মেঘের ওপারে আলো
পর্ব_১৩
Tahmina_Akhter
—মোবাইলটা সাথে রাখবেন।
মেঘালয় একটি মোবাইল ফোন আলোর সামনে বাড়িয়ে ধরল। আলো অবাক হয়ে বলল,
–আমি মোবাইল দিয়ে কি করব?
— আমার সঙ্গে কথা বলবেন। সিম, এমবি, মিনিট সবই আছে মোবাইলে।
সোজা সাপ্টা উত্তর দিলো মেঘালয়। আলো মোবাইল হাতে নিয়ে থতমত খেয়ে বলল,
— আমি কি মোবাইল ইউজ করতে পারি?
–কেউই প্রথম প্রথম কিছুই পারে না, শিখে নিতে হয়। মোবাইল ফোনে কল লিস্টে স্মিতা নামের একটা মেয়ের নাম্বার সেভ করা আছে। মেয়েটা আপনাকে কল করবে।যখনই কল করবে তখনই তার দেয়া ঠিকানায় চলে যাবেন।
–স্মিতা নামের মেয়েটা কে? আর সে কল করলে আমি যাব কেন?
–আপনি একা যাবেন কেন? ইতি ভাবি এবং তানিয়া ভাবি সঙ্গে যাবে। আপনাকে সাদা লেহেঙ্গা কিনে দিয়েছে কে ? মিস মিথ্যাবতী, বিয়েতে কেউ সাদা লেহেঙ্গা পরে?
মেঘালয়ের কথা শুনে আলো চুপসে গেল। সে তো লেহেঙ্গা পছন্দ করেনি। পছন্দ করেছে তানিয়া। এবং তার কথার ইঙ্গিতে যা বোঝা গেছে, সে বারবার বুঝাতে চেয়েছে যে আলোর গায়ে রঙ ময়লা। লাল রঙে তাকে হয়তো সুন্দর নাও লাগতে পারে। এই ভেবে তানিয়া সাদা লেহেঙ্গা কিনে ফেলে।
আলোর নীরবতা দেখে মেঘালয় বিরক্ত বোধ করল। এই মেয়েটার নির্লিপ্ততা আজ প্রথমবার মেঘালয় আবিস্কার করল। কেউ কিছু চাপিয়ে দিতে চায় বলেই কি নিতে হবে? আলো মুখে না বলুক কিন্তু মেঘালয় জানে কাজটা কার? মেঘালয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— আপনি আমার সঙ্গে এখনই যাবেন।
—এত রাতে কোথায় যাব?
— বিয়ের শাড়ি কিনব। তাড়াতাড়ি আসুন। আমার রাতে হসপিটালে ডিউটি আছে। সকালের ডিউটি কমপ্লিট না করে চলে এসেছি।
—সাদা লেহেঙ্গা আছে তো নাকি? লাগবে না বিয়ের শাড়ি।
কথাটি বলেই আলো পেছনে ঘুরে মেঘালয়কে উদ্দেশ্য করে বললো,
–আপনি এবার বাড়িতে যান। যা যা কেনা হয়েছে সবই আমার পছন্দ হয়েছে। সাদা লেহেঙ্গাতে আমার কোন সমস্যা নেই।
–আমি কি বলেছি আপনি শুনতে পাননি? এখনই আমার সাথে যাবেন। বিয়ে মানুষ জীবনে একবারই করে। তো বিয়ের সাজ একবারই হয়। নাকি আপনার চিন্তা আছে দ্বিতীয়বার এরকম কিছু করবেন?
মেঘালয়ের মুখ থেকে এমন কথা শুনে আলো হতবিহ্বল হয়ে গেল। পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখতে পেলো মেঘালয় চুলগুলো তার হাত দিয়ে পেছনের দিকে সরাচ্ছে। কিছু কঠিন কথা বলতে মন চাইল। কিন্তু, মানুষটাকে এভাবে দেখে আলোর কিছু বলার ইচ্ছে ফুস হয়ে গেছে।
প্রথমবার বিয়ে হচ্ছে তাও আবার মাহরীনের শেষ ইচ্ছা পূরণের জন্য। “দ্বিতীয়বার” শব্দটা কোন আক্কেলে ব্যবহার করল মানুষটা। লোকটা কেমন কেন? একবার মনে হয় সে সহজ সরল। তো আর একবার মনে হয় সে রসিকতা পছন্দ করে। কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে সে একরোখা, জেদি একজন মানুষ।
— তাহলে আপনি থাকুন। আমি যাই। আমার চয়েজ করা বিয়ের শাড়ি আপনি আমাদের বিয়ের দিন পরবেন। বউ সেজে আমার জন্য বসে থাকবেন, এনাফ ফর মি। আপনি থাকেন। গুড বায়।
মেঘালয় চলে গেল। আলো দাঁড়িয়ে রইলো ওভাবেই। নিজেই সব কথা বলল! আবার নিজে রেগে গেল! নিজেই চলে গেল!
মেঘালয় চলে গেল। আলো দরজা লাগিয়ে তার ঘরের ভেতরে গিয়ে দেখল আফসার সাহেব, সিতারা বেগম, আলোর নানি এবং আলোর দুই মামি মিলে আলোর জন্য করা বিয়ের কেনাকাটা দেখছিল। আলোকে দেখে আলোর নানি বলল,
— অবশেষে তোর জীবনে সুখেরা হাতছানি দিয়ে ডাকছে রে আলো!
আলোর নানীর সঙ্গে উপস্থিত সবাই সহমত পোষণ করল। কিন্তু আলো কিছুই বলল না। কারণ, সে তো জানে। তার এবং মেঘালয়ের সম্পর্কের ভিত গড়ে উঠতে শুরু করেছে মাহরীনের জন্য। মাহরীনের শেষ ইচ্ছা পূরণের জন্য তারা দু’জন না চাইতেও একই সুতোয়ে বাঁধা পরেছে।
ধীরে ধীরে সবাই আলোর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আলো সবকিছু গুছিয়ে রাখল৷ তারপর মনে হলো পড়াশোনা করার দরকার। যেই ভাবা সেই কাজ। কিছুটা পড়াশোনা করল। আগামী কয়েকদিন যে পড়াশোনায় মন বসবে না।
পড়াশোনা শেষ করে বিছানায় এসে যখন ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছিল আলো। ঠিক তখনি মোবাইলে টিং করে শব্দ হলো। আলো হাত বাড়িয়ে বালিশের পাশ থেকে মোবাইল হাতে নিয়ে দেখল What’s app থেকে নোটিফিকেশন এসেছে। নোটিফিকেশনে টাচ করার পর খুব সুন্দর একটা লাল শাড়ির ছবি স্ক্রীণে ভেসে উঠল। ছবির ওপরে কিছু লেখাও আছে।
আলো মনোযোগী হয় লেখাগুলোতে।
“লাল শাড়িতে নারী
লাল রঙ হচ্ছে আগুনের, আবেগের, ভালোবাসার প্রতীক।
কিন্তু, কনের বেলায় এই লাল রঙ যেন আরও গভীর অর্থ পায়।
মেয়েদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনে, যখন সে এক নতুন পরিচয়ে পা রাখে, লাল রঙটা তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে নীরব সাক্ষী হয়ে।
সেই লাল রঙে লুকিয়ে থাকে স্বপ্ন, ভয়, অনিশ্চয়তা, আবার নতুন জীবনের আলোও।
লাল শাড়িতে সে শুধু এক কনে নয়।
সে এক নবজন্ম পাওয়া নারী, যে জীবনের নতুন অধ্যায়ে নিজের রঙ ছড়িয়ে দিতে প্রস্তুত।”
আলোর ঠোঁটের কোনে হাসির রেখা ফুটে উঠল। মেঘালয় কথাগুলো এত চমৎকার ভাবে লিখল! আলো ছোটবেলা থেকে জেনেবুঝে এসেছে বিয়ের দিন বাঙালি নারী লাল শাড়ি পরে। ব্যস এতটুকুই ছিল তারা জানার পরিধি৷ কিন্তু, মেঘালয়ের পাঠানো ক্ষুদে বার্তা যেন নতুন করে তাকে শেখালো লাল শাড়ির অর্থ।
ফোনের স্ক্রীনে ভেসে থাকা শাড়িটার দিকে তাকিয়ে আলো বলল,
— মেঘালয়, আপনি কি এইসব মন থেকে করছেন? নাকি কেবল দায়িত্ব পালন?
পরদিন সকালে আলোদের বাড়িতে ধীরে ধীরে মেহমান আসার শুরু করল। গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান পাশের কমিউনিটি সেন্টারের আয়োজন করা হয়েছে মেঘালয়দের পক্ষ থেকে। আলো ঘুম থেকে উঠে সিতারা বেগমের সঙ্গে কিছু কাজের সাহায্য করছিল। এটা সেটা এগিয়ে দিচ্ছিল।
সকালের নাস্তা খাওয়া শেষ হওয়ার পর আলো যখন ঘরে এসে এখানে বিশ্রাম নিচ্ছিল। ওই সময় তার মোবাইলে কল এলো। আলো মোবাইল হাতে নিয়ে দেখলো, স্মিতা নামের মেয়েটা কল করছে। আলো কল রিসিভ করল। ওপাশ থেকে একটা সুরেলা কন্ঠে ভেসে এলো।
–এটা কি মেঘালয় ভাইয়ের উড বি ওয়াইফের নাম্বার?
মেঘালয় ভাইয়ের “উড বি ওয়াইফ” শব্দটা শুনে আলোর হুট করে কেমন যেন লাগল! মনে হলো যেন, ” সত্যি কি সে মেঘালয়ের স্ত্রী হতে যাচ্ছে?” যেই মানুষটার পাশে দাঁড়ানোর যোগ্যতা কখনো ছিল না। আজ বাদে কাল নাকি সেই মেঘালয়ের নাম জুড়ে তার নামটা লেপ্টে থাকবে? মানুষটার স্ত্রী সে হবার মতো সৌভাগ্য আলোর হলো কিভাবে?
—জি আমি, আলো বলছি। মেঘালয় ইমতিয়াজ আহমেদের উড বি ওয়াইফ।
— কংগ্রাচুলেশন্স ভাবি। আমি মেঘালয় ভাইয়ার কাজিন বলছিলাম। আসলে,আমি একজন বিউটিশিয়ান। আপনার গায়ে হলুদ এবং ব্রাইডাল লুকের জন্য আমাকে হায়ার করেছে ভাইয়া। আমি ঠিকানা মেসেজ করে দিচ্ছি । আপনি চলে আসুন৷
স্মিতা নামের মেয়েটা কল কেটে দিলো। আলোর কেন যেন রাগ হলো। কে বলেছে তার জন্য বিউটিশিয়ান হায়ার করতে? নাকি মেঘালয় তার ভাবির মত আলোর গায়ের রং নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে। এবং সেই কারণেই তার জন্য বিউটিশিয়ান হায়ার করেছে । আলোর মনে এক সমান পৃথিবী বিরক্তি ভর করল মেঘালয়ের ওপর।
দুই মিনিট পর আলোর মোবাইল থেকে মেসেজ এর শব্দ ভেসে এলো। মেসেজ সিন করলো আলো। ঠিকানাটা খুব বেশি দূরে নয়। আলো তার পরনের কাপড়-চোপড় বদলে ফেলল। অফ-ওয়াইট রঙের একটা কূর্তি পরে নিলে৷ চুলগুলো খোপায় বেঁধে, মাথায় ওড়না চাপিয়ে ঘর থেকে বের হলো আলো। আফসার সাহেবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এবার স্মিতা মেয়েটার দেয়া ঠিকানার উদ্দেশ্যে রওনা দিলো আলো।
রিকশা থেকে নেমে রাস্তার অপজিটে থাকা দোতলা বিল্ডিং এর ওপর দৃষ্টি রাখল আলো। সঠিক জায়গায় এসেছে সে। রিকশা ভাড়া মিটিয়ে মোবাইল ফোন বের করে নাম্বারে কল কর আলো। স্মিতা যখন জানতে পারল, আলো এসেছে। সে তড়িঘড়ি করে নিচে নেমে এলো।
আলোকে সামনাসামনি দেখে স্মিতা মেয়েটার মুখটা কালো হয়ে গেল। মেঘালয় তাকে বলেছিল তার উড বি’র গায়ের রঙ সামান্য ময়লা মেয়েটা। কিন্তু মেয়েটা মেঘালয় ভাইয়ার বর্ণনার চেয়েও বেশি ডার্ক। মেঘালয় ভাইয়ার মত মানুষ মেয়েটাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে কেন? কথাগুলো ভাবতে ভাবতে স্মিতা নামের মেয়েটা বোকা বনে গেল।
মেয়েটার দৃষ্টি আলোকে যেন অপ্রস্তত অবস্থায় ফেলল। মেয়েটার চোখের দৃষ্টিতে তখন সম্মান নয় অন্য কোন কিছু ছিল। এবার স্মিতা নিজেকে সামলে ফেলল। ঠোটের কোণে মেকি হাসি ফুটিয়ে, আলোকে সঙ্গে নিয়ে দোতলার সেই বিল্ডিং এর উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
মেয়েটার বিউটি পার্লার খুব সুন্দর। সাজানো গোছানো চমৎকার একটা পার্লার। মাঝে মাঝে টেলিভিশনে যেমন পার্লার দেখায় ঠিক তেমন। আলোকে একটা চেয়ারে বসিয়ে স্মিতা চলে গেল। কিছুক্ষণ পর সে ফিরে এলো। তারপর শুরু হলো একে একে ফেসিয়াল,পেডিকিওর, মেনিকিওর, হেয়ার ট্রিটমেন্ট।
ফেসিয়াল ট্রিটমেন্টের সময় আলোর বিরক্ত লাগতে শুরু করল। এতক্ষণ কি বসে থাকা যায়? তানিয়া ভাবি আর ইতি ভাবিরা নাকি আসবে? কই এখন আসছে না কেন?
এক ঘন্টা অতিক্রম হবার পর তানিয়া এবং ইতি এসে হাজির হলো। সঙ্গে নিয়ে এলো হলুদের অনুষ্ঠানের জন্য শাড়ি, গহনা । আলোর পাশে দাঁড়িয়ে ইতি বলল,
— নিশ্চয়ই একা একা বোর হচ্ছিলে?
ইতির কথার পিঠে জবাব না দিয়ে মুচকি হেসে ফেলল আলো। তানিয়ার মন খারাপ। আলোকে কিছু জিজ্ঞেসও করল না। যেন তারা অপরিচিত। আলো আগ বাড়িয়ে কিছু কথা জিজ্ঞেস করল তানিয়াকে। তানিয়া সেই কথাগুলো উত্তর না দিয়ে আলোকে বলল,,
— বিয়ে এখনও হয়নি। কিন্তু এখনই শ্বাশুড়ি আর স্বামীকে হাত করে ফেললে?হাউ ইট’স পসিবল? মানলাম আমার শ্বাশুড়ি তোমার করা উপকার ভুলতে পারেন না তাই অতি মমতা করে তোমাকে। কিন্তু মেঘালয়? তাকে কি এমন জাদু টোনা করেছো?
তানিয়ার মুখ থেকে উচ্চারিত এক একটা শব্দ আলোর শরীরে বিষক্রিয়ার মত প্রয়োগ হচ্ছে। কিন্তু শেষ কথাটি শুনে আলো অবাক হয়ে যায়। মেঘালয়কে সে আবার জাদুটোনা করতে যাবে কেন?
তানিয়া আরও কিছু বলার আগে ইতি তানিয়াকে থামিয়ে আলোর দিকে ফিরে বলল,
— আসলে হয়েছে কি? আজ সকালে তোমার বরের সাথে তানিয়া ভাবির তর্ক হয়েছে। তাও আবার কি নিয়ে জানো? তোমাদের বিয়ের শাড়ির রঙ নিয়ে! তানিয়া ভাবি বলেছে, তোমাকে সাদা লেহেঙ্গায় মানাবে। আর মেঘ সাহেব বলছিলেন, বিয়ের দিন কে সাদা রঙ পরে? তারা কি খ্রিস্ট্রান ধর্ম পালনকারি? নাকি তারা সেলিব্রিটি? বাংলাদেশের মানুষ তারা। বিয়ের কনে লাল শাড়ি না পরলে বউ বউ মনে হবে নাকি? ইত্যাদি ইত্যাদি। গতকাল রাতে তোমাকে তোমাদের বাসায় রেখে আসার পর নাকি সে শপিংমলে গিয়ে তোমার জন্য লাল বেনারসি কিনে নিয়ে এসেছে। এখন তুমি বলো আলো? আমরা তো তোমার ভালোর জন্য সাদা রঙের লেহেঙ্গা কিনলাম। যাতে তোমাকে দেখতে সুন্দর লাগে। কিন্তু, মেঘ সাহেবের কথা শুনে আজ আমরা দুই জা ভীষণ আপসেট হয়েছি ।
কথাগুলো বলার সময় সত্যি সত্যি ইতিকে আপসেট মনে হচ্ছিল। সবটা শোনার পর থেকে আলোর নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। বিয়েতে তাকে কি দিলো? কি দিলো না? এসব নিয়ে তার মাথা ব্যাথা নেই। কিন্তু, মেঘালয় এমন করছে কেন? এই যে এখন তানিয়া ভাবি এবং ইতি ভাবির মন খারাপ হলো। এটার দায়ভার কার?
সম্পূর্ণ ট্রিটমেন্ট শেষ হতে হতে বিকেল হলো। দুপুরের খাবার তারা স্মিতাকে সঙ্গে নিয়ে খেয়েছে। তবে খাবার ট্রিট করেছে ইতি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। এবার শুরু হলো আলোর হলুদের সাজ। সিম্পল লুক ক্রিয়েট করল স্মিতা, তাও আবার মেঘালয়ের দেয়া বর্ণনা অনুযায়ী।
আলোর লুক দেখে তানিয়া এবং ইতি দুজনেই সন্তুষ্ট হলো। মেয়েটার গায়ের রঙ সামান্য ময়লা হলেও ফেস কাট নিখুঁত। বড় বড় হরিণী চোখ তার। সরু নাকের ওপর স্বর্ণের নাকফুলটা জ্বলজ্বল করছে। পাতলা ঠোঁটে খুবই হালকা করে পিংক লিপস্টিকের ছাঁপ। লাল পাড়ের হলুদ শাড়ি, সূর্যমুখী ফুলের গহনায় যেন আজ আলোর আশপাশ আলোকিত হলো।
অবশেষে তানিয়া, ইতি এবং আলোর সাজসজ্জা সম্পূর্ণ হবার পর তারা ড্রাইভারকে কল করল গাড়ি নিয়ে আসার জন্য। কিছুক্ষণের মধ্যে ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে চলে এলো। তারা তিনজন পার্লার থেকে বেরিয়ে কমিউনিটি সেন্টারের দিকে রওনা হলো। যেখানে আজ মেঘালয় এবং আলোর গায়ে হলুদের প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হবে।
আলোর পরিবার এবং মেঘালয়ের পরিবার সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত। উপস্থিত নেই তানিয়া, ইতি, আলো এবং মেঘালয়। সবাই বারবার আলো এবং মেঘালয়ের কথা জিজ্ঞেস করছিল। আফসার সাহেব এবং মাহরিন সবাইকে অপেক্ষা করতে বলছিল।
মেঘালয়কে সঙ্গে নিয়ে এলো কাব্য এবং মাশফি। তিন ভাই এক রকমের দেখতে পাঞ্জাবি পরে এসেছে। এবার সবাই আলো, ইতি তানিয়ার জন্য অপেক্ষা শুরু করল।
“বউ এসেছে” “বউ এসেছে” বলেই হই হই শুরু করল বাচ্চারা। মেঘালয় তখন স্টেজে বসে ছিল। পাশে দাঁড়িয়ে ছিল কাব্য এবং মাশফি। ক্যামেরাম্যান ইতিমধ্যে আলোর দিকে দৌঁড়ে চলে গেলে কারণ পার্ফেক্ট ভিডিও শুট এবং ফটো শুটের প্রয়োজন আছে।
অবশেষে আলোর এন্ট্রি হলো ক্যামেরাম্যান এর দেয়া ইন্সট্রাকশন অনুযায়ী। স্টেজের সামনে আসার পর আলোকে থামিয়ে দিলো সবাই। কারণ, এবার বেশ নাটকীয়ভাবে আলো স্টেজে উঠবে তাও আবার মেঘালয়ের হাতে হাত রেখে।
ক্যামেরাম্যান যখন কথাগুলো বলছিল তখন আলো মাথা নীচু করে শুনছিল। তার বারবার বলতে ইচ্ছে করছিল, “আরে আমি নিজেই হেঁটে স্টেজে উঠব। কারো আমাকে টেনে তোলার দরকার নেই।” কিন্তু বলা হলো না।
প্ল্যান মোতাবেক আলো স্টেজে উঠবে এবং স্টেজের অভিমুখে দাঁড়িয়ে আলোর হাত ধরে ওয়েলকাম জানাবে মেঘালয়।
সবাই এমন একটা মূহুর্ত দেখার জন্য তৈরি। ক্যামেরাম্যান আলোকে বারবার অনুরোধ করছে।কিন্তু আলোর পা সামনের দিকে এগুচ্ছে না। ইতি এগিয়ে এসে আলোর কানে কানে বলল,
–সবাই দেখছে আলো। গো নাও। মেঘালয় ভাই কতক্ষণ হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে , বলো?
অবশেষে আলো হাত বাড়িয়ে ধরল মেঘালয়ের উদ্দেশ্য। মেঘালয় আলোর বাড়িয়ে দেয়া হাত ধরল শক্ত করে। আলো কেঁপে উঠল। মূহুর্তের মধ্যে পুরো হলরুমে হৈ হৈ রব। শিষ এবং করতালিতে ভরে উঠল।
আলো লজ্জায় মাথা উঁচু করতে পারল না। এদিকে মেঘালয় আলোর অবনত মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— যার নামে সেজেছেন, তাকে দেখেই যদি চেহারা নামিয়ে রাখেন, তাহলে এই সাজের মূল্য কি মিস. মিথ্যাবতী?
“মিথ্যাবতী” শব্দটা শুনে আলো মেঘালয়ের মুখের দিকে তাকালো সরাসরি। তারপর, কিছুটা রাগ মিশ্রিত সুরে বলল,
— মিথ্যাবতী বলছেন কেন?
— আপনি লাজলজ্জ্বা ভুলে, রেগেমেগে ফায়ার হয়ে যেন ঠিক এভাবে আমার দিকে তাকান, সেজন্যই “মিথ্যাবতী” বলেছি।
কথাটি বলেই মেঘালয় ঠোঁট চেপে হেসে ফেলল। আলো মেঘালয়ের কথার মানে বুঝতে পেরে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে হেসে ফেলল আনমনে৷ তারপরই, আবার ভেসে এলো মেঘালয়ের বলা দুইটা বাক্য।
— হলুদের সাজে আপনাকে যেমন দেখতে চেয়েছিলাম, তারচেয়েও বেশি সুন্দর লাগছে , মিস মিথ্যাবতী।
চলবে….
Share On:
TAGS: তাহমিনা আক্তার, মেঘের ওপারে আলো
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৩০
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১২
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২৫
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৭
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৪
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২৪
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২৭
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২
-
মেঘের ওপারে আলো গল্পের সবগুলো পর্বের লিংক