নির্লজ্জ_ভালোবাসা
পর্ব ৮ (বাচ্চাদের পড়া নিষেধ ❌)
লেখিকাঃ-#প্রিঁয়ঁসেঁনীঁ
দিনটাই যেনো আজকে খুব বিরক্তিকর। তার সাথে সময়টাও অসহ্য লাগছে। পাল্লার থেকে লোক এসেছে তুরাকে সাঁজাতে। তুরা পুতুলের মতো বসে আছে, আর মহিলাটা যত্ন করে তাকে সাঁজাচ্ছে। তুরা বাধ্য হয়ে রৌদ্রের বউ হিসেবে নিজেকে সাঁমলাচ্ছে। মাঝে মাঝে চোখ কুঁচকাচ্ছে, ঠোঁট কাঁপছে ভিতরের অস্থিরতা যেনো বাইরে বেরোতে চাইছে।
তখন কামড় দেওয়ায় প্রাই রৌদ্র তুরার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো, তুরা বাঁচার জন্য বলেছে বিয়ে করবে। তুরার বিরক্তির মাঝেই অজান্তেই কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। চোখে অস্বস্তির মিশ্রণ মনে হচ্ছে প্রতিটি মুহূর্ত আরও ভারী হয়ে উঠছে।কোনও নারীই চাইবে না যে রৌদ্রের মতো একজন স্বামী হোক। তুরার সামনেই রৌদ্র অন্য একটা মেয়েকে ঘনিষ্ঠভাবে স্পর্শ করেছে। আর সেই দৃশ্য দেখেও তুরার মন অজান্তেই উত্তেজিত, ভয় আর বিরক্তির মাঝে দোলাচল করছে কীভাবে সেই মন আবার রৌদ্রের দিকে টান খায়, তা সে নিজেও বুঝতে পারছে না। পাল্লারের মহিলাটা তুরাকে সাঁজিয়ে দিয়ে নিজেই বলল,
“ওয়াও ম্যাম, আপনাকে অনেক সুন্দর লাগছে। স্যার তো আপনার থেকে চোখ ফিরাতেই পারবে না।”
তুরা বিরক্ত হয়ে উঠলো। ঠোঁট কামড়ে আয়নায় নিজেকে দেখলো। কিছুখন নিজের রূপ দেখার পর নিজেই থমকে গেলো। লাল খয়েরী রঙের লেহেঙ্গা, শরীর ভর্তি গয়না, ভারি মেকআপ সব মিলিয়ে সত্যিই সুন্দর লাগছে। তুরা মনে মনে নিজেকে নিজেই ছোট্ট প্রশংসা করলো, যদিও রাগ আর অস্থিরতা এখনও ভেতরে জমে আছে।মহিলাটা নিজের বেগে সব কিছু তুলতে লাগলো। যখন ফোন তুলতে যাবে, তুরার চোখ পড়লো মহিলাটার ফোনের দিকে। তুরা সঙ্গে সঙ্গে মহিলাটাকে বলল,
“আন্টি, একটা হেল্প করবেন?”
মহিলাটা মুচকি হেঁসে বলল,
“হ্যাঁ, বলো, কি হেল্প করতে পারি?”
“আসলে আন্টি, আপনার ফোনটা একটু দিতে পারবেন? আমি একটা জায়গায় কল দিতে চাচ্ছিলাম।”
মহিলাটা কিছুখন কিছু ভেবে বলল,
“ওকে, নাও।”
মহিলাটা ফোন এগিয়ে দিলো। তুরা রোবটের মতো ফোন নিয়ে বাবার নাম্বার ডায়াল করে কল দিলো। কয়েকবার রিং হলো, কিন্তু কেউ ধরলো না। তুরা বিরক্ত হয়ে বাড়ির টেলিফোনেও কল দিলো। সেখানে কল দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কেউ রিসিভ করলো। তুরা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“হ্যালো, আমি তুরা বলছি। শুনতে পাচ্ছো কেউ?”
অপাশ থেকে রৌশনি খানের কণ্ঠ ভেসে এলো, কণ্ঠটা যেনো উৎকণ্ঠায় কাঁপছে।
“হ্যাঁ তুরা, আমি তোর চাচি! তুই ঠিক আছিস তো? তোরা এখন কোথায়? আর রৌদ্র কোথায়?”
তুরার চোখ ভরে উঠলো অশ্রুতে, গলায় কাঁপুনি আর নিঃশ্বাস যেনো আটকে যাচ্ছে তাড়াহুড়োয়।
“হ্যাঁ চাচি, আমি ঠিক আছি চাচি, আমাকে বাঁচাও! আমি রৌদ্র ভাইয়াকে বিয়ে করবো না, আমাকে জোর করে বিয়ে করছে প্লিজ, তুমি আমাকে বাঁচাও!”
অপাশ থেকে রৌশনি খানের কণ্ঠটা ভীষণ চিন্তিত হয়ে উঠলো,
“কি বলছিস! রৌদ্র তোর পাশে আছে? একটু অর কাছে দে, আমি কথা বলবো?”
তুরা ডুকরে কেঁদে উঠলো, গলার স্বর কেঁপে যাচ্ছে ভয় আর অসহায়তায়।
“না, না চাচি! রৌদ্র ভাইয়া জানলে আমার সর্বনাশ করে ফেলবে তুমি বাবাকে, চাচাকে সবাইকে বলো, আমাকে রৌদ্র জোর করে বিয়ে করছে?আমাকে এখান থেকে তাড়াতাড়ি নিয়ে যেতে বলো।”
রৌশনি খানও যেনো ফোনের অপর পাশ থেকে কেঁপে উঠলেন, কণ্ঠটা ভারী হয়ে এলো।
“আচ্ছা, আচ্ছা তুই শান্ত হো, আমি এখনই তোর চাচাকে বলছি, ঠিক আছে? তুই ভয় পাবি না মা।”
তুরা আবার কাঁপা কাঁপা গলায় কিছু বলতে যাবে, এমন সময় হঠাৎ পেছন থেকে শক্ত একটা হাত এগিয়ে এসে ফোনটা তুরার হাত থেকে ছিনিয়ে নিলো। তুরা চমকে উঠলো, বুক ধকধক করছে। ঘুরে দাঁড়াতেই দেখে রৌদ্র দাঁড়িয়ে আছে, ঠোঁটে সেই ভয়ানক বাঁকা হাসি। তুরা এক ধাপ পিছিয়ে গেলো, চোখে আতঙ্ক, মুখে নিঃশব্দ চিৎকার যেনো আটকে আছে।
রৌদ্র নিচের দিকে তাকিয়ে নাম্বারটা দেখলো, হালকা হাসলো, তারপর মুখে একরাশ মিথ্যে আনন্দ নিয়ে ফোনটা কানে ধরে বলল,
“হাই মম, কেমন আছো? খুব মিস করছো আমাকে, তাই না?”
ওপাশ থেকে রৌশনি খানের গলা প্রায় কাঁপছে রাগে আর অবিশ্বাসে।
“কে রৌদ্র! এই রৌদ্র, তোর কি হয়েছে? সমস্যা কি তোর? তুই তুরাকে নিয়ে গিয়েছিস কেনো, আবার ওকে জোর করে বিয়েও করছিস এসবের মানে কি?”
রৌদ্র রৌশনি খানের কণ্ঠে উদ্বেগ শুনেও একচুল বদলালো না, বরং আরও গভীরভাবে হাসলো। ঠোঁটের কোণে কৌতুকের রেখা টেনে মসৃণ গলায় বলল।
“মম,তোমার ছেলের মনে ধরেছে তুরাকে। মম, আমি তুরাকে চাই, ওকে বিয়ে করছি। এখন থেকে তুরা তোমার আদরের পুত্রবধূ।”
ওপাশ থেকে রৌশনি খান প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন,
“রৌদ্র বাবা, পাগলামি করিস না। এদিকে শিহাব পাগল হয়ে যাচ্ছে। বাবা টা ভালো, তুরাকে নিয়ে চলে আয়, প্লিজ।”
রৌদ্র চোখ আধবোজা করে, হালকা হাসি নিয়ে উত্তর দিলো,
“সম্ভব নয় মম। তোমার ছেলে যেই জিনিস একবার নিয়ে আসে, সেই জিনিস ফেরত দেওয়ার মানেই হয় না। আর শিহাব! ওই শা*লারে বইলো, ভালো একটা মেয়ে দেখে বিয়ে করে ফেলতে। আমাদের মাজে যেনো না আসে। না হলে আমি খারাপ হতে এক পাও পিছ পা হবো না।”
“রৌদ্র বাবা, দেখ পাগলামি করিস না তুই… শুনছিস?”
রৌদ্র এবার ঠোঁটের কোণে একরাশ ব্যঙ্গ নিয়ে বলল,
“মম, রাখছি। আমার বিয়ের সময় হয়ে গেছে। নিজের খেয়াল রেখো, আর ড্যাড কে আমার কথা জানিয়ে দিও। বাই মম উম্মাহ!”
কথাটা বলেই রৌদ্র ফোনটা টুস করে কেটে দিলো। মুহূর্তেই তার মুখের রঙ বদলে গেলো যে হাসিটা কিছুক্ষণ আগে ঠোঁটে খেলছিলো, তা মিলিয়ে গিয়ে জায়গা নিলো একরাশ কঠোরতা। চোখে যেনো ভয়ঙ্কর ঝড় ঘনীভূত হচ্ছে। সে ধীরে ধীরে পাল্লারের মহিলাটার দিকে এগিয়ে গেলো, ঠান্ডা, নিয়ন্ত্রিত কণ্ঠে ফোনটা তার হাতে দিয়ে বলল।
“ইউ ক্যান গো নাও।”
মহিলাটা কিছু বুজে ওঠার আগেই রৌদ্রের চোখের সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখে এক মুহূর্তও দেরি করলো না। মাথা নিচু করে দ্রুত ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। ঘরে এখন শুধু তুরা আর রৌদ্র একটি ভারী নীরবতা চারপাশে ছড়িয়ে পড়লো।
রৌদ্রের চোখে তখন এক অদ্ভুত ঝড় রাগ, আকর্ষণ আর জেদ মিশে এক হয়ে আছে। মুহূর্তে সে চোখ পাকিয়ে তুরার দিকে তাকালো। সেই চাহনিটা এতটাই ভয়ঙ্কর, যেনো কোনো দগ্ধ অগ্নিকণা নিঃশব্দে সামনে ছুটে আসছে। তুরা স্থির হয়ে গেলো, বুকের ভেতর ধড়ফড়ানি এমন জোরে বাজছে যেনো চারপাশ শুনে ফেলবে। রৌদ্র ধীরে ধীরে তুরার দিকে এগোতে লাগলো, প্রতিটি পদক্ষেপ যেনো ভারী হয়ে আঘাত করছে মেঝেতে। তুরা এক ধাপ করে করে পিছাতে লাগলো, ভয়ে চোখ বড় বড় হয়ে গেছে তার। পিছাতে পিছাতে দেয়ালের সাথে গিয়ে ঠেকে, পিছানোর আর কোনো জায়গা নাই।
রৌদ্র মুহূর্তে এসে তুরাকে দেয়াল আর নিজের দুই হাতের মাঝে বন্দি করে ফেললো। দেয়ালের ঠান্ডা ছোঁয়া আর রৌদ্রের শরীরের উষ্ণতা মিলেমিশে তুরার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। সে আতঙ্কে চোখ বন্ধ করে ফেললো। রৌদ্রের গরম নিশ্বাস তুরার মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছে, গায়ের লোম কেঁপে উঠছে তার। রৌদ্রের চোখ থেমে আছে তুরার ঠোঁটে সেই কাঁপা ঠোঁটের পাশে ছোট্ট তিলটা যেনো তার ধৈর্য নিয়ে খেলা করছে। তার বুকের ভিতর অস্থিরতা কাজ করছে, ইচ্ছে করছে ওই ঠোঁট জুড়া নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিতে। কিন্তু রৌদ্র বিয়ের আগে তুরাকে গভীর ভাবে ছুঁতে চাই না। রৌদ্র কোনোভাবে নিজেকে সংযত রাখলো। মুখটা তুরার কানের কাছে নিয়ে গিয়ে ফিসফিস স্বরে বলল।
“জানে মান, চোখ খুল এইভাবে চোখ বন্ধ রাখলে আমি কিন্তু গভীর ভাবে ছুঁয়ে দেবো।”
তুরা চমকে উঠে পিলপিল করে চোখ মেললো।আর চোখ খোলার সাথে সাথেই রৌদ্রের সেই নেশাগ্রস্ত দৃষ্টির দু’চোখে জুড়া পড়লো তুরার চোখে। চোখে চোখ পড়তেই মুহূর্তের মধ্যে রৌদ্রের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠলো। সে ধীরে ধীরে তুরার দিকে ঝুঁকে এলো নাক প্রাই বরাবর ছুয়ে যাবে, কণ্ঠে মিশে গেলো অদ্ভুত এক মাদকতা, ফিসফিস করে বলল
“তুই এত সুন্দর কেনো বল তো? তোকে এত সুন্দর হতে কে বলেছে? তুই জানিস, তোর এই সুন্দর্য আমাকে পাগল করে দেয়। আমি নিজেকে সামলাতে পারি না। ইচ্ছে করে তোর উপরের সৌন্দর্যের সঙ্গে ভেতরের সৌন্দর্যটাও নিজের করে নিতে।”
তুরা কিছুই বলল না। শুধু নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলো রৌদ্রের দিকে। মুখে কোনো শব্দ নেই, কিন্তু চোখে আগুন। ঘৃণা, রাগ,সব মিলেমিশে যেনো তার বুকের ভেতর তাণ্ডব করছে। যদি আজ সামর্থ থাকতো, তাহলে সে মুহূর্তে রৌদ্রকে ঠাসিয়ে একের পর এক থা*প্পড় দিতো। কিন্তু না, আজ সে বাঁধা। কারণ সে জানে, রৌদ্র যদি এখন খেপে যায়, তাহলে সে নারী হয়ে আর রক্ষা পাবে না, এই মানুষটা এক পাও পিছিয়ে যাবে না, তুরার কলঙ্ক করতে তার গায়ে নতুন এক দাগ আঁকতেও দ্বিধা করবে না।
রৌদ্র তুরাকে কিছু না বলতে দেখে এক ঝটকায় তুরার কোমর চেপে ধরে একদম কাছে এনে ফেললো। তুরা চমকে উঠে পড়লো বুক ধুকপুক করা শুরু করলো। ইচ্ছে করছে এই রৌদ্রকে মরিচের গুড়ায় পানিতে ডুবিয়ে মারতে। রৌদ্র তুরার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো তুরার চোখ, সেই পাপড়ি ঠোঁট সব কিছু যেনো রৌদ্রকে খুব টানছে, কোনো ভাবেই নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছে না। পৃথিবীতে যেনো এখন রৌদ্রের ধৈর্যের পরীক্ষা হচ্ছে। রৌদ্র আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারলো না, এক ঝটকায় তুরার ঠোঁটগুলো নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিলো। তুরা চোখ বড় বড় করে রৌদ্রের কাছ থেকে আসতে চাইলো, কিন্তু রৌদ্র আরও শক্ত করে চেপে ধরলো। রৌদ্র পাগলের মতো তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে তুরার ঠোঁটে, গম্ভীর চুম্বন আর সাথে কামড়ের পর কামড়, সব মিলিয়ে যেনো তুরার ঠোঁট জুড়াই এখন রৌদ্রের মনের সুখ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাক্কা ৫ মিনিটের পর রৌদ্র তুরার ঠোঁট ছাড়লো আর তুরা সাথে সাথে হেলিয়ে পড়লো। রৌদ্র চমকে উঠে তুরার গালে হালকা থা*প্পড় দিয়ে বলল।
“এই জান, কি হয়েছে?এইভাবে ঘুমিয়ে পড়লি কেনো? এই জান, চোখ খুল।”
কিন্তু তুরার কোনো সাড়া শব্দ নেই, একদম স্টেড হয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। রৌদ্রের আর বুজার বাকি নেই, তুরা যে সেন্স হারিয়ে ফেলেছে, মুহূর্তে রৌদ্র লম্বা শ্বাস নিয়ে চোখে উত্তেজিত ঝিলিক নিয়ে বলল।
“জান তুই আমার এই সামান্য এই স্পর্শই সামলাতে পারলি না? তাহলে যখন গভীর ভাবে স্পর্শ করবো তখন তো তোকে খুঁজেও পাওয়া যাবে না। আর রৌদ্র তুই কার মায়ায় পড়লি এ তো তোর একটু উষ্ণনই সেন্স হারিয়ে ফেলেছে? তাহলে তোকে কিভাবে সামলাবে? ডিজ ইজ নট আ ওয়ার্ড।”
খান বাড়ির ঘরজুড়ে তখন অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা। রৌশনি খানের মুখে রৌদ্র আর তুরার বিয়ের খবরটা যেনো সবাইকে নিস্তব্ধ করে দিয়েছে। আনোয়ার খান বারবার ফোনে কথা বলছেন, থানার অফিসারদের তাগাদা দিচ্ছেন, তবুও কোনো খোঁজ মিলছে না তাদের। রৌশনি খান কপালের পাশে হাত রেখে চুপচাপ বসে আছেন, মুখে কষ্ট আর উদ্বেগের ছাপ। ঘরের বাতাস ভারি হয়ে আছে সবাই জানে, রৌদ্র কিছু না কিছু বড় ভুল করছে, কিন্তু কেউ তার নাগাল পাচ্ছে না। এমন সময় হঠাৎ সদর দরজা দিয়ে শিহাব ভেতরে ডুকে। তার মুখ গম্ভীর, চোখের ভেতর ঘুমহীনতার দাগ, যেনো অনেকটা ভেবে এসেছে কিছু বলবে। ঘরের সবাই তাকায় তার দিকে রৌশনি খান, আনোয়ার খান, আশিক খান সবাই অবাকও হয়, আবার একরকম অস্বস্তিও অনুভব করে। শিহাব এগিয়ে গিয়ে কোনো কথা না বলে সরাসরি আশিক খানের সামনে এসে দাঁড়ায়। তার কণ্ঠ কাঁপছে, তবু সে দৃঢ়ভাবে বলে উঠে।
“আংকেল প্লিজ আপনারা রৌদ্র কে বুজান সে যেনো তুরাকে দিয়ে যায়। আমি কথা দিচ্ছি রৌদ্র দিয়ে গেলেই আমি তুরাকে বিয়ে করবো, শুধু আপনারা একটা বার বুজান রৌদ্র কে।”
শিহাবের কথা শেষ হতেই ঘরের ভেতর আবারও নীরবতা নেমে আসে। রৌশনি খান মাথা তুলে তাকান, চোখের কোণে জল টলমল করে। আনোয়ার খান গভীর নিঃশ্বাস ফেলেন, মনে হয় যেনো বুকের ভেতর রাগ, দুঃখ, হতাশা সব একসাথে জড়ো হয়েছে। আশিক খান শিহাবের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, কিন্তু মনে হচ্ছে ভেতরে যেনো প্রচণ্ড ঝড় বইছে।
রৌশনি খান শিহাবের দিকে তাকিয়ে গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেললেন। চোখেমুখে ক্লান্তি, কিন্তু কণ্ঠে ছিলো কঠোর বাস্তবতার ভার। ধীরে ধীরে বললেন,
“বাবা, তুরা আর রৌদ্রের বিয়ে রৌদ্র কোনো ভাবেই তুরাকে আনবে না।”
কথাটা যেনো বজ্রপাতের মতো আঘাত করলো শিহাবের বুকের ভেতর। মুহূর্তেই তার চারপাশের পৃথিবীটা ঝাপসা হয়ে গেলো। মাথার ভিতর শব্দ থেমে গেলো, শুধু কানের ভেতর নিজের হৃদস্পন্দনের ধ্বনি বাজতে থাকলো। বুকের গভীরে এক অসহ্য ব্যথা জেগে উঠলো একটা ব্যথা যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়। চোখের পাতা কেঁপে উঠলো, ঠোঁট শুকিয়ে গেলো। সে কিছুক্ষণের জন্য স্থির হয়ে রইলো, তারপর হঠাৎ কাঁপা কণ্ঠে বলল।
“আন্টি প্লিজ আপনি রৌদ্রকে বুজান। আমি তুরাকে চাই, আন্টি তুরা আমার বহু দিনের পছন্দ, অর্থাৎ আমার ভালোবাসা। অরে না পাইলে আমি আমি শেষ হয়ে যাবো আন্টি।”
এই কথাগুলো বলেই শিহাব হাঁটু মুড়ে ফ্লোরে বসে পড়লো। তার দুই হাত মুঠো হয়ে গেলো, চোখ থেকে টলটল করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সবাই নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। ছেলেরা নাকি কাঁদে না এই কথাটা যেনো আজ মিথ্যা প্রমাণ করে দিচ্ছে শিহাব। চোখে তার অসহায়তা, বুকে তার হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা। কখন যে সে তুরাকে এতটা ভালোবেসে ফেলেছে, সে নিজেও জানে না। কিন্তু আজ, যখন তুরাকে হারিয়ে ফেলেছে, তখন তার মনে হচ্ছে যেনো নিজের সমস্ত পৃথিবীটাই ভেঙে গিয়েছে, আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
শিহাবের সেই অসহায় ভাঙা চেহারা দেখে খান বাড়ির সবার বুকটা কেমন হালকা কেঁপে উঠলো। এতটা যন্ত্রণায় এক তরুণ মানুষকে কাঁদতে দেখা সত্যিই সহ্য হচ্ছে না কারওর। রৌশনি খান নিজের আঁচল মুখে চেপে কেঁদে উঠলেন চোখে তার অনুশোচনা, মুখে কষ্টের রেখা। তাঁর বুক কেঁপে উঠছে কান্নার দমে। ঘরের বাতাস ভারি হয়ে আছে, কারও মুখে কোনো শব্দ নেই, শুধু রৌশনির কান্না আর শিহাবের দম বন্ধ করে রাখা নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে।আশিক খান ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে শিহাবের পাশে বসে পড়লেন। তিনি নিজের হাত বাড়িয়ে শিহাবের দুই কাঁধে রাখলেন, তারপর দৃঢ় কণ্ঠে কিন্তু কষ্টভরা চোখে বললেন।
“বাবা শিহাব, আমরা সত্যি তোমার কাছে লজ্জিত। আমরা জানতাম না রৌদ্র এত বড় একটা কাজ করবে। তুমি প্লিজ আমাদের উপর রাগ কইরো না হয়তো ভাগ্যেই এটা লেখা ছিলো।”
কথাগুলো বলার সময় আশিক খানের চোখের কোণে জল টলমল করছিলো। তিনি এক মুহূর্তের জন্যও সাহস পাচ্ছিলেন না শিহাবের চোখে তাকাতে কারণ সেখানে ছিলো এক ভাঙা স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি, আর ছিলো এমন এক ভালোবাসার ব্যথা যা তারা কেউই ফিরিয়ে দিতে পারবে না। রৌশনি খান কান্নার মাঝেও শিহাবের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে শুধু বললেন,
“বাবা, আমরা বুজতে পারিনি রৌদ্র যে এত বড় একটা কাজ করে ফেলবে। তুমি বাবা মনে কষ্ট নিও না।”
শিহাব ধীরে ধীরে কাঁপা হাতে চোখের জল মুছে দাঁড়িয়ে গেলো। তার চোখে এখন আর কান্না নেই সেখানে এক অদম্য জেদ, এক পুড়ে যাওয়া ভালোবাসার তীব্র শপথ জ্বলছে। সে চারপাশে তাকালো, সবাইয়ের চোখে চোখ রেখে দৃঢ় গলায় বলল।
“আমার কারও উপর রাগ নেই। তবে আমি সবাইকে একটা কথা বলে যাচ্ছি আমি তুরাকে ছাড়তে পারবো না। আমি তুরাকে খুঁজে বের করবো। আমি নিশ্চিত তুরা ভালো নেই। আমি থাকতে আমার তুরার কিছু হতে দিবো না। যদি ওই রৌদ্র পাততলায়ও তুরাকে রাখে, তবুও আমি ওকে খুঁজে বের করবো। আমার ভালোবাসার শক্তি দিয়ে আমি তাকে খুঁজে বের করবো। যদি ওকে পেতে হলে আমার রৌদ্রের সাথে লড়তেও হয়, তাহলে আমি লড়বো ভালোবাসার শক্তি দিয়ে লড়বো। হয় জয় হবো, নয় ক্ষয় হবো। তবুও আমি হাল ছাড়বো না। আমার নিশ্বাস থাকা অব্দি তুরাকে ছাড়বো না। কখনোই না কোনো দিনও না!”
শেষে শিহাব ধীরে ধীরে মুখে অর্ধেক অর্ধেক কথার আক্ষেপ নিয়ে, চোখের জল মুছতে মুছতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো। শিহাব যেতেই বাড়ির ঘরে ফের নেমে এল নীরবতার গভীরতা। সবাই যেনো তার ছেলের মতোই বেদনার সঙ্গে সম্পর্কিত, কিন্তু কিছু বলতে পারছে না।মুহুর্তের মধ্যেই আশিক খান নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না, হঠাৎ কাঁদতে শুরু করলেন। চোখের জলে তার গলায় ধরে আছে হৃদয়ের ব্যথা। পাশে তনুজা খান এগিয়ে এসে আশিক খানের কাঁদতে থাকা কাঁধে হাত রাখলেন, সহমর্মিতা আর মায়ার ছোঁয়া দিয়ে।আশিক খান চোখে জল ভাসিয়ে তাকিয়ে বললেন,
“ছেলেটা সত্যি কষ্ট পেয়েছে দেখছো কিভাবে কেঁদে গেলো। পুরুষ মানুষ সহজে কাঁদে না। আর তখনি কাঁদে যখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আঘাত পায় আর আজ সেই আঘাতটাই শিহাব পেয়েছে।”
তনুজা খান শুধু মাথা নেড়ে তার কষ্টের সঙ্গে একরকম মিলে গেলেন, ঘরের ভেতর নীরবতা আবারও ঘিরে ধরলো শুধু বেদনাই বাকি, আর প্রত্যেকের মনে গভীরভাবে বেঁধে রাখা সহমর্মিতা।
শিহাব খান বাড়ি পেরিয়ে বাইরে এসে থেমে গেলো। সন্ধ্যার হালকা বাতাসে তার চুল উড়ে উঠছে, চোখ লাল হয়ে আছে কান্নায়। সে ধীরে ধীরে পকেট থেকে ফোনটা বের করলো, স্ক্রিনে তুরার একটা ছবি ভেসে উঠলো তুরার হাসি, সেই চেনা চোখের মায়া যেনো মুহূর্তেই তার বুকের ভিতর সব আবেগ জাগিয়ে তুললো। গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সে নিঃশব্দে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলো, তারপর কাঁপা কণ্ঠে বলল।
“তুমি যেখানেই থাকো তুরা, আমি তোমাকে ঠিকই খুঁজে বের করবো। আমি জানি, তুরা তুমি আমাকেই চাও, ওই রৌদ্রকে না। তুমি চিন্তা কইরো না,তোমার শিহাব ঠিকই তোমাকে খুঁজে বের করবে। শুধু তুমি আমি গেলে তুমি আমার সাথে এসো। আর আমার বিশ্বাস, তুমি আমার সাথে আসবে। আই লাভ ইউ তুরা লাভ ইউ সো মাচ,তুরা।”
শেষ কথাগুলো বলার সময় শিহাবের কণ্ঠ ভেঙে গেলো, চোখের জল আবার গড়িয়ে পড়লো গালে। সে ফোনটা বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলো যেনো সেই ছবিটার মধ্যেই তার পুরো পৃথিবী, তার ভালোবাসা, তার শান্তি লুকিয়ে আছে। ঠোঁটে হালকা এক হাসি ফুটলো, কিন্তু সেই হাসির ভিতরে ছিলো গভীর যন্ত্রণা, অশেষ মায়া আর প্রতিজ্ঞা। বাতাসে যেনো তুরার নাম ভেসে উঠলো, আর শিহাবের বুকের ভেতর প্রতিধ্বনি হলো আমি তোমায় খুঁজে বের করবোই যেভাবেই হোক।
( হাহ আজকেও হাঁপিয়ে গিয়েছি লিখতে লিখতে হাত ব্যাথা করছে আজকে আর লিখতে পারবো না । আর যাই হোক আমার শিহাবের জন্য আজকে আরও বেশি কষ্ট হচ্ছে! 🥹🥹)
চলবে…..!
~~
আসসালামু আলাইকুম আমার লেখায় বানান ভুল হলে অবশ্যই আমাকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন! আর কোনো কিছু ভুল হলে অবশ্য আরও বেশি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন ধন্যবাদ সবাইকে…!
Share On:
TAGS: নির্লজ্জ ভালোবাসা, প্রিঁয়ঁসেঁনীঁ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৪,১৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৪
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৩৩