Golpo romantic golpo ভবঘুরে সমরাঙ্গন

ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৬১


ভবঘুরে_সমরাঙ্গন

পর্ব_৬১

তাজরীন ফাতিহা

এশার আযানের একটু পরেই নিশাত নড়েচড়ে উঠল। নড়তে গিয়ে টের পেল সর্বাঙ্গ ব্যথায় অবশ হয়ে আছে। সম্ভবত টানা অনেকক্ষণ এক পাশ হয়ে ঘুমানোর কারণে এই অসহনীয় ব্যথা। পিটপিট করে আঁখি মেলতেই মুখ বরাবর দর্শন হলো একটি ছোট্ট মাথার পিছন সাইড। কালো হালকা ছোট ছোট চুলগুলো উড়ছে ফ্যানের বাতাসে। ওপাশে ঘুরে হাত, পা ছড়িয়ে একমনে কি যেন করছে। নিশাত কেমন থমকে গেল। ফ্যাসফেসে গলায় ডাকল,

“নাহওয়ান..”

নাহওয়ান খেলা থামিয়ে মায়ের ডাকে চাইল। নিশাত তিনদিন পর চোখের সামনে নিজের বুকের মানিককে দেখে হুহু করে কেঁদে দিল। কান্নারত কণ্ঠে হিসহিসিয়ে বলতে লাগল,

“আল্লাহ প্রতিদিন তুমি আমার সন্তানকে ছুঁতে নিলেই নিয়ে যাও আজকে অন্তত এটা মিথ্যা না হোক। আমি যেন ওকে ছুঁলেই হারিয়ে না ফেলি মাবুদ।”

বলে কেঁদে উঠে নাহওয়ানের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। নাহওয়ান মাকে হাত বাড়াতে দেখে ছুটে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ল মায়ের বুকে। নিশাত পাগলের মতো নাহওয়ানের সারা দেহে চুমু দিয়ে যাচ্ছে। বাচ্চাটা মায়ের বুকের মধ্যে ঢুকে গেছে একেবারে। নিশাত পারে না নিজের অস্তিত্বকে একেবারে বুকের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলতে। নাহওয়ান শান্ত হয়ে মায়ের হৃৎপিণ্ডের ধুকধুকানি শুনতে শুনতে বলল,

“আমি ইসে গেচি। টোমাল গুম বাংগিচে?”

নিশাতের একদমই হুঁশ নেই। সে নাহওয়ানকে বুকে চেপে ধরে কেঁদেই চলেছে। বিড়বিড় করে বলছে,

“আমার বাচ্চা, আমার মানিক, জাদুরে তোকে মা আর কোথাও যেতে দেব না। তুই আমার পরান পাখি। আরেকবার চোখের আড়াল হলে পরানটা বের হয়ে যাবে রে। আমার আব্বা, কলিজার টুকরা।”

নাহওয়ান নিশাতের বুক থেকে মাথা তুলে চোখের পানি ছোট্ট ছোট্ট গোলগাল হাত দ্বারা মুছে দিতে দিতে বলল,

“কাডে না। মুজা মুজা কাবো।”

নিশাত চোখের পানি মুছে ছেলেকে নিয়ে তড়িঘড়ি করে উঠে বসল। শরীর ব্যথার পরোয়া করল না। বিছানা থেকে নামতে নামতে বলল,

“আমার আব্বার খিদা লেগেছে? চলো চলো খাবার খাইয়ে দেই।”

নাহওয়ান মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলল,

“কিডা নাই। বাবা কাবার ডিচে। মুজা মুজা কেয়েচি।”

নিশাত তবুও মানল না। মায়ের মন মানার কথাও না। তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে সে এতদিন শয্যাশায়ী ছিল। ছেলেকে কাছে পেয়ে তার সকল অসুস্থতা গায়েব হয়ে গেছে। আশেপাশের কোথাও ধ্যান জ্ঞান নেই তার। নাহওয়ানের ফুলো ফুলো গাল নিজের গালের সাথে চেপে ধরে বলল,

“আমার কলিজা। মা তোমাকে নিজের হাতে খাওয়াব।”

নাহওয়ান মায়ের উষ্ণতা পেয়ে ফিচফিচ করে হেঁসে উঠল। গালে গাল ঘষতে লাগল ফোকলা দাঁতে হেঁসে। নিশাতের চুল খোলা। নাহওয়ানকে আদর করতে করতে রুম থেকে বেরোলো। রান্নাঘরে আসতেই দেখতে পেল মারওয়ান চুলোয় যেন কি গরম করছে। নাহওয়ান বাবাকে দেখতে পেতেই ডাকল,

“বাবা।”

মারওয়ান ঘুরে নাহওয়ানের দিকে চেয়ে একটা হাসি দিল তারপর আবারও খুন্তি নাড়াতে লাগল। নিশাতের দিকে একবারও চাইল না। আর নাতো কারো সঙ্গে একটা বাক্য ব্যয় করল। নিশাত বিস্মিত নেত্রে মারওয়ানকে দেখছে। লোকটা এত শান্ত যে! যাইহোক সে মাথা থেকে চিন্তা ছেড়ে ছেলেকে নিয়ে ভাবতে লাগল। এগিয়ে এসে বলল,

“আপনি রান্নাঘর থেকে বের হন।”

মারওয়ান টু শব্দ ছাড়া এক মুহুর্ত দাঁড়িয়ে বেরিয়ে গেল। নাহওয়ান কান ডলতে ডলতে তার গমনপথের দিকে চেয়ে রইল। মারওয়ানের এমন শান্ত আচরণে নিশাত একটু অবাকই হয়েছে। তার সংসার জীবনের এতটা বছর লোকটাকে জীবনেও এমন শান্ত দেখেনি। হঠাৎ এতটা নিশ্চুপ হয়ে যাওয়ার কারণ কি? নিশাত মাথা থেকে এসব ঝেড়ে ফেলে চুলোতে উঁকি দিতেই দেখল আলু দিয়ে মুরগির গোশতের তরকারি গরম হচ্ছে। অর্থাৎ মারওয়ান এতক্ষণ এটাই গরম করছিল। নিশাত নাহওয়ানকে কোল থেকে নামিয়ে চুল খোঁপা করে তরকারি গরম করে চুলো থেকে নামালো। পুরোটা সময় নাহওয়ান মায়ের পা ধরে দাঁড়িয়ে থাকল। নিশাত মুচকি হেঁসে একটু পর পর ছেলেকে দেখছে। দুধের কৌটা থেকে গুঁড়ো দুধ একটা বাটিতে নিয়ে নাহওয়ানকে দিল। নাহওয়ান দুধ দেখে মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলল,

“ডুডু, মুজা মুজা কলি কাবো।”

নিশাত তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

“খান। আপনার জন্যই সব।”

নাহওয়ান বাটি নিয়ে নিচে বসতে নিলে নিশাত বাধা দিয়ে বলল,

“এখানে না, বাবার কাছে যান। মা খাবার বেড়ে ডাকব।”

নাহওয়ান ফিচফিচ করে হেঁসে মায়ের দিকে চেয়ে বলল,

“মা বিল্লু চানা ডুডু কাবে না?”

নিশাত বলল,

“ওরা খেয়েছ। এখন আপনি খান মানিক আমার।”

নাহওয়ান মাথা নাড়িয়ে বাটি হাতে ছোট্ট ছোট্ট পায়ে রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। নিশাত খুশিতে ছেলের জন্য পোলাওর চাল বের করল। বাচ্চাটা পোলাও খুব পছন্দ করে। মুরগির গোশত সম্ভবত বাড়িওয়ালা আন্টি পাঠিয়ে দিয়েছেন। সেটুকুতে দুজন টোনাটুনি ও তার ছানার হয়ে যাবে। নিশাতের বুকটা কেন যেন ভারহীন লাগছে। মনে হচ্ছে তিনদিন না কতবছর পরে সন্তানকে দেখছে। খুশিমনে পোলাওয়ের চাল ধুতে লাগল।


নাহওয়ান বাটি হাতে রুমে ঢুকতেই মারওয়ানকে বাথরুম থেকে বেরোতে দেখল। গামছা গলায় প্যাঁচানো। মুখ মুছে নাহওয়ানকে দেখতে পেতেই বলল,

“কিরে কি খাস?”

নাহওয়ান ফিচফিচ করে হেঁসে বলল,

“ডুডু কাই।”

মারওয়ান মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলল,

“বাহ বেশ ভালো।”

বলে বারান্দায় গামছা মেলতে গেল। নাহওয়ানও বাবার পিছুপিছু গেল। মারওয়ান গামছা দড়িতে মেলে পিছু ফিরতেই নাহওয়ানকে দেখে বলল,

“কী?”

নাহওয়ান বাটি বাড়িয়ে ধরে বলল,

“মুজা মুজা কাবে?”

“না, তুই খা।”

“ইট্টু কাও। মুজা।”

মারওয়ান রুমের ভেতরে এসে বিছানায় বসল। নাহওয়ান পিছন পিছন এসে খাটের পাশে দাঁড়ালো। বাবার দিকে চাইতেই মারওয়ান অন্যদিকে চাইল। বোঝালো তাকে দেখতে পায়নি সে। নাহওয়ান বহু কষ্ট করে বিছানায় উঠতে চাইল। তারপর শেষে উঠতে গিয়ে পড়ে গেল। ব্যথা পেয়ে কেঁদে উঠে বলল,

“মাচ্চে, চবাই পুচা। কালি মালে।”

মারওয়ান ছেলের কান্না শুনে দ্রুত গিয়ে ওঠালো। ছেলের কান্নারত মুখের দিকে চেয়ে শক্ত করে বুকে চেপে ধরল। সে এই বাচ্চার মায়া কি করে কাটাবে। এতটা মায়ায় তাকে কিভাবে জড়ালো এইটুকু একটা অস্তিত্ব। নাহওয়ান বাবার ঘাড়ে মুখ রেখে ফুঁপিয়ে চলছে। মারওয়ান ছেলের কান্না থামতেই মুখ মুছিয়ে দিয়ে বিছানায় বসালো। নাহওয়ান বাটি হাতে দুধের গুঁড়ো হাতে নিয়ে চেটে চেটে খাচ্ছে। মাঝে মধ্যে মারওয়ানের দিকে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। মারওয়ান ইশারায় না জানিয়েছে। শুধু ছেলের লাল গালের দিকে তাকিয়ে একদৃষ্টিতে কি যেন দেখছে।

“মাকে বলেছিস মারার কথা?”

নাহওয়ান খেতে খেতে বলল,

“বলিনি।”

মারওয়ান কেমন গলায় বলল,

“কেন বলিসনি?”

নাহওয়ান হাত পা মেলে মনোযোগ দিয়ে আঙুলে দুধের গুঁড়ো উঠিয়ে বলল,

“টুমি মানা কচ্চো।”

“তোর মা গাল দেখেনি?”

নাহওয়ান মাথা নাড়িয়ে বলল,

“ডেকেনি, কালি চুমু ডিচে। বিশি বিশি চুমু ডিচে। মুজা।”

মারওয়ান আর কথা না বলে ছেলের খাওয়া দেখতে লাগল। পুরো বাটি দুধ খাওয়া শেষে অবশিষ্ট গুঁড়ো গুলো হাত দিয়ে উঠিয়ে চেটে খাচ্ছে। মারওয়ান হুট করে বলল,

“তোকে একটু খাই ফাইয়াজ?”

নাহওয়ান হাত চাটা বাদ দিয়ে গোলগোল চোখে বাবার দিকে চেয়ে বলল,

“ইননা।”

__

ইহাব ঘরে ঢুকতেই পুরো রুম অন্ধকার পেল। লাইট জ্বালাতে দেখল পুরো ঘর ফাঁকা। পুরো দুদিন পর সব কাজ শেষে বাসায় ফিরল অথচ ঘরের মানুষই নেই। সে বিরক্ত হয়ে নিজের ঘামে ভেজা শার্ট খুলে ময়লার ঝুড়িতে ফেলল। ইশ আজ সারাদিন কত ধকল গেছে। কয়েকদিন না ঘুমিয়ে সমস্ত ডকুমেন্টরি বানাতে হয়েছে। বিভিন্ন ফাইল, তথ্য ইনভেস্টিগেশন করতে হয়েছে। দম ফেলানোর ফুসরত পায়নি সে। মানহাকে এই কয়েকদিন একটুও সময় দিতে পারেনি। সেদিন ডাক্তারের কাছে নেয়ার কথা থাকলেও সময় পায়নি। হেডের ডাকে চলে যেতে হয়েছিল। সে ভেবে রেখেছিল সব কাজ থেকে একটু রিলিফ হয়েই ডাক্তারের কাছে নেবে। মেয়েটাও যেতে আগ্রহ দেখায়নি। ইদানিং সব কিছুতে অনিহা প্রকাশ করে। ঘরের টেনশন বাইরের টেনশন। এত টেনশনে পাগল হয়ে যাবে সে।

গোসল করে বের হয়েও মানহাকে কোথাও দেখল না ইহাব। এবার চিক্তার বলিরেখা ফুটে উঠল সমস্ত মুখ জুড়ে। তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছে একটা টিশার্ট গায়ে জড়ালো। রুম ছেড়ে বেরোতেই একজন সার্ভেন্টকে চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে ছাদের দিকে যেতে দেখল। সে ডাক দিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“এসব কোথায় নিচ্ছ?”

“উপরে স্যার।”

“উপরে কেন?”

“চেয়ারম্যান স্যার চা নিয়ে যেতে বলেছেন।”

ইহাব ভ্রু কুঁচকে বলল,

“হঠাৎ কি মনে করে?”

“জানি না স্যার। ছোট ম্যাডামও আছেন।”

ইহাব কপাল ভাঁজ করে বলল,

“বাব্বাহ সূর্য কোনদিকে উঠেছে। এত রাতে দুজন একসঙ্গে চা পান করবে। বাহ ভালোই তো উন্নতি দুই শ্বশুর বৌমার। মমও কি উপরে?”

“না স্যার। তিনি ঘুমাচ্ছেন।”

ইহাব আর কিছু না বলে উর্মি ভুঁইয়ার ঘরে এল। ঘরে ড্রিমলাইট জ্বালানো। গালের নিচে এক হাত রেখে উর্মি ভুঁইয়া ঘুমিয়ে আছেন। ইহাব মায়ের শিয়রের পাশে বসতেই মমতাময়ী চেহারাটা ভেসে উঠল। অল্প বয়স থেকেই তার মা কত অসুস্থ ছিল। কত চড়াই উৎরাই পেরিয়ে একটু সুখের দেখা পেয়েছিল। এই মানুষটাকে দেখলে কেউই বুঝবে না তার মাঝে এত রোগ বসত গেড়ে আছে। অথচ এই স্বাভাবিক দেখতে মানুষটাই সবচেয়ে অস্বাভাবিক। কিছু ভুল ওষুধের কারণে আবারও অসুস্থতা ঝেঁকে বসেছে। আচরণ উগ্র হয়েছে কিন্তু মায়ের মমতা, কোমলতা চেহারা থেকে একটুও বিলুপ্ত হয়নি। খুবই মোলায়েম ভাবে মায়ের মাথায় একটা দীর্ঘ চুমু খেল। তারপর ছলছল চোখে ঘুমন্ত মাকে দেখে গেল।


মানহা ছাদ থেকে নেমে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই উপস্থিত হলো ইহাব। তাকে দেখতে পেয়ে ইমতিয়াজ ভুঁইয়া বললেন,

“আরে বাহ এতদিন পর বাসায় এলে যে? ওখানে থাকতে দিচ্ছিল না বুঝি?”

ইহাব পিতার পাশের খালি চেয়ারটাতে ধপ করে বসে বলল,

“এতদিন কোথায়? মোটে দুইদিন।”

“ওহ আচ্ছা এটা তোমার জন্য মোটে?

ইহাব টি-পট থেকে কাপে চা ঢালতে ঢালতে বলল,

“আহ বাবা ঝামেলা কোরো না তো। অনেক টায়ার্ড আমি। তোমার সমুন্ধিকে হাজতে ঢুকিয়ে এলাম।”

ইমতিয়াজ ভুঁইয়া চোখ কপালে তুলে বললেন,

“কি বলছ! সত্যি?”

ইহাব চায়ের কাপে লম্বা চুমুক দিয়ে বাবাকে খোঁচা মেরে বলল,

“কেন কষ্ট পেলে নাকি? তোমার তো আবার গলায় গলায় ভাব ছিল।”

ইমতিয়াজ ভুঁইয়া মুখ কুঁচকে বললেন,

“কচু ছিল। সেটা তো ব্ল্যাকমেল করিয়ে কার্য হাসিল করতো। বেটা বদ, এক নম্বরের খেলোয়াড়। এজন্য দেখতে পারতাম না আমি।”

ইহাব ভেঙিয়ে বলল,

“হ্যাঁ বুঝতে পেরেছি। সবকিছুর মূলে হচ্ছ তুমি।”

“আমি কি করলাম আবার?”

“কিছু করোনি?”

“একদমই না। শুধু তোর মাকে বিয়ে করে ফেঁসে গেছি।”

ইহাব সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল,

“আচ্ছা পাপা, উমায়ের ভুঁইয়া যে মায়ের আপন ভাই না তুমি জানতে?”

ইমতিয়াজ ভুঁইয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“হ্যাঁ, বিয়ের কিছুদিনের মাথায় জানতে পেরেছি।”

“মমের প্রতি বিতৃষ্ণা এসেছিল?”

“বিতৃষ্ণা আসবে কেন?”

“এইযে মায়ের সমস্ত সম্পত্তি হাত ছাড়া হয়ে গেল।”

“বুড়ো বয়সে বাপের হাতে মার খেও না। তোমার মাকে সম্পত্তি, স্ট্যাটাস এসবের জন্য বিয়ে করিনি। এসবের আমার কমতি নেই। আমার হৃদয়ের রাণী সে। সামান্য সম্পত্তি, প্রভাব প্রতিপত্তির জন্য হৃদয়ের রাণীর প্রতি কার বিতৃষ্ণা আসে? তোমার আসবে?”

ইহাব মন্ত্রমুগ্ধের মতো বাবার মাকে নিয়ে বলা কথাগুলো শ্রবণ করছিল। মায়ের এত পাগলামির পরেও সেই আগের মতোই বাবা এখনো তাকে হৃদয়ে ধারণ করে। তার প্রত্যেকটা কথায় সেটা ফুটে উঠেছে। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

“যাও ঘুমিয়ে পড়। অনেক রাত হলো।”

ইহাব পেছন থেকে বলল,

“মমকে এত ভালোবাসো কেন পাপা?”

ইমতিয়াজ ভুঁইয়া মুচকি হেঁসে বললেন,

“হৃৎপিণ্ড বন্ধ হয়ে গেলে কি হয় জানো?”

“মৃত্যু।”

“তোমার মা হলো আমার হৃৎপিণ্ড। হৃৎপিণ্ড বন্ধ হয়ে গেলে মানুষের কোনো মূল্য নেই। তেমনই তোমার মা হারিয়ে গেলে আমিও মূল্যহীন।”


ইহাব রুমে ঢুকে দেখল মানহা টেবিলে দুই হাত মাথায় চেপে বইয়ের দিকে চেয়ে আছে। সে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,

“কি অবস্থা?”

মানহা ঘাড় ঘুরিয়ে চেয়ে বলল,

“কখন এলেন?”

ইহাব অভিমানী গলায় বলল,

“আমার দিকে কারো নজর নেই। কখন আসি কখন যাই কেউ বলতে পারবে না”

মানহা ততক্ষণে বই বন্ধ করে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে। ইহাবের কথা শুনে একটু অবাক হলো। লোকটা কি অনেক আগে এসেছে? সে রুম থেকে বেরোতে নিলে ইহাব এগিয়ে এসে বলল,

“কোথায় যাচ্ছ?”

“আপনার জন্য খাবার রেডি করতে যাচ্ছি।”

“তোমরা খেয়েছ?”

“হ্যাঁ অনেক আগেই। আব্বু, আম্মুর সাথেই খেয়েছি। আপনি যে আসবেন তা তো বলেননি।”

ইহাবের মুখে আঁধার নেমে এল। সে মুখ টানটান করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। মানহা এগিয়ে এসে বলল,

“সেকি ঘুমাচ্ছেন কেন? খাবেন না?”

ইহাব চোখের উপর এক হাত রেখে বলল,

“তুমি তোমার কাজ করো। পড়া শেষ করে লাইট নিভিয়ে দেবে, আমি প্রচুর টায়ার্ড।”

মানহা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে নিচে চলে গেল। ইহাব চোখ থেকে হাত সরিয়ে একবার তাকিয়ে উল্টো ফিরে শুয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর মানহা প্লেট, গ্লাস নিয়ে রুমে ঢুকল। বিছানায় বসে বলল,

“আমার খিদে পেয়েছে কেউ যদি চায় তো শেয়ার করতে পারি।”

ইহাবের নড়চড় নেই। মানহা ইহাবকে শক্ত হয়ে পড়ে থাকতে দেখে বলল,

“ভাইয়া ফোন করেছিল।”

ইহাব নড়েচড়ে কান খাড়া করে রাখল। মানহা মুখ টিপে হেঁসে বলল,

“বলেছে একজনকে পাঠাচ্ছি। আদর, যত্নে রাখিস।”

ইহাব তড়াক করে উঠে বলল,

“সত্যি এটা বলেছে?”

মানহা প্রত্যুত্তর না করে হাসল কেবল। ইহাব মানহার গা ঘেষে ভ্রু নাচিয়ে বলল,

“আদরের কথা বলেছে?”

মানহা ইহাবের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। এই মানুষটা একদমই রাগ করতে জানে না। ছোট বাচ্চাদের মতো মাঝেমধ্যে অভিমান করে। ভাইয়া ফোন দিয়েছিল ঠিকই তবে এসব বলেনি। সেদিনের সবকিছু অভিনয় ছিল এসব জানিয়েছে। এই কোমল হৃদয়ের মানুষটাকে অবহেলা করতে নিষেধ করেছে। মানহা সেদিন কত শক্ত একটা কথা বলেছিল অথচ লোকটা একটুও ধমকায়নি তাকে। নিজের পক্ষে সাফাইও গায়নি। তার স্বামী ভাগ্য এতটা ভালো হবে কে জানতো!

মানহার চোখ থেকে পানি পড়তে দেখে ইহাব হকচকিয়ে গেল। তাড়াহুড়া করে দুরত্ব রেখে বসে বলল,

“আরে কাঁদছো কেন? স্যরি তুমি তো আবার প্যানিক অ্যাটাকের রোগী। এইযে সরে বসেছি। কান্না থামাও।”

মানহা প্লেট রেখে চোখের পানি মুছল। বোকা লোক ভেবেছে সে কাছে বসেছে দেখে কাঁদছে। ভাত তরকারি মেখে ইহাবের মুখের সামনে লোকমা বাড়িয়ে দিল। ইহাব মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল,

“ভাই বলেছে দেখে আদর, যত্ন করছ নিজ থেকে তো করছ না।”

মানহা ইহাবের গালের দুপাশ একহাতে চেপে ধরে লোকমা ঢুকিয়ে দিল। ইহাব গাল ভর্তি খাবার নিয়ে মানহার দিকে অবাক হয়ে চাইল। মানহার মনে হলো কোনো অভিমানী বাচ্চা খাবার মুখে নিয়ে গাল ফুলিয়ে বসে আছে। সে ঠোঁট টিপে বলল,

“বুড়ো বয়সে যত্তোসব ঢং। মনে হচ্ছে বাচ্চা অভিমান করেছে।”

রাতে ইহাব মানহার আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। কয়েকদিনের খাটাখাটুনিতে বেচারা একদমই ঘুমাতে পারেনি। তাই শোয়ার সাথে সাথেই গাঢ় নিদ্রায় তলিয়ে গেছে। মানহার সামনে পরীক্ষা বিধায় বেশ রাত হলো ঘুমাতে। নিজের পড়া শেষ করে লাইট বন্ধ করে ড্রিম লাইট জ্বালিয়ে শুয়ে পড়ল। মৃদু নাক ডাকার শব্দ আসছে। মানহা কুনুইয়ে ভর দিয়ে ইহাবের দিকে চাইল। ঘুমে মগ্ন মুখটার দিকে চেয়ে রইল একভাবে। লোকটা তার আচরণে বেশ অবাক হচ্ছিল আজ। সে ফিসফিসিয়ে বলল,

“এই শুনছেন, আপনি জীবনসঙ্গী হিসেবে নিখুঁত আর মানুষ হিসেবে অপরিমেয় নিখুঁত।”

__

নিশাত ছেলের মুখে পোলাওয়ের লোকমা তুলে দিল। বাচ্চাটা শান্ত ভঙ্গিতে মায়ের ভাঁজ করা পায়ের উপর বসে খাবার খাচ্ছে। তার ডান হাতে হাড্ডি ধরা। সে মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে হাড্ডি চিবোচ্ছে। হাড্ডি চিবোনো হলে পোলাও মুখে নিচ্ছে। নিশাত জিজ্ঞেস করল,

“খেতে কেমন লাগছে?”

নাহওয়ান বাচ্চাসুলভ হেঁসে বলল,

“মুজা মুজা।”

নিশাত ছেলের ফুলো ফুলো নরম গালে চুমু দিল। খাওয়া শেষ করে মুখ ধুয়ে দিতে গিয়ে খেয়াল করল নাহওয়ানের ডান গাল লাল হয়ে আছে। এতক্ষণ খেয়াল করেনি সে। নিশাত গালে হাত বুলিয়ে বলল,

“গালে কি হয়েছে আব্বা?”

নাহওয়ানের হাতে তখনো হাড্ডি ধরা ছিল। সে সেটাই চিবোচ্ছিল। হঠাৎ মায়ের প্রশ্নে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল,

“কিচু হয়নি।”

“লাল কেন?”

নাহওয়ান ফোকলা হেঁসে বলল,

“কুতায়? লাল নাই।”

“তোমাকে কেউ মেরেছে?”

“না না।”

নিশাতের সন্দেহ হলো। মায়ের মন ছটফট তো করবেই। সে ছেলেকে কোলে নিয়ে প্লেট ধুয়ে রাখল। তারপর নিজেদের রুমে ঢুকে বিছানায় শায়িত মারওয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,

“শুনুন নাহওয়ানের গালে কেমন লাল লাল হয়ে ফুলে উঠেছে। মনে হচ্ছে ওকে কেউ মেরেছে। ঐ লোকগুলো কি ওকে মেরেছিল? একটু দেখুন তো।”

মারওয়ান চোখ খুলে বলল,

“ফাইয়াজ বলেছে ওকে মেরেছে?”

নিশাত মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি জানিয়ে বলল,

“বলল কেউ নাকি মারেনি। কিন্তু আপনি দেখুন এটা মনে হচ্ছে আঙুলের ছাপ। কেমন ফুলে ফুলে আছে।”

মারওয়ান ওপাশ ফিরে বলল,

“ফাইয়াজকে মারলে ও এসে বলে দেয়। আজ অস্বীকার করছে তার মানে মারেনি। হয়তোবা মশার কামড়।”

নিশাত কেন যেন মানতে চাইল না। মায়ের মন ছটফট করছে। এগিয়ে এসে বলল,

“মশার কামড় এমন হয়না। আমার মন বলছে ওকে মেরেছে। বাচ্চা মানুষ বুঝতে পারেনি। একটু দেখুন আপনি।”

মারওয়ান নাহওয়ানের দিকে চেয়ে বলল,

“তোকে মেরেছে কেউ?”

নাহওয়ান ফিচফিচ করে হেঁসে বলল,

“না।”

নিশাত কঠোর গলায় বলল,

“তাহলে গাল লাল হয়ে আছে কেন? কি লুকাচ্ছিস তোরা বাপ, ছেলে?”

মারওয়ান কপাল কুঁচকে বিরক্ত হয়ে বলল,

“এখন না মারলেও কি বলবে মেরেছে? ফাইয়াজ কোনোদিন মিথ্যা বলেনা।”

নিশাত মুখ গম্ভীর করে ফেলল। সে জানে নাহওয়ান মিথ্যা বলেনা তবে আজ কেন যেন মনে হচ্ছে মিথ্যা বলছে। সে কথা না বাড়িয়ে মুখ ভার করে স্যাভলন লাগিয়ে দিল ছেলের গালে। ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বলল,

“খাবেন চলুন।”

মারওয়ান নাকোচ করে বলল,

“খিদে নেই।”

নিশাত অবাক হয়ে মারওয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,

“পোলাও রেঁধেছিলাম।”

“তো?”

এমন ভাবে তো বলল যে এর বিপরীতে কিছু বলতে পারল না নিশাত। এত ঠান্ডা ও গম্ভীর কেন আজ? একটু বেশিই নীরব হয়ে আছে মনে হচ্ছে। সে সবকিছু গুছিয়ে রেখে এল। নিজেও খেল না। একা একা খেতে ভালো লাগেনা। নাহওয়ানের সঙ্গে দুই লোকমা খেয়েছিল এতেই চলবে। ওযু করে এসে যে কয় ওয়াক্ত নামাজ কাযা হয়েছে সেগুলো আদায় করল। এশার নামাজ শেষে শুকরানা নামাজ পড়ল। নাহওয়ানকে আবারও তার বুকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জ্ঞাপন করল। এরপর বাতি নিভিয়ে ছেলেকে কোলের মধ্যে আঁকড়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

মাঝরাতে নিশাতের ঘুম ভেঙেে গেল। তার গাল ভেজা ভেজা অনুভূত হলো। অবাক হলো বেশ। আশ্চর্য গাল ভেজা কেন? সে উঠে বসে ছেলের গায়ে কাঁথা টেনে দিতেই ওপাশ ফাঁকা দেখল। একটু অবাকই হলো। লোকটা এত রাতে কোথায় গিয়েছে? বিড়ি টানতে? সে চুলগুলো খোঁপা করে বারান্দায় গেল। কাউকে দেখল না। পুরো ঘর অন্ধকার। পাশের রুমে উঁকি দিতেই দেখল টর্চের আলোতে মারওয়ান মনোযোগ দিয়ে কিছু লিখছে। অফিসের কিছু নাকি?

নিশাত পা টিপে টিপে এগিয়ে যেতেই লেখা থামিয়ে দিল। ডায়েরির মতো কিছু হবে। এটা তো আগে দেখেনি। লোকটার ডায়েরি লেখার অভ্যাস আছে নাকি? কই কখনো তো দেখেনি। সে উঁকি দিয়ে দেখতে গেলেই তৎক্ষণাৎ ডায়েরি বন্ধ করে দিল। নিশাত অবাক হয়ে গেল। সে এসেছে বুঝতে পেরে গেছে নাকি? বুঝলেও লুকালো কেন? এমন গোপনীয় কি আছে যে তার থেকে লুকাতে হবে। ওয়েট, গ্রামে একটা চিঠি পেয়েছিল সে। ঐ চিঠিটা কে দিয়েছিল এর সদুত্তর এখনো পায়নি সে। তার ভাবনার মাঝেই মারওয়ানের কণ্ঠ শোনা গেল,

“এত রাতে এখানে কী?”

নিশাতের রাগ লাগল হঠাৎ করে। এখানে কি মানে? ত্যাড়া কণ্ঠে বলল,

“আপনি।”

মারওয়ান সামনে ফিরে ছিল। নিশাতের উত্তর শুনে ঘাড় ফিরিয়ে বলল,

“আমার সাথে তোমার কী?”

“আপনার সাথেই তো সবকিছু। লুকোচুরি বাদ দিন। কী করছিলেন এতক্ষণ? কার জন্য ডায়েরি লিখছিলেন?”

মারওয়ান বিরক্ত গলায় বলল,

“মাথামোটা মেয়েছেলে।”

নিশাত চোখ রাঙিয়ে বলল,

“খবরদার মাথামোটা বলবেন না। আপনি অস্বীকার করতে পারবেন আপনি আমার সাথে লুকোচুরি করেন না? কথা লুকান না?”

“তো?”

নিশাত ক্ষেপে গিয়ে বলল,

“তো আবার কী? চিঠি আদান প্রদান কার সাথে চলছে দ্রুত বলুন। নয়তো আপনার খবর আছে।”

“কী খবর করবে?”

“সেটা করলেই বুঝবেন।”

মারওয়ান কৌতুক স্বরে বলল,

“আচ্ছা করো আমি দেখি।”

নিশাত ফুঁসে উঠে বলল,

“কথা ঘুরাবেন না। সেদিনও নয়ছয় করেছিলেন। সাফ সাফ বলুন ঐ চিঠি কে দিয়েছিল? আজকে আবার কার জন্য লুকিয়ে লুকিয়ে ডায়েরি লিখছিলেন?”

মারওয়ান হাঁটুর উপরে বালিশ তুলে বলল,

“তোমার সতীনের জন্য।”

নিশাত হতবাক হয়ে মারওয়ানের দিকে চাইল। সে জানে মারওয়ান মিথ্যা বলছে। তবুও বুকটায় কি যেন বিঁধলো। চোখ ফুঁড়ে জল বেরোতে চাইল। মারওয়ান নিশাতকে চুপ হয়ে যেতে দেখে হাতের টর্চ লাইট মুখ বরাবর ধরল। দেখল কেমন নির্জীবের মতো শক্ত হয়ে টুইটুম্বর আঁখিতে তার দিকে চেয়ে আছে। হঠাৎ গায়ের উপর কিছু হামলে পড়তেই সে স্তব্ধ হয়ে গেল।

কামড়ে টামরে গলা, হাত একেবারে ছিলে ফেলেছে নিশাত। এখন স্যাভলন লাগিয়ে দিচ্ছে একমনে। স্যাভলন লাগাতেই কামড় দেয়া স্থানে ভীষণ জ্বালাপোড়া শুরু করল। মারওয়ান রাগান্বিত গলায় বলল,

“কামড় দিয়ে স্যাভলন লাগানোর কী মানে? আমার শরীরটা তো কামড়ের ফ্যাক্টরি। জুতা মেরে গরু দানের আর দরকার কী?”

নিশাত মুখ নামিয়ে বলল,

“স্যরি রাগের মাথায় বুঝতে পারিনি এতটা জখম হবে।”

মারওয়ান মুখ কুঁচকে জ্বলন সহ্য করতে করতে বলল,

“হ্যাঁ, তুমি তো নাদান তাই কিছুই বোঝো না।”

নিশাত মন খারাপ করে বলল,

“আপনি রাগিয়েছেন কেন?”

“তুমি রেগেছ কেন?”

“আবারও রাগাচ্ছেন।”

“তোমার সাথে দেখি কথা বলাই যাবে না।”

“চিঠিটার কথা বলে দিলেই তো হয়।”

মারওয়ান বিরক্তি চেপে বলল,

“ওটা একটা কমান্ড ছিল। সাংকেতিক চিঠি।”

নিশাত খানিক উত্তেজিত হয়ে বলল,

“মিথ্যা বলবেন না। সাংকেতিক চিঠি এমন প্রেমময় হয় না। গোয়েন্দা বলেই ভুলভাল কিছু বোঝাবেন না। আমি আপনার মতো বুদ্ধিমান না হলেও একেবারে বলদও না। আমার জাদ, রান্না করে এনেছে, সিনেমা হলে সিনেমা দেখবে আরও কি কি যেন ছিল।”

মারওয়ান ভ্রু কুঁচকে বল,

“তুমি কয়টা সাংকেতিক চিঠি পড়েছ?”

“একটাও না।”

রুক্ষ গলায় বলল,

“তাহলে মাথামোটার পরিচয় দেবে না। ওটা আমার চাচ্চু পাঠিয়েছিলেন। তিনি আমায় জাদ ডাকেন।”

নিশাত অবাক হয়ে বলল,

“আপনার ছোট চাচা? চিরকুমার যে? তিনি তো বিদেশে থাকেন। উনি আপনাকে সাংকেতিক চিঠি পাঠাবেন কেন?”

“কারণ তিনিও একজন গোয়েন্দা।”

নিশাত এতই অবাক হয়েছে যে কথা বলতে ভুলে গেল। কোনরকম বলল,

“গোয়েন্দা? আপনার পুরো পরিবারই কি গোয়েন্দা?”

“না। শুধু চাচ্চু আর আমিই এই পেশায় যুক্ত।”

নিশাত হতাশ গলায় বলল,

“তাহলে উনিই আপনার মাথায় এসব ঢুকিয়েছেন? দেশে এসেছেন কবে?”

মারওয়ান কপাল ভাঁজ করে বলল,

“দেশে আসবে আবার কি? সে তো দেশেই ছিল। বিদেশে কিছু বছর ছিলেন। সাইবার ইন্টেলিজেন্স এবং কাউন্টার টেররিজম এই দুটো কোর্স করতে USA গিয়েছিলেন। দুই বছর সেখানে ছিলেন। বর্তমানে তিনি আমার সাথে একই ডিপার্টমেন্টে কর্মরত।”

নিশাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“আচ্ছা তিনি বিয়ে করেননি কেন?”

মারওয়ান খাটের সঙ্গে হেলান দিয়ে বলল,

“চাচ্চু বিয়ে বিরোধী। বউ, বাচ্চা এসব তার কাছে প্যারা লাগে।”

নিশাত ফট করে বলল,

“আপনি নিশ্চয়ই তার স্বভাব পেয়েছেন?”

মারওয়ান বিরক্তি নিয়ে বলল,

“ঠিক বলেছ। প্যারা লাগে দেখেই ঢ্যাং ঢ্যাং করে বিয়ে করতে গিয়েছিলাম।”

নিশাত মুখ ঘুরিয়ে বলল,

“সেটা তো শ্বশুর আব্বার জন্য করেছেন। বাচ্চা প্যারা না লাগলেও বউকে ঠিকই প্যারা লাগে।”

মারওয়ান অসম্ভব বিরক্ত হয়ে বলল,

“প্যারা লাগেনা এটা বুঝাতে কি কোলে তুলে নাচতে হবে?”

নিশাত মুখ গম্ভীর করে বলল,

“কথার কি বাহার! নাচতে হবে কেন? ভালো ব্যবহার করলেই হয়।”

মারওয়ান জখমগুলোর দিকে চেয়ে জ্বলে উঠে বলল,

“জায়গা বেজায়গায় কামড় খেয়ে যে তোমাকে মাইর দেই না এটাই তো সবচেয়ে ভালো ব্যবহার। অন্য কাউকে এরকম একটা বিষাক্ত কামড় দিয়ে দেখ না, চিরে চ্যাপ্টা করে রেখে যাবে।”

নিশাত বুকে হাত গুজে বলল,

“অন্য কেউ নিশ্চয়ই আপনার মতো এত ঘাড়ত্যাড়া হবে না। আপনি ত্যাড়া দেখেই চামড়া বেশি শক্ত তাই তেমন কিছু হয়না। আর কামড় না দিলে গড়গড় করে সব কথা বলতেন? তাই যেমন মাচা তেমনই নাচা।”

চলবে…

(আসসালামু আলাইকুম।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply