে বাম পায়ে ঢুকতে হয়।”
নাহওয়ান মায়ের সাথে সাথে বলল,
“বাম পায়ে ডুকতে হয়।”
“ইয়েস। বলো তো পানি কিভাবে খেতে হয়?”
“দাঁড়িয়ে।”
“হয়নি তো। পানি বসে খেতে হয়।”
নাহওয়ান ঘাড় নাড়িয়ে বলল,
“বসে খেতে হয়।”
মারওয়ান পাশের রুম থেকে রেডি হয়ে এসে বলল,
“কিরে পান্ডা কী করিস?”
“পড়া শিকি।”
“তোর আবার কিসের পড়া?”
নাহওয়ান হাত মেলে বলল,
“এত্ত পড়া।”
“বাইরে যাবি?”
“যাব।”
“আয়।”
নাহওয়ান মায়ের দিকে তাকাতেই নিশাত সম্মতি জানালো। এরপর নাহওয়ানকে আর পায় কে? দৌড় দিয়ে এসে বাবার পা জড়িয়ে ধরল। মারওয়ান ছেলেকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে যেতে নিলে নিশাত বলল,
“ওকে নিয়ে বেশিক্ষণ বাইরে থাকবেন না।”
“কেন?”
“বেশি ঘোরাঘুরি করলে পরে কিছু পড়তে চায়না।”
“এত উতলা হচ্ছ কেন তুমি? সময় কি পেরিয়ে যাচ্ছে? এতটুকু বাচ্চাকে মনে হচ্ছে তুমি পুরো পিএইচডি করিয়ে ছাড়বে।”
“আরে টুকটাক যাই শিখাই সেটাও শিখতে চায়না। খালি ঘুরতে যেতে চায় এজন্য বলেছি বেশিক্ষণ বাইরে রাখবেন না। ওকে কোনো কিছুতে বাধা দিয়েছি কখনো?”
“বাধা দেয়া লাগবে কেন? যে জুলুম করতেছ আমার ছাওটার উপর। এতটুকু মাথায় কতকিছু ঢুকাবে আর?”
“হ্যাঁ কিছু না শিখিয়ে আপনার মতো বানাবো তাই তো?”
মারওয়ান গম্ভীর গলায় বলল,
“আমার মতো বলতে?”
“আপনার মতো ভবঘুরে আরকি।”
“তোমার কি মনে হয় আমি অশিক্ষিত?”
“এখানে শিক্ষিত অশিক্ষিত বোঝাইনি? আমি নীতি নৈতিকতার কথা বুঝিয়েছি। আমি নাহওয়ানকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দিচ্ছি না, পারিবারিক শিক্ষা দিচ্ছি। যেটা সবসময় কাজে লাগে।”
“তুমি বলতে চাচ্ছ, আমার বাবা-মা আমাকে শিক্ষা দেয়নি?”
“আপনার বাবা, মায়ের অর্থাৎ আমার শ্বশুর শাশুড়ির শিক্ষার উপরে প্রশ্ন তোলার আগে তার বাকি সন্তানগুলোর দিকে আমাকে তাকাতে হবে। যেহেতু আব্বা, আম্মার সব সন্তান ভালো শুধুমাত্র আপনি বাদে সেহেতু গোঁড়ায় গলদ আপনার। সো, নিজেকে ঠিক করুন। ঘাউরাকে ঠিক করতে পারিবারিক শিক্ষা নয় বেত শিক্ষা জরুরি।”
শেষের বাক্যটা চিবিয়ে চিবিয়ে বলল নিশাত। মারওয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,
“বেত শিক্ষা মানে?”
“মানে কঞ্চি ও বেতের সপাং সপাং বারি।”
মারওয়ান চোখ তীক্ষ্ণ করে বলল,
“তোমার আস্পর্ধা দেখছি নিশাত!”
“আমিও দেখছি।”
মারওয়ান রাগান্বিত হয়ে ছেলেকে নিয়ে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেল। নিশাত সামান্য ঠোঁট প্রসারিত করে মারওয়ানের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল।
মারওয়ান ছেলেকে নিয়ে পার্কে হাঁটতে এসেছে। বিকেলে এদিকটায় হাঁটতে বেশ ভালোই লাগে। নাহওয়ান দৌড়াদৌড়ি করছে। মারওয়ান কোত্থেকে এক ফুটবল জোগাড় করে এনেছে। নাহওয়ান দৌঁড়ে এসে বলল,
“বাবা, গুলু বল কই পেয়েছ?”
“পেয়েছি একজায়গায়। চল খেলি।”
নাহওয়ান মাথা নাড়িয়ে গোলগাল শরীরটা নিয়ে বাবার পিছে পিছে দৌঁড়াতে লাগল। কিছুতেই বল নিতে না পেরে কেঁদে উঠতেই মারওয়ান বলল,
“আশ্চর্য কান্না করিস কেন? নে খেল।”
নাহওয়ান বল পেতেই বাবার দিকে কিক দিল। কিন্তু বল বেশিদূর এল না। মারওয়ান নিজেই এগিয়ে এসে আবার নাহওয়ানের দিকে ঠেলে দিল। দুই বাপ, বেটার খেলার মাঝেই এক সাত, আট বছর বয়সী বাচ্চা কাঁদতে কাঁদতে মাকে নিয়ে এসে বলল,
“উনি বল নিয়েছে?”
বাচ্চার মা ক্ষেপে উঠে বলল,
“কি সমস্যা? একটা বাচ্চার বল এভাবে ছিনিয়ে আনার মানে কি? আপনার কমনসেন্স নেই?”
মারওয়ান গম্ভীর গলায় বলল,
“কমনসেন্স তো আপনার ছেলের বল আনেনি। এনেছে আমার পা, আপনি পাকে জিজ্ঞেস করুন। কমনসেন্সের উপর প্রশ্ন তুলছেন কেন?”
মহিলাটি মুখ কুঁচকে বলল,
“এসব পাগল আসে কোত্থেকে?”
“বাসা থেকেই এসেছি। তবে প্রশ্ন হলো আপনি জানলেন কিভাবে আমি পাগল? ঐযে কথায় আছে না পাগলে চেনে পাগল, ছাগলে চেনে ছাগল।”
মহিলাটি রাগে কিড়মিড় করতে করতে বলল,
“আপনি কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি করছেন। বলটা দিন। আলতু ফালতু লোকের সঙ্গে কথা বলার মানে হয়না।”
মহিলার চিল্লাচিল্লিতে আশেপাশে মানুষ জড়ো হতে দেখে মারওয়ান কথা না বাড়িয়ে বলটা দিয়ে দিল। মহিলাটি মুখ ঝামটে ছেলেকে নিয়ে চলে গেল। মারওয়ান সেদিকে তাকিয়ে মুখ কুঁচকে বলল,
“গলা তো নয় যেন করাত।”
নাহওয়ান এতক্ষণ বাবার পা ধরে ছিল। মহিলার চিল্লাচিল্লিতে বাচ্চাটা বেশ ভয় পেয়েছে। মারওয়ান ছেলেকে কোলে নিয়ে বাসায় চলে এল।
__
উজান ভুঁইয়া উমায়ের ভুঁইয়াকে দেখতে এসেছে। উমায়ের ভুঁইয়ার চেহারা ভেঙে গেছে। বয়স বেড়ে দ্বিগুণ দেখাচ্ছে। বুড়িয়ে গেছে মনে হচ্ছে। সে প্রায়ই বড় ভাইকে দেখতে আসে। অদ্ভুত দেখাচ্ছে উমায়ের ভুঁইয়াকে। উজান ভুঁইয়া ভাইয়ের এই করুণ পরিণতি দেখে বললেন,
“ভাইজান তুমি এসব কেন করেছ? নিজেকেও ধ্বংস করেছ সাথে নিজের পরিবারকেও ধ্বংসের মুখে ফেলে দিয়ে এসেছ। ভাবি, উমা, রিমা ওদের জন্য তোমার চিন্তা হয়না?”
উমায়ের ভুঁইয়া জবাব দিলেন না। তিনি প্রতিবারই এই প্রশ্নে চুপ হয়ে যান। কোনো উত্তর তার কাছে নেই। আবারও একই প্রশ্ন করলে উমায়ের ভুঁইয়া রাগান্বিত হয়ে বললেন,
“চুপ কর। আমার যেটা ভালো মনে হয়েছে সেটা করেছি। আমার কাছে কৈফিয়ত চাওয়ার তুই কে?আরামে খেয়ে খেয়ে ভুঁড়ি বানাচ্ছিস আর আমার কাছে কৈফিয়ত চাইতে এসেছিস? একদম ভুঁড়ি ফুটো করে দেব।”
এমন অনেক উদ্ভট উদ্ভট কথা বলতে লাগলেন তিনি। উজান ভুঁইয়া জানে এরকম চলতেই থাকবে। সে দেখা করতে আসলেই এমন কথার মুখোমুখি হয়। দেখা শেষ করে বেরিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে সাইফারের মুখোমুখি হলো উজান ভুঁইয়া। সাইফার একটা দরকারি কাজে এখানে এসেছে। সচরাচর থানায় আসা হয়না তার তবে মাঝেমধ্যে কিছু ডকুমেন্টস ও তথ্য নিতে আসতে হয় এখানে। উজান ভুঁইয়াকে এই প্রথম দেখল সে। সে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আপনি?”
“আমি উজান ভুঁইয়া।”
“উমায়ের ভুঁইয়ার ভাই?”
“জি।”
“আপনাকে খুঁজছিলাম আমি। ভালোই হলো দেখা হয়ে। আপনার সাথে কিছু কথা বলা যাবে?”
“শিওর।”
একটা কফিশপে বসেছে আজারাক সাইফার আর উজান ভুঁইয়া। মুখোমুখি তাদের অবস্থান। সাইফার কফিতে চুমুক দিয়ে বলল,
“ডোন্ট মাইন্ড একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে পারি?”
“জি করুন।”
“আপনার ছেলে মেয়ে কয়জন?”
উজান ভুঁইয়া কথাটায় বেশ বিব্রত হয়েছে বোঝাই যাচ্ছে। সাইফার বলল,
“বলতে না চাইলে থাক।”
উজান ভুঁইয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“আমার কোনো সন্তান নেই। আমি নিঃসন্তান।”
সাইফার ভ্রু কুঁচকে বলল,
“দুঃখিত। আপনার ওয়াইফ?”
“সে আছে। আমরা নিঃসন্তান দম্পতি।”
“সো স্যাড। আপনারা বাচ্চা দত্তক নিতে পারতেন।”
উজান ভুঁইয়া বিরস মুখে বললেন,
“ভাইজান বাচ্চা দত্তকের পক্ষে ছিল না। তার উপর শাম্মি বারবার গর্ভপাত করত শেষে মৃত বাচ্চা জন্ম দিলে ভাইজান ক্ষেপে যান। তাকে বাড়ি থেকে বের করেও দিতে চেয়েছিল কিন্তু আমার কারণে পারেনি। শেষের বাচ্চাটা মৃত হওয়ার পর শাম্মি আর কোনোদিন কনসিভ করতে পারেনি। ডাক্তার বলেছে জরায়ু নাকি কেটে ফেলতে হয়েছিল।”
সাইফার মাথা নাড়িয়ে বলল,
“আপনাদের বিবাহের কত বছর হলো?”
“বত্রিশ বছর শেষ হবে।”
“বত্রিশ বছর! তাহলে আপনার বড় ভাইয়ের বিবাহের কত বছর হয়েছে?”
“ভাইজান আমার অনেক পরে বিয়ে করেন। প্রায় দশ বারো বছর পরে। ভাইজানের বিবাহের কত বছর হয়েছে সঠিক খেয়াল নেই। আমি শাম্মিকে ছাত্রাবস্থায় বিয়ে করেছিলাম। তখন আমার বয়স তেইশ ছিল। আমাদের প্রেমের বিয়ে।”
“আপনাদের মৃত সন্তান হওয়ার কত বছর পেরিয়েছে?”
“আটাশ, ঊনত্রিশ বছর হবে বোধহয়।”
“আপনার ভাইয়ের মেয়ে দুটোর বিয়ে হয়েছে?”
“না কারোই হয়নি।”
“তাদের বয়স কত?”
“একজনের বিশ আরেকজনের সতেরোতে পড়েছে।”
সাইফার কফিতে চুমুক দিল। কফি শেষ করে বলল,
“আচ্ছা, আমি যদি বলি আপনাদের সন্তান মৃত হয়নি বিশ্বাস করবেন?”
“না। কারণ আমি নিজ চোখে দেখেছি আমার মৃত সন্তানকে।”
“হতেও তো পারে সেই সন্তানটা আপনার নয়।”
“এসব সিনেমার মতো শোনাচ্ছে।”
“কখনো কখনো এই জীবনটা সিনেমাকেও অতিক্রম করে ফেলে মিস্টার ভুঁইয়া। আপনি পেপার পত্রিকা পড়েন না? হারানো মেয়ে অথবা ছেলেকে এতবছর পর খুঁজে পেলেন মা। এমন বহু ঘটনা কিন্তু ঘটে আমাদের আশেপাশে। আর সিনেমার কাহিনী কিন্তু বাস্তব থেকেই নেয়া হয়।”
“হতে পারে। তবে আমার কাছে এসব অবিশ্বাস্য। আমার সন্তান তো আর হারিয়ে যায়নি। মারা গেছে। মৃত সন্তান জীবিত হয়ে ফিরে আসবে কি করে?”
“যুক্তিযুক্ত প্রশ্ন। আচ্ছা, আপনার ছেলে হয়েছিল নাকি মেয়ে?”
“মেয়ে।”
“ইন্টারেস্টিং।”
চলবে….
(আসসালামু আলাইকুম।)
Share On:
TAGS: তাজরীন ফাতিহা, ভবঘুরে সমরাঙ্গন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৭১
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব (৪৯.১+৪৯.২)
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৮
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ২৯+৩০
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫৭+বোনাস
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব (৫৬.১+৫৬.২)
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৭০.২
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫৮
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৪৭+৪৮