মেঘের ওপারে আলো
পর্ব ৮,৯ এবং ১০
Tahmina_Akhter
— আলোদের বাড়িতে গিয়েছিলাম আজ সকালে…
মাহরীনের কথা শুনে মেঘালয় মাথা উঁচু করে তাকালো।
—আলোর বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব রেখেছি। উনি হ্যা বা না কিছুই জানায়নি।
মাহরীনের কথায় যেন মেঘালয়ের মাঝে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। এদিকে মাহরীন মন খারাপ করে বসে আছে। মেঘালয় ধীরেসুস্থে ভাত খেলো। তানিয়া আর মাশফি মেঘালয়ের খাবার শেষ হবার জন্য অপেক্ষা করছে। মেঘালয় চেয়ার ছেড়ে বেসিনে গিয়ে হাত ধুলো তারপর টাওয়ালে হাত মুছে মাহরীনের চেয়ারের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। মাহরীন মেঘালয়ের হাত ধরে বলল,
— আমার ভীষণ নার্ভাস ফিল হচ্ছে মেঘালয়! যদি আলোর বাবা না করে দেয়?
— এটা তো তাদের ব্যক্তিগত বিষয়। এখন অপিনিয়ন যাই আসুক মেনে নিতে হবে। দুশ্চিন্তা না করে ঘরে গিয়ে আরাম করো।
মাহরীন উঠে চলে গেল তার ঘরের দিকে। মেঘালয় নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিল, এমন সময় পেছন থেকে তানিয়ার ডাক শুনে মেঘালয় ফিরে তাকালো।
— কিছু বলবেন, ভাবি?
— দশমিনিট সময় হবে? কিছু কথা বলার ছিল।
নাইট ডিউটি পর মেঘালয়ের ঘুমে চোখ ভেঙে আসছিল।কিন্তু, তানিয়ার ডাক উপেক্ষা করে যাওয়া মানে বেয়াদবি। অগত্যা মেঘালয়কে আবারও সেখানে যেতে হলো।
— আমি, মাশফি এবং আম্মু গিয়েছিলাম সেই মেয়েটির বাসায়।
কথাটি বলে সামান্য বিরতি নিয়ে আবারও বলতে শুরু করল তানিয়া।
— সরকারি বাসা। বাসাগুলো তেমন উন্নত না। ধরো তোমার আলোর সঙ্গে বিয়ে হলো। কিন্তু তুমি এক ঘন্টার জন্য তোমার শ্বশুরের বাসায় টিকতে পারবে না। মানে এতটাই অবস্থা শোচনীয় তাদের।
মাশফি এবার তানিয়ার পক্ষ নিয়ে বলল,
— দেখ মেঘালয়,মা হচ্ছে আবেগ্রপ্রবণ মানুষ। তার কথায় তো হ্যা বললে হবে না! তুই কি সেই আগের মত ছোট আছিস?
— মায়ের কথা আমি সবসময় অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি ভাইয়া। আজও করব। মা যেই ডিসিশন নিয়েছে সেটা নিশ্চয়ই অনেক ভেবেচিন্তে নিয়েছে।
— মেয়ের পরিবার গরীব। তানিয়া ব্যাঙ্গাত্মক সুরে বলল।
— মেয়ের পরিবার গরীব? তো কি হয়েছে? মেয়ের পরিবার মানুষ হলেই চলবে। কারণ মানুষের সঙ্গে সংসার করা গেলেও মানুষরুপী শয়তানগুলোর সঙ্গে সংসার করা সম্ভব নয়।
মেঘালয় কথাটি বলেই তার ঘরের উদ্দেশ্য চলে আসার জন্য পা বাড়াতেই তানিয়া বলে উঠল,
— তারমানে তুমি ওই মেয়েকে বিয়ে করবে?
— ওই মেয়ের খুব সুন্দর একটা নাম আছে, ভাবি। নাম সম্বোধন করে কথা বললে শুনতে ভালো লাগে। আলো মনে হয় না আমাকে বিয়ে করতে রাজি হবে। তাই নিশ্চিত থাকতে পারেন।
— যদি রাজি হয়?
তানিয়ার কটাক্ষ করে বলা কথাখানি শুনে মেঘালয় হেসে ফেলল। মাশফির দিকে তাকিয়ে বলল,
— ভাইয়া, তোমার বউ কেন আলোকে নিয়ে ইনসিকিউরিটিতে ভুগছে?
— মা যে আলো বলতে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে সেটা দেখেই ইনসিকিউরিটিতে ভুগছে। ভাবছে আলো তোর বউ হয়ে এলে মা’কে হাতের মুঠোয় রাখবে।
মাশফি কথাটি বলেই হো হো করে হেসে ফেলল। সেই সঙ্গে মেঘালয় হেসে ফেলল। এদিকে তানিয়ে রেগেমেগে উঠে চলে গেল সেখান থেকে। কারন, মাশফি তানিয়ার মনের অবস্থা বুঝে জায়গা মত তীর ছুঁড়েছে।
তানিয়া চলে যেতেই মাশফি মেঘালয়কে বলল,
— এদিকে আয়, পাশে এসে বস। কয়েকটা কথা বলি।
মেঘালয় মাশফির পাশের চেয়ার বসতে বসতে বলল,
— বলো, কি বলবে?
— আলোর বাবা একজন রেলওয়ে কর্মকর্তা। এলাকায় বেশ ভদ্রলোক মানুষ হিসেবে পরিচিত। আলো ভীষণ ভালো একটা মেয়ে। আমি খোঁজখবর নিয়েছি। টাকাপয়সা সব না মেঘালয়। জীবনসঙ্গী হিসেবে আলো অনেক অনেক ভালো হতে পারে। কারণ, যেই মেয়ে রাস্তায় অজানা মানুষকে হেল্প করতে পারে সেই মেয়ে নিজের মানুষদের হয়ত আরও বেশী আগলে রাখবে।
— আরে ভাইয়া, তোমরা কি শুরু করেছো বলো তো? আরে মাত্র বিয়ের প্রস্তাব গিয়েছে তাদের বাড়িতে। তারা বিবেচনা করুক। তারপর, না হয় এসব কথা বলো?
মেঘালয়ের কথার মাঝে মাশফি কিছু একটা খুঁজে বেড়াচ্ছে। ছোট ভাই দু’টোকে সে ভীষণ ভালোবাসে। বিয়ের পর স্ত্রীর জন্যই হয়ত পরিবার থেকে কিছুটা ছিটকে পরেছে। কিন্তু ভালোবাসা সেই আগের মতই আছে। মেঘালয় কি মায়ের কথা মানতে গিয়ে নিজের সঙ্গেই না আবার অন্যায় করে বসে? সেই চিন্তা তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।
— আলো মেয়েটাকে তোর কেমন লাগে, মেঘালয়?
মাশফির কথা শুনে মেঘালয় থমকে যায়। কারণ, বড় ভাইয়ের সঙ্গে তাদের এত সখ্যতা হয়নি যে এমন ব্যাপার নিয়ে ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ করতে পারবে।
— উত্তর দিতে হবে?
মেঘালয় দুষ্টুমি করে জবাব দেয়। মাশফি সিরিয়াস ভঙ্গিতে মেঘালয়ের কাঁধে হাত রেখে বলল,
— জবাব চাই। কারণ, তুই আর মা মিলে কথা পেটে নিয়ে ঘুরিস। তোরা সোজাসাপটা কথা বলিস না কখনো।
— জবাব নেই আমার কাছে। আমি চললাম। ঘুম পাচ্ছে। সারারাত হসপিটালে খেটে এসে নিজের বিয়ের আলাপ করতে এ্যানার্জি পাচ্ছি না। গুড বায়।
মেঘালয় চলে গেল। এদিকে মাশফি চিন্তিত ভঙ্গিতে মোবাইল ফোন বের করে কল করল কাব্যের নাম্বারে। কাব্যের কি মতমত সেটাও তো জানা জরুরি।
আলো সবেমাত্র বাসায় ফিরেছে। সকাল থেকে বাড়িতে ছিল না। সকালে গিয়েছিল কোচিংয়ে। কারণ শনিবার দিন সকালে কোচিংয়ে পড়ায়। কোচিং শেষ করে টিউশনি পড়াতে চলে যায়। টিউশনি শেষ করে এতক্ষণে ফিরল। বাসায় ফেরার পর আজ সিতারা বেগমকে বেশ আনন্দিত মনে হচ্ছিল আলোর কাছে। তবুও নিজের ছোট মস্তিষ্কে চাপ না দিয়ে গোসলে ঢুকল। গোসল শেষ করে। বের হয়ে দেখল সিতারা বেগম ভাত প্লেটে বেড়ে রেখেছে। আজ যে তার মায়ের মন ভীষণ ভালো, আলো টের পেল। কারণ, তার মায়ের মন যেদিন ভালো থাকে সেদিন আলোকে ভীষণ আদর করে। যেমন করে একজন মা আদর করে তার সন্তানকে। আলো নিঃশব্দে ভাত খেলো। আলোর ভাত খাওয়া শেষ হতে না হতেই আফসার সাহেব দুই ব্যাগভর্তি বাজার নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে। সিতারা বেগম এগিয়ে যায়। ব্যাগদুটো রান্নাঘরে রেখে ফিরে এসে আলোকে বলল,
— তোর বাবার নাকি কি কথা আছে তোর সঙ্গে! তোর বাবার ঘরে যা।
— বাজারগুলো গুছিয়ে দেই তোমায়। একা পারবে?
— পারব। তুই যা।
আলোর যেন আজ অবাক হবার দিন। অবাকের রেষ কাটিয়ে চলে গেল তার বাবার ঘরে। তার বাবা সবেমাত্র পরনের ঘমার্ক্ত কাপড়গুলো ছেড়ে লুঙ্গি পরছেন। ঠিক ওইসময় আলো তার বাবার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
— বাবা। আসব?
— আয়। অনুমতি নেয়ার কি আছে?
আলো ধীরপায়ে হেঁটে ওর বাবার খাটে গিয়ে বসল। আফসার সাহেব খাটের পাশে রাখা একটা প্লাষ্টিকের চেয়ারে বসলেন।
— তোর সঙ্গে জরুরি কিছু কথা ছিল। তুই যদি অনুমতি দিস তাহলে বলি?
— অনুমতি নেয়ার কি আছে?
আলো কথাটি বলতেই আফসার সাহেব হেসে বললেন,
— আমার কথা আমাকেই ফিরিয়ে দিচ্ছিস!
আলো মুচকি হেসে বলল,
— এমন স্পর্ধা আমার নেই বাবা। তুমি আমার সঙ্গে কথা বলার সময় অনুমতি নেবে কেন? আমি না তোমার মেয়ে? মেয়েদের কাছে বাবারা অনুমতি নেয় না।
আলোর কথা শুনে আফসার সাহেবের আনন্দে বুক ভরে উঠল। মেয়ের কথাবার্তা প্রায়ই তাকে মুগ্ধ করে। মেয়ে দেখতে তার মত হলেও, কথাবার্তার ধাঁচ পেয়েছে তার মায়ের।
— তোর জন্য একটা বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। তুই অনুমতি দিলেই আমি তাদের আসতে বলব আগামীকাল।
আলো থমকে যায়। হুট করে মনের মাঝে আবারও আতংক ভর করে। কারণ, তাকে দেখতে আসা মানে আরও একটা অপমানের দিন তার জীবনের অধ্যায়ে যোগ করা। তার বাবার মলিন মুখ, তার মায়ের কটাক্ষ কথাবার্তা হজম করা আলোর পক্ষে আর সহ্য করা সম্ভব নয়।
— বাবা, আমি বিয়ে করতে না চাইলে কোনো অসুবিধা আছে? “বিয়ে” “আমাকে দেখতে আসবে” এসব শব্দ আমার কাছে এখন আতংকের শব্দ। বাবা, আমাকে এসব শব্দ থেকে মুক্তি দেয়া যায় না?
আলোর কথা শুনে আফসার সাহেবের মন খারাপ হয়ে যায়। মেয়ের কথাগুলো মনে দাগ কেটে রক্তাক্ত করে তোলে। সমাজের নিয়ম মানতে হয় বলেই তো মেয়েদের বিদায় দিতে হয়। নয়ত, কে চায় নিজের অংশকে পরের ঘরে দিতে?আফসার সাহেব দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। মেয়েটাকে নিয়ে ইদানিং ভীষণ চিন্তা হয়। কিন্তু, মাহরীন আহমেদের কাছ থেকে আজ মেঘালয়ের জন্য আলোর বিয়ের প্রস্তাব শুনে আনন্দে ভরে উঠেছে আফসার সাহেবের মন।
— মা’রে মেয়েদের জন্ম হয়েছে পরের ঘরের জন্য। মেয়েরা হচ্ছে পরের বাড়ির আমানত। পরের বাড়ির আমানতকে পেলে পুষে বড়ে করে মেয়ের বাবা-মায়েরা। একদিন আমানত ফিরিয়ে দেয়ার সময় ঘনিয়ে আসে। আমানত ফিরিয়ে দিতে হয়। বাবা মাকে শত কষ্ট বুকের মাঝে রেখে মেয়েকে বিদায় দিতে হয়। সমাজের নিয়ম, সৃষ্টিকর্তার নিয়ম যে ভঙ্গ করা যায় না। যদি নিয়ম ভঙ্গ করার জন্য আমি অনুমতি পেতাম তাহলে আমি নিয়ম ভেঙে তোকে আমার কাছে রেখে দিতাম। কিন্তু, এমন নিয়ম যে কোনোদিনও হবে না।
আলোর চোখ দিয়ে টুপটুপ করে পানি পরছে। মাথা নীচু করে রেখেছে বিধায় আফসার সাহেব টের পেলেন মেয়ের নিঃশব্দ কান্না টের পেলেন না।
— মাহরীন আহমেদ এসেছিল আজ সকালে। তোকে উনার ছোট ছেলে মেঘালয়ের জন্য চাইছে। ছেলে চট্রগ্রাম মেডিক্যালের ইন্টার্নি চিকিৎসক।
ব্যস তিনটা বাক্য শুনে আলো চমকে তাকালো তার বাবার দিকে। কি বলছে তার বাবা
“মেঘালয়!” “মাহরীন আন্টি! “
তাকে কেন চাইবে? তার মাঝে স্পেশাল কিছুই নেই। মেঘালয় মানুষটাকে সেই প্রথমদিন থেকেই আলো মিথ্যা বলেছে, এড়িয়ে গেছে। শেষবার তো তার সামনে অপ্রীতিকর অবস্থায় পরেছিল।
— তুই অনুমতি দিলে আমি তাদের আগামীকাল আসতে বলব।
আলোর অবাকের রেষ কাটতে না কাটতেই আফসার সাহেবের শেষের কথাটুকু শুনে আলো চট করে উঠে দাঁড়ালো। এই ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে তার বাবাকে বলে গেল,
— আমি তাদের যোগ্য নই, বাবা। তাদের আসতে বারণ করে দেবে। আমার এত সৌভাগ্য হয়নি আমি মাহরীন আহমেদের ছেলের বউ হতে পারব।
মেঘেরওপারেআলো
পর্ব_৯
Tahmina_Akhter
আলোর বাবা আলোর কথা রাখলেন। মাহরীনকে কল করে জানিয়ে দিলেন আলো এখনই বিয়ে করতে রাজি নয়। মাহরীন যেন এই ভয়টা পাচ্ছিল ভেতরে ভেতরে। কারণ, আলো মেয়েটা একটু ডিফারেন্ট। বিলাসিতা, টাকা-পয়সার দিকে তেমন ওর আর্কষণ নেই। কাব্যের রিসিপশনের দিন বুঝতে পেরেছেন তিনি। মেয়েটাকে সেদিন ঘরের ভেতরে রেখে যাচাই করেছেন। আলমারীর চাবি লকের জায়গায় ঝুলিয়ে রেখে বের হয়ে গিয়েছিলেন। আলমারীতে প্রায় পনেরো ভরির মত স্বর্নালংকার ছিল। ক্যাশ ছিল পাঁচ লক্ষ টাকা। মেয়েটা এতটাই নিজেকে সব কিছু থেকে গুটিয়ে রেখেছিল যে,খাটের যেই জায়গায় বসেছিল সেই জায়গাটা অব্দি একটু কুঁচকাতে দেয়নি।
ঘটনার দুই দিন পেরিয়ে গেছে। কাব্য আর ইতির ফ্লাইট আগামী সপ্তাহে। এরই মাঝে যদি মেঘালয় আর আলোর মাঝে কিছু একটা করা যেত!
আকাশকুসুম ভাবতে ভাবতেই মাহরীন সিদ্ধান্ত নিলো সে আজ আলোর কোচিংয়ে যাবে। মেয়েটার সঙ্গে কথা বলা জরুরি। যেমন ভাবা তেমন কাজ। মাহরীন কাউকে না জানিয়ে ড্রাইভারকে নিয়ে রওনা হলো কোচিংয়ে। ড্রাইভার সেই কোচিং সেন্টার চেনে বলে ব্যাপারটা আরও সহজ হয়ে গেল।
আলো সবেমাত্র কোচিংয়ে ভেতরে ঢুকতেই যাবে তার আগেই মাহরীন আলোর সামনে এসে দাঁড়ালো। আলো মাহরীনকে দেখে অবাক হয়ে যায়।
— আন্টি, আপনি এখানে!
— তোমার সঙ্গে কিছু কথা ছিল।
—কিন্তু আন্টি আমার ক্লাস..।
— আমি ছুটি নিয়েছি। কাব্যের পরিচয় দিয়েছি বলে সহজ হয়েছে। এখন চলো আমার সঙ্গে।
আলোকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সামনের ছোট্ট একটা পাহাড়ের দিকে অগ্রসর হলো তারা। চট্টগ্রাম শহরের পাহাড়তলীতে শেখ রাসেল নামক শিশুপার্কে তারা প্রবেশ করল। সারিবাঁধা গাছ। স্মৃতি-স্তম্ব, শহীদ মিনার, পাশেই ব্যস্ত রাস্তা । যেখানে রোজ হাজার হাজার গাড়ি ছুটে চলে নিজ গন্তব্যে। ঢালু পথ পেরিয়ে সামান্য পাহাড়ের ওপরে গেলেই দেখা মিলে বাংলাদেশ রেলওয়ে জাদুঘরের। ভেতরে আছে অসংখ্য তারসংযোগের টেলিফোন, রেলপথের ছোট প্রজেক্ট, কিছু ট্রেনের যন্ত্রাংশ সহ আর অনেককিছুই আছে।
মাহরীন আলোকে নিয়ে স্মৃতি স্তম্ভের সামনের সিঁড়িতে বসল। চারপাশে কোলাহল মাহরীনকে স্পর্শ করছে না। আলোর মাথায় হাত রেখে আদুরে সুরে মাহরীন জিজ্ঞেস করলো,
— আমার মেঘালয় কি দেখতে খারাপ? নাকি যোগ্যতা কম? ওকে রিজেক্ট করার কারণ কি আলো?
— উনার সঙ্গে দাঁড়াবার যোগ্যতা আমার নেই, আন্টি। আমি দেখতে কালো, আমরা মধ্যবিত্ত। আপনারা বড়লোক। উনি ডাক্তার মানুষ। উনি আমার থেকেও ভালো মেয়ে ডির্জাভ করে।
আলো ধীরে ধীরে নিজের কথাগুলো মাহরীনের সামনে উপস্থাপন করল। মাহরীন সবটা শুনে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর, আলোর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রাস্তায় ছুটে চলা চলন্ত গাড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
— কিন্তু, আমি তো চাই তুমিই আমার মেঘালয়ের বউ হবে। বাহ্যিক যোগ্যতা দিয়ে মানুষ কেমন হয় বিচার করতে পারি না, আমি?
আলো বিস্মিত হয়ে গেল। মাহরীনের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল আলো। মনে মনে ছক আঁকতে শুরু করল। মাহরীনকে কোনোভাবে ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। কারণ, তিনি আলোকে হয়ত অধিক পছন্দ করে ফেলেছেন। আলো নিজের কমতির কথা কেন জানি মাহরীনকে বলতে ইচ্ছে করছে না! কে বা চায় নিজের কমতি সম্পর্কে বলতে? কে চাইবে তাকে কেউ করুনার চোখে দেখুক? তাছাড়া, মাহরীনকে সে মায়ের স্থানে বসিয়েছে। মেঘলায়কে সে বিয়ে না করুক কিন্তু মাহরীনের সঙ্গে সু-সম্পর্ক রাখতে চায়।
— আন্টি, আপনি একবার উনাকে এখানে আসতে বলবেন? উনার সঙ্গে আমি কথা বলব। যদি উনার সঙ্গে কথা বলার পর আমি হয়ত সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারব।
আলোর কথা শুনে মাহরীনের ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটে উঠল।
— উনিটা কে? আমার মেঘালয়?
মাহরীনের কথায় এবার আলোর কেন জানি লজ্জা পাচ্ছে! সামান্য একটা শব্দকে ঘিরে কেউ মজা করতে পারে!
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। আলোর এবার দুশ্চিন্তা হচ্ছে। কারণ, তার বাসায় ফিরে যাবার সময় হয়ে গেছে। বাসায় ফিরে যাবার সময় এদিক-সেদিক হলেই সিতারা বেগম তো চেঁচামেচি করবেই। তার বাবাও চিন্তা করবে। এদিকে মাহরীন আর আলো আধঘন্টা ধরে অপেক্ষা করছে মেঘালয়ের জন্য। মাহরীন মেঘালয়কে এখানে আসতে বলেছে আর্জেন্ট।
অবশেষে অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মেঘালয় এসে পৌঁছেছে সেখানে। মাহরীনের মোবাইলে সে কল দিয়ে জিজ্ঞেস করল। কোথায় আছে ওরা? মাহরীন স্থানের নাম বলার পাঁচমিনিট পর মেঘালয় সেখানে উপস্থিত হলো। মাহরীনের পাশে আলোকে দেখে মেঘালয় থমকে যায়। ভেবেছিল আলোর সঙ্গে তার মায়ের পাতানো সম্পর্ক শেষ। কিন্তু, এখনও সম্পর্ক টিকে আছে। এদিকে আলোর লজ্জা লাগছে। সেদিনকার ঘটনার পর থেকে মেঘালয়ের দিকে তাকানোর সাহসটুকু হারিয়ে গেছে।
— আমি ওদিকটায় আছি। তুই আলোর সঙ্গে কথা বল।
মেঘালয়কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে মাহরীন চলে গেল। মেঘালয় বোকার মত তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। কি কথা বলবে? আলো সেদিন না জানিয়েছে। মেঘালয় মেনে নিয়েছে। কারণ, বিয়ে-শাদির ব্যাপারে জোর-জবরদস্তি ব্যাপারটা চলে না। আলোর সিদ্ধান্তকে সে পূর্ণ সম্মান জানিয়েছে। কিন্তু, তার মা যে এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি আজই বুঝতে পারল। মেঘালয় দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর, আলোর থেকে ঠিক দুইহাত দূরে বসে পরল। আলো খানিকটা সরে বসল৷ মেঘালয় এবার স্মৃতি স্তম্বের লাল টাইলসের মেঝেতে দৃষ্টি রেখে বলল,
— আপনি যদি সেদিন হ্যা বলতেন তাহলে আমার অনুমান ভুল প্রমাণিত হত। অবশ্য না করেছেন শুনেও খানিকটা অবাক হয়েছি।
— অবাক হোননি। আপনার ইগোতে লেগেছে বোধহয়?
কথাটি কটাক্ষের সুরে বলল আলো। কারণ, সে এখনও মেঘালয়ের সঙ্গে মোটেও স্বাভাবিকভাবে কথা বলবে না। মেঘালয়ের তার প্রতি বিরুক্তি জন্মালে চলবে। কারণ, ছেলের মা হাজারবার চেষ্টা করুক কিন্তু ছেলে রাজি না হলে বিয়ে হবে কি করে? নিজের বুদ্ধির কথা ভেবে আলো যেন ভেতরে ভেতরে স্বস্তি পাচ্ছে ।
মেঘালয় আলোর কথা শুনে অবাক হলো। আলো টের পেলো কীভাবে? আসলেই তার ইগোতে লেগেছে। যদিও সে জানত আলো তাকে রিজেক্ট করবে। কিন্তু রিজেক্ট করেছে শোনার পর মেঘালয়ের অস্বস্তি হয়। কারণ, মেঘালয়কে রিজেক্ট করার কোনো কারণ নেই। মেঘালয়ের মত ছেলেদের মেয়ের বাবা-মায়েরা খুঁজছে। মেয়েটা যে শক্ত ধাঁচের আরও একবার সে টের পেলো।
— আমি মাহরীন আন্টিকে সন্মান করি, ডাক্তার সাহেব। উনি আমার কাছে ছুটে এলেন আজ। কিন্তু, উনাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে আমার খারাপ লাগছে। কিন্তু, আমিও যে অপারগ হয়ে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি। আমার মত মেয়ে আপনার যোগ্য কখনোই হতে পারে না। আপনি আপনার মত কাউকে ডিজার্ভ করেন।
আলো অদূরে পশ্চিমের আকাশে ঢলে পড়া অস্তমিত সূর্যটার দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলল। মেঘালয় মাথা নীচু করে সব শুনল। তারপর, মাথা তুলে আলোর দিকে তাকিয়ে বলল,
— আপনি যেই ফ্যাক্টগুলো বলছেন সেগুলো আমিও জানি। কিন্তু, এই পৃথিবীতে সব জায়গায় ফ্যাক্টের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না।
মেঘালয়ের কথা শুনে আলো দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে যায়। মেঘালয়ের কাছ থেকে এমন উত্তর সে আশা করেনি। ভেবেছে মানুষটা তার কথায় সায় দেবে!
— তো আপনি কি বলতে চাইছেন আপনার সঙ্গে আমার বিয়ে হওয়া উচিত। বিয়ের মত একটা চিরস্থায়ী সম্পর্কে দুই ফ্যামিলির স্ট্যাটাস, মিল-অমিল, গুন-খুঁত এগুলো কোনো ফ্যাক্ট না, আপনি বলতে চাইছেন?
— অবশ্যই ফ্যাক্ট আছে। কিন্তু, এই ফ্যাক্ট নির্ভর করছে মেনে নেওয়া কিংবা মেনে না নেওয়াতে। মেনে নিলে কোনো ফ্যাক্টের ভ্যালু নেই। আর মেনে না নিলে হাজারটা ফ্যাক্ট দাঁড় করানো যায়।
আলোর হাল ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করছে। নিজের ওপর ধিক্কার জানাতে ইচ্ছে করছে। তার এমন সোনায় বাঁধানো কপালই যদি ছিল তাহলে তাকে এতবড় খুঁত কেনো শরীরে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে? মাহরীন কেন তার জীবনে এলো? মাহরীন এসেই তার জীবনে ম্যাজিক করছে? আলোর বুকের ওপর চাপ যেন দ্বিগুণ হলো। ভেবেছিল মেঘালয়কে সাধারণ কিছু কথা বলে ফিরিয়ে দেবে। এবং সামনের দিকে যেন বিয়ের আলাপ নিয়ে কোনো কথা না-হয় সেই ব্যাপারে বলবে। কিন্তু, সাধারণ কথায় মনে হচ্ছে না মেঘালয় রাজি হবে। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে সবটা জানাবে মেঘালয়কে। সবটা জানার পর নিশ্চয় আর আলোকে বিয়ে করতে চাইবে না। কোনো পুরুষ চায় না তার স্ত্রীর খুঁত থাকুক। অতি নিখুঁত সুন্দরী স্ত্রীরা মাঝে মাঝে স্বামীকে আকৃষ্ট করতে পারে না। সেখানে আলোর কি আছে? না আছে সৌন্দর্য আর না আছে পরিপূর্ণ দেহ। কাটাছেঁড়া দেহটাকে নিয়ে বড়াই করতেও আলোর মুখে বাঁধে।
মেঘেরওপারেআলো
পর্ব_১০
Tahmina_Akhter
হুট করে পার্কের পাশে মানুষের হট্টগোল পরে গেল। মানুষ সেদিকেই যাচ্ছে। মেঘালয়ের মনটা কেন যেন ধুক করে উঠল! আলোকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে উঠে চলে গেল হট্টগোলের দিকে। ভিড় ঠেলে ভেতরে গিয়ে দেখল তার মা মাহরীন অচেতন হয়ে পিচঢালা রাস্তায় পরে আছে। মেঘালয় মাহরীনের সামনে হাঁটুগেড়ে বসল। গাল ধরে কয়েকবার “মা” বলে ডাকল কিন্তু মাহরীনের দিক থেকে কোনো সাড়া নেই৷ ততক্ষণে আলো চলে এসেছে। মাহরীনের সামনে বসে মাহরীনের হাত ধরে কয়েকবার ডাক দিলো। কিন্তু মাহরীন নিশ্চুপ।
— কারো কাছে পানি হবে?
মেঘালয় চিৎকার করে বলল। পাশের ফুচকা স্টলের একজন লোক পানি এনে দিলো। আলো হাত বাড়িয়ে পানি নিয়ে মাহরীনের চোখেমুখে ছিটিয়ে দেয়। কিন্তু, মাহরীন…
মেঘালয় উঠে দাঁড়ালো তারপর ড্রাইভারকে কল করতেই কিছুক্ষণের মধ্যেই ড্রাইভার কার নিয়ে সেখানে এলো। ভাগ্যিস গাড়িটা এখানে ছিল। মেঘালয় ভিড় কমাতে বলল সবাইকে উদ্দেশ্য করে।
মূহুর্তের মধ্যে সবাই সড়ে দাঁড়াল। মেঘালয় তার মাকে কোলে তুলে গাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। মাহরীনকে গাড়ির সিটে বসিয়ে পেছনে ফিরতেই দেখল আলো দাঁড়িয়ে আছে। মেঘালয় বুঝতে পারল আলোর কি চাই?
— উঠে বসুন।
মেঘালয় সরে দাঁড়াতেই আলো মাহরীনের বাম পাশে বসল আর মেঘালয় ডানপাশে। ড্রাইভার ততক্ষণে গাড়ি স্টার্ট করে রওনা হলো সিএইচসিআর হসপিটালের উদ্দেশ্য। মেঘালয় ইতিমধ্যে কাব্য এবং মাশফিকে কল করে জানিয়ে দিলো। এবং এটাও বলল যেন মাহরীনের রিপোর্টগুলো নিয়ে অতিদ্রুত হসপিটালে চলে আসে।
আলো সব শুনছে। কিন্তু বোধগম্য হচ্ছে না আসলে মাহরীনের কি হয়েছে? মাহরীন কি আগে থেকেই অসুস্থ? সেদিনও মানুষটা হুট করে অসুস্থ হয়ে পরাতে আলোর সঙ্গে তার দেখা হলো। মাহরীনের হাত ধরা অবস্থায় কথাগুলো ভাবছিল আলো। ঠিক সেইসময় মেঘালয়ের কথা শুনে আলো মাথা উঁচু করে তাকালো।
— আপনার বাবাকে কল করে বলে দিন। নয়ত দুশ্চিন্তা করবে।
মেঘালয় মোবাইল বাড়িয়ে রেখেছে আলোর দিকে। আলো দেখল খুব চমৎকার একটা মোবাইল ফোন। কিন্তু এই মোবাইল কিভাবে ইউজ করতে হয় সে তো জানে না?
— আমি তো এই মোবাইল ইউজ করে অভ্যস্ত নই। আমি বাবার নাম্বারটা বলছি, আপনি ডায়াল করে দিন।
মেঘালয়ের তখন অবাক হবার কথা কিন্তু ওকে কোনো সেন্স যেন কাবু করতে পারল না। মায়ের জন্য করা দুশ্চিন্তা তাকে আর অন্যকিছুতে মনোযোগী করতে পারল না। আলো নাম্বার বলল। মেঘালয় সেই নাম্বারে কল ডায়াল করে আলোর দিকে বাড়িয়ে দিলো। আলো মোবাইল হাতে নিয়ে কানে ধরল। আফসার সাহেব কল রিসিভ করতেই, আলো সংক্ষিপ্ত আকারে সব ঘটনা খুলে বলল৷ এখন যে সে হসপিটালে যাচ্ছে সেটাও বলল। আফসার সাহেব জানালেন, তিনি রওনা হচ্ছেন। হসপিটালের নাম জিজ্ঞেস করল। আলো হসপিটালের নাম বলে কল রেখে দিতে বলল ওর বাবাকে। আফসার সাহেব কল কেটে দিলো।
এদিকে গাড়ি এবার রেলগেট পেরিয়ে জিইসির পথে। মেঘালয় মাহরীনের দিকে তাকিয়ে আলোকে বলল,
— মা, লিউকেমিয়ার প্যাশেন্ট৷ স্টেইজ টুতে আছে। দিনদিন মা’র শরীর খারাপ হচ্ছে।
মেঘালয় চুপ হয়ে যায়৷ মাহরীনের মুখের দিকে তাকিয়ে আলোকে উদ্দেশ্য করে বলল,
—মায়ের অনেক ইচ্ছা আপনাকে আমার স্ত্রী হিসেবে দেখার৷
আলো মেঘালয়ের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারল না। মাহরীনের অচেতন মুখটার দিকে তাকিয়ে বলল,
— সব ইচ্ছা কি পূরণ করা সম্ভব?
এরপর মেঘালয় আর কথা বাড়ায় না। মাহরীন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে মাহরীনকে এডমিট করানো হলো। এই হাসপাতালে মাহরীনের চিকিৎসা চলছে। ইতিমধ্যে মাশফি, তানিয়া, কাব্য, ইতি হসপিটালে পৌঁছে গেছে। মাশফি মাহরীনের রিপোর্ট গুলো মেঘালয়ের কাছে দিতেই মেঘালয় রিপোর্টগুলো নিয়ে মাহরীনের ডাক্তারের কেবিনের প্রবেশ করল। ডাক্তার নতুন করে সব টেস্ট করার জন্য সাজেস্ট করল। মেঘালয় সব শুনল। তারপর, ডাক্তারকে বলল,
— একটু কি উন্নতি হয়নি? এত এত চিকিৎসা দেয়ার পরও কি মায়ের হেলথ ভালো হবার চান্স নেই?
— রোগ সম্পর্কে আবেগী কথা বলা যায় না। আপনি নিজেও ডাক্তার। আমি সন্দেহ করছি যে আপনার মা এখন স্টেইজ ফোরে আছে। চিকিৎসা চললে বড়োজোর তিনমাস তিনি বেঁচে থাকবেন….
মেঘালয়ের যেন পুরো আকাশ ভেঙে পরল মাথার ওপর। মা’কে ছাড়া সে নিজেকে কল্পনা করতে পারে না। সেদিনকার বলা কথাগুলো ভাবতে ভাবতে মেঘালয়ের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। চোখের জল গড়িয়ে পরার আগেই ডাক্তার এক্সকিউজ মি বলে বের হয়ে আসে। বুকটা চুরমার হয়ে যাচ্ছে। কি করলে মা’কে বাঁচানো যাবে? কি করলে তাদের মা তাদের ছেড়ে অসীম যাত্রায় রওনা হবে না? কি করলে মায়ের আঁচলে ঢেকে থাকবে সারাজীবন? মেঘালয়কে ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হতে দেখে মাশফি এবং কাব্য দু’জনেই এগিয়ে যায়। মাশফি জিজ্ঞেস করে,
— কি বলল, ডাক্তার?
মেঘালয় হুট করে মাশফিকে জড়িয়ে ধরল। কাব্য স্তব্ধ হয়ে যায়। তানিয়া, ইতি আর আলোর একই অবস্থা। অজানা আশংকার ওদের বুক কেঁপে ওঠে।
— ভাইয়া, মা..। মাকে ছাড়া কিভাবে থাকব আমি? রাতবিরেতে যখন বাড়িতে ফিরব তখন আমার জন্য কে টেবিলে বসে অপেক্ষা করবে?বলো না ভাইয়া? কোথায় নিয়ে গেলে, মা সুস্থ হবে??
মাশফি আর কাব্য যেন নিজেদের মধ্যে নেই। ছেলে মানুষ নাকি কাঁদতে পারে না। কাব্য, মাশফি আর মেঘালয় যেন তাদের মায়ের শেষ পরিণতির খবর শুনে এতটাই ভেঙে পরল যে তাদের চোখের কোনে পানির উপস্থিতি ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল।
এরপরের অবস্থা থমথমে। মাহরীনের চিকিৎসা চলছে। মেঘালয়, কাব্য আর মাশফি হসপিটালে রয়ে গেছে। আলোকে ওর বাবা এসে নিয়ে গেছে ঘন্টাখানেক আগে।
পুরো একটা নির্ঘুম রাত কাটিয়ে সকালের স্নিগ্ধ রোদের পরশে মেঘালয় চোখ খুলল। করিডরে পেতে রাখা সারিবদ্ধ চেয়ারে তিন ভাই রাত কাটিয়ে দিয়েছে। কাব্য আর মাশফি তখন চেয়ার গা এলিয়ে ঘুমিয়ে আছে। মেঘালয় ওয়াশরুম গিয়ে মুখে পানির ছিটা দিয়ে বের হয়ে সোজা চলে গেল ডাক্তারের কাছে। ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে মাহরীনের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি পেল মেঘালয়।
কেবিনে ঢুকতেই মেঘালয় দেখতে পেলো মাহরীনের ক্লান্ত মলিন চেহারা। ধীরপায়ে এগিয়ে যায় মাহরীনের বেডের পাশে। মাহরীন যেন মেঘালয়ের উপস্থিতি টের পেলো। কোনোমতে চোখ খুলে হাসিমুখে বলল,
— তোদের আবারও বিরক্ত করছি তাই না, মেঘ?
মেঘালয় তার মায়ের কথা শুনে মাহরীনের হাত ধরে কান্না ধরা গলায় বলল,
— কে বলল মা এমন কথা?
— আমার সময় হয়ে গেছে রে মেঘালয়। আমি বোধহয় বাঁচব না বেশিদিন।
— এমন কথা বলো না। ঠিক হয়ে যাবে তুমি। ডাক্তারের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। আমরা ভারতে নিয়ে যাব তোমাকে। সেখানকার চিকিৎসা অনেক ভালো।
— আর ভালো লাগে না হসপিটাল আর হসপিটালের গন্ধ। মেঘালয়?
— বলো, মা?
তখনও মেঘালয় শক্ত করে ওর মায়ের হাত চেপে ধরে রেখেছে।
— আলো রাজি হয়েছে?
মেঘালয় চুপ হয়ে যায়। কি বলবে তার মা’কে? আলোর সঙ্গে তার সম্পূর্ণ কথা হয়নি। মেয়েটা তাকে কি যেন বলতে চেয়েছিল? কিন্তু..
— চুপ করে আছিস কেন?
মাহরীনের কথায় মেঘালয় ভাবনার জগত থেকে বের হয়ে আসে। মাহরীনের হাতটা তার কপালে ঠেকিয়ে বলল,
— আলো রাজি হয়েছে, মা। তুমি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলে দেখবে তোমার মেঘালয় তোমার ইচ্ছা অনুসারে ঘোড়ায় চড়ে আলোকে বউ বানিয়ে তোমার বাড়িতে নিয়ে আসবে। আচ্ছা মা, ঘোড়া ম্যানেজ করবে কোত্থেকে?
মেঘালয়ের সুন্দর মিথ্যা কথা শুনে মাহরীনের ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে উঠল। হাসতে হাসতে বলল,
— তুই সত্যি বলছিস! আমার তো বিশ্বাস হচ্ছে না!
— হান্ড্রেড পার্সেন্ট সত্যি কথা বলছি আমি। তুমি এবার নিজের শরীরের দিকে নজর দাও। তোমার ছোট ছেলের বউকে তোমার বরণ করতে হবে তো,মা?
মাহরীনের ঠোঁটের কোণ থেকে যেন হাসি সড়ছে না। মেঘালয় জানে না সে কেন মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে? তবে এতটুকু বুঝতে পারল, আলোকে তার যে করেই হোক বিয়ের জন্য রাজি করাতে হবে। মায়ের শেষ ইচ্ছে সে যে কোনো কিছুর বিনিময়ে সে পূরণ করবেই৷
চলবে…
[আমার পেইজ ছাড়া অন্যকোথাও গল্প পড়া থেকে বিরত থাকবেন। কিছু অসাধু মানুষ আমার নাম এবং গল্পের ছবি ব্যবহার করে নকল গল্প ছড়াচ্ছে। আমার পেইজ ফলো করতে ভুলবেন না 🥰]
Share On:
TAGS: তাহমিনা আক্তার, মেঘের ওপারে আলো
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২২
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব (১৫,১৬)
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৬
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১৩
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৩১
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১৮
-
মেঘের ওপারে আলো গল্পের সবগুলো পর্বের লিংক
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২৬
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২১
-
মেঘের ওপারে আলো পর্ব ১৪