#মেঘের_ওপারে_আলো
#পর্ব_২৯
#Tahmina_Akhter
পরদিন সকালে আলোর ঘুম ভাঙল মেঘালয়ের ডাকে। পাশ ফিরতেই মেঘালয়ের শুকনো মুখটা চোখে পরল আগে। আলোর ঘুম ভাব কেটে গেল মূহুর্তের মধ্যে। আলো উঠে বসল। চুলগুলো কোনোমতে খোঁপায় বেঁধে খাটের ওপর পা ঝুলিয়ে বসল। মেঘালয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— কিছু হয়েছে?? আপনাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?
মেঘালয় আলোর কথার জবাব না দিয়ে বলল,
— হাতমুখ ধুয়ে এসে পড়তে বসো। সকাল সাতটা বাজছে। হাতে সময় খুবই কম৷
আলো মেঘালয়কে দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করল না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে খাটে থেকে নেমে ওয়াশরুমে চলে গেল। আলো ফ্রেশ হয়ে রুমে এসে দেখল, মেঘালয় রুমে নেই। বারান্দায় উঁকি দিয়ে দেখল সেখানেও নেই।
আলো চুপচাপ পড়তে বসল। পনেরো মিনিট সময় সময় অতিক্রম হবার পর মেঘালয় ঘরে ফিরে এলো। তবে, ট্রে ভর্তি খাবার নিয়ে। ট্রে খাটের ওপর রেখে আলোর ঔষধের বক্স হাতে নিয়ে একটা গ্যাস্ট্রিকের এবং বমি বন্ধ করার ট্যাবলেট খুলে হাত নিয়ে আলোর পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। আলো পড়া বন্ধ করে হাত বাড়িয়ে দিলো। ট্যাবলেট আলোর হাতে দিয়ে একগ্লাস পানি এনে দিলো মেঘালয়। আলো ঔষুধ খাওয়ার পর মেঘালয় আলোর পাশে একটা চেয়ার টেনে বসল।
— তুমি পড়ো। আমি পাশে বসে থাকি।
ঔষুধ খাওয়ার ঠিক আধঘন্টা পর মেঘালয় আলোকে সঙ্গে নিয়ে নাশতা খেলো। তারপরের, সময়টা খুব তাড়াহুড়ায় কেটে গেল। ঘড়ির কাটা ৯টা ৪৫মিনিটে আসতেই আলো কলেজ ড্রেস পরে নিলো। মেঘালয় এ্যাশ কালারের চেক শার্ট এবং জিন্স পরিধান করল। আলো পরীক্ষার ফাইল হাতে নিয়ে অপেক্ষা করছিল মেঘালয়ের জন্য খাটের ওপর বসে। মেঘালয় মোবাইল পকেটে রেখে আলোর হাত ঘড়িটা ড্রেসিংটেবিলের ওপর থেকে নিয়ে আলোর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
— বাম হাতটা দাও?
আলো মেঘালয়ের কথামত হাত বাড়িয়ে দিলো।
— সময়ের অনেক মূল্য। মাঝে মাঝে দুয়েক সেকেন্ড অপচয় আমাদের অনেক বড় ক্ষতি করে ফেলে। তোমার কনসার্নটেন্ট যেন কেবল খাতায় থাকে।প্যানিকড হবার কিছুই নেই।
মেঘালয় আলোর হাতে ঘড়ি পরিয়ে দেয়ার সময় কথাগুলো বলল। ঘড়ি পরানো শেষ হলে আলো মেঘালয়ের হাতটা ধরে বলল,
— আমাদের বিয়ের ছয়মাস হতে চলল। একটা কথা জানতে ইচ্ছে করে আমার?
মেঘালয় স্থীর হয়ে দাঁড়ালো। আলো উঠে দাঁড়ালো। মেঘালয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রাখল। মেঘালয় অস্থির ভঙ্গিতে আলোর সারামুখে কি যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে!
— আমার কমতি জেনে কতটা আপন করতে পেরেছেন, আমায়? কখনো কি আপনার মনে খেয়াল আসেনি, আপনি চাইলে একজন পরিপূর্ণ দেহের নারীকে বিয়ে করতে পারতেন?
আলোর কথা শোনার পর মেঘালয় থমকে যায়। মস্তিষ্ক শব্দশূন্য হয়ে যায়। আলো মেঘালয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে জবাবের আশায়। মেঘালয় জবাব দেয়ার জন্য যখনি মুখ খুলবে ঠিক সেই সময় মেঘালয়ের মোবাইল ফোন বেজে উঠল। মাশফি কল করেছে। মেঘালয় কল রিসিভ করল। ওপাশ থেকে ভেসে এলো মাহরীনের উচ্ছসিত সুর।
— কেমন আছিস, মেঘ?
মায়ের কন্ঠস্বর পেয়ে মেঘালয়ের যেন হৃদয়ে প্রশান্তি নেমে আসে। গতকাল রাত থেকে অস্থির হৃদয়ে শান্তির প্রলেপ ঢেলে দিয়েছে যেন তার মায়ের কন্ঠস্বর। মেঘালয় কাঁপা গলায় বলল,
— একটুও ভালো নেই আমি। মা তোমাকে ছাড়া আমি একটু ভালো নেই।
মেঘালয়ের কথা শুনে মোবাইলের ওপরপ্রান্তে থাকা মাহরীনের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। মাশফি পাশে ছিল এবং ফোন লাউডস্পিকারে থাকার কারণে মেঘালয়ের কথাগুলো স্পষ্ট শুনতে পেয়েছে । মাশফি তার মায়ের কাঁধে রেখে মেঘালয়কে উদ্দেশ্য করে বলল,
— আর কয়েকটা দিন অপেক্ষা কর। মা’কে নিয়ে অতি শীঘ্রই ফিরব, ইনশাআল্লাহ।
মেঘালয় কথা বলতে পারল না আর। গলার কাছে কি যেন দলা পাকিয়ে গেছে। আলোর কাছ মোবাইলটা দিয়ে মেঘালয় ঘর থেকে বেরিয়ে যায়৷ আলো অনিমেষ নয়নে তাকিয়ে রইল মেঘালয়ের গমনের পথে। হুট করে বুক চিরে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। আলো মোবাইল কানে ঠেকিয়ে সালাম জানালো শ্বাশুড়িকে। তারপর, পরীক্ষার জন্য দোয়া চাইল।
মাহরীন ভীষণ খুশী হয়ে বলল,
— খুব ভালো করে পড়াশোনা করবি। যেনতেন রেজাল্ট যেন না আসে। কারণ, তুই আমার মেঘালয়ের বউ। মেঘালয়কে টেক্কা দেয়ার মত রেজাল্ট অর্জন করবি।
— আম্মু, আপনার ছেলে আর কদিন পর ডাক্তার হয়ে ঘুরবে এই বাড়িতে! আমি তার সঙ্গে সামান্য এইচএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়ে কিভাবে টেক্কা দেব?
আলোর কথা শুনে মাহরীন হেসে ফেলল। মাশফি হাসতে হাসতে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেছে। মাহরীন হসপিটালের বেডে আধশোয়া হয়ে লাউডস্পিকার অফ করে মোবাইল কানে ঠেকিয়ে বলল,
— নিজ যোগ্যতায় পরিচিত হবি। এটা আমার উপদেশ হিসেবে শুনে রাখ। তুই তোর বাবার মেয়ে, তুই তোর ডাক্তার স্বামীর স্ত্রী, এগুলো তোর আলাদা পরিচয়। তুই তোর আলাদা পরিচয় গড়ে তুলবি৷ পারবি না?
— তুমি যেহেতু বলেছো, তাহলে অবশ্যই পারব। কবে ফিরবে আম্মু? তোমাকে ছাড়া আমার এই বাড়িতে মন টিকছে না।
আলোর কথা শুনে মাহরীন চোখ বন্ধ করে ফেললেন। ঠোঁটের কোনে মৃদু হাসি ফুটে উঠল তার। যাক ছেলে তিনটার বাইরে আজ কেউ তো বলল, “বাড়িতে ফিরবে কবে? তোমাকে ছাড়া আমার এই বাড়িতে মন টিকছে না “
— অতি শীঘ্রই ফিরব। তুই নিজের দিকে খেয়াল রাখিস।
কথাবার্তা শেষ হওয়ার পর আলো একহাতে পরীক্ষার ফাইল এবং অন্যহাতে মেঘালয়ের মোবাইল নিয়ে বের হলো।
ড্রইংরুম পেরিয়ে যাওয়ার সময় তানিয়ার সঙ্গে দেখা হলো। তবে,তানিয়ার সঙ্গে তানিয়ার বোনকে ইনায়াকে দেখা গেল। আলো ভীষণ অবাক হলো। কারণ, ইনায়ার আসার কথা তানিয়া একবারও তার সঙ্গে শেয়ার করেনি। আলোকে দেখে ইনায়া ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটিয়ে বলল,
— কেমন আছো?
— ভালো। আপনি?
— ভালো আছি বলেই তো তোমাদের বাড়িতে এলাম। তোমার বর মশাই কি তোমাকে ফেলে চলে গেল?
ইনায়া বিদ্রুপের হাসি দিয়ে কথাখানি বলল। আলো ইনায়ার প্রশ্নের জবাব দেয় না। তানিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
— ভাবি, আমি চললাম।
তানিয়া কিছুই বলল না। মাথা নাড়িয়ে বোঝালো “যাও”। আলো সোজা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। গেট পেরিয়ে রাস্তায় বের হতেই চোখে পরল বাইকে বসে থাকা মেঘালয়ের ওপর। আলোকে দেখে মেঘালয়া বলল,
— এত দেরি কেন করলে?
— আমি কি জানতাম, আপনি রাস্তায় এসে অপেক্ষা করছেন? ভেবেছি আমার প্রশ্নকে উপেক্ষা করতে পালিয়ে গেছেন।
কথাটি বলতে বলতে আলো বাইকে উঠে বসল ধীরে ধীরে। মেঘালয়ের কাঁধে হাত রাখতেই মেঘালয় আলোর দিকে সামান্য ফিরে তাকাল।
—তুমি আমার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানো না, আলো। কখনো জানতে চাওনি। তুমি ঠিক ততটুকুই জানো যতটুকু আমি তোমাকে জানতে দিয়েছি। অথচ, এতদিন আমি ভাবতাম…
বাকি কথা বলল না মেঘালয়। বাইক স্টার্ট করল। আলো সারা পথ জুড়ে মেঘালয়ের বলা কথাগুলো ভাবছে। তার কথার মানে খুঁজছে।
___________
পরীক্ষা কেন্দ্রের সামনে এসে বাইক থামাল মেঘালয়। আলো বাইক থেকে নামার পর মেঘালয় বাইক রাস্তার একপাশে পার্ক করে, আলোর পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। আলো মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে ছিল।
— এই যে মিথ্যাবতী?
আলো মাথা উঁচু করে তাকালো। দেখল মেঘালয় তার দিকে তাকিয়ে আছে। আলো অন্যপাশে তাকালো। কারণ, আশেপাশের অনেকের দৃষ্টি এখন তাদের ওপর নিবদ্ধ। কারণ, একজন সূদর্শন পুরুষের সঙ্গে কালো একটা মেয়েকে দেখে হয়ত তাদের মন মানছে না।
— আমার দিকে তাকানোর প্রয়োজন নেই। তবে কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনে রেখো। পানি খাবে। পরীক্ষা শেষ হবার পর ধীরেসুস্থে বের হবে। ধাক্কাধাক্কি করে ভিড় ঠেলে বের হবার দরকার নেই। যদি শরীর খারাপ লাগে তাহলে স্যার ম্যামকে বলবে। এবং ছুটি শেষ পর বাসায় ফিরে যাবে সিএনজি করে। রিকশায় উঠবে না ঝাঁকি লাগবে। এসময় ঝাঁকি লাগলে বাবুর সমস্যা হবে। শরীরে ঝাঁকি যেন না লাগে সেজন্যই বাইকে করে নিয়ে এলাম তোমায়। যতদিন পর্যন্ত গাড়ি ঠিক না হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত একটু কষ্ট করে ম্যানেজ করবে।অন্তত এই একটা দিক মেনে চলবে, ওকে?
মেঘালয়ের কথা শুনে আলো মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো। হুট করে ভীড় বেড়ে গেল। মেঘালয় সেই সুযোগে আলোর হাতটা মুঠোয় নিলো। আলো মেঘালয়ের হাতের স্পর্শ পেতেই চট করে তাকালো। আলোর কুঁচকে যাওয়া কপাল দেখে মেঘালয় আদুরে সুরে বলল,
— বহুদিন পরে তোমার চোখে আবারও বিরক্তি খুঁজে পেলাম, বাবুর আম্মু। আমার প্রতি তোমার বিরক্তি প্রকাশ কেন জানি, আমার এখানে গিয়ে লাগে?
বুকের বা পাশে ডানহাতের তর্জনী আঙুলের ইশারা দিয়ে দেখালো মেঘালয়। আলো হাত ছাড়িয়ে বলল,
— ডাক্তার সাহেব, চললাম আমি।
আলো ধীরে ধীরে পরীক্ষা কেন্দ্রের ভেতরে ঢুকে পরল। আলো চোখের সামনে থেকে আড়াল হয়ে যাওয়ার পর মেঘালয় হসপিটালের উদ্দেশ্য বেরিয়ে গেল।
———–
পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর আলো ধীরেসুস্থে বের হলো পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে। এত ভিড়ভাট্টা চারপাশে। কোনোমতে ফাইলটা দিয়ে তার বাড়ন্ত গর্ভকে আড়াল করে রাস্তার একপাশে গিয়ে দাঁড়ালো। সিএনজি নেই। এদিকে দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। আলো উপায়ন্তর না পেয়ে একটা রিকশা ডেকে তাতে উঠে বসল। রিকশা চলতে শুরু করল। আলো মনে মনে কেবল সৃষ্টিকর্তাকে ডেকে যাচ্ছে। যেন সে সহি সালামতে বাড়িতে ফিরতে পারে।
আলো বাড়িতে ফিরল সহি সালামতে। কিন্তু, বাড়ির ভেতরে ঢোকার পর যা দেখল তাতে আলোর পায়ের নীচের মাটি যেন সরে যায়৷ আলোর চোখ ধীরে ধীরে জলে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। চোখের পলক ফেলা মাত্রই জল গড়িয়ে পরল মেঝেতে।
চলবে…..
Share On:
TAGS: তাহমিনা আক্তার, মেঘের ওপারে আলো
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৩১
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২৭
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২৫
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১৯
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২০
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২৪
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৪
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৭
-
মেঘের ওপারে আলো গল্পের সবগুলো পর্বের লিংক