Golpo romantic golpo মেঘের ওপারে আলো গল্পের লিংক

মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২১


#মেঘের_ওপারে_আলো

#পর্ব_২১

#Tahmina_Akhter

দ্বিতীয়বার মেঘালয় কল করল। আলো অস্থির হয়ে কলটা রিসিভ করল৷ কানে ঠেকিয়ে চুপ হয়ে রইল৷ মেঘালয় যেন আলোর নীরবতাকে সাদরে আলিঙ্গন করল। সময় অতিক্রম হলো। আলো অপেক্ষা করছিল মেঘালয়ের আদুরে সুরে বলা কথা শোনার জন্য। কিন্তু, মেঘালয় যেন আলোর ধৈর্য্যের পরীক্ষা নিচ্ছিল।

আলো মোবাইল কানে ঠেকিয়ে খাটের ওপর বসল। এমন সময় তার দরজায় নক হলো। আলো মোবাইল কানে ঠেকিয়ে দরজা খুলে দিলো। আফসার সাহেবকে দেখে আলো বলল,

— কি হয়েছে, বাবা? এত রাতে? শরীর খারাপ লাগছে?

— জামাই এসেছে। আমার ঘরে বসিয়ে রেখেছি। তাড়াতাড়ি যা আমার ঘরে।

আফসার সাহেব ফিসফিস করে কথাগুলো বলেই সেখান থেকে চলে গেলেন। আলো স্তব্ধ হয়ে যায়। কথাগুলো যেন তার বিশ্বাস হচ্ছে না। মোবাইল হাতে নিয়ে দেখল, মেঘালয় এখনও লাইনে আছে। আলো তার ঘর ছেড়ে আফসার সাহেবের ঘরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করতেই মেঘালয়ের দেখা পেলো।

মেঘালয় খাটের ওপর বসে ছিল। দরজা খোলার শব্দ পেয়ে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতেই দেখতে পেলো কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে। মেঘালয় উঠে দাঁড়ায়৷ আলো এগিয়ে যায় মেঘালয়ের কাছে। মেঘালয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে নীচু আওয়াজে বলল,

— এত রাতে এলেন যে?

— তুমি এত নিষ্ঠুর কেন, আলো? একটিবার আমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করলে না! বাড়িতে ফিরে তোমাকে না পেয়ে আমার..

বাকি কথা বলতে ইচ্ছে করল না মেঘালয়ের। আলোর হাত ধরে কাছে টেনে বলল,

— তোমাকে ছাড়া ঘরে আমার মন বসছে না। অথচ, আমার ঘরটায় আমি বুঝ হবার পর থেকেই বসবাস করছি। তুমি এলে আমার ঘরে, এখন তোমাকে ছাড়া আমার ঘরটা আমার কাছে পর পর মনে হচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে বলো তো?

মেঘালয়ের এহেন কথার জবাব আলোর কাছে নেই। মেঘালয় আলোর মুখটা উঁচু করে ধরল। তারপর, নরম সুরে বলল,

–বাড়িতে চলো।

মেঘালয়ের এই কথা শুনে আলো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

— পরীক্ষা যতদিন চলবে ততদিন আমি এই বাড়িতে থাকত চাই, ডাক্তার সাহেব।

আলোর মুখে এই কথা শুনে মেঘালয় ভ্রু কুঁচকে ফেলল। আলোর কপালের ওপর এলোমেলো হয়ে পরে থাকা চুলগুলো গুছিয়ে কানের পাশে গুঁজে দিয়ে বলল,

— আমাদের বাড়িতে থেকে পরীক্ষা দিতে খুব কি অসুবিধা হবে?

— আমার পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে।

কথাটি বলেই আলো মাথা নীচু করে ফেলল। মেঘালয় অবাক হয়ে যায় আলোর উত্তর শুনে। আলোর থুতনি উঁচু করে ধরল। আলো না চাইতেও মেঘালয়ের চোখের দিকে তাকায়।

—কেন ব্যাঘাত ঘটবে? আমি কি তোমার বই খাতা ছিঁড়ে ফেলব ?

মেঘালয়ের কন্ঠে রাগের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আলোর হাসি পেয়ে যায়। ফিক করে হেসে বলল,

— আমি কি একবারও বলেছি, আপনি আমার বই খাতা ছিঁড়ে ফেলবেন?

— তাহলে তোমার পড়ালেখা ব্যাঘাত ঘটার মত কিছুই দেখছি না আমাদের বাড়িতে।

মেঘালয় আলোকে ছেড়ে দেয়। আলো মেঘালয়ের দিকে তাকিয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ। তারপর, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময়টা দেখল। রাত সাড়ে বারোটা বাজছে।

— গাড়ি এনেছেন সঙ্গে? আমার বইখাতাগুলো নিতে হবে কিন্তু।

ব্যস, এই দুটো বাক্য যথেষ্ট ছিল মেঘালয়ের জন্য। মেঘালয়ের ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে ওঠে। আলো অতি দ্রুত করে তার ঘরে চলে যায়। বইখাতা সব গুছিয়ে নেয়। আফসার সাহেব এবং সিতারা বেগম আলোকে বই খাতা গুছাতে দেখে জিজ্ঞেস করল,

— কি রে এত রাতে বই খাতা গুছিয়ে কি করবি? জামাইকে একা ঘরে ফেলে রেখেছিস যে?

আলো ওড়না দিয়ে কপালের ঘাম মুছল। তারপর, মাথা নীচু করে বলল,

— তোমাদের জামাই আমাকে নিতে এসেছে।

ব্যস, আফসার সাহেব এবং সিতারা বেগম দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করেনি। তবে আফসার সাহেব কষ্ট পাচ্ছিলেন, এই ভেবে যে মেয়েটাকে একদিনের জন্য তিনি নিজের কাছে রাখতে পারলেন না। মেয়েরা যে বিয়ের পরে পর হয়ে যায় এখন তিনি হারে হারে টের পাচ্ছেন।

সিতারা বেগম, আফসার সাহেবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আলোর বইখাতা এবং আলোকে সঙ্গে নিয়ে বের হলো মেঘালয়। কোয়ার্টারের বাইরের রাস্তায় দেখা মিলল মাশফির গাড়িটার। মেঘালয় গাড়ির ডিকিতে বইখাতা গুলো রেখে গাড়ির দরজা খুলে আলোকে ইশারা করল বসার জন্য। আলো উঠে বসতেই মেঘালয় গাড়িতে বসে রওনা হলো।

বাড়িতে পৌঁছেতে প্রায় রাত একটা বাজল। মাহরীন তখন নিজের ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। মাশফি বাড়িতে নেই। সে জরুরি একটা কাজে বিকেলে বান্দরবান গিয়েছে। বইখাতা টেবিলের ওপর রেখে মেঘালয় আলোকে বলল,

— অনেক ক্ষুদা লেগেছে। দেখো তো ফ্রিজে কিছু আছে কিনা?

মেঘালয়ের কথা শুনে বিস্মিত হয়ে যায়। হসপিটাল থেকে এসে না খেয়ে কি তবে..।

বাকি কথা আলোর জানতে ইচ্ছে করল না। ইদানিং মেঘালয়ের না বলা অনেক কথা সে বুঝতে পারে। মানুষটার কেয়ারিং আলোকে বারবার মেঘালয়ের কাছে তাকে টেনে যাচ্ছে। অথচ, আলোর কেন যেন মনে হচ্ছে মানুষটা আরও ভালো কিছু ডিজার্ভ করে। তার মত একটা মেয়ের মেঘালয়ের পাশে দাঁড়ানোর মত কি যোগ্যতা আছে ? এই সব ভাবনা তাকে বারবার মেঘালয়ের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অথচ, ইদানিং মেঘালয়ের হৃদয়ের কাছাকাছি যাওয়ার বড্ড লোভ হয় আলোর।

মেঘালয় ওয়াশরুমে চলে যায়। আলো দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তড়িঘড়ি করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় রান্নাঘরের দিকে। ফ্রিজ খুলতেই চোখে পরল পাবদা মাছের ঝোল, পাতলা ডাল, লাউ দিয়ে চিংড়ি মাছের তরকারি। আলো সবকিছু গরম করল। তারপর, প্লেটে সাজিয়ে টেবিলের ওপর রাখতেই পেছনে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে আলো পেছনে ফিরে তাকালো। মাহরীন এসেছে। আলোকে বাড়িতে দেখে মাহরীন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। আলো মাথা নীচু করে বলল,

— আম্মু, আপনার ছেলে গিয়ে নিয়ে এসেছে আমাকে।

মাহরীন মুচকি হেসে বলল,

— বাড়িতে এসে যখন শুনল তুই নেই, তখনি গাইগুই করল কিছুক্ষণ। কেন তাকে না জানিয়ে চলে গেলি,সেজন্যে। আমি বললাম, ভাত খেয়ে নে। সে বলল, খাবে না। আমাকে বলল, তুমি গিয়ে ঘুমিয়ে থাকো। আমাকে ঘুম পাড়িয়ে বউকে যে আনতে যাবে পাগলটা, আমি কি জানতাম?

আলো লজ্জা পেয়ে মাথা নীচু করে ফেলল। মাহরীন গিয়ে ডাইনিং টেবিলের একটা চেয়ারে বসল। মেঘালয় এসে দেখল, মাহরীন ঘুম থেকে জেগে ওঠেছে। মা’কে দেখে ভীষণ লজ্জিত ভঙ্গিতে তার মায়ের পাশের চেয়ারটা টেনে বসল। আলো একে একে সবকিছু মেঘালয়ের সামনে এগিয়ে দেয়। মাহরীন একহাত টেবিলের ওপর ঠেকিয়ে মেঘালয়ের দিকে ভ্রু নাচিয়ে বলল,

— কে যেন বলেছিল, ভাত খাবে না?

মেঘলায় খাবার মুখে দেয়ার আগে এই কথা শুনে মাহরিনের দিকে তাকিয়ে বলল,

— মাশফি ভাইয়া বাড়িতে নেই। আমি হসপিটালে গেলে কি তুমি একা বাড়িতে থাকবে? তাই আলোকে নিয়ে এলাম।

— আমার জন্য আলোকে এনেছিস!

কথাটি বলে হেসে ফেললেন মাহরীন। আলো মাথা নীচু করে হেসে ফেলল। মেঘালয় কোনো কথায় কান না দিয়ে চুপচাপ ভাত খাচ্ছে। মাঝে মাঝে তার মা তাকে নিয়ে টিজ করে। ব্যাপারটা ভালো লাগে না। মায়েরা সন্তানের সব ব্যাপারে সাপোর্ট করবে তা-না। উল্টো মজা করে। ধুত! ভাল্লাগে না তার।

_________________

রোজ সকালে মেঘালয় ঘড়ি ধরে একঘন্টা আলোকে পড়াশোনায় হেল্প করে। তারপর দুপুর হলে আলো চলে যায় কোচিংয়ে। তবে সঙ্গী হিসেবে মাহরীন পাশে থাকে। বিকেলে শ্বাশুড়ি বউ মিলে কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করে বাড়িতে ফিরে আসে। তারপর, আবার লেখাপড়া। মেঘালয় প্রায়ই মধ্যেরাতে ফিরে আসে। মাহরীন ইদানিং মেঘালয়ের অপেক্ষায় বসে থাকতে পারেন না। আলো একাই বসে থাকে।

মেঘালয় রোজ বাড়িতে ফিরে আসার সময় এক ঠোঙা বাদাম কিনে নিয়ে আসে। খাওয়াদাওয়া শেষ করে আলোর সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে । কথাবার্তার বিষয়বস্তু হচ্ছে পড়াশোনা, সারাদিন কি কি করেছে, ইত্যাদি। কথাবার্তার ফাঁকে আলো বাদামের খোসা ছাড়িয়ে দেয় মেঘালয়ের হাত। মেঘালয় বেশ আয়েশ করে চিবিয়ে খায়। মাঝে মাঝে আলোকে বাদামের খোসা ছাড়িয়ে খাইয়ে দেয় মেঘালয়৷

টেস্ট পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে মেঘালয় বেশ কয়েকবার আলোকে পরীক্ষা কেন্দ্রে দিয়ে এসেছে। সবাই যখন জানতে পারল আলোর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা আলোর স্বামী তখন অনেকেই বিশ্বাস করত না। আলোর দিকে অনিমেষ নয়নে তাকিয়ে থাকা মেঘালয়ের দিকে অনেকেই বাঁকা চোখে তাকিয়ে থাকত।

আলো সে সব দৃষ্টি উপেক্ষা করতে পারত না। নিজেকে নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগত। পরক্ষণেই মেঘালয়ের মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলত। মানুষটা তাকে চায়, আদরে রাখছে, দায়িত্বশীল, কেয়ার করছে আর কি চাই আলোর?

বাঙালি নারীরা একজীবনে একজনকে ভালোবাসে, তাও আবার নিজের স্বামীকে। সেই স্বামী মন্দ হোক, ভালো হোক। সেই স্বামীকে তারা হৃদয়ে জায়গা দেয়।

সেই হিসেবে আলোর স্বামী ঢের ভালো। আলোর হৃদয়ে মেঘালয়কে স্থান দিতে দোষ কোথায়?

পরীক্ষা যেদিন শেষ হলো, সেদিন সন্ধ্যাবেলায় মেঘালয় বাড়িতে ফিরে আসে। এসেই আলোকে তাগাদা দেয় বারবার তৈরি হবার জন্য। মেঘালয়ের কোন কলিগের যেন আজ বার্থডে পার্টি। আলো যেতে চাইছিল না। কিন্তু, মেঘালয়ের জেদ এবং অনুরোধের কাছে হার মানে।

মেঘালয় কালো পাঞ্জাবি এবং পায়জামা পরিধান করে। আলো একটা লাল পাড়ের সাদা জামাদানি পরিধান করে। চুলগুলো বেনী করে কাঁধের একপাশে রাখা। চোখে সামান্য কাজলরেখা। ব্যস এতটুকু।

মেঘালয় হাতে ঘড়ি পরতে পরতে রুমে ঢুকেই আলোকে দেখে কিছুক্ষণ থম মেরে দাঁড়িয়ে রইল। ঠিক ওই সময় আলো তার শাড়ির আঁচল কাঁধে উঠিয়ে মেঘালয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।

—চলুন।

মেঘালয় আলোর কাজলরেখা চোখের দিকে কিছুক্ষণ অনিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর পাঞ্জাবির পকেট হাতড়ে একটা টিস্যু বের করল। বাম হাত দিয়ে আলোর গাল আলতো করে তুলে ধরে, ডান হাতে তার চোখের লেপ্টে যাওয়া কাজলটা মুছে দিল।

আলো নিঃশব্দে মেঘালয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ইদানিং মানুষটাকে এভাবে কাছ থেকে দেখা খুব কমই হয়। মানুষটা ইদানিং ফুরসত পায় না যেন।

কাজল মুছে দিয়ে মেঘালয় আলোর কানের পাশ থেকে ছোট চুলগুলো বের করে আঙুলে পেঁচিয়ে গালের পাশে সাজিয়ে দিল। আলো শুধু মেঘালয়ের এই কান্ড মুগ্ধ হয়ে দেখছিল। এমন সময় মেঘালয় আলোর হাত ধরে ঘর থেকে বের হয়। যেতে যেতে গুনগুনিয়ে গান গায়।

“তোমারে দেখিলো পরানো ভরিয়া

আসমান জমিন দরিয়া

তোমারে দেখিলো পরানো ভরিয়া

আসমান জমিন দরিয়া

চলিতে চলিতে থামিয়া

দেখিবো তো্মারে আমিও”

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply