মেঘের ওপারে আলো
পর্ব_১২
Tahmina_Akhter
—তোরা এখন যাবি নাকি আমরা চলে যাব?
মাশফি দুষ্টমির সুরে কথাগুলো বলল মেঘালয়কে। আলো মাথা নিচু করে ফেলল। তানিয়া মুখ ভেংচি কেটে অন্য দিকে তাকালো। কাব্য আর ইতি হৈ হৈ করে উঠল। মেঘালয় মুচকি হেসে বলল,
—এভাবে রিয়েকশন দেয়ার মানে কি! আমি কি এখন বাসর ঘরে আছি?
আলো আরো কুঁকড়ে গেল। মেঘালয়ের সম্পর্কে তো ওরা দুই ভাই এবং তানিয়া জানে । কিন্তু ইতি আর আলো তো জানেনা। তাই ওরা বোকার মত তাকিয়ে রইল, পাবলিক প্লেসে মেঘালয়ের কাছ থেকে এমন কথা শুনে।
–তাহলে তোরা থাক আমি চলে যাই। কাব্য তোরা যাবি?
মাশফির কথা শুনে কাব্য বলল,
–আমি ওদের সাথে থেকে কি করবো? কাবাবের হাড্ডি হতে যাব কেন? আমার বউ আছে না! এই ইতি চলো। ওরা থাকুক।
কাব্য ইতির হাত ধরে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। মেঘালয় ডাক দিল।
–আরে ভাই তোমরা এত ওভার রিয়েক্ট করছো কেন? এখানে এসো।
–বল কি বলবি?
কাব্য আবারো ফিরে এলো মেঘালয়দের কাছে। মেঘালয় কাব্যর কাঁধে হাত রেখে বলল,
—আজ স্পেশাল ডে। তুমি কি ভুলে গেলে?
মাশফি এবং কাব্য দুজনেই বোকার মতো তাকিয়ে রইল মেঘালয়ের দিকে। কারণ আজ স্পেশাল কি তারা মনে করতে পারছে না?
মেঘালয় ওদের অভিব্যক্তি দেখে বিরক্ত হয়ে বলল,
— আসলেই তোমরা কি?আজ আমাদের মায়ের জন্মদিন ভুলে গেছো? আমার একার মা? প্রত্যেকবার শুধু আমি মনে রাখব! তোমরা কি করবে তাহলে?
মাশফি এবং কাব্য দুজনে অবাক হয়ে বলে,
— আরে সরি মেঘালয়, ভুলে গিয়েছিলাম! দেখ আজকে কতদিন ধরে কত ঝামেলা চলছে, মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল!
তো প্ল্যান কি? কি করবি?
—হয়তো মায়ের সঙ্গে আমাদের তার জন্মদিন পালন করা শেষ সুযোগ পাচ্ছি? তাই এই জন্মদিনটা একটি স্পেশাল ভাবে সেলিব্রেট করতে চাই।
মেঘালয় মলিন মুখে জানালো। মেঘালয়ের কথাগুলো শুনে মাশফি এবং কাব্য দুজনে মন খারাপ করে ফেলল।ইতি, তানিয়া এবং আলো চুপ করে রইল।
এবার তাদের প্ল্যান ভিন্ন হল। তিন ভাই মিলে তাদের মাকে গিফট করবে। তিনজন তাদের বউ নিয়ে তিন ভাগে চলে গেল তিন দিকে। যদিও মেঘালয়ের সঙ্গে আলোর এখনো বিয়ে হয়নি। তবুও তারা একসাথে গেল। কারণ, তারা এখন একই পথের পথিক।
মেঘালয় আর আলো একটা শাড়ি শোরুমে গেল। মেঘালয় তার মায়ের জন্য শাড়ি দেখছিল। হুট করে আলোর চোখ পরল একটা সাধারন সুতি শাড়ির উপর। হুট করে আলোর মন বলল, মাহরীনের গায়ে শাড়িটা মানাবে। কিন্তু আলোর কাছে যে টাকা নেই। টাকা থাকলে সে অবশ্যই মাহরীনের জন্মদিনের উপলক্ষে এই শাড়িটা গিফট করত। হুট করে মেঘালয় আলোর পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
— শাড়িটা পছন্দ হয়েছে?
আলো খানিকটা অবাক হয় মেঘালয় তার এত কাছে এসে দাঁড়ানো দেখে। লজ্জা পাওয়া ভঙ্গিতে বলল,
— হ্যা মাহরীন আন্টিকে শাড়িটা মানাবে।
— আমি তো ভেবেছিলাম আপনি নিজের জন্য পছন্দ করেছেন। চলুন শাড়িটা কিনে ফেলি।
মেঘালয়ের কথা শুনে আলো প্রায় অস্থির হয়ে বলল,
—কিন্তু আমার কাছে তো এখন টাকা নেই?
–আমি আছি না।আমি ম্যানেজ করে নেব। আপনি চয়েজ করেছেন আমার মায়ের জন্য এটাই চলবে। ধরুন এটা আমার আর আপনার পক্ষ থেকে মায়ের জন্য উপহার। আমি টাকা দিলাম, আপনি চয়েজ করলেন। দুজনেই সমান সমান কন্ট্রিবিউট করলাম।
মেঘালয়ের কথাগুলো শুনে কেন যেন আলোর অনেক ভালো লাগলো! অবশ্য মেঘালয়ের বাচনভঙ্গি অনেক ভালো। কিন্তু আলো তো জানতো ডাক্তাররা নাকি খিটখিটে স্বভাবের হয়। মেঘালয়কে আজ যতটুকু দেখেছে ততটুকুতে বুঝতে পারল মেঘালয় খানিকটা রসিকতা করতে পছন্দ করে।
কাব্য আর ইতি মিলে কিনলো মাহরীনের জন্য দামি ওয়াচ। মাশফি আর তানিয়া মিলে কিনলো বই।
এবার বাড়িতে ফিরে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। ততক্ষণে পুরো ধরণীতে সন্ধ্যা নেমে এলো। লালচে সূর্যের বিদায়ীক্ষণ যেন পুরো পৃথিবীকে রাঙিয়ে তুলল রক্তিম আভায়।
কাব্য, মাশফি, ইতি এবং তানিয়া ফিরে এসেছে সে কখন! কিন্তু মেঘালয় আর আলো এখনো ফিরে আসেনি। কাব্য বেশ কয়েকবার মেঘালয়ের নাম্বারে কল করল। কিন্তু মেঘালয় কেটে দিয়েছে।
হুট করে মার্কেটের প্রবেশ দ্বারে মানুষের আনাগোনা বেড়ে গেল। আলো ভাবছিল এত মানুষের ভিড়ে সে নিজেকে হারিয়ে ফেলবে না তো! এমনিতেই কখনো এত বড় শপিংমলে আসা হয়নি তার। হুট করে নিজের হাতের মাঝে কারো হাতের স্পর্শ পেলো আলো। মেঘালয় তার হাত ধরেছে।আলোর হাত ধরে সামনে হেঁটে যেতে যেতে মেঘালয় বলল,
–ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যেতে পারেন। সেজন্য হাত ধরলাম।
ফিরতি পথে কারে করে এসেছে তানিয়া, মাশফি,আলো আর ইতি। মেঘালয় আর কাব্য এসেছে বাইকে করে। প্রয়োজনীয় সব শপিং ব্যাগ বের করে নিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকল তারা।
শপিং ব্যাগগুলো দোতালায় মেঘালয়ের ঘরে রেখে এসে, মেঘালয় কল করল আফসার সাহেবকে। কল দিয়ে অনুমতি নিলো। আলো আরো দুই ঘন্টা তাদের বাড়িতে থাকবে এই কথা বলে। কারণ তাদের মায়ের জন্মদিন আজ। আফসার সাহেবকে দাওয়াত দিল মেঘালয়। কিন্তু আফসার সাহেব বললেন,
–না বাবা তোমরা ইনজয় করো। সময় মত আলোকে দিয়ে যেও বাড়িতে।
ফোনালাপ শেষ করে কোনো মতে ফ্রেশ হয়ে নিচে চলে গেল মেঘালয়। মাহরীনের ঘর থেকে আপাতত অনেক হৈ হুল্লোড় শোনা যাচ্ছে। মেঘালয় দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতে দেখতে পেলো তার দুই ভাই তার মাকে দুই পাশ থেকে জড়িয়ে ধরেছে। মায়ের চোখ ভেজা। হুট করে মেঘালয়ের দুই চোখ ভিজে গেল। হয়তো শেষবারের মতো এভাবে তার মায়ের জন্মদিন পালন করা। আর কখনোই হয়তো মায়ের জন্য এমন করে সেলিব্রেট করতে পারবে না তারা তিন ভাই।
–আমাকে ছাড়া দুই ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরেছ, কেন মা? তুমি জানো তোমার দুই ছেলে তোমার জন্মদিনের তারিখ মনে রাখতে পারে না? মনে রেখেছি আমি। তুমি ওদের আগে কেন জড়িয়ে ধরলে?
মেঘালয়ের বাচ্চা মানুষের মত বলা কথাগুলো শুনে মাহরীন সহ সবাই হেসে ফেলল।
আলোকে এই বাড়িতে দেখে মাহরীন বেশ খুশি হল। আলোর মাথায় হাত রেখে বলল,
–জীবনে তুুমি অনেক বড় হবে আলো। আমার দোয়া তোমার সঙ্গে সব সময় আছে। আর আমার মেঘালয় অনেক ভালো। তোমাকে কোনদিনও অবহেলা করবে না। অনেকগুলো বছর পর আমার কথাগুলো মিলিয়ে দেখো। আমি মানুষটা থাকব না। কিন্তু আমার কথা থেকে যাবে তোমাদের অন্তরে।
আলোর মাথা নিচু করে মাহরীনের কথা শুনে। তারপর শুরু হলো মূল আনুষ্ঠানিকতা। কেক কাটা হলো মাহরিনের জন্মদিন উপলক্ষে। তিন ভাই মিলে ভারি দুষ্টামি করলো। একজনকে একজন কেক লাগিয়ে দিল। ইতি, তানিয়া, আলো এবং মহারীন এদের কান্ড দেখে হাসতে হাসতে শেষ।
চারজন নারীর খিলখিল হাসির শব্দ শুনে ওরা তিন ভাই থমকে গেল। আলোর চোখ পরল মেঘালয়ের উপর। দেখল মেঘালয় তার দিকে তাকিয়ে আছে। আলো চোখ নামিয়ে ফেলল। এরপরের সময়টুকুতে সে মাহরীনের হাত ধরে বসে রইল মাথা নীচু করে। মেঘালয় তাকে কি ভাবছে কে জানে?
আলোকে রাতের খাওয়া-দাওয়া করিয়ে তারপর মাহরীন বিদায় দেওয়ার জন্য অনুমতি দিল। মেঘালয়কে বলল, আলোকে তাদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসতে।
বড় একটা ট্রলি ব্যাগে বিয়ের জন্য কেনাকাটা করা শাড়ি, কসমেটিকস, জুতা সহ সব জিনিসপত্র রেডি করে দিলে ইতি। মেঘালয়ের মাশফির থেকে গাড়ির চাবি নিয়ে আগেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। মাহরীনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঘর থেকে বের হলো আলো। কাব্য এবং ইতি গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এলো তাকে।
আলো পেছনের সিটে বসলো। মেঘালয় ড্রাইভিং সিটে বসল।এমন দৃশ্য দেখে কাব্য ঠাট্টার সুরে বলল,
—দুইজন একসাথে, পাশাপাশি বসলে ভালো হতো। গাড়ি কখন জানি আবার উল্টে যায়!
ইতি ওর কনুই দিয়ে কাব্যের পেটে গুতো দিয়ে বলল,
— এই তুমি কি বড় ভাই না? এভাবে কেউ কথা বলে?
—আরে আলো হচ্ছে আমার স্টুডেন্ট। স্টুডেন্টের হাজবেন্ডকে আমি সাজেশন দিচ্ছিলাম। আমি হচ্ছি বাংলাদেশের একজন সচেতন নাগরিক। আমার কারনে কারো এক্সিডেন্ট হোক, আমি চাই না। আলো তুমি সামনে এসে বসো। দেখো মেঘালয়কে কেমন জানি ড্রাইভার এর মত লাগছে!
কথাটি বলে কাব্য হো হো করে হেসে ফেলল। ইতি হেসে ফেলল। কিন্তু আলো হাসি চেপে রাখতে না পেরে দুই ঠোঁট চেপে হাসি কন্ট্রোল করার বৃথা চেষ্টা করতে লাগল। মেঘালয় সবটা দেখল। কিছু না বলে গাড়ি স্টার্ট করল।
এবার আলোদের বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থেমে যায়। ব্যাগটা গাড়ি থেকে নামিয়ে মেঘালয় পেছনে ঘুরে তাকাতেই দেখতে পেলো আলো তখনও দাঁড়িয়ে আছে।
—আপনাকে আমি বললাম না বাড়ির ভেতরে চলে যেতে!
মেঘালয়ের কথা শুনে আলোর কিছুটা রাগ হলো। সে শক্ত গলায় মেঘালয়কে জবাব দেয়।
—আপনাকে রেখে যদি আমি ঘরে যাই, বাবা বলবে যে আমি আপনাকে সম্মান করি না। আমার ইমেজ ভালো রাখার জন্য এখানে দাঁড়িয়ে আছি। বুঝতে পেরেছেন?
—জি বুঝতে পেরেছি।
আলোকে নিয়ে মেঘালয় দ্বিতীয়বার এই কোয়ার্টারে প্রবেশ করল। ভেতরে গিয়ে তেমন দেরি করল না। আফসার সাহেবের কাছে ব্যাগটা বুঝিয়ে দিয়ে বের হওয়ার জন্য মেঘালয় প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু আশেপাশে কোথাও আলোর অস্তিত্ব নেই। কিছু কথা ছিল আলোর সঙ্গে। কিন্তু এখন আলোকে ডাক দিলে কেমন দেখা যায় ব্যাপারটা! মেঘালয় এক প্রকার না পারতেই আফসার সাহেবকে বলল,
—আঙ্কেল একটু কষ্ট করে যদি আলোকে ডাক দিতেন? কিছু কথা ছিল ওর সঙ্গে।
আফসার সাহেবের এবার আলোর প্রতি বিরক্ত হলো। ছেলেটা এসেছে কই ছেলেটার পাশে থাকবে তা না। ঘরে গিয়ে বসে আছে। আফসার সাহেব মেঘালয়কে দাঁড় করিয়ে আলোর ঘরে গিয়ে জানালো তাকে মেঘালয় ডাকছে।
আলো এই কথা শুনে ভ্রু কুচকে গেল। একটা মেরুন রঙা ওড়না কোনো মতে মাথায় জড়িয়ে ঘর থেকে বের হয়ে দেখল মেঘালয় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ।
আলো মেঘালয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।মেঘালয় আলোকে দেখে বলল ,
চলবে….
Share On:
TAGS: তাহমিনা আক্তার, মেঘের ওপারে আলো
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৩০
-
মেঘের ওপারে আলো গল্পের সবগুলো পর্বের লিংক
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৩১
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৭
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২৯
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২১
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২২
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১১
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব (১৫,১৬)